লেখার শুরুতেই ডিসক্লেইমার দিয়ে দরকার, এটি হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য সমালোচনা নয় বরং তার সাক্ষাৎকার, আত্মজীবনী ও তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে দাবি করা বিভিন্ন লেখাতে কিছু চোখে পড়ার মত তথ্যগত ভুল এবং অপবিজ্ঞান তুলে ধরছি শুধুমাত্র।

এক।
ম্যাজিক নিয়ে উনি তার “ম্যাজিক মুনশী” বইতে লিখেছেন,

অনেকদিন পর মুনশী বিষয়ে আমি নিজেও উৎসাহী হলাম। বিশেষ কিছু ক্ষমতা তার অবশ্যই আছে। এই ক্ষমতার উৎস কি?
তিনি যা দেখাচ্ছেন তা হল আসল ম্যাজিক। এই ম্যাজিক অন্যভূবনের বাসিন্দাদের সাহায্যে করা হয়। পৃথিবীর কোন ম্যাজিসিয়ানই তা স্বীকার করবেন না। বিজ্ঞান তো কখনোই না। আমরা কিন্তু শৈশব থেকেই ব্ল্যাক ম্যাজিকের ভিতর বাস করি। শিশুর প্রথম যখন দাঁত পরে তখন এ দাঁত ফেলা হয় ইঁদুরের গর্তে, যেন তার ইঁদুরের মত দাঁত হয়। এখান থেকেই ম্যাজিকের শুরু। নজর কাটানোর জন্য শিশুর মাথায় কালো টিপ দেওয়া হয়। এটাও ম্যাজিক।

“বিশেষ কিছু ক্ষমতা” আর “আসল ম্যাজিক” এই শব্দগুলো পরিষ্কারভাবেই বিভ্রান্তিমূলক। উনি উল্লেখ করেছেন বিজ্ঞান স্বীকার করবে না, হ্যাঁ, বিজ্ঞান স্বীকার করবে না। কারণ কি? কারণ এইসব অলৌকিক সব ঘটনা শুধু মানুষের মুখেই শোনা যায় অথবা অসচেতন চোখেই ধরা পড়ে। যখনই পর্যবেক্ষণের নিচে রেখে দেখাতে বলা হয় তখনই জারিজুরি বের হয়ে আসে। শুধু ছোট্ট একটা চিন্তা থেকেই এইসব ভাজুং ভুজুং এর সত্যতা বুঝতে পারা যায়, মুনশী যদি অলৌকিক ক্ষমতাধর হয়েই থাকে তাহলে নিশ্চয়ই উনিই ওয়ান অ্যান্ড অনলী নন। সেক্ষেত্রে দুই-একজনকেও কি পাওয়া যেত না যারা বিভিন্ন পরীক্ষাতে প্রমাণ করে দিতে পারতেন অলৌকিক ক্ষমতা বলে সত্যি কিছু আছে? কিন্তু না কোন এক অদ্ভুত কারণে এই অলৌকিক ক্ষমতাধর লোকেরা শুধু বিভিন্ন গালগল্পের নায়ক হতেই পছন্দ করেন, সকল বুদ্ধু যুক্তিবাদীদের মুণ্ডু ঘুরিয়ে দিতে তাদের মোটেও আগ্রহ নেই। আগ্রহ পাবার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা পুরস্কারেরও ব্যবস্থা আছে যদিও।[১] [২]

যারা বইখানি পড়েননি বা পড়লেও খেয়াল করেননি ঠিকমত তারা হয়তো ভাববেন, যেমনটা আমিই প্রথমে ভাবছিলাম যে উনি সচেতন মস্তিষ্কে ইঁদুরের গর্তে দাঁত ফেলাকে কুসংস্কার না বলে ম্যাজিক বা ব্ল্যাক ম্যাজিক বলতে পারেন? এই ভেবে আমি ধরেই নিয়েছিলাম বইটির উদ্দেশ্য আসলে মহৎ, বিভিন্ন পরিচিত কুসংস্কার যেমন ইঁদুরের গর্তে দাঁত ফেলা, নজর কাটানোর জন্য টিপ দেয়া ইত্যাদির সাথে উনি ব্ল্যাক ম্যাজিকের তুলনা করে আসলে অতিচাতুরতার সাথে ঐসব তথাকথিত অলৌকিক ব্যাপার স্যাপারকে কটাক্ষ করেছেন। কিন্তু তার বইয়ের ভূমিকাতে পরিষ্কার লিখা আছে,

এই লেখায় আমি কাউকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছি না। আমি নিজে বিভ্রান্ত মানুষ কোনোকালেই ছিলাম না, কাজেই নিজের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়ার প্রশ্ন আসে না। তবে আমি সচেতনভাবেই জগতের রহস্যময়তার প্রতি ইঙ্গিত করেছি। এই অধিকার আমার আছে।

হায়রে জগতের রহস্যময়তা! অবশ্যই উনার অধিকার আছে এবং অবশ্যই অমারও অধিকার আছে একে সম্পূর্ণই কুসংস্কারে ভরা একটা লেখা বলে উল্লেখ করার। তবে আমি এখনো যেই অংশটুকুই বুঝিনি তাহলো, বিজ্ঞানের ঊর্ধ্বে, ম্যাজিশিয়ানরা যা মানেন না সেই সব রহস্যময়তা বর্ণনা করে লেখা কীভাবে পাঠকদের বিভ্রান্ত করছে না?

মুনশী আর অন্যজগতের বাসিন্দাদের সাহায্যে সত্যিকারের ম্যাজিক দেখানোর ব্যাপারে কারো বিভ্রান্ত না হওয়া একটাই রাস্তা খোলা আছে, উনার কথা সোজা সাপ্টা বিশ্বাস করে নেয়া কেননা তাছাড়া উনার বক্তব্য যুক্তিতে টিকবে না, বিজ্ঞান যে স্বীকার করবে না উনি নিজেই লিখে দিয়েছেন। তবে এখনো বিভ্রান্ত না হয়ে থাকলে আরেকটু রসদ যোগান দেয়া যাক।

আমার ছোটভাই জাফর ইকবাল (লেখক, বিজ্ঞানী এবং আরও অনেক কিছু)। সে থাকে ফজলুল হক হলে। পড়ে Physics. প্রায়ই শুনি সে বন্ধুদের সাথে চক্রে বসছে। ভূত-প্রেত নামাচ্ছে। এক রাতে ঘটনা তাদের হাতছাড়া হয়ে গেল। (কি হয়েছিল পরিষ্কার না) তারা বাধ্য হল হলের মাওলানা সাহেবকে ডেকে আনতে। মাওলানা তাদের ঘরে পা দিয়েই আঁতকে উঠে বললেন, কি সর্বনাশ! আপনারা তো জ্বিন নামিয়ে ফেলেছেন! কীভাবে নামালেন?
…………………………
এখন আমি বিশেষ এক চক্রের পূর্ণ বিবরণ দিচ্ছি, তবে কেউ যেন এই ঝামেলায় না জড়ান তার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। ভূত-প্রেত নামুক বা না-নামুক, এই পদ্ধতি এক ধরনের হিপনোটিক অবস্থার সৃষ্টি করবে। দৃষ্টি-ভ্রান্তি (Hallocination) ঘটার সমূহ সম্ভাবনা

হুমায়ূন আহমেদের এই লাইনগুলো পড়ে খুঁজে বের করে জাফর ইকবালের বইখানি আবার পড়তে বসলাম, দেখুন উনি কি লিখেছেন,

ইমাম সাহেব আসবেন আমি আশা করি নি কিন্তু সেই রাতদুপুরে তিনি হাজির হলেন। পুরো ব্যাপার দেখে তিনি অসম্ভব ঘাবড়ে গেলেন, জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে?”
“জীনে ধরেছে”

অর্থাৎ ইমামকে জাফর ইকবাল জানাল যে জীনে ধরেছে, আর হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন “মাওলানা তাদের ঘরে পা দিয়েই আঁতকে উঠে বললেন, কি সর্বনাশ! আপনারা তো জ্বিন নামিয়ে ফেলেছেন!” :))
আর জাফর ইকবাল এর ব্যাখ্যাটাও মোটামুটি ভালই দিয়েছেন, উনি লিখেছেন,

যতদিন একটা ছোট শিশির ভেতরে ভূত বা জীনকে ভরে ফেলে হাই ভোল্টেজ দিয়ে ডিসচার্জ করিয়ে তার স্পেকট্রাম দেখে এটা কি কি মৌল দিয়ে তৈরি বের করার সুযোগ না পাচ্ছি আমি ধরে নিচ্ছি এটা এক ধরণের স্বেচ্ছা-সম্মোহন।

কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ এই কথাগুলো পরিষ্কার করে বলেন নি। বরং উনি তার ভাইয়ের লেখা খানিক বিকৃতভাবে বর্ণনা করে তারপর বলেছেন, এটা স্বেচ্ছা-সম্মোহন কিন্তু মাঝে মধ্যে প্রেত-জীনও নেমে পড়ে। এখানেই আমার আপত্তি কারণ উনি সাইকোলজিক্যাল ব্যাখ্যার সাথে কুসংস্কারটুকুও মিশিয়ে দিয়েছেন অত্যন্ত যত্নের সাথে।

দুই

উনি তার কাঠপেন্সিল বইতে কসমোলজিক্যাল ফাইন-টিউনিং সমর্থন করে লিখেছেন,

Sir Martin Rees হচ্ছে ইংল্যান্ডের Astronomer Royal .পৃথিবীর সেরা জ্যোতির্বিদদের একজন। তিনি বলেছেন , প্রাণের সৃষ্টি কোন accident না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এবং তাঁর নিয়মকানুন এমনভাবে করা হয়েছে যেন প্রাণের উদ্ভব হয় ।
তিনি তাঁর যুক্তি দেন Epsilon এর উদাহরণ দিয়ে । Epsilon হচ্ছে হাইড্রোজেন এবং ফিউসনএর মাধ্যমে পাওয়া হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়ামের অনুপাত । epsilon এর ম্যান হচ্ছে ..007 . এর মান যদি .007 না হয়ে .006 হতো, তাহলে নিউক্লিয়ার আকর্ষণ দুর্বল হয়ে যেত । প্রোটন এবং নিউট্রন একসাথে থাকতে পারতো না। ফিউসন হতো না। তারার (যেমন সূর্য ) কখনো ভারী অণু সৃষ্টি হতো না । প্রাণের জন্ম হতো না।“
যদি Epsilon .007 না হয়ে .008 হতো, সামান্য বেশী হতো , তাহলে ফিউসন প্রক্রিয়া হতো অতিদ্রুত । big bang এর পর কোন হাইড্রোজেন থাকতো না । বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কোন তারার সৃষ্টি হতো না। প্রাণের উদ্ভবও হতো না।
Epsilon এর পর আসছে ধ্রুবক N, N হোল ইলেকট্রিক বল এবং মাধ্যাকর্ষণ বলের অনুপাত । N এর মান হোল N^36, এই মান দেখাচ্ছে মাধ্যাকর্ষণ বল কতো দুর্বল। মাধ্যাকর্ষণ বল যদি আরেকটু কম হতো, তাহলে fusion হতো না। আমরা কোন তারা পেতাম না। জগত এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ডুবে যেত চির অন্ধকারে ।মাধ্যাকর্ষণ বল যদি যা আছে তার চেয়ে সামান্য বেশী হতো , তাহলে কি দাঁড়াত ? তারারা অতিদ্রুত জ্বলে শেষ হয়ে যেত । কোথাও প্রাণ সৃষ্টি হতো না
সাদামাটা উদাহরণ ( যা সহজবোধ্য) দেয়া যেতে পারে। পৃথিবী নিয়ে উদাহরণ । পৃথিবী যদি সূর্যের আরেকটু হতো ? প্রচণ্ড উত্তাপে প্রাণ সৃষ্টি হতো না। এখন যেখানে আছে, তারচেয়ে একটু দূরে হতো ? প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় প্রাণের উদ্ভব হতো না । পৃথিবী এখন যে জায়গায় আছে সেই জায়গাটিও যেন সুরক্ষিত । বৃহস্পতি নামক একটা প্রকাণ্ড গ্রহকে রাখা হয়েছে যেন পৃথিবীর ওপর যেসব উল্কাপাত হবে টা সে নিজের বুকে টেনে নেয় । পৃথিবীকে যেন ভয়াবহ বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে যেতে না দেয়া হয় ।পৃথিবীর ঘূর্ণন ঠিক রাখার জন্যে চাঁদকে ঠিক জায়গা মতো বসানো হয়েছে । সব দেখে শুনে মনে হয়, অদৃশ্য কোন শক্তির কঠিন নজরদারিতে আমরা আছি ।

সেই পুরাতন বস্তাপচা যুক্তি। এর বিরুদ্ধে, অনেক যুক্তি দেয়া হয়েছে, অনেক আর্টিকেল-বই লেখা হয়েছে। তবে সবকিছুর প্রথমে আমি সত্যটা উপস্থাপন করতে চাই তাহলো, স্যার মার্টিন রেস নিজে একজন নাস্তিক![৩] উনি মিলিট্যান্ট নাস্তিক নন এবং বিশ্বাস করেন সায়েন্সের, ধর্মের সাথে কোন লেনাদেনা নেই বরং তিনি হকিং এর মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেছিলেন উনি বিজ্ঞানী, ধর্মীয় বিষয়ে বিজ্ঞান ঢোকানোর প্রয়োজনই নেই। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তারই লেখা সায়েন্টিফিক বইয়ের কিছু তথ্য তারই মতাদর্শের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে সৃষ্টিবাদীরা প্রমাণ করে বেড়াচ্ছেন সায়েন্টিফিক তথ্যের মাঝে কোন এক অদৃশ্য শক্তির নিদর্শন পাওয়া যায়।

হুমায়ূন আহমেদের তথ্যগুলো বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে মার্টিন রেসের “Just Six Numbers” পুস্তকখানা পড়া শুরু করলাম। এবং আরেকটা মজার তথ্য উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না, মার্টিন রেস রহস্য ঘনিয়ে রাখেননি এবং তিনি ভাল করেই জানতেন তার এইসব তথ্য সৃষ্টিবাদীরা তাদের পক্ষের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে, তাই তিনি স্পষ্ট করে, পুরো একটা অধ্যায়ে এইসব নিয়ে আলোচনা করেছেন। পুরো অধ্যায়টুকু তুলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না তবে কিছু লাইন তুলে দিচ্ছি,

I’m impressed by a metaphor given by the Canadian philosopher John Leslie. Suppose you are facing a firing squad. Fifty marksmen take aim, but they all miss. If they hadn’t all missed, you wouldn’t have survived to ponder the matter. But you wouldn’t just leave it at that – you’d still be baffled, and would seek some further reason for your good fortune

উনি নিজের মতামতটাও পরিষ্কারভাবেই লিখেছেন,

It is that our Big Bang may not have been the only one. Separete universes has cooled down differently, ending up governed by different laws , and defined by different numbers[৪]

অথচ তার বইয়ের এই অংশটুকু সবাই গোপন রেখে শুধু আংশিক কিছু তথ্য তুলে দিয়ে সৃষ্টিবাদ এর পক্ষে ব্যবহার করেন।

এই ফ্যালাসীকে খণ্ডন করে অভিজিৎ রায়ের একটি তথ্যবহুল লেখা আছে মুক্তমনায় সেটি পড়তে পারেন আগ্রহীরা।

আমি নিজের যুক্তিটা সংক্ষেপে উপস্থাপন করে এই ফাইন টিউনড ইউনিভার্সের প্যাচাল শেষ করবো। তবে আগেই বলেছি, নতুন লেখার মত কিছু নেই তাই আমার চিন্তাটাও হয়তো মৌলিক নয়। আসলে ফাইন টিউনিং এর যতই প্রমাণ দেখাক আসলে কোনই প্রমাণ নেই। ব্যাখ্যা করছি, “ক” এর কারণে “খ” হয় তাতেই প্রমাণ হয়ে যায়না “ক” কে ফাইন টিউন করা হয়েছে। “ক” কে কীভাবে ফাইন টিউন করা হয়েছে তার পর্যবেক্ষণ নির্ভর প্রমাণ প্রয়োজন। একটা পাথর আমার পকেটে ঠিকমত সেট হচ্ছে মানেই এই না পাথরটা বিশেষ কিছু। এটাকে ফাইন টিউন করা হয়েছে তার প্রমাণ হবে “কীভাবে” করা হয়েছে সেই ডাটাগুলো, এটা আমার পকেটে সেট হচ্ছে এটা কোনপ্রকার প্রমাণই নয়!!

তিন।
তিনি আবার কাঠপেন্সিলের ১১৪ পৃষ্ঠায় বললেন,

আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে , উন্নত প্রাণী শুধু পৃথিবীতেই সৃষ্টি হয়েছে ? আর কোথাও কেউ নেই । বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমরা একা ঘটনা কি ভয়াবহ না ?
এই সম্ভাবনা কিন্তু আছে । আস্তিক ভাবধারার একজন বিজ্ঞানী বলছেন, পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির ধারা দেখে মনে হয় একজন ডিজাইনার তাঁর সমস্ত সৃষ্টি এমনভাবে পরিকল্পনা করেছেন যেন পৃথিবী নামক গ্রহে অতি উন্নত বোধ এবং চেতনার প্রাণী জন্মগ্রহণ করেন। তাদের ভাষায় a designer’s great design. সেই ডিজাইনার কে ? god. বিজ্ঞানীরা God কে কীভাবে দেখেন ? অতি জটিল আলোচনা । এই আলোচনা এক পর্যায়ে বিজ্ঞানের বাইরে চলে যায় । তখন চলে আসে দর্শন । সেই দর্শন অতি জটিল

তিনি বিবর্তনের বিরুদ্ধে আরও পরিষ্কার করে বলেছেন,

আমি ওল্ড ফুলস ক্লাবের আড্ডায় প্রায়ই ঈশ্বর-বিষয়ক একটি গল্প বলি। পাঠকদের গল্পটি জানাচ্ছি। ধরা যাক এক কঠিন নাস্তিক মঙ্গল গ্রহে গিয়েছেন। সেখানকার প্রাণহীন প্রস্তরসংকুল ভূমি দেখে তিনি বলতে পারেন-একে কেউ সৃষ্টি করেনি। অনাদিকাল থেকে এটা ছিল। তার এই বক্তব্যে কেউ তেমন বাধা দেবে না। কিন্তু তিনি যদি মঙ্গল গ্রহে হাঁটতে হাঁটতে একটা ডিজিটাল নাইকন ক্যামেরা পেয়ে যান, তাহলে তাঁকে বলতেই হবে এই ক্যামেরা আপনা-আপনি হয়নি। এর একজন সৃষ্টিকর্তা আছে। মনে করা যাক ক্যামেরা হাতে তিনি আরও কিছুদূর গেলেন, এমন সময় গর্ত থেকে একটা খরগোশ বের হয়ে এল। যে খরগোশের চোখ নাইকন ক্যামেরার চেয়েও হাজার গুণ জটিল। তখন কি তিনি স্বীকার করবেন যে এই খরগোশের একজন সৃষ্টিকর্তা আছে?[৫]

সেই প্যালের ঘড়ি! সেই ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন! এক খণ্ডন করেও বহু লেখাই লেখা হয়েছে। আগ্রহীরা পড়তে পারেন, এখানে,এখানে,এখানে,এখানে,এখানে

তবে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করবো অন্য যায়গায়,

সেই ডিজাইনার কে ? god. বিজ্ঞানীরা God কে কীভাবে দেখেন ? অতি জটিল আলোচনা ।এই আলোচনা এক পর্যায়ে বিজ্ঞানের বাইরে চলে যায়।

আহা! কি সুন্দরই না কথা, বিজ্ঞানেও আজকাল প্রাণের উদ্ভব ব্যাখ্যা করতে গড এর প্রয়োজন পড়ছে? আমি একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাইছি, জীববিজ্ঞানে কোন ডিজাইনার, ফাইন টিউনার বলে কিছু নেই। এটি অপবিজ্ঞান এবং সায়েন্টিফিক কম্যুনিটিতে এর কানাকড়িও দাম নেই। [৬][৭][৮][৯][১০][১১]
সুতরাং এই তথাকথিত ডিজাইনারকে বিজ্ঞানীরা কীভাবে দেখেন? উত্তর খুব সোজা, এই ডিজাইনার কখনোই বিজ্ঞানীদের কাছে দামই পাই নি, একে নিয়ে আলোচনা তো দূরের কথা! পপারীর মতবাদ অনুসারে এটি বিজ্ঞানের টপিক হিসেবেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, সুতরাং একে বিজ্ঞানীরা ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করেছেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

খানিক অফ-টপিক।
উনি বিজ্ঞানের এই সহজ বিষয়গুলো আসলেই বুঝেননা নাকি ইচ্ছেকৃতভাবে করেন তার প্রমাণ করার খুব উপায় নেই। তবে আমি ছোট্ট একটা উদাহরণ দিতে পারি, উনার লেখা সায়েন্স ফিকশন “শূন্য” থেকে,

মোট পাঁচটা কাজ। পাঁচ সংখ্যাটা ইন্টারেস্টিং। মৌলিক সংখ্যা। প্রাইম নাম্বার। সংখ্যার জগতে চতুর্থ প্রাইম নাম্বার। প্রথমটা হল ১, তারপর ২, তারপর ৩, তারপরেই ৫…

লেখকের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, ১ প্রাইম নাম্বার নয়। [১২] [১৩]। এবং তাই অন্যান্য লাইনগুলোতেও অসঙ্গতি ফুটে উঠে, কারণ ১কে বাদ দিলে ৫ ৪র্থ প্রাইম নাম্বার হয়না।

উনি আবার কয়েক পরিসটা গিয়েই লিখলেন

ফিবোনাক্কি রাশিমালা হল__১,১,২,৩,৫,৮,১৩,২১,৩৪,৫৫,৮৯…

ভুল! ফিবোনাক্কি রাশিমালার প্রথম সদস্য হবে ০। তারপর ১। তারপরের প্রতিটি সদস্য, প্রথম দু’টি সংখ্যার যোগফল।[১৪]
তিনি আরও লিখেছেন,

এই রাশিমালার ১১ নম্বর সংখ্যা হল ৮৯। রাশিমালার প্রথম সংখ্যা এককে যদি তুমি ৮৯ দিয়ে ভাগ দাও তাহলে আবার এই রাশিমালা দিয়ে আসে যেমন…
১/৮৯=.০১১২৩৫৮১৩২১…

প্রতিটি লাইনই ভুল। ১১ নম্বর সংখ্যা হবে ৫৫, প্রথম সংখ্যা হবে ০। শুধু কি তাই? এক কে ৮৯ দিয়ে ভাগ করলে যে ভাগফলটি উনি বসিয়েছেন সেখানেও ভুল, আসলে ভাগফল হবে ০.০১১২৩৫৯৫৫১…(প্রায়)।[১৫] তবে মজার ব্যাপার হলো এবার ভাগফল বসানোর সময় শুন্যকে প্রথমেই রেখেছেন! এগুলোও লেখকের উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা নাকি ইচ্ছেকৃতভাবে চতুরতার সাথে কিছু তথ্য গোপন ও কিছু তথ্য পালটিয়ে দেয়া হয়েছে? বিচারের ভার আপনার হাতে।

ফিকশন সাহিত্যের অবাধ স্বাধীনতা নিয়ে যারা বলছেন, তাঁদের উদ্দেশে, শ্রীব্রজেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্যের বই “সাহিত্য ও পাঠক” থেকে কিছু লাইন উদ্ধৃত করছি।

সাহিত্য শুধুমাত্র হৃদয়বৃত্তির ব্যাপার , তাহাতে ইন্দ্রিয় বা বুদ্ধিবৃত্তির কোন স্থান নাই এ ধারণা কিন্তু নিতান্তই অমূলক । ইন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়াই হৃদয়ে পৌঁছাইতে হয় ।ইন্দ্রয়ই হৃদয়ের দ্বার । সাহিত্যিক বস্তু- জগতের বিভিন্ন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন এবং তাহা রসাশ্রিত করিয়া আমাদের সম্মুখে উপস্থাপিত করেন । তাহা পাঠ করিয়া আমাদের মনশ্চক্ষে যে চিত্র ভাসিয়া উঠে তাহা হৃদয়গ্রাহ্য সন্দেহ নাই । কিন্তু মনের চক্ষুও তো ইন্দ্রিয় । আসল কথা হতেছে এই বস্তু-জগতকেই আশ্রয় করিয়া সাহিত্যিক চিরন্তন সত্য প্রকাশ করিয়া থাকেন।

এই বিচারটা এখন পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দিলাম যে , বৈজ্ঞানিক তথ্যগত ভুল ফিকশন সাহিত্যেও কতোখানি গ্রহণযোগ্য –সেটাও পুনর্বিবেচনা-যোগ্য ।
কোন আদর্শই শাশ্বত ও সর্বজনীন হওয়ার যোগ্যতা রাখে না । কাল ও স্থানভেদে সবকিছুর উপযোগিতা যাচাই করাকেই বলতে পারি প্রগতিশীলতার চর্চা । এবং সেই আদর্শিক দ্বন্দ্বই লাগামছাড়া স্বাধীনতার আপত্তির প্রধান কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে ।

গোলাম মুরশিদের একটা উদ্ধৃতি এখানে উল্লেখযোগ্য ,

বাক প্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই আছে । সভ্যতার , মানবতার একটা আবশ্যিক শর্ত । কিন্তু বাক প্রকাশের স্বাধীনতা কি অ্যাবসোলুট ? চরম ? অন্য কোন বিবেচনা যার কাছে ঠাই পাবে না ? তা হলে যে- বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে মারণাস্ত্র আবিষ্কার করেন , তাদের কেন নিন্দা করবো ? পর্ণোগ্রাফি তৈরি করে যারা অনেকের অনুভূতিকে উস্কে দেন , তাঁদের কেন নিন্দা করবো ? আমার মনে হয় , বাক স্বাধীনতার সাথে মানব-কল্যাণের ধারণাটাও জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গীভাবে । অধিকারের সাথে দায়িত্বের যোগাযোগও অস্বীকার করা যায় না।

পরিষ্কারভাবে তাই বলতে গেলে , ঠিক অধিকারের সাথে এই দায়িত্বের যোগাযোগ ঘটানোর জন্যেই আমাদের হুমায়ূনের লিখার বিরুদ্ধে কলম তুলে নিতে হচ্ছে ।

কেউ চাইলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করে উপন্যাস, সিনেমা লিখতে পারেন কিন্তু তার জন্য তাকে সমালোচিত হতে হয়। কেন? উপরে শ্রীব্রজেন্দ্রচন্দ্র তা ভালই বুঝিয়েছেন! কেউ চাইলেই সুডোসায়েন্স /কুসংস্কারকে সত্য ঘটনা, নিজের দেখা ঘটনা বলে চালিয়ে দিতে পারেন, চাইলেই ভাগফল পালটে দিয়ে ফিবোনাক্কি রাশিমালা দিয়ে ভেলকি দেখাতে পারেন, চাইলেই বিগ-ব্যাং স্পেশাল রিলেটিভিটি ভায়োলেট করছে বলে ফেলতে পারেন, চাইলেই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মত পরীক্ষণ নির্ভর র-সায়েন্সের সাথে আধ্যাত্মিকতার সম্পর্কের কথা বলতে পারেন কিন্তু, একটা কিন্তু থেকে যাবে। এই কিন্তু শুধু আমরাই উত্থাপন করছি তা নয়। কিন্তুটা কি? উপরে উদ্ধৃতিগুলো পড়ুন।

যারা এরপরও হুমায়ূন আহমেদের যা ইচ্ছা লেখার স্বাধীনতা নিয়ে বলছেন, তাঁদের জন্যে সমরেশ মজুমদারের বই “খোলাখুলি বলছি” থেকে কয়েকটা লাইন তুলে দিচ্ছি।

আমি লক্ষ্য করতাম বাংলাদেশের বেশীরভাগ লেখকদের লেখায় সময় চিহ্নিত হয় না । অর্থাৎ কাহিনী কোন সময়ের তা সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয় ।কাহিনীর কোন চরিত্ররা রাস্তায় কোন মিছিলে যান না বা আটকে থাকেন না । বেশীরভাগ লেখায় সরকার বা বিরোধীদলের বিরুদ্ধে একটা বাক্যও ব্যয় করা হয় না ।আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে এই উপন্যাসগুলো পড়লে বোঝাই যাবে না সরকার বিএনপি নাকি আওয়ামী লীগ ছিল। হুমায়ূন আজাদ অথবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায় ক্ষোভ আছে , বাকিরা সযত্নে এড়িয়ে গেছেন । গত মাসে হুমায়ূন আহমেদের বাড়িতে আড্ডা মারতে মারতে প্রশ্নটা করেছিলাম । একটু চুপ থেকে হুমায়ূন বলেছিলেন , ” অসুবিধা আছে । এখানকার রাজনৈতিক পরিবেশ আপনাদের মতো নয়”

অসুবিধা ? স্বাধীনতা সৃষ্টির প্রথাগত নাম যেখানে বলা হয় শিল্পকলা ,শিল্পী যেখানে নিজেই সৃষ্টি করবেন অসামান্য স্বাধীনতা , সেখানে তিনি কেন “অসুবিধা” বলে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন? আর আমি মামুলী এক তরুণ-ছাত্র তার সামান্য কিছু ভুল/বিকৃতি/অপবিজ্ঞান তুলে ধরাতে হই-হই করে তেড়ে আসছে সেই লেখকের বাক-স্বাধীনতা নিয়ে যিনি নিজেই বলেন, অসুবিধা আছে। বাক-স্বাধীনতা আর গলার জোর কেবল অপবিজ্ঞান বলার বেলাতে?
এই কথাগুলো বলতে আমার ইচ্ছা হচ্ছে না, কিন্তু বলতে বাধ্য হলাম কিছু অন্ধ হুমায়ূন ভক্তের জন্য।

যাইহোক, এই লেখাটি কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে নয়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমাদের জাতি বরাবরই পুতুলপূজারি । বুদ্ধদেব বসু একবার বলেছিলেন –

আমরা বাঙালিরা বঙ্কিম , বিবেকানন্দ ,রবীন্দ্রনাথ নামের যে-কয়টি পুতুল আছে , তাঁদের প্রাণপণে ফুল দেবো , ঘি ঢালবো, তাঁদের কাছাকাছি আর কেউ আসবার চেষ্টা করলে তেড়ে মারতে আসবো।

বর্তমান সময়ের সেই পুতুলগুলোর মধ্যে নতুন একটা পুতুলের সার্বজনিক সংযুক্তি হয়েছে , আর তা হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদ।“ এভাবে চলবে কেন? তার গৌরীপুর জংশন নিয়ে প্রশংসা করতে পারলে তার ভুল নিয়েও কথা বলার অধিকার আমার আছে। । তা না হলে বুদ্ধদেবের মতোই বলতে হবে দুঃখ করে ,

মাত্রাজ্ঞান যদি সম্পূর্ণ বিসর্জন দিতে না পারলেন তাহলে আর আপনি বাঙালি কিসের ।

উনার ক্যান্সারের নিউজটা পড়ে আমি তার সুস্থতা কামনা করে ফেসবুকে শেয়ার করার পর সেখানে তার একটা সাক্ষাৎকার নিয়ে কয়েকজনের সাথে কিছু আলাপ হয় যা থেকেই এই সিরিজটির জন্ম। উনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক আমাদের মাঝে! উনি কথাশিল্পী, কথামালা সাজিয়ে সাজিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করুক এই কামনা করি, শুধু তার খামাখা বিজ্ঞান বিকৃতি আর অপবিজ্ঞান ঢুকানোটাকে আমি সমর্থন করতে পারিনা। এই ছোট্ট অভিযোগ ছাড়া আর অন্য কোন উদ্দেশ্যে এই লেখাটি নয়। আমি ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কথা বলছিনা, আমি তার লেখার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করছিনা। তাই আমার কোন পয়েন্টে ভুল থাকলে সেটা নিয়ে যৌক্তিক সমালোচনা করলে খুশি হব, খামাখা আমাকে হুমায়ূন বিদ্বেষী বলে ধরে নিয়ে আমার লেখা বাদ দিয়ে, আমাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করার দরকার নেই।

প্রথম পর্বের লিঙ্ক

তথ্যসূত্র:
[১] http://www.randi.org/site/index.php/1m-challenge.html
[২] http://www.srai.org/challenge-to-all-supernatural-and-paranormal-power-holders-astrologers-etc/
[৩] http://www.independent.co.uk/news/people/profiles/martin-rees-we-shouldnt-attach-any-weight-to-what-hawking-says-about-god-2090421.html
[৪] Just Six Numbers: The Deep Forces That Shape the Universe by Martin Rees, 2000, ISBN 0-465-03673-2. Page number:148,149,150
[৫] http://www.kalerkantho.com/?view=details&type=gold&data=Hotel&pub_no=554&cat_id=1&menu_id=13&news_type_id=1&news_id=163359&archiev=yes&arch_date=17-06-2011
[৬] http://www.kuro5hin.org/story/2005/4/27/03541/2520
[৭] http://www.today.ucla.edu/portal/ut/050927voices_pseudoscience.aspx
[৮] http://theviewspaper.net/intelligent-design-science-or-pseudoscience/
[৯] http://www.lhup.edu/~dsimanek/philosop/creation.htm
[১০] http://scientiareview.org/pdfs/38.pdf
[১১] http://en.wikipedia.org/wiki/Intelligent_design#Creating_and_teaching_the_controversy
[১২] http://primes.utm.edu/notes/faq/one.html
[১৩] http://mathforum.org/library/drmath/view/57058.html
[১৪] http://en.wikipedia.org/wiki/Fibonacci_number
[১৫] http://www.google.com/search?hl=en&source=hp&biw=&bih=&q=1%2F89&btnG=Google+Search

***** এইচএসসির প্রিপারেশনের জন্য আমি (টেকি সাফি) নেট থেকে বিদায় নিচ্ছি কাল থেকে। তাই অনেকেরই মন্তব্যের উত্তর আমি দিতে পারবো না হয়তো। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
মুক্তমনাকে মিস করবো :)) আর মুক্তমনা এগিয়ে যাক! *****

[575 বার পঠিত]