সুতি শাড়ি আর সাধারণ চপ্পলেই দিব্যি চলে যার। বাড়ির পাশেই নালা। যা মশার বংশবিস্তারের কারখানা। এ থেকেই বোঝা যায়, তাঁর জীবনযাপন কতটা সাধারণ। সমর্থকদের কাছে তিনি ‘দিদি’ বলে পরিচিত। এই দিদিই ভোট শুরুর আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে এবার ইতিহাস সৃষ্টি হবে ’। আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৩ই মে এর নির্বাচনে নিজের পূর্বঘোষিত বিজয়বাণী দিয়ে যিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তিনি আর অন্য কেউ নন তিনি হলেন ১৯৫৫ সালের ৫ জানুয়ারিতে কলকাতায় জন্ম নেওয়া তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
মমতা রাজনীতি জীবন শুরু করেন জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে। ১৯৭০ সালে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৬ সালে তিনি মহিলা কলেজের সাধারণ সম্পাদিকা হন। তিনি ইতিহাসে সম্মানসহ স্নাতক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন ইসলামের ইতিহাসে। আইন শাস্ত্রেও তিনি ডিগ্রি নেন। ১৯৮৪ সালে যাদবপুর কেন্দ্রে সিপিএম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে তিনি প্রথম সাংসদ নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকবার তিনি লোকসভা সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে কংগ্রেস সরকার গঠন করলে মন্ত্রী হন মমতা। ১৯৯৬ সালে মমতা অভিযোগ করেন, কংগ্রেস দেশজুড়ে দুর্নীতি শুরু করেছে এবং পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকারকে দুর্নীতিতে সহযোগিতা করছে।
একপর্যায়ে কংগ্রেস ছেড়ে দিয়ে ১৯৯৭ সালে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) গঠিত সরকারে যোগ দেন। তাঁকে কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০০১ সালের শুরুতে এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন মমতা। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের একমাত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। ২০০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিল্পোন্নয়ন নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সরকার হাওড়ায় কৃষিজমি দিতে রাজি হয়। এর বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে জনতা। মমতা সেই আন্দোলনে জনতার পক্ষে অবস্থান নিলে বুদ্ধদেব সরকার শিল্পোন্নয়নের নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। এরপর ২০০৬ সালে সিঙ্গুরে টাটার ন্যানো গাড়ি তৈরির প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেন মমতা। এ ছাড়া নন্দীগ্রামে রাজ্যসরকারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তাও বন্ধ করতে সক্ষম হন। ওই আন্দোলনে সরকারের নির্দেশে পুলিশের গুলিতে ১৪ জন গ্রামবাসী নিহত হয়। এসব আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মমতা সাধারণ মানুষের হূদয়ে স্থান করে নেন।
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচন করেন মমতা। নির্বাচনে তাঁর দল ১৯টি আসন লাভ করে। কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী হন তিনি।
এখানেই থেমে থাকেনি দিদি মমতার অগ্রযাত্রা। ২০১০ সালে কলকাতা ও বিধাননগর মিউনিসিপালে জয়লাভ করে তাঁর দল। আর বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বাম দুর্গের পতন ঘটাল তাঁর দল।
এদিকে ১৯৭৭ সালের ২১ জুন কংগ্রেসের কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়েছিলেন বামফ্রন্টের নেতা জ্যোতি বসু। তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়। ২০০০ সাল পর্যন্ত জ্যোতি বসু ওই পদে বহাল থেকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ওপর দায়িত্ব দিয়ে অবসর নেন। মমতার আগে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন যথাক্রমে প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ (১৯৪৭-৪৮), বিধান চন্দ্র রায় (১৯৪৮-৬২), প্রফুল্ল চন্দ্র সেন (১৯৬২-৬৭), অজয় কুমার মুখার্জি (মার্চ ১৯৬৭ থেকে নভেম্বর ৬৭), প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ (১৯৬৭-৬৮), অজয় কুমার মুখার্জি (১৯৬৭-৭১), সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় (১৯৭২-৭৭), জ্যোতি বসু (১৯৭৭-২০০০) ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য (২০০০-২০১১)।
দীর্ঘদিনের শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের ফসল হিসেবে ৩৪ বছর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতায় ছিল বামপন্থীরা। কিন্তু এবার বিধানসভা নির্বাচনে মমতার জাদুর ছড়িতে রচিত হলো নতুন অধ্যায়।

পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের উত্থান ও পতনের ইতিহাসের সূত্রপাত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয় ১৯৩০ সালের এপ্রিল মাসে। যুগান্তর ও অনুশীলন পার্টির তরুণ বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগারে হামলা চালায়। প্রশ্নাতীতভাবে ঐ দল দুটো ছিল বাঙালী কমিউনিস্টদের সবচেয়ে সংগঠিত ও সফল দল। ফেব্রুয়ারী ১৯৩৩ এ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলায় গ্রেপ্তার হন বিপ্লবী মাস্টার দা সূর্যসেন। ঐ বছরের মে মাসে সূর্যসেনের সহযোদ্ধা কল্পনা দত্ত ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ বাহিনী। বিচারে সূর্যসেন ও তারকেশ্বরকে মৃত্যুদণ্ড এবং কল্পনাকে নির্বাসনে পাঠানোর রায় দেয় ঔপনিবেশীক শাসক গোষ্ঠীর আদালত। ১৯৩৪ এর জানুয়ারীতে চট্টগ্রাম কারাগারে ফাঁসি হয় সূর্যসেনের। ফাঁসির আগে এক বক্তব্যে ভারত মুক্তির স্বপ্ন ছড়িয়ে যান তিনি। সহযোদ্ধাদের মধ্যে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা যুগিয়ে বন্দে মাতরম সঙ্গীতের মাধ্যমে শেষ করেন বক্তব্য। পরবর্তীতে সূর্যসেনের দলের সদস্যরা যোগ দেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে (সিপিআই)।
জ্যোতি বসু ১৯৩৫ সালের মার্চে আইন পড়তে ব্রিটেন যান। সেখানে ভিকে কৃষ্ণা মেননের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন ইন্ডিয়ান লীগে যোগ দেন তিনি। অনুশীলন দলের সদস্য ভূপেশ গুপ্ত ও শেহাংসুকান্ত আচার্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় বসুর। গ্রেট ব্রিটেন কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিজিবি) নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন তারা। লন্ডন, অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজের কমিউনিস্ট গ্রুপগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতে থাকেন। হ্যারি পোলিট, রজনি পালমে দত্ত, বেন ব্রাডলিসহ সিপিজিবির অনেক নেতার চিন্তা ও আদর্শের প্রভাব পড়ে এই তরুণ বাঙালী শিক্ষার্থীদের ওপর। পরবর্তীতে ১৯৪০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কল্পনা দত্ত, অনন্ত সিং, অম্বিকা চক্রবর্তীসহ আরো কয়েকজন জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সিপিআই-এ যোগ দেন। শুরু করেন প্রকাশ্যে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। জ্যোতি বসু ১৯৪০ সালে ভারতে ফিরে সিপিআই-এ যোগ দেন। ব্যারিস্টার হিসেবে কলকাতা হাই কোর্টে আইন ব্যবসার অনুমতি পান। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হওয়ার তাগিদে কখনো প্র্যাকটিস করেননি বসু। প্রথমদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত বামপন্থী দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়িত্ব পালন করতেন। ১৯৪৬ সালে রেল শ্রমিকদের এলাকা থেকে ভোটে জিতে বিধানসভায় যান বসু। ঐ বছর রতনলাল ব্রাহ্মণ ও রুপনারায়ন রায় নামে আরো দুই কমিউনিস্ট নেতা বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয়তা পায় সিপিআই। ১৯৪৬ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক ফ্রন্ট- কিষাণ সাবা গড়ে তোলে তেভাগা আন্দোলন। সে সময় বর্গা চাষীরা অর্ধেক ফসল ভূমির মালিককে দিতে বাধ্য ছিল। তেভাগা আন্দোলনের দাবী ছিলো, অর্ধেক নয় তিন ভাগের এক ভাগ ফসল পাবেন জমির মালিক। আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিলে অনেক ভূস্বামী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার কৃষকদের দাবী মেনে নেওয়ার আদেশ দেয়। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালের খাবারের দাবীতে আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐতিহাসিক মাইল ফলক হিসেবে সমাদৃত। সে বছর ৩১ অগাস্ট কিষাণ সাবার ডাকে কলকাতায় বিক্ষোভে যোগ দেয় কয়েক লাখ গ্রামবাসী। সমাবেশ শেষে জনতা রাইটার্স ভবন অভিমুখে মিছিল শুরু করলে তাতে লাঠিপেটা করে পুলিশ। গুলি নয়, নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে ৮০ জনকে। জ্যোতি বসু বিধানসভায় ঐ হত্যাকাণ্ডকে জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করেন। বিধানসভায় কংগ্রেস সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিরোধীদলীয় জোট।

দীর্ঘ সময় পার হবার পর ১৯৬৪ সালে চীন-সোভিয়েত আদর্শিক দ্বন্দ্বের জেরে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই-এর একাংশ সিপিআই (মার্ক্সিস্ট) নামে নতুন দলের সূচনা করে। ১৯৬৬ সালে বাম দলগুলোর ডাকে খাবারের দাবীতে আবারো বিক্ষোভ হয়। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে বাঙলা কংগ্রেসের নেতা অজয় মুখার্জির নেতৃত্বে সরকার গঠন করে ইউনাইটেড ফ্রন্ট। ঐ সরকারের উপ মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান সিপিআইএমের জ্যোতি বসু। তবে বেশীদিন টিকতে পারেনি সে সরকার। ঐ বছরেই চারু মজুমদারের নেতৃত্বে শুরু হয় নকশালবাড়ী আন্দোলন। সিপিআইএমকে ‘বুর্জোয়াদের মিত্র’ চিহ্নিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয় তারা। এর পরে ১৯৬৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় সিপিআই (এম)। কিন্তু সিপিআই ও বাঙলা কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে তারা। অজয় মুখার্জি হন মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৭৭ এর নির্বাচনে ২৪৩ আসন পায় বামফ্রন্ট। জ্যোতি বসুকে মুখ্যমন্ত্রী করে বামফ্রন্টের প্রথম সরকার গঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গে। ভূমি সংস্কার করে সরকার। এরপর অনেকদিন আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বামদের। ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে জয় পায় তারা। ২০০০ সালে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে আসেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ২০০৬ সালের নির্বাচনে ২৩৫ আসন পায় বামফ্রন্ট। ২০০৭ সালের বামফ্রন্টের পরাজয়ের পথ রচিত হয় এ বছরই, নন্দীগ্রামে। মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামে শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস ও মাওবাদীদের সমর্থনে বিক্ষোভে নামে এলাকাবাসী। বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে ১৪ জন নিহত হওয়ার পর অবস্থান পাল্টায় সরকার। ২০০৮ এ পঞ্চায়েত নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের মুখে পড়ে বামফ্রন্ট। এ বছর আবারো ভুল করে বামফ্রন্ট সরকার। এবার হুগলি জেলার সিঙ্গুরে টাটা মটরসের ন্যানো প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা। আন্দোলন রসদ যোগান তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অক্টোবরে প্রকল্পটি গুজরাটে সরিয়ে নেয় টাটা। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে লোকসভা (ভারতের জাতীয় নির্বাচন) নির্বাচনে ভরাডুবি হয় বামফ্রন্টের। কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস জোট লোকসভার ২৭ আসনে জয়ী হয়। তৃণমূল একাই পায় ১৯ আসন।
সর্বশেষ ২০১১ এ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে শেষ হল টানা ৩৪ বছরের বাম শাসন।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল তৃণমূল-কংগ্রেস জোট। তৃণমূল-কংগ্রেস জোট ২২৭টি আসনে জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী বামফ্রন্ট মাত্র ৬২টি আসনে জয় পেয়েছে। বিজেপিসহ অন্যান্য কয়েকটি দল অপর ৬টি আসন পেয়েছে। পশ্চিমবাংলায় গত বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট ২৩৫টি আসনে জয় পেয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনী ফলাফল উল্টে গেছে। তৃণমূল-কংগ্রেস জোটের কাছে এবারের নির্বাচনে কুপোকাত হয়েছেন ১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণকারী খোদ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যসহ বেশ কয়েক জন হেভিওয়েট বাম প্রার্থী। অর্থমন্ত্রী অসীম দাসগুপ্ত নির্বাচনে হেরেছেন। এছাড়াও যেসব হেভিওয়েট প্রার্থী পিছিয়ে রয়েছেন তারা হলেন_ শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেন, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী দেবেশ দাস, শ্রমমন্ত্রী অনাদি সাহু, গৃহায়ন উন্নয়নমন্ত্রী গৌতম দেব, পরিবহনমন্ত্রী রঞ্জিত কুণ্ডু, পিডবি্লউডিমন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সূর্যকান্ত মিশ্র ও পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়নমন্ত্রী সুশান্ত ঘোষ প্রমুখ।

জোট নেত্রী মমতা ব্যানার্জী এ বিজয়কে মা-মাটি ও মানুষের বিজয় বলে অভিহিত করেছেন। সেই সাথে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিহিংসা ও সহিংসতা ত্যাগ করে ধৈর্য ও সংযমী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অপরদিকে, পশ্চিমবাংলার ভাবি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর এ অবিস্মরণীয় বিজয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন। শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোনে মমতা ব্যানার্জীকে বিজয়ের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

এ বিজয়ে কলকাতায় তৃণমূল শিবিরে আনন্দের জোয়ার বইছে যখন। দলে দলে তারা কালীঘাটে বিজয়ী নেত্রী মমতার বাসভবনের দিকে ছুটছেন অভিনন্দন জানাতে। আনন্দ ভাগাভাগি করতে রঙ খেলায় মেতেছেন সবাই। চলছে মিষ্টি বিতরণও। তখন বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা জাচ্ছে মমতা ব্যানার্জীর নির্বাচন ফেস্টুনের অন্তরালের কাহিনী।
কলকাতা থেকে জানা গেল আর্ট কলেজের থেকে শিক্ষিত ভালো কাজ জানা ছেলেমেয়েরা যখন একটা ছবি ভালো দামে বিক্রির আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন তখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির তড়িঘড়ি এঁকে দেওয়া ছবিও আকাশছোঁয়া দামে নাকি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ছবি বিক্রির এই বাজার দেখে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা কলকাতার সত্যিকারের কাজ জানা শিল্পীরাও বিস্মিত। সম্প্রতি কলকাতায় গ্যালারি ৮৮এ মমতা ব্যানার্জির আঁকা ছবির প্রদর্শনী হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় মুখপত্র জাগো বাংলার উদ্যোগে প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হলেও এর পিছনে মূল উদ্যোক্তা ছিলেন প্রতিদিন সংবাদপত্রের মালিক। উদ্যোক্তাদের দাবি প্রদর্শনীতে মমতা ব্যানার্জির আঁকা ছবিগুলির সবকটি বিক্রি হয়ে গেছে, ছবি বিক্রি করে নাকি পাওয়া গেছে ২কোটি টাকা। জাদুর ছড়ি হাতে থাকলে আর কলকাতায় ছবি আঁকতে জানলেই দুদিনে ২কোটি টাকার ছবি বিক্রি করা সম্ভব! আর্ট কলেজ থেকে পাস করা এক শিল্পী জানিয়েছেন, কলকাতার মাত্র কয়েকজন শিল্পীর ছবিই কোটি টাকা দামে বিক্রি হয়। তারও বেশিরভাগ বিক্রি হয় মুম্বাই বা বিদেশে। এখানে ছবির প্রশংসা করার সমঝদার লোক থাকতে পারেন, কিন্তু চড়া দাম দিয়ে কেনার লোক কমই আছেন। কলকাতার খুব কম শিল্পীই কোটিপতি ক্লাবের মেম্বার হতে পারেন।তাঁদের আরো দাবি, মমতা ব্যানার্জি ছবি বিক্রির পুরো টাকাটাই দিয়ে দিয়েছেন তৃণমূলের নির্বাচনী প্রচারের কাজে। তৃণমূলের প্রচারের যাবতীয় কাজ নাকি হচ্ছে এই ছবি বিক্রির টাকায়। ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ভোট দেওয়ার আহবান জানিয়ে বিজ্ঞাপন সহ হেলিকপ্টারে করে প্রচারণা করাও এর অর্ন্তভুক্ত। যিনি এই নির্বচানের আগে হেলিকপ্টারে করে প্রচারণা করলেন সেই মমতা ব্যানার্জি পর্বেই সোনিয়া গান্ধীকে কটাক্ষ করে বলতেন, ভোটপাখি। কারণ সোনিয়া গান্ধী হেলিকপ্টারে করে প্রচারে ঘুরতেন।

জানা গেছে, ছবি প্রদর্শনীর আড়ালে আসলে তৃণমূল কংগ্রেস খুব সংগঠিতভাবে কলকাতার শিল্পপতিদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহের কাজটি করেছে। যারা প্রকাশ্যে টাকা দিতে রাজি ছিলেন না, তাঁদের বলা হয়েছিলো ছবি কিনে টাকা দিতে। এতে প্রকাশ্য লেনদেনও হলো, রাজনীতির রঙও লাগলো না। এইভাবেই বড়বাজারের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েঙ্কা, হর্ষ নেওটিয়া, প্রতিদিনের মালিক সৃঞ্জয় বসু, জগমোহন ডালমিয়া, কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিক জয় মেহতা প্রমুখ লক্ষ লক্ষ টাকা ঢেলে ছবি কিনেছেন।

এ নির্বাচনী প্রচারে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল অর্থ ব্যয় দেখে প্রশ্নটা উঠছিলোই। এবার সি পি আই (এম) নেতা ও রাজ্যের আবাসনমন্ত্রী গৌতম দেব তথ্যসহ সেটাই ফাঁস করে দিলেন। তৃণমূল কংগ্রেসের কুপন কেলেঙ্কারি। শনিবার ১৪ই মে কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সামনে এই কেলেঙ্কারি ফাঁস করে দিয়ে গৌতম দেব জানিয়েছেন, ই এম বাইপাসে তৃণমূল কংগ্রেস ভবন থেকে ঐ দলের একজন বাদে প্রত্যেক প্রার্থীকে ১৫লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মোট ৩৪কোটি টাকা বণ্টন করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুকুল রায় ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন গৌতম দেব। কালো টাকার বণ্টন পদ্ধতি ও ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে গৌতম দেব বলেন, তৃণমূল নেত্রীর ছবি বিক্রির প্রদর্শনী হয়েছে এপ্রিল মাসে। কিন্তু তার আগেই গত ২৫শে মার্চ তারিখে তৃণমূল ভবনে জেলাগুলি থেকে তৃণমূল প্রার্থীরা আসেন। একজন প্রার্থী বাদে তৃণমূলের ২২৬জন প্রার্থীই তৃণমূল ভবন থেকে নগদে ১৫ লক্ষ টাকা করে নিয়ে গেছেন। মোট ৩৩কোটি ৯০লক্ষ টাকা এই ভাবে দেওয়া হয়েছে তৃণমূল প্রার্থীদের।

আরো জানা গেছে, এবারের নির্বাচনী প্রচারে তৃণমূল কংগ্রেস যে বিপুল ব্যয় করছে সেটা খোলা চোখেই দেখা যাচ্ছিলো। দুটো হেলিকপ্টার ভাড়া থেকে শুরু করে টেলিভিশন চ্যানেলে চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেওয়া, জেলায় জেলায় বিপুল টাকার ব্যবহার। এদিন কলকাতা প্রেস ক্লাবে মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে এই টাকার উৎস সন্ধান দিতেই কুপন কেলেঙ্কারির উত্থাপন করেন গৌতম দেব। তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা গেছে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দর থেকেই তিনি বিস্তৃত তথ্য ও নমুনা সংগ্রহ করেছেন, এবং তৃণমূলের অর্থ-বণ্টনের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জেনে শুনেই তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন। এর আগেই তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ১৬ই এপ্রিল তৃণমূল সম্পর্কে মারাত্মক খবর তিনি ফাঁস করে দেবেন। এদিন সেই কাজটাই করলেন, তার সঙ্গে একথাও বলে রাখলেন, ‘আরো তথ্য রয়েছে আমার হাতে। প্রয়োজনে সেগুলি দফায় দফায় প্রকাশ করে দেবো।’

গৌতম দেব ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন এই একমাত্র টাকা না নেওয়া তৃণমূল প্রার্থীর নাম উপেন বিশ্বাস। (পরে সাংবাদিকদের কাছে উপেন বিশ্বাসও বলেছেন, আমি দলের কাছ থেকে টাকা নিইনি। আমার নিজের টাকা এবং বাগদা থেকে সংগৃহীত টাকায় লড়ছি।)

কালো টাকা যা তৃণমূল প্রার্থীদের বিতরণ করা হয়েছে তাকে সাদা হিসাবে দেখানোর জন্য তৃণমূল কংগ্রেস ১০০, ২০০ এবং ৫০০ টাকার কুপন ছাপিয়েছিলো। গৌতম দেব বলেছেন, টাকা জেলায় জেলায় সব প্রার্থীদের কাছে চলে গেছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত জেনে বলছি, কোথাও কোনো কুপন বিলি হয়নি, জনগণের কাছ থেকে একপয়সাও তোলা হয়নি। তৃণমূল ভবনে পাঁচ-ছয়জন লেবারকে বাইরে থেকে আনা হয়েছিলো, তাদের দিয়ে কুপন ছিঁড়ে কাউন্টার ফয়েল আলাদা করা হয়েছে। টাকার সঙ্গে কাউন্টার ফয়েল অংশ প্রার্থীদের হাতে দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে, যান, এইভাবে টাকা সংগ্রহ হয়েছে বলে হিসাব দিয়ে দেবেন। আর কুপনের মূল অংশগুলি বস্তায় ভরে ভরে তৃণমূল ভবনে রাখা হয়েছিলো। তারপর মধ্যরাতে ভবনের পাশের জমিতে সেগুলি পোড়ানো হয়েছে। এই সব ঘটেছে মুকুল রায়ের তত্ত্বাবধানে।
বাতাসে নির্ভর করে যে তিনি অভিযোগ করছেন না, তা বোঝাতে গৌতম দেব জানিয়ে দিয়েছেন, আমার কাছে কুপন পোড়ানোর জায়গার ছবিও তোলা রয়েছে। কুপন এবং পোড়া কুপনের নমুনাও রয়েছে। আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে তৃণমূলের নেতাকে পাশে বসিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে আরো তথ্য ফাঁস করে দেবো।
এই উত্তপ্ত পরিবেশে ভারতে এই মুহূর্তে মহিলা রাজনীতিকদের জয়জয়কার চলছে। পুরো ভারত জুড়ে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধির জনপ্রিয়তাতো আছেই, তার উপর ৪টি প্রদেশে এই মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী আছেন ৪ জন মহিলা রাজনীতিবিদ। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বর্তমানে রয়েছেন শিলা দিক্ষিত। উত্তর প্রদেশে আছেন মায়াবতী, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার আসনে বসতে প্রস্তুত বিপুল জনপ্রিয় তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। আর তামিলনাড়ুতে রয়েছেন জয়ললিতা। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশী সংখ্যকবার মুখ্যমন্ত্রী হবার গৌরব আছে শিলা দিক্ষিতের। তিনি গত ১২ বছর যাবৎ আছেন এই পদে। উত্তর প্রদেশে নিজেকে একাই একশ বলে প্রমাণ করেছেন মায়াবতী। শুধু মুখ্যমন্ত্রী নন দেশের সর্বোচ্চ আসনেতো বসে আছেন আরেক তারকা প্রেসিডেন্ট প্রতিভা পাতিল। এখন দেখবার বিষয় পশ্চিমবঙ্গের ৮ম মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বাংলায় তার জাদুর ছড়ি নাড়িয়ে কত সময় দমিয়ে রাখতে সক্ষম হন ৩৪ বছরের বাম শাসন।

Email: [email protected]

[257 বার পঠিত]