(পঞ্চম পর্বের পর…)

মনুর দৃষ্টিতে নারীর প্রকৃতি ও সম্পত্তি বিচার
প্রাকৃতিকভাবেই নারী যে পুরুষের মতোই প্রাণীজ আবেগসম্পন্ন জৈব-মানসিক সত্তা, তা পিতৃতান্ত্রিক কূটবুদ্ধিতে অজানা থাকার কথা নয়। তাই নারীকে ক্ষমতা ও অধিকারশূণ্য করে পিতৃতন্ত্রের পূর্ণ-কব্জায় নিতে গিয়ে পুরুষের মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও জটিলতা তৈরি হয়েছিলো, শেষপর্যন্ত তা হয়তো গোপন রাখা যায় নি। আর এই সংকট ও নিজেদের ব্যভিচার ঢেকে রাখার আপ্রাণ অপচেষ্টা হিসেবে নারীকে হীনস্বভাবী আখ্যায়িত করে তার উপর খুব সচেতনভাবেই কতকগুলো আপত্তিকর অপবাদ কৌশলে চাপিয়ে দিয়েছে পুরুষ-

‘স্বভাব এষ নারীণাং নরাণামিহ্ দূষণম্।
অতোহর্থান্ন প্রমাদ্যন্তি প্রমদাসু বিপশ্চিতঃ।।’
ইহলোকে (শৃঙ্গার চেষ্টার দ্বারা মোহিত করে) পুরুষদের দূষিত করাই নারীদের স্বভাব; এই কারণে পণ্ডিতেরা স্ত্রীলোকসম্বন্ধে কখনোই অনবধান হন না। (২/২১৩)।
.
‘অবিদ্বাংসমলং লোকে বিদ্বাংসমপি বা পুনঃ।
প্রমদা হ্যুৎপথং নেতুং কামক্রোধবশানুগম্।।’
ইহলোকে কোনও পুরুষ ‘আমি বিদ্বান্ জিতেন্দ্রিয়’ মনে করে স্ত্রীলোকের সন্নিধানে বাস করবেন না; কারণ, বিদ্বানই হোন বা অবিদ্বানই হোন, দেহধর্মবশতঃ কামক্রোধের বশীভূত পুরুষকে কামিনীরা অনায়াসে বিপথে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়। (২/২১৪)
.
‘মাত্রা স্বস্রা দুহিত্রা বা না বিবিক্তাসনো ভবেৎ।
বলবানিন্দ্রিয়গ্রামো বিদ্বাংসমপি কর্ষতি।।’
মাতা, ভগিনী বা কন্যার সাথে কোনও পুরুষ নির্জন গৃহাদিতে বাস করবে না, কারণ ইন্দ্রিয়সমূহ এতই বলবান্ (চঞ্চল) যে, এরা (শাস্ত্রালোচনার দ্বারা আত্মসংযম অভ্যাস করতে পেরেছেন এমন) বিদ্বান্ ব্যক্তিকেও আকর্ষণ করে (অর্থাৎ কামক্রোধাদির বশবর্তী করে তোলে)। (২/২১৫)।
.
‘নৈতা রূপং পরীক্ষন্তে নাসাং বয়সি সংস্থিতিঃ।
গুরূপং বা বিরূপং বা পুমানিত্যেব ভুঞ্জতে।।’
বস্তুতঃপক্ষে স্ত্রীলোকেরা যে সৌন্দর্যে আসক্ত হয় তা নয় কিংবা পুরুষের বিশেষ বয়সের উপর নির্ভর করে তা-ও নয়। কিন্তু যার প্রতি আকৃষ্ট হয় সে লোকটি সুরূপই হোক বা কুরূপই হোক তাতে কিছু যায় আসে না, যেহেতু ব্যক্তিটি পুরুষ এইজন্যেই তার প্রতি আসক্ত হয় (এবং তার সাথে সম্ভোগে লিপ্ত হয়)। (৯/১৪)।
.
‘শয্যাসনমলঙ্কারং কামং ক্রোধমনার্জবম্।
দ্রোহভাবং কুচর্যাঞ্চ স্ত্রীভ্যো মনুরকল্পয়ৎ।।’
বেশি নিদ্রা যাওয়া, কেবল বসে থাকার ইচ্ছা, শরীরকে অলংকৃত করা, কাম অর্থাৎ পুরুষকে ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা, অন্যের প্রতি বিদ্বেষ, নীচহৃদয়তা, অন্যের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং কুচর্যা অর্থাৎ নীচ পুরুষকে ভজনা করা- স্ত্রীলোকদের এই সব স্বভাব মনু এদের সৃষ্টি-কালেই করে গিয়েছেন। (৯/১৭)।

.
অর্থাৎ পুরুষের নিজস্ব দুরাচারকে সুকৌশলে ব্রহ্মবাক্য দিয়ে শেষপর্যন্ত নারীর উপরই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ তথাকথিত শাস্ত্রজ্ঞ হয়েও আসলে পুরুষই যে অভব্য হয়, সেই নিচত্ব ঢাকতে গিয়ে নারীকে একটা নিকৃষ্ট কামজ সত্তা প্রমাণেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে হীনম্মণ্য পুরুষ। এ কারণে মনুশাস্ত্রে নারীর স্বাধীনতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে বলা হচ্ছে- নারী স্বাধীনাবস্থায় অবস্থানের যোগ্য নয়-
.

‘বালয়া বা যুবত্যা বা বৃদ্ধয়া বাপি যোষিতা।
ন স্বাতস্ত্র্যেণ কর্তব্যং কিঞ্চিৎ কার্যং গৃহেষবপি।।’
স্ত্রীলোক বালিকাই হোক, যুবতীই হোক কিংবা বৃদ্ধাই হোক, সে গৃহমধ্যে থেকে কোনও কাজই স্বামী প্রভৃতির অনুমতি ছাড়া করতে পারবে না। (৫/১৪৭)।

‘বাল্যে পিতুর্বশে তিষ্ঠেৎ পানিগ্রাহস্য যৌবনে।
পুত্রাণাং ভর্তরি প্রেতে ন ভজেৎ স্ত্রী স্বতন্ত্রতাম্।।’
স্ত্রীলোক বাল্যাবস্থায় পিতার অধীনে থাকবে, যৌবনকালে পাণিগ্রহীতার অর্থাৎ স্বামীর অধীনে থাকবে এবং স্বামীর মৃত্যু হলে পুত্রদের অধীনে থাকবে। (পুত্র না থাকলে স্বামীর সপিণ্ড, স্বামীর সপিণ্ড না থাকলে পিতার সপিণ্ড এবং পিতার সপিণ্ড না থাকলে রাজার বশে থাকবে), কিন্তু কোনও অবস্থাতেই স্ত্রীলোক স্বাধীনতা লাভ করতে পারবে না। (৫/১৪৮)।

.
উল্লেখ্য যে, সপিণ্ড মানে যিনি মৃতব্যক্তির শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে পিণ্ড দানের যোগ্য। হিন্দুশাস্ত্রে পিণ্ডদানের ক্রমাধিকারের সাথে সম্পত্তির অধিকার অর্জনের বিষয়ও জড়িত।
এবং মনুর পুরুষ-দৃষ্টি এতোটাই একচক্ষু যে, নারীকে কখনও বিশ্বাসও করা যাবে না। তাই-

‘পিত্রা ভর্ত্রা সুতৈর্বাপি নেচ্ছেদ্বিরহমাত্মনঃ।
এষাং হি বিরহেণ স্ত্রী গর্হ্যে কুর্যাদুভে কুলে।।’
স্ত্রীলোক কখনো পিতা, স্বামী কিংবা পুত্রের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না; কারণ, স্ত্রীলোক এদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে পিতৃকুল ও পতিকুল- উভয় কুলকেই কলঙ্কিত করে তোলে। (৫/১৪৯)।

.
অর্থাৎ নারীর জীবন পিতা বা স্বামীর কুলেই সীমাবদ্ধ। নিজের কোন কুল নেই বলে এই কুলহীনতা নারীকে একধরনের সামাজিক সম্পত্তিতে পরিণত করে। ফলে চূড়ান্ত বিচারে নারী পুরুষের অধীনতাই স্বীকার করতে বাধ্য।
.
পুরুষ-কেন্দ্রিকতায় নারীর প্রতি এই সম্পত্তি-ধারণা থেকেই হয়তো পুরুষের নারীসংরক্ষণের দৃষ্টিভঙ্গি উদ্ভূত। অসতর্ক হলেই এ সম্পত্তি নষ্ট বা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তাই মনুশাস্ত্রে উক্ত হয়-

‘অস্বতন্ত্রাঃ স্ত্রিয়ঃ কার্যাঃ পুরুষৈ স্বৈর্দিবানিশম্।
বিষয়েষু চ সজ্জন্তঃ সংস্থাপ্যা আত্মনো বশে।।’
স্ত্রীলোকদের আত্মীয় পুরুষগণের [অর্থাৎ পিতা, স্বামী, পুত্র প্রভৃতি যে সব পুরুষ স্ত্রীলোককে রাক্ষা করবার অধিকারী, তাদের] উচিত হবে না, দিন ও রাত্রির মধ্যে কোনও সময়ে স্ত্রীলোককে স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করতে দেওয়া [অর্থাৎ স্ত্রীলোকেরা যে নিজেদের ইচ্ছামতো ধর্ম, অর্থ ও কামে প্রবৃত্ত হবে তা হতে দেবে না]। স্ত্রীলোকেরা গান-বাজনা প্রভৃতি বিষয়ে আসক্ত হতে থাকলে তা থেকে তাদের নিবৃত্ত করে নিজের বশে রাখতে হবে। (৯/২)।
.
‘ইমং হি সর্ববর্ণানাং পশ্যন্তো ধর্মমুত্তমম্।
যতন্তে রক্ষিতুং ভার্যাং ভর্তারো দুর্বলা অপি।।’
স্ত্রীলোককে রক্ষণরূপ-ধর্ম সকল বর্ণের পক্ষে শ্রেষ্ঠ ধর্ম- অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ কর্তব্য। এই ব্যাপার বুঝে অন্ধ, পঙ্গু প্রভৃতি দুর্বল স্বামীরাও নিজ নিজ স্ত্রীকে রক্ষা করবার জন্য যত্ন করবে। (৯/৬)।

.
শাস্ত্রে উপদিষ্ট হয়েছে বলেই যে কেবল ভার্যাকে রক্ষা করা কর্তব্য, এমন নয়; স্ত্রীর দ্বারা নানারকম প্রয়োজন সাধিত হয় বলেও ঐ রক্ষণরূপ কাজ করা কর্তব্য-

‘স্বাং প্রসূতিং চরিত্রঞ্চ কুলমাত্মানমেব চ।
স্বঞ্চ ধর্মং প্রযত্নেন জায়াং রক্ষন্ হি রক্ষতি।।’
যে লোক যত্নের সাথে নিজের স্ত্রীকে রক্ষা করে, তার দ্বারা নিজ সন্তান রক্ষিত হয়। কারণ, সাঙ্কর্যাদি দোষ না থাকলে বিশুদ্ধ সন্তান-সন্ততি জন্মে। স্ত্রীকে রক্ষার দ্বারা শিষ্টাচার রক্ষিত হয় এবং নিজের কুলমর্যাদা রক্ষিত হয়। স্ত্রীকে রক্ষা করলে নিজেকেও রক্ষা করা হয় এবং স্ত্রীকে রক্ষা করলে স্বামী তার নিজের ধর্মকেও রক্ষা করতে পারে। (৯/৭)।

.
তাই, কিভাবে স্ত্রীকে রক্ষা করতে হবে তার উপায়ও মনু বাতলে দিয়েছেন-

‘ন কশ্চিদ্যোষিতঃ শক্তঃ প্রসহ্য পরিরক্ষিতুম্।
এতৈরুপায়যোগৈস্তু শক্যাস্তাঃ পরিরক্ষিতুম্।।’
স্ত্রীলোকসমূহকে কেউ বলপূর্বক বা সংরোধ বা তাড়নাদির দ্বারা রক্ষা করতে পারে না। কিন্তু বক্ষ্যমাণ উপায়গুলি অবলম্বন করলে তাদের রক্ষ করা যায়। (৯/১০)।

.
কী উপায় ?

‘অর্থস্য সংগ্রেহে চৈনাং ব্যয়ে চৈব নিযোজয়েৎ।
শৌচে ধর্মেহন্নপক্ত্যাঞ্চ পারিণাহ্যস্য বেক্ষণে।।’
টাকাকড়ি ঠিকমত হিসাব করে জমা রাখা এবং খরচ করা, গৃহ ও গৃহস্থালী শুদ্ধ রাখা, ধর্ম-কর্ম সমূহের আয়োজন করা, অন্নপাক করা এবং শয্যাসনাদির তত্ত্বাবধান করা- এই সব কাজে স্ত্রীলোকদের নিযুক্ত করে অন্যমনস্ক রাখবে। (৯/১১)।

.
তারপরও রক্ষক পুরুষ এই স্বভাবদুষ্ট নারীকে নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারে নি। কেননা নারীকে কখনো বিশ্বস্ত ভাবা হয় না। তাই স্বভাব অনুযায়ী নারীর অবিশ্বস্ত বা দূষিত হওয়ার আরো কিছু কল্পিত কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা থেকে নারীকে নিরস্ত করার ব্যবস্থা নিতে হয়-

‘পানং দুর্জনসংসর্গঃ পত্যা চ বিরহোহটনম্।
স্বপ্নোহন্যগেহবাসশ্চ নারীসংদূষণানি ষট্।।’
মদ্যপান, দুষ্ট লোকের সাথে মেলামেশা করা, স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ, যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো, অসময়ে ঘুমানো এবং পরের বাড়িতে বাস করা- এই ছয়টি বিষয় স্ত্রীলোককে দূষিত করে। (৯/১৩)।
.
‘অরক্ষিতা গৃহে রুদ্ধাঃ পুরুষৈরাপ্তকারিভিঃ।
আত্মানমাত্মনা যাস্তু রক্ষেয়ুস্তাঃ সুরক্ষিতাঃ।।’
যে স্ত্রী দুঃশীলতাহেতু নিজে আত্মরক্ষায় যত্নবতী না হয়, তাকে আপ্তপুরুষেরা গৃহমধ্যে অবরুদ্ধ করে রাখলেও সে অরক্ষিতা হয়; কিন্তু যারা সর্বদা আপনা-আপনি আত্মরক্ষায় তৎপর, কেউ তাদের রক্ষা না করলেও তারা সুরক্ষিতা হয়ে থাকে। (৯/১২)।

.
অতএব-

‘যাদৃশং ভজতে হি স্ত্রী সুতং সূতে তথাবিধম্।
তস্মাৎ প্রজাবিশুদ্ধ্যর্থং স্ত্রিয়ং রক্ষেৎ প্রযত্নতঃ।।’
যে পুরুষ শাস্ত্রবিহিত উপায়ে নিজের পতি হয়েছে এমন পুরুষকে যে স্ত্রীলোক সেবা করে, সে উৎকৃষ্ট সন্তান প্রসব করে; আর শাস্ত্রনিষিদ্ধ পরপুরুষ-সেবায় নিকৃষ্ট সন্তান লাভ হয়। সেই কারণে সন্তানের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য, সর্বপ্রযত্নে যাতে স্ত্রীর পরপুরুষ-সম্পর্ক না হয়, তার জন্য স্ত্রীকে সকল সময় রক্ষা করা কর্তব্য। (৯/৯)।

.
যাবতীয় দুষ্কর্মের ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে পুরুষই সব অঘটনের মূল ও সক্রিয়বাদী। তবু একপেশে পুরুষবাদে নারীকেই এর সমস্ত দায়ভাগ অন্যায়ভাবেই বহন করতে হয়। এক্ষেত্রে মনুশান্ত্র অন্ধ নয় অবশ্যই, দারুণরকম পক্ষপাতদুষ্ট ও আধিপত্যবাদী। ফলে সম্পত্তিসূচক স্ত্রীসংরক্ষণে প্রভুত্ববাদী মনুশাস্ত্র কখনোই হাল ছেড়ে দেয়নি তো বটেই, এবং একই কারণে স্ত্রীকে কোনরূপ প্রশ্ন উত্তাপনের সুযোগরহিত করে কেবল ভোগ্য থাকার নিমিত্তে নারীর কর্তব্যবিধান নির্দেশেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

(চলবে…)
[১ম পর্ব ] [২য় পর্ব ] [৩য় পর্ব] [৪র্থ পর্ব] [৫ম পর্ব ] [*] [৭ম পর্ব ]

[178 বার পঠিত]