পূর্ববর্তী পর্বঃ ::রক্তাক্ত প্রদেশ, খণ্ডিত উপমহাদেশ::

প্রাচীনকালে মানুষ গল্প বানাতে ভালোবাসতো। আধুনিক কালেও মানুষ সেটাই ভালোবাসে। কাল কোনো ব্যাপার না। প্রাচীন হোক আর আধুনিক হোক, যেখানে মানুষ কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি, যেখানে গিয়ে তারা থমকে গেছে, সেখানেই তারা তৈরী করেছে মন-গড়া গল্প। ক্ষেত্রবিশেষে এ-সমস্ত গল্পের প্রভাব এত বেশি যে, পরবর্তীতে মানুষের কৃষ্টি-কালচার, ইতিহাসই আবর্তিত হয়েছে সে-সমস্ত গল্পকে কেন্দ্র করে। মানুষের বানানো সেরকমই এক গল্পের ফল হিসেবে অষ্টম শতাব্দীতে পৃথিবীর ইতিহাসে জন্ম হয় এক রহস্যময়, কল্পিত দ্বীপের। কথিত আছে যে, মুসলিমদের স্পেন বিজয়ের প্রাক্কালে ৭১৪ খ্রিস্টাব্দে, আক্রমণকারীদের রোষানল থেকে মুক্তি লাভের আশায় সাতজন খ্রিস্টান বিশপ(উচ্চপদস্থ খ্রিস্টীয় যাজক)পাল তুলে পাড়ি জমান অজানা আটলান্টিক মহাসাগরে। দিনের পর দিন টানা জাহাজ চালিয়ে দিগ্বিদিক হয়ে অবশেষে আটলান্টিকের মাঝে খুঁজে পান এক রহস্যময় দ্বীপ। পীরতন্ত্রের সংবিধান অনুযায়ী এক ঘরমে দো পীর যেমন থাকা সম্ভব নয়, তেমন বিশপতন্ত্রের সংবিধান অনুযায়ী এক শহরে সাত বিশপও থাকা সম্ভব নয়। অতএব, প্রত্যাশিত ও অবধারিতভাবে রহস্যময় দ্বীপটিকে সাতভাগে ভাগ করা হলো। সাতভাগে বিভক্ত হওয়া দ্বীপের নামকরণ হলো সাতজন বিশপের নামে। সাত বিশপের নামে গড়ে উঠা এই সাত শহরের কল্পিত দ্বীপের নাম ‘এন্টিলিয়া’। অনেকে সাত শহরের দ্বীপও বলে থাকেন।

পরবর্তীতে শতকের পর শতক ধরে এই রহস্যময় ‘এন্টিলিয়া’ দ্বীপের কোনো সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া না গেলেও, প্রায় আটশো বছর পরে ১৪৯২ সালে খুঁজে পাওয়া যায় সত্যিকারের এক দ্বীপপুঞ্জ। এবার আর কল্পিত নয়, একেবারেই দিনের আলোর মত পরিষ্কার; তবে রহস্যময়, অপার রহস্যময়। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে-সমস্ত রহস্যের আবির্ভাব ঘটেছে, মানব প্রজাতি যে সমস্ত রহস্যের মুখোমুখি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যকার এক অনন্য রহস্য এই দ্বীপপুঞ্জ। অসাধারণ এই রহস্যের জন্ম দিয়ে ১৪৯২ সালের ১২ই অক্টোবর ইতালিয়ান বংশোদ্ভুত, স্প্যানিশ নাবিক ক্রিস্টোফার কলাম্বাস তার বহরের তিন জাহাজ ‘নিনা’, ‘পিন্টা’ আর ‘সান্টা মারিয়া’ নোঙ্গর করালেন বর্তমান বাহামা দ্বীপেপুঞ্জের অন্তর্গত ‘সান সালভাদরে’।

তৎকালীন ইউরোপ কিংবা এশিয়ার মানুষজনের স্বপ্নেও ছিলো না, এরকম একটি দ্বীপের অস্তিত্বের কথা। স্পেন থেকে যাত্রা শুরু করে, কথা ছিলো চার সপ্তাহের মধ্যে কোনো ভূমির সন্ধান না পেলে ফিরে যাবেন কলাম্বাস। চার সপ্তাহ সময় পার হয়ে যাবার পর, কোনো ভূমির নাম-গন্ধও না দেখে, তার নাবিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলো। ১০ই অক্টোবার স্থির হয়, আর তিনদিন অনুসন্ধান শেষে কিছু দেখতে না পেলে, ফিরে যাবেন কলাম্বাস আর তার সঙ্গী নাবিকরা। কিন্তু ১২ই অক্টোবার মধ্যরাতের ঠিক দুইঘন্টা পর, ‘পিন্টা’র নাবিক ‘রডরিগে ডি ত্রিয়ানা’ সর্বপ্রথম অনুধাবন করতে পারেন ভূমির অস্তিত্ব। তাদের সে-দিনের সেই আবিষ্কারের আনন্দ, কলাম্বাস কিংবা তার নাবিকদের সে-দিনের সেই অনুভূতি হয়তো কিছুতেই ভাষায় প্রকাশ করার নয়। ভাষায় না হোক, তবু সুরের জাদুকর ‘ভ্যাঞ্জালিস’ সুরের মূর্ছনা দিয়ে সে অনুভূতি কিছুটা প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন।

বিজয়ী দল সর্বপ্রথম আধিপত্য বিস্তার করে পতাকা আর নাম পরিবর্তন দিয়ে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না। কলাম্বাস একে একে ছোটো ছোটো দ্বীপগুলোর নাম পরিবর্তন করলো স্প্যানিশ রানী ইসাবেলা, রাজা ফার্দিনান্দ, বিভিন্ন সাধু, সন্যাসীর নামে। সর্বোপরি, নতুন এই ভূমির আবির্ভাবে স্প্যানিশরা যেন শত শত বছর পর তাদের কল্পিত সেই দ্বীপ এন্টিলিয়াকেই খুঁজে পেলো। রহস্যের প্রতীক সেই এন্টিলিয়ার নামেই কালক্রমে নতুন এই ভূমির নাম হয়ে পড়লো এন্টিলিজ- গ্রেটার এন্টিলিজ ও লেসার এন্টিলিজ। মানচিত্রে তুলনামূলকভাবে উপরের দিকে থাকা গ্রেটার এন্টিলিজ বসবাসকারী অধিবাসীরা ছিলো মূলত ‘তাঈনো’ সম্প্রদায়ের, অন্য দিকে নিচের দিকে থাকা লেসার এন্টিলিজ অধিবাসীদের বেশিরভাগ ছিলো ‘ক্যারিব’ সম্প্রদায়ের আদি অধিবাসী। যাদের নাম অনুযায়ী এ অঞ্চলকে বলা হয়ে থাকে ‘ক্যারিবিয়ান’।

ছবিঃ গ্রেটার এন্টিলিজ ও লেসার এন্টিলিজ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ (সৌজন্যেঃ উইকিপিডিয়া)

ছবিঃ কলাম্বাসের অনুসরণ করা নৌপথ (সৌজন্যেঃ কলাম্বাস নেভিগেশান)

ছবিঃ কলাম্বাসের অনুসরণ করা নৌপথ (সৌজন্যেঃ কলাম্বাস নেভিগেশান)

যদিও কলাম্বাসের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখনকার দিনে স্পেন থেকে পূর্বমুখী জাহাজ চালিয়ে ইন্ডিয়া পৌঁছাতে হলে সমস্ত আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে তারপর যেতে হয় ইন্ডিয়া অভিমুখে।(বর্তমানে সমস্ত আফ্রিকা ঘুরে ইন্ডিয়া যেতে হয় না। কারণ, ভূমধ্যসাগর পার হয়ে, কৃত্রিম ভাবে তৈরী করা সুয়েজ খাল দিয়ে শর্টকাট পথ অনুসরণ করা যায়। ইউরোপ থেকে আফ্রিকা না ঘুরে এশিয়া যাবার সুয়েজ খাল ছাড়া অন্য আর কোনো সহজ পথ নেই। যার জন্য সুয়েজখাল ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিকভাবে এতটা গুরুত্বপূর্ন)।কলম্বাসের পরিকল্পনা ছিলো পশ্চিম দিকে জাহাজ চালিয়ে যদি ইন্ডিয়া পৌঁছা যায়, তাহলে ইউরোপের অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোকে পিছনে ফেলে ব্যবসায়িক দিক থেকে স্পেন এগিয়ে যেতে পারবে। এই প্রস্তাব দিয়েই কলম্বাস রানী ইসাবেলাকে অভিযানের খরচ জোগাড় করতে রাজী করিয়েছিলেন। কথিত আছে যে, রানী ইসাবেলা নিজের গয়না বিক্রি করে এই অভিযানের খরচ বহন করেছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইন্ডিয়ার খোঁজে স্পেন থেকে পশ্চিমমুখী অভিযানে বের হওয়া এই দীপপুঞ্জকে প্রথমে মনে করা হয়েছিলো ‘ইন্ডিয়া’ আর দ্বীপের অধিবাসীদের মনে করা হয়েছিলো ‘ইন্ডিয়ান’। তাই পশ্চিমে পাওয়া এই ভুল ইন্ডিয়ার ভুল করে দেয়া নাম হয়ে যায় ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ আর অধিবাসীদের নাম হয় ‘রেড ইন্ডিয়ান’।

ছবিঃ যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওহাইয়ো’ স্টেট এর রাজধানী ‘কলাম্বাস’ শহরের রাখা ‘সান্টা মারিয়া’র রেপ্লিকা (সৌজন্যেঃ লেখক)

ছবিঃ যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওহাইয়ো’ স্টেট এর রাজধানী ‘কলাম্বাস’ শহরের রাখা ‘সান্টা মারিয়া’র রেপ্লিকা (সৌজন্যেঃ লেখক)

এখানেই শেষ নয়, ভুলের আবর্তে ঘুরতে থাকা এই অভিযানের ফলে, পরবর্তীতে যে দুটো মহাদেশের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় তার কোনোটির নামই কলাম্বাসের নামে নয়। ইতালিয়ান বা রোমানরা এত এত ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে যে, তারা হয়তো প্রচার করতে ভুলেই গেছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম দুই নাবিকের জন্ম এই ইতালিতেই। একজন ক্রিস্টোফার কলাম্বাস, অন্যজন অ্যামিরিগো ভেস্‌পুচি। কলম্বাস তার প্রথম অভিযানের পরেও আরো কয়েকবার একই পথে অভিযানে গিয়েছিলেন। কিন্তু, ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের হয়ে অভিযানে যান অ্যামিরিগো ভেস্‌পুচি। যদিও বর্তমানে এই অভিযানের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা হয়। বলা হয়ে থাকে, ভেস্‌পুচি আদৌ এই অভিযানে যাননি; সমস্তটাই অপপ্রচার এবং জালিয়াতি। তবে এটা ঠিক যে, আরো কিছুদিন পরে বেশ কিছু অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন অ্যামিরিগো ভেস্‌পুচি। ১৪৯৭ এর অভিযানে যান আর না-ইবা যান, ১৫০৭ সালে মানচিত্র নির্মাণকারী মার্টিন ওয়াল্ডসিম্যুয়েলার এবং ম্যাথিয়াস রিংম্যান্‌ তাদের বিখ্যাত মানচিত্র ‘ইউনিভার্স্যালিস্‌ কসমোগ্রাফিয়া’তে অ্যামেরিগো ভেস্‌পুচির প্রতি সন্মান দেখিয়ে তার নামের প্রথম অংশ থেকে ‘অ্যামেরিকা’ শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যাবহার করেন। সেদিন তাদের দেয়া সেই নামেই আজও সারা বিশ্বে পরিচিত ‘অ্যামেরিকা’।

যেদিন কলাম্বাস বাহামার (সান সালভাদর) মাটিতে প্রথম পদচিহ্ন রাখেন, সে-পর্যন্ত মানব জাতির ইতিহাস গর্বের, সাহস আর বীরত্বের; সেই ইতিহাস দুর্জেয়কে জয় করার, অনতিক্রম্যকে অতিক্রম করর। এরপর ইতিহাসের মোড় ঘুরে যাবার পালা। এর পরের ইতিহাস মানব জাতির কলঙ্কের ইতিহাস, অবমাননা আর অসন্মানের ইতিহাস। সেই ইতিহাস বড়ই দুঃখের, বড়ই লজ্জার।

**আগামী পর্বে ( কলাম্বাস পরবর্তী নির্যাতন এবং বিদ্রোহী ‘এনরিকে’) সমাপ্য।

মইনুল রাজু (ওয়েবসাইট)
[email protected]

তথ্যসূত্রঃ
১। মুভ্যিঃ কনকোয়েস্ট অব প্যারাডাইজ
২। ফাইভ হান্ড্রেড নেশানস
৩। কলাম্বাস নেভিগেশান
৪। উইকিপিডিয়া
৫। ইন্টারনেট

[205 বার পঠিত]