এমন একটি সময়ে ফিরে যাওয়া যাক যখন মানুষ তার জ্ঞান বা কৌশলগুলো কোন লেখা, ছবি বা সংকেতের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে শিখেনি। আজকে যেভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জ্ঞানের পরিমাণ কয়েক গুণ হয়ে যাচ্ছে তখন কিন্তু তেমনটি কোনভাবেই হতে পারতো না। কারণ তখন কোন মানুষের জীবন দিয়ে অর্জিত সকল জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা সীমাবদ্ধ থাকতো কেবলই তার সন্তান-সন্ততিদের মাঝে, তাও যদি সে মৃত্যুর সময় পূর্ণবয়স্ক সন্তান রেখে যেতে পারে। জ্ঞানের এই ঘনীভবনই হয়ত আদিম যুগে মানুষের ধীর অগ্রগতির প্রধান কারণ। ভাষা, শিল্প এবং লিখনপদ্ধতি আবিষ্কারের পর মানুষ খুব দ্রুত অগ্রসর হতে শুরু করে। বলা যায় মানুষের জ্ঞানের অগ্রগতি এবং জ্ঞান সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার অগ্রগতি একে অপরের পরিপূরক।

তো যখন জ্ঞানের কোন সংরক্ষণ পদ্ধতি ছিল না তখন সামষ্টিক প্রগতির একমাত্র উপায় ছিল সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে যতটুকু সম্ভব পূর্ব প্রজন্মের জ্ঞানের ধারা অব্যাহত রাখা। কিন্তু এতেও বাধ সেধেছিল মানুষের স্বল্পায়ু। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে আজ উন্নত দেশগুলোতে গড় আয়ু ৭০-৮০ বছরে গিয়ে ঠেকেছে। এই দেখে ভাবতে সত্যিই কষ্ট হয় যে বিংশ শতকের সূচনালগ্নেও বিশ্বমানবের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩০ বছর। তার মানে এই নয় যে ৩০ বছরের বেশি কেউ বাঁচতো না। ঘটনা হচ্ছে, শিশু মৃত্যু, দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের মৃত্যু এবং মহামারীতে মৃত্যুর হার অনেক বেশি হওয়ার কারণেই গড় আয়ু এত কম ছিল। যেমন, যুক্তরাজ্যে ১২৭৬ থেকে ১৩০০ সালের মধ্যে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৩১ বছর, কিন্তু কেউ ২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকলে মোটামোটি নিশ্চিত যে ৪৫ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারতো, আর ৩০ পার করতে পারলে পঞ্চাশের সীমানা পার হওয়াও সম্ভব ছিল।[1]

হিসেব করলে দেখা যায়, প্রায় অর্ধ লক্ষ বছর পূর্ব থেকে শুরু করে এই বিংশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত মানুষের গড় আয়ু খুব বেশি উঠানামা করেনি। তথাপি বিজ্ঞানীরা ৪০-৪৫ হাজার বছর পূর্বের সময়টিকে একটি ক্রান্তিকাল হিসেবে অভিহিত করেছেন। কারণ এর আগে কারও নাতি-নাতনির কথা শোনার সৌভাগ্য হতো না বললেই চলে। গড় আয়ু কম হলেও, ৪০ হাজার বছরের পর অর্থাৎ উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগে কেউ ১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকলে তার আরও ৩৯ বছর বেঁচে থাকার একটি সম্ভাবনা ছিল। সে হিসেবে তার মোট বয়স হতো ৫৪ বছর। ৫৪ বছরে তো অবশ্যই নাতি-নাতনির সান্নিধ্য লাভ সম্ভব। আর শিশু মৃত্যু ও দুর্ঘটনা বাদ দিয়ে গড় আয়ু যদি ৩০-৪০ বছর ধরা হয় তাহলেও জীবদ্দশায় নাতি-নাতনি দেখার একটি সম্ভাবনা রয়ে যায়। কারণ তখন সন্তান উৎপাদনের বয়সও ছিল ২০-এর কম। ১৬ বছর বয়সে সন্তান উৎপাদন করলে এক জীবনে দুই প্রজন্ম দেখে যাওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। এ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা এজন্যই দরকার যে নাতি-নাতনির যুগ শুরু হওয়ার সাথে মানুষের সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক বিকাশের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আর এই গবেষণার একটি কার্যকর হাতিয়ার জীবাশ্ম। জীবাশ্মের মাধ্যমে কিভাবে প্রাগৈতিহাসিক জনমিতি বিশ্লেষণ করা যায় সে কাহিনী দিয়েই তবে শুরু করা যাক।

প্রাগৈতিহাসিক জনমিতি জানার উপায়

কখন থেকে দাদা-দাদি বা নানা-নানি থাকাটা মানব সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হল তা জানার জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠীর বয়স বিভাজনটি বুঝতে হবে। অর্থাৎ জানতে হবে কোন যুগে শিশু, সন্তান জন্মদানে সক্ষম সাবালক এবং সেই সাবালকদের পিতা-মাতার আনুপাতিক সংখ্যাটি কেমন ছিল। এটি জানা খুব সোজা নয়। কারণ প্রথমত, বয়স নির্বিশেষে একটি গোষ্ঠীর সকল সদস্যের জীবাশ্ম কখনোই সংরক্ষিত থাকে না, বিজ্ঞানীরা কিছু সদস্যের খণ্ড খণ্ড জীবাশ্মের সন্ধান পেয়ে থাকেন কেবল। দ্বিতীয়ত, একেক যুগে ও একেক স্থানে মানুষের সাবালকত্ব একেক সময়ে আসতো। এমনকি বর্তমানেও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মাঝে সাবালকত্ব অর্জনের বয়সে পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, কিছু জীবাশ্মস্থানের একই পলিস্তরে যথেষ্ট সংখ্যক জীবাশ্মের সন্ধান পাওয়া গেছে যাদের সবাইকে একই গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ধরে নেয়া যায় এবং মৃত্যুর সময় কার বয়স কত ছিল তাও নির্ণয় করা যায়।

১৮৯৯ সালে ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেব থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ক্রাপিনা শহরের অদূরে এমনই একটি জীবাশ্মস্থান খুঁজে পেয়েছিলেন বিখ্যাত ক্রোয়েশীয় জীবাশ্মবিদ দ্রাগুতিন গোরিয়ানোভিচ-ক্রামবের্গার। সেখানকার একটি পাথুরে আশ্রয়স্থল থেকে তিনি কম করে হলেও ৭০ জন নিয়ানডার্টাল ব্যক্তির জীবাশ্মের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করেন। এরা সবাই ১,৩০,০০০ বছরের পুরনো একটি পলিস্তরে সংরক্ষিত ছিল। তিনটি কারণে এরা সবাই একই সময়ে বসবাসকারী একটি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে মনে করা যায়- প্রথমত, একটিমাত্র স্থানে সবগুলো জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। দ্বিতীয়ত, যে পলিস্তরে তারা সংরক্ষিত তা খুব কম সময়ের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গঠিত হয়েছিল, সুতরাং তারা সংরক্ষিতও হয়েছে একসাথে। তৃতীয়ত, তাদের এমন কিছু সাধারণ জিনগত বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য কোন অঞ্চলে দেখা যায় না। সুতরাং স্পষ্টতই এই জীবাশ্মস্থান আমাদেরকে একটি সুসংগঠিত নিয়ানডার্টাল জনগোষ্ঠীর জনমিতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, কেবল জানা প্রয়োজন মৃত্যুর সময় কার বয়স কত ছিল।

ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে, প্রচুর পরিমাণে খনিজ পদার্থ থাকার কারণে জীবাশ্মের দাঁত সবচেয়ে ভালভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং এই দাঁতই মৃত্যুকালে তার বয়স নির্ণয়ের সবচেয়ে উপযোগী মাধ্যমগুলোর একটি। বয়সের সাথে সাথে আমাদের দাঁতের পৃষ্ঠে একটি আস্তরণ পড়তে থাকে যার পুরুত্ব বয়স নির্দেশ করে। এছাড়া বয়সের সাথে দাঁতের অভ্যন্তরীন গঠনেও কিছু পরিবর্তন আসে। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে কিভাবে নিয়ানডার্টাল গোষ্ঠীটি সহ প্রাচীন অনেক জীবাশ্মের মৃত্যুকালীন বয়স নির্ণয় করা হয়েছে তা বুঝতে হলে মানব দাঁতের গঠন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

দাঁতের গঠন বেশ সোজাসাপ্টা এবং শরীরে অন্য অনেক অঙ্গের মতই অতিমাত্রায় প্রতিসম। পূর্ণবয়স্ক দেহে দাঁত থাকে ৩২টি, প্রতি পাটিতে ১৬টি করে এবং এক পাটির প্রতি দিকে ৮টি করে। অর্থাৎ দাঁতগুলো চারটি অংশে বিভক্ত যার একটি জানলেই বাকিগুলো জানা হয়ে যায়। একটি চতুর্থাংশের সামনে থেকে শুরু করে মুখের ভেতরের দিকে প্রথম ২টি হচ্ছে কর্তণদন্ত, পরেরটি শ্বদন্ত, পরের ২টি পুরঃপেষণদন্ত এবং শেষ ৩টি পেষণদন্ত। এই পেষণ দাঁতগুলো একসাথে নয় বরং ধারাবাহিকভাবে গজায়।

তো বর্তমান যুগে মানুষের পেষণদন্তের কোনটি কখন গজায় তার একটি সর্বজনীন রুটিন তৈরি করা আছে। ১৯৭৯ সালে মার্কিন জীবাশ্ম-নৃবিজ্ঞানী মিলফোর্ড উলপফ আধুনিক মানুষের পেষণ দাঁত উদয়ের রুটিনের সাথে প্রথমবারের মত ক্রাপিনা নিয়ানডার্টালদের তুলনা করেন। তিনিই আবিষ্কার করেন, ক্রাপিনা নিয়ানডার্টালদের পেষণ দাঁত তিনটি যথাক্রমে ৬, ১২ ও ১৫ বছর বয়সে গজাতো। আগেই বলেছি, আমাদের বয়স যত বাড়তে থাকে পেষণ দাঁতগুলোর উপর তত বেশি আস্তরণ জমতে থাকে। কোন পেষণ দাঁতে কত বছরের আস্তরণ জমেছে তা বের করাও সম্ভব। এখন ৭০ জনের এই নমুনায় কারও ১ম পেষণ দন্তে ১৫ বছরের আস্তরণ পাওয়া গেলে বুঝতে হবে তার বয়স ১৫+৬=২১ বছর। একই আস্তরণ ২য় ও ৩য় পেষণ দন্তে পাওয়া গেলে বয়স হবে যথাক্রমে ১৫+১২=২৭ ও ১৫+১৫=৩০ বছর। ১৯৬৩ সালে দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ এ ই ডব্লিউ মাইলস বয়স নির্ণয়ের এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন।

তবে এই পদ্ধতির সফলতার জন্য কিশোর বয়সের জীবাশ্ম প্রয়োজন, বয়স বেড়ে গেলে আস্তরণটি এতোই পুরু হয়ে যায় যে তা কত বছরের সঠিকভাবে বলার উপায় থাকে না। আবারও সৌভাগ্য যে, ক্রাপিনায় অনেকগুলো কিশোরের ফসিল পাওয়া গেছে।

পেষণ দন্তের আস্তরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে উলপফ আবিষ্কার করেন, ক্রাপিনার নিয়ানডার্টালরা বেশ কম বয়সেই মারা গিয়েছিল। কিন্তু ২০০৫ সালে রেচেল ক্যাসপারি ব্যাপারটি পুনরায় পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কারণ পেষণ দন্ত পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।

ক্যাসপারি ও তার সহকর্মীরা ফসিলগুলোর মাইক্রো-সিটি নামক একটি পদ্ধতির মাধ্যমে স্ক্যান করেন। এর মাধ্যমে সূক্ষ্ণভাবে দাঁতে গৌণ ডেন্টিনের পরিমাণ নির্ণয় সম্ভব হয়। উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে মানব দাঁতের সবার উপরের স্তরের নাম এনামেল যার নিচেই ডেন্টিনের অবস্থান। ডেন্টিন তিন ধরণের- মুখ্য, গৌণ এবং টারশিয়ারি। মুখ্য ডেন্টিন এনামেলের ঠিক নিচেই অবস্থিত, এর নিচে থাকে গৌন ডেন্টিন। দাঁত গজিয়ে ঠিকভাবে কাজ করতে শুরু করার পর গৌন ডেন্টিন জমতে থাকে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে গৌণ ডেন্টিনের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। আস্তরণের পরিমাণ অস্পষ্ট হলেও এই পদ্ধতি সব ক্ষেত্রে ভাল কাজ দেয়। ক্যাসপারিদের পরীক্ষায় উলপফের তথ্যই সত্য বলে প্রমাণিত হয়- ক্রাপিনার নিয়ানডার্টালদের কেউই ৩০ বছরের বেশি বাঁচতে পারেনি।

অনেকে ভাবতে পারেন, এমনও তো হতে পারে কোন কারণে বয়স্কদের ফসিল কম পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেটা সত্য হলে সকল জীবাশ্মস্থান থেকে একই উপাত্ত পাওয়া যেতো না। স্পেনের সিমা দে লোস হুয়েসোসে প্রায় ৬ লক্ষ বছরের পুরনো অনেক জীবাশ্ম পাওয়া গেছে যাদের কেউই ৩৫ বছরের বেশি বাঁচতে পারেনি। জীবাশ্মবহুল স্থানের নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং অপেক্ষাকৃত কম জীবাশ্মবিশিষ্ট স্থানগুলোর সহযোগী উপাত্ত থেকে প্রায় দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, কম বয়সে মারা যাওয়াটাই প্রাচীনকালে স্বাভাবিক ছিল, বেশিকাল বেঁচে থাকা ছিল অস্বাভাবিক এবং ব্যতিক্রম। ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবসের ভাষায় তাই আমরা বলতেই পারি, “প্রাগৈতিহাসিক জীবন ছিল কদর্য, বর্বর এবং সংক্ষিপ্ত।”

বৃদ্ধ-সাবালক অনুপাত

তো এভাবে দাঁতের মাধ্যমে প্রতিটি জীবাশ্ম-ব্যক্তির মৃত্যুকালীন বয়স নির্ণয়ের পর খুব সহজেই বের করে ফেলা সম্ভব গোষ্ঠীটির মধ্যে কোন বয়সের জনসংখ্যা কেমন ছিল। আর বিভিন্ন যুগের মানব গোষ্ঠীর বয়স বিভাজন জানা থাকলে মানুষের আয়ুষ্কালের বিবর্তন বোঝা যাবে। তখন আমাদের দায়িত্ব থাকবে কেবল প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব বা নতুন অনুকল্পের মাধ্যমে বিবর্তনের এই ধারাটি ব্যাখ্যা করা। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ক্রাপিনার মত অতি সমৃদ্ধ জীবাশ্মস্থানগুলোর ক্ষেত্রেই শুধু ফল দেবে। যেসব স্থানে জীবাশ্মের পরিমাণ কম সেখানে সন্দেহ থেকেই যায়। জীবাশ্মের পরিমাণ যত কম হবে পরিসাংখ্যিক অনিশ্চয়তার কারণে গবেষণার ফলাফল একপেশে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ততই বেড়ে যাবে। কারণ জীবাশ্ম যত কম হয় কোন এক বয়সের জীবাশ্মের পরিমাণ বেশি থাকার সম্ভাবনা তত বাড়ে।

ওদিকে এও সত্য যে ক্রাপিনার মত সমৃদ্ধ জীবাশ্মস্থানের তুলনায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাশ্মস্থানের সংখ্যা বেশি এবং ক্ষুদ্র স্থানগুলোকে গণনায় না আনতে পারলে আয়ুষ্কালের বিবর্তনের সার্বিক চিত্র দাঁড় করানো অসম্ভব। এজন্যই বিজ্ঞানীরা একটি বিকল্প প্রক্রিয়ার চিন্তা করেছেন। প্রত্যেক ব্যক্তি কতদিন বেঁচে ছিল তা জানার পরিবর্তে তারা নির্ণয় করার চেষ্টা করছেন কতজন বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিল। অর্থাৎ প্রত্যেকের প্রকৃত বয়স নির্ণয় না করে তারা আপেক্ষিক বয়স বের করছেন, যার মাধ্যমে জানা যাচ্ছে গোষ্ঠীর শতকরা কত অংশ দাদা-দাদি হওয়ার বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিল। এক্ষেত্রে তারা যে অনুপাতটি বের করেন তার নাম বৃদ্ধ-সাবালক অনুপাত। ইংরেজিতে এর একটা চলিত নাম হচ্ছে OY ratio, বাংলায় বৃদ্ধ+সাবালক+অনুপাত শব্দ তিনটি মিলিয়ে করা যেতে পারে বৃসানুপাত। বিভিন্ন জীবাশ্মস্থানের বৃসানুপাত হিসাব করা গেলে সময়ের সাথে সাথে বৃসানুপাত কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তাও জানা সম্ভব।

আধুনিক মানুষসহ সকল প্রাইমেটদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের তৃতীয় পেষণ দন্ত ঠিক সাবালক হওয়ার সময় উদিত হয়, যা বুঝতে পেরে চতুর বাঙালিরা সেই কবে থেকেই দাঁতটিকে আক্কেল দাঁত নামে অভিহিত করে আসছে। কারও আক্কেল দাঁত ওঠার অর্থ হচ্ছে সে সন্তান জন্মদানে সক্ষম। নিয়ানডার্টাল এবং সমসাময়িক শিকারী-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরাও এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে প্রাচীন মানুষদের ১৫ বছর বয়সে তৃতীয় পেষণ দন্ত উঠতো এবং কালক্ষেপণ না করে সেই বয়সেই তারা প্রথম সন্তান গ্রহণ করতো। মার্কিন নৃবিজ্ঞানী রেচেল ক্যাসপারি এবং সাং-হি লি তাই তাদের গবেষণায় ১৫-র দ্বিগুণ অর্থাৎ ৩০ বছরকে দাদা-দাদি হওয়ার বয়স হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ১৫-তে কেউ সন্তান জন্ম দিলে এবং সেই সন্তানও ১৫ বছর বয়সে সন্তান গ্রহণ করলে প্রথম জন ৩০ বছর বয়সেই দাদা/দাদি হতে পারবে। আমাদের আলোচনায় তাই সাবালকত্বের বয়স ১৫ আর বার্ধক্যের বয়স ৩০।

গৌণ ডেন্টিন ব্যবহার করে অপেক্ষাকৃত নিখুঁতভাবে বয়স নির্ণয় সম্ভব, কিন্তু সকল জীবাশ্মের উপর সে প্রক্রিয়া আরোপ সহজ নয়। এজন্যই তারা মাইলসের পুরনো পেষণদন্তের আস্তরণ পদ্ধতিতেই বৃসানুপাত নির্ণয় করেন। আর বৃসানুপাতের জন্য প্রকৃত বয়স জানার প্রয়োজনও নেই, পেষণ দন্ত থেকে বয়সটি অনুমান করে তাকে সাবালক বা বৃদ্ধ দুই শ্রেণীর একটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেই কাজ হয়ে যাবে। একেক গোষ্ঠীতে সাবালকত্বের বয়স একেক রকম হওয়ার সমস্যাও এবার আর থাকছে না। কারণ বৃসানুপাতের সৌন্দর্য্য হচ্ছে এটি সাবালকত্বের বয়সের ওপর নির্ভর করে না। ১০, ১৫ বা ২০ যে বয়সেই সাবালকত্ব আসুক না কেন বার্ধক্যের বয়সও সে অনুযায়ী পরিবর্তিত হবে। সাবালকত্ব ২০ বছর বয়সে এলে বার্ধক্য আসবে ৪০ বছর বয়সে, আর সাবালকত্ব ১০-এ আসলে বার্ধক্য আসবে ২০-এ। তাই বৃসানুপাতের কোন পরিবর্তন হবে না।[2]

আয়ুষ্কালের বিবর্তনের বর্তমান চিত্র

ক্যাসপারি ও লি গত ৩০ লক্ষ বছরের মোট ৭৬৮ জন জীবাশ্ম-ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে তাদেরকে এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। এদের মধ্যে রয়েছে চারটি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল এবং সময়ের জীবাশ্ম- ৩০ থেকে ১৫ লক্ষ বছর পূর্ব পর্যন্ত পূর্ব এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস তথা লুসির আত্মীয়রা, ২০ থেকে ৫ লক্ষ বছর পূর্বের হোমো গণের অধিবাসীরা যারা আবার আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ, ১,৩০,০০০ থেকে ৩০,০০০ বছর পূর্বের ইউরোপীয় নিয়ানডার্টাল এবং সব শেষে প্রাথমিক উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের অধিবাসীরা যারা ৩০,০০০ থেকে ২০,০০০ বছরের মধ্যে বাস করতো। উল্লেখ্য শেষোক্ত মানুষদের অনেক সূক্ষ্ণ সূক্ষ্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শন বর্তমানে উদ্ধার করা গেছে। তাদের ফলাফল নিচের ছকে তুলে ধরা হল:

তারা অবশ্যই দিনদিন আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি এবং সে হিসেবে বৃসানুপাত বৃদ্ধির আশা করছিলেন। কিন্তু অনেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মতোই ফলাফল তাদের কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। দেখা যাচ্ছে প্রথম তিনটি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বৃসানুপাত ধীরে ধীরে বাড়ছে, কিন্তু চতুর্থ অর্থাৎ উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধদের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে, বৃসানুপাতের মান হয়ে গেছে পূর্বের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ। অর্থাৎ ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে মারা যাওয়া প্রতি ১০ জন সাবালক নিয়ানডার্টালের বিপরীতে বৃদ্ধ ছিল মাত্র ৪ জন; অথচ উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের প্রাথমিক সময়কার ইউরোপীয় বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ জন সাবালকের বিপরীতে প্রায় ২০ জন বৃদ্ধ ছিল। বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হঠাৎ করে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় প্রথমে সন্দিহান হয়ে পড়েন ক্যাসপারি ও লি। উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগে মানুষ সচেতনভাবে মৃতদেহ সমাহিত করতো, তারা ভাবলেন হয়ত এ কারণেই বৃদ্ধদের সংখ্যা এতো বেশি পাওয়া গেছে। এই অনুকল্প প্রমাণের জন্য তারা এবার উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের জীবাশ্মগুলোকে সমাধিস্থ এবং সমাধিবিহীন এই দুই দলে ভাগ করেন যার ফলাফল দেখা যাচ্ছে নিচের ছকে:

দেখা যাচ্ছে, সমাধিস্থ এবং সমাধিহীন উভয় ক্ষেত্রেই বৃসানুপাত প্রায় একই, ২ এর কাছাকাছি। এর পর আর সন্দেহ থাকে না যে, উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের শুরুতে এমন কিছু ঘটেছিল যা মানুষের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধিতে বিরাট অবদান রেখেছে, চিরতরে পাল্টে দিয়েছে মানুষের গোষ্ঠীগত চেহারা, জন্ম দিয়েছে অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ণ ও সংবেদনশীল সংস্কৃতি ও আচারানুষ্ঠানের। ঠিক কি ঘটেছিল এবং তার ফলাফলই বা কি সে নিয়েই আমাদের পরবর্তী আলোচনা।[3]

উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগে আয়ু কিভাবে বৃদ্ধি পেল?

আনুমানিক ৪০ হাজার বছর পূর্বে মানুষের আয়ু হঠাৎ এত বেড়ে যাওয়ার কারণ দুই ধরণের হতে পারে: জৈবিক বা সাংস্কৃতিক। জৈবিক কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, হয়ত দৈহিকভাবে আধুনিক মানুষের মধ্যে যেসব জিনগত বৈশিষ্ট্য প্রভাব বিস্তার করেছিল তারই একটি দীর্ঘায়ু। অথবা হয়ত শারীরস্থান নয় বরং মানুষের আচার-ব্যবহার ও সংষ্কৃতির ভিন্নতাই দীর্ঘায়ু এনে দিয়েছিল।

জৈবিক কারণ সঠিক হলে আয়ু আরও আগে বাড়তে শুরু করার কথা। কারণ উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের অনেক আগেই মানুষ দৈহিক দিক দিয়ে পুরোপুরি আধুনিক হয়ে গিয়েছিল, সাংস্কৃতিক আধুনিকত্ব এসেছে অনেক পরে। ৩ লক্ষ বছর পূর্ব থেকে ৪০,০০০ বছর পূর্ব পর্যন্ত সময়টিকে বলে মধ্য প্রাচীন প্রস্তর যুগ। এই যুগের শেষ দিকেই মানুষ ও তার সমসাময়িক নিয়ানডার্টালরা দৈহিক দিক দিয়ে পুরোপুরি আধুনিক ছিল, এমনকি তারা উভয়েই কিছু প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহার শুরু করেছিল সে সময়। অবশ্য সেসব প্রযুক্তি নৈপুণ্য ও সূক্ষ্ণতার দিক থেকে উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের তুলনায় বেশ নিম্ন মানের। মধ্য প্রাচীন প্রস্তর যুগের শেষাংশেই আয়ু বাড়তে শুরু করেছিল কিনা তা জানতে হলে সে যুগের আরও জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। ক্যাসপারি এবং লি ঠিক তাই করেছেন।

তারা পশ্চিম এশিয়ায় পাওয়া ১,১০,০০০ থেকে ৪০,০০০ বছর পূর্বের প্রচুর নিয়ানডার্টাল ও আধুনিক মানুষের জীবাশ্মের উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। এবং দেখেছেন এদের বৃসানুপাত ১ এর বেশ কাছাকাছি যা ইউরোপের নিয়ানডার্টালদের (০.৩৯) চেয়ে অনেক বেশি কিন্তু ইউরোপের আধুনিক মানুষদের (২.০৮) চেয়ে বেশ কম। এই ফলাফল বিস্ময়কর। দৈহিক দিক দিয়ে পশ্চিম এশীয়দের সাথে ইউরোপীয়দের তেমন কোন পার্থক্য না থাকা সত্ত্বেও তাদের বৃসানুপাত যথেষ্ট আলাদা। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, জৈবিক কারণে আয়ু বাড়েনি। জৈবিক কারণে বাড়লে তো পশ্চিম এশিয়ার অপেক্ষাকৃত আদিম মানুষদের বৃসানুপাতও আধুনিক ইউরোপীয়দের সমান হওয়ার কথা।

এই পরীক্ষায় আরও মজার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। যেমন, পশ্চিম এশিয়ার নিয়ানডার্টালদের বৃদ্ধ জনসংখ্যা ইউরোপীয় নিয়ানডার্টালদের চেয়ে বেশি। এর কারণও সহজবোধ্য- বরফ যুগের ইউরোপের তুলনায় উষ্ণ আবহাওয়ার পশ্চিম এশিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করা ছিল সহজ, এজন্যই সেখানে মানুষ বেশি বয়স পর্যন্ত টিকে থাকতো। কিন্তু সেক্ষেত্রে ইউরোপের আধুনিক মানুষদের আয়ু পশ্চিম এশিয়ার আধুনিক মানুষদের চেয়ে এত বেশি হওয়াটা আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে। ইউরোপে পরিবেশ এত প্রতিকূলে থাকার পরও সেখানকার আধুনিক মানুষদের জীবনে এমন কি ঘটেছিল যা দৈহিকভাবে অন্য অঞ্চলের মানুষদের মত হওয়া সত্ত্বেও তাদের আয়ু এত বাড়িয়ে দিয়েছিল? বোঝাই যাচ্ছে কারণটি জৈবিক নয় বরং সাংস্কৃতিক। দেহের তাড়না নয় বরং সাংস্কৃতিক চেতনাই আয়ু বৃদ্ধির কারণ। সংস্কৃতি যে ৪০ হাজার বছর পূর্ব থেকেই মানব জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিল তা বোধকরি এর আগে এতটা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা সম্ভব ছিল না। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের আয়ু বৃদ্ধির কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে আমরা প্রথমবারের মত বুঝতে পারব কুলবৃদ্ধাদের সেবা ও প্রজ্ঞা এবং সংস্কৃতির বিকাশ ছিল একে অপরের কার্যকারণ।

কুলবৃদ্ধা অনুকল্প

আয়ু বৃদ্ধির জৈবিক কারণ খুঁজে না পেয়ে প্রথমেই যা করা হল তা হচ্ছে অন্যান্য প্রাইমেটদের সাথে আমাদের জীবনেতিহাস মিলিয়ে দেখা। দেখা গেল, আমাদের সাথে শিম্পাঞ্জিদের বেশ মিল আছে। এই উভয় প্রজাতির নারীদের ক্ষেত্রেই প্রজননের সবচেয়ে ভাল সময় ৩০ বছরের একটু আগে থেকে প্রায় ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে শিম্পাঞ্জিদের গড় আয়ু অনেক কম, শতকরা তিন ভাগেরও কম শিম্পাঞ্জি ৪৫ বছরের বেশি বাঁচে। মানুষের প্রজনন ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ার সময়কে বলে রজোনিবৃত্তি (মেনোপজ)। শিম্পাঞ্জিরা যেখানে প্রজনন ক্ষমতা হারানোর পরপরই মারা যায় মানবীরা সেখানে রজোনিবৃত্তির পরেও অনেকদিন বেঁচে থাকে। সুতরাং মানুষই একমাত্র প্রাইমেট যাদের নারী সদস্যদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রজননে অক্ষম। বিজ্ঞানীরা প্রথমেই এই অক্ষমতার বিবর্তন কিভাবে ঘটেছে তা বোঝার চেষ্টা করলেন।

ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব অনুসারে, কোন বৈশিষ্ট্য যদি মানুষের দীর্ঘায়ু এবং বংশবিস্তারের সহায়ক হয় তবে সেই বৈশিষ্ট্যের অধিকারীরাই দিনদিন সংখ্যাগুরু হতে থাকবে। অনেক কাল পরে দেখা যাবে সবাই সেই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, কারণ যাদের সেটি ছিল না তারা ততোদিনে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে মানুষের প্রজননে অক্ষমতা কিভাবে বংশবিস্তারে সহায়ক হয়ে উঠল? এর উত্তর দিতে গিয়েই জন্ম হয় কুলবৃদ্ধা অনুকল্পের।

এই অনুকল্পে বলা হচ্ছে, বৃদ্ধ বয়সে যদি কেউ সন্তান নেয় তাহলে শিশু সন্তান রেখেই সে মারা যাবে, আর মা মারা গেলে শিশুটি বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও অনেক কমে যাবে। কিন্তু কেউ যদি সে বয়সে সন্তান না নিয়ে বরং তার জীবিত সন্তানদের দেখভাল এবং নাতি-নাতনিদের সেবা করে দিন কাটায় তাহলে সার্বিকভাবে তার বংশের ভাল হবে। যে কুলের বৃদ্ধারা সন্তান না নিয়ে নাতি-নাতনির সেবা করবে সেই কুল বেশি বিস্তার লাভ করবে। সুতরাং অনেককাল পর দেখা যাবে কেবল সেই কুলের মানুষই টিকে আছে। অন্যদিকে, নিজে সন্তান না নিয়ে নাতি-নাতনির সেবা করার কারণে কুলবৃদ্ধাদের স্বাস্থ্য-সবলতাও বাড়বে। অর্থাৎ, যে বৃদ্ধারা সবল তারা বেশি সেবা করতে পারবে, সুতরাং প্রাকৃতিক নির্বাচন সবল বৃদ্ধাদেরই নির্বাচন করবে। এ কারণে হয়ত প্রাকৃতিকভাবে সেই কুলই নির্বাচিত হয়েছে যে কুলের বৃদ্ধাদের রজোনিবৃত্তি ঘটতো এবং যে কারণে তারা নিজে সন্তান না নিয়ে নাতি-নাতনির সেবা করতে পারতো। স্বজ্ঞা অনুকল্পটির পক্ষে সায় দিলেও অনেকদিন কোন পরীক্ষণমূলক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অবশেষে ২০০৪ সালে ফিনল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও কানাডার বিজ্ঞানীরা একটি গবেষণা প্রকল্প হাতে নেন।

তারা অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতকে ফিনল্যান্ড এবং কানাডার বিভিন্ন প্রজন্মের অধিবাসীদের জীবনেতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন। ফিনল্যান্ড খুব ধীরে বিকশিত হলেও কানাডার বিকাশ ঘটেছিল খুব দ্রুত। দুই মহাদেশের দুটি অঞ্চলের উপাত্ত একই ফলাফল দেয়- যে নারী রজোনিবৃত্তির পর বেশিদিন বেঁচে ছিল তার নাতি-নাতনির সংখ্যা বেশি এবং সে বেশি সবল। তার সবল হওয়ার কারণ এর মাধ্যমে প্রকারান্তরে সে তার নাতি-নাতনিদের সেবা করে তার সন্তানদের প্রজনন সফলতায় অবদান রাখতে পারতো। তার সাহায্যেই তার সন্তানরা অপেক্ষাকৃত কম বয়সে বেশি সন্তান গ্রহণ করতে পারতো এবং সেই সন্তানরা বেঁচেও থাকতো। এমনকি তারা এও দেখেছেন যে, বংশে সন্তান উৎপাদনের হার যত কমে রজোনিবৃত্তির পর অনেকদিন বেঁচে থাকার সুবিধাগুলোও তত কমতে থাকে। অর্থাৎ সে আর সবল থাকে না। এ থেকে প্রমাণিত হয়, আপন মেয়ের রজোনিবৃত্তি ঘটার পর বৃদ্ধ মায়েদের শরীর ভেঙে পড়ে। কানাডা ও ফিনল্যান্ডের উপাত্তে সত্যিই দেখা গেছে, মেয়েদের রজোনিবৃত্তির পর মায়েদের মৃত্যুর হার অনেক বেড়ে যাচ্ছে।[4]

ফিনল্যান্ডের অনেক খুটিনাটি উপাত্ত পাওয়ার কারণে তারা আরও কিছু বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে পেরেছেন। যেমন, বৃদ্ধা মা জীবিত থাকলে ছেলে-মেয়ে উভয়েই অপেক্ষাকৃত বেশি সন্তান নেয় এবং তাদের সবাইকে বড় করতে পারে। দাদি/নানি যদি তাদের সাথে একই গ্রামে না থাকে তাহলে সন্তান উৎপাদনের হার কমে যায়। অধিক সন্তান গ্রহণের অন্য কারণও যে থাকতে পারে সে সম্পর্কেও ভেবেছেন গবেষকরা; বড় পরিবারের প্রতি আকর্ষণ বা কিছু ভৌগলিক কারণকে বাতিল করার উপায়ও তাই বের করতে হয়েছে তাদেরকে। একেক নাতি/নাতনির জন্মের সময় দাদি/নানির বয়স ভিন্ন ভিন্ন ছিল। কোন সন্তান দাদি/নানির সেবা পেয়েছে আর কে পায়নি সেটা বিশ্লেষণের পর তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে শিশুপালনের সফলতা কুলবৃদ্ধা ক্রিয়ার কারণেই ঘটেছে। উল্লেখ্য, সন্তানের সংখ্যা এবং তাদের স্বাস্থ্যের উপর দাদি/নানি অর্থাৎ কুলবৃদ্ধার প্রভাবকেই কুলবৃদ্ধা ক্রিয়া বলে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে শিশুর উপর কুলবৃদ্ধা ক্রিয়ার প্রভাব কেবল তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যখন শিশু বুকের দুধ ছাড়া অন্য কোন খাবার গ্রহণের উপযোগী হয়েছে, অর্থাৎ যখন শিশুর মা ছাড়া অন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন পড়েছে। এই তথ্যগুলোই কুলবৃদ্ধা অনুকল্পের পক্ষে কাজ করেছে।[5]

সুতরাং এই অনুকল্পটি আমরা ৪০,০০০ বছর পূর্বের আধুনিক মানুষদের জীবনে প্রয়োগ করতেই পারি। তবে প্রশ্ন আসতে পারে, কুলবৃদ্ধা তত্ত্ব তো কেবল নারীদের আয়ু বৃদ্ধির কথা বলছে, তাহলে পুরুষের কি হবে? এটা ঠিক যে, পুরুষের আয়ুর বিবর্তনে আরও কিছু প্রভাবক নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হবে, কিন্তু নারীর আয়ুবৃদ্ধি নির্ঘাত পুরুষের দেহেও প্রভাব ফেলবে। কারণ, আমাদের দেহের কোষগুলোর সংরক্ষণ ও সংস্কারের প্রক্রিয়া অন্যান্য প্রাইমেটদের চেয়ে কার্যকর। যে দৈহিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বৃদ্ধায়ন ধীরে ধীরে ঘটে তা কিন্তু বংশ পরম্পরায় মায়ের দেহ থেকে ছেলে-মেয়ে উভয়ের দেহেই প্রবাহিত হবে। এভাবেই কুলবৃদ্ধাদের নাতি-নাতনি লালন-পালনের সংস্কৃতি আনুমানিক ৪০,০০০ বছর পূর্বে মানুষের আয়ু বৃদ্ধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।

প্রবীণ-নবীনের মিলনমেলা

কুলবৃদ্ধা অনুকল্প কিন্তু মানুষের জীবনেতিহাস পরিবর্তনের একটি প্রভাবক মাত্র। ৪০,০০০ বছর পূর্বে দীর্ঘায়ু লাভের আরও অনেকগুলো কারণকে এর সাথে সমন্বিত করে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে দীর্ঘায়ুর একটি একীভূত তত্ত্ব প্রদানের চেষ্টায় আছেন। অবশ্য জীববিজ্ঞানের খুব কম বিষয়েই নিখুঁত তত্ত্ব থাকে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় অসংখ্য ছোট ছোট বিষয়ের অবদানে একটি বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়।

দীর্ঘায়ু লাভের অন্যান্য প্রভাবকগুলো নিয়ে আলোচনার আগে এটা পরিষ্কার করে নেয়া প্রয়োজন যে, কুলবৃদ্ধা অনুকল্প সর্বজনগৃহীত কোন তত্ত্ব নয়। এমনকি ২০০০ সালে হিলার্ড ক্যাপলান ও তার সহকর্মীরা দীর্ঘায়ু লাভের আরেকটি তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন যা আয়ুষ্কালের বিবর্তনে একই সাথে শারীরবৃত্ত, মনস্তত্ত্ব এবং আচার-ব্যবহারের অবদান স্বীকার করে। তারা প্রথমেই বলেছিলেন, একজন মানুষের জীবনেতিহাস অন্তত পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কারণে অন্য সব স্তন্যপায়ী এবং প্রাইমেটদের থেকে আলাদা। এগুলো হচ্ছে দীর্ঘায়ু, শিশু-কিশোরদের বড়দের উপর অনেক বেশি নির্ভরতা, সন্তান লালন-পালনে কুলবৃদ্ধাদের অবদান, মা এবং শিশুদেরকে পুরুষদের খাদ্য সরবরাহ এবং উন্নত মস্তিষ্ক যা বোধ, শিক্ষা ও অন্তর্দৃষ্টির মত মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ধারনে সক্ষম। তত্ত্বটি বলে, উন্নত খাদ্যাভ্যাসের সাথে এই সবগুলো বৈশিষ্ট্যের সহবিবর্তন ঘটেছে। তাদের যুক্তির ধারা ছিল এরকম,

মানুষ এক সময় উন্নত কিন্তু দুর্লভ খাদ্য গ্রহণের প্রতি আকৃষ্ট হয় যা তৈরিরে জন্য অনেক দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান এবং শক্তির প্রয়োজন ছিল। শিশু-কিশোর বয়সে মানুষ এই গুণগুলো অর্জন করতো, কিন্তু সরাসরি কোন খাদ্য সংগ্রহ করতো না। বড়রা খাদ্য সংগ্রহ করে শিশু ও মায়েদের খাওয়াতো। শিশু-কিশোররা এত কম উৎপাদনশীল বলেই বয়স্ক পুরুষদের উৎপাদনশীলতা এত বেশি। বয়সের সাথে সাথে উৎপাদনশীলতা বাড়ে বলেই মৃত্যুর হার কমে এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়। খাদ্য যোগানের দক্ষতা অর্জনের পর তা থেকে ফল পেতে অনেক সময় লাগে যে কারণে মানুষের কৈশোর বেশ দীর্ঘ। খাদ্য সংগ্রহে এত চেষ্টা চরিত্তির করে বলেই তা পরিবারের সবার সাথে ভাগ করার প্রবণতা মানুষের বেশি। মা এবং শিশুদের খাদ্যের চিন্তা থাকে না বলে শিশু-কিশোর মৃত্যুর হার কম। সংক্ষেপে বলা যায় মানুষের দীর্ঘায়ু লাভের মূল কারণ উন্নত খাদ্যাভ্যাস এবং তা অন্য তিনটি বৈশিষ্ট্যের সাথে সহবিবর্তিত হয়েছে: দক্ষতা তৈরির উপযোগী জটিল মস্তিষ্ক, দক্ষতা অর্জনের জন্য দীর্ঘ কৈশোর এবং ছোটদেরকে খাদ্য ও সেবা দিয়ে বড়দের সাহায্য করা।[6]

দেখা যাচ্ছে এই তত্ত্বে কুলবৃদ্ধা অনুকল্প অন্তর্ভুক্ত আছে, কিন্তু সাথে আরও কিছু বিষয় যোগ করা হয়েছে। তবে এদের পার্থক্য হচ্ছে কুলবৃদ্ধা অনুকল্প যেখানে দাদি-নানিদের অবদানকে বড় করে দেখে এই তত্ত্ব সেখানে বাবার অবদানকে প্রাধান্য দেয়, প্রথমটিতে নির্বাচনী চাপ হচ্ছে নাতি-নাতনির সেবা আর দ্বিতীয়টিতে নির্বাচনী চাপ উন্নত খাদ্যাভ্যাস, প্রথমটি বেশি সাংস্কৃতিক, দ্বিতীয়টি বেশি একইসাথে জৈবিক ও সাংস্কৃতিক।

তবে বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। নতুন অনুকল্প প্রণয়ন এবং পরীক্ষার মাধ্যমে সেগুলো যাচাই বাছাই করার মাধ্যমেই সে বেঁচে থাকে। এই যেমন, ২০১১ সালের প্রবন্ধে ক্যাসপারি দীর্ঘায়ু লাভের পেছনে জীববিজ্ঞান নয় বরং সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিলেন। কারণটা ছিল অবশ্যম্ভাবী। দৈহিক দিক দিয়ে মধ্য এবং উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ একেবারে এক রকম, কিন্তু দুটো বিষয়ে তারা খুবই আলাদা- একটি সংস্কৃতি এবং অন্যটি গড় আয়ু। সুতরাং সংস্কৃতি এবং গড় আয়ুর মধ্যে যে একটি যোগসাজোশ আছে তা না মেনে উপায় নেই। সংস্কৃতির দিক দিয়ে তারা কতোটা আলাদা ছিল তা নিচের ছবিতে দুই যুগের কিছু সাংস্কৃতিক নিদর্শন দেখেই বোঝা সম্ভব:

গয়না, বাদ্যযন্ত্র আর ভাস্কর্য- এটুকুই একটি গোত্রের সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা ফুটিয়ে তুলতে যথেষ্ট। উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের শুরুর দিকেই অরণি আর চাঁছনির বদলে পাওয়া যেতে শুরু করে এমন হাঁড়ের বাঁশি। ১৯৭৩ সালে প্রথম দক্ষিণ জার্মানির গাইসেনক্ল্যস্টেয়ালে গুহা থেকে প্রায় ৩৫,০০০ বছরের পুরনো একটি হাঁড়ের বাঁশি পাওয়া যায়। আধুনিক ভাষারও আগে হয়ত বাঁশি দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে শুরু করেছিল মানুষ। দীর্ঘায়ু এই সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রাকে সাহায্য করেছিল, অন্যদিকে আবার সেই সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা আয়ু বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছিল। কুলবৃদ্ধা অনুকল্পের আলোকে এই পারষ্পরিক প্রভাব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু এটি ছাড়াও দীর্ঘায়ুর সাথে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আরও কিছু বিষয়ের গভীর সম্পর্ক আছে।

দাদা-দাদিরা জটিল সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে। তারা গল্পের ছলে ছোটদেরকে তাদের পূর্বপুরুষের কাহিনী বলে যার ফলে শিশুরা মানবতার মহাযাত্রার সাথে নিজেকে যুক্ত করার অনুপ্রেরণা পায়। এই ইতিহাস নির্ভরতার উপর কিন্তু আমাদের সামাজিক ভিত্তি অনেকটাই নির্ভরশীল।

বৃদ্ধরা বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বাহক। পরিবেশ থেকে শুরু করে প্রযুক্তি পর্যন্ত সকল বিষয়েই তারা মানুষের এ যাবৎ অর্জিত জ্ঞানগুলো বিলিয়ে দিয়ে যায় বংশধরদের মাঝে। প্রাচীনকালে হয়ত তারা নাতি-নাতনিদের শেখাতেন কোন গাছগুলো বিষাক্ত, খরা হলে পানি খুঁজতে কোথায় যেতে হবে, কিভাবে ঝুড়ি বানাতে হয় কিংবা পাথরের গা ঘষে কিভাবে তৈরি করা যায় সূক্ষ্ণতর অস্ত্র। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক দেখিয়েছেন কিভাবে একই কাজের পুনরাবৃত্তি আপন সংস্কৃতির ধারা বজায় রাখতে সাহায্য করে। বাবা-মা এবং দাদা-দাদি বা নানা-নানির অনুকরণের মাধ্যমেই সংস্কৃতির ধারা বজায় থাকে। যেসব পরিবারে কয়েক প্রজন্মের বাস তারা এই চর্চা আরও ভালভাবে করতে পারে। স্বভাবতই দীর্ঘায়ু এক প্রজন্মের সাথে অন্য প্রজন্মের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে তথ্যের আদান প্রদানে যেমন সাহায্য করেছে তেমনি বিভিন্ন জটিল সামাজিক বন্ধন তথা আত্মীয়তার গোড়াপত্তন করেছে। এই আত্মীয়তার বন্ধনই প্রতিকূল সময়ে মানুষকে আশার আলো দেখায়।

এতো গেল পারিবারিক বন্ধন এবং আত্মীয়তার কথা। এবার জনসংখ্যার হিসেবে আসা যাক। দীর্ঘায়ুর কারণে সার্বিকভাবে গোষ্ঠীর জনসংখ্যাও অনেক বেড়ে যায়। বেশি জনসংখ্যা মানেই বেশি বেশি মিথস্ক্রিয়া, নতুন নতুন আচার-আচরণ আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। জনসংখ্যার ঘনত্ব এখানে একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাবক। ২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অ্যাডাম পাওয়েল “সায়েন্স” সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখান যে, জটিল সংস্কৃতি বজায় রাখতে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি থাকা প্রয়োজন। পাওয়েল সহ আরও অনেকেই এ ব্যাপারে একমত যে, ঘনত্ব বেশি হলে জটিল বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, সাহায্য-সহযোগিতা এবং লেনদেনের সুযোগ বাড়ে এবং গোষ্ঠীর সদস্যরা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পরিচয়ের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করে। যে কারণে এ ধরণের সমাজে গয়না পরে বা শরীরে রঙ মেখে আত্মপরিচয় বা গোষ্ঠীগত পরিচয় বহনের চেষ্টা করে মানুষ। এদিক থেকেও উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগ বৈপ্লবিক। কারণ এ যুগেই মানুষ প্রথম প্রতীকের সাহায্যে ভাব রূপায়িত করতে শুরু করে। অস্ত্র ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নির্মাণের জন্য ব্যবহার করতে শুরু করে অদ্ভুত সব উপাদান। পাওয়েল এমনকি জনসংখ্যার ঘনত্বের সাথে সাথে সামাজিক দক্ষতায় পরিবর্তনও লক্ষ্য করেছিলেন।[7]

জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বিবর্তনের গতিও অনেক বেড়ে যায়। কারণ অধিক জনসংখ্যা মানেই বেশি বেশি পরিব্যক্তি (মিউটেশন)। উপরন্তু তাদের মধ্যে প্রজননের ফলে উপকারী পরিব্যক্তিগুলো পুরো গোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। এর ফলে প্রাকৃতিক নির্বাচন আরও কর্যকরী হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসন এর বিজ্ঞানী জন হক্স ও তার সহকর্মী এই বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখেন যার নামের বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়, মানুষের অভিযোজনগত বিবর্তনে সাম্প্রতিক ত্বরণ। প্রথমে তারা কিছু নির্দেশকের মাধ্যমে পরিব্যক্তির সংখ্যা নির্ণয় করেছেন যাতে একটি সুস্পষ্ট চূড়া লক্ষ্যণীয়।[8]

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ৪০,০০০ বছর পূর্ব থেকেই পরিব্যক্তির ত্বরণ ঘটতে শুরু করে এবং আট থেকে পাঁচ হাজার বছরের মধ্যে বিবর্তনের গতি সর্বোচ্চ মানে পৌঁছায়। এখানে পরিব্যক্তির সংখ্যাকে বিবর্তনের গতির সমার্থক ভাবা যেতে পারে। এবার এই লেখচিত্রের সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চিত্রের তুলনা করা যাক,

উপরের ছবিতে দুটি পৃথক পৃথক জনসংখ্যা বিস্ফোরণ সুস্পষ্ট। লেখচিত্রটি লগভিত্তিক। অর্থাৎ উল্লম্ব অক্ষের দিকে প্রতি ঘরে মান দশগুণ করে বেড়ে যায়। এখানেও দেখা যাচ্ছে ৪০-৫০ হাজার বছরেরও আগে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ দিকের আফ্রিকাতে জনসংখ্যা ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার চেয়ে বেশি ছিল, আনুমানিক ৪০,০০০। কিন্তু ৫০ হাজার বছরের পর উভয় মহাদেশের জনসংখ্যাই বাড়তে বাড়তে ১০ হাজার বছরের পূর্বেই ৩-৪ লাখে পৌঁছায়। ১০ হাজার বছর পূর্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আরেক ধাপ বেড়ে যায়। উপরের দুটি লেখচিত্র থেকে স্পষ্টই জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধির সাথে বিবর্তনের গতিবেগের সম্পর্ক বোঝা যাচ্ছে।

আসলে জনসংখ্যার ত্বরিত বৃদ্ধি উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের তুলনায় নব্য প্রস্তর যুগে বেশি কাজে দিয়েছে। আনুমানিক ১০,০০০ বছর পূর্বে কৃষিকাজ উদ্ভাবনের মাধ্যমে নব্য প্রস্তর বিপ্লবের সূচনা ঘটে। বিবর্তনের জন্য দশ হাজার বছর সময়টি অনেক কম মনে হলেও জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি হওয়ার কারণে সে থেমে থাকেনি। গ্রেগরি কোচরান এবং হেনরি হারপেন্ডিং তাদের ২০০৯-এ প্রকাশিত বই “The 10,000 Year Explosion” এ দেখিয়েছেন কিভাবে মাত্র দশ হাজার বছরে গায়ের রঙ থেকে শুরু করে, গরুর দুধ পানের ক্ষমতা পর্যন্ত সকল বৈশিষ্ট্যের জিন খুব দ্রুত প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে। এই বিবর্তন বিপ্লবের প্রধান কারণ ছিল মানুষের অধিক জনসংখ্যা, যার প্রথম কারণ সেই প্রাচীন বুড়োর দল।[9]

সকল সমাজেই প্রবীণরা প্রাজ্ঞ বলে যে একটি ধারণা প্রচলিত আছে এতক্ষণে তার মর্মার্থ বুঝতে নিশ্চয়ই কারও বাকি নেই। উর্ধ্ব প্রাচীন প্রস্তর যুগের সূচনালগ্নে বা সে যুগ শুরুর একটু আগে কোন সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের উপজাত হিসেবেই হয়ত মানুষের আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছিল, গঠিত হয়েছিল একটি প্রবীণ গোষ্ঠী। কিন্তু সেই উপজাত প্রবীণদের কারণেই মানুষের এবং তার মাধ্যমে পুরো পৃথিবীর ইতিহাস আর কোনদিন এক থাকেনি। সংস্কৃতির উপজাত হিসেবে জন্ম নিয়ে সেই সংস্কৃতিকেই আমূল পাল্টে দিয়েছে তারা। নর-নারীর লীলার পরই মানবতা বিকাশের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি ছিল প্রবীণ-নবীনের মিলন। এই মিলনমেলা কতদিন অটুট থাকে তাই এখন দেখার বিষয়।

পরিভাষা
Ageing – বৃদ্ধায়ন
Menopause – রজোনিবৃত্তি
Old-Young adults ratio (OY ratio) – বৃদ্ধ-সাবালক অনুপাত (বৃসানুপাত)
Venus figurine – রম্ভাপুতুল

তথ্যসূত্র

1. A millennium of health improvement, BBC, 27 December 1998
2. Rachel Caspari, “The evolution of grandparents”, Scientific American, August 2011
3. Caspari, Lee, “Older age becomes common late in human evolution”, Proceedings of the National Academy of Sciences, 27 July 2004
4. Mirkka Lahdenperä et al., “Fitness benefits of prolonged post-reproductive lifespan in women”, Nature v428, 11 March 2004
5. Kristen Hawkes, “The grandmother effect”, Nature v428, 11 March 2004
6. Hillard Kaplan et al., “A Theory of Human Life History Evolution: Diet, Intelligence, and Longevity”, Evolutionary Anthropology, 2000
7. Adam Powell et al., “Late Pleistocene Demography and the Appearance of Modern Human Behavior”, Science v324, 5 June 2009
8. John Hawks et al., “Recent acceleration of human adaptive evolution”, PNAS v104, 26 December 2007
9. Gregory Cochran, Henry Harpending, “The 10,000 Year Explosion”, Basic Books, 2009

[157 বার পঠিত]