সম্রাট অশোকের(৩০৪-২৩২ খ্রি:পূ:) নাম আমাদের সবারই কমবেশি জানা। ভারতের ইতিহাসে দুজন রাজাকে গ্রেট উপাধি দেয়া হয়েছে তাদের একজন হলেন অশোক দ্যা গ্রেট আরেকজন আকবর দ্যা গ্রেট। মজার ব্যাপার হল হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে একজন হিন্দু রাজাও এই উপাধি লাভ করেননি। অশোক প্রথম জীবনে বৈদিক ধর্মের অনুসারী হলেও পরে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন আর আকবর মুসলিম(আসলে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী কারণ তিনি পরে নিজেই দ্বীন এ এলাহী ধর্ম প্রবর্তন করেন যাতে সব ধর্মের সংমিশ্রণ ঘটান যা ইসলামে সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ)।

যাই হোক, অশোকের কথা বলতে গেলেই অনিবার্যভাবে চলে আসে তার ধর্মানুরাগ,মানবতাবাদী,সাম্যবাদী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যাবস্থার কথা। এগুলো নিয়ে আসলেই দ্বিমত করার কোন অবকাশ নেই। বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় আমূল পরিবর্তন আনেন। জায়গায় জায়গায় তিনি স্থাপন করেন হাসপাতাল, বিদ্যালয়, কুয়া, অতিথিশালা ইত্যাদি। বুদ্ধের অহিংস নীতি অনুসরণ করে রাজ্যে নিষিদ্ধ করেন জীবহত্যা। তার রাজ্যে বিভিন্ন জায়গায় তিনি স্তম্ভ নির্মাণ করেন যাতে খোদাই করা ছিল গৌতম বুদ্ধ ও তার নিজের অনেক বানী। এরকম একটি শিলালিপিতে আমরা দেখি অশোক বলছেন “সব মানুষ আমার সন্তান। আমি তাদের পিতার মত। প্রত্যেক পিতা যেমন তার সন্তানের মঙ্গল ও খুশি চান তেমন আমিও চাই জগতের প্রত্যেকটি মানুষ যেন সবসময় আনন্দে থাকে।”এই বাণী থেকেই প্রজাদের প্রতি তার মনোভাব বোঝা যায়। এছাড়া মূলত অশোকের অবদানেই বৌদ্ধধর্ম বৈশ্বিকভাবে পরিচিতি পায়। তার সাম্রাজ্যে তো বটেই তিনি তখনকার দিনের প্রায় প্রত্যেকটি বিখ্যাত সাম্রাজ্যে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পণ্ডিতদের পাঠান। এখানে লক্ষণীয় যে তিনি কিন্তু কোথাও রক্তপাত করে ধর্মপ্রচার করেননি। বুদ্ধের আদর্শ অনুযায়ী জ্ঞান ও অহিংসার মাধ্যমে ধর্মপ্রচার করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। এরকম অশোক সম্পর্কে হাজারটা ভাল কথা বলা যায় ও তা বলাও হয়েছে। কিন্তু সাধারণত যা হয় মহৎ ব্যাক্তিদের অন্ধকার দিকগুলি ঢেকে রাখা হয়। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তারা একসময় সর্বপাপশূন্য অতিমানব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন ও তাদের বিন্দুমাত্র সমালোচনাও সহ্য করা হয় না। অশোকও তার ব্যাতিক্রম নন। যে অশোক সমস্ত মানুষকে সন্তানের মত ভালবাসতেন, প্রতিটি জীবের জন্য করুণা অনুভব করতেন তিনিই ছিলেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রচণ্ড ধর্মান্ধ ও পরমতঅসহিষ্ণু। এরকম একটি ঘটনা তুলে ধরার জন্যই আমার এই পোস্ট।

ঘটনাটির উল্লেখ পাওয়া যায় দিব্যাবদান[1] গ্রন্থে। দিব্যাবদান শব্দটির অর্থ “ঐশী কাহিনী”। এই গ্রন্থে মোট ৩৮টি কাহিনী বর্ণিত হয়েছে যার একটি হল অশোকাবদান। এই গ্রন্থটি খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে রচিত। অশোকাবদান অংশটি অশোকের জীবনী নিয়েই লেখা এবং লেখকও বৌদ্ধ। অশোকাবদানের সম্পাদক সুজিতকুমার মুখোপাধ্যায় ঘটনাটিকে তুলে ধরেন এভাবে”এসময় এমন একটি ঘটনা ঘটে যাতে রাজা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। নির্গ্রন্থের (জৈন ধর্মগুরু মহাবীর) একজন অনুসারী একটি ছবি আঁকে যাতে দেখা যায় বুদ্ধ মহাবীরের চরণে পতিত হয়ে প্রণাম করছেন। অশোক তখন পুণ্ড্রবর্ধনের সমস্ত আজীবিক ধর্মাবলম্বীকে হত্যার নির্দেশ দেন। এক দিনে প্রায় আঠারো হাজার আজীবিক মারা যায়।

এধরণেরই আরেকটি ঘটনা ঘটে পাটালিপুত্র নগরীতে। এক্ষেত্রে যে লোক ওই ছবি এঁকেছিল তাকে সপরিবারে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। ঘোষণা করা হয় যে রাজাকে একজন নির্গ্রন্থের মাথা এনে দিতে পারবে তাকে একটি স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেয়া হবে। এর ফলে হাজার হাজার নির্গ্রন্থ প্রাণ হারায়।(সুজিতকুমার মুখোপাধ্যায়:অশোকাবদান,সাহিত্য অ্যাকাডেমি,দিল্লী,১৯৬৩,পৃষ্ঠা ৩৭। মুখোপাধ্যায় ফুটনোটে বলেন যে গ্রন্থলেখক নির্গ্রন্থ সম্প্রদায়কে আজীবিকদের সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন যারা জৈনদের মতই একটি সংসারত্যাগী গোত্র। নির্গ্রন্থ অর্থ বন্ধন বা বন্দীদশা থেকে মুক্ত অর্থাৎ জৈন।) এখানে আরও বলা আছে যে অশোক এই ঘোষণা শুধু তখনই প্রত্যাহার করেন যখন ভিটাশোক নামে অশোকের একজন প্রিয় বৌদ্ধ ভিক্ষু ভুল বোঝাবুঝির কারণে মারা যান। কিন্তু মজার ব্যাপার হল সুজিত বাবু নিজেই কাহিনীর সত্যতা অস্বীকার করে বলেছেন যে অশোকের অন্যান্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে এই ঘটনা খাপ খায় না এবং ভারতের অন্য কোন বৌদ্ধ রাজার বিরুদ্ধেও এধরণের অভিযোগ পাওয়া যায় না। তিনি এ ঘটনাটিকে নিছক বানানো কাহিনী বলে মত দিয়েছেন।[2] প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার তার “বাংলা দেশের ইতিহাস(প্রাচীন যুগ) গ্রন্থেও এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন কিন্তু তিনিও পরে মন্তব্য করেছেন যে “এই গল্পটির মূলে কতটা সত্য আছে বলা কঠিন”(সপ্তম সংস্করণ,পৃষ্ঠা ২০৮ )। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় ঐতিহাসিকরা অশোকের এই ঘটনাটিকে স্বীকৃতি দিতে এত অনীহ কেন? এর কারণ কি ভারতে বৌদ্ধধর্মের প্রতি কোন অন্ধ আবেগ বা সহানুভূতি?সুজিতবাবু যে যুক্তিতে ঘটনাটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা খুব একটা শক্তিশালী নয়। অশোকের অন্যান্য কর্মকাণ্ডের সাথে এই ঘটনার মিল পাওয়া যায় না বলে তা একা একাই ভুল প্রমাণিত হয়ে যায় না। অশোকের বুদ্ধের শিক্ষা ও দর্শনের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল। সেই বুদ্ধকে কোনভাবে খাটো করে দেখানো হলে তাতে তার উত্তেজিত হয়ে এমনকি বুদ্ধের শিক্ষার বিপরীতে গিয়েও নিষ্ঠুর পন্থা গ্রহণ করাটা অযৌক্তিক নয়।

মহৎ ব্যাক্তিদের এরকম ঘটনা ইতিহাসে এটাই একমাত্র নয়। ক্রিস্টোফার হিচেন্স তার “The missionary position:Mother Teresa in theory and practice” গ্রন্থে দেখিয়েছেন মাদার তেরেসা কিভাবে গর্ভপাতের বিপক্ষে সর্বাবস্থায় অনড় অবস্থানে ছিলেন ও কিভাবে দারিদ্র্য নির্মূলের পরিবর্তে দারিদ্র্যকে পুঁজি করে মিশনারী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। প্রবীর ঘোষ তার “অলৌকিক নয় লৌকিক” সিরিজের ৩য় খণ্ডে দেখিয়েছেন কিভাবে জীবে প্রেম করা বিবেকানন্দ বরাহনগর মঠে পশুবলির প্রচলন করেছিলেন। দেখিয়েছেন দয়ার অবতার বিবেকানন্দের দরিদ্র সেবার ক্ষেত্রে পাক্কা হিসাব। সুতরাং কারো ভাল দিক দেখেই তার অন্ধকার দিকটিকে অস্বীকার করা যায় না। ভাল মন্দ মিলিয়েই মানুষ। আরেকটি ব্যাপার হল দিব্যাবদান গ্রন্থটি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের লেখা যারা সারা জীবন অহিংসার মন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন। এটা মেনে নেয়া কষ্টকর যে তারা অশোকের এই ঘটনাটি পুরোপুরি বানিয়ে লিখবেন। অশোকাবদান অংশটি অশোকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ এবং পৃথিবীতে বৌদ্ধধর্মকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তার অবদানকে বার বার স্মরণ করেছে। এমনকি এই গ্রন্থে এমনও দাবী করা হয়েছে যে স্বয়ং বুদ্ধ নাকি অশোকের জন্ম সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যা বর্ণনা করা হয়েছে “ধূলার উপহার” নামক গল্পে। ঠিক এখানেই এমন একটি বেখাপ্পা ঘটনা কেন তারা শুধুশুধু লিখবেন সেটা বোধগম্য নয়। ঘটনাটিতে অতিরঞ্জন থাকা বিচিত্র নয় এবং থাকাই স্বাভাবিক। একদিনে আঠারো হাজার নির্গ্রন্থকে হত্যার ব্যাপারটি অতিরঞ্জন হিসেবেই নেয়া যায়। কিন্তু প্রবাদ আছে “যা রটে তার কিছু তো বটে”। স্বাভাবিক যুক্তিবোধ বলে যে কোন ব্যাক্তি সম্পর্কে তার শত্রুশিবির থেকে কোন খারাপ কথা শুনলে খুব শক্ত প্রমাণ ছাড়া তাতে বিশ্বাস না করাই উত্তম কিন্তু তার বন্ধুশিবির থেকেই যদি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তাহলে সেটাকে ফেলে দেয়া যায় না। এখানে দাবী করা হচ্ছে না যে ঘটনাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য বা কোন প্রমাণিত ঐতিহাসিক ঘটনা কিন্তু ইঙ্গিত করা হচ্ছে যে এরকম কিছু হয়ে থাকতে পারে এবং ইতিহাসের পাতায় অশোকের সম্পর্কে শুধু মহান কথাই লেখা নেই বরং অনেক বিতর্কিত অধ্যায়ও উঠে এসেছে সেই ধর্মের সাধকদের লেখায়ই যে ধর্মের উন্নতির জন্য তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাই পরিশেষে বলা যায় উল্লেখিত ঘটনার কিছু অংশও যদি সত্য হয় তাহলে বলতেই হবে অশোক এক্ষেত্রে সরে গিয়েছিলেন বুদ্ধের শিক্ষা থেকে যাতে বলা ছিল –

“অহিংসা পরম ধর্ম”
“জীবহত্যা মহাপাপ”
“জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক”

[1] http://en.wikipedia.org/wiki/Divyavadana
[2]http://koenraadelst.voiceofdharma.com/articles/ayodhya/pushyamitra.html

[2202 বার পঠিত]