গ্র্যান্ড ইউনিভার্স খ্যাত তানভিরুল ইসলামের গণিত নিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে লেখার ইচ্ছা জাগলো। শুরুতেই বলে নেই আমি গণিতে আমার ভিত খুব বেশি শক্ত নয়,আমি ক্যালকুলাস বুঝিনা,নম্বর থিওরিতে দুর্বল। তবে গণিতের প্রতি ভালবাসা আছে আমার,প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করতে গিয়ে গণিতের কিছু ব্যাপার জানার সৌভাগ্য হয়েছে,জাফর ইকবাল স্যারের নিউরনে অনুরণন থেকেও অনেক কিছু শিখেছি। যাদের গণিতের জ্ঞান ভালো তাদের প্রতিভা আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে,জটিল সব সমস্যা তারা সমীকরণ বের করে চট করে সমাধান করে ফেলতে পারে।
:line:

ছোটোবেলা থেকেই দেখেছি ক্লাসে যে অংক ভালো পারে তার অন্যরকম দাম,সবাই তাকে কিছুটা হলেও সমীহ করে চলে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না কারণ গণিতে নম্বর পাওয়া খুব সহজ না,মুখস্থ করেও গণিতে ভালো নম্বর পাওয়া কঠিন। সুত্র মূখস্থ করার পরেও পরীক্ষার হলে সব অংক সঠিকভাবে মিলাতে বারবার চর্চার দরকার হয় যদিনা স্যার সাজেশন আর ফটোকপি থেকে অংক হুবুহু তুলে দেন। তাই গণিতে ৯৯ পেলে তাকে সমীহ করা হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সুত্র মুখস্থ করে ১০০টি অংক চর্চা করলেই কি গণিত জানা যায়? অংক পারা আর গণিত জানা কি এক?

এ প্রশ্নের উত্তর সব থেকে ভালো দেয়া যায় ক্যালকুলাসের প্রসঙ্গ তুলে। বাংলাদেশে উচ্চমাধ্যমিক থেকে ক্যালকুলাসের সাথে পরিচয় হয় বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের। শুরুতেই dy/dx অপারেটরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় এবং খাতায় কিছু সুত্র লিখে দেয়া হয়: dy/dx(x^2)=x, dy/dx(sinx)=cosx,ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর শুরু হয় অংক করা। সুত্র বসিয়ে আমরা অংক করতে থাকি,যত বেশি অংক করি তত সুত্র মাথায় বেশি থাকে,কখন কোন সুত্র ব্যবহার করতে হবে ধীরে ধীরে আয়ত্ব হয়ে যায়। যে ভালো আয়ত্ব করতে পারে তাকে “ক্যালকুলাসের বস” উপাধি দেয়া হয়। কিন্তু সমস্যাটা হলো কোন সুত্র কিভাবে এলো,কেনো dy/dx(sinx)=cosx হচ্ছে এগুলো খুব বেশি হলে ৩% শিক্ষার্থী বুঝে(আমি সেই ৩% এর মধ্যে পড়িনা)। ফিজিক্স করার সময় ক্যালকুলাস দরকার হয় তবে কেনো দরকার সেটা পরিস্কার করে বলা হয়না। নিউটনের গতিসূত্র প্রমাণ করতে গিয়ে ক্ষুদ্র অংশে বেগ পরিবর্তন বের করতে differentiation করি কিন্তু ক্যালকুলাস আসলে কিভাবে এই পরিবর্তনটা বের করে আনে সেই ব্যাপারে অন্ধকারেই থেকে যাই,আইনস্টাইনের e=mc^2 প্রমাণ করার সময়ও একই ঘটনা ঘটে। উচ্চ মাধ্যমিকে বইয়ের শেষের দিকে ২-৩ টা মতো অধ্যায় আছে ক্যালকুলাসের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ নিয়ে। সেসব অধ্যায়ের সমস্যা সমাধান করলে কিছুটা ধারণা আসে ক্যালকুলাস কিভাবে আর কখন প্রয়োগ করতে হয় সেটা নিয়ে। কিন্তু হাস্যকরভাবে সেগুলো স্যাররা পড়াননা,কারণ সেগুলো থেকে পরীক্ষায় খুব কম প্রশ্ন আসে,তাই এগুলো “important না”। আমি জানিনা কেনো এগুলো থেকে প্রশ্ন কম আসে,যে ছাত্র কেবল dy/dx বসিয়ে দেয়া সমীকরণ সমাধান করলো,রিয়েল লাইফ সমস্যা ধরলোনা সে যতই সুত্র জানুক,কিভাবে বুঝবে ক্যালকুলাস কখন লাগবে? কোনো অজানা প্রবলেম ধরিয়ে দিলে সে কি বের করতে পারবে যে এটা ক্যালকুলাস দিয়ে সমাধান করতে পারবে? আসল জিনিস ধরতে পারলে সে অবশ্যই সুত্র ব্যবহার করে সমাধান করতে পারবে কিন্তু কোথায় কাজে লাগে ভালো করে না জানলে সে আসল জিনিস ধরবে কি করে?

শুধু ক্যালকুলাস না,বেশি ভাগ টপিকের রিয়েল লাইফ সমস্যার অধ্যায় থাকে সবার শেষে এবং সেগুলো করানো হয়না। এতে করে সুত্র চর্চা হচ্ছে কিন্তু জ্ঞান চর্চা হচ্ছেনা। ক্যালকুলাসের খটমটে উদাহরণের জায়গায় একটি সহজ উদাহরণ দেই। আপনাকে আমি লসাগু বের করা শিখিয়ে দিচ্ছি: সংখ্যাগুলোকে উতপাদকে বিশ্লেষণ করুন,উতপাদক গুলো কোনো সংখ্যায় সর্বোচ্চ কয়বার আছে সেগুলো গণনা করুন এবং সেগুলোকে power এ নিয়ে গুণ করুন।যেমন ৪=২*২,৬=৩*২ তাহলে ৪ আর ৬ এর লসাগু হলো ২^২*৩^১=১২। এবার আপনাকে অনেকগুলো অংক দেই, (১০,২০),(১০০,২৩),(১২,৩৩) এর লসাগু বের করুন। আপনি চর্চা করতে থাকলেন,আপনি জানেন লসাগু বের করতে হলে কি কি করতে হয়,আপনার একটি অংকও ভুল হয়না। কিন্তু এভাবে উতপাদক গুন করে কি হলো তার মাথামুন্ডু আপনি জানেনা। এবার আপনাকে প্রবলেম দিলাম “একটি বিয়ে বাড়িতে রঙিন আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে। ডান পাশের আলো ৫ সেকেন্ড পরপর নীল হয়ে যায়,উপরের আলো ৭ সেকেন্ড পরপর লাল হয়ে যায়,বাম পাশের আলো ১২ সেকেন্ড পর পর হলুদ হয়ে যায়। কত সেকেন্ড পরপর আমরা নীল,লাল এবং হলুদ রং একসাথে পাবো?” আপনি যদি লসাগু জিনিসটা আসলে কি এটা বুঝেন তাহলে ১ মিনিটও লাগবেনা সমাধান বের করতে কিন্তু না জানলে আপনাকে অনেক চিন্তা করতে হবে,সংখ্যাগুলো যত বড় হবে চিন্তা তত বেশি করতে হবে এবং ৩টির জায়গা ৬টি সংখ্যা দিলে ব্যাপারটি বেশ কঠিন হয়ে যাবে লসাগু না বুঝলে। ক্লাস ফাইভের বাচ্চাকে সত্যিকার সমস্যার সাথে পরিচয় না করিয়ে খালি লসাগু কিভাবে বের করে সেটা শিখিয়ে কি আদৌ কোনো লাভ আছে?

গণিত বিজ্ঞানের ভাষা,সুত্র মুখস্থ করে গণিত শিখে আর যাই হোক বিজ্ঞান শেখা সম্ভব না।

আমরা অংক করার সময় একটি অধ্যায় শেখানো শুরু হয় সুত্র শেখানো দিয়ে,সুত্রের প্রমাণ হয়তো শেখানো হয় তবে খুব কম শিক্ষকই ভিতরের জিনিসগুলো পরিস্কার করে বুঝান। অধ্যায়ের শুরুতে কিছু কথা-বার্তা লেখা থাকে,অংক করার সময় খুব কমই অধ্যায়ের শুরুতে কি লেখা আছে সেগুলো দেখেছি,দেখেছি শুধু সুত্র,তারপর সোজা চলে গিয়েছে অনুশীলনীতে। হিজিবিজি করে মাঝে কি লেখা আছে পড়ে দেখার দরকার মনে করিনি কখনো। আর বোর্ডের বইগুলো লেখা হয়েছে খুব অযত্নে,সেগুলো থেকে খুব বেশি কিছু বোঝা সম্ভব নয়। তারথেকে ইংরেজি মিডিয়ামের গণিত বইতে দেখেছি সবকিছু অনেক সুন্দর করে লেখা তবে সেখানেও স্কুলে সুত্রই শেখানো হয়।

ক্লাস নাইনে থাকতে আমি একজন অসাধারণ স্যারের কাছে গণিত পড়তাম। উনার কাজ ছিলো খালি আটকে গেলে সাহায্য করা। সমস্যা আমাদের নিজেদেরই সমাধান করতে হবে,মাথা খাটাতে হবে,না পারলে উনি ১-২ লাইন এগিয়ে দিবেন,তারপর আবার মাথা খাটাতে হবে। পরবর্তিতে কলেজে যত শিক্ষক পেয়েছি সবাই সুন্দর করে অংক খাতায় তুলে গিলিয়ে দিতেন,মাথা খাটানোর কোনো সুযোগ থাকতোনা তাই স্কুলজীবনের সেই আগ্রহটাও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ইউনিভার্সটিতেও আমাদের ম্যাথের কোর্সগুলো মাইনর,সেগুলোতেও কোনো উন্নতি দেখিনি,টিচার অংক বোর্ডে করে দিচ্ছে,সবাই(=৯৫%) লেকচার ফটোকপি করে নিচ্ছে,সুত্র শিখে পরীক্ষার হলে লিখে আসছে। আমি যতটুক গণিত শিখেছি সবই স্কুলের ওই স্যারের কাছে,নিউরণে অনুরণন বই থেকে এবং পরে ভার্সিটিতে প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করতে গিয়ে ইন্টারনেট আর সিনিয়রদের কাছে।কলেজে থাকতে কখনো বুঝিনি matrix দিয়ে কি হয়,শিখেছি কনটেস্টের জন্য recurrence relation সলভ করতে গিয়ে।

খান একাডেমির ভিডিও গুলোর কথা সবাই শুনেছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত তরুণ “সালমান খান” গণিতসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর অনেকগুলো ভিডিও তৈরি করেছেন। ভিডিওগুলো দেখলে বোঝা যায় আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থা কতটা বাজে। ছোট ছোট ভিডিওগুলো যেভাবে বিষয়গুলোর গভীর গিয়ে শেখানো হয়েছে তার অর্ধেকও আমাদের স্কুল-কলেজে করা হয়না।

গণিতে যারা সত্যিকারভাবে ভালো তাদের বেশিভাগকেই দেখেছি ম্যাথ অলিম্পিয়াড করতে। IOI যারা করে তারাও গণিতে খুব ভালো। জাফর ইকবাল স্যার,কায়কোবাদ স্যার,মুনীর চৌধুরীরা ম্যাথ অলিম্পিয়াড ছড়িয়ে দিয়ে সত্যিকারের গণিতের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন,তাদের এ উদ্যোগ ছাত্র-ছাত্রীদের যে কি পরিমাণ উপকার করেছে সেটা বলে বুঝানো খুব কঠিন। প্রবলেম সলভিং এর প্রথম স্বাদ পেয়েছি নিউরণে অনুরণন বইতে,সেই অনুপ্রেরণা থেকেই পরবর্তীতে প্রোগ্রামিং কনটেস্টে যুক্ত হয়েছি। আরো একজনের নাম উল্লেখ না করলে অন্যায় হয়,তিনি “শাহরিয়ার মনজুর”। ACM প্রোগ্রামিং কনটেস্টের ওয়ার্ল্ড ফাইনালের জাজ তিনি,আমার জানামতে পৃথিবীতে হাতেগোনা ১০-১১ এখন পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড ফাইনালের জাজ হতে পেরেছেন। কয়েক শত প্রোগ্রামিং প্রবলেম তিনি তৈরি করেছেন যার বেশিভাগ নাম্বার থিওরী সংক্রান্ত,বিশ্বের সব দেশের প্রোগ্রামিং কনটেস্টেন্টরা তার সমস্যা সমাধান করে এবং তাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করে।

যে ছেলেটি বা মেয়েটি শুধু সুত্র বসিয়ে অংক ভালো পারে তাকে “অংকের বস” টাইপের উপাধি দেয়া মানে আসলে তার ক্ষতি করা। সে এই প্রশংসায় খুশি হয়ে ভেবে বসতে পারে গণিত জানা শুধু মানে অংক পারা। আবার যে গভীরভাবে সব বুঝে কিন্তু পরীক্ষায় হয়তো সবসময় ৯৫ পায়না তাকে উতসাহ না দিলে তার শেখার ইচ্ছাটা মরে যেতে পারে। একটা ছেলেমেয়েকে ভালোমত অনুপ্রেরণা দেয়া গেলে সে অসাধ্য সাধন করতে পারে,বাংলাদেশের বিভিন্ন অলিম্পিয়াড,প্রোগ্রামিং কনটেস্টের প্রতিযোগীরা বিশ্বের বড়বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের হারিয়ে সেটা ভালোভাবেই প্রমাণ করেছে। কিন্তু না বুঝে মুখস্থকে অনুপ্রেরণা দেয়া মানে যাকে অনুপ্রেরণা দেয়া হচ্ছে তাকে শেষ করে দেয়া। এ প্রবন্ধের লেখাগুলো শুধু গণিত নয়,সব বিষয়ের জন্য প্রযোজ্য। আমরা সবাই যদি আমাদের আশেপাশের ছেলেমেয়েদের অনুপ্রেরণা দিতে পারি যেটা জাফর ইকবাল স্যার করছেন,শিক্ষা ব্যাবস্থার পরিবর্তন ছাড়াই শিক্ষার মান অনেকটা বাড়িয়ে ফেলা সম্ভব আমার ধারণা।