[সাবেক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধকে বহুবছর ধরে বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে রাখা হয়েছে। খাটো করে দেখা হয়েছে পাহাড়ি জনগণের মুক্তিযুদ্ধ তথা ১৯৭১ সালে তাদের সব ধরণের চরম আত্নত্যাগের ইতিহাস। একই সঙ্গে সারাদেশে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের আত্নত্যাগকেও অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করার অপপ্রয়াস চালানো হয়। এ কারণে লেখার শিরোনামে ‘অন্য আলোয় দেখা’ কথাটি যুক্ত করা হয়েছে। বলা ভালো, এটি মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোনো গুঢ় গবেষণাকর্ম নয়; এটি নিছকই পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি আলোচনার অবতারণা মাত্র।]

পাহাড়ের হত্যাযজ্ঞ পর্ব: একটি অপ্রকাশিত দলিল

১৯৬০ কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে কাপ্তাই জলবিদ্যুত নির্মাণ করা হলে প্রায় এক লাখ পাহাড়ি মানুষ সহায়-সম্বল হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন। তাদের অনেকেই প্রধানত ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে তখনকার ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ত্রিপুরা রাজার সঙ্গে সাাতে এলে ত্রিপুরার পাহাড়ি শরণার্থীরা আট পৃষ্ঠার পুস্তিকা আকারে তাকে একটি স্মারক লিপি হস্তান্তর করেন। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ১৯৭১-৭২ সালে পাকিস্তানী বাহিনী, কতিপয় বিপথগামী মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ রাইফেলস, বিডিআর (এখন বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ, বিজিবি) সদস্য কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরস্ত্র পাহাড়ি জনপদে চালানো একাধিক একাধিক হত্যাযজ্ঞ, লুঠতরাজ ও অপারেশনের রোমহর্ষক বর্ণনা দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় যেমন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তেমনি মং রাজা মং প্র“ সেইন আবার মুক্তিযুদ্ধের পে কাজ করেছেন। সে সময় রাজা মং প্র“ সেইন মুক্তিবাহিনীর জন্য নিজ প্রাসাদ উজাড় করে দেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার প্রাসাদে থেকেই যুদ্ধ করেছিলেন, বহু সাহায্য পেয়েছিলেন। এছাড়া পাহাড়ি নেতা এমএন লারমা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। চাকমা রাজার কাকা শ্রী কেকে রায়ও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। কিন্তু শুধু সন্দেহের বশে তাকে ত্রিপুরায় আটক করা হয়েছিল। স্মারকলিপিটিতে এসব বিষয়ও তুলে ধরা হয়। এই অধ্যায়টি আমরা পরের পর্বগুলোতে আলোচনা করবো।


এই লেখক ১৯৯৬-৯৭ সালে এপারের পাহাড়ি শরণার্থীদের ওপর সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরির জন্য তথ্য-সাংবাদিকতার পেশাগত কাজে একাধিকবার ত্রিপুরা রাজ্য সফর করেন। সে সময় ত্রিপুরার স্থায়ী বাসিন্দা, স্কুল শিক ও বর্ষিয়ান পাহাড়ি নেতা শ্র“তরঞ্জন (এসআর) খীসা লেখককে দুর্লভ স্মারকলিপির একটি কপি হস্তান্তর করেন। এসআর খীসার ছোট ভাই ভবদত্ত খীসা ছিলেন রাঙামাটির একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক।

প্রসঙ্গত, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে পাহাড়িদের যে প্রতিনিধি দল ওই স্মারকলিপিটি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে এসআর খীসা নিজেও ছিলেন। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেও পরে তা আর কখনোই পূরণ হয়নি। দৃশ্যত, তিনি হয়তো এ নিয়ে তখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে বিব্রত করতে চাননি। পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাশাপাশি চাপা পড়ে গেছে ওই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন পর্বটিও।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দেওয়া ইংরেজী স্মারকলিপিটির প্রচ্ছদে লেখা হয়:

MEMORANDUM OF THE TRIBAL PEOPLE OF TRIPURA TO THE PRIME MINISTER OF INDIA.

ON

POLITICAL DEVELOPMENT IN THE CHITTAGONG HILL TRACTS FROM 1947-1972.

ON

Killing, raps, arson and loot committed by the MUKTIBAHINI and the BANGLADESH RIFELS before and the after liberation of Bangladesh. The forceful occupation of Tribal lands by the Muslim of Bangladesh.

ON

Violation of the CHARATER OF HUMAN RIGHTS and the Principals of Secularism

ON

Stoppage of rising the height of the ‘KAPTAI HYDEL PROJECT DAM’ to supply electricity to Tripura and Mizoram.

ON

Humble suggestion put forth by the Tribals of Tripura for implementation in the Chittagong Hill Tracts.

এতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের প্রত্য মদদে ১৯৭১ সালের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দেওয়া হয়। যেখানে দেখা যায় রাজাকার নিধনের নামে চাকমাদের সে সময় স্রেফ জবাই করা হয়েছিল! এতে বলা হয়:

…. During this time Mr. KK Roy, an uncle of Chakma Chief and an Awami League nominee to the provincial Assembly from from Chittagong Hill Tracts crossed into India with an intention of contacting Awami League hierarchy and explaining matters. But he was apprehended and arrested by Tripura police at Subrum on April 22, on the instruction of HT IMAM and B. Rahman, the SP of Chittagong Hill Tracts.

Mr. Imam after crossing into the India became the administrator of the Bangladesh Eastern Zonal office in Tripura. In absolute violation of the principals of secularism he unleashed in India a vicious anti-Chakma campaign. Leading dailies published at random his fabricated stories openly denouncing the Chakma and their chief as Pak-Mizo collaborators. He malicious propaganda incited and encouraged the Mukti Bahini to adopt the inhuman slogan ‘SLAUGHTER THE CHAKMAS’. As a result of this policy hundreds of tribals, mainly Chakmas, have been butchered, their homes burned, their place of religion ransacked, their women raped and their land forcibly occupied…

এরপর স্মারকলিপিতে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয় আওয়ামী লীগ, মুক্তিবাহিনী, বিডিআর নামধারী কতিপয় সন্ত্রাসীরা একের পর এক গণহত্যা, গণধর্ষণ, লুণ্ঠন ও জ্বালাও-পোড়াও অপারেশনের সব নৃশংস ঘটনা।


এর মধ্যে ১৯৭১ এর মে মাসে ক্যাপ্টেন খালেক ও জমাদার খায়রুজ্জামানের নেতৃত্বে রাঙামাটির তবলছড়ি, তনদাং, রামসিরা, দেওয়ানপাড়া এবং রামগড় অপারেশন, ৫ ডিসেম্বর পানছড়ির শীলাছড়ি অপারেশন (৩২ জন নিহত), ১৪ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি অপারেশন (২২জন নিহত), ২১ ডিসেম্বর দীঘিনালার তারাবনিয়া অপারেশন ( নয়জন নিহত) উল্লেখ যোগ্য। ১৯৭২ সালের ফেব্র“য়ারিতে রাঙামাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে বিডিআর সদস্যরা বিস্তৃর্ণ পাহাড়ে দফায় দফায় অপারেশন চালিয়ে হত্যা, ধর্ষন ও লুঠতরাজ করে। এরমধ্যে ২২ মার্চ ধালিয়া গ্রামে, ২২ ও ২৩ এপ্রিল বরইরাগি বাজারে, ৩০ এপ্রিল মাইচছড়িতে, ৮ মে খাগড়াছড়ির তারাবনিয়া, লোগাং বাজার অপারেশন উল্লেখযোগ্য। ২৯ মার্চ ১৯৭২ সালে প্রায় ২০০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী রামগড়ের মানিকছড়ি, চিকনপাড়া, সাঙ্গুপাড়া, পাক্কামুড়া ও গোদাতলা গ্রামে একযোগে অপারেশন চালায়। ঘটনার তদন্তের নামে ২ এপ্রিল পুলিশ বাহিনী একই গ্রামগুলোতে আবারো তল্লাসী অভিযান চালায়। …

রাঙামাটি মুক্ত হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতারা রাজকার আখ্যা দিয়ে বহু সংখ্যক পাহাড়ি জনসাধারণকে আটক করে। সে সময় মং রাজা ও সরকারের আদিবাসী উপদেষ্টা প্রু সেইন আটকৃতদের মুক্তি দাবি করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে টেলিগ্রাম করেন। স্মারকলিপিতে উল্লেখিত টেলিগ্রামটি নিম্নরূপ:


‘VISITED RANGAMATI ON SIXTH INSTANT STOP EXTREMELY AGGRIEVED TO FIND INNOCENT TRIBAL PEOPLE ARRESTED INDISCRIMINATELY AS ALLEGED COLLABORATORS STOP EARNESTLY REQUESTED INSTRUCT CIVIL ADMINISTRATION IMMEDIATE RELEASE OF ALL TRIBALS SO FAR ARRESTED WITHOUT PREJUDICE AND FURTHER ARREST BE CEASED STOP= MONG RAJA AND THE TRIBAL ADVISOR TO BANGLADESH’


আগামী পর্বে থাকছে: ত্রিদিব রায়ের ভূমিকা, ১৯৭১ এবং পাহাড়িদের প্রতিরোধ লড়াই, ১৯৭১।

ছবি: স্বাধীন বাংলার পতাকা, শিব নারায়ন দাস, শহীদ খগেন্দ্র নাথ চাকমা, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লার মুরাদনগরে সার্কেল ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পাকিস্তানী বাহিনীর কর্তৃক নিহত হন, তন্দ্রা চাকমা। ইন্দিরা গান্ধীকে দেওয়া স্মারকলিপির ইমেজ, লেখক।


সংযুক্ত: দেশের একমাত্র আদিবাসী বীরবিক্রম ইউকে চিং এবং একটি অপলেখনির প্রতিবাদ- খসড়া নোট।

[55 বার পঠিত]