::রক্তাক্ত প্রদেশ, খণ্ডিত উপমহাদেশ::

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত বৃটিশদের জন্য হাজার মাইল দূর থেকে এত বড় ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বৃটিশরা বেণিয়ার জাত। যোগ-বিয়োগের পরে শেষ লাইনে যদি একটা নেগেটিভ চিহ্ন আসে, তাহলে আর সেখানে সময় ব্যয় করার কারণ দেখে না। মাথা মোটা অ্যামেরিকানরাই কেবল নিজেদের ভাণ্ডার খালি করে, দেশকে মন্দার ভেতর নিপাতিত করে, ইরাক-পাকিস্তান-আফগানিস্তানের বন-জঙ্গলে পাহাড়ে-পর্বতে যুদ্ধ করে বেড়ায়।

বৃটিশরা ঠিকই বুঝে গেছে, যতই কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ করুক না কেন, যতই আন্দোলন করুক না কেন, এই ভারতীয়রা নিজেদের স্বাধীনতা নিজেরা যদি অর্জন করতে চায়, তাহলে কমপক্ষে আরো একশো বছর লাগবে। অতএব, স্বাধীনতা জোর করে উপহার দেয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। সমস্যা সেখানে না, সমস্যা হলো তাদেরকে স্বাধীনতা যে উপহার দেয়া হবে, সে উপহার নিতে গিয়েই তারা লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে বসবে। এই অদ্ভুত জাতির অদ্ভুত কর্মকাণ্ডের মাথামুণ্ডু বুঝতে গিয়ে বৃটিশ প্রশাসকরা অন্দর মহলে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেয়েছে। নিজদের মধ্যে যখন এদেরকে যুদ্ধ করতে বলা হয়, পাশের বাড়ীর প্রতিবেশিদের সাথে যখন ঝগড়া করতে বলা হয়, তখন এরা সবাই এক-এক জন বীরপুরুষ। কিন্তু, বৃটিশ অফিসের সাদা চামড়ার কেরানীকে দেখলেও শ্রদ্ধায়, বিনয়ে এরা গলে গলে পড়ে। এরকম প্রভূভক্ত প্রজা সাত জনমের ভাগ্যে। সাদা চামড়ার যে এত-এত গুণ, বৃটিশরা উপমহাদেশে এসে সেটা পদে পদে টের পেয়েছে, আর তার সব কার্যকারিতা কড়ায়-গন্ডায় আদায় করে নিয়ে গেছে।

এই সেই অনেক নাটকীয়তার পরে অবশেষে, স্বাধীনতা উপহার তথা ক্ষমতা হস্তান্তরের গুরু দায়িত্বটি এসে পড়লো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলের সুপ্রিম কমান্ডার, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের আস্থাভাজন লর্ড মাউন্টব্যাটেন এর উপর। মাউন্টব্যাটেন দায়িত্ব বুঝে নিয়ে, উপমহাদেশে পদার্পণ করে, এদিক-সেদিকে দেখে শুনে বুঝতে পারেন প্রগতিশীল কংগ্রেস নেতা নেহেরুর উপর দায়িত্ব প্রদান করে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দ্রুতগতিতে ফিরে যাওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু যে জিনিসটা মাউন্টব্যাটেন বুঝতে পারেন নি- এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে মতৈক্য বলে কোনো শব্দের প্রচলন নেই। ভারতীয় কংগ্রেসে হিন্দু আধিপত্যের সাথে পাল্লা দিতে তৈরী হওয়া মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এ প্রস্তাবে সায় দিবেন সেটা স্বপ্নের মধ্যে আনাটাও বোকামি। জিন্নাহ ঠিকই বুঝে গিয়েছিলো, অভিন্ন ভারত মেনে নেয়া হলে, আর যাই হোক নেহেরুকে পিছন ফেলে তার রাষ্ট্রনায়ক হবার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে। অন্যদিকের নেহেরুর হারানোর কিছু নেই। ভারত বিভাজিত হলেও তিনি রাষ্ট্রপ্রধান, না হলেও রাষ্ট্রপ্রধান। অতএব, অখণ্ডিত ভারতের দাবী নিয়ে কিছু দিন দেন-দরবার করা, মাঠ গরম রাখাটা মন্দ হয় না। অন্যদিকে, একটা অখণ্ড ভারতের জন্য গান্ধী ও তাঁর অনুসারীরা মনে-প্রাণে চেষ্টা করতে লাগলেন। শুধু ধর্মের উপর ভিত্তি করে একটা জাতি, একটা দেশ দুইভাগ হয়ে যাবে; বছরের পর বছর যারা একসাথে মিলেমিশে বাস করেছে, তাদেরকে ভৌগোলিক সীমানা দিয়ে জোর করে, আইন করে দূরে ঠেলে দেয়া হবে, বিবেকবান যে-কোনো মানুষের জন্য সেটা মেনে নেয়া কষ্টদায়ক।

বলে রাখা ভালো, মাউন্টব্যাটেন এর ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হবার আগেই, ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, রাজনৈতিক ইন্ধনে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সূত্রপাত হয়েছিলো। ১৯৪৬ সালের ১৬ই অগাস্ট কলকাতার হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় নিহত হয় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ, আহত হয় অগণিতজন। এরই ধারাবাহিকতায় অক্টোবরে বঙ্গে (বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্গত) অবস্থিত নোয়াখালীর দাঙ্গায় খুন হয় প্রায় আরো পাঁচ হাজার হিন্দু। ধর্ষিত হয় শত শত হিন্দু নারী। অন্যদিকে, মুসলিমদের উপর একই ধরণের অত্যাচার শুরু করা হয় বিহার, পাটনা, ভাগলপুরে। হত্যা করা হয় হাজার হাজার মুসলিম, ধর্ষিত হয় শত শত মুসলিম নারী। অভিযোগ আছে, নোয়াখালীর দাঙ্গায় হাজার হাজার হিন্দু নারী-পুরুষকে জোর করে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। ধর্মান্তরিতদের কাছ থেকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে লিখিত নেয়া হয়- তারা স্বেচ্ছায় মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। (তথ্যসূত্র)

দাঙ্গার খবর পেয়ে এক পর্যায়ে, ১৯৪৬ সালের নভেম্বরে মহাত্মা গান্ধী দলবল নিয়ে উপস্থিত বঙ্গে অবস্থিত নোয়াখালী অঞ্চলে। একবার তিনি মুসলমানের বাড়ীতে যাত্রাবিরতি দেন তো অন্যবার দেন হিন্দুদের বাড়ীতে। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেন, নিজেদের মধ্যে কলহ বন্ধ করে অখণ্ড ভারতের দাবীর সাথে একাত্ম হতে। বুঝাতে চাইলেন ধর্মের উপর ভিত্তি করে দেশভাগ, ধর্মে ধর্মে জীবন বিনষ্টকারী কলহ-দাঙ্গা নিতান্তই দুখঃজনক। কিছু দিনের মধ্যে স্থানীয় মুসলিমরা গান্ধীর কাছ থেকে সহযোগিতার হাত গুটিয়ে নিলো। তাঁর সভায় আহবানে উপস্থিত হলো না একজন মুসলিমও; নগ্ন পায়ে হাঁটতে অভ্যস্ত গান্ধীর চলার পথে ছড়িয়ে রাখলো হাঁড়ের টুকরা আর কাঁটা। (তথ্যসূত্র)

                  ছবিঃ নোয়াখালীতে মহাত্মা গান্ধী (ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহকৃত)

এরই মাঝে কংগ্রেসে হঠাৎ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে যায়। মনোবল হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন গান্ধী ও তাঁর সহকর্মীরা। সমস্ত শান্তি প্রচেষ্টা সেখানেই থমকে যায়। শুরু হয় মাইগ্রেশান, দেশ ত্যাগ। বছরের পর বছর যে মাটির বুকে মিলে মিশে বেড়ে উঠেছে পিতা-মাতা-সন্তান, সে মাটির মায়া ছেড়ে, হাজার হাজার হিন্দু নর-নারী বাংলার মাটিকে বিদায় জানিয়ে আশ্রয় নেয় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরায়।

মাউন্টব্যাটেনের ধর্মভিত্তিক দেশভাগের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়লো যে সমস্ত অঞ্চলগুলোতে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোর (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত)। উপমহাদেশের ঐতিহ্যময়, শিক্ষা-সংস্কৃতি-স্থাপত্যে অনন্য শহর লাহোর। পশ্চিমের লাহোর আর পূর্বের বঙ্গ, মূলত এই দুই ভূখণ্ডে হিন্দু-মুসলিমদের সহবস্থান। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে যদি দেশ ভাগ হয়, তাহলে কাদের দখলে যাবে কোন শহর? কে কোথায় কত বেশি শক্তিশালী? সেই ধর্মীয় শক্তিই যদি দেশভাগের মানদণ্ড হয়, তাহলে ঈমান দেখানোর কিংবা ভক্তি দেখানোর এটাই সময়, এত বড় সুযোগ আর কখনো পাওয়া যাবে না। স্বল্পশিক্ষিত, ধর্মান্ধ, যুক্তিহীন, নির্বোধ কিছু মানুষ ভক্তি আর উপাসনার ছলে নিজেরাই নিজেদের সাথে মেতে উঠে মরণ খেলায়। আর তারই ফলস্বরূপ উপমাহাদেশের মাটিতে রচিত হয় ভয়ঙ্কর এক ইতিহাস, ভীতিহাস।

ভিডিওঃ দেশভাগের উপর নির্মিত BBC এর ডকুমেন্টারি (সৌজন্যেঃ ইউটিউব)

দাঙ্গায় মুসলিমরা বাড়িঘর জ্বালিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলো হিন্দুদের, শিখদের। হিন্দু, শিখরা মুসলিমদের বাড়িঘরের একই হাল করলো। লুটেরা, হায়েনাদের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলো উপমহাদেশ। রাতের আঁধারে মুসলিমদের একদল নিজেদের এলাকা পাহারা দেয় তো অন্যদল হিন্দু-শিখদের পাড়ায় আক্রমণ করতে যায়। তরবারির আঘাতে মাথা কেটে ফেলতে যায়। একই অবস্থা হিন্দু-শিখদেরও। তারাও ঘুরে বেড়ায় লাঠি-বল্লম-ছোরা নিয়ে। মুসলিম দেখলেই ধর্মের দোহাই দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে । শিশু-নারী ধর্ষিত হয়েছে নির্বিচারে। গ্রামের সমস্ত নারীদেরকে এক জায়গায় লুকিয়ে রেখেও রক্ষা হয়নি। ধর্মের দোহাই দিয়ে ইশ্বর-ভগবান-আল্লাহ-খোদার নাম নিয়ে শিরশ্ছেদ করেছে, ধর্ষণ করেছে। এত ক্ষোভ, এত ঘৃণা শুধু অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি, অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে। অথচ, এই কিছুদিন আগেও, তারা ছিলো প্রতিবেশি; একসাথে হাঁট-বাজারে গেছে, খেলার মাঠে গেছে, এক সাথে নৌকায় নদীর এপার হতে ওপারে গিয়েছে। আগুনের স্ফুলিঙ্গে হলুদ হয়ে আর মানুষের রক্তে লাল হয়ে, দিনের পর দিন কেঁদেছে লাহোর। জিন্নাহ-নেহেরুরা তখন একে অন্যের কাঁধে দোষ চাপিয়ে, কাদা ছোঁড়াছুড়িতে ব্যস্ত। আর মাউন্টব্যাটেন বুঝে গেছে, যত দ্রুত সম্ভব এদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে পালাতে পারলেই হয়, কোনো ধরণের কালক্ষেপণ নয়, কোনোভাবেই ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখ পিছানো হবে না, পূর্ব নির্ধারিত তারিখের ভিতর যে করেই হোক ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর নিজেরা নিজেদের সাথে মারামারি করে মাস-বছর-যুগ পার করে দিক, তাতে বৃটিশ সরকারের কিছুই আসবে যাবে না। অতএব, তাড়াহুড়ো করে ধর্মের স্কেল দিয়ে দেশ ভাগ করার জন্য লন্ডন থেকে নিয়ে আসা হলো এক ব্যারিস্টার, যার নাম সিরিল র‍্যাডক্লিফ

                  ছবিঃ দেশভাগের পর দেশান্তরি সাধারণ মানুষ (ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহকৃত)

র‍্যাডক্লিফ ভালো করেই জানতেন, যেভাবেই যেমন করেই দেশভাগ করা হোক না কেন, সবপক্ষকে খুশি রাখা সম্ভব হবে না। তবু যতটুকু সম্ভব মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলি পাকিস্তানের আওতায় রেখে, নদীপথ, রেলপথগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে, ছিঁড়ে টুকরো করা হলো ভারতীয় উপমহাদেশ। টেনে দেওয়া হলো সীমানা রেখা। তারপর যা হবার কথা ছিলো তাই হলো। শুরু হলো কান্না। মাটির কান্না। এপারের লাখ লাখ মানুষকে বলা হলো ওপারে চলে যেতে, ওপারের লাখ লাখ মানুষকে বলা হলো এপারে চলে আসতে। ভিটেমাটি ছাড়ার কষ্ট অসহ্য, যে ছেড়েছে সেই জানে। নিজের গ্রাম, নিজের শৈশব, অতীত, পূর্বপুরুষ সবকিছু পেছনে ফেলে রেখে, পরিবার-পরিজন-সন্তান-সন্ততি নিয়ে অজানা অচেনা এক অপরিচিত জায়গায় চলে যেতে বলা হলো নিতান্তই সাধারণ হত-দরিদ্র সব মানুষদের। এ-কষ্ট কখনো দূর হবার নয়, এ-কষ্ট ভুলে যাবার নয়। মানুষের হৃদয়কে বিদীর্ণ করে, টুকরো টুকরো করে, নিজেও টুকরো টুকরো হলো উপমহাদেশ। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীন হলো পাকিস্তান, পূরণ হলো জিন্নাহদের স্বপ্ন। ১৬ই আগস্ট স্বাধীন হলো ভারত, পূরণ হলো নেহরুদের স্বপ্ন। শুধু ভেঙ্গে গেলো চিরকালের ভুক্তভোগী সাধারণ জনতার ঘর, স্বপ্ন, সাজানো সংসার। সেই ভাঙ্গনের ক্ষত আজও শুকায়নি, জোড়া লাগেনি সেই বিদীর্ণ হৃদয়।

মইনুল রাজু (ওয়েবসাইট)
[email protected]

[122 বার পঠিত]