রামন-ইফেক্ট আবিষ্কারের জন্য ১৯৩০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন স্যার চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন। কিন্তু এই আবিষ্কারের সাথে রামনের পাশাপাশি অন্য যে মানুষের মেধা ও পরিশ্রম প্রত্যক্ষভাবে জড়িত তিনি হলেন কারিয়ামানিক্যম শ্রীনিবাস কৃষ্ণান – যিনি স্যার কে এস কৃষ্ণান নামেই বেশি পরিচিত। রামন-ইফেক্টের সহ-আবিষ্কারক পরিচয়টা কৃষ্ণানের একমাত্র পরিচয় নয়। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের এমন অনেক শাখায় মৌলিক অবদান রেখেছেন যে তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠে একজন ‘পরিপূর্ণ পদার্থবিজ্ঞানী’ (complete physicist) হিসেবে [1]। ১৯২৩ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত স্যার সি ভি রামনের সাথে গবেষণা করে রামন-ইফেক্ট আবিষ্কারের পর ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দিয়ে কৃস্টাল ম্যাগনেটিজম বিষয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সুযোগের মধ্যে বসে পরবর্তী পাঁচ বছরে এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন কৃষ্ণান। সাম্প্রতিক কালে কার্বন সায়েন্সের যে অগ্রগতি হচ্ছে তাতে অনেক বছর আগে প্রকাশিত গ্রাফাইটের এন-আইসোট্রপিক চৌম্বকধর্ম সংক্রান্ত কৃষ্ণানের গবেষণাপত্রগুলোর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায় [2]। কৃস্টালের গঠন সংক্রান্ত কৃষ্ণানের গবেষণাগুলো কাজে লাগে ঘনবস্তুর (কনডেন্সড ম্যাটার) চৌম্বকতত্ত্বের প্রতিষ্ঠায় [3]। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রাথমিক যুগে চৌম্বকত্বের বিভিন্ন ধর্মের ব্যাখ্যা দেয়ার ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যবহার শুরু করেন কৃষ্ণান। এর জন্য যে সব পরীক্ষা তিনি করেন পরবর্তীতে সেগুলো চৌম্বকধর্ম বোঝার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত হয় [4]। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত ভারতের সবচেয়ে বড় ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবোরেটরির প্রথম পরিচালক কৃষ্ণান প্রশাসনিক কাজে শত ব্যস্ততার মাঝেও গবেষণা শুরু করেন থার্মিওনিক্সের ওপর। থার্মিওনিক্স হলো উত্তপ্ত বস্তু থেকে যে ইলেকট্রন নির্গত হয় তাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে ইলেকট্রনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজ [5]। বিভিন্ন বিষয়ে কৃষ্ণানের গবেষণাগুলো ছিল সময়ের চেয়ে এগিয়ে। পদার্থবিজ্ঞানের যে শাখাকে আজ আমরা ‘কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স’ হিসেবে জানি তার পরিপূর্ণ বিকাশের অনেক আগেই কৃষ্ণান এ বিষয়ের অনেক গবেষণা করে রেখেছেন।

তামিলনাডু রাজ্যের তিরুনেলভেলি জেলার ওয়াটরাপ গ্রামে কৃষ্ণানের জন্ম ১৮৯৮ সালের ৪ ডিসেম্বর। কৃষ্ণানের বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। তামিল ভাষার পাশাপাশি সংস্কৃতেও সুপন্ডিত ছিলেন তিনি। প্রথম জীবনে তামিলনাড়ুর মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। বাবার কাছ থেকে তামিল ও সংস্কৃত শেখার পাশাপাশি বাবার ধর্মবোধ এবং দর্শনচিন্তাও সঞ্চারিত হয় কৃষ্ণানের মনে। ভারতীয় সনাতন ধর্ম ও দর্শন-চর্চা শুরু হয়েছিল একেবারে ছোটবেলা থেকেই। ছোটবেলায় তালপাতার পুঁথি লিখতে শুরু করেন কৃষ্ণান। প্রতিদিন দু-তিন পাতা করে লিখতে লিখতে তালপাতার বিরাট পুঁথি বানিয়ে ফেলেছিলেন বছরের শেষে [6]। গ্রামের স্কুলেই প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হলো কৃষ্ণানের। তারপর পাশের শ্রীভিলিপুত্তুর গ্রামের হিন্দু হাইস্কুল। সেখানে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় বিজ্ঞানের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা জন্মায় কৃষ্ণানের। তাদের বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন সুব্রাহ্মণ্য আয়ার। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি উৎসাহ সৃষ্টির অপরিসীম ক্ষমতা তাঁর। যদিও বিজ্ঞানের উচ্চতর কোন ডিগ্রি তাঁর ছিল না তবুও বিজ্ঞানকে সহজবোধ্যভাবে ব্যাখ্যা করার বিরল ক্ষমতা ছিল তাঁর। কৃষ্ণান তখন থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। দশম শ্রেণীতে ওঠার পর পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক যখন আর্কিমেডিসের নীতির ওপর একটি রচনা লিখতে দিলেন কৃষ্ণান শুধু রচনা লিখেই ক্ষান্ত হলো না – আর্কিমেডিসের নীতি কাজে লাগিয়ে কঠিন পদার্থের ঘনত্ব নির্ণয় করার জন্য একটি যন্ত্রও তৈরি করে ফেললো। কিছুদিন পরে অবশ্য সে জানতে পারলো যে তার তৈরি যন্ত্রটি নতুন কিছু নয় – অনেকদিন আগে থেকেই তা ‘নিকোলাস হাইড্রোমিটার’ নামে প্রচলিত।

হিন্দু স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে মাদুরার আমেরিকান কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলেন কৃষ্ণান। তারপর ভর্তি হলেন মাদ্রাজের খ্রিস্টান কলেজে। ভৌত বিজ্ঞানে বিএ পাশ করলেন। গণিত, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে সমান দক্ষতা থাকলেও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি বেশি টান কৃষ্ণানের। মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা করবেন বলে তামিলনাড়ুর বাইরে যাবার চিন্তা করেন নি শুরুতে। খ্রিস্টান কলেজে রসায়নের প্রদর্শক পদ খালি হলে সেখানে যোগ দিলেন কৃষ্ণান। পরীক্ষাগারের যন্ত্রপাতির ওপর আশ্চর্য দখল কৃষ্ণানের। কয়েকদিনের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠলেন কৃষ্ণান। শুধু রসায়নের পরীক্ষণ নয়, দেখা গেলো গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের যে কোন বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলেই শিক্ষার্থীরা ছুটে আসছে কৃষ্ণানের কাছে। লাঞ্চের ছুটির সময় কৃষ্ণানের কাছে শিক্ষার্থীদের ভিড় লেগে যায়। দ্রুত প্রসিদ্ধ হয়ে গেলো কৃষ্ণানের ‘লাঞ্চ লেকচার’। পরবর্তীতে অনেকেই স্বীকার করেছেন “সারা বছরের পদার্থবিজ্ঞানের লেকচার শুনে আমি যা শিখেছি তার চেয়ে অনেক বেশি শিখেছি স্যার কৃষ্ণানের লাঞ্চ আওয়ার লেকচার থেকে” [7]। খ্রিস্টান কলেজে চাকরি করার সময় বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ নিয়মিত পড়তেন কৃষ্ণান। সেখানে প্রফেসর রামনের গবেষণাপত্রগুলো পড়ে পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেললেন। প্রফেসর রামনের কাছ থেকে পদার্থবিজ্ঞান শিখবেন ভেবে চাকরি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে এলেন ১৯২০ সালে।

১৯১৭ সাল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ানো শুরু হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দিয়েছেন সি ভি রামন, সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহা, শিশির মিত্র, দেবেন্দ্রমোহন বসু প্রমুখ। ‘পালিত অধ্যাপক’ রামন পড়াতেন বিদ্যুৎ ও চৌম্বকতত্ত্ব, এবং আলোর তত্ত্ব। রামনের জ্ঞানের গভীরতা ও পড়ানোর স্টাইলে মুগ্ধ শিক্ষার্থীদের অনেকেই রামনের রিসার্চগ্রুপে গবেষণা করার জন্য উদ্‌গ্রীব। কৃষ্ণান চাকরি ছেড়ে কলকাতা এসেছেন প্রধানত এই উদ্দেশ্য নিয়েই। কিন্তু অধ্যাপক রামন কৃষ্ণানকে শুরুতে কোন সুযোগই দিলেন না। বাধ্য হয়ে রামনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায় রামনের ক্লাসে গিয়ে বসতে শুরু করলেন কৃষ্ণান। নিজের চেষ্টায় গণিত শিখছেন, রসায়ন শিখছেন, আর পদার্থবিজ্ঞান তো আছেই। রামন কৃষ্ণানের আগ্রহ ও মেধার পরিচয় পেয়ে গেলেন কয়েকদিনের মধ্যেই।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম-এসসি কোর্সে ভর্তি হলেও পরীক্ষা দেয়ার ব্যাপারে কোন আগ্রহ নেই কৃষ্ণানের। ১৯২১ সালে ইউরোপ ভ্রমণ-কালে রামন আলোর বিচ্ছুরণ সংক্রান্ত যে সব পর্যবেক্ষণ করেছেন সেগুলোকে গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করেছেন। রামনের সাথে গবেষণা-সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছেন রামনাথন। কাজ চলছে দ্রুত। গবেষণা-পত্র প্রকাশিত হচ্ছে নেচার সহ বিশ্বখ্যাত সব জার্নালে। রামনের আরো সহযোগী দরকার। ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র কৃষ্ণানকে মনে রেখেছেন রামন। ডেকে নিলেন তাঁকে। এসোসিয়েশান ফর দি কাল্টিভেশান অব সায়েন্সের একটা গবেষণা বৃত্তি বরাদ্ধ করলেন কৃষ্ণানের জন্য। ১৯২৩ সালের নভেম্বর মাসে রামনের গ্রুপে গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দিলেন কে এস কৃষ্ণান। গবেষণার জগতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটলো কৃষ্ণানের। পরবর্তী এক বছর ধরে তিনি পরীক্ষা করলেন ৬৫টি তরলের বিচ্ছুরণ ধর্ম। ১৯২৫ সালে ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হলো কৃষ্ণানের প্রথম গবেষণাপত্র ‘অন দি মলিকিউলার স্ক্যাটারিং অব লাইট ইন লিকুইড্‌স’ [8]। ১৯২৪ সালে রামন রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পেলেন এবং সে উপলক্ষে ইউরোপে ছিলেন বছরের বেশির ভাগ সময়। কৃষ্ণান নিজে নিজেই বেশির ভাগ পরীক্ষণ শেষ করে ফলাফল বিশ্লেষণ করে পেপার লিখলেন। রামন ইউরোপ থেকে ফিরে এসে কৃষ্ণানের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হলো কৃষ্ণানের দ্বিতীয় গবেষণাপত্র [9]। ১৯২৬ সালে স্যার সিভি রামনের সাথে আরো তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় কৃষ্ণানের। ১৯২৭ সালে কৃষ্ণান নয়টি গবেষণা-পত্র প্রকাশ করেন যাদের মধ্যে আটটির সহ-লেখক হিসেবে রামনের নাম আছে। সবগুলো পেপারই তরলের ভৌত-ধর্ম সংক্রান্ত। এই পেপারগুলো রামনের নোবেল বিজয়ী গবেষণার দিক-নির্দেশক।

কৃষ্ণানের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি তখনো বিএ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম-এসসিতে ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু পরীক্ষা দেয়া হয়নি। ১৯২৭ এর এপ্রিলে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এম-এসসি ডিগ্রির জন্য দরখাস্ত করলেন কৃষ্ণান। ১৯২৩ সাল থেকে যেসব গবেষণা কাজ করেছেন সেগুলোর ভিত্তিতে রিসার্চ মাস্টার্স ডিগ্রি দেয়ার জন্য আবেদনপত্রে সুপারিশ করেন স্যার সি ভি রামন। রামনের সুপারিশ ও কৃষ্ণানের গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে ১৯২৭ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন কৃষ্ণান।
১৯২৮ সাল রামন ও কৃষ্ণানের জন্য অনন্য একটি বছর। ১৯২৭ সালের শেষের আর্থার কম্পটনকে ‘কম্পটন ইফেক্ট’ আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরষ্কার দেয়া হলে কৃষ্ণান ও রামনের মনে হলো এক্সরে’র ক্ষেত্রে কম্পটন ইফেক্ট যেরকম সত্য – সেরকম ঘটনা আলোর ক্ষেত্রেও সত্য হবার সম্ভাবনা আছে। রামন সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যাপারটা দ্রুত পরীক্ষা করে দেখবেন। ১৯২৮ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হলো পরীক্ষণের কাজ। রামনের সহকারী ভেঙ্কটেশ্বরণ ঘন জৈবতরলে আলোকের বিক্ষেপণ নিয়ে কাজ করছিলেন। গ্লিসারিন নিয়ে কাজ করার সময় তিনি দেখলেন যে সূর্যালোক প্রবেশ করানোর পর বিশুদ্ধ গ্লিসারিনে সবুজ আলোকরেখা দেখা যাচ্ছে। অথচ নীল আলো দেখতে পাওয়ার কথা। অনেকবার ফিল্টার বদল করার পরে দেখা গেলো প্রতিবারই আলোর রঙ বদলে যাচ্ছে। ভেঙ্কটেশ্বরণ ছিলেন খন্ডকালীন গবেষক। দিনের বেলায় তিনি আলিপুর টেস্ট হাউজে সহকারী কেমিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। তাই পরীক্ষণের জন্য শুধুমাত্র সকাল ও পড়ন্ত বিকেলের আলোতে কাজ করা সম্ভব হচ্ছিল তাঁর পক্ষে। পুরো পরীক্ষণে দিনের আলোর ব্যবহার এত বেশি দরকারি যে শুধুমাত্র ভেঙ্কটেশ্বরণের ওপর নির্ভর করা যাচ্ছিলো না। রামন কৃষ্ণানের ওপর ভার দিলেন এ গবেষণার পরীক্ষাগুলো চালিয়ে যাবার জন্য। কৃষ্ণান তখন এ সংক্রান্ত তত্ত্বীয় গবেষণায় ব্যস্ত ছিলেন। ‘প্রফেসর’ রামন তাঁকে পরীক্ষণের ভার দেয়াতে তিনি বুঝতে পারলেন একটা বিরাট কিছু ঘটতে চলেছে। তিনি ডায়েরিতে লিখে রাখতে শুরু করলেন তখনকার ঘটনাগুলো।

কৃষ্ণানের জীবদ্দশায় কৃষ্ণানের ডায়েরি অপ্রকাশিত ছিল। ১৯৫৩ সালে প্রফেসর রামসেশানের সাথে কথোপকথনের সময় কৃষ্ণান তাঁর ডায়েরির কথা উল্লেখ করেছিলেন [10]। ১৯৬১ সালে কৃষ্ণানের মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে শ্রীনিভাসনের কাছ থেকে ডায়েরিটি নিয়ে যান কে আর রামনাথন। ১৯৭০ সালের পর থেকে রামন-ইফেক্ট আবিষ্কার সংক্রান্ত বিভিন্ন লেখায় এই ডায়েরির অংশবিশেষ প্রকাশিত হতে থাকে কৃষ্ণানের পরিবারের অনুমতি ছাড়াই। কৃষ্ণানের ডায়েরি প্রথম সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে রয়েল সোসাইটির জার্নালে [11]। ডায়েরিটি খুব একটা বড় নয়; ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ পর্যন্ত মাত্র কয়েকদিনের দিনলিপি পাওয়া যায় তাতে। রামন-ইফেক্ট আবিষ্কারের দিনগুলোর প্রত্যক্ষ বিবরণ আছে এতে। সি ভি রামনকে কৃষ্ণান ‘প্রফেসর’ বলে সম্বোধন করতেন। ইংরেজিতে লিখিত ডায়েরির বাংলা অনুবাদ নিচে দেয়া হলো।

রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
গত তিন চারদিন ধরে জৈব-বাষ্পের আলোক-নির্গমন সংক্রান্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা করছি। পরীক্ষামূলক গবেষণা করিনি অনেকদিন। সত্যি বলতে কী, নাইট্রিক অক্সাইডের চৌম্বকীয় দ্বৈত-প্রতিসরণ (magnetic double refraction) সংক্রান্ত শেষ পরীক্ষাটা করেছিলাম ১৯২৬ সালের গ্রীষ্মকালে। তারপর থেকে নিজের ডেস্কে এমন ভাবে সিঁধিয়ে ছিলাম যে অন্যকিছু করার সময়ই পাইনি। অবশ্য গত মার্চে এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের ওপর এক্স-রে’র বিক্ষেপন পরীক্ষা করার জন্য এক্স-রে টিউব সেট করার কাজ করেছিলাম। কাজটা অবশ্য শেষ করতে পারিনি। কারণ প্রথমতঃ চৌম্বকত্বের তত্ত্বে কিছু আকর্ষণীয় সমস্যা দেখা যাচ্ছিলো (যেমন কেলাসিত নাইট্রেট ও কার্বোনেটের অসাম্যতা) এবং দ্বিতীয়তঃ গরমের ছুটিতে ডক্টর শেঠির যে আমাদের ল্যাবে উচ্চ-তাপমাত্রার তরলে এক্সরে-র বিক্ষেপন নিয়ে কাজ করার কথা ছিল তা করা যায় নি কারণ কাজ করার জন্য আমাদের অতিরিক্ত টিউব ছিল না। প্রফেসর যেমন বলেন, কোন বিজ্ঞান গবেষকেরই উচিত নয় সত্যিকারের পরীক্ষামূলক গবেষণা থেকে কিছু সময়ের জন্যও দূরে থাকা। তাই আমাকে কিছু পরীক্ষামূলক কাজে নিয়োজিত রাখার জন্যই প্রফেসর আমাকে এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। যদিও আমার তত্ত্বীয় কাজও খুব ফলপ্রসূ ছিল সাম্প্রতিক কালে। মূলত আমাদের সব গবেষণা- বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় দ্বৈত-প্রতিসরণ, কৃস্টালের ম্যাগনেটিক এন-আইসোট্রপি, ধাতব পর্দার ওপর আলোর বিচ্ছুরণ, ল্যাংগেভিন তত্ত্বের পরিবর্ধন সংক্রান্ত তিনটি পেপার, লরেঞ্জ-ডিবাই তত্ত্ব, আলোক বিক্ষেপণের রামানাথন তত্ত্ব, তরলের ওপর ম্যাক্সওয়েল তত্ত্বের প্রভাব ইত্যাদি মিলিয়ে ১১টি পেপার ও নেচার সাময়িকীতে দুটো চিঠি আমরা প্রকাশ করেছি গত বিশ মাসের মধ্যে। তবুও প্রফেসরের সাথে একমত হতেই হয় যে- কোন বিজ্ঞান গবেষকেরই উচিত নয় পরীক্ষামূলক গবেষণা থেকে দূরে থাকা। প্রফেসর আমাকে করতে বলেছেন বলেই শুধু নয়, জৈব বাষ্পে আলোর উৎপত্তি সংক্রান্ত পরীক্ষাগুলোতে আমার সম্পৃক্ত হওয়ার আরো একটা প্রধান কারণ হলো আমি চাইছিলাম যথাশীঘ্র পরীক্ষণ শুরু করতে। আসলে রামচন্দ্র রাওয়ের সাথে এন-আইসোট্রপির যে পেপারটা লেখার প্রস্তাব আমি করেছিলাম – গতমাসে সায়েন্স কংগ্রেসে যোগ দেয়ার জন্য তিনি যখন এখানে এসেছিলেন তখন দু’জনে মিলে পেপারটা কিছুটা লিখেও ছিলাম – সেটা এখনো শেষ হয়নি। সায়েন্স কংগ্রেসের আগে তরলের প্রতিসরাঙ্ক সম্পর্কিত যে পেপারটা আমি শুরু করেছিলাম তাও শেষ করতে হবে। জ্যামিন ইফেক্টের একটা তত্ত্ব দাঁড় করানোর চেষ্টাও করেছি সপ্তাহ খানেক। অনেকদিন আগে প্রফেসর কিছু সাবানের ফেনার ছবি তুলে নিকেলের ফ্রেমে আটকে রেখেছিলেন। সেগুলোও পরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করলাম যদি দ্বৈত-প্রতিসরণের কোন প্রমাণ মেলে। এগুলোর জন্য অনেক সময়ের দরকার। যাই হোক, আমি ভাবলাম ডেস্ক ছেড়ে উঠেই পরীক্ষণের কাজে লেগে গেলে মন্দ হয় না। সে অনুসারে গত তিন-চারদিন ধরে আমার সবটুকু সময় আমি পরীক্ষণের পেছনেই দিয়েছি। মনে হচ্ছে এই বিষয়টি অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। যদিও এখনো পর্যন্ত কোন ধরণের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি যা দিয়ে পরীক্ষণের ফলাফলগুলোর ব্যাখ্যা দেয়া যায়।

এনথ্রাসিনের বাষ্প পরীক্ষা করে দেখলাম। অনেক আলো তৈরি হয় এতে। কিন্তু প্রিজমের মধ্য দিয়ে দেখলে মনে হচ্ছে কোন ধরণের মেরুকরণ ঘটছে না। প্রফেসরও সবসময় কাজ করছেন আমার সাথে।

ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিন থেকে আমাদের ম্যাক্সওয়েল ইফেক্ট সম্পর্কিত পেপারটির প্রুফ এসেছে আজ।

প্রফেসর সম্প্রতি মিস্টার ভেংকটেশ্বরণের সাথে এরোম্যাটিক তরলের ফ্লুরোসেন্স পরীক্ষা করে দেখেছেন। অতিবেগুনি রশ্মির কাছাকাছি তরঙ্গের সূর্যালোকে দেখা গেছে কিছু কিছু তরলের ফ্লোরোসেন্সে মেরুকরণ ঘটছে। যাই হোক এনথ্রাসিনের বাষ্পের ফ্লুরোসেন্সে কোন মেরুকরণ দেখা যায় নি। প্রফেসর আমাকে বলেছেন এগুলো আর একটু যাচাই করে নিতে।

সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
সপ্তাহ দুয়েক আগে প্রফেসর যখন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের মিটিং উপলক্ষে ব্যাঙ্গালোর যাচ্ছিলেন তখন তাঁর সাথে স্টেশনে গিয়েছিলাম আমি। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম যে ডক্টর এ এল নারায়ণন আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন যেন মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটিতে দরখাস্ত করে দেখতে ডক্টরেটের জন্য তিন বছরের সময়সীমাকে কমিয়ে নেয়া যায় কি না। প্রফেসরকে অনুরোধ করেছিলাম মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট মেম্বারদের কারো সাথে দেখা হলে যেন ব্যাপারটা নিয়ে একটু আলোচনা করেন।

প্রফেসর আজ আমাকে বললেন ভাইস চ্যান্সেলর স্যার ভেংকটরত্নমের সাথে তাঁর টেলিফোনে কথা হয়েছে কিন্তু দেখা হয় নি। যাই হোক, প্রফেসর জানালেন স্যার ভেঙ্কট তাঁকে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বক্তৃতা দিতে। স্যার ভেঙ্কটরত্নমকে চিঠি লেখার সময় প্রফেসর আমার কথাও লিখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি আমার একাডেমিক ক্যারিয়ার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিলেন। কথাপ্রসঙ্গে এটাও উল্লেখ করলেন যে ইউনিভার্সিটিতে যদি একক লেকচারের পরিবর্তে সিরিজ লেকচারের ব্যবস্থা হয় তাহলে তিনি আমাকেও নিয়ে যাবেন।

সারাদিন পেপারটার প্রুফ দেখলাম আর গাণিতিক সমীকরণগুলো ঠিক আছে কি না দেখে নিলাম।

মঙ্গলবার ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
অতিবেগুণী আলোর কাছাকাছি এলে কিছু কিছু এরোম্যাটিক তরলের ফ্লুরোসেন্সের যে মেরুকরণ ঘটে তা যাচাই করে দেখার চেষ্টা করলাম সারাদিন। ঘটনাক্রমে আবিষ্কার করলাম যে সব বিশুদ্ধ তরলেই জোরালো ফ্লুরোসেন্স ঘটছে। এবং আরো আশ্চর্য বিষয় হলো তাদের সবগুলোরই তীব্র মেরুকরণ ঘটছে। এমনকি সাধারণ আলোতেও তা দেখা যাচ্ছে। এলিফেটিক তরলের মেরুকরণ এরোম্যাটিক তরলের তুলনায় বেশি। ফ্লুরোসেন্ট আলোর মেরুকরণ সাধারণ ভাবে বিক্ষেপিত আলোর মেরুকরণের সমান্তরালে ঘটছে। অর্থাৎ অণুর অপটিক্যাল এন-আইসোট্রপি যত ছোট – ফ্লুরোসেন্ট আলোর মেরুকরণ ততই বড়।

আমি যখন প্রফেসরকে আমার পরীক্ষণের ফলাফল জানালাম তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে সবগুলো তরল দৃশ্যমান আলোতেই পোলারাইজড ফ্লুরোসেন্স দেখাচ্ছে। তিনি যখন রুমে এলেন – আমি একটা নীল বাল্ব জ্বালিয়ে আলোর প্রবেশ পথে বেগুনি ফিল্টার বসিয়ে দিলাম। আলোর সবুজ ও হলুদ রেখা দেখে তিনি মন্তব্য করলেন, “কৃষ্ণান, তুমি নিশ্চয়ই মনে করছো না যে এদের সবগুলোই ফ্লুরোসেন্স?” যাই হোক, যখন তিনি সবুজ ও হলুদের সমন্বিত আলোর গতিপথ পরিবর্তন করে আলোর প্রবেশ পথের দিকে নিয়ে এলেন – তখন আর কোন আলোক রেখা দেখা গেলো না। তিনি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। অনেক বার পরীক্ষাটা করে দেখলেন কীভাবে আলোর মেরুকরণ ঘটছে। এমন চমৎকার ফলাফলে তিনি খুবই উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। একটার পর একটা করে সবগুলো তরলই পরীক্ষা করে দেখা হলো। সবগুলো তরলেই একই রকম ফল পাওয়া যাচ্ছে। প্রফেসর ভাবতে লাগলেন – কীভাবে আমরা কেউই এই ব্যাপারটা গত পাঁচ বছরে একবারও ধরতে পারিনি।

বিকেলে ফ্লুরোসেন্সের মেরুকরণ সম্পর্কিত আরো কিছু ডাটা সংগ্রহ করলাম।

বিকেলে কলেজ থেকে ফিরে প্রফেসর আমাকে একটা টাইপ করা চিঠির ড্রাফ্‌ট দেখালেন। গতকালের তারিখ দেয়া (অর্থাৎ ৬ই) স্যার ভেঙ্কটরত্নমের কাছে লেখা চিঠি – কালি দিয়ে অনেক জায়গায় পরিবর্তন করা হয়েছে। চিঠিতে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য তিনবছরের সময়সীমার বাঁধনটা শিথিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি আমার ব্যাপারে অতিরিক্ত রকমের প্রশংসা করে উল্লেখ করেছেন যে তিনি মনে করেন আমি অনেক কম সময়ের ভেতর রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পেয়ে যেতে পারি। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে চিঠিটি টাইপ করা হয়েছে গতকাল। আজ সকালের উত্তেজনাপূর্ণ ফলাফলের পরে এ চিঠি লেখা হয়নি। আরো আশ্চর্য হলাম আমাদের প্রস্তাবিত গবেষণাপত্রটির শিরোনাম আমি যা দিয়েছিলাম – ‘দি পোলারাইজড ফ্লুরোসেন্স এক্সিবিটেড বাই অর্গানিক ভ্যাপার্‌স’ – তাই রেখে দিয়েছেন তিনি। শুধুমাত্র ‘ভ্যাপার্‌স’ এর জায়গায় ‘লিকুইড’ বসিয়ে দিয়েছেন।

রাতের খাবারের পর ভেঙ্কটেশ্বরণ আর আমি আমাদের রুমে বসে গল্প করছিলাম। এমন সময় প্রফেসর এলেন। রাত তখন প্রায় ন’টা বাজে। তিনি ডাকলেন আমাকে। নিচে নেমে এসে দেখলাম তিনি খুব উত্তেজিত। এত রাতে তিনি ছুটে এসেছেন আমাকে বলতে যে সকালে আমরা যা দেখেছি তা নিশ্চয়ই ক্রেমার্স-হাইজেনবার্গ ইফেক্ট। সুতরাং আমরা ঠিক করলাম এই ইফেক্টকে আমরা ফ্লুরোসেন্স বলার চেয়ে ‘মডিফাইড স্ক্যাটারিং ইফেক্ট’ বলে ডাকবো। আমরা বাসার সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় পনেরো মিনিট ধরে কথা বললাম। তিনি বার বার আমাদের আবিষ্কারের অভিনবত্ব সম্পর্কে বলছিলেন।

বুধবার ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
কিছু প্রচলিত তরলের মডিফাইড স্ক্যাটারিং সম্পর্কিত প্রাথমিক মেরুকরণের পরিমাপ করলাম।

বৃহস্পতিবার ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
সকালে বড় টেলিস্কোপটি ফিট করে বাষ্পের প্রভাব দেখার প্রাথমিক প্রস্তুতিটুকু করে রাখলাম। প্রস্তুতি শেষ হবার আগেই প্রফেসর কলেজে চলে গেলেন ক্লাস নিতে।

দুপুরের পর ইথারের বাষ্প নিয়ে কাজ করে একই ফলাফল পাওয়া গেল। ক্রমান্বয়ে আরো কয়েকটি পরীক্ষা করেও একই রকম সাফল্য পাওয়া গেল।

বিকেল তিনটের দিকে প্রফেসর যখন ফিরলেন তাঁকে জানালাম আমার পরীক্ষণের ফলাফলের কথা। তখনো দিনের আলো প্রচুর। প্রফেসর নিজের চোখেই দেখতে পেলেন। তিনি উত্তেজনায় বাচ্চা ছেলের মত চিৎকার চেঁচামেচি করে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন। তাঁর অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো যে কত বড় মাপের একটা আবিষ্কার আমরা করে ফেলেছি। প্রফেসর বললেন ক্লাস নেবার সময় তাঁর খুব অস্থির লাগছিলো যে পরীক্ষণের শুরুতেই তাঁকে চলে যেতে হয়েছে। তবে আমার ওপর এই বিশ্বাস তাঁর ছিল যে আমি আমার আবিষ্কারের শেষ না দেখে থামবো না। তিনি আমাকে বললেন সবাইকে সেখানে ডেকে নিয়ে আসতে। এসে দেখে যাক আমাদের আবিষ্কার। প্রায় সাথে সাথেই নাটকীয় ভাবে আমাদের মেকানিককে ডেকে উচ্চ-তাপমাত্রার বাষ্পে আমাদের ইফেক্ট-টা পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হলো।

সন্ধ্যেবেলা হট বাথ-টাবের ব্যবস্থা করতে করতে সময় গেলো, ঘর থেকে বেরোইনি একবারও। সান্ধ্যভ্রমণ থেকে ফিরে প্রফেসর আমাকে বললেন এরকম বড় বড় সমস্যার সমাধান করাই হবে আমার কাজ। আরো বললেন এই কাজটা শেষ হলে ইলেকট্রনের স্পিন সংক্রান্ত পরীক্ষাগুলো শুরু করা উচিত আমার। ভেঙ্কটশ্বরণকে বললেন এই আবিষ্কারের কথা। আমাদের সাথে আলোচনার সময় প্রফেসর বললেন আমাদের আবিষ্কারটার নাম হওয়া উচিত ‘রামন-কৃষ্ণান ইফেক্ট’। ভেঙ্কটশ্বরণ বা অন্যরা এ নামে ডাকবে হয়তো। কথাপ্রসঙ্গে প্রফেসর বললেন এবার আমার রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পাওয়াটা আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। বললেন আমি সম্ভবত ডক্টরেট পাওয়ার আগেই রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পেয়ে যাবো। রামানুজন মাত্র বিএ পাশ করেই ফেলোশিপ পেয়েছিলেন।

১০-১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
বেশ কয়েকটি বাষ্প নিয়ে পরীক্ষা করলাম। যদিও তাদের অনেকগুলোই আমাদের ‘ইফেক্ট’দেখাচ্ছে – কিন্তু মডিফাইড স্ক্যাটারিং এর পোলারাইজেশান সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু পাওয়া গেলো না।

বৃহস্পতিবার ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
উচ্চতাপমাত্রায় পেন্টেইন বাষ্প পরীক্ষা করে দেখলাম আজ। মডিফাইড স্ক্যাটারিং এর পরিষ্কার পোলারাইজেশান দেখা গেলো।

আজ নেচার সাময়িকীতে একটা নোট পাঠালাম ‘এ নিউ টাইপ অব সেকেন্ডারি রেডিয়েশান’ শিরোনামে।

শুক্রবার ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
পেন্টেইন বাষ্পের ফ্লুরোসেন্সের পোলারাইজেশান কনফার্ম করলেন প্রফেসর। আমার বাম চোখে খুব সমস্যা হচ্ছে। প্রফেসর বললেন সামনের কয়েকদিন পরীক্ষাগুলো তিনি নিজেই করতে পারবেন।

১৯-২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
আরো কিছু বাষ্পের পরীক্ষা করেছি আজ।

সোমবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
সৎমায়ের অনুষ্ঠান ছিল। এসোসিয়েশানে যাইনি।

মঙ্গলবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮
বিকেলবেলা এসোসিয়েশানে গিয়েছিলাম। প্রফেসর ছিলেন সেখানে। আমরা আমাদের পরীক্ষায় আপতিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘের কোন প্রভাব আছে কি না বের করার চেষ্টা করলাম। ইউরেনিয়াম গ্লাসের সাথে নীল-বেগুনী ফিল্টার যোগ করে দিলাম। ফলে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সীমারেখা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে গেলো। ডাইরেক্ট ভিশান স্পেক্ট্রোস্কোপ দিয়ে বর্ণালীর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। আপতিত আলোকরশ্মি থেকে মডিফাইড স্ক্যাটারিং এর ফলে প্রতিসরিত রশ্মি আলাদা হয়ে গেছে। দুটোর মাঝে একটা কালো রেখা দেখা যাচ্ছে।

এটা থেকে উৎসাহ পেয়ে আমরা মনোক্রোম্যাটিক লাইট ব্যবহার করার —

ডায়েরিটি এখানেই হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেছে। সেদিনই ‘রামন-ইফেক্ট’ আবিষ্কারের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রফেসর রামন নিজেই ‘রামন-কৃষ্ণান ইফেক্ট’ নামকরণ করার পক্ষে থাকলেও পরে কীভাবে যেন কৃষ্ণানের নাম বাদ পড়ে গেলো। অন্তর্মুখী কৃষ্ণান কখনো এই নিয়ে কারো কাছে কোন অভিযোগ করেন নি।

১৯২৮ সালের অক্টোবর মাস। কলকাতায় এসেছেন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আর্নল্ড সামারফেল্ড। পরপর পাঁচটি বক্তৃতা দিলেন তিনি ওয়েভ মেকানিক্সের সাম্প্রতিক অগ্রগতির ওপর। কৃষ্ণান সবগুলো বক্তৃতা শুনলেন। নিজের মত করে নোট নিলেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হবার মত করে একটা পান্ডুলিপি তৈরি করে সামারফেল্ডকে দিলেন। সামারফেল্ড পান্ডুলিপি পড়ে অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর মনে হলো তিনি নিজে লিখলেও এর চেয়ে ভালো লিখতে পারতেন না। সামারফেল্ড কৃষ্ণানকে বইটির সহ-লেখক হবার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু কৃষ্ণান বিনীত ভাবে প্রত্যাখান করলেন সামারফেল্ডকে। ‘লেকচার্‌স অন ওয়েভ মেকানিক্স’ এর ভূমিকায় আর্নল্ড সামারফেল্ড কৃষ্ণানের অবদানের কথা স্বীকার করে অকুন্ঠ ধন্যবাদ জানিয়েছেন কৃষ্ণানকে।

রামন ও কৃষ্ণানের আবিষ্কার নিয়ে দেশে বিদেশের পদার্থবিজ্ঞানের জগতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ১৯২৮ সালে তেরোটি গবেষণা-পত্র প্রকাশিত হয়েছে কৃষ্ণানের। কিন্তু রামনের নামের নিচে কৃষ্ণানের নাম চাপা পড়ে যাচ্ছে। কৃষ্ণানের মনে অভিমান জন্ম নেয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি এমনই নম্র এবং গুরুভক্তি তাঁর এতই প্রবল যে প্রাণ গেলেও রামনের বিরুদ্ধে একটা শব্দও উচ্চারণ করবেন না। তিনি নীরবে রামনের গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলেন। ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের রিডার পদের জন্য দরখাস্ত করলেন। তাঁর দরখাস্তের সাথে সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছিলেন প্রফেসর সি ভি রামন, দেবেন্দ্র মোহন বসু, শিশিরকুমার মিত্র প্রমুখ। নভেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষ্ণানের ইন্টারভিউ হলো। ১৯২৮ সালের ৭ই ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন কৃষ্ণান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তবে কৃষ্ণান সত্যেন বসুর সাথে যৌথভাবে কোন গবেষণা করেন নি। কৃষ্ণান যোগ দিয়েই কাজ শুরু করলেন কৃস্টালের চৌম্বকধর্ম বিষয়ে। ডায়াম্যাগনেটিক ও প্যারাম্যাগনেটিক কৃস্টালের ভৌতধর্মের পার্থক্য নির্ণয়ের চেষ্টা করলেন কৃষ্ণান। যেসব কৃস্টালের বিভিন্ন তলের ভৌতধর্মের মধ্যে পার্থক্য থাকে তাদের বলা হয় এন্‌-আইসোট্রপিক কৃস্টাল। এসব কৃস্টালের একাধিক প্রতিসরাঙ্ক থাকতে পারে। কিন্তু ঠিক কী কারণে প্রতিসরাঙ্কের তারতম্য ঘটছে তা জানা ছিল না কারো। একই যৌগ দিয়ে যে কৃস্টাল তৈরি তার বিভিন্ন তলে বিভিন্ন রকমের প্রতিসরাঙ্ক কেন হবে? তবে কি কৃস্টাল গঠিত হবার সময়ে তার ভৌতধর্মের কোন পরিবর্তন ঘটছে? কৃষ্ণান কতকগুলো সহজ পরীক্ষা-পদ্ধতি বের করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি সাধারণ গবেষণাগারে বসে। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৩ – এই পাঁচ বছরে কৃস্টালের গঠন সম্পর্কিত যুগান্তকারী সব কাজ করেছেন তিনি এখানে। কৃষ্ণানের বিশটি গবেষণা-পত্র প্রকাশিত হয় এই পাঁচ বছরে।

১৯৩০ সালে রামন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পর পৃথিবীবিখ্যাত হয়ে ওঠেন। নোবেল বক্তৃতায় রামন স্বীকার করেছেন কৃষ্ণানের অবদানের কথা। ১৯৩২ সালে অন্ধ্র ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসরের পদে কৃষ্ণানকে নিয়োগ করার জন্য সুপারিশ করে চিঠি লিখেছিলেন রামন। সেখানে তিনি লিখেছেন “১৯২১ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত যে কাজ হয়েছে তার ওপর ভিত্তি না করে শুধুমাত্র ১৯২৮ সালের কাজের ওপর ভিত্তি করে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হলে কৃষ্ণানও নোবেল পুরষ্কারের অংশীদার হতেন”। অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়া হয়নি কৃষ্ণানের। ১৯৩২ সালের শেষের দিকে ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশান ফর কাল্টিভেশান অব সায়েন্সে ‘ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার অধ্যাপক’ পদ সৃষ্টি করা হলো। এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি থেকে অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা এই পদে যোগ দেয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু স্যার সি ভি রামন এই পদে কৃষ্ণানকেই বেশি উপযুক্ত মনে করেন। ১৯৩৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন কৃষ্ণান ‘মহেন্দ্রলাল সরকার অধ্যাপক’ হিসেবে।

কৃষ্ণানের ডায়েরি থেকে জানা যায় যে ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটিতে কৃষ্ণানের ডক্টরেট ডিগ্রির ব্যাপারে চিঠি লিখেছিলেন স্যার রামন। কিন্তু চিঠিটি আদৌ পাঠানো হয়েছিল কিনা বা পাঠানো হলেও সে ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়েছিল কি না জানা যায় না। তবে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় কৃষ্ণানের গবেষণা-পত্রের ওপর ভিত্তি করে কৃষ্ণানকে ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে ১৯৩৩ সালে।

ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশান ফর দি কাল্টিভেশান অব সায়েন্স-এ গবেষণা সহকারী হিসেবে প্রথমবার এসেছিলেন কৃষ্ণান ১৯২৩ সালে। দশ বছর পর এখন সেখানে প্রথম ‘মহেন্দ্রলাল সরকার অধ্যাপক’ হিসেবে ফিরে এসে নতুন উৎসাহে গবেষণা শুরু করলেন কৃষ্ণান। রামন তখন ব্যাঙ্গালোরে চলে গেছেন। বিভিন্ন যৌগলবণ ও লোহার চৌম্বকধর্ম নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা চালান কৃষ্ণান। পর্যায় সারণীতে লোহার সাথে আরো যেসব মৌল আছে সবগুলোর চৌম্বরকধর্ম পরীক্ষা করে দেখা হলো। পর্যায় সারণীর রেয়ার আর্থ ইলেমেন্টগুলো পরীক্ষা করে দেখা হলো। যেসব কৃস্টালের খুবই সামান্য পরিমাণ চৌম্বকধর্ম আছে কৃষ্ণান সেগুলো পরিমাপ করার পদ্ধতি বের করে ফেললেন। কৃস্টালের চৌম্বকক্ষেত্রের তত্ত্বীয় ফলাফলের সাথে মেলানো হলো। দেখা গেলো ভন ভেলক, পেনির তত্ত্বীয় ব্যাখ্যার সাথে মিলে যাচ্ছে। চৌম্বকধর্ম সম্পর্কিত পেপারগুলো প্রকাশিত হলো রয়েল সোসাইটি থেকে। গ্রাফাইট কৃস্টালের ওপর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় প্রসিডিংস অব রয়েল সোসাইটিতে। কৃষ্ণান প্রমাণ করলেন গ্রাফাইটের ডায়াম্যাগনেটিজম এর মান খুব বেশি।

রয়েল সোসাইটির জার্নালে কৃষ্ণানের অনেকগুলো গবেষণা-পত্র প্রকাশিত হয় এসময়। ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে চৌত্রিশটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় কৃষ্ণানের। কৃস্টাল ফিজিক্সে কৃষ্ণানের নাম উচ্চারিত হতে থাকে প্রায় নিয়মিত। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হন কৃষ্ণান। লর্ড রাদারফোর্ড নিজে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ জানান কৃষ্ণানকে। এক্স-রে কৃস্টালোগ্রাফির জন্য ১৯১৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী স্যার উইলিয়াম ব্র্যাগ কৃষ্ণানকে আমন্ত্রণ জানান লন্ডনের রয়েল ইনস্টিটিউটে। ১৯৩৭ সালে বেলজিয়ামের লিজ (Liege) ইউনিভার্সিটি মেডেল প্রদান করা হয় কৃষ্ণানকে।

১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে বাইশটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় কৃষ্ণানের। ১৯৪০ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পান অধ্যাপক কৃষ্ণান। স্যার সি ভি রামন নিজে কৃষ্ণানের ফেলোশিপের জন্য লিখিত প্রস্তাব করেছিলেন। ১৯৪১ সালে কৃষ্ণ রাজেন্দ্র জুবিলি গোল্ড মেডেল পান প্রফেসর কৃষ্ণান।

১৯৪২ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন প্রফেসর কৃষ্ণান। গবেষণার পাশাপাশি ক্লাসে পাঠদান কীভাবে আরো আকর্ষণীয় করা যায় সে ব্যাপারে কাজ করেন কৃষ্ণান। আলোর চিরায়ত বিক্ষেপণ তত্ত্বের বিভিন্ন সমস্যা, এক্স-রে ও ইলেকট্রন এবং কোয়ান্টাম তত্ত্ব, ওয়েভ মেকানিক্স ও স্ট্যাটিস্টিক্যাল থার্মোডায়নামিক্সের অনেক মৌলিক সমস্যার সমাধান করেন তিনি। সহকর্মী এ বি ভাটিয়া’র সহযোগিতায় তিনি বিশুদ্ধ ও সংকর ধাতুর বৈদ্যুতিক পরিবাহিতার তত্ত্বীয় অনুসন্ধান চালান। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায় ইলেকট্রনের বিক্ষেপণ তত্ত্ব আইনস্টাইন ও স্মোলুকৌস্কির তাপমাত্রার তারতম্যের তত্ত্বের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার কারণে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত সময়ে মাত্র তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় কৃষ্ণানের। এরমধ্যে ১৯৪৬ সালে কৃষ্ণানকে নাইটহুড প্রদান করে ‘স্যার’ উপাধি দেয় ব্রিটিশ সরকার।

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর দিল্লিতে নব প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবোরেটরির পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয় স্যার কৃষ্ণানকে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক কৃষ্ণান জাতীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক পদে এসে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও বৈজ্ঞানিক ভাবেই সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেন সমস্ত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এটমিক এনার্জি কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯৪৯ সালে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বোর্ড অব রিসার্চ ইন নিউক্লিয়ার সায়েন্সের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন এসময়। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিওর এন্ড এপ্লাইড ফিজিক্স এবং ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক ইউনিয়ন এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত। ১৯৫৭-৫৮ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কমিটি ফর ইন্টারন্যাশনাল জিওফিজিক্যাল ইয়ার এর চেয়ারম্যান ছিলেন স্যার কৃষ্ণান। ইউনেস্কোর সায়েন্টিফিক এডভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। নোবেল বিজয়ী উইলিয়াম ব্র্যাগ এবং ফন লাউএ’র সাথে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কৃস্টালোগ্রাফির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন স্যার কৃষ্ণান। ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবোরেটরির পরিচালক হিসেবে পদাধিকার বলে প্রায় শ’দুয়েক কমিটির সাথে যুক্ত ছিলেন কৃষ্ণান। ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। বোর্ড অব ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ, স্ট্যান্ডিং বোর্ড অব এস্ট্রোনমি, ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশনের সদস্য ছিলেন স্যার কৃষ্ণান। ফলে তাঁর নেতৃত্বে প্রশাসনিক কাজ খুব মসৃণভাবে চলেছে বলা যাবে না। অনেকগুলো দাপ্তরিক ফাইল জমে থেকেছে বছরের পর বছর সিদ্ধান্তবিহীন [12]।

কিন্তু এত প্রশাসনিক ব্যস্ততার মাঝেও গবেষণার কাজ থেমে থাকেনি স্যার কৃষ্ণানের। আলোকের ব্যাতিচার, ইলেকট্রন-চাপ ও বিদ্যুৎ পরিবাহীতে তাপের বিস্তার নিয়ে কাজ করেছেন কৃষ্ণান। সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন থার্মিওনিক্স নিয়ে। সহকর্মী ডক্টর জৈনের সহযোগিতায় ইলেকট্রনের সেচুরেশান প্রেসার নির্ণয়ের একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন কৃষ্ণান। সহকর্মী ডক্টর সুন্দরমের সহযোগিতায় উত্তপ্ত নলের মধ্যে তাপমাত্রার বন্টন নীতির তত্ত্বীয় ভিত্তি স্থাপন করেন কৃষ্ণান। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে চল্লিশটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় স্যার কৃষ্ণানের। ১৯৫৫ সালে আমেরিকান ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের বার্ষিক ডিনারে অতিথি বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় স্যার কৃষ্ণানকে। এ এক বিরল সম্মান। এর আগে যাঁরা এ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন তাঁদের সবাই ছিলেন রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অথবা একাডেমি অব সায়েন্সের প্রেসিডেন্ট। কৃষ্ণানই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত যোগ্যতায় এ সম্মান পেলেন।

ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাব থেকে বাণিজ্যিক ভাবে ‘সোলার কুকার’ তৈরির একটা বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে মাত্র তিরিশ মিনিটেই রান্না করতে পারার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাজারে এলেও এই যন্ত্রটি খুব একটা সাফল্য পায়নি। এর জন্য পার্লামেন্টে পরিচালক কৃষ্ণানের সমালোচনা করেন রাজনীতিকরা। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু নিয়মিত আসতেন ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবে। বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা শুনতেন আর কৃষ্ণানের সাথে আলোচনা করতেন কীভাবে দেশকে বৈজ্ঞানিকভাবে সমৃদ্ধ করা যায়।

বিজ্ঞানী স্যার কৃষ্ণানের প্রকাশিত ১৩৫টি গবেষণাপত্রের মধ্যে ৫০টি পেপার স্পেক্ট্রোস্কোপি সম্পর্কিত, ৬০টি পেপার ম্যাগনেটিজম, ২৩টি থার্মিওনিক্স, ২টি জনপ্রিয় লেখা [13]। প্রচুর পড়াশোনা করতেন স্যার কৃষ্ণান। বিজ্ঞান ছাড়াও সাহিত্যের প্রতিও আগ্রহ ছিল কৃষ্ণানের। ইংরেজি সাহিত্য প্রচুর পড়েছেন তিনি। ষাটতম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই বলেছেন ওয়াল্টার স্কট, ডিকেন্স, থ্যাকারে, স্টিভেনসন, ডুমা, ভিক্টর হুগো, আর্থার কনান ডয়েল তাঁর প্রিয় লেখক। প্লেটো আর এরিস্টটলের অনুবাদ পড়েছেন। একটু বয়স হবার পর পড়েছেন শেক্সপিয়ার, মিলটন, শেলি, সুইফ্‌ট, এডিসন, বসওয়েল, নিউম্যান, ম্যাথিউ আর্নল্ড, ওয়াল্টার প্যাটার, চার্লস ল্যাম্ব। আরও পরে টলস্টয়, ইবসেন ও বার্নাড শ। সাহিত্যের পাশাপাশি জনপ্রিয় ও বিষয়নির্ভর দুরকম বিজ্ঞানের বই-ই পড়তেন। কতগুলো বইয়ের নাম তিনি আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন টিনড্যালের ‘ফ্র্যাগমেন্টস’, পল ক্রুইফের ‘মাইক্রোব হান্টার্‌স’, এরিক বেলের ‘ম্যান অব ম্যাথম্যাটিক্‌স’, হার্ডির ‘এ ম্যাথম্যাথিসিয়ান্‌স অ্যাপোলজি’। লর্ড কেলভিন, হেলমোলৎজ, লর্ড রেইলে, ম্যাক্সওয়েল প্রমুখ বিজ্ঞানীর জীবনী পড়ে গবেষণার অনুপ্রেরণা পেতেন কৃষ্ণান। লর্ড রেইলের গবেষণাপত্রের সংকলনটি ধরতে গেলে কৃষ্ণানের নিত্যসঙ্গী হয়ে পড়েছিল।

জাতীয় পর্যায়ে ১৯৫৪ সালে পদ্মভূষণ উপাধিতে সম্মানিত হন স্যার কৃষ্ণান। ১৯৬১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান পুরষ্কার ভাটনগর পুরষ্কার পান। ১৯৬১ সালে ভারতের জাতীয় অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিয়ে সম্মানিত করা হয় স্যার কৃষ্ণানকে।

বিজ্ঞান আর বিনয় পাশাপাশি ছিল কৃষ্ণানের জীবনে। যত বেশি সাফল্য পেয়েছেন তত বেশি বিনয়ী হয়ে উঠেছেন কৃষ্ণান। ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাব কৃষ্ণানের জীবনে গভীরভাবে ছিল। তিনি ধর্মপরায়ণ ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞান একাকী অনেক কিছুরই সমাধান দিতে পারে না। বিজ্ঞানের সাথে সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দর্শনেরও দরকার হয়। শেষ বয়সে স্যার ভেঙ্কট রামন কৃষ্ণানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা শুরু করলেও কৃষ্ণান কখনো তাঁর ‘গুরু’র বিরুদ্ধে একটা শব্দও উচ্চারণ করেন নি। এ ব্যাপারে কৃষ্ণানকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন অধ্যাপক রামশেসন [10]। উত্তরে কৃষ্ণান বলেছিলেন, “আমি বিশ্বাস করি কিছু ঈর্ষাপরায়ণ লোক আমার বিরুদ্ধে প্রফেসরের কাছে গিয়ে কিছু বলেছেন। প্রফেসরের মন শিশুর মত সরল। আমার শুধু একটাই দুঃখ যে তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র সম্পর্কে ওরকম ধারণা করতে পারলেন”। কিছুক্ষণ নীরব থেকে কৃষ্ণান বলেছিলেন, “সম্ভবত ঈশ্বর আমাকে আমার অহংকারের শাস্তি দিচ্ছেন। কারণ আমি অহংকার করেছিলাম যে আমিই প্রফেসরের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র”। “আমি কখনো আমার গুরুর বিরুদ্ধে একটা শব্দও উচ্চারণ করিনি। আমি গুরুধর্ম থেকে বিচ্যুত হইনি”।

খেলাধূলার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল কৃষ্ণানের। নিয়মিত মাঠে যেতেন ফুটবল খেলা দেখতে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর রামনের সাথে কাজ করার সময় ল্যাবোরেটরি থেকে বের হতে কিছুটা দেরি হলে দ্রুত ট্যাক্সি ধরে ইডেন গার্ডেনে খেলা দেখতে চলে যেতেন। প্রায়ই কাউন্টারে টিকেট পাওয়া যেতো না। কালোবাজারীদের কাছ থেকে চড়া দামে টিকেট কিনে স্টেডিয়ামে ঢুকেই হৈ চৈ করে উঠতেন কৃষ্ণান। হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে গ্যালারি মাতানো কৃষ্ণানকে দেখে তখন বোঝার উপায় থাকতো না যে ল্যাবোরেটরিতে তিনি কত সিরিয়াস গবেষক। বাঙালিদের ভিড়ে তামিল ভাষায় খেলার ধারাবিবরণী দেয়ার সাথে সাথে চিৎকার করে ব্যর্থ খেলোয়াড়কে গালাগালি দিতেও বাধতো না কৃষ্ণানের। গ্যালারির অনেকেই বিরক্ত হতেন কৃষ্ণানের এরকম আচরণে। কিন্তু স্টেডিয়ামে ঢুকলেই কেমন যেন ছেলেমানুষ হয়ে উঠতেন কৃষ্ণান। ফুটবলের পাশাপাশি টেনিস, ব্যাডমিন্টন আর ব্রিজ খেলতে পছন্দ করতেন কৃষ্ণান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে নিয়মিত টেনিস খেলতেন। কলকাতায় বৌবাজারের বাসার ছাদে ব্যাডমিন্টন খেলতেন।

দুই পুত্র ও চার কন্যার জনক কৃষ্ণানের পোশাক-পরিচ্ছদ ও চাল-চলন এতটাই সাধারণ ছিল যে ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবে নতুন কেউ এসে পরিচালকের অফিসের বাইরে কৃষ্ণানকে দেখলে পিয়ন বলে ভুল করতো। একবার আমেরিকা ফেরৎ এক যুবক ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাব দেখতে এসে করিডোরে কৃষ্ণানকে দেখে পিয়ন ভেবে জিজ্ঞেস করলেন এই প্রতিষ্ঠানে কী কী কাজ হয় তা কি ঘুরিয়ে দেখানো সম্ভব? কৃষ্ণান বললেন অবশ্যই। তিনি যুবকটিকে বিভিন্ন বিভাগ ঘুরিয়ে দেখালেন। এক পর্যায়ে পরিচালকের রুমের সামনে এসে যুবককে যখন বললেন ‘এটা আমার অফিস’ যুবক ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

১৯৬১ সালে জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত পর কৃষ্ণান ভেবেছিলেন একটা লম্বা ছুটি নিয়ে ইংল্যান্ডে তাঁর এক ছেলের কাছে কিছুদিন এবং আমেরিকায় এক মেয়ের কাছে কিছুদিন কাটিয়ে আসবেন। এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ছুটি নেয়ার পরিকল্পনা। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তার আগেই জুন মাসের ১৩ তারিখ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান স্যার কৃষ্ণান। দিল্লির ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাব যে সড়কে অবস্থিত – সেই সড়কটির নাম এখন কে এস কৃষ্ণান রোড।

1. R. Sundaram, K. S. Krishnan – the complete physicist. Current Science, 1998. 75(11): p. 1263-1265.
2. M. S. Dresselhaus, G. Dresselhaus, and A.K. Ramdas, Impact of K. S. Krishnan on contemorary carbon science research. Current Science, 1998. 75(10): p. 1212-1216.
3. A. K. Ramdas and H. Alawadhi, Magneto-optics of II-VI diluted magnetic semiconductors. Current Science, 1998. 75(11): p. 1216-1221.
4. A. K. Raychaudhuri, Modern magnetism and the pioneering experiments of K. S. Krishnan. Current Science, 1998. 75(11): p. 12071211.
5. Pranab Bandyopadhyay, Great Indian Scientists. 1993, Delhi: Book Club.
6. শ্যামল চক্রবর্তী, বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী. ১৯৯৯, কলকাতা: শিশু সাহিত্য সংসদ

7. Subodh Mahanti, Kariamanikkam Srinivasa Krishnan. Vigyan Prasar Science Portal www.vigyanprasar.gov.in/scientists/KS_Krishnan/KariamanikkamSKrishnan.htm, 2011.
8. K. S. Krishnan, On the molecular scattering of light in liquids. Philosophical Magazine, 1925. 50: p. 679-715.
9. K. S. Krishnan, A discussion of the available data on light-scattering in fluids. Proc. Indican Assn. Cutiv. Sci., 1926. 9: p. 251-270.
10. S. Ramaseshan, A conversation with K. S. Krishnan on the story of the discovery of the Raman effect. Current Science, 1998. 75(11): p. 1265-1272.
11. Mallik, D.C.V., The Raman Effect and Krishnan’s Diary. Notes and Records of the Royal Society of London, 2000. 54(1): p. 67-83.
12. Shiv Visvanathan, The tragedy of K. S. Krishnan: A sociological fable. Current Science, 1998. 75(11): p. 1272-1275.
13. B. S. Kademani, V. L. Kalyane, and K. A. B, Scientometric portrait of sir K S Krishnan. Indian Jour. Inf., Lib. & Soc., 1996. 9(2): p. 125-150.

[155 বার পঠিত]