:: হাইপেশিয়া :: রুকসানা/আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট :: অ্যাডা :: তসলিমা নাসরিন :: হুমায়ুন আজাদ :: দালাইলামা :: সুরের রাণী মমতাজ ::

“এক পায়ে নূপুর তোমার অন্য পা খালি, এক পাশে সাগর আর এক পাশে বালি”- বেশ কিছু সময় ধরে বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে এই গান। আপনি আগের লাইনটি পড়ে, যদি এই দ্বিতীয় লাইনে চলে আসেন এবং এ-পর্যন্ত আপনার কাছে যদি একটুও খটকা লেগে না-থাকে, সে-ক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন থাকলো, কারা ‘বাংলার মানুষ’? প্রশ্ন থাকলো, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ -যারা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ, কি দাম আছে তাদের কাছে এই এক নূপুরওয়ালা পায়ের? মানুষ যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যায়, তখন ভুলে যায় তার শিশুকালের কথা; যখন ফাইনাল ইয়ারে পড়ে, তখন ভুলে যায় ফার্স্ট ইয়ারের কথা; যখন মাটির থেকে দূরে চলে যায়, তখন ভুলে যায় মাটির কাছের মানুষের কথা, মাটির মানুষের কথা। সমস্ত ইন্ডাস্ট্রি, সমস্ত সংস্কৃতাঙ্গণ, সমস্ত মিডিয়া যখন মত্ত আধুনিক সব শ্রোতার অত্যাধুনিক চাহিদা মেটাতে, ঠিক তখনটাতে বাংলার সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়াকে সুরের জগতে বাস্তবায়িত করতে নিয়োজিত হয়েছেন কণ্ঠশিল্পী মমতাজ, ভক্তদের কাছে যিনি পরিচিত ‘মমতাজ বুবু’ নামে।

কল্পনার কাব্যিক ঝংকার নয়, ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট এর জানু-জানু, ডার্লিং-ডার্লিং খেলা নয়, তার গানে উঠে এসেছে সাধারণ জবীনের প্রেম-পিরিতি, সাথে সাথে উঠে এসেছে অভিযোগ-অনুযোগ, ছল-চাতুরী। অপ্রকাশিত সব বাস্তব সত্য ফুটে উঠেছে গানের কথা হয়ে। নীচের দেয়া গানের কথাগুলো শুধু একটি গান নয়, সাথে সাথে জীবনের প্রতিধ্বণিও-

‘ভাড়া কইরা স্যুট পইরা আমার বাড়ী আইসা / প্রতিদিনই চা খাইয়া যায় কাসেম আলী কাইশা / আমার বাপের কানের কাছে করে প্যান্‌প্যান্‌ / এত সুন্দর মাইয়্যার লগে আমায় বিয়া দেন / সে-তো ডেঞ্জারম্যান, সে-তো ডেঞ্জারম্যান / চায় সে আমার বাড়ী-গাড়ী-টিভি-এসি-ফ্যান / সে-তো ডেঞ্জারম্যান, সে-তো ডেঞ্জারম্যান / সিস্টেম করে সবখানেতে সাজে জেন্টেলম্যান।’

মমতাজের অপরিশীলিত উচ্চারণে বলা বেশ কিছু ইংরেজী শব্দের ব্যবহারে নির্মিত ডেঞ্জারম্যান গানটির মিউজিক ভিডিও আছে এখানে-

ভিডিওঃ ডেঞ্জারম্যান গানের মিউজিক ভিডিও

বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে একবার কোনো একটা রাজনৈতিক দলের আমন্ত্রণে প্রায় নামকরা সব ব্যান্ড একেকদিন একেক দল ক্যাম্পাসে গান করে যাচ্ছেন। সবার প্রোগ্রামে স্টুডেন্ট বা শ্রোতা কম বেশি হলো। কিন্তু, যে-দিন মমতাজের প্রোগ্রাম হলো, হলগুলি সব খালি হয়ে গেলো। অনুষ্ঠানস্থলে তিল ধারণের জায়গাটুকুও থাকলো না। প্রাণ খুলে শ্রোতারা তাঁর গান শুনলেন, আনন্দ করলেন, নাচলেন, গাইলেন, চিৎকার করলেন। শুধু করলেন না একটা জিনিস, ‘সত্যটা’ স্বীকার করলেন না। ঘরে ফিরে বললেন-‘ধুর্‌ মমতাজের গান কোনো ভদ্রলোক শুনে।’ কিন্তু, কি আসে যায়, তাদের স্বীকার-অস্বীকারে, তাদের দেয়া স্বীকৃতির অভাবে মমতাজতো আর থেমে থাকেননি, এগিয়ে গেছেন সব প্রতিকূলতাকে পরাস্ত করে। আজ গাছতলা থেকে দশতলা, সবাই শুনেন মমতাজের গান, শুধু দ্ব্যার্থহীন স্বীকৃতিটুকু দেবার সততা দেখাতে ব্যর্থ হোন সেই সমস্ত ‘ভদ্দরনোকেরা’।


ভিডিওঃ লন্ডনে মমতাজ (লাইভ)

গানের কথা সাধারণ, উচ্চারণ অপরিশীলিত, তাহলে আর কি এমন বাকী থাকে, যেটা দিয়ে একজন শিল্পী এতটা উপরে উঠতে পারেন। হুম্‌, আর বাকী থাকে কণ্ঠ, বাকী থাকে সুর, বাকী থাকে মিউজিক। সুরের জাদু দিয়েই মমতাজ আজ বাংলাদেশের ‘সুরের রাণী’ খেতাবে ভূষিত। মমতাজের সুপারহিট ‘খায়রুন সুন্দরী’ গানের সুরের আদলে করা এই ডুয়েটেও ফুটে উঠেছে মমতাজের সেই তেজস্বী সুরেলা কণ্ঠ-

ভিডিওঃ মমতাজের ডুয়েট

মানিকগঞ্জের এক স্বল্পপরিচিত গ্রামে জন্ম নেয়া মমতাজ, বাবা ‘মধু বয়াতী’র কাছেই শৈশবে গান শিখেছেন, সাথে সাথে ‘মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান’ নামের আরেকজন গায়ককে দিয়েছেন গুরুর মর্যাদা। বাবার সাথে সাথে ঘুরে ঘুরে মমতাজ গান শুনেছেন, কখনো কখনো অল্প-স্বল্প গেয়েছেনও। কিন্তু একটা সময় যখন বুঝতে পেরেছেন, এই গানের রাজ্যই তাকে বারে বারে ডাকছে, আপন করে নিতে চাইছে; তখন আর ফিরে আসতে পারেননি। গানকেই করে নিয়েছেন জীবনের ধ্যান-জ্ঞান, জীবনের উদ্দেশ্য।

**********************************************
অডিওঃ ভয়েস অব অ্যামেরিকায় মমতাজের সাক্ষাৎকার (ক্লিক এমপিথ্রি)
**********************************************

আজকের প্রতিষ্ঠিত মমতাজের ব্যক্তিগত জীবনের ঊনিশ-বিশ নিয়ে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেন। বলেন, ‘আজকের যে মমতাজ তাকে শ্রোতারাই সে মমতাজ বানিয়েছেন’। ভাবখানা এমন যে, মমতাজকে এখন তাদের মনের মত করে চলতে হবে, এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও। অত্যন্ত হাস্যকর তাদের চিন্তা-ভাবনা। বাঙালি কখনো কাউকে সন্মান করে না, সন্মান করে একমাত্র বাধ্য হলে। কৌতুক আছে যে, ‘নরকের সব গেইটে দারোয়ান আছে, যাতে করে নরক থেকে পালিয়ে কেউ স্বর্গে যেতে না পারে। শুধুমাত্র, বাঙ্গালিদের জন্য নির্মিত নরকে কোনো দারোয়ান নেই। কারণ, বাঙালি কেউ নরক থেকে পালিয়ে স্বর্গে যেতে চাইলে, নিজেদের স্বগোত্রীয়রাই তাকে টেনে ধরে রাখে। এরা কারো ভালো সহ্য করতে পারে না, এমনকি সেটা নিজেদের কেউ হলেও।’ সম্পূর্ণ নিজ যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত আজকের এই সফল মমতাজ। কেউ যদি ধারণা করে থাকেন যে, কোনো বিশেষ শ্রেণীর অনুকম্পায় তিনি সফলতার মুখ দেখেছেন, এতটা উপরে উঠেছেন, তাহলে সেটা হবে নিতান্তই এক ভুল ধারণা। বরং, মমতাজের জীবনের বাস্তবতা ছিলো সম্পূর্ণ উলটো।

ছবিঃ মমতাজ

দিনের পর দিন বিনা টাকায় অ্যালবামের জন্য কাজ করেছেন মমতাজ। একটা অ্যালবাম যখন সুপার হিট হলো, প্রযোজক যখন গুণতে লাগলো কাড়ি কাড়ি টাকা, তখন মমতাজকে মাত্র দুই হাজার টাকার প্রস্তাব করা হলো পরবর্তী অ্যালবামের কাজ করার জন্য। তাও অ্যালবাম যদি হিট না করে তাহলে এই দুইহাজার টাকাও ফেরত দিতে হবে। দ্বিধাগ্রস্ত মমতাজ শঙ্কিতচিত্তে করে গেছেন সে অ্যালবাম। নিজেকে তিনি চিনতেন-জানতেন, কিন্তু জানতেন কি-না জানি না, বহু যুগ আগে এক মহাপুরুষ বলে গিয়েছিলেন, অত্যন্ত সহজ কিন্তু জটিলের থেকেও জটিল একটি বাক্য- ‘যোগ্যতমের জয়’। আরো একবার সে বাক্যের সত্যতা প্রমাণ হবার মধ্য দিয়েই, মমতাজকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। এমনও সময় গেছে যখন দিনে দুইটা অ্যালবামের রেকর্ডও করেছেন মমতাজ। বর্তমানে মমতাজের অ্যালবামের ঈর্ষণীয় সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাতশো।

ভিডিওঃ আধুনিক ইনস্ট্রুমেন্টের সাথে মমতাজের গান

বহুসংখ্যক অ্যালবামের সাথে সাথে মমতাজ অর্জন করে গেছেন বিপুল জনপ্রিয়তাও। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে মনোনীত হোন সংসদ সদস্য। তাছাড়া, মমতাজ বাংলাদেশের একমাত্র শিল্পী যার জীবনের উপর ভিত্তি করে তৈরী হয় চলচ্চিত্র, আর সেই চলচ্চিত্রে শিল্পী নিজেই অভিনয় করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১১ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রুনা-সাবিনার সাথে যে আরেকজন শিল্পী গান গাইবার বিরল সুযোগ ও সন্মান পেয়েছিলেন, তিনিও সেই মমতাজই।

ভিডিওঃ ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মমতাজ


ভিডিওঃ ক্রিকেটার আশরাফুলের উইকেট এবং মমতাজের গান

মমতাজ শুধু যে সাধারণ মানুষের জন্য গানই করেছেন তা নয়, সাথে সাথে সাধারণ মানুষের কাছে থাকা সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাও ভুলে যাননি তিঁনি। একদিন টাকার অভাবে বাবার চোখের অপারেশান করাতে পারেননি, যার ফলে বাবা ‘মধু বয়াতী’ অকালেই অন্ধ হয়ে যান। সেই অপ্রাপ্তি থেকেই পরবর্তীতে মমতাজ নিজ গ্রাম ও জেলা শহরে প্রতিষ্ঠা করেন দুই দুটি চক্ষু ও শিশু হাসপাতাল। এছাড়া, তিনি ‘মমতাজ ফাউন্ডেশান’-এর মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছেন বিভিন্নধরণের শিক্ষামূলক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে।


ভিডিওঃ সকল মহলে প্রশংসিত ‘মনপুরা’ ছবির জন্য গাওয়া মমতাজের একটি গান


ভিডিওঃ ‘আমি কারো হলে তোমার কেন জ্বলে’ -পর্দায় মমতাজের আরেকটি প্রাণবন্ত উপস্থাপনা

সচেতনতার কথা যদি বলতে হয়, বাংলাদেশের কয়জন কণ্ঠশিল্পী তাদের ওয়েবসাইট পরিচালনা করেন আমার জানা নেই; তবে মমতাজের কিন্তু ঠিকই রয়েছে অত্যন্ত চমৎকার এবং কার্যকর একটি ওয়েবসাইট, যেটা তার সচেতন মানসিকতার আরেকটি উজ্জ্বল, অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

**************
মমতাজের ওয়েবসাইট
**************

সবশেষে মমতাজের কণ্ঠে হাসন রাজার জনপ্রিয় গান ‘লোকে বলে, ও বলেরে, ঘর বাড়ি বালা(ভালা) না আমার’ দিয়ে শেষ করছি। শুভকামনা থাকলো তিনি নিজের মত করে নিজের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে এগিয়ে যাবেন আর সামনে, বাংলা গানকে তুলে ধরবেন দেশ-বিদেশের অগণিত শ্রোতার কাছে।

ভিডিওঃ মমতাজের কণ্ঠে হাসন রাজার গান

মইনুল রাজু (ওয়েবসাইট)
[email protected]

[673 বার পঠিত]