|মনু’র বৈদিক চোখ: নারীরা মানুষ নয় আদৌ|পর্ব-০৫/..|

(চতুর্থ পর্বের পর…)

মনুশাস্ত্রে বিয়ে ও নারীর স্থান
বৈদিক শাস্ত্রে বিয়ে হচ্ছে সুনির্দিষ্ট উপভোগ্য নারীকে প্রয়োজনীয় ভোগের নিমিত্তে পুরুষের ব্যক্তি-মালিকানায় শর্তহীন হস্তান্তরের ধর্মসিদ্ধ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া যাতে কিছুতেই ব্যহত না হয় সে লক্ষ্যে ‘বিবাহ-সংস্কারকেই স্ত্রীলোকদের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ উপনয়নস্থানীয় বৈদিক সংস্কার’ (২/৬৭) হিসেবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ‘এই সংস্কার সম্পন্ন না হলে স্ত্রীলোকদের দেহশুদ্ধি হয় না’ (২/৬৬)। যেহেতু ‘গর্ভধারণের জন্য নারী এবং গর্ভাধানের জন্য পুরুষ সৃষ্টি হয়েছে’ (১০/৯৬), তাই গর্ভধারণ করাই নারীর প্রধান কাজ হিসেবে বিবেচিত। আর পুত্রোৎপাদনের নিমিত্তে নারীদেহে গর্ভাধানের কাজটি ইচ্ছানুযায়ী সম্পাদন করবে তার পুরুষ প্রভু বা স্বামী, যিনি বিবাহ নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঐ নারীদেহের সম্পূর্ণ কর্তৃত্বের অধিকারী হন-

‘মঙ্গলার্থং স্বস্ত্যয়নং যজ্ঞশ্চাসাং প্রজাপতেঃ।
প্রযুজ্যতে বিবাহেষু প্রদানং স্বাম্যকারণম্।।’
স্ত্রীলোকদের বিবাহকর্মে যা কিছু স্বস্ত্যয়ন বা প্রজাপতিযাগ অর্থাৎ বিবাহের দেবতা প্রজাপতির উদ্দেশ্যে যে হোম করা হয়, তা কেবল উভয়ের মঙ্গলার্থ মাত্র। স্ত্রীলোকগণকে প্রথমে যে বাগদান করা হয়, তার দ্বারাই স্ত্রীলোকের উপর পতির স্বামিত্ব জন্মায়; অতএব বাগদান থেকে আরম্ভ করেই স্ত্রীলোকদের স্বামীর সেবা করা কর্তব্য। (৫/১৫২)।

আর এজন্যেই বয়োসন্ধিকালে প্রজননক্ষম হওয়ামাত্রই কন্যাকে পাত্রস্থ করে দিতে মনুর উপদেশ-

‘কালেহদাতা পিতা বাচ্যো বাচ্যশ্চানুপযন্ পতিঃ।
মৃতে ভর্তরি পুত্রস্তু বাচ্যো মাতুররক্ষিতা।।’
বিবাহ-যোগ্য সময়ে অর্থাৎ ঋতুদর্শনের আগে পিতা যদি কন্যাকে পাত্রস্থ না করেন, তাহলে তিনি লোকমধ্যে নিন্দনীয় হন; স্বামী যদি ঋতুকালে পত্নীর সাথে সঙ্গম না করেন, তবে তিনি লোকসমাজে নিন্দার ভাজন হন। এবং স্বামী মারা গেলে পুত্রেরা যদি তাদের মাতার রক্ষণাবেক্ষণ না করে, তাহলে তারাও অত্যন্ত নিন্দাভাজন হয়। (৯/৪)।

অর্থাৎ একটি কুমারী কন্যা প্রজননযোগ্যা ঋতুমতী হয়েও প্রজননকার্যে ব্যবহৃত না-হওয়া মনুশাস্ত্রেরই উল্লঙ্ঘন। সেক্ষেত্রে যথাসময়ে পাত্রস্থ না-করার কারণে কন্যার উপর পিতার অধিকারও খর্ব হয়ে যায়। ফলে-

‘পিত্রে ন দদ্যাচ্ছুল্কন্তু কন্যামৃতুমতীং হরন্।
স হি স্বাম্যাদতিক্রামেদৃতূনাং প্রতিরোধনাৎ।।’
ঋতুমতী কন্যাকে যে বিবাহ করবে সেই ব্যক্তি কন্যার পিতাকে কোন শুল্ক দেবে না। কারণ, সেই পিতা কন্যার ঋতু নষ্ট করছেন বলে কন্যার উপর তার যে অধিকার তা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। (৯/৯৩)।

এখানে দেখা যাচ্ছে যে, বিয়ের বাজারে কন্যার একটা বিনিময়মূল্য রয়েছে, যা অধিকার হিসেবে পিতাই প্রাপ্ত হতেন। কিন্তু কন্যার ঋতু নষ্ট না-করার স্বার্থেই তা সম্পর্কিত। অতএব, ঋতু নষ্ট না-করা অর্থাৎ যথাসময়ে পাত্রস্থ করাটা খুবই গুরুত্ববহ। তবে যোগ্য পাত্র নির্বাচন করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই গুণহীন পাত্রে কন্যাদান যেমন নিরুৎসাহিত করা হয়, তেমনি যোগ্য পাত্র পাওয়া গেলে ঋতুমতী হবার আগেই কন্যাকে সম্প্রদান করারও নির্দেশ করা হয়েছে-

‘উৎকৃষ্টায়াভিরূপায় বরায় সদৃশায় চ।
অপ্রাপ্তামপি তাং তস্মৈ কন্যাং দদ্যাদ্ যথাবিধি।।’
উৎকৃষ্ট অভিরূপ এবং সজাতীয় বর পাওয়া গেলে কন্যা বিবাহের বয়স প্রাপ্ত না হলেও তাকে যথাবিধি সম্প্রদান করবে। (৯/৮৮)।

নইলে-

‘অদীয়মানা ভর্তারমধিগচ্ছেদ্ যদি স্বয়ম্।
নৈনঃ কিঞ্চিদবাপ্লোতি ন চ যং সাহধিগচ্ছতি।।’
ঋতুমতী হওয়ার তিন বৎসর পরেও যদি ঐ কন্যাকে পাত্রস্থ করা না হয়, তাহলে সে যদি নিজেই পতি বরণ করে নেয়, তার জন্য সে কোনও পাপের ভাগী হবে না। কিংবা যাকে সে বরণ করে, তারও কোনও পাপ বা দোষ হবে না। (৯/৯১)।

এটাকে নারী বা কন্যার অধিকার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং পিতার ব্যর্থতায় প্রজননযোগ্য কন্যার এই স্বপ্রণোদিত পুরুষানুগমন ধর্মীয় পিতৃতন্ত্রের বাধ্যবাধকতাই নির্দেশ করে। উল্লেখ্য, একই প্রেক্ষিতে সামাজিকভাবে নারীর বিয়ের বয়সটিও মনুশাস্ত্রে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে-

‘ত্রিংশদ্বর্ষোদ্বহেৎ কন্যাং হৃদ্যাং দ্বাদশবার্ষিকীম্।
ত্র্যষ্টবর্ষোহষ্টবর্ষাং বা ধর্মে সীদতি সত্বরঃ।।’
ত্রিশ বৎসর বয়সের পুরুষ বারো বৎসর বয়সের মনোমত কন্যাকে বিবাহ করবে, অথবা, চব্বিশ বছর বয়সের পুরুষ আট বছরের কন্যাকে বিবাহ করবে। এর দ্বারা বিবাহযোগ্য কাল প্রদর্শিত হলো মাত্র। তিনগুণের বেশি বয়সের পুরুষ একগুণ বয়স্কা কন্যাকে বিবাহ করবে, এর কমবেশি বয়সে বিবাহ করলে ধর্ম নষ্ট হয়। (৯/৯৪)।

তবে যে দৃষ্টিতেই দেখা হোক না কেন, ধর্মভিত্তিক পুরুষতন্ত্রে বিয়ে মানেই হচ্ছে পুরুষ কর্তৃক পছন্দসই নারী সংগ্রহ ও তার উপর ব্যক্তি-মালিকানা প্রতিষ্ঠাকরণের সামাজিক বৈধতা আরোপ প্রক্রিয়া মাত্র। এই প্রক্রিয়ার স্বরূপ অনুযায়ী বৈদিক শাস্ত্রের আট রকমের বিবাহের উল্লেখ রয়েছে-

‘ব্রাহ্মো দৈবস্তথৈবার্যঃ প্রাজাপত্যস্তথাসুরঃ।
গান্ধর্বো রাক্ষসশ্চৈব পৈশাচশ্চাষ্টমোহধমঃ।।’
ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস ও সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট (নিন্দিত) পৈশাচ- বিবাহ এই আটরকমের। (৩/২১)।
.
‘ষড়ানুপূর্ব্যা বিপ্রস্য ক্ষত্রস্য চতুরোহবরান্।
বিট্শূদ্রয়োস্তু তানেব বিদ্যাদ্ধর্ম্যানরাক্ষসান্।।’
(প্রথম থেকে) ক্রমানুসারে ছয়-প্রকার বিবাহ (ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব) ব্রাহ্মণের পক্ষে ধর্মজনক (অতএব বিহিত); শেষ দিকের চারটি বিবাহ (আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ) ক্ষত্রিয়ের পক্ষে বিহিত; এবং রাক্ষস ভিন্ন শেষের বাকী তিনটি বিবাহ (আসুর, গান্ধর্ব ও পৈশাচ) বৈশ্য ও শূদ্রের পক্ষে বিহিত বলে জানবে। (৩/২৩)।

এবং এই আটপ্রকার বিবাহের স্বরূপ থেকেই বিবাহ-সংস্কৃতিতে নারীর অবস্থান বা ভূমিকা কী তার পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

(ব্রাহ্মবিবাহের স্বরূপ:)

‘আচ্ছাদ্য চার্চয়িত্বা চ শ্রুতিশীলবতে স্বয়ম্।
আহূয় দানং কন্যায়া ব্রাহ্মো ধর্মঃ প্রকীর্তিতঃ।।’
শাস্ত্রজ্ঞান ও সদাচার সম্পন্ন পাত্রকে (কন্যার পিতা) স্বয়ং আহ্বান করে (অর্থাৎ বরের দ্বারা ঐ পিতা প্রার্থিত না হয়ে) নিজের কাছে আনিয়ে বর ও কন্যাকে (দেশ অনুসারে যথাসম্ভব যথাযোগ্য) বস্ত্রদ্বারা আচ্ছাদিত করে এবং অলঙ্কারাদির দ্বারা অর্চনা করে (অর্থাৎ বিশেষ প্রীতি ও বিশেষ সমাদর দেখিয়ে) ঐ বরের হাতে কন্যাকে যে সম্প্রদান করা হয়, তাকে ব্রাহ্মবিবাহরূপ ধর্মব্যবস্থা বলা হয়। [ব্রাহ্মবিবাহ সর্বোৎকৃষ্ট; এই বিবাহে যে কন্যাদান করা হয়, তাতে কোনও শর্ত বা স্বার্থ থাকে না]। (৩/২৭)।

(দৈববিবাহের স্বরূপ:)

‘যজ্ঞে তু বিততে সম্যগৃত্বিজে কর্ম কুর্বতে।
অলংকৃত্য সুতাদানং দৈবং ধর্মং প্রচক্ষতে।।’
জ্যোতিষ্টোমাদি বিস্তৃত যজ্ঞ আরম্ভ হলে সেই যজ্ঞে পুরোহিতরূপে যজ্ঞকার্যনিষ্পাদনকারী ঋত্বিক-কে যদি সালঙ্কারা কন্যা দান করা হয়, তাহলে এইরকম বিবাহকে মুনিগণ দৈব নামক শাস্ত্রবিহিত বিবাহ বলে থাকেন। [ব্রাহ্মবিবাহে নিঃশর্তভাবে কন্যাদান করা হয়। দৈববিবাহে কন্যাদান করা হয় বটে, কিন্তু যজ্ঞকর্মে নিযুক্ত ঋত্বিকের কাছ থেকে পূণ্যফল লাভের সম্ভাবনা থাকায় এই কন্যাদানটিকে একেবারে শুদ্ধদানের পর্যায়ে ফেলা যায় না]। (৩/২৮)।

(আর্য-বিবাহের স্বরূপ:)

‘একং গোমিথুনং দ্বে বা বরাদাদায় ধর্মতঃ।
কন্যাপ্রদানং বিধিবদার্ষো ধর্মঃ স উচ্যতে।।’
ধর্মশাস্ত্রের বিধান-অনুসারে বরের কাছ থেকে এক জোড়া, বা দুই জোড়া গোমিথুন (অর্থাৎ একটি গাভী ও একটি বলদ) গ্রহণ করে ঐ বরকে যথাবিধি কন্যাসম্প্রদান ধর্মানুসারে আর্য-বিবাহ নামে অভিহিত হয়। [এখানে বরের কাছ থেকে গোমিথুন-দানগ্রহণ একটি ধর্মীয় ব্যাপার। তাই এটি কন্যার শুল্ক বা বিনিময় মূল্যস্বরূপ নয়। কাজেই এখানে কন্যা-বিক্রয় করা হচ্ছে এমন মনে করা উচিত নয়। টিকাকার মেধাতিথির মতে, এখানে অল্পই হোক, বা বেশিই হোক, কোনও ঋণপরিশোধের ব্যাপার নেই]। (৩/২৯)।

(প্রাজাপত্য-বিবাহের স্বরূপ:)

‘সহোভৌ চরতাং ধর্মমিতি বাচানুভাষ্য চ।
কন্যাপ্রদানমভ্যর্চ্য প্রাজাপত্যো বিধিঃ স্মৃতঃ।।’
‘তোমরা দুইজনে মিলে একসঙ্গে গার্হস্থ্যধর্মের অনুষ্ঠান কর’- বরের সাথে এইরকম চুক্তি করে এবং তার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতিরূপে স্বীকৃতি আদায় করে, অলঙ্কারাদির দ্বারা বরকে অর্চনাপূর্বক কন্যাসম্প্রদান প্রাজাপত্যবিবাহ নামে স্মৃতিমধ্যে অভিহিত হয়েছে। [সম্ভবতঃ এই বিবাহে বর নিজে থেকে প্রার্থী হয়ে উপস্থিত হন। প্রাজাপত্যবিবাহে যে কন্যাদান করা হয়, সে দান শুদ্ধ নয়, কারণ এখানে দানের শর্ত আরোপ করা হয়]। (৩/৩০)।

(আসুরবিবাহের স্বরূপ:)

‘জ্ঞাতিভ্যো দ্রবিণং দত্ত্বা কন্যায়ৈ চৈব শক্তিতঃ।
কন্যাপ্রদানং স্বাচ্ছন্দ্যাদাসুরো ধর্ম উচ্যতে।।’
কন্যার পিতা প্রভৃতি আত্মীয়স্বজনকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী (কিন্তু শাস্ত্র-নির্দেশ অনুসারে নয়) এবং যথাশক্তি অর্থ দিয়ে এবং কন্যাটিকেও স্ত্রীধন দিয়ে যে কন্যর ‘আ-প্রদান’ অর্থাৎ কন্যাগ্রহণ করা হয়, তা আসুরবিবাহ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। [আসুর-বিবাহের ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় যে, এই বিবাহে স্বেচ্ছানুসারে ধন দিয়ে অর্থের জোরে কন্যা গ্রহণ বা ক্রয় করা হয়, কিন্তু শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে নয়। এখানেই আর্য-বিবাহ থেকে আসুর-বিবাহের পার্থক্য। আর্যবিবাহে যেমন গোমিথুন নির্দিষ্ট করা হয়, আসুর বিবাহে তেমন হয় না। এখানে বর কন্যার রূপ ও গুণে আকৃষ্ট হয়ে এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তার সামর্থ অনুযায়ী কন্যার মূল্যস্বরূপ অনির্দিষ্ট পরিমাণ শুল্ক বা অর্থের বিনিময়ে কন্যা গ্রহণ বা সংগ্রহ করা হয়]। (৩/৩১)।

(গান্ধর্ব-বিবাহের স্বরূপ:)

‘ইচ্ছয়ান্যোন্যসংযোগঃ কন্যায়াশ্চ বরস্য চ।
গান্ধর্বঃ স তু বিজ্ঞেয়ো মৈথুন্যঃ কামসম্ভবঃ।।’
কন্যা ও বর উভয়ের ইচ্ছাবশতঃ (অর্থাৎ প্রেম বা অনুরাগবশতঃ) যে পরস্পর সংযোগ (কোনও একটি জায়গায় সঙ্গমন বা মিলন) তা গান্ধর্ব-বিবাহ; এই বিবাহ মৈথুনার্থক অর্থাৎ পরস্পরের মিলন বাসনা থেকে সম্ভূত এবং কামই তার প্রযোজক বা কারণস্বরূপ। (৩/৩২)।

(রাক্ষস-বিবাহের স্বরূপ 🙂

‘হত্বা চ্ছিত্ত্বা চ ভিত্ত্বা চ ক্রোশন্তীং রুদতীং গৃহাৎ।
প্রসহ্য কন্যাহরণং রাক্ষসো বিধিরুচ্যতে।।’
বাধাপ্রদানকারী কন্যাপক্ষীয়গণকে (আহত) নিহত করে, (অঙ্গ) প্রত্যঙ্গ ছেদন করে এবং গৃহ প্রাচীর প্রভৃতি ভেদ করে যদি কেউ চীৎকারপরায়ণা ও ক্রন্দনরতা কন্যাকে গৃহ থেকে বলপূর্বক অপহরণ করে, তবে একে রাক্ষস-বিবাহ বলা হয়। (৩/৩৩)।

(পৈশাচ-বিবাহের স্বরূপ:)

‘সুপ্তাং মত্তাং প্রমত্তাং বা রহো যত্রোপগচ্ছতি।
স পাপিষ্ঠো বিবাহানাং পৈশাচশ্চাষ্টমোহধমঃ।।’
নিদ্রাভিভূতা, মদ্যপানের ফলে বিহ্বলা, বা রোগাদির দ্বারা উন্মত্তা কন্যার সাথে যদি গোপনে (বা প্রকাশ্যে) সম্ভোগ করা হয়, তাহলে তা পৈশাচ-বিবাহ নামে অভিহিত হবে; আটরকমের বিবাহের মধ্যে এই অষ্টম বিবাহটি পাপজনক ও সকল বিবাহ থেকে নিকৃষ্ট (এই বিবাহ থেকে ধর্মাপত্য অর্থাৎ ধর্মজ-পুত্র জন্মে না)। [পৈশাচবিবাহে মিথ্যা বা ছল আশ্রয় করে গোপনে কন্যা সংগ্রহ করা হয় বলে এ বিবাহ খুবই নিন্দিত। তবে টিকাকারদের অভিমত এই যে, পরে হোমসংস্কারের দ্বারা ঐ নিন্দনীয় সকল বিবাহেরই স্বীকৃতি দেয়া হয়]। (৩/৩৪)।

এই আটপ্রকার বিয়ের স্বরূপ দেখে এটা মনে করা বাহুল্য হবে না যে, বৈদিক শাস্ত্রে বিয়ে মানে পুরুষের নারী সংগ্রহের সামাজিক অভিযান কেবল। প্রাথমিক দৃষ্টিতে এই সংগ্রহ অভিযান শোভন বা অশোভন বা নিন্দনীয় যা-ই দেখাক না কেন, পুরুষতন্ত্র নিজের প্রয়োজনেই তার স্বীকৃতির ব্যবস্থা রেখেছে। তবে নারী যে পূর্ণমাত্রায় কেবল সম্পত্তিই, এর প্রমাণ হচ্ছে নারী দানযোগ্য, ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য কিংবা বলপূর্বক হরণযোগ্য। অর্থাৎ যেভাবেই হোক, তার মালিকানার হস্তান্তর ঘটে মাত্র। তাই বস্তুগত ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় যেমন ভেজাল দেয়া অনৈতিক বলে গণ্য হয়, তেমনি প্রয়োজনীয় নারী সংগ্রহের হস্তান্তর প্রক্রিয়ায়ও কোনরূপ ব্যতিক্রম সহ্য করা হয় না-

‘অন্যাং চেদ্ দর্শয়িত্বান্যা বোঢ়ুঃ কন্যা প্রদীয়ক্তে।
উভে তে একশুল্কেন বহেদিত্যব্রবীন্মনুঃ।।’
বরের নিকট থেকে পণ নেওয়ার সময়ে একটি কন্যাকে দেখিয়ে বিবাহের সময়ে যদি তাকে (বরকে) অন্য একটি মেয়েকে দেওয়া হয়, তা হলে সেই বরটি ঐ একই শুল্কে দুইটি কন্যাকেই পাবে, মনু নিজেই একথা বলেছেন। (৮/২০৪)।
.
‘নোন্মত্তায়া ন কুষ্ঠিন্যা ন চ যা স্পৃষ্ঠমৈথুনা।
পূর্বং দোষানভিখ্যাপ্য প্রদাতা দণ্ডমর্হতি।।’
মেয়েটি উন্মত্তা কিংবা কুষ্ঠরোগগ্রস্তা কিংবা অন্যপুরুষের দ্বারা উপভুক্তা,- কন্যার এসব দোষ বিবাহের আগেই বলে দিলে অর্থাৎ শুল্ক নেবার আগেই তা কথায় প্রকাশ করে দিলে আর সেই কন্যাদানকারী দণ্ডনীয় হবে না। (৮/২০৫)।

নইলে এক্ষেত্রে রাজার বিচারে অপরাধের মাত্রাবিচারে বিভিন্ন দণ্ডের বিধান মনুসংহিতায় উদ্ধৃত রয়েছে। তবুও-

‘বিধিবৎপ্রতিগৃহ্যাপি ত্যজেৎ কন্যাং বিগর্হিতাম্।
ব্যাধিতাং বিপ্রদুষ্টাং বা ছদ্মনা চোপপ্যাদিতাম্।।’
বর যথাবিধি কন্যাকে গ্রহণ করেও যদি দেখে যে মেয়েটি বিগর্হিতা, ব্যাধিতা, বিপ্রদুষ্টা কিংবা তাহার স্বরূপ গোপন করে তাকে সম্প্রদান করা হয়েছে, তা হলে তাকে পরিত্যাগ করবে। (৯/৭২)।

আবার-

‘ন দত্ত্বা কস্যচিৎ কন্যাং পুনর্দদ্যাদ্বিচক্ষণঃ।
দত্ত্বা পুনঃ প্রযচ্ছন্ হি প্রাপ্লোতি পুরুষানৃতাম্।।’
যার উদ্দেশ্যে কন্যা বাগদত্তা হবে, তার মৃত্যুর পরও বিচক্ষণ ব্যক্তি নিজের ঐ বাগদত্তা কন্যাকে আবার অন্য পুরুষকে সমর্পণ করবে না। কারণ ঐ ভাবে একজনের উদ্দেশ্যে দত্তা কন্যাকে আবার অন্যকে দান করলে পুরুষানৃত প্রাপ্ত হবে অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঐরকম করে তাহলে সমগ্র মানবজাতিকে প্রতারণা করার যে পাপ হয়, সে তার ভাগী হয়। (৯/৭১)।

অর্থাৎ এক্ষেত্রে নারীটির জৈব-মানসিক চাহিদাকেই সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হলো।
আমরা আগেই দেখেছি যে, নারী বা স্ত্রী সকলের কাছ থেকে সকলেই গ্রহণ করতে পারে (২/২৪০)। তবু ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্ষকেরা কিন্তু তাদের মৌলিক বর্ণবাদী নীতিকে ভুলে যায় নি একটুও। তাই নারী শূদ্র-সমতুল্য হলেও (৯/১৮), নারীর প্রাথমিক রক্ষকের (অর্থাৎ পিতৃবংশের) বর্ণ-অবস্থান বা আভিজাত্যের নিরীখেই তারও স্তর বা জাতিভেদ আরোপ করে আরও নিগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে নারী নির্বাচন ও সংগ্রহের মনুশাস্ত্রীয় প্রক্রিয়ায় পুরুষের প্রতি মনুর পরামর্শ-

‘সর্ববর্ণেষু তুল্যাসু পত্নীষবক্ষতযোনিষু।
আনুলোম্যেন সম্ভূতা জাত্যা জ্ঞেয়াস্ত এব তে।।’
সকল বর্ণের পক্ষেই স্বপরিণীতা ও অক্ষতযোনি (অর্থাৎ প্রথমবিবাহিতা এবং যার সাথে আগে কোনও পুরুষের দৈহিক সম্পর্ক হয় নি) সবর্ণ বা সমান জাতির নারীর গর্ভে সবর্ণ পতিকর্তৃক উৎপাদিত সন্তান পিতামাতার জাতি থেকে অভিন্ন। অর্থাৎ ব্রাহ্মণীতে ব্রাহ্মণকর্তৃক উৎপাদিত সন্তান ‘ব্রাহ্মণ’হবে; ক্ষত্রিয়কর্তৃক এই রকম ক্ষত্রিয়া পত্নীর গর্ভে উৎপাদিত সন্তান ‘ক্ষত্রিয়’ হবে; বৈশ্যকর্তৃক স্বপরিণীতা ও অক্ষতযোনি বৈশ্যার গর্ভে উৎপাদিত সন্তান ‘বৈশ্য’ এবং শূদ্রকর্তৃক ঐ রকম শূদ্রার গর্ভে উৎপাদিত সন্তান ‘শূদ্র’ হবে। এসব ছাড়া অসবর্ণা স্ত্রীর গর্ভে উৎপন্ন সন্তান জনকের সাথে সবর্ণ হয় না, নিশ্চয়ই জাত্যন্তর হবে। (১০/৫)।

তাই-

‘সবর্ণাহগ্রে দ্বিজাতীনাং প্রশস্তা দারকর্মণি।
কামতস্তু প্রবৃত্তানামিমাঃ স্যুঃ ক্রমশো বরাঃ।।’
ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য- এই দ্বিজাতিগণের দারপরিগ্রহব্যাপারে সর্বপ্রথমে (অর্থাৎ অন্য নারীকে বিবাহ করার আগে) সমানজাতীয়া কন্যাকেই বিবাহ করা প্রশস্ত। কিন্তু কামনাপরায়ণ হয়ে পুনরায় বিবাহে প্রবৃত্ত হলে [অর্থাৎ সবর্ণাকে বিবাহ করা হয়ে গেলে তার উপর যদি কোনও কারণে প্রীতি না জন্মে অথবা পুত্রের উৎপাদনের জন্য ব্যাপার নিষ্পন্ন না হলে যদি কাম-প্রযুক্ত অন্যস্ত্রী-অভিলাষ জন্মায় তাহলে] দ্বিজাতির পক্ষে ব্ক্ষ্যমাণ নারীরা প্রশস্ত হবে। (৩/১২)।
.
‘শূদ্রৈব ভার্যা শূদ্রস্য সা চ স্বা চ বিশঃ স্মৃতে।
তে চ স্বা চৈব রাজ্ঞশ্চ তাশ্চ স্বা চাগ্রজন্মনঃ।।’
একমাত্র শূদ্রকন্যাই শূদ্রের ভার্যা হবে; বৈশ্য সজাতীয়া বৈশ্যকন্যা ও শূদ্রাকে বিবাহ করতে পারে; ক্ষত্রিয়ের পক্ষে সবর্ণা ক্ষত্রিয়কন্যা এবং বৈশ্যা ও শূদ্রা ভার্যা হতে পারে; আর ব্রাহ্মণের পক্ষে সবর্ণা ব্রাহ্মণকন্যা এবং ক্ষত্রিয়া, বৈশ্যা ও শূদ্রা ভার্যা হতে পারে। [এটা ‘অনুলোম’ বিবাহের প্রসঙ্গ। উচ্চবর্ণের পুরুষের সাথে নীচবর্ণের কন্যার বিবাহকে অনুলোম বিবাহ বলে। এর বিপরীত বিবাহ অর্থাৎ তুলনামূলক উচ্চবর্ণের কন্যাকে নিম্নবর্ণের পুরুষ কর্তৃক বিবাহের নাম প্রতিলোম বিবাহ। প্রতিলোম বিবাহ সকল স্মৃতিকারদের দ্বারাই নিন্দিত। মনু মনে করেন, প্রথমে সজাতীয়া কন্যার সাথে বিবাহই প্রশস্ত। পুনর্বিবাহের ইচ্ছা হলে অনুলোম-বিবাহের সমর্থন দেয়া হয়েছে]। (৩/১৩)।

এখানে একটু খেয়াল করলেই উচ্চবর্ণীয় প্রভাবশালী ক্ষমতাধর পুরুষকর্তৃক হীনবর্ণীয়া একাধিক নারীভোগ করার শাস্ত্রীয় অনুমোদনের সূক্ষ্ম রাজনীতিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রথম বিয়েটা সবর্ণা নারীর সাথে হওয়া বাঞ্ছনীয় এজন্যেই যে, তার থেকে জাত-পুত্র পিতার বংশরাক্ষা ও উত্তরাধিকারের সহায়ক হয়, যা হীনবর্ণা স্ত্রী-জাত বর্ণ-সঙ্কর সন্তানে শাস্ত্রীয় সংকট তৈরি করে। কেননা-

‘জ্যেষ্ঠেন জাতমাত্রেণ পুত্রীভবতি মানবঃ।
পিতৃণামনৃণশ্চৈব স তস্মাৎ সর্বমর্হতি।।’
উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গেই জ্যেষ্ঠ পুত্র অসংস্কৃত থাকলেও তার দ্বারাই মানুষ পুত্রবিশিষ্ট হয় এবং ঐ পুত্র তার পিতৃপুরুষগণকে পুন্-নামক নরক থেকে নিষ্কৃতি দেয়ার জন্য সে পিতৃঋণ থেকে মুক্ত হয়; জ্যেষ্ঠই প্রকৃত অর্থে পুত্রপদবাচ্য। এইরকম বিচার করলে, জ্যেষ্ঠই সমস্ত পিতৃধন লাভ করার যোগ্য। (৯/১০৬)।
.
‘পুন্নাম্নো নরকাদ্ যস্মাৎ ত্রায়তে পিতরং সুতঃ।
তস্মাৎ পুত্র ইতি প্রোক্তঃ স্বয়মেব স্বয়ম্ভুবা।।’
যে হেতু পুত্র ‘পুৎ’ নামক নরক থেকে পিতাকে উদ্ধার করে এই কারণে স্বয়ং ব্রহ্মা তাকে ‘পুত্র’ এই নামে অভিহিত করেছেন। [পৃথিবীতে যে সব প্রাণীর উৎপত্তি হয় তাদের সেই উৎপত্তিটাকেই পুৎ নামক নরক বলা হয়। পুত্র জন্মালে পিতাকে তা থেকে পরিত্রাণ করে অর্থাৎ পিতা তখন পৃথিবীতে পুনর্জন্ম গ্রহণ না করে দেবলোকে জন্মপ্রাপ্ত হয়। সেই কারণে তাকে ‘পুত্র’ বলা হয়]। (৯/১৩৮)।
.
‘যস্মিনৃনং সন্নয়তি যেন চানন্ত্যমশ্নুতে।
স এব ধর্মজঃ পুত্রঃ কামজানিতরান্ বিদুঃ।।’
যে জ্যেষ্ঠপুত্রের উৎপত্তিমাত্র পিতা পিতৃঋণ পরিশোধ করেন, এবং যার দ্বারা পিতা মোক্ষ লাভ করেন, সেই জ্যেষ্ঠ পুত্রকে যথার্থ ধর্মজ-সন্তান বলা যায়; অবশিষ্ট পুত্রগুলি সব কামজ, জ্ঞানীরা এইরকম বিবেচনা করেন। (৯/১০৭)।

তাই পারলৌকিক মুক্তি বা ইহলৌকিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক বর্ণ-প্রাধান্যের কারণেই দ্বিজদের জন্যে সবর্ণা কন্যার সাথে প্রথম বিয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এটা ঠিক থাকলে বর্ণ-শ্রেষ্ঠদের জন্য পরবর্তী অনুলোম বিবাহের মাধ্যমে অতিরিক্ত কামনা চরিতার্থের সুযোগ শাস্ত্রই অবারিত রেখেছে। তবে যেহেতু বর্ণ-সংকর সন্তান সৃষ্টি ক্ষমতাকেন্দ্রিক সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্টের কারণ হতে পারে, তাই হীনবর্ণা নারীকে সর্বস্তরের পুরুষের ইচ্ছানুরুপ সম্ভোগের সবরকম সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়ে শুধু তাদের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদনকে কৌশলে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে-

‘হীনজাতিস্ত্রিয়ং মোহাদুদ্বহন্তো দ্বিজাতয়ঃ।
কুলান্যেব নয়ন্ত্যাশু সসন্তানানি শূদ্রতাম্।।’
ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই দ্বিজাতিরা যদি মোহবশতঃ (ধনলাভজনিত অবিবেকবশতই হোক অথবা কামপ্রেরিত হয়েই হোক) হীনজাতীয়া স্ত্রী বিবাহ করেন, তাহলে তাদের সেই স্ত্রীতে সমুৎপন্ন পুত্রপৌত্রাদির সাথে নিজ নিজ বংশ শীঘ্রই শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হয়। (৩/১৫)।
.
‘শূদ্রাবেদী পতত্যত্রেরুতথ্যতনয়স্য চ।
শৌনকস্য সুতোৎপত্ত্যা তদপত্যতয়া ভৃগোঃ।।’
শূদ্রা স্ত্রী বিবাহ করলেই ব্রাহ্মণাদি পতিত হন,- এটি অত্রি এবং উতথ্যতনয় গৌতম মুনির মত। শৌনকের মতে, শূদ্রা নারীকে বিবাহ করে তাতে সন্তানোৎপাদন করলে ব্রাহ্মণাদি পতিত হয়। ভৃগু বলেন, শূদ্রা স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানের সন্তান হলে ব্রাহ্মণাদি দ্বিজাতি পতিত হয়। [মেধাতিথি ও গোবিন্দরাজের মতে, কেবলমাত্র ব্রাহ্মণের শূদ্রা স্ত্রীর ক্ষেত্রেই এই পাতিত্য বুঝতে হবে। কুল্লুক ভট্টের মতে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য- এই তিনজাতির শূদ্রা স্ত্রী সম্বন্ধেই এই পাতিত্য হবে]। (৩/১৬)।
.
‘শূদ্রাং শয়নমারোপ্য ব্রাহ্মণো যাত্যধোগতিম্।
জনয়িত্বা সুতং তস্যাং ব্রাহ্মণ্যাদেব হীয়তে।।’
সবর্ণা স্ত্রী বিবাহ না করে শূদ্রা নারীকে প্রথমে বিবাহ করে নিজ শয্যায় গ্রহণ করলে ব্রাহ্মণ অধোগতি (নরক) প্রাপ্ত হন; আবার সেই স্ত্রীতে সন্তানোৎপাদন করলে তিনি ব্রাহ্মণত্ব থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পড়েন [অতএব সমানজাতীয়া নারী বিবাহ না করে দৈবাৎ শূদ্রা বিবাহ করলেও তাতে সন্তান উৎপাদন করা ব্রাহ্মণের উচিত নয়]। (৩/১৭)।

ইত্যাদি অর্থাৎ বংশ পতনের কারণ সৃষ্টি হয় কেবল হীনজাতীয়া স্ত্রীতে সমুৎপন্ন পুত্রপৌত্রাদি দিয়েই। তা না হলে আর কোন সমস্যা নেই। তারপরও-

‘দৈবপিত্যাতিথেয়ানি তৎপ্রধানানি যস্য তু।
নাশ্লন্তি পিতৃদেবাস্তং ন চ স্বর্গং স গচ্ছতি।।’
শূদ্রা ভার্যা গ্রহণের পর যদি ব্রাহ্মণের দৈবকর্ম (যথা, দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞ প্রভৃতি এবং দেবতার উদ্দেশ্যে যে ব্রাহ্মণভোজনাদি হয়, তা), পিত্র্যকর্ম (পিতৃপুরুষের প্রতি করণীয় কর্ম, যথা, শ্রাদ্ধ, উদক-তর্পণ প্রভৃতি) এবং আতিথেয় কর্ম (যেমন, অতিথির পরিচর্যা, অতিথিকে ভোজন দান প্রভৃতি) প্রভৃতিতে শূদ্রা ভার্যার প্রাধান্য থাকে অর্থাৎ ঐ কর্মগুলি যদি শূদ্রা স্ত্রীকর্তৃক বিশেষরূপে সম্পন্ন হয়, তাহলে সেই দ্রব্য পিতৃপুরুষগণ এবং দেবতাগণ ভক্ষণ করেন না এবং সেই গৃহস্থ ঐ সব দেবকর্মাদির ফলে স্বর্গেও যান না (অর্থাৎ সেই সব কর্মানুষ্ঠান নিষ্ফল হয়)। (৩/১৮)।

অর্থাৎ শূদ্রা নারী ব্রাহ্মণের ভার্যা হয়ে ব্রহ্মভোগের বস্তু হলো ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্ত্রীর কোন মর্যাদাই তার প্রাপ্য হয় না।
.
অন্যদিকে হীনবর্ণীয় পুরুষ কর্তৃক উচ্চবর্ণা নারী সম্ভোগকারী প্রতিলোম-বিবাহকে তীব্রভাবে নিন্দিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর কারণ কিন্তু নারীকে বা নারীর কোন আভিজাত্যকে সমুন্নত করা নয় কিছুতেই। মূলত ব্রাহ্মণ্যশান্ত্রের সামাজিক ক্ষমতা-কাঠামোয় বর্ণশ্রেষ্ঠের প্রভাব ও আভিজাত্যকে রক্ষা ও নিষ্কণ্টক রাখার নিরাপোষ খবরদারি তা। এক্ষেত্রে শূদ্রসমতুল্য নারী তার সহজাত দেহটি নিয়ে রক্ষকের বর্ণস্তরের আপাত প্রতীক হিসেবেই চিহ্নিত শুধু। তাই হীনজাতীয় পুরুষ কর্তৃক উচ্চবর্ণের নারীসম্ভোগ সরাসরি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবেই গণ্য হয়-

‘উত্তমাং সেবমানস্তু জঘন্যো বধমর্হতি।
শুল্কং দদ্যাৎ সেবমানঃ সমামিচ্ছেৎ পিতা যদি।।’
কোনও হীনজাতীয় পুরুষ যদি কোনও উচ্চবর্ণের কন্যাকে তার ইচ্ছা অনুসারেও সম্ভোগ করতে থাকে, তাহলে সেই পুরুষের বধদণ্ড হবে। কিন্তু নিজের সমানজাতীয়া কন্যার সাথে ঐরকম করলে সে ঐ কন্যার পিতাকে শুল্ক দেবে, যদি তার পিতা ঐ শুল্ক নিতে ইচ্ছুক হয়। (৮/৩৬৩)।
.
‘শূদ্রো গুপ্তমগুপ্তং বা দ্বৈজাতং বর্ণমাবসন্।
অগুপ্তমঙ্গসর্বস্বৈর্গুপ্তং সর্বেণ হীয়তে।।’
কোনও দ্বিজাতি-নারী স্বামীর দ্বারা রতি হোক্ বা না-ই হোক, কোনও শূদ্র যদি তার সাথে মৈথুন ক্রিয়ার দ্বারা উপগত হয়, তাহলে অরক্ষিতা নারীর সাথে সঙ্গমের শাস্তিস্বরূপ তার সর্বস্ব হরণ এবং লিঙ্গচ্ছেদনরূপ দণ্ড হবে; আর যদি স্বামীর দ্বারা অরক্ষিতা নারীর সাথে সম্ভোগ করে তাহলে ঐ শূদ্রের সর্বস্বহরণ এবং মারণদণ্ড হবে। (৮/৩৭৪)।

এভাবে অন্যান্য দ্বিজাতি পুরুষও যদি তার চেয়ে তুলনামূলক উচ্চবর্ণের রক্ষিতা বা অরক্ষিতা নারীসম্ভোগ করে, তাহলে শূদ্রের মতো তীব্রদণ্ড না হলেও বিভিন্ন দণ্ডের বিধান মনুশাস্ত্রে বর্ণিত আছে। এছাড়াও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিবাহকার্যে একেবারে আনকোরা অক্ষত নারী সরবরাহের ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে নারী সংরক্ষণের নিমিত্তে মনুসংহিতায় ব্যভিচার রোধকল্পে বর্ণস্তর অনুযায়ী বিভিন্নমাত্রার দণ্ডবিধান রাখা হয়েছে। যা অবশ্যই বর্ণ নিরপেক্ষ নয়। এক্ষেত্রে দণ্ডবিধান উচ্চবর্ণীয়দের অনুকুলই বলা যায়।
.
তবে প্রতিলোম-প্রক্রিয়ায় স্ত্রী-ভোগের ফলাফল শুধু এই দণ্ডদানেই থেমে থাকে না। উচ্চবর্ণের স্ত্রীভোগ গুরুতর সামাজিক অপরাধ বা দূষণ হিসেবেও চিহ্নিত। তাই এ প্রক্রিয়ায় দ্বিজাতি পুরুষসৃষ্ট সন্তান উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় বর্ণ-সংকট তৈরি করে বর্ণ-অবনমন ঘটালেও, শূদ্রবর্ণের পুরুষের উৎপাদিত বর্ণসঙ্কর সন্তান তাদের পুত্র-অধিকার হারিয়ে নরাধম হয়ে যায়। এখানে বর্ণবৈষম্য খুবই স্পষ্ট। আর এ অপরাধের মাত্রা বা দূষণপ্রক্রিয়া তীব্রতম হলে অর্থাৎ শূদ্রপুরুষ কর্তৃক ব্রাহ্মণা স্ত্রী দূষিত হলে উৎপাদিত বর্ণসঙ্কর অস্পৃশ্য চণ্ডাল হয়ে যায়-

‘আয়োগবশ্চ ক্ষত্তা চ চাণ্ডালশ্চাধমো নৃণাম্।
প্রাতিলোম্যেন জায়ন্তে শূদ্রাদপসদাস্ত্রয়ঃ।।’
শূদ্র পুরুষ থেকে প্রতিলোমক্রমে জাত অর্থাৎ শূদ্র পুরুষের ঔরসে বৈশ্যা স্ত্রীতে জাত আয়োগব, ক্ষত্রিয়া স্ত্রীতে জাত ক্ষত্তা এবং ব্রাহ্মণী স্ত্রীতে জাত চণ্ডাল- এই তিন জাতি পুত্রকাজ করার অযোগ্য। এই জন্য এরা অপসদ অর্থাৎ নরাধম বলে পরিগণিত হয়। এদের মধ্যে চণ্ডাল হলো অস্পৃশ্য। (১০/১৬)।
.
‘চণ্ডালশ্বপচানাং তু বহির্গ্রামাৎ প্রতিশ্রয়ঃ।
অপপাত্রাশ্চ কর্তব্যা ধনমেষাং শ্বগর্দভম্।।’
চণ্ডাল, শ্বপচ প্রভৃতি জাতির বাসস্থান হবে গ্রামের বাইরে। এইসব জাতিকে ‘অপপাত্র’ করে দিতে হয়; কুকুর এবং গাধা হবে তাদের ধনস্বরূপ। (অপপাত্র হলো যে পাত্রে ভোজন করলে তা আর সংস্কার দ্বারা শুদ্ধ করা চলবে না, তা পরিত্যাগই করতে হবে। অথবা তারা যে পাত্র স্পর্শ করে থাকবে তাতে অন্ন-শক্তু প্রভৃতি দেয়া চলবে না; কিন্তু পাত্রটি মাটির উপর রেখে দিলে কিংবা অন্য কোনও লোক তা হাতে করে ধরে থাকলে তার উপর ভাত-ছাতু প্রভৃতি দিয়ে মাটির উপর রেখে দিলে তারা ঐ খাদ্য গ্রহণ করবে। অন্য অর্থে ভাঙা পাত্রকে অপপাত্র বলে)। (১০/৫১)।

অতএব, সারমর্ম দাঁড়ালো এই, পুরুষতান্ত্রিক বৈদিক ধর্মব্যবস্থায় নারীর নিজের কোন বর্ণ নেই বলে সাধারণ দৃষ্টিতে নারী শূদ্রসমতুল্য। ফলে নারী হচ্ছে পুরুষের ইচ্ছানুরূপ ভোগের নৈবেদ্য। তাকে যথেচ্ছ ভোগ করার পুরুষকেন্দ্রিক বৈধতা রয়েছে। তবে সহজাত পিতৃবর্ণের স্তরভেদ অনুযায়ী নারীর যে আপেক্ষিক বর্ণপরিচয় দাঁড় করানো হয়, তা মূলত আধিপত্যকামী পুরুষতন্ত্রের নিজস্ব আভিজাত্যের আন্তবৈষম্য নির্ণায়ক সামাজিক প্রতীকী মাত্র। তাই তাকে ইচ্ছেখুশি ভোগ করা গেলেও উপজাত হিসেবে সৃষ্ট সন্তানের দ্বারা সমাজে প্রচলিত সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রিক উচ্চ-নিচ বর্ণ-ভারসাম্য নষ্ট করা চলবে না কিছুতেই। কেননা পুরুষতন্ত্রে নারীই হচ্ছে সেই একমাত্র উপাদান, যাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সমাজ-নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় সমাজ-শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকে প্রয়োজনমতো পরিচালিত করা হয়।

(চলবে…)
[১ম পর্ব ] [২য় পর্ব ] [৩য় পর্ব] [৪র্থ পর্ব] [*] [৬ষ্ঠ পর্ব ]

About the Author:

‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।’ -- প্রাচীন গ্রীক কবি ইউরিপিডিস (৪৮০-৪০৬ খ্রীঃ পূঃ)

মন্তব্যসমূহ

  1. রণদীপম বসু ডিসেম্বর 26, 2011 at 1:35 পূর্বাহ্ন - Reply

    প্রথমেই সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলছি, গত তিনদিন আমি অনলাইনে ঢুকার সুযোগ পাইনি বাসা বদলের ঝক্কিতে। বাক্স পেটরা বোঝাই হয়ে আজই নতুন বাসায় উঠলাম। তাই কারো মন্তব্যের জবার দেয়া হয়নি। এই ঝামেলা আরো কয়েকদিন যাবে। পরের পর্বও তৈরি আছে। কিন্তু সেটা পোস্ট করতে পারছি না সময় ও সুযোগের অভাবে। সবকিছু মিলিয়ে একটু চিপায় আছি।
    আশা করি এই দায়ে পড়া অনিয়মটুকুতে কেউ কিছু মনে নেবেন না। নিশ্চয়ই যত শীঘ্র সম্ভব ফিরে আসবো। ধন্যবাদ।

  2. গীতা দাস ডিসেম্বর 24, 2011 at 1:50 অপরাহ্ন - Reply

    ধারাবাহিকটি পড়ার সাথে সাথে আমার পদক্ষেপ হচ্ছে, লেখাটি সংগ্রহে রাখতেছি।

    • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 27, 2011 at 11:51 অপরাহ্ন - Reply

      @গীতা দাস, দিদি, সিরিজটা পড়ে যে মহাপাতকী হচ্ছেন সেই নরকবাস ঠেকাবেন কী করে ! একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিচ্ছি, সব পাপ নাশ হয়ে যাবে। পরীক্ষা পাসের জন্য শেখা স্কুলপাঠ্য মন্ত্রটা এখনো স্মৃতিতে গেঁথে আছে-

      অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তি তার মন্দোদরী তথাঃ
      পঞ্চকন্যা স্মরনিত্যং মহাপাতং নাশনম্ ।

      বেশি বেশি করে জপবেন। বিফলে মূল্য ফেরৎ !

      • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 27, 2011 at 11:55 অপরাহ্ন - Reply

        গীতা দি, মন্ত্রটাতে একটু ভুল হয়ে গেলো ! একটা আ-কার পড়ে নি। আবার শুদ্ধভাবে দিচ্ছি। নইলে ভুল মন্ত্রে পাপের বোঝা আরো বেড়ে যাবে !!

        অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তি তারা মন্দোদরী তথাঃ
        পঞ্চকন্যা স্মরনিত্যং মহাপাতং নাশনম্ ।

        এখানে স্মরনিত্যং না কি শরণিত্যং হবে সেটা কিন্তু খেয়াল নাই, হা হা হা !!

  3. কাজী রহমান ডিসেম্বর 24, 2011 at 1:32 অপরাহ্ন - Reply

    গোগ্রাসে গিলছি। বিষয় দুষ্প্রাপ্য বলে এমন লেখা অবশ্য সংরক্ষণ যোগ্য। কষ্ট করে গবেষণা আর উপস্থাপনার জন্য ধন্যবাদ।

    • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 27, 2011 at 11:43 অপরাহ্ন - Reply

      @কাজী রহমান, গিলছেন তো গোগ্রাসে ! সাথে ওরাল স্যালাইনের ব্যবস্থাটা অভিজিৎ দা রেখেছেন কিনা সেটাও খেয়াল রাখতে হবে কিন্তু, হা হা হা !!

  4. রাজেশ তালুকদার ডিসেম্বর 24, 2011 at 6:39 পূর্বাহ্ন - Reply

    মনুসংহিতায় ব্যভিচার রোধকল্পে বর্ণস্তর অনুযায়ী বিভিন্নমাত্রার দণ্ডবিধান রাখা হয়েছে। যা অবশ্যই বর্ণ নিরপেক্ষ নয়। এক্ষেত্রে দণ্ডবিধান উচ্চবর্ণীয়দের অনুকুলই বলা যায়।

    দন্ডবিধান শারীরিক ছিল না সামাজিক ছিল?

    হিন্দুধর্ম নিয়ে বেশ ওজনদার লেখা। আপনার সুলেখার জন্য সিরিজটি খুব উপভোগ্য হচ্ছে।
    শীতের দিনে এত খাটুনি করে লিখছেন কাছে তো ভাই আপনাকে পাচ্ছি না তাই ভাবলাম ইমো দিয়েই না হয় আপ্যায়ন করি, কি বলেন। এই নিন (C)

    • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 27, 2011 at 11:41 অপরাহ্ন - Reply

      @রাজেশ তালুকদার, দণ্ডবিধান শারীরিক ও সামাজিক উভয়টাই তীব্রভাবে ছিলো। আমার আগের সিরিজ ‘অস্পৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ…’ লেখাটায় ঢু মেরে এ বিষয়ে কিঞ্চিৎ ধারণা নিয়ে নিতে পারেন।

      আর প্রিয় পানীয় চা’এর জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ।

  5. অভিজিৎ ডিসেম্বর 23, 2011 at 11:28 অপরাহ্ন - Reply

    হিন্দু ধর্মের দুরাচার নিয়ে লেখা বাংলা ব্লগগুলোতে কিছুটা কম আসে। আপনি সেই কাজটিই আমাদের জন্য করছেন যা আবুল কাশেম, আকাশ মালিক কিংবা ভবঘুরেরা ইসলামের ক্ষেত্রে করছেন বা করেছেন। অভিবাদন আপনাকে। এর সাথে অবশ্য নৃতত্ত্ব এবং বিবর্তনের বিষয়গুলো যেটা বিপ্লব কোন এক পর্বে উল্লেখ করেছিলো, সেটা নিয়ে একতু চিন্তা করতে পারেন। তাহলে সিরিজটি পূর্ণতা পাবে।

    আপনার এই সিরিজটি আসলেই মূল্যবান। গন্ধর্ব বিয়ে, রাক্ষস বিয়ে প্রভৃতি নিয়ে এরকম লেখা বাংলা ব্লগে সম্ভবত আর নেই।

    চলুক সিরিজটা … (Y) , আর এ নিয়ে বই করার কোন ইচ্ছে আছে নাকি আপনার? আগেও তো হিন্দু ধর্মের উপর আরেকটা সিরিজ লিখেছিলেন (অদৃশ্য ব্রাহ্মণ্যবাদ…), সেটা কি বই হিসেবে এসেছিল? নাকি এবারে আসবে?

    • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 27, 2011 at 11:37 অপরাহ্ন - Reply

      @অভিজিৎ, দা, পরবর্তীতে বেদ নিয়ে এরকম একটা সিরিজ লেখার খেয়াল আছে। তখন হয়তো এই নৃতাত্ত্বিক বিষয়গুলো চলে আসবে। মনুসংহিতা তো আসলে হিন্দু ধর্মের সংবিধান, অনুশাসনমূলক গ্রন্থ। তাই এখানে ওই খুব একটা প্রযোজ্য হয় না মনে করেই নৃতাত্ত্বিক বিষয়গুলো আনা হয় নি।

      আর আগের ‘অদৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ’ সিরিজের আম্বেদকরের জীবনী বাদে বাকি অংশটা প্রবন্ধাকারে গতবার শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত ‘অবমুক্ত গদ্যরেখা‘ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছি অন্যান্য বেশ কিছু প্রবন্ধের সাথে।
      তবে প্রকাশকের আগ্রহ থাকলে ‘মনুশাস্ত্রে নারী ও ব্রাহ্মণ্যবাদ‘ শিরোনামে ছয়-সাত ফর্মার একটা বই হতে পারে।

      আর ভারতীয় দর্শন নিয়ে কাজ করছি এখন। আপাতভাবে আগামী এক বছরের একটা টার্গেট নিয়েছি। দেখা যাক কতোটা কী হয় ! তবে যাই হোক অন্তর্জালে ভারতীয় দর্শনের ঘাটতিটা কিঞ্চিৎ পূরণ করার দরকার মনে করছি। যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ আর ঘটে থাকে সামর্থ ততক্ষণ চলবে…

  6. বিপ্লব রহমান ডিসেম্বর 23, 2011 at 6:22 অপরাহ্ন - Reply

    রাক্ষস-বিবাহের স্বরূপ

    ‘হত্বা চ্ছিত্ত্বা চ ভিত্ত্বা চ ক্রোশন্তীং রুদতীং গৃহাৎ।
    প্রসহ্য কন্যাহরণং রাক্ষসো বিধিরুচ্যতে।।’
    বাধাপ্রদানকারী কন্যাপক্ষীয়গণকে (আহত) নিহত করে, (অঙ্গ) প্রত্যঙ্গ ছেদন করে এবং গৃহ প্রাচীর প্রভৃতি ভেদ করে যদি কেউ চীৎকারপরায়ণা ও ক্রন্দনরতা কন্যাকে গৃহ থেকে বলপূর্বক অপহরণ করে, তবে একে রাক্ষস-বিবাহ বলা হয়। (৩/৩৩)।

    রাক্ষস বিবাহ সম্পর্কে আরো জানতে ইচ্ছে করছে। প্রাচীনকালে এমন বিবাহ প্রায়ই হতো নাকী? :-s

    এই গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকটির জন্য রণো দা’কে শুভেচ্ছা জানাই আরেকবার। চলুক। (Y)

    • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 27, 2011 at 11:20 অপরাহ্ন - Reply

      @বিপ্লব রহমান, বিপ্লব দা, রাক্ষস বিয়ে নিয়ে আপনার আগ্রহ তো বিপজ্জনক দেখছি ! খুব সুবিধের তো মনে হচ্ছে না ! হাহ হা হা !!

  7. শাখা নির্ভানা ডিসেম্বর 23, 2011 at 6:58 পূর্বাহ্ন - Reply

    খুব ইক্রিটিকাল একটা লেখা হয়েছে। এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলেছি। বিবাহের অনেক শ্রেনী বিন্যাস সম্পর্কে ধারনা হলো। শ্রম সাপেক্ষ রচনার জন্য অসংখ্যা ধন্যবাদ। রাক্ষস বিবাহের কথা পড়ে হাসি চেপে রাখতে পারিনি। এ ধরনের বিবাহ সব সমাজেই আছে। তাহলে বিবাহের এই শ্রেনী বিন্যাস মানুষের মনস্তাত্তিক ভাব ও সামাজিক আচারনের উপর ভিত্তি করে একটা বিশেষ শ্রেনীকে সুবিধে ভোগী করার জন্য করা হয়েছে বলা যায়। বৈদিক সমাজের বিষয়ে এমন সহজ করে লেখা কোন রচনা আগে আমার চোখে পড়েনি।

    • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 27, 2011 at 11:18 অপরাহ্ন - Reply

      @শাখা নির্ভানা, প্রশংসা দিয়ে তো একেবারে তরল বানিয়ে দিলেন আমাকে ! হা হা হা !!
      অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

  8. কাজি মামুন ডিসেম্বর 23, 2011 at 12:37 পূর্বাহ্ন - Reply

    রনদীপম-দা,
    আপনার সিরিজটি পড়ে মনুসংহিতা সম্পর্কেই শুধু জানা হয়নি, সাথে সাথে আমাদের সমাজে এখন পর্যন্ত চলা অনেক সংস্কার, নিয়ম কানুন আর ব্যবস্থার আদি উৎসের খবরও পেয়ে যাচ্ছি! আপনার বর্ণনা এত গোছানো ও পরিশীলিত যে, পাঠকের অনভ্যস্ত চোখ সহজেই এর বিষয়বস্তুর সাথে মানিয়ে নিতে পারছে!

    ঋতুমতী কন্যাকে যে বিবাহ করবে সেই ব্যক্তি কন্যার পিতাকে কোন শুল্ক দেবে না। কারণ, সেই পিতা কন্যার ঋতু নষ্ট করছেন বলে কন্যার উপর তার যে অধিকার তা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন।

    এখানে কন্যার স্বাধীণসত্তার উপর আঘাতকে ছাপিয়েও আমার যে কথা মনে হল, তা হচ্ছে, পিতার দায়িত্ববোধের ব্যাপারে মনুসংহিতার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

    বরং পিতার ব্যর্থতায় প্রজননযোগ্য কন্যার এই স্বপ্রণোদিত পুরুষানুগমন ধর্মীয় পিতৃতন্ত্রের বাধ্যবাধকতাই নির্দেশ করে।

    এই কথাটার মানে ঠিক বুঝতে পারিনি!

    আর্যবিবাহে যেমন গোমিথুন নির্দিষ্ট করা হয়, আসুর বিবাহে তেমন হয় না। এখানে বর কন্যার রূপ ও গুণে আকৃষ্ট হয়ে এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তার সামর্থ অনুযায়ী কন্যার মূল্যস্বরূপ অনির্দিষ্ট পরিমাণ শুল্ক বা অর্থের বিনিময়ে কন্যা গ্রহণ বা সংগ্রহ করা হয়]।

    এতো দেখছি আজকের যৌতুক ব্যবস্থার পুরো বিপরীত! শুল্ক ব্যবস্থা আমার কাছে অন্তত যৌতুকের চেয়ে শ্রেয় মনে হয়! তাহলে আমরা কি মনু সংহিতার যুগের চেয়েও সময়ে বসবাস করছি আমরা?

    বাধা-প্রদানকারী কন্যাপক্ষীয়গণকে (আহত) নিহত করে, (অঙ্গ) প্রত্যঙ্গ ছেদন করে এবং গৃহ প্রাচীর প্রভৃতি ভেদ করে যদি কেউ চীৎকার-পরায়ণা ও ক্রন্দনরতা কন্যাকে গৃহ থেকে বলপূর্বক অপহরণ করে, তবে একে রাক্ষস-বিবাহ বলা হয়।

    এই যুগেও আমরা এমন জোরপূর্বক বিয়ে দেখতে পাই; তাই মনুসংহিতা রাক্ষস-বিবাহ নামকরণ করার মাধ্যমে একে যে নিকৃষ্ট হিসাবে আখ্যায়িত করেছে, তাকে তো আমার সঠিক বলেই মনেই হচ্ছে!

    তবে টিকাকারদের অভিমত এই যে, পরে হোম-সংস্কারের দ্বারা ঐ নিন্দনীয় সকল বিবাহেরই স্বীকৃতি দেয়া হয়]।

    হোম-সংস্কার বিষয়টি ঠিক বুঝলাম না। এই স্বীকৃতির পেছনের কারণগুলো জানতে পারলে ভাল হত!

    কোনও দ্বিজাতি-নারী স্বামীর দ্বারা রতি হোক্ বা না-ই হোক, কোনও শূদ্র যদি তার সাথে মৈথুন ক্রিয়ার দ্বারা উপগত হয়, তাহলে অরক্ষিতা নারীর সাথে সঙ্গমের শাস্তিস্বরূপ তার সর্বস্ব হরণ এবং লিঙ্গচ্ছেদনরূপ দণ্ড হবে; আর যদি স্বামীর দ্বারা অরক্ষিতা নারীর সাথে সম্ভোগ করে তাহলে ঐ শূদ্রের সর্বস্বহরণ এবং মারণদণ্ড হবে।

    কিন্তু অরক্ষিতা নারীটির কি কোন শাস্তি হবে না? মনে হচ্ছে, মনুসংহিতার নারী বৈষম্য এর জাত বৈষম্যক্যকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি!

    • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 23, 2011 at 1:09 পূর্বাহ্ন - Reply

      @কাজি মামুন, আপনি যে কথাটার মানে বুঝেন নি বলছেন, তা হচ্ছে, কন্যা ঋতুবতী হলে কিছুতেই তার ঋতু নষ্ট করা যাবে না, তাতে বীজ রোপন করতে হবে। পিতা তাকে সম্প্রদানে ব্যর্থ হলে কন্যা নিজেই কাউকে বাছাই করে ফেলতে পারছে। আসলে কন্যা কি বাছাই করছে ? আরেকটি পুরুষই কন্যাটিকে নিজের মতো করে বাছাই করে ফেলছে। খেয়াল করে দেখেন, এখানে কন্যার কিন্তু নিজস্ব কোন মতামত নেই। সে তো একটি পচনশীল (রূপকার্থে) ফল বা পণ্য ! ঋতুমতি হওয়া মানে ফল খাওয়ার উপযুক্ত হয়ে গেছে। এখন তা আর ফেলে রাখা যাবে না। তাড়াতাড়ি পুরুষতন্ত্রের ভোগে লাগাতে হবে। জন্মদাতা পিতাও তাকে ধরে রাখার অধিকার হারিয়ে ফেলেন ! অর্থাৎ এখানে ব্যক্তি গৌন, সিস্টেমটাই মুখ্য।

      তবে আপনার মধ্যে আরো যে প্রশ্নগুলোর জন্ম হয়েছে তা আস্তে আস্তে আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে পর্ব আরো সামনে আগালে। তাই অন্য বিষয়ে আর ব্যাখ্যায় গেলাম না। মনুর গোটা আবহটা জানা হয়ে গেলে তখন দেখবেন যে দুয়ে দুয়ে চার হওয়ার গাণিতিক সূত্রটা কী চমৎকার মিলে যায় !!

  9. নষ্ট কবি ডিসেম্বর 22, 2011 at 9:44 পূর্বাহ্ন - Reply

    আপনি দাদা মনুর বৈদিক চোখ নাম দিয়ে যে উক্তি গুলি করছেন সব তো মনুসংহিতা থেকে নেয়া।

    আপনি বেদ থেকে কোট করেন

    আমি আপনাকে কিছু রেফারেন্স দিচ্ছি

    বেদে নারী ৩ http://www.shonaton.com/archives/1095
    বেদে নারী ২ http://www.shonaton.com/archives/1071
    বেদে নারী ১ http://www.shonaton.com/archives/1067

    আরো আসছে সিরিজ আকারে

    • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 22, 2011 at 8:42 অপরাহ্ন - Reply

      @নষ্ট কবি, মনুর চোখ যা দেখছে তা তো মনুসংহিতাতেই থাকবে, বেদে নয়। তবে প্রথম দিকের পর্বে মনু স্পষ্টোক্তিটাতো আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মনুসংহিতা পুরোটাই বেদবিহিত, এর বাইরে নয়। এর সমর্থনে বিভিন্ন উপনিষদ শাস্ত্রের উক্তিও তুলে ধরেছি। তাছাড়া বেদকে সাধারণ্যে বুঝার মতো করেই তো মনুসংহিতার সৃষ্টি হয়েছে বলা হয়েছে। এবং এটাও বলা হয়েছে যে, মনুসংহিতার বাইরে আর কোন শাস্ত্রগ্রন্থের প্রয়োজন নেই। যেখানে বিরোধ দেখা দেবে সেখানে মনুর বিধানকেই মান্য করতে হবে। মূল বিষয়ে প্রবেশের আগে এসব ব্যাখ্যা প্রথম দুতিন পর্বে করা হয়েছিলো এজন্যেই। এবং আমি এখনো বলি যে, হিন্দু সমাজ সংস্কৃতিতে বেদের কোন ব্যবহারিক মূল্য নেই একটুও। সেখানে মনুরই প্রাধান্য। বেদ কোন শাস্ত্রগ্রন্থও নয়। বেদ নিয়ে যখন সিরিজ করবো তখন এসব নিয়ে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করবো।

      আর আপনি সনাতন সাইটে সংরক্ষণ করা বেদের ইংরেজি ভার্সনের যে লিংক দিয়েছেন তা আমার কাছে নির্ভরযোগ্য মনে হয়নি। কারণ আমার কাছে চারটি বেদের মোট পাঁচটি বিরাট বিরাট ভল্যুম সংরক্ষিত আছে। এই মন্তব্য করার আগে বৈদিক শ্লোক, এর বঙ্গানুবাদ ও টিকাসহ কয়েকটি মণ্ডল, সুক্ত ও ঋক মিলিয়ে দেখেছি আপনার দেয়া ইংরেজি অনুবাদের সাথে। প্রচুর বৈসাদৃশ্য চোখে পড়েছে। কোন কোন ঋকের তো পুরোটাই অমিল দেখলাম। অম্পূর্ণও আছে কতকগুলো। আর যারা ইংরেজি করেছেন, এতো উদ্দেশ্যমূলক সহজভাবে অনুবাদ করেছেন যে রীতিমতো হতবাক হয়ে গেছি ! মূল বৈদিক সুক্তগুলোতে সত্যি কি তা-ই বলা হয়েছে যা ইংরেজি অনুবাদে দেখলাম ? আপনার প্রদত্ত নমুনার মূল শ্লোকগুলো বাংলা অনুবাদসহ তুলে দেয়ার ইচ্ছা থাকলেও এই জটিল কাজটা এ মুহূর্তে করলাম না অন্য তাড়া থাকায় (বাসা বদল করার ঝামেলায় আছি)। এরপরও যদি একান্ত আপত্তি থাকে, অনুযোগ যেহেতু করেই ফেললাম, সময় করে কিছূ কিছূ নমুনা তো হাজির করতেই হবে !

      তবে একটা অনুরোধ রাখি। আপনার বেদের ইংরেজি অনুবাদগুলো সাইটে প্রকাশ করার আগে একটু কষ্ট করে যদি মূল শ্লোক (বঙ্গানুবাদের) এবং যথাযথ মণ্ডল, সুক্ত ও ঋকগুলো যাচাই করে নেন তাহলে পরবর্তী অনেক জটিলতা আগেভাগেই কেটে যাবে। প্রয়োজনে মনুসংহিতার মতো পিডিএফ করে করে তুলে রাখতে পারেন।

      মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। নিশ্চিন্তে নির্দ্বিধায় মন্তব্য মতামত জানাবেন। অবশ্যই তা সাদরে গৃহীত হবে এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনাও আগাবে এবং আমাদের সবার জন্য তা সহায়ক হবে। ভালো থাকুন।

      • আকাশ মালিক ডিসেম্বর 22, 2011 at 9:27 অপরাহ্ন - Reply

        @রণদীপম বসু,

        নষ্ট কবির সাথে বঙ্গানুবাদ নিয়ে যা আলোচনা করলেন, এতো দেখি কোরানের সেই আসল আরবী, নকল আরবীর কায় কায়বার। হাদিস বলে এক কথা তাফসির (ব্যখ্যা) বলে আরেক কথা, মনের মাধুরী মিশিয়ে বারোজন অনুবাদকারী বা তাফসিরকারক এক আয়াতের (বাক্যের) বারো প্রকার ব্যাখ্যা দেন। দাদা আমার অজ্ঞতা ক্ষমা করবেন, মণ্ডল, সুক্ত ও ঋকগুলোর মধ্যে পার্থক্য কী বা এদের পুরো অর্থটা কী?

        • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 23, 2011 at 12:54 পূর্বাহ্ন - Reply

          @আকাশ মালিক, হা হা হা ! অনেকটা সেরকমই তো মনে হচ্ছে !

          প্রতিটা বেদকে কতগুলো মণ্ডলে ভাগ করা আছে, যেমন ঋগ্বেদ দশটি মণ্ডলে বিভক্ত। এগুলোকে ঠিক অধ্যায় বলাও সঙ্গত হবে না। আসলে একেকটা মণ্ডলের রচয়িতা নির্দিষ্ট একজন ঋষির গোত্রস্য বিভিন্ন ঋষিরা। হতে পারে তা বংশ পরম্পরা বা শিষ্য পরম্পরা। এই পরম্পরা কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় সমাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতেও এরকম ঘরানা বা পরম্পরা রয়েছে খেয়াল করবেন। অনেকটা সেরকমই।

          এই প্রতিটা মণ্ডলে বহু সুক্ত রয়েছে। সুক্তগুলোকে যদি একেকটা দীর্ঘ কবিতাকৃতি বিবেচনা করি এর প্রত্যেক দ্বিপদী পংক্তিকে একেকটা ঋক বলা হয়। আসলে সুক্তগুলোকে কোন কবিতাও বলা যাবে না এজন্যেই যে এর সবগুলো ঋক একই বিষয়ে থাকে না।

          এই পোস্টে মনুসংহিতার যে দুলাইনের সংস্কৃত শ্লোকগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, ঋকগুলোও অনেকটা এরকমই। কিন্তু মনুসংহিতায় যেমন বারটি বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়ে বিভক্ত এবং প্রত্যেক অধ্যায়ে এরকম অসংখ্য এরকম আলাদা আলাদ দ্বিপদী শ্লোক রয়েছে, বেদে মণ্ডল বারোটি এবং প্রত্যেকটি মণ্ডলের বহু সুক্ত রয়েছে। এবং প্রতি সুক্ত এরকম দ্বিপদী অনেকগুলো ঋকের সমন্বয়ে গঠিত। এজন্যেই মনুর শ্লোক চিহ্নিত করতে অধ্যায়ক্রম আর শ্লোক নম্বর উল্লেখ করা হয় দুটো গাণিতিক চিহ্নের সমন্বয়ে, যেমন ১০/৫১। এটা দিয়ে বুঝানো হয় মনুসংহিতার ১০ম অধ্যায়ের ৫১ নম্বর শ্লোক। অন্যদিকে বেদের ক্ষেত্রে তিনটি গাণিতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, যেমন ঋগ্বেদ ৫/১৮/১৪ এরকম। এটার অর্থ ঋগ্বেদের ৫ম মণ্ডলের ১৮ নম্বর সুক্তের ১৪ নম্বর ঋক। উল্লেখ্য বেদে কিন্তু একেকটা মণ্ডলের প্রত্যেকটি সুক্ত ১ থেকে পর্যায়ক্রমিক নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা এবং প্রতিটি সুক্তের দ্বিপদী ঋকগুলোও ১ থেকে পর্যায়ক্রমিক নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা আছে।

          আমি কি বোঝাতে পারলাম ?

          • আকাশ মালিক ডিসেম্বর 23, 2011 at 9:42 পূর্বাহ্ন - Reply

            @রণদীপম বসু,

            আমি কি বোঝাতে পারলাম ?

            থ্যাঙ্ক ইউ দাদা। এবার বুঝেছি, কোরানের সেই সুরা, পারা, আয়াতের মতো। তবে সাহিত্যমানে বোধ হয় কোরানের চেয়ে বেদ আর রামায়ণ-মহাভারত অনেক উঁচু মানের। সংস্কৃত না শিখে ভুলই করলাম। আপনার লেখাগুলো কিন্তু রেফারেন্সের কাজে লাগবে, শুধু লাগবে কি আমি কিছুকিছু জায়গায় ব্যবহারও করেছি।

            আপনাকে আশেষ ধন্যবাদ এমন একটি লেখা আমাদেরকে উপহার দেয়ার জন্যে। (Y) (F)

  10. হেলাল ডিসেম্বর 22, 2011 at 6:58 পূর্বাহ্ন - Reply

    @ রণদা,
    (Y)
    সাথে আছি।

    • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 22, 2011 at 8:43 অপরাহ্ন - Reply

      @হেলাল, ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য।

  11. বিনায়ক হালদার ডিসেম্বর 22, 2011 at 12:06 পূর্বাহ্ন - Reply

    অসাধারণ একটা লেখা।আপনার এই পর্বটা খুব ভাল লেগেছে।তবে একটা প্রশ্ন আছে। গান্ধর্ব বিবাহ সেই যুগে কেমন হত বা গাধর্ব বিবাহ যারা করত তাদের সমজে কি চোখে দেখা হত তার কি কোন ক্লু পাওয়া যায় মনু সংহিতায় ?

    • বিনায়ক হালদার ডিসেম্বর 22, 2011 at 12:07 পূর্বাহ্ন - Reply

      sorry, গান্ধর্ব হবে।

    • রণদীপম বসু ডিসেম্বর 22, 2011 at 1:29 পূর্বাহ্ন - Reply

      @বিনায়ক হালদার, একালেই গান্ধর্ব বিয়েকে কিভাবে দেখা হয় তা দিয়েই হয়তো আঁচ করা যায় সেকালে কিরকম দেখা হতো। তাছাড়া উৎকৃষ্টতার বিচারে খেয়াল করলে দেখবেন যে এটা উপর থেকে ষষ্ঠ অবস্থানে। অতএব বুঝতেই পারছেন গান্ধর্বের কী হাল ! হা হা হা !!

      মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন