আধুনিক জীববিজ্ঞানের অগ্রগতি এখন জীবাণু অস্ত্রের সম্ভাব্য উৎপাদন যে কোন ইচ্ছুক পক্ষের সাধ্যের নাগালে নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয় , সেই সাথে জীবাণু অস্ত্রের কার্যকারিতাকে অতীতের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি করতে সক্ষম। যথার্থভাবে প্রয়োগ করতে পারলে মাত্র কয়েক কিলোগ্রাম বোটালিনামের (Botulinum toxin) মত নিউরোটক্সিন দিয়ে সমগ্র মানব জাতিকে নিশ্চিন্হ করে দেয়া সম্ভব যা কিনা একটা ছোট খাটো ল্যাবে উৎপাদন করা সম্ভব। সমসাময়িক জীববিজ্ঞানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোন একটা জীবাণুতে প্রয়োজনীয় জীনগত পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন এমনভাবে করা সম্ভব যে প্রচলিত প্রতিরোধক কিংবা প্রতিষেধক সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়বে। উদাহরণস্বরূপ, কোন একটা বিশেষ ভাইরাসকে একটা নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর জেনোটাইপ লক্ষ্য করে এমনভাবে বানানো যেতে পারে যাতে করে কেবলমাত্র ঐ জাতিগোষ্ঠীর মানুষই আক্রান্ত হয়।ব্যাকটেরিয়ার বেলায় যক্ষ্মা (Tubercle Bacillus) অথবা এনথ্রাক্সের ( Bacillus Anthracis) প্রতিরোধক টিকা নেয়া থাকলেও নিজেদের নিরাপদ মনে করার কোন কারণ আমাদের নেই কারণ ল্যাবে এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর জীনে নির্দিষ্ট পরিব্যক্তি ঘটিয়ে টিকা প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াবানানো কঠিন কোন কাজ নয়। জীনগত পরিব্যক্তি এখন কেবলমাত্র প্রকৃতির একান্ত খেয়াল নয় , একজন জীববিজ্ঞানী চাইলেই সেটা করতে পারেন । জৈব অস্ত্র কনভেনশন (BWC) ১৯৭২ –এ সবরকম জৈব অস্ত্রের ব্যবহার, উৎপাদন এবং মজুদ করন নিষিদ্ধ করা হয় এবং এই কনভেনশন স্বাক্ষরের ১০ বছরের মধ্যে সকল স্বাক্ষরদানকারী পক্ষকে বিদ্যমান অস্ত্রের মজুদ এবং উৎপাদনকারী অবকাঠামো ধ্বংস করতে বলা হয়। কিভাবে এই চুক্তি যথার্থভাবে কার্যকর এবং বলবৎ করা হবে তা এখন পর্যন্ত একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিগণিত। এছাড়া রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টিকে জৈব অস্ত্রের ব্যবহার এবং উৎপাদন করা হতে বিরত রাখা অত্যন্ত কঠিন বিষয় কেননা তারা কোন চুক্তি স্বাক্ষর করে না এবং সেই সাথে চুক্তির শর্তাবলী মানতেও তারা বাধ্য নয়। অতএব , ভবিষ্যতে কোন রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রহীন পক্ষ দ্বারা জীবাণু তথা জেনেটিক অস্ত্রের ব্যবহার একটা বাস্তব এবং সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করার দাবী রাখে।

ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
জৈব রাসায়নিক পদার্থবাহী জীবাণু অস্ত্র বিশেষ লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহৃত হতে পারে । লক্ষ্যস্থল এবং তার আশে পাশের এলাকাসহ সম্ভাব্য লক্ষ্যস্থলের অধিবাসীদের উপর বিরূপ শারীরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করা যার মধ্যে অন্যতম। জৈব রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা সংঘটিত প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষনিক কিংবা বিলম্বিত হতে পারে। একটা সম্পূর্ণ এলাকা দীর্ঘমেয়াদী আক্রান্ত করতে যেখানে অধিক পরিমাণে জৈব কম্পাউন্ড প্রয়োজন , অতর্কিত আক্রমণে স্বল্প পরিমাণ কম্পাউন্ড পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলে আরও বেশী মরণঘাতী ফলাফল পাওয়া সম্ভব।এছাড়া জীবাণুরা নিজেরাই দ্রুতহারে বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম। জীবাণু অস্ত্র দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পরে উপসর্গসমূহ বিশ্লেষণ করে কারণ সনাক্ত করা অর্থাৎ জীবাণু অস্ত্রের আক্রমণ যে হয়েছে সেটা সনাক্ত করা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া হওয়ায় তা আক্রমণকারী পক্ষকে বাড়তি কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে। অত্যাধুনিক নিক্ষেপণ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে হাতে তৈরী বিবিধ ডিভাইস (improvised devices) এক্ষেত্রে রাষ্ট্র অথবা সন্ত্রাসবাদীদের দ্বারা ব্যবহৃত হতে পারে।

জৈব অস্ত্র কি ?
জৈব অস্ত্রে থাকে জৈব উপাদান যা মানুষ , জীবজন্তু এবং উদ্ভিদদের রোগাক্রান্ত করে তোলে। প্রচলিত জৈব উপাদানসমূহকে প্যাথোজেন(pathogens), টক্সিন (toxins), জৈবনিয়ন্ত্রনকারী(bioregulators) ও প্রিয়ন (prions) –এই চার শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়।

১। প্যাথোজেন(pathogens) : প্যাথোজেন রোগাক্রান্তকারী অণুজীব যেমন , ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস কিংবা রিকেটসিয়া । প্রকৃতিতে বিদ্যমান এবং বিক্ষিপ্ত পরিব্যক্তিসহ কৃত্রিম রিকম্বিনান্ট ডিএনএ তথা আধুনিক জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি দ্বারা মর্জিমাফিক পরিবর্তনযোগ্য।

২। টক্সিন (toxins : এক ধরনের জৈব বিষ যা জীবদেহের (অণুজীব, সাপ, কীট, মাকড়সা, সামুদ্রিক জীব, উদ্ভিদ ইত্যাদি) স্বাভাবিক মেটাবোলিজমের ফলশ্রুতিতে নির্গত হয়। কৃত্রিম পদ্ধতিতে উৎপাদনযোগ্য। টক্সিন দুই রকমের:‌
ক) সাইটোটক্সিন (Cytotoxins) : কোষ বিধ্বংসী , যেমন রিসিন (ricin)
খ) নিউরোটক্সিন (Neurotoxins) : কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বিকল কারী , যেমন বোটালিনাম টক্সিন।

৩। জৈবনিয়ন্ত্রনকারী(bioregulators) : একধরনের জৈবরাসায়নিক কম্পাউন্ড যা কোষ পর্যায়ের কার্যক্রম এবং দেহের সক্রিয় উপাদান সমূহ যেমন এনজাইম ও ক্যাটালিস্টদের নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাভাবিক দেহে স্বল্প পরিমাণে বিদ্যমান হলেও অধিক মাত্রায় রয়েছে নিশ্চিত মৃত্যুর সম্ভাবনা। যেমন , সাবস্ট্যান্স পি (Substance P)।

৪। প্রিয়ন (prions ) : এক ধরনের প্রোটিন যা মস্তিষ্কের কোষে প্রবেশ করে সেখানকার প্রোটিনকে প্রিয়নে রূপান্তর করে যার ফলে একসময় মস্তিষ্কের আক্রান্ত কোষের মৃত্যু ঘটে এবং মস্তিষ্কের টিস্যুতে প্রিয়ন ছড়িয়ে দেয়। এই প্রিয়নগুলো মস্তিষ্কের অন্যান্য কোষগুলো আক্রান্ত করে ধ্বংস করে দেয় যার ফলশ্রুতিতে মৃত্যু অনিবার্য। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯৬ সালে ব্রিটেনের ম্যাড কাউ (mad cow epidemic) মহামারীর কথা বলা যেতে পারে যা মানব দেহে সংক্রমিত হয়ে ক্রয়েটসফেল্ট ইয়াকব বা Creutzfeldt–Jakob disease রোগ সৃষ্টি করে ।

ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া টক্সিন রিকেটসিয়া
Chikungunya
Dengue
Ebola
Monkeypox
Variola
(গুটিবসন্ত)
Bacillus Anthracis
(এনথ্রাক্স)
Salmonella Typhi
(টাইফয়েড জ্বর)
Vibrio Cholerae
(কলেরা)
Yersinia Pestis
(প্লেগ)
Botulinum Toxins
Conotoxin
Ricin
Saxitoxin
Verotoxin
Coxiella Burnetii
Rickettsia Quintana
Rickettsia Prowasecki
Rickettsia Rickettsii

সম্ভাব্য ব্যবহার
১।মানববিধ্বংসী : জৈব এন্টি পার্সোনেল উপাদান সরাসরি মানব দেহে ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় যার মধ্যে তাৎক্ষনিক মৃত্যু এবং বিকলাঙ্গতা অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে যেসকল উপাদান ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস , রিকেটসিয়া , বায়োরেগুলেটর এবং টক্সিন।

২।পশুবিধ্বংসী : এগুলো গবাদি পশু সম্পদ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে বানানো হয়। বিশেষ রোগ ছড়িয়ে একটা দেশের গবাদি পশু নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে সেই দেশের খাদ্য সরবরাহে ক্ষতিসাধন এবং অর্থনীতিতে ধ্বস নামানোই এখানে মুখ্য উদ্দেশ্য।

৩। শষ্যবিধ্বংসী : একটা দেশের উদ্ভিদ এবং কৃষিকাজে সংশ্লিষ্ট চারা গাছে রোগের বিস্তার ঘটিয়ে খাদ্য সংকট সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে পঙ্গু করা এখানে মূল উদ্দেশ্য যাতে করে জনগনের বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধাচরন করার ক্ষমতা ব্যপকভাবে হ্রাস পায়।

৪। বস্তুবিধ্বংসী : বস্ত্র , চামড়া, রাবার ইত্যদি বিনষ্টকারী ফুঙ্গি (fungi) ছড়িয়ে দিয়ে মজুদ নষ্ট করে অর্থনীতিতে ব্যপক ক্ষতিসাধন করা হয়। কিছু চরমজীবি ব্যাকটেরিয়া পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ হতে শক্তি সন্চয় করে এবং এরা জ্বালানী সরবরাহ লাইন বন্ধ করে দিতে পারে।

কার্যকারিতা ও স্হায়িত্বকাল

জৈব অস্ত্রে ব্যবহৃত জৈব উপাদান সমুহের কার্যকারীতা এবং স্হায়িত্বকাল নির্ভর করে পরিবেশ ও সেই পরিবেশে ঐ জৈব উপাদান সমুহের টিকে থাকার ক্ষমতার উপর। অতিবেগুনী রস্মির(UV) বিকিরণ , আপেক্ষিক আদ্রতা , বায়ুর বেগ এবং তাপমাত্রা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। এছাড়া জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জৈব উপাদানসমূহের কার্যকারিতা ও স্হায়ীত্বকাল বৃদ্ধি করা সম্ভব।

(চলবে)

তথ্যসূত্র :
DoD- Chemical and Biological Defense Program Annual Report to Congress, Vol. I, April 2002.

Office of the Secretary of Defense, Proliferation: Threat and Response, US Government
Printing Office, January 2001.

Joint Publication 1-02, Department of Defense Dictionary of Military and Associated Terms,
as amended through 05 June 2003.

Brigadier General (BG) Russ Zajtchuck, et al. (eds.), Textbook of Military Medicine:
Medical Aspects of Chemical and Biological Warfare, Office of the Surgeon General, 1997,
Chapter 11, “Incapacitating Agents.”

Anna Johnson-Winegar, PhD, Assistant to the Secretary of Defense, Memorandum,
Subject: Interim Certification of Chemical and Biological Data, December 27, 2001.

Office of the US President, The Biological and Chemical Warfare Threat, 1999.

Centers for Disease Control and Prevention (CDC), Office of Health and Safety (OHS),
“BMBL Section VII: Agent Summary Statements, Section VII-D: Prions,” 17 June 1999,
http://www.cdc.gov/OD/OHS/BIOSFTY/bmb14/bmbl4s7d.htm, 19 August 2003.

Ruth Levy Guyer, “Research in the News: Prions: Puzzling Infectious Proteins,”
http://scienceeducation.
nih.gov/nihHTML/ose/snapshots/multimedia/ritn/prions/prions1.html, 8 August 2003.

AFMAN 10-2602, Nuclear, Biological, Chemical, and Conventional (NBCC) Defense
Operations and Standards (Operations), 1 December 2002.

USDA, APHIS, “Protocol for Military Clearance,” 18 June 2001.

BG Russ Zajtchuk, et al. (eds.), Textbook of Military Medicine: Medical Aspects of
Chemical and Biological Warfare, Office of the Surgeon General, 1997, Chapter 21, “The
Biological Warfare Threat.”

TM 3-216/AFM 355-6, Technical Aspects of Biological Defense, 12 January 1971.

BG Russ Zajtchuk, et al. (eds.), Textbook of Military Medicine: Medical Aspects of
Chemical and Biological Warfare, Office of the Surgeon General, 1997, Chapter 20, “Use of
Biological Weapons.”

[213 বার পঠিত]