আবুল কাশেম

সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১১

ইসলামি ক্রীতদাসত্ব, খণ্ড ১

[রচনাটি লেখক এম, এ, খানের ইংরেজি বই থেকে অনুবাদিত “জিহাদঃ জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণ, সাম্রাজ্যবাদ ও ক্রীতদাসত্বের উত্তরাধিকার” গ্রন্থের ‘ইসলামি ক্রীতদাসত্ব’ অধ্যায়ের প্রথম অংশ এবং লেখক ও ব-দ্বীপ প্রকাশনের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত হলো। এ পর্বে আলোচিত হয়েছেঃ ১) সূচনা, ২) দাসপ্রথাকে কোরানের অনুমোদন, ৩) নবির চর্চাকৃত দাসপ্রথার আদর্শ।]

লেখক এম, এ, খান

‘আল্লাহ দুই ব্যক্তির মাঝে আরেকটি কাহিনীর অবতারণা করেছেন: তাদের একজন ক্ষমতাহীন ও বোবা, যে তার প্রভুর উপর এক ক্লান্তিকর বোঝা; যেভাবেই তাকে চালনা করা হোক না কেনো, সে কোনোই কাজে আসে না: এরূপ মানুষ কি তার মতোই, যিনি ন্যায়বান ও সঠিক পথের অনুসারী?’ — (আল্লাহ, কোরান ১৬:৭৬)

‘(আল্লাহ) যেসব গ্রন্থভুক্ত লোককে ধরে এনেছেন…. এবং তাদের অন্তরে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিয়েছেন, তার কিছু (সাবালক পুরুষ) লোককে তোমরা হত্যা করেছো, কিছুকে (নারী ও শিশু) করেছো বন্দি।’ — (আল্লাহ, কোরান ৩৩:২৬-২৭)

‘কোরানে লেখা রয়েছে যে, মুসলিমদের কর্তৃত্ব অস্বীকারকারী সকল জাতিই পাপী; এ রকম লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ও যুদ্ধে বন্দিদেরকে কৃতদাস বানানো মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার ও দায়িত্ব। এবং এরূপ যুদ্ধে নিহত প্রত্যেক মুসলমানই নিশ্চিত স্বর্গে প্রবেশ করবে।’ — (কী অধিকারে বার্বার মুসলিম রাষ্ট্রগুলো আমেরিকার নাবিকদেরকে ক্রীতদাস বানাচ্ছে, সে প্রশ্নের উত্তরে টমাস জেফারসন ও জন অ্যাডামস্কে বলেন লন্ডনস্থ ত্রিপোলির রাষ্ট্রদূত আবদ আল-রহমান, ১৭৮৬।)

সূচনা

ক্রীতদাসত্ব হলো একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যাতে ক্রীতদাস নামে কিছু মানুষ প্রভু বা মালিক হিসেবে পরিচিত অপর মানুষের সম্পদে পরিণত হয়। নিজস্ব স্বাধীনতা ও ইচ্ছা বিবর্জিত ক্রীতদাসরা তাদের মালিকের সুবিধা, আরাম-আয়েশ ও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য অনুগত থেকে নিরলস কাজ করতে বাধ্য। সকল মানবাধিকার বঞ্চিত ক্রীতদাসরা তাদের প্রভুদের শর্তহীন সম্পত্তি। তারা মালিকের অস্থাবর সম্পত্তি মাত্র; তাদের মালিককে ছেড়ে চলে যাবার কোনো অধিকার নেই, কাজ করতে অস্বীকার করার উপায় নেই, নেই শ্রমের জন্য পারিশ্রমিক দাবির অধিকার। সমাজে ক্রীতদাসদের অবস্থান অনেকটা গৃহপালিত পশুর মতো: গরু, ঘোড়া ও অন্যান্য ভারবাহী পশুগুলোকে অর্থনৈতিক সুবিধা, যেমন গাড়ি-টানা ও হালচাষের জন্য যেরূপ কাজে লাগানো হয়, ক্রীতদাসদেরকেও তেমনিভাবে তাদের প্রভুদের লাভ, আরাম-আয়েশ ও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য কাজে লাগানো হয়। দাস-ব্যবসা অন্যান্য বাণিজ্যিক লেনদেনের মতোই ক্রীতদাসকৃত মানুষকে পণ্যরূপে বেচাকেনার একটা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা বা রীতি। সংক্ষেপে: ক্রীতদাসত্ব হলো সবল কর্তৃক দুর্বলকে শোষণের একটি প্রথা, যার সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

ইউরোপীয় শক্তি কর্তৃক আটলান্টিকের পারাপারের দাস-ব্যবসা এবং আমেরিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে ক্রীতদাসদের অমানবিক শোষণ ও তাদের উপর অমর্যাদাকর আচরণের জন্য পশ্চিমারা সবার দ্বারাই বড় সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে, বিশেষত মুসলিমদের দ্বারা। মুসলিমরা কথায় কথায় ইউরোপীয় দাস-ব্যবসার দিকে আঙ্গুল তোলে। তারা ঘন ঘন দাবি করে যে, ক্রীতদাসদেরকে শোষণ করেই আমেরিকার মতো দেশগুলো বিপুল সম্পদ-ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিল, যা আজ তারা ভোগ করে চলছে। আমেরিকায় জন্ম হওয়া এক তরুণ মুসলিম লিখেছে:

‘জানেন কি, কীভাবে আমেরিকার দাস-শিকারিরা আফ্রিকায় গিয়ে কালো মানুষগুলোকে ধরে ক্রীতদাসরূপে আমেরিকায় নিয়ে আসে? আমেরিকার অর্থনৈতিক শক্তি ওসব ক্রীতদাসদের শ্রমের কাছে ব্যাপকভাবে ঋণী’ (ব্যক্তিগত যোগাযোগ)।

আটলান্টিক পারাপারের ৩৫০ বছরের দাস-বাণিজ্যকে ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ও নিষ্ঠুরতম ক্রীতদাস ব্যবস্থা বলে আখ্যায়িত করে আমেরিকার ‘নেশন অব ইসলাম’-এর মিনিস্টার লুইস ফারাহ খান দাবি করেন:

‘অনেক শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান জানে না যে, অতীতে আমাদের (কৃষ্ণাঙ্গ) উপর যা কিছু ঘটানো হয়েছিল, তার উপর ভিত্তি করেই আজ তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।’[১]

অধিকাংশ মুসলিম ভাবে যে, ইসলামের ইতিহাসে ক্রীতদাসত্বের কোনো চিহ্নই ছিল না। ইসলামে ধর্মান্তরিত এক অস্ট্রেলীয় আদিবাসী রকি ডেভিস বা শহীদ মালিক এ. বি. সি. রেডিও’কে বলেন:

‘ইসলাম নয়, খ্রিষ্টান ধর্মই ক্রীতদাসত্বের প্রতিষ্ঠাতা।’[২]

ভারতীয় মুসলিমরা যখন এ উপমহাদেশে প্রচলিত দাসপ্রথা সম্পর্কে আলোচনা করে, তারা কেবলই কীভাবে পর্তুগিজরা গোয়া, কেরালা ও বাংলার সমুদ্রোপকূলীয় অঞ্চল থেকে ভয়াবহ অবস্থায় দাস পরিবহন করতো সেসব লোমহর্ষক কাহিনীর কথা বলে। ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাকিস্তানের ইতিহাস বইয়ে শেখানো হয়: ইসলামের আগে ছিল দাসপ্রথা ও শোষণ, যা ইসলাম আসার সঙ্গে সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে যায়। তারা ভারতে মুসলিম হানাদার ও শাসক কর্তৃক ব্যাপকভাবে দাসপ্রথাচর্চার কথা কখনোই বলবে না।

ইসলামি শাসনের অধীনে ব্যাপকভাবে চর্চাকৃত দাসপ্রথা (যেমন ভারতে) সম্পর্কে মুসলিমদের এ নীরবতা সম্ভবত তাদের ঐতিহাসিক সত্য সম্বন্ধে অজ্ঞতার ফলশ্রুতি। ভারতের আধুনিক ইতিহাস লেখায় মুসলিম আক্রমণ ও শাসনকালে সংঘটিত নিষ্ঠুরতাকে ব্যাপকভাবে ঢাকা দেওয়া হয়। ইসলামের ইতিহাসের সঠিক চিত্রটির এরূপ বিকৃতিকরণ মুসলিমদের দ্বারা পরিচালিত ব্যাপক ক্রীতদাসত্ব ও দাস-ব্যবসা সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতাকে জোরদার করে ও ভুল ধারণা সৃষ্টি করে। এ পুস্তকের আগাগোড়া বর্ণনায়, দুঃখজনকভাবে হলেও ইসলামের কর্তৃত্বের গোটা ইতিহাসে সর্বত্রই যে দাসপ্রথা একটা বিশিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল তা দেখানো হয়েছে। এর কিছু অনন্য বা বিশেষ বৈশিষ্ট্যও ছিল, যেমন ব্যাপকহারে উপপত্নীকরণ, খোজাকরণ ও ‘গিলমান’ চর্চা (নিচে বর্ণিত)।

দাসপ্রথাকে কোরানের অনুমোদন

দাসপ্রথাকে ইসলামে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে নিম্নোক্ত কোরানের আয়াতটি, যার মাধ্যমে আল্লাহ ন্যায়বান ও সত্যপন্থী মুক্ত মানুষ বা প্রভুদেরকে বোবা, অকেজো ও বোঝাস্বরূপ ক্রীতদাসদের থেকে পৃথক করেছেন:

‘আল্লাহ দুই ব্যক্তির মাঝে আরেকটি কাহিনীর অবতারণা করেছেন: তাদের একজন ক্ষমতাহীন ও বোবা, যে তার প্রভুর উপর এক ক্লান্তিকর বোঝা; যেভাবেই তাকে চালনা করা হোক না কেনো, সে কোনোই কাজে আসে না: এরূপ মানুষ কি তার মতোই, যিনি ন্যায়বান ও সঠিক পথের অনুসারী? (কোরান ১৬:৭৬)

আল্লাহ ক্রীতদাসদেরকে মর্যাদায় সমঅংশীদার ও তাদের সম্পদের ভাগীদার করে নেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বাসীদের সতর্ক করে দেন, পাছে অন্যদের মত ক্রীতদাসদেরকেও একইভাবে ভয় করতে হয়:

তোমরা কি তোমাদের দক্ষিণ হস্তের মালিকানাধীন লোকদেরকে (অর্থাৎ ক্রীতদাস বা বন্দি) আমাদের প্রদত্ত সম্পদের সমঅংশীদারী করবে? তোমরা কি তাদেরকেও সেরূপ ভয় করবে, যেমন ভয় করো পরস্পরকে? (কোরান ৩০:২৮)

এ আয়াতটির ব্যাখ্যায় মওলানা আবুল আলা মওদুদি ক্রীতদাসদেরকে সম্মান ও ধনসম্পদে সমান গণ্য করাকে ইসলামে সবচেয়ে ঘৃণ্য শিরক বা অংশীদারিত্বের মতো কাজ বলে মনে করেন।[৩] অন্যত্র আল্লাহ স্বয়ং তার স্বর্গীয় পরিকল্পনার অংশরূপেই কম আনুকূল্যপ্রাপ্ত ক্রীতদাসদের চেয়ে কিছু মানুষকে, অর্থাৎ প্রভু বা দাসমালিকদেরকে, বেশি আশীর্বাদপুষ্ট করেছেন বলে দাবি করেন। তিনি মুসলিমদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন যাতে তারা ক্রীতদাসদেরকে তাঁর দেওয়া উপহার বা প্রতিদানে সমান অংশীদার না করে। যারা ক্রীতদাসদেরকে নিজেদের সমান মর্যাদার ভাববে, আল্লাহ তাদেরকে সাবধান করে দেন এটা বলে যে, সেরকম ভাবলে আল্লাহকে অস্বীকার করা হবে:

জীবনধারনের নিমিত্তে আল্লাহ তোমাদের কারো কারো উপর অন্যদের তুলনায় অধিক মুক্তহস্তে তাঁর উপহার বা প্রতিদান বর্ষণ করেছেন। অধিক আনুকূল্যপ্রাপ্তরা তাদেরকে দেওয়া সে উপহার তাদের দক্ষিণ হস্তে ধারণকৃতদের (দাসদের) উপর বর্ষণ করবেনা, যাতে তারা এক্ষেত্রে সমপর্যায়ের হতে পারে। তারা কি আল্লাহর আনুকূল্য অস্বীকার করবে? (কোরান ১৬:৭১)

আল্লাহ শুধু দাসপ্রথাকে অনুমোদনই দেননি, তিনি নারী-দাস বা দাসীদেরকে যৌনসম্ভোগ হিসেবে ব্যবহারের জন্য দাস-মালিকদেরকে স্বর্গীয়ভাবে আশীর্বাদপুষ্টও করেছেন (মুসলিম পুরুষরাই কেবল দাস-মালিক হতে পারে):

তারা তাদের গোপনাঙ্গকে রক্ষা করবে, তবে তাদের স্ত্রীদের ও দক্ষিণ হস্তের মালিকানাধীনদের (ক্রীতদাসীদের) বাদ দিয়ে−এদের সাথে (যৌন-সহবাসে) দোষের কিছু নেই। (কোরান ২৩:৫-৬)

সুতরাং বন্দি ও ক্রীতদাসদের মধ্যে নারীরা থাকলে মুসলিম পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে যেরূপে যৌনক্রিয়া করে, তাদেরকেও সেরূপে ভোগ করার স্বর্গীয়ভাবে অনুমোদিত অধিকার পেয়েছে। আল্লাহর এ রায় ইসলামে যৌনদাসীত্ব বা উপপত্নী প্রথা প্রতিষ্ঠা করে, যা উপনিবেশ-পূর্ব মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক রূপ লাভ করেছিল এবং বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। যদিও বৈধ বিবাহের ক্ষেত্রে একজন পুরুষের জন্য একই সময়ে চারজন স্ত্রী রাখার বিধান রয়েছে (কোরান ৪:৩), কিন্তু যৌনদাসী রাখার বেলায় সংখ্যাগত এরূপ কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।

আল্লাহ মুসলিমদেরকে যৌনকর্মে ব্যবহারের জন্য অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নারী ক্রীতদাস সংগ্রহের স্বর্গীয় অনুমোদনও দিয়েছেন এভাবে:

হে নবি! অবশ্যই আমরা তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের বৈধ করেছি, যাদেরকে তোমরা যৌতুক প্রদান করেছো। এবং যাদেরকে তোমাদের দক্ষিণ হস্ত দখল করে রেখেছে, তাদের মধ্য থেকে আল্লাহ যাদেরকে যুদ্ধবন্দিরূপে তোমাদেরকে প্রদান করেছেন। (কোরান ৩৩:৫০)

মুসলিমরা আটককৃত ক্রীতদাস নারীদের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হতে পারে, যদি তারা বিবাহিতও হয়; কিন্তু কোনো বিবাহিত মুক্ত মুসলিম নারীর সঙ্গে নয়:

তোমাদের দক্ষিণ হস্তের মালিকানাধীন নারীরা ব্যতীত যারা ইতিমধ্যে বিবাহিতা, তারা অবশ্যই নিষিদ্ধ… (কোরান ৪:২৪)

কোরানে আরো অনেক আয়াত রয়েছে যাতে ক্রীতদাসের কথা বলা হয়েছে এবং তাদেরকে যুদ্ধের মাধ্যমে আটক বা সংগ্রহ করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এরূপে পবিত্র কোরানে উপস্থাপিত ইসলামি ঈশ্বরের স্বর্গীয় আদেশ অনুযায়ী মুসলিমরা ক্রীতদাস রাখার অনুমোদন প্রাপ্ত। যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তারা ক্রীতদাস যোগাড় করতে পারে, ক্রীতদাসীদের সঙ্গে যৌন-সংসর্গে লিপ্ত হতে পারে ও অবশ্যই তাদেরকে নিজেদের খুশি মতো কাজে লাগাতে পারে। মুসলিমদের জন্য নারী ক্রীতদাসদের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া তাদের বিবাহিতা স্ত্রীর সঙ্গে যৌনকর্মের মতই বৈধ। প্রকৃতপক্ষে দাসপ্রথা ইসলামে অতি আকাক্সিক্ষত একটি স্বর্গীয় প্রথা, কেননা আল্লাহ বহু আয়াতে বারংবার এ ‘স্বর্গীয় অধিকার’ সম্পর্কে মুসলিমদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

নবির চর্চাকৃত দাসপ্রথার আদর্শ

দাসপ্রথায় লিপ্ত হতে মুসলিমদেরকে বারংবার স্মরণ করিয়ে দিতে আল্লাহ শুধু প্রাণান্তই হননি, কীভাবে অবিশ্বাসীদেরকে দাস করতে হবে সে ব্যাপারে নবি মুহাম্মদকে পরিচালনারও উদ্যোগ নিয়েছেন। যেমন নিচের আয়াতে আল্লাহ বলেন:

এবং তিনি (আল্লাহ) ধর্মগ্রন্থের সেসব লোকদেরকে (বানু কোরাইজা ইহুদি) বের করে এনেছেন, যারা তাদের ঘাঁটিতে বসে থেকে তাদেরকে (কোরাইশ) সহায়তা করেছিল, এবং আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিয়েছেন তাদের প্রাণে। (তাদের) কিছু সংখ্যককে (বয়স্ক পুরুষ) তোমরা বধ করেছো, কিছু সংখ্যককে (নারী ও শিশু) করেছো বন্দি… (কোরান ৩৩:২৬-২৭)

এ আয়াতটিতে আল্লাহ বানু কোরাইজা ইহুদিদেরকে নিজস্ব বস্তির মধ্যে বসে থেকেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে মক্কার কোরাইশদেরকে সমর্থন করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। এ অবান্তর অভিযোগের ভিত্তিতে আল্লাহ অনুমোদন দেন: ইহুদি গোত্রটির বয়স্ক পুরুষদেরকে হত্যা করতে হবে এবং অবশিষ্ট নারী ও শিশুদের ক্রীতদাস বানাতে হবে। নবি যথাযথরূপে সে আদেশ পালন করেন এবং তাঁর অনুসারীদের মাঝে ক্রীতদাসকৃত নারী ও শিশুদেরকে বিতরণ করে দেন ও এক-পঞ্চমাংশ নিজের ভাগ হিসেবে রাখেন। বন্দি নারীদের মধ্যে যারা তরুণী ও সুন্দরী তাদেরকে যৌনদাসী করা হয়। নবি নিজে যৌনদাসী হিসেবে ১৭-বছর-বয়স্কা সুন্দরী রায়হানাকে গ্রহণ করেন, যার স্বামী ও পরিবারের সদস্যরা সে হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছিল, এবং সে রাতেই তিনি তাকে বিছানায় নেন যৌন-সহবাসে লিপ্ত হতে।[৪]

ঐ বছরই খাইবার ও বানু মুস্তালিকের ইহুদিদেরকে আক্রমণ ও পরাজিত করার পর মুহাম্মদ তাদের নারী ও শিশুদেরকে ক্রীতদাসরূপে উঠিয়ে নিয়ে যান। অন্যান্য অনেক আক্রমণে নবি ও তাঁর অনুসারীরা পরাজিতদের নারী ও শিশুদেরকে একইভাবে ক্রীতদাসরূপে কব্জা করেছিল। সুতরাং অবিশ্বাসীদের উপর নিষ্ঠুর আক্রমণ চালিয়ে পরাজিত করার পর তাদের নারী ও শিশুদেরকে ক্রীতদাসকরণ মুহাম্মদের যুদ্ধের মডেল বা আদর্শ কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়, যা উপরোক্ত আল্লাহর নির্দেশের বাস্তবায়ন মাত্র। নবি কিছু ক্রীতদাসকে বিক্রি করেছিলেন এবং তাদের কিছু সংখ্যককে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য জিম্মি হিসেবে ব্যবহার করতেন। নারী বন্দিদের মধ্যে সুন্দরী যুবতীরা যৌনদাসী হতো।

ইসলামি চিন্তা-চেতনায় খাঁটি মুসলিম জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয় যেহেতু তাদের কর্ম ও কৃতিত্বে মুহাম্মদের সমকক্ষ হওয়ার প্রয়াস, সে কারণে মুসলিমরা যথার্থরূপেই তাঁর দাসপ্রথা চর্চার এ মডেলকে (ক্রীতদাসকরণ, দাস-বাণিজ্য ও দাস-উপপত্নীকরণ) আঁকড়ে ধরে থেকেছে; এবং এ প্রক্রিয়া পরবর্তী শতাব্দীগুলোত ইসলামিক শাসনাধীনে চিরন্তনরূপে বহাল থাকে। খাইবার বা বানু কুরাইজার সঙ্গে যুদ্ধে মুহাম্মদের আচরণ ক্রীতদাস আটককরণের মানদণ্ডে পরিণত হয়। এবং সেটাই মধ্যযুগের ইসলামি রাজত্বে ক্রীতদাসকরণ, যৌনদাসীত্ব ও দাস-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসারের জন্য দায়ী। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর মুসলিমরা কোরান ও সুন্নতের অনুমোদন-অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ইসলামের প্রসার ও শাসন সম্প্রসারণে বিশ্বজয়ের নিমিত্তে পবিত্র ধর্মযুদ্ধের এক লাগামহীন কর্মকাণ্ড শুরু করে। আরবাঞ্চলে ইসলামের বিস্ফোরণ ঘটার সাথে সাথে মুসলিম হানাদাররা পরাজিত অবিশ্বাসীদের নারী ও শিশুদেরকে ব্যাপক সংখ্যায় ক্রীতদাসরূপে আটক করণে দক্ষ হয়ে উঠে।

ইসলামি চিন্তাধারায় (ইতিমধ্যেই উল্লেখিত) ইসলাম-অতীত ও ইসলাম-বহির্ভূত সভ্যতা হলো ‘জাহিলিয়া’ বা ভ্রান্ত প্রকৃতির, যা ইসলামের আগমনে অকার্যকর ও বাতিল হয়ে গেছে। ইসলাম একমাত্র সত্যধর্ম হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কেবলমাত্র মুসলিমরাই প্রকৃত সত্যের অধিকারী। তাদের চিন্তায়, বার্নার্ড লুইস উল্লেখ করেছেন,

‘ইসলামের সীমানা ও ধর্মের বাইরের জগতে কেবল বিধর্মী ও বর্বররাই বসবাস করতো। তাদের কেউ কেউ কোনো প্রকারের ধর্ম ও সভ্যতার একটি আভার অধিকারী ছিল; অবশিষ্ট বহু-ঈশ্বরবাদী ও পৌত্তলিকদেরকে প্রধানত ক্রীতদাসের উৎসরূপে দেখা হয়।’[৫]

মুসলিমরা এত বেশি পরিমাণে মানুষকে ক্রীতদাস বানিয়েছে যে, দাস-ব্যবসা একটা বিস্ফোরিত ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরিণত হয়: মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র বাজারগুলো দাসে ভরে উঠে। সুতরাং, লিখেছেন অধ্যাপক লাল:

‘ব্যাপকহারে দাস-বাণিজ্যের সৃষ্টি ও মুনাফার উদ্দেশ্যে অন্যান্য ব্যবসার মতো দাস-ব্যবসা চালিত করার কৃতিত্ব ইসলামেরই।’[৬]

[আগামী পর্বে আলোচিত হবেঃ প্রাচীন বিশ্বে দাসপ্রথার চর্চা]

সুত্রঃ

1. Farra khan L, What does America and Europe Owe? Final Call, 2 June 2008

2. ABC Radio, Aboriginal Da’wah- “Call to Islam”, 22 March 2006; http://www.abc.net.au/rn/talks/8.30/relrpt/stories/s1597410.htm

3. Famous scholar Abu Ala Maududi in his interpretation of this verse notes: “When you do not make your own slaves partners in your wealth, how do you think and believe that Allah will make His creatures partner in His Godhead?” (Maududi AA, Towards Understanding the Quran, Markazi Muktaba Islami Publishers, New Delhi, Vol. VIII). In other words, associating partners with Allah, which is the most abhorrent thing to do in Islam, is tantamount for a man to take his slaves as equal partner.

4. Ibn Ishaq, The Life of Muhammad, Oxford University Press, Karachi, p. 461-70

5. Lewis B (1966), The Arabs in History, Oxford University Press, New York p. 42

6. Lal K S (1994), Muslim Slave System in Medieval India, Aditya Prakashan, New Delhi, p. 6
—-

[1389 বার পঠিত]