অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা: হোমো গণের নতুন আত্মীয়

বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবচেয়ে নামী জার্নাল সায়েন্সের ৯ই সেপ্টেম্বর ২০১১ সংখ্যাটির প্রচ্ছদ জুড়ে ছিল একটি হাতের ছবি। সে কোন মানুষের হাত নয়, মানুষের সম্ভাব্য পূর্বপুরুষের। আদিম নরবানর থেকে আধুনিক মানুষের বিবর্তনের পথে অনেক অন্তর্বর্তীকালীন প্রজাতির উদ্ভব ঘটেছিল যাদের অধিকাংশই ডারউইনের তত্ত্ব মেনে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই বিলুপ্ত আত্মীয়দের জীবাশ্ম উদ্ধারের মাধ্যমেই আমরা আমাদের ইতিহাস উদঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সে ইতিহাস রচনায় আরেকটি অধ্যায় যোগ করল দক্ষিণ আফ্রিকায় পাওয়া ২০ লক্ষ বছরের পুরনো একটি জীবাশ্ম যার প্রজাতিকে বিজ্ঞানীরা অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা নামে আখ্যায়িত করেছেন। একটি জীবাশ্ম কিভাবে পুরো একটি জনগোষ্ঠীর জন্য গর্ব হয়ে উঠতে পারে তার দৃষ্টান্ত যেন এই সেডিবা। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ আবিষ্কারের শিহরণ বয়ে গেছে। আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য আশার কথা যে তারা মানব বিবর্তনের সূতিকাগার হিসেবে গর্ব করার পাশাপাশি মানবেতিহাস রচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়ার জন্যও গর্ব করতে পারে। আমাদের দেশে যেখানে কুসংস্কারের ভীড়ে বিবর্তনের ধারণা চাপা পড়ে যায় সেখানে ইথিওপিয়ার মানুষেরা আজও লুসি নিয়ে গর্ব করে ভেবে শান্তিই পাই।

অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা আবিষ্কার করেছেন জীবাশ্ম-নৃবিজ্ঞানী লি বার্গার। মার্কিন নাগরিক হয়ে তার দক্ষিণ আফ্রিকায় থেকে যাওয়ার কারণ মানুষের পূর্বপুরুষদের প্রতি টান কিনা তা নিশ্চিত জানি না, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তার অনুসন্ধিৎসা ও অধ্যাবসায় নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ প্রশ্ন করেনি। বার্গারের গবেষণা জীবনের প্রথম যুগ খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। কারণ তিনি অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস তথা লুসি-র যুগে দাবী করে বসেছিলেন, পূর্ব আফ্রিকা নয় বরং দক্ষিণ আফ্রিকাই মানব বিবর্তনের প্রকৃত সূতিকাগার। লুসির বদলে অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস-কে মানুষের পূর্বপুরুষ হিসেবে গুরুত্ব দেয়া এবং হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস-এর সমকক্ষ একটি প্রজাতি আবিষ্কারের ভুল দাবীর জন্য তিনি একসময় বেশ কুখ্যাতই হয়ে পড়েছিলেন। এই কুখ্যাতিই হয়ত তাকে আরও দৃঢ় সংকল্প করে থাকবে। কারণ তিনি খুচরো জীবাশ্মের খুচরো গবেষণায় অতিষ্ঠ হয়ে একসময় একটি মহা পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ফেলেন- জীবাশ্মের খনি-খ্যাত দক্ষিণ আফ্রিকার ক্র্যাডল অফ হিউম্যানকাইন্ড তথা “মানবজাতির সূতিকাগার”-এ হোমিনিন জীবাশ্ম সন্ধান।[1] জোহানেসবার্গের খানিকটা উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানে ২০০৮ সালে তিনি গুগল আর্থ দিয়ে গুহা সনাক্ত করা শুরু করেন।

লি বার্গার ও তার ৯ বছরের ছেলে ম্যাথিউ যে কিনা প্রথম মালাপা হোমিনিনটি খুঁজে পেয়েছিল। Credit: Ann Gibbons

সে বছরের মার্চের মধ্যে প্রায় ১০০টি নতুন গুহা পাওয়া যায়, জুলাইয়ের মধ্যে পাওয়া যায় আরও ৬০০টি। এগুলোরই একটি ছিল মালাপা গুহা। অনেকগুলো গুহা চুনাপাথরের খনি-শ্রমিকরা একেবারে তছনছ করে ফেললেও ভাগ্য ভাল যে মালাপা ছিল তুলনামূলক অক্ষত। অন্য আর কয়টি দিনের মতোই সে বছরের ১৫ই আগস্ট ৯ বছরের ছেলে ম্যাথিউ এবং কুকুর টাউকে নিয়ে জীবাশ্ম সন্ধানে বের হন বার্গার। এলাকা ভাগ করে দুজনে আলাদা আলাদাভাবে খুঁজতে শুরু করেন। একটু পরেই ছেলে চিৎকার করে বাবাকে বলে সে একটি জীবাশ্ম পেয়েছে। কথা শুনে বার্গার নিশ্চিত ছিলেন যে, ম্যাথিউ কোন কৃষ্ণসার মৃগের (অ্যান্টিলোপ) জীবাশ্ম পেয়েছে কারণ সেখানে প্রতিটি হোমিনিড জীবাশ্মের বিপরীতে কম করে হলেও হাজার খানেক কৃষ্ণসার মৃগের জীবাশ্ম পাওয়া যায়। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখেন এক খণ্ড পাথরের গায়ে আটকে আছে একটি হোমিনিড অক্ষকাস্থি (ক্ল্যাভিকল বা কলার বোন)। এ ধরণের হোমিনিড হাড় খুবই বিরল, সব মিলিয়ে কয়েক ডজন পাওয়া গেছে, কিন্তু বার্গারের তা সনাক্ত করতে একটুও কষ্ট হয়নি কারণ এটাই ছিল তার পিএইচডি গবেষণার বিষয়। পাথরটি উল্টিয়ে অন্য পাশে পেয়ে যান চোয়াল এবং শ্বদন্ত। সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখ তারা ১৪ জন মিলে ফিরে যান মালাপা গুহায় এবং প্রথমে আড়াই ঘণ্টা খুঁজেও কিছু পান না। কিন্তু তারপরই দেখা মিলে একটি প্রক্সিমাল হিউমার এবং স্ক্যাপুলার।[2]

আফ্রিকার যে স্থানগুলোতে আদি হোমিনিন দের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে: মালাপা, স্টার্কফন্টেইন, সোয়ার্টক্রান্স, হাডার, ওলদুভাই। Credit: Ann Gibbons

মানব বিবর্তন গবেষণার ইতিহাসে এর স্থান খুঁজে পেতে হলে আরেকটু পেছন থেকে শুরু করতে হবে। ১৯২৪ সালে রেমন্ড ডার্ট দক্ষিণ আফ্রিকার টং শহরের নিকটে একটি শিশুর জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছিলেন যার জনপ্রিয় নাম হয়েছিল টং শিশু আর বৈজ্ঞানিক নাম অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস। অস্ট্রালোপিথেকাস শব্দের অর্থই হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলীয় নরবানর। এরপর সেদেশেরই স্টার্কফন্টেইন এবং মাকাপান্সগাট থেকে আফ্রিকানাসের আরও জীবাশ্ম উদ্ধার করা হয় যাদের বয়স ছিল ৩০ থেকে ২০ লক্ষ বছরের মধ্যে। অপেক্ষাকৃত নবীন স্বাস্থবান অস্ট্রালোপিথ-সদৃশদের পাওয়া গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। আর স্টার্কফন্টেইনের লিটল ফুট খ্যাত জীবাশ্মের প্রজাতি তো এখনও সনাক্ত করা যায়নি। যাহোক দক্ষিণ আফ্রিকার এত সব জীবাশ্ম দেখে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন অ. আফ্রিকানাস আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ। কিন্তু ইথিওপিয়ার হাডার থেকে ৩২ লক্ষ বছরের পুরনো লুসি এবং একই স্থান থেকে ২৩ লক্ষ বছরের পুরনো হোমো গণের একটি চোয়াল উদ্ধারের পর দক্ষিণের বদলে পূর্ব আফ্রিকার আধুনিক মানুষের সূতিকাগার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তবে ৩২ থেকে ২৩ লক্ষ বছরের মাঝে যা ঘটেছিল তার কোন নিদর্শনই পাওয়া যায়নি।[3]

এমনই একটি পরিস্থিতিতে স্টার্কফন্টেইন ও সোয়ার্টক্রান্স জীবাশ্মস্থানের মাত্র ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে পাওয়া গেল মালাপা জীবাশ্মগুলো। এখন পর্যন্ত চারটি হোমিনিডের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে:
১। ১২-১৩ বছর বয়সী একটি ছেলের আংশিক খুলি ও কঙ্কাল (মাহো১)
২। বয়ষ্ক একজন নারীর আংশিক কঙ্কাল (মাহো২)
৩। ১৮ মাস বয়সী একটি শিশু
৪। আরেকজন বয়ষ্ক মানব
মাহো দ্বারা বোঝানো হয়েছে মালাপা হোমিনিন। মাহো কেবল নয় সকল জীবাশ্মের খুটিনাটি ব্যাখ্যার আগে বিজ্ঞানীরা সাধারণত প্রেক্ষাপটটা ঠিক করে নেন- কখন কিভাবে কেমন স্থানে এই হোমিনিডগুলো মারা গিয়েছিল, কিভাবে তাদের দেহ সংরক্ষিত হয়ে জীবাশ্মে পরিণত হল আর তাদের বয়সই বা কিভাবে নির্ণয় করা হয়েছে?

ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট ও বয়স নির্ণয়

মালাপা গুহা একেবারে প্রাগৈতিহাসিক কালের, গঠিত হয়েছে প্রায় আড়াই শত কোটি বছর পূর্বে। পরবর্তীতে এর ভেতরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জমা হয়েছে অনেক পলি, জন্ম হয়েছে কিছু বিচ্ছিন্ন শিলাখণ্ডের (Facies)। বর্তমানে মালাপা গুহায় এমন পাঁচটি শিলাখণ্ড চিহ্নিত করা হয়েছে এ, বি, সি, ডি, ই এবং এফ নামে। ডি শিলাখণ্ডে সেডিবার জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। ই-তেও কিছু হোমিনিনের অবশেষ ছিল। যে শিলাখণ্ডে জীবাশ্মগুলো আটকে ছিল তা বেশ ভোঁতা, আর জীবাশ্মগুলো এত ভালভাবে সংরক্ষিত যে একটি আরেকটির সাথে খুব সুন্দরভাবে মিলে যায়। এসব দেখে বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন যে, এরা আলাদা আলাদাভাবে এই গুহায় এসে পড়েনি, বরং একইসাথে কোন বড় আকারের ঢলের মাধ্যমে এখানে পতিত হয়েছে। কিভাবে ব্যাপারটি ঘটেছে তা নিয়েও একটি বাস্তবসম্মত অনুকল্প প্রস্তাব করেছেন ভূতাত্ত্বিক পল ডার্কস যা নিচের ছবিতে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে:

Credit: Paul Dirks et al. 2011

গুহাটি তখন মাটির অনেক গভীরে ছিল, একেবারে ভূগর্ভস্থ পানির সমতলে। এই পানি বেয়ে বেয়ে বাম পাশের ঝর্ণাটির মাধ্যমে অবমুক্ত হতো। একই পানি আবার মাটি চুইয়ে চুইয়ে টিলার উপরে উঠে আসতো যার গন্ধে এখানে ভীড় জমতো অনেক হতভাগা প্রাণীর। এদেরই একজন ছিল আমাদের আবিষ্কৃত মালাপা হোমিনিনরা। তারা পানির সন্ধানে ডানের মরণ ফাঁদটির কাছে এসে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যায় নিচের খাদে যা রিক্ত অঞ্চলের সমতলে অবস্থিত। ভূগোলককে তিন ভাগ করা যায়: সবার ভেতরের অংশটি কোর বা কেন্দ্রভাগ, তার উপরে ম্যান্টল এবং সবার উপরে ভূত্বক। ম্যান্টলের উপরিভাগ এবং ভূত্বকের সংযোগস্থলকে বলা হয় রিক্ত (shear) অঞ্চল। ফাঁদে পড়ে হয়ত তারা মারা গিয়েছিল, বেঁচে থাকলেও গুহা থেকে উঠে আসা ছিল অসম্ভব। মোটকথা এখানেই তাদের মৃত্যু ঘটে। তাদের মৃতদেহ বা জীবাশ্ম পরবর্তীতে আরও অনেক জীবাশ্মের সাথে কোন বড় আকারের ঢলে আরও নিচে চলে যায়। এভাবেই বর্তমান মালাপা গুহাস্থানে সংরক্ষিত হয়ে থাকে তারা। উল্লেখ্য এই গুহায় হোমিনিন ছাড়াও আরও অনেক প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, মাংসাশী প্রাণীরা গলিত লাশের গন্ধেই এই অঞ্চলের কাছে আসতো আর ফাঁদে পড়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যেতো।

বর্তমানে মালাপা গুহাস্থান মাটির মধ্যে কয়েক মিটার গভীর একটি গর্ত কেবল। গুহামুখের উপরের পুরো টিলাটির কিভাবে ক্ষয় ঘটল সেটি নির্ণয় করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা খুবই চতুর এক পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন যার নাম নভোজাত বয়স নির্ণয় পদ্ধতি। মহাকাশের বিভিন্ন স্থান থেকে পৃথিবীতে অবিরত অসংখ্য নভোরশ্মি আসে। এরা মূলত প্রোটন এবং হিলিয়াম কেন্দ্রীন (আলফা কণা) হলেও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর বিভিন্ন কণার সাথে সংঘর্ষের কারণে শক্তি হারাতে থাকে। ভূপৃষ্ঠে যখন পৌঁছায় তখন কেবল অবশিষ্ট থাকে নিউট্রন। এসব নিউট্রন শিলা ও পাথরকে আঘাত করে তার মধ্যকার পরমাণুর প্রোটন বা নিউট্রন সরিয়ে নিতে পারে যার ফলে জন্ম হয় অপেক্ষাকৃত হালকা নতুন একটি মৌলের যাকে পূর্বতন মৌলের আইসোটোপ বলে। সুতরাং কোন শিলা যত বেশিদিন নভোরশ্মির আক্রমণের শিকার হবে তার পৃষ্ঠ তত ক্ষয়ে যেতে থাকবে। শিলা পরীক্ষা করে সে কতকাল নভোরশ্মির নির্যাতন সহ্য করেছে তা যেমন নির্ণয় করা সম্ভব তেমনি তার ক্ষয়ের হারও জানা সম্ভব। আর ক্ষয়ের হার জানলে একটি নির্দিষ্টকাল পূর্বে সে কতটুকু পুরু ছিল তা পরিমাপ করা সম্ভব। মালাপা গুহাস্থানের বর্তমান প্রস্তর ও শিলায় হালকা আইসোটোপ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের ক্ষয়ের হার নির্ণয় করা হয়েছে। এভাবে জানা গেছে ২০ লক্ষ বছর পূর্বে গুহাটি মাটির ৩০ থেকে ৫০ মিটার গভীরে ছিল।[4]

মালাপা জীবাশ্মস্থান। Robyn Pickering, Paul Dirks et al. 2011

মালাপা হোমিনিন (মাহো) যে শিলাখণ্ডে (ফেসিস) পাওয়া গেছে এবং সে স্তরে অন্য যে সকল প্রাণী বা উদ্ভিদের হদিশ মিলেছে তা বিশ্লেষণ করতে পারলে হোমিনিনদের বয়স নির্ণয়ের পথে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া যায়। উপরের ছবিতে মালাপা গুহাস্থান এবং তার প্রতিবেশ দেখানো হয়েছে। ছয়টি শিলাখণ্ড পৃথক পৃথক রঙ দ্বারা রাঙানো হয়েছে। দেখা যাচ্ছে বেলে পাথর, স্রোতপ্রস্তর, পলির স্তরগুলো। ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থ তার নিজের অভিকর্ষজ টান বা কোন তরল পদার্থের ঢলের কারণে নিচু কোন জায়গায় পতিত হলে তৈরি হয় পলি। আর কোন গুহার গা বেয়ে তরল পদার্থ প্রবাহিত হলে তাতে ক্যালসাইট জাতীয় পদার্থের যে আস্তরণ পড়ে তাকে বলে স্রোতপ্রস্তর বা ফ্লোস্টোন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ডি শিলাখণ্ডে, যেখানে সেডিবা প্রজাতির বয়ষ্ক নারী ও কিশোরের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, তার ঠিক নিচেই স্রোতপ্রস্তরের আস্তরণ আছে। এর উপরে আবার ডাইনোফেলিস নামের একটি অধুনা বিলুপ্ত প্রজাতির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। পলি, স্রোতপ্রস্তর এবং প্রতিবেশের অন্যান্য প্রাণীর উপর নির্ভর করে অন্তত তিনটি পদ্ধতির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পৃথক পৃথকভাবে মালাপা হোমিনিনদের বয়স নির্ণয় করেছেন।

প্রথমত, ডি এবং ই শিলাখণ্ড থেকে ২০৯টি জীবাশ্ম পাওয়া গেছে যারা হোমিনিন নয়। এর মধ্যে ছিল অধুনাবিলুপ্ত ঘোড়া আকৃতির একটি প্রাণী (Equus) এবং আফ্রিকার বুনো কুকুর সদৃশ একটি প্রজাতি। আফ্রিকায় এই প্রজাতিগুলোর প্রথম উদ্ভব ঘটেছিল ২৩.৬ লক্ষ বছর পূর্বে। ওদিকে আবার পাওয়া গেছে আধুনিক বিড়ালদের প্রাচীন আত্মীয় প্রজাতি যারা আনুমানিক ১৫ লক্ষ বছর পূর্বে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এই সবগুলো জীবাশ্ম যেহেতু হোমিনিনদের সাথেই পাওয়া গেছে সেহেতু নিশ্চিত করে বলা যায় এরা একই সময়ে বাস করতো। আর সেটি সত্য হলে আমরা প্রাথমিকভাবে বলতে পারি অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা ২৩ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ বছর পূর্বের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাস করতো।

দ্বিতীয়ত, সি ও ডি শিলাখণ্ডের ১০-২০ সেন্টিমিটার নিচে যে স্রোতপ্রস্তর আছে ইউরেনিয়াম-সীসা পদ্ধতি দিয়ে তার বয়স নির্ণয়ের জন্য দুটি পৃথক পৃথক গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছিল, একটি সুইৎজারল্যান্ডের বার্নে এবং অন্যটি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে। এক গবেষণাগারের ফলাফল অন্যটিকে জানতে দেয়া হয়নি। উভয়েই ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে সীসায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ভিত্তি করে বয়স নির্ণয় করেছে। ইউরেনিয়াম থেকে কোন কোন পদার্থ গঠিত হতে পারে, এই তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের হার কেমন এবং বর্তমানে আলোচ্য শিলায় উৎপাদ পদার্থগুলোর পরিমাণ কত- এই কয়টি তথ্য জানলে সহজেই বের করে ফেলা যায় এই পরিমাণ পদার্থ উৎপন্ন করতে ইউরেনিয়ামের কত বছর সময় লেগেছে। সেই সূত্র ধরেই বার্ন মালাপা স্রোতপ্রস্তরের বয়স বলেছে ২০.২৪ লক্ষ, আর মেলবোর্ন বলেছে ২০.২১ লক্ষ। বিজ্ঞানীরা তাই নিশ্চিত হয়ে যান যে, সেডিবার সদস্যরা যেহেতু স্রোতপ্রস্তরের একটু উপরে আছে সেহেতু তাদের বয়স ২০ লক্ষ বছর থেকে একটু কম হবে।

তৃতীয়ত, সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য মালাপা হোমিনিনদের নিচের স্রোতপ্রস্তর এবং আশপাশের পলিমাটির বয়স জীবাশ্ম-চুম্বকত্ব বিশ্লেষণের মাধ্যমে আবার নির্ণয় করা হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে একের উপর আরেকটি শিলার স্তর জমা হয়। সুতরাং নিচের শিলাস্তরটি উপরেরটির তুলনায় আগে গঠিত হয়েছে। ওদিকে আবার পৃথিবীর চৌম্বক মেরুর দিক সময় সময় পরিবর্তিত হয়। বর্তমানে চৌম্বক উত্তর মেরু ভৌগলিক উত্তর মেরুর দিকেই আছে। কিন্তু সবসময় এমন ছিল না। মাঝেমাঝে স্বল্প সময়ের জন্য এটি একেবারে উল্টো হয়ে যেতো, চৌম্বক উত্তর মেরু চলে যেত ভৌগলিক দক্ষিণ মেরুর দিকে আর চৌম্বক দক্ষিণ ভৌগলিক উত্তরের দিকে। এমন মেরু-বিপর্যাস শেষবার ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ৭ লক্ষ ৮০ হাজার বছর পূর্বে। মেরু বিপর্যাসের সময় যেসব শিলা স্তর গঠিত হয় তাদের মধ্যে এই বিপর্যাসের চিহ্ন রয়ে যায়। বর্তমানে কোন শিলার মধ্যে যদি এমন বিপর্যাসের চিহ্ন পাওয়া যায় তাহলে সে কবে গঠিত হয়েছিল তা বলে দেয়া সম্ভব, কারণ আমরা পৃথিবীর চৌম্বক মেরু বিপর্যাসের ইতিহাস জানি। এই হিসাব থেকে দেখা গেছে স্রোতপ্রস্তরের স্তরে চৌম্বক বিপর্যাসের চিহ্ন থাকলেও তার নিচের অংশে (লাল স্তর) বর্তমানের মত স্বাভাবিক মেরুধর্মিতা দেখা যায়। এই স্বাভাবিক মেরুধর্মিতাটি আজ থেকে ২০.৬ লক্ষ বছর পূর্বের সময়কে নির্দেশ করে। স্রোতপ্রস্তরের উপরে অবস্থিত সি, ডি এবং ই শিলাখণ্ডের মেরুধর্মিতা স্বাভাবিক যা ১৯.৫ থেকে ১৭.৮ লক্ষ বছর পূর্বের একটি সময়কে নির্দেশ করে।[5]

মালাপা হোমিনিন জীবাশ্মসমূহের বর্ণনা

একেকটি নতুন জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদেরকে মানব বিবর্তনের খুটিনাটি বিষয়গুলো ঝালিয়ে নিতে এবং কোন বাস্তবতার ব্যাখ্যায় নতুন অনুকল্প হাজির বা পুরনো অনুকল্প প্রমাণ করতে সাহায্য করে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে তা সাহায্য করে বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি প্রত্যক্ষ করতে। অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা আধুনিক মানুষ এবং প্রাচীন নরবানরদের সংমিশ্রণের আরেকটি চমৎকার উদাহরণ। এর পায়ের পাতা যেখানে হুবহু অধুনাবিলুপ্ত নরবানরদের মত, গোঁড়ালির সন্ধি সেখানে অনেকটাই আধুনিক মানুষের মত। এছাড়া তার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক, লম্বা বাহু, শিম্পাঞ্জি আকারের দেহ এবং সরু জন্মনালি সবই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নরবানরদের মত। অন্যদিকে ছোট ছোট আঙুল, শক্তভাবে কিছু আঁকড়ে ধরার উপযোগী লম্বা তালু এবং মস্তিষ্কের পুনর্বিন্যাস আধুনিক মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বৈশিষ্ট্যের এই মেলবন্ধনের দিকে ইঙ্গিত করে লি বার্গার দাবী করেছেন, সেডিবা শেষ অস্ট্রালোপিথসদৃশদের একটি। এমনকি হয়ত এটিই সেই প্রজাতি যা আফ্রিকায় হোমো গণের জন্ম দিয়েছিল। সেক্ষেত্রে সে আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ। কিন্তু নিশ্চিত কিছু বলার সময় এখনও আসেনি, বিতর্ক এবং আলোচনা-সমালোচনা কেবল শুরু হয়েছে। তবে ফলাফল যাই হোক মালাপা হোমিনিনদের গবেষণা বিবর্তনে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়ে থাকবে যেহেতু এর জীবাশ্ম ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূর্ণ, ২০ থেকে ৩০ লক্ষ বছর পূর্বের যে সময়টিতে জীবাশ্মের ঘাটতি রয়েছে ঠিক সে সময়েই এদের বাস, যখন আবার আফ্রিকায় অস্ট্রালোপিথসদৃশরা বিলুপ্ত হয়ে হোমো-দের উদ্ভব ঘটেছিল, সূচিত হয়েছিল মানব জন্মের প্রক্রিয়া। এজন্যই মাহো-দের মস্তিষ্ক, হাত, শ্রোণীচক্র, পায়ের পাতা এবং গোঁড়ালি প্রতিটি অংশের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ জরুরী হয়ে পড়েছে।

মস্তিষ্ক

মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তনের ইতিহাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় আছে- প্রথমত, মস্তিষ্কের শ্বেত পদার্থের বহিরাবরণ তথা কর্টেক্সের পুনর্বিন্যাস এবং দ্বিতীয়ত, মস্তিষ্কের সামগ্রিক আকার বৃদ্ধি। কর্টেক্স আমাদের মস্তিষ্কের সবচেয়ে বাইরের স্তর যা চিন্তা, চেতনা, ভাষা, স্মৃতি এবং মনোযোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে কোন প্রাণী বিশেষ একটি কাজে অপেক্ষাকৃত বেশি দক্ষতা অর্জন করতে পারে। অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস-দের মস্তিষ্কের গড় আকার ৪৫৯-৪৮২ ঘনসেন্টিমিটার (সিসি)। শক্তিশালী গড়নের অস্ট্রালোপিথদের ক্ষেত্রে এই আকার বেশ ছোট, ৪১০ সিসি, অথচ অপেক্ষাকৃত নবীন প্রজাতি যেমন প্যারানথ্রোপাস-দের ক্ষেত্রে এটি ৪৮৫-৪৯৩ সিসি। এই উপাত্ত দেখেই বিখ্যাত মার্কিন নৃবিজ্ঞানী ডিন ফক বলেছিলেন, অস্ট্রালোপিথদের মস্তিষ্কের আকার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে পেতে এক সময় উদ্ভব ঘটে হোমো গণের। কর্টেক্সের পুনর্বিন্যাসও হয়ত হোমো গণের উদ্ভবের আগে শুরু হয়ে থাকবে, তবে আকার বৃদ্ধি আগে ঘটেছিল। কিন্তু মাহো১ নামধারী কিশোরের খুলির জীবাশ্ম অন্য কথা বলছে।

মাহো১ এর মাথার খুলিটি ১৯.৭৭ লক্ষ বছরের পুরনো। মৃত্যুর সময় তার বয়স ১২-১৩ বছর হলেও তৃতীয় পেষক দন্তের উপস্থিতি প্রমাণ করে, তখন তার মস্তিষ্কের গঠন পরিপূর্ণ ছিল। গবেষণার সুবিধার্থে প্রথমেই সিটি (কম্পিউটেড টমোগ্রাফি) স্ক্যানের মাধ্যমে এর একটি অন্তঃছাঁচ (endocast) তৈরি করা হয়েছে। সেখান থেকে তার মস্তিষ্কের আয়তন পাওয়া গেছে মাত্র ৪২০ সিসি যা আফ্রিকানাসদের গড় আয়তন থেকে বেশ কম। সকল অস্ট্রালোপিথদের মস্তিষ্কের আকার তুলনা করলে সেডিবা একেবারে নিচের দিকে থাকবে। সেডিবা বয়সে নবীন অথচ মস্তিষ্কের আকারে ছোট- এ থেকে মনে হয় অস্ট্রালোপিথদের মস্তিষ্কের আকার হোমো-দের উদ্ভবের অনেক আগে থেকে বৃদ্ধি পাচ্ছিল- কথাটি সঠিক নয়। ওদিকে আবার আরেক সমস্যা হচ্ছে মস্তিষ্কের আকার ছোট হওয়া সত্ত্বেও হোমো গণের প্রজাতিদের সাথে তার এমন কিছু দৈহিক মিল আছে যা পূর্বের অস্ট্রালোপিথদের ছিল না, বিশেষত উন্নত শ্রোণীচক্র এবং আঁকড়ে ধরার উপযোগী হাত। প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্বাচনী চাপ হয়ত তাদের উপর কাজ করেছিল, কিন্তু সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হবে- হয়ত মস্তিষ্কের আকার এক রেখেই কর্টেক্সের পুনর্বিন্যাস শুরু হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ পুনর্বিন্যাস আকার বৃদ্ধির পরে নয় বরং আগে ঘটেছিল।

গাঢ় নীল রঙ দিয়ে স্ফীত ইনফেরিয়র ফ্রন্টাল জাইরাস দেখানো হয়েছে। Credit: Ann Gibbons

অস্ট্রালোপিথদের গড় মস্তিষ্কের চেয়ে ছোট আকারের হওয়া সত্ত্বেও সেডিবার মস্তিষ্কে এমন দুটি বিন্যাস লক্ষ্য করা যায় যার সাথে আধুনিক মানব মস্তিষ্কের মিল স্পষ্ট। মস্তিষ্ক দুই ভাগে বিভক্ত যার প্রতিটিকে একটি গুরুগোলার্ধ (cerebral hemisphere) বলা হয়। প্রতিটি গুরুগোলার্ধের সম্মুখভাগে অর্থাৎ কপালের ঠিক পেছনে যে অংশটি থাকে তার নাম ফ্রন্টাল লোব। মানুষের ডান ফ্রন্টাল লোব বামেরটি থেকে বড় যাকে অনেক সময় অধিকাংশ মানুষের ডানহাতি হওয়ার কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অস্ট্রালোপিথ বা প্রাচীন নরবানরদের ক্ষেত্রে এমন বৈষম্য লক্ষ্য করা না গেলেও মাহো১ এর মস্তিষ্কে মানুষের মতোই বাম ফ্রন্টাল লোবের চেয়ে ডানেরটি বড়। দ্বিতীয়ত, মাহো১ এর মস্তিষ্কের ইনফেরিয়র ফ্রন্টাল জাইরাসে (উপরের ছবিতে স্থানটি চিহ্নিত করা আছে) একটি ছোট স্ফীতি লক্ষ্যণীয়। এই স্ফীতি প্রমাণ করে সেডিবাদের মস্তিষ্কের এই অংশে বেশি বেশি নিউরন জড়ো হয়ে পরষ্পরের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছিল। উল্লেখ্য এ অংশটি আবার সামাজিক আচার-ব্যবহার এবং ভাষার বিকাশের সাথে সম্পর্কিত।[6]

হাত

মানুষের এতো উন্নত হওয়ার পেছনে হাতের একটি বিশেষ অবদান ছিল। অনেক আগেই দুই পায়ে হাঁটতে শেখার কারণে আমাদের পূর্বসূরীদের হাত মুক্ত হয়ে যায়। চলনের কাজ থেকে এই মুক্তির পর হাত দিয়ে তাই মানুষ কোনকিছু আঁকড়ে ধরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার সবই করতে শুরু করে। এক সময় এই হাত দিয়েই শুরু হয় অস্ত্র নির্মাণ। অস্ত্র নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা মস্তিষ্ক বৃদ্ধির জন্য একটি নির্বাচনী চাপ হিসেবেও কাজ করে থাকতে পারে। এজন্য হাতের বিবর্তন বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে হাতের জীবাশ্ম খুব বিরল, কারণ অঙ্গটি খুব একটা শক্তপোক্ত নয়। ২০ লক্ষ বছর পূর্বে বিচরণরত অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা প্রজাতির সদস্য মাহো২-এর হাত তাই মানব বিবর্তন গবেষণায় একটি যুগান্তকারী সংযোজন। পূর্ণবয়স্ক নারী মাহো২ এর ডান হাতের প্রায় পুরোটাই পাওয়া গেছে, মিলেছে বাম হাতেরও কিছু হাড়। এই জীবাশ্মে বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করা গেল, তার বাহু অনেক লম্বা যা তাকে গাছে গাছে ঝুলে বেড়াতে সাহায্য করতো, কিন্তু ওদিকে আবার আঙুল আমাদের মতই ছোট এবং তালু অনেক লম্বা যার সাহায্যে সে শক্তভাবে কোনকিছু আঁকড়ে ধরতে পারতো। বলা যায় না, হয়ত ছোট ছোট কার্যকর হাত আর লম্বা তালুর সহায়তায় পাথরের অস্ত্রও বানাতে শুরু করেছিল সে।

সেডিবার বাহু আদিম নরবানরদের মত অনেক লম্বা হলেও আমাদের মত হাতের আঙুল ছোট এবং তালু লম্বা। Credit: Ann Gibbons

বর্তমানে ধারণা করা হয়, মানব হাতের বিবর্তনের ইতিহাসে তিনটি অধ্যায় রয়েছে।

প্রথম অধ্যায় ৩০ লক্ষ বছর পূর্বে শেষ হয় যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস-দের হাত। সে সময়কার হাতে বৃক্ষনির্ভর কার্যকলাপের ছাপ কমতে শুরু করে। গাছ থেকে গাছে ঝুলে বেড়াতে চাইলে অনেক লম্বা ও বক্র আঙুল লাগে, লাগে লম্বা বাহু। এক্ষেত্রে তালু ও আঙুলের দৈর্ঘ্যের অনুপাত একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। যার দেহে অনুপাতটি যত কম সে তত বেশি বৃক্ষনির্ভর। এই অধ্যায়ের হোমিনিনদের আঙুল লম্বা ও বক্র হলেও তালু তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ হতে শুরু করেছিল, অর্থাৎ অনুপাতটি বাড়তে শুরু করেছিল। এ সময়কার হাতের সাথে মাহো২-এর হাতের মিলটি হচ্ছে কার্পোমেটাকার্পাল সন্ধিতে। আমাদের তালুতে রয়েছে ৫টি মেটাকার্পাল অস্থি এবং কব্জিতে ৫টি কার্পাল অস্থি। মেটাকার্পালের প্রতিটি অস্থি কার্পালের অস্থিগুলোর সাথে যে সন্ধি দিয়ে আবদ্ধ তারই নাম কার্পোমেটাকার্পাল অস্থিসন্ধি।

দ্বিতীয় অধ্যায় ৩০ লক্ষ বছর পূর্ব থেকে শুরু করে ১৫ লক্ষ বছর পূর্ব পর্যন্ত যার উদাহরণ অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাসদের হাত। এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ হাতের জীবাশ্মটিও এ যুগের, তানজানিয়ার ওলদুভাই থেকে পাওয়া ওলদুভাই হোমিনিন ৭ যাকে হোমো হ্যাবিলিস প্রজাতির সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের হাতে তালু-আঙুল অনুপাত বেশ বড়, মানুষের কাছাকাছি, আর মেটাকার্পাল হাড়গুলো অপেক্ষাকৃত শক্ত। অর্থাৎ তাদের তালু একইসাথে শক্ত ও লম্বা ছিল যা যন্ত্রপাতি ও অস্ত্র নির্মাণ ও ব্যবহারের জন্য উপযোগী। মাহো২-এর তালু-আঙুল অনুপাত এদের সমান এবং তার হাতের মাংসপেশীও অস্ত্র নির্মাণ ও ব্যবহারের উপযোগী। তবে এসব হাতেও বৃক্ষবাসী হাতের যে কিছুটা ছাপ রয়ে যায়, মাহো২ যার ব্যতিক্রম নয়।

তৃতীয় অধ্যায় ১৫ লক্ষ বছরের পর থেকে শুরু হয় ৮ লক্ষ বছর পূর্বে অনেকটা পরিপূর্ণতা পায়। এ সময়খার হাতে বৃক্ষবাসের প্রায় সব চিহ্নই লোপ পায়, পরতে পরতে স্পষ্ট হয়ে উঠে পাথরের যন্ত্রপাতি নির্মাণের ছাপ। মাহো২-এর কব্জির হাড়ের বিন্যাস অনেকটাই এই অধ্যায়ের হোমোদের মত, তালু-আঙুল অনুপাতও বেশ কাছাকাছি। কিন্তু ওদিকে আবার লম্বা বাহু দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় সেডিবা প্রজাতির সদস্যরা বৃক্ষবাস পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে পাথরের যন্ত্রনির্ভর জীবন শুরু করেনি।

এজন্যই বিজ্ঞানীরা ভাবছেন হাতের বিবর্তনের এই সরলরৈখিক ত্রিখণ্ডিত চিত্র সেডিবার বদৌলতে কিছুটা পরিমার্জিত হতে পারে। কারণ, সে বলছে তৃতীয় অধ্যায়ের কিছু বৈশিষ্ট্য ২০ লক্ষ বছর আগে তথা দ্বিতীয় অধ্যায়ের যুগেই এসে গিয়েছিল। তাছাড়া বৃক্ষবাস এবং পাথরের অস্ত্র নির্মাণ একইসাথে কতোটা দক্ষতার সাথে করা সম্ভব সে নিয়েও এখন আমাদের জ্ঞান এক ধাপ অগ্রসর হবে।[7]

শ্রোণীচক্র

গত ৪০ লক্ষ বছর ধরে অস্ট্রালোপিথেকাস থেকে হোমো গণের বিভিন্ন প্রজাতির শ্রোণীচক্রের যে বিবর্তন ঘটেছে তার সাথে নিবিঢ় সম্পর্ক রয়েছে দ্বিপদী চলন এবং দেহের তুলনায় মস্তিষ্কের ভরের। যে প্রাণীর মস্তিষ্ক এবং দেহের ভরের অনুপাত যত বেশি সে তত বুদ্ধিমান। শ্রোণীচক্রের সাথে এর সম্পর্ক আছে কারণ, নারীর শ্রোণীচক্রেই থাকে জন্মনালী যার সাহায্যে সে সন্তান প্রসব করে। জন্মনালী অপেক্ষাকৃত বড় হওয়ার অর্থ হচ্ছে সে অপেক্ষাকৃত বড় মস্তিষ্কবিশিষ্ট সন্তান প্রসব করতে পারে। এতোদিন অস্ট্রালোপিথেকাস এবং হোমো গণের সদস্যদের শ্রোণীচক্রের পার্থক্য নিরুপণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ছিল ইথিওপিয়ার গোনা থেকে পাওয়া একটি শ্রোণীচক্র।[8] কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এটি অস্ট্রালোপিথ নাকি হোমো তা জানা যায়নি আজ অবধি। শ্রেণীবিন্যাসের অসুবিধার কারণে প্রাণবৃক্ষে তার অবস্থান রয়ে গেছে অনিশ্চিত যদিও আমরা জানি সে ৯ থেকে ১৪ লক্ষ বছর পূর্বের। এবার অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবার দুটি জীবাশ্ম (মাহো১, মাহো২) এগিয়ে এল আমাদের দ্বিধা দ্বন্দ্বের কিছুটা নিরসন ঘটাতে।

সেডিবাদের মস্তিষ্কের আকার অনেক ছোট হলেও তারা অস্ট্রালোপিথ থেকে হোমো গণে বিবর্তনের ক্রান্তিকালে বাস করতো। তাদের ইলিয়াম দুটো অপেক্ষাকৃত উল্লম্ব এবং মানুষের মতোই এস আকৃতির, লুসির মত নয়। উল্লেখ্য শ্রোণীচক্রে দুই পাশের দুটো ব্লেড আকৃতির বড় অস্থিকে বলে ইলিয়াম, মাঝের সংযোগ স্থাপনকারী অস্থিটির নাম স্যাক্রাম, আর নিচের অর্ধবৃত্তাকার অস্থি ইস্কিয়াম। ইস্কিয়াম এবং ইলিয়ামের মাঝে অবতল অংশটি হচ্ছে অ্যাসিটাবুলাম যার অপর নাম হিপ সকেট। কারণ পায়ের বড় অস্থি ফিমার এই অ্যাসিটাবুলামের মধ্যেমেই পুরো দেহের সাথে সংযুক্ত হয়। সেডিবাদের অ্যাসিটাবুলামের ব্যাস হোমো নয় বরং অস্ট্রালোপিথদের মত। সরু জন্মনালী এবং পেলভিস ও স্যাক্রামের সন্ধির ছোট আকারও অস্ট্রালোপিথদের কথা মনে করিয়ে দেয়। এতোদিন ধারণা করা হয়ে আসছে বড় মস্তিষ্কের সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য যে বড় জন্মনালীর প্রয়োজন হতো তাই শ্রোণীচক্রের পুনর্বিন্যাস ঘটিয়েছে। কিন্তু সেডিবার জন্মনালী ছোট হওয়া সত্ত্বেও ইলিয়ামের বিন্যাস হোমোদের মত। হয়ত, বড় মস্তিষ্কের সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে নয় বরং দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে গিয়েই শ্রোণীচক্রের পুনর্বিন্যাস ঘটেছে।

অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস (বামে) এর শ্রোণীচক্রের ইলিয়াম দুটো অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত এবং দুপাশে ছড়ানো। কিন্তু সেডিবার (ডানে) ইলিয়াম উল্লম্ব এবং মানুষের মত এস আকৃতির, এ ধরণের ইলিয়াম দ্বিপদী চলনের জন্য বেশি উপযোগী। Credit: Job Kibii, Steven Churchill et al. 2011

সেডিবার আবিষ্কারক ও গবেষকরা শ্রোণীচক্রের পুনর্বিন্যাসের কারণ হিসেবে দ্বিপদী চলন অথবা মস্তিষ্কের আকার দুটোর যেকোন একটিকে আখ্যায়িত করতে চাচ্ছেন। সেডিবা অবশ্যই দ্বিপদী চলনকে বেশি সমর্থন করে। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, একটি গ্রহন করে আরেকটি পুরোপুরি বাতিল করে দেয়ার কোন কারণ নেই। একইসাথে দুটো বিষয়ের কমবেশী অবদান থাকতেই পারে। ভবিষ্যতে মাহো১ এবং মাহো২ এর শ্রোণীচক্রের সাথে সম্ভাব্য সকল অস্ট্রালোপিথদের তুলনা করা হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে বলে আশা করা যায়।[9]

পায়ের পাতা ও গোঁড়ালি

বর্তমানে দুই পায়ে ভর করে সর্বদা চলাচল করতে পারে এমন একমাত্র প্রাণী আমরা। এ কারণে আমরা ধরেই নেই যে দুই পায়ে চলন মানেই মানবীয় চলন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন দুই পায়ে হাঁটলেই তাকে মানুষের মত হাঁটতে হবে এমন কোন কথা নেই। গত ৪০ লক্ষ বছরের ইতিহাসে অধুনাবিলুপ্ত প্রজাতিগুলো নানা ধরণের চলন অনুশীলন করেছে। অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা এই ধারণা আরও পাকাপোক্ত করছে। তার গোঁড়ালিটি বড়ই ব্যতিক্রম। আমাদের গোঁড়ালির হাড় বেশ সমতল ও প্রশস্ত, কিন্তু সেডিবার গোঁড়ালি আদিম ধরণের, সরু ও কোণা। তবে গোঁড়ালির গাঁট দেখলে মনে হয় এটি দিয়ে সে অনেক চলাফেরা করতো। পায়ের পাতা, গোঁড়ালি এবং গোঁড়ালির গাঁট পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে হাঁটার সময় তাদের হাটু পায়ের পাতার ঠিক উপরে থাকতো, আমাদের মত এতোটা বেঁকে যেতো না। সেডিবা দুই পায়ে হাঁটতে পারলেও বৃক্ষবাস একেবারে ছেড়ে দেয়নি, পায়ের পাতাও সে প্রমাণ দিয়েছে।

প্রাণবৃক্ষে সেডিবার অবস্থান

হোমো স্যাপিয়েন্স উদ্ভবের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল অস্ট্রালোপিথেকাস গণ বিলুপ্ত হয়ে হোমো গণের উৎপত্তি। অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস তথা লুসির প্রজাতি যে আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সে ৩২ লক্ষ বছর আগের কথা। অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা ২০ লক্ষ বছর আগের প্রজাতি। কিন্তু বর্তমান জীবাশ্ম উপাত্ত অনুসারে হোমোর উৎপত্তি ঘটেছিল আনুমানিক ২৩ লক্ষ বছর পূর্বে। এজন্যই অনেকে বলেন সেডিবা হোমোর পূর্বপুরুষ হওয়ার পক্ষে খুব বেশী নবীন।

প্রথম যে প্রজাতিটিকে হোমো গণের অবিসংবাদিত সদস্য হিসেবে গণ্য করা হয় তা হচ্ছে হোমো ইরেক্টাস সেন্সু লাটো। এই প্রজাতির পরিপূর্ণ করোটিকা জীবাশ্মের বয়স প্রায় ১৭.৮ লক্ষ বছর, যদিও ১৮.৮ এবং ১৯ লক্ষ বছর পূর্বের কিছু নিদর্শনও পাওয়া গেছে। সাধারণভাবে প্রজাতিটি ১৯ লক্ষ বছর পূর্বে পৃথিবীর বুকে বিচরণ করতো বলে ধরে নেয়া যায়। সেক্ষেত্রে এই প্রজাতির পূর্বপুরুষ গণ্য করা হয় হোমো হ্যাবিলিস এবং হোমো রুডলফেনসিস-কে। ১৯ লক্ষ বছরের আগের এই দুটি প্রজাতিকে হোমো গণের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তাদের বয়স ও বৈশিষ্ট্য দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি বলে হোমো ইরেক্টাসকেই প্রথম হোমো প্রজাতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এখানে। তবে তা আমাদেরকে ১৯ লক্ষ বছরেরও আগের আদিম হোমো প্রজাতি নিয়ে কিছু আলোচনা থেকে আটকাতে পারবে না।

ইথিওপিয়া থেকে পাওয়া ২৩.৩ লক্ষ বছরের পুরনো একটি উর্ধ্ব চোয়ালের হাড়কে আদিম হোমো প্রজাতির সবচেয়ে শক্তিশালী নিদর্শন হিসেবে মনে করেন অনেকে। তবে হোমোর সাথে অনেক মিল থাকলেও এর গণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। ওদিকে হোমো হ্যাবিলিস এবং হোমো রুডলফেনসিস প্রজাতির যেসব জীবাশ্ম পাওয়া গেছে তাদের বয়স হোমো ইরেক্টাসের প্রায় কাছাকাছি। সুতরাং বলা যায় হোমো গণের এই তিনটি প্রজাতি বৈশিষ্ট্য এবং বয়সের দিক থেকে বেশ কাছাকাছি, অর্থাৎ হোমো গণের উত্থানের যুগ ছিল আজ থেকে ১৯ লক্ষ বছর আগে।

যে শিলাখণ্ডে মালাপা হোমিনিনদের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে তার ঠিক নিচের স্রোতপ্রস্তরের চুম্বকত্ব বিশ্লেষণ করে বয়স পাওয়া গেছে ১৯.৭৭ লক্ষ বছর। এটি খুব বেশি হলে ৩০০০ বছর এদিক ওদিক হতে পারে। তাই হাডার চোয়ালকে হোমো বলে ধরে নিলে সেডিবা হোমো গণের পূর্বপুরুষ হতে পারে না। অবশ্য বার্গার বলেছেন, এমনও হতে পারে সেডিবার জন্ম অনেক আগে হয়েছিল এবং মালাপা হোমিনিন সেই প্রজাতির শেষ সদস্যদের একজন। এভাবে হাডার চোয়ালকে হোমো ধরে নিয়েও সেডিবাকে হোমোর পূর্বপুরুষ ভাবা যায়। তবে বার্গার আরও এক ধাপ এগিয়ে সেডিবাকে সরাসরি হোমো ইরেক্টাসের পূর্বপুরুষই বলতে চেয়েছেন।

হোমো হ্যাবিলিস, রুডলফেনসিস এবং অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা এই তিনটি প্রজাতিতেই হোমো গণের দিকে একটি ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়, তাদের সবার মধ্যেই হোমো ইরেক্টাসের কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যণীয়। এর মধ্যে আছে, মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি এবং পুনর্বিন্যাস, খাঁড়া নাক, দেহের আকার বৃদ্ধি, দ্বিপদী চলনের জন্য শ্রোণীচক্রের বিশেষ জৈব-যান্ত্রিক পুনর্বিন্যাস, নিম্নাঙ্গের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি, দ্বিপদী চলনের উপযোগী পায়ের পাতা এবং অস্ত্র নির্মাণ ও ব্যবহারের যোগ্যতা। তিনটি প্রজাতির কোনটিই এই সবগুলো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে না, কিন্তু তাদেরকে একসাথে দেখা হলে সবগুলো বৈশিষ্ট্যের এক জটিল মোজাইক লক্ষ্য করা যায়।[10] সে হিসেবে সেডিবা, হ্যাবিলিস এবং রুডলফেনসিস তিনটি প্রজাতিকেই হোমো ইরেক্টাস তথা প্রকৃত হোমোদের পূর্বপুরুষ বলার অবকাশ রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে হাডার চোয়ালকে হোমো গণের মাঝে স্থান দেয়া যাবে না।

দেখা যাচ্ছে হোমো গণের জন্মস্থান পূর্ব আফ্রিকা থেকে আবারও দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে ঝুঁকে পড়েছে সেডিবার কারণে। হয় সেডিবা আফ্রিকানাস প্রজাতির অন্তিম সময়ের প্রতিনিধি অথবা আফ্রিকানাসের উত্তরসূরি ভিন্ন প্রজাতি। উত্তরসূরী হলে, লি বার্গারের মতে সেডিবা ও আফ্রিকানাস দুটোই হোমো গণের পূর্বপুরুষ, একটির আগে আরেকটি। আগেই বলেছি আফ্রিকানাসকে মানুষের সরাসরি পূর্বপুরুষ হিসেবে আখ্যায়িত করে কুখ্যাত হয়েছিলেন বার্গার। এখন আবারও তিনি সে পথে এগোচ্ছেন, তবে এবার অনেক তথ্য-উপাত্ত সহকারে। পাশাপাশি অন্য অনেক বিজ্ঞানীও তার পক্ষে সায় দিচ্ছেন।

যেমন নেচারে প্রকাশিত একটি খবরে বিজ্ঞানীরা বললেন, সেডিবা দুইভাবে হোমো গণের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে: হয় সে হোমো গণের সরাসরি পূর্বপুরুষ অথবা সে এমন একটি অধুনাবিলুপ্ত প্রজাতির শেষ সদস্যদের একজন যাদের পূর্বপুরুষরা হোমো গণের পূর্বপুরুষ ছিল। দুদিক দিয়েই সেডিবা হোমো গণের উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের গবেষণায় বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম। একটি চিত্রের মাধ্যমে নেচারের গবেষকরা বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন:

হোমো গণের তিনটি প্রাথমিক প্রজাতি ইরেক্টাস, হ্যাবিলিস এবং রুডলফেনসিস সবার জীবাশ্মই পাওয়া যেতে শুরু করেছে ১৯ লক্ষ বছরের পর থেকে। এর মধ্যে হোমো ইরেক্টাস টিকে গেছে, তারা মানুষসহ পরবর্তী বিভিন্ন হোমো প্রজাতির জনক, এমনকি আফ্রিকা থেকে বহির্গমনের চেষ্টাও করেছিল। প্রায় ৫ লক্ষ বছর পূর্বে তাদের বিলুপ্তি ঘটেছে। প্রতিটি প্রজাতির স্তম্ভের উচ্চতা তার জীবদ্দশা নির্দেশ করে। লাল স্তম্ভ অস্ট্রালোপিথেকাস গণ, গাঢ় নীল হোমো গণ, এবং হালকা নীল দিয়ে ২০ লক্ষ বছর পূর্বের সম্ভাব্য হোমো জীবাশ্মসমূহ (যেমন কালো দাগটি হাডার চোয়াল) বোঝানো হয়েছে। সংযোগকারী রেখাগুলো প্রজাতিদের মধ্যে সম্পর্ক বোঝায়। সেডিবা দুইভাবে হোমো গণের পূর্বপুরুষ হতে পারে। প্রথমত, হয়ত সেডিবা (গাঢ় লাল দাগ) এমন একটি প্রজাতির শেষ সময়কার সদস্য যাদের প্রাথমিক সদস্যরা (গোলাপী স্তম্ভ) হোমো গণের পূর্বপুরুষ (ড্যাশ দেয়া রেখা) ছিল। অথবা দ্বিতীয়ত, হয়ত সেডিবা সরাসরিই হোমো গণের পূর্বপুরুষ (ডট দেয়া লাইন) যেক্ষেত্রে আবার হালকা নীল রঙা স্তম্ভের জীবাশ্মগুলোকে হোমো বলা যাবে না। আফ্রিকানাস যে সেডিবার পূর্বপুরুষ (লাল রেখা) তা নিশ্চিত।[11]

চিত্র থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, এতোদিন মানব বিবর্তনের প্রাণবৃক্ষে ৩২ এবং ১৮ লক্ষ বছরের মাঝে যে শূন্যতাটি দেখা যেতো তা পূরণের গবেষণায় একটি নবতরঙ্গের জন্ম দিয়েছে অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা।

তথ্যসূত্র
1. Michael Balter, “Paleoanthropologist Now Rides High On a New Fossil Tide”, Science v333, 9 September 2011
2. Australopithecus sediba (media reveal) – Part 2: Lee Berger gives fossil insight
3. Ann Gibbons, “Skeletons Present an Exquisite Paleo-Puzzle”, Science v333
4. Australopithecus sediba (media reveal) – Part 3: Paul Dirks describes the fossil site
5. Paul Dirks, Job Kibii et al., “Geological Setting and Age of Australopithecus sediba from Southern Africa”, Science, v328, 9 April 2010
6. Kristian Carlson, Dietrich Stout et al., “The Endocast of MH1, Australopithecus sediba”, Science v333
7. Tracy Kivell, Job Kibii et al., “Australopithecus sediba Hand Demonstrates Mosaic Evolution of Locomotor and Manipulative Abilities”, Science v333
8. Scott W. Simpson1, Jay Quade et al., “A Female Homo erectus Pelvis from Gona, Ethiopia”, Science v320, 14 November 2008
9. Job Kibii, Steven Churchill et al., “A Partial Pelvis of Australopithecus sediba”, Science v333
10. Robyn Pickering, Paul Dirks et al., “Australopithecus sediba at 1.977 Ma and Implications for the Origins of the Genus Homo”, Science v333
11. Fred Spoor, “Malapa and the genus Homo”, Nature v478

About the Author:

মন্তব্যসমূহ

  1. অভিজিৎ ডিসেম্বর 30, 2011 at 8:31 অপরাহ্ন - Reply

    অবশেষে পুরোটা পড়া হল। আসলেই খুব খাটাখাটনি করে লেখা। তবে আমার কিছু ছোট সমালোচনা আছে। ইতোমধ্যেই সবাই লেখাটি সম্বন্ধে অনেক ভাল কথা বলে ফেলেছে। তাই সে পথ না মাড়ালেও মার চলবে। লেখাটা যে ভালই সেটা নিয়ে কেউই সন্দেহ করবে না। আমি কেবল কয়েকটি দিক তুলে ধরব যেগুলো মাথায় রাখলে হয়তো লেখকের জন্য ভাল হবে। অবশ্য এগুলো সবই আমার ব্যক্তিগত অভিমত, না মানলেও চলবে।
    লেখাটাতে কাঠখোট্টা ভাষার প্রয়োগ কিছু জায়গায় লক্ষণীয়। অনেকটা একাডেমিক স্টাইলে লেখা। আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘সম্মুখভাগে’, ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ ‘বৃক্ষনির্ভর কার্যকলাপের’ –এ ধরণের তদ্ভব তৎসম সমৃদ্ধ বাক্যের বিরোধী। সম্মুখভাগকে সহজেই সামনের দিক বলা যায়, বৃক্ষকে গাছ। আসলে গুরুগম্ভীর শব্দ ব্যবহার করলে ভাষার প্রাঞ্জলতা নষ্ট হয়ে যায় অনেকটাই। এমনিতেই বিষয়টা অনেক গভীর এবং খটমটে। ভাষা যদি সেই খটমটে ভাবকে আরো বাড়িয়ে দেয় তাহলে একটু মুশকিল।

    শিরোনামটাও আমার কাছে একটু বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। ‘অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা: হোমো গণের নতুন আত্মীয়’ শুনে প্রথমেই যেটা মনে আসে সেটা হল অস্ট্রালোপিথেকাস বোধ হয় হোমো গোত্রের কেউ। কিন্তু আসলে তা নয়। হোমো গ্রুপে আছে – Homo habilis, Homo rudolfensis, Homo ergaster, Homo georgicus, Homo antecessor, Homo cepranensis, Homo erectus, Homo heidelbergensis, Homo rhodesiensis, Homo neanderthalensis, Homo sapiens idaltu, Archaic Homo sapiens, Homo floresiensis.
    সেডিবা হচ্ছে অস্ট্রালোপিথেকাস গ্রুপের। সেই গ্রুপে আছে – Au.anamensis, Au. afarensis, Au. africanus, Au. bahrelghazali, Au. garhi, and Au. sediba;
    অবশ্য হোমো গণের সাথে অস্ট্রালোপিথেকাসের আত্মীয়তার বন্ধন আছে যদিও। কিন্তু সে হিসেবে বিবর্তনের পথ পরিক্রমায় সবাই সবার আত্মীয়। অস্ট্রালোপিথেকাসেরা আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ কিনা সেটাও তর্কের বিষয়, যদিও লি বার্গারের তথ্য উপাত্ত অনেক জোরালোই মনে হচ্ছে। শিরোনামটা হয়তো এভাবেও দেয়া যেত – ‘অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা: মানব বিবর্তনের পথ-পরিক্রমায় এক নতুন যাত্রী’ , বা এ ধরনের কিছু। যাত্রীর বদলে সদস্য-ও হতে পারত। তবে এটা না মানলেও চলবে। আবারো বলছি- পুরোটাই ব্যক্তিগত অভিমত।

    আর আমার মনে হয় এ ধরণের প্রতিটি লেখায় তোমার করা বিবর্তন উকিস্পেসের ছবিটা দিতে পার।

    [img]http://biborton.wikispaces.com/file/view/family_tree.png/288585042/family_tree.png[/img]

    এর ফলে সময়ের হিসেব গুলো মাথার মধ্যে গেঁথে থাকে। প্রাণবৃক্ষে ৩২ এবং ১৮ লক্ষ বছরের মাঝে যে শূন্যতাটির উল্লেখ করেছ সেটা হয়তো সবার কাছে স্পষ্ট হবে চিত্রটার উল্লেখ থাকলে।

    • শিক্ষানবিস ডিসেম্বর 30, 2011 at 9:07 অপরাহ্ন - Reply

      সমালোচনা পছন্দ হয়েছে।
      আমি আসলেই ইদানিং অ্যাকাডেমিক স্টাইলের দিকে ঝুঁকে পড়েছি। এই ঝোঁক সারাতে হবে। এই লেখাটারই রিভিউ হবে এবং শেষ সংস্করণ তৈরির আগে শব্দ ও বাক্য ঠিকঠাক করা হবে। আপনার ধরিয়ে দেয়া বিষয়গুলো খেয়াল রাখব।
      শিরোনামের বিষয়টাও একেবারে ঠিক। আসলে আমি প্রথমে শিরোনাম দিয়েছিলাম- শুধু অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা। পরে দেখলাম কেমন যেন খটমটে ও পাঠ্যবই ধরণের হয়ে গেছে। তাই কোলন দিয়ে একটা সাবটাইটেল দিয়েছিলাম যেটা ঠিক হয়নি। শিরোনামে বড় ধরণের পরিবর্তন আসবে ভবিষ্যতে। আসলে যেটা করব তা হচ্ছে প্রতিটি প্রজাতির লেখায় প্রজাতির নামটি দিয়ে শুরু হবে, তারপর কোলন দিয়ে একটা সাবটাইটেল যুক্ত হবে। এই লেখার সাবটাইটেল সেদিক দিয়ে এখনো তৈরি হয়নি। আপনার পরামর্শ মনে থাকবে।
      ছবিটাও উল্লেখ করব এরপর থেকে।

  2. কেশব অধিকারী ডিসেম্বর 30, 2011 at 6:26 অপরাহ্ন - Reply

    জনাব শিক্ষানবিশ,

    চমৎকার অনুবাদটির জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ। আর এতো প্রাঞ্জল ভাবে এর উপস্থাপন সত্যি অভাবনীয়! বন্যা আহমেদ এর সাথে সুর মিলিয়ে বলছি ছবির বাংলা অনুবাদ গুলো দেখেও গর্ব অনুভব হচ্ছিলো কেনো যেনো! বিবর্তন বিজ্ঞানের এই যে আহরিত তথ্য, এ সত্যি মানুষকে তথাকথিত চিন্তার বন্ধ্যাত্ত্ব এবং বন্দীত্ব থেকে এক সময় মুক্ত করবে। আবারো ধন্যবাদ লেখাটির জন্যে সাথে সাথে অপেক্ষা পরেরটির জন্যে!

  3. বন্যা আহমেদ ডিসেম্বর 29, 2011 at 8:54 পূর্বাহ্ন - Reply

    শিক্ষানবিস,
    অনেকদিন পরে তোমার লেখা দেখে ভালো লাগলো। সেডিবা আসলেই মানব বিবর্তনের একটা বড় মাইলস্টোন হয়ে উঠতে পারে। আর্ডি নিয়ে যেরকম হইচই পরে গিয়েছিল সেডিবা নিয়েও তো দেখি সেরকমই অবস্থা, এই বিষয়টা নিয়ে লেখার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই বিলুপ্ত আত্মীয়দের জীবাশ্ম উদ্ধারের মাধ্যমেই আমরা আমাদের ইতিহাস উদঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

    জীবাশ্মর সাথে সাথে জেনেটিক্সও আমাদের ইতিহাস উদঘাটনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে জেনেটিক্স জীবাশ্মর গ্যাপগুলো পূরণ করতে শুরু করেছে, মাঝে মাঝে মনে হয়, এমন একটা সময় আসবে যখন আর জীবাশ্মর দরকার পড়বে না আমাদের ইতিহাস নির্ধারণে, ডিএনএ থেকেই আমরা হয়তো আমাদের ৩-৪ কোটি বছরের ইতিহাসের অ আ ক খ থেকে শুরু করে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত পড়ে ফেলতে পারবো। যাই হোক , বাংলায় অনুবাদ করা ছবিগুলো দেখতে বড়ই ভালো লাগলো, আশা করছি অদূর ভবিষ্যতে তোমার কাছ থেকে আরো এধরণের লেখা দেখতে পাবো আশা করছি।

    • শিক্ষানবিস ডিসেম্বর 30, 2011 at 9:11 অপরাহ্ন - Reply

      অনুবাদ করতে আমারও সেইরকম মজা লাগছে। একটাই আফসোস যে কাজটা আসলে তাত্ত্বিকভাবে অবৈধ। 😀
      জিনতত্ত্বের উপরও জোড় দেয়া উচিত ছিল। জীবাশ্ম আর জিন দুটার কথাই উল্লেখ করে পরে জীবাশ্ম নিয়ে শুরু করতে পারতাম।

  4. জালিস ডিসেম্বর 29, 2011 at 6:05 পূর্বাহ্ন - Reply

    তথ্যসমৃদ্ধ লেখা ।

  5. ইরতিশাদ ডিসেম্বর 28, 2011 at 9:40 অপরাহ্ন - Reply

    বেশ তথ্যসমৃদ্ধ আর শ্রমসাধ্য এই লেখাটার জন্য লেখককে আন্তরিক অভিনন্দন।

  6. আলোকের অভিযাত্রী ডিসেম্বর 28, 2011 at 9:33 অপরাহ্ন - Reply

    মিসিং লিংকগুলো যে আস্তে আস্তে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে এটা বিরাট আনন্দের কথা। আচ্ছা অন্যান্য এলাকার তুলনায় আফ্রিকায় মানুষের পূর্ববর্তী প্রজাতিগুলো বেশি পাওয়া যায় কেন? এর কি কোন বৈজ্ঞানিক কারণ আছে?

    • শিক্ষানবিস ডিসেম্বর 28, 2011 at 11:28 অপরাহ্ন - Reply

      আফ্রিকাতেই হোমো গণের উদ্ভব ঘটেছে যার একটি প্রজাতি আমরা (হোমো স্যাপিয়েন্স)। ১৮ লক্ষ বছর আগে কিছু হোমো ইরেক্টাস হয়ত আফ্রিকার বাইরে গিয়েছিল যে কারণে আফ্রিকার বাইরে সামান্য কিছু জীবাশ্ম পাওয়া যায়। কিন্তু হোমো ইরেক্টাস থেকে পরবর্তীতে হোমো স্যাপিয়েন্স এর মূল বিবর্তনও আসলে ঘটেছে আফ্রিকাতে। আনুমানিক দেড় লাখ বছর পূর্ব থেকে শুরু করে ৫০,০০০ বছর পূর্বের সময়ের মধ্যে এই মানুষেরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং মানুষের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের খুব কমই আফ্রিকার বাইরে ছিল।

  7. কাজী মাহবুব হাসান ডিসেম্বর 28, 2011 at 9:05 অপরাহ্ন - Reply

    লেখাটা পড়া শেষ করলাম অবশেষে। খুবই ….খু্বই ভালো লাগলো।
    লেখকের আসল নামটা জানা হলো না এটুক‍ু হতাশা শুধু থেকে গেল।
    (Y) (Y) শুভকামনা।

  8. নিটোল ডিসেম্বর 28, 2011 at 7:31 অপরাহ্ন - Reply

    অসম্ভব সুন্দর একটা প্রবন্ধ। অনেকদিন পর মুক্তমনায় লিখলেন। আবারো নিয়মিত হবেন আশা করি।

  9. অভিজিৎ ডিসেম্বর 27, 2011 at 10:53 অপরাহ্ন - Reply

    মুক্তমনায় পুনরাগমনে সুস্বাগতম, শিক্ষানবিস!

    লেখাটা পড়ব।

মন্তব্য করুন জবাব বাতিল