টেক্সাসের গরম শুরু হয়ে গেছে। কলেজ স্টেশনে আজই এ বছরের প্রথম ১০০ ডিগ্রী তাপমাত্রা। ছোট্ট পাখি। দেখতে ঘুঘু পাখির মত। আকারে তার চেয়েও ছোট। কিন্তু বেজায় দুষ্ট। পেছনের দরজা খুলে বাইরে এলেই আমার টাকু মাথায় চাটি মেরে দিয়ে যায়। ব্যাটাদের মাথায় ঘিলু কম। চাটি মেরে আমাকে ভয় ভয় দেখাতে এসে ওরা ওদের আসল মতলবটাই ফাস করে দেয়। আমার লাউ গাছের জাংলায় বাসা বেঁধেছে। ডিম থেকে বাচ্ছা বেরিয়েছে। কাজেই সাবধান। আমি খুজে বের করি বাচ্চা। ওরা আরো বেশী চেচামেচি করে।

প্রচন্ড গরম। জাংলার তলায় পাতা চেয়ারে বসি। গাছের ছায়া এবং মৃদু বাতাস উপভোগ করি। বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে। পাখিদের কিচির মিচির শুনি আর গাছেদের কান্ড কারখানা দেখি। ডারউইনের বিবর্তনের ধারায় সৃষ্ট প্রজাতি মনুষ্যকূল শুধু বুদ্ধিমানই নয়। এরা চালাক, ধূর্ত, ঠগ, বিভৎস এবং ভয়ংকর। কিন্তু গাছেরা বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু বুদ্ধি হলে চলে শুধুমাত্র অতটুকুই বুদ্ধিমান। লাউ গাছের লাউ এবং পাতার শাক খাবেন। কষ্ট হলেও লাউ গাছ মুখ বুজে সহ্য করবে। কিন্তু গোলআলু গাছ তা সহ্য করবে না। যদি আলু খেতে চান তো পাতায় হাত দিবেন না। আর পাতায় হাত দিলে আলুর খাতা একেবারে শূন্য। এদের পাতায় হাত পড়লে গাছ ক্ষেপে উঠে। তখন প্রতিরোধক হিসেবে টক্সিক কেমিকেল তৈরী হয়। ফলে ক্ষেপা ষাঁড়ের মত এদের আচরণ হয়। গাছের আকার দ্রুতবৃদ্ধি পায়। নতুন পাতাও তাড়াতাড়ি দেখা দেয়। কিন্তু এই শাক খেলে বিষাক্ত স্বাদ সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন। আত্মরক্ষার জন্য দেহরক্ষাই আলু গাছের প্রধান ব্রত হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বিন্দুমাত্র শক্তিও এরা নতুন প্রজন্মের জন্য রাখতে পারে না। বয়সের ভারে গাছ শুকিয়ে যায়। আপনি ভাববেন এবারে আলু তোলার সময় হয়েছে। মাটি আলগা করুন। দেখবেন একটাও নতুন আলু নেই।

দেখুন আত্মরক্ষার জন্য গাছেরা কী রকম বেপরোয়া।
(মাত্র তিন মিনিট)

আপনি হয়ত খুশী হবেন গাছে অনেক লাঊএর কড়া এসেছে। এবং পরাগায়নও হয়েছে অনেক। সবগুলোই বড় হচ্ছে। আপনি খুব খুশী। কিন্তু গাছেদের এবার সিদ্ধান্ত নেবার পালা। গাছ তার নিজের শরীরের আয়তন এবং মাটি এবং সূর্য রশ্মি থেকে প্রাপ্ত পুষ্টির একটা হিসাব করবে। দেখবে কয়টি শিশুকে বড় করতে পারবে। হিসাব থেকে চিহ্নিত করবে কাকে রাখবে, কাকে ছাড়বে। বাড়তি লাঊয়ের কড়াকে একফোটা পুষ্টি সরবরাহ করবে না। চিহ্নিত মাত্র কয়েকটি লাউই বড় হবে। বাকী গুলো পুষ্টির অভাবে এক ইঞ্চিও বড় হবে না। তারপর একদিন অনাদরে অবহেলায় মারা যাবে। আর এই সময় পুষ্টি পাওয়া লাউগুলো যতদিন গাছে থাকবে নতুন কড়া একটিও আর আসবে না। কী আসাধারণ বুদ্ধি এদের। নিজের কোন ডালে কোন কোনায় শিশু লাউ বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তার একটা হিসেব হবে। চিহ্নিত করবে কে পুষ্টি পাবে আর কে পাবে না। তার পর যে পুষ্টি সরবরাহ পাবে না, তার পথে রোধক বসাতে হবে। এ এক জটিল ব্যাপার – স্নায়বিক, গানিতিক, জৈবিক, বৈষয়িক এবং প্রায়োগিক। এদের বুদ্ধি কোথায় থাকে? এত কিছু কে নিয়ন্ত্রন করে? কী ভাবে, কোন পথে? গাছেদের কি মস্তিষ্ক আছে? কোথায় এই মস্তিষ্ক?

ডানে-উপরের কড়াটি এবং বাঁয়ের দুটো লাউএর বয়স একই। গাছটি ছোটটিকে হিসেবের বাইরে ফেলে দেওয়ায় এই দশা। পুষ্টিহীনতায় আর বড় হতে পারেনি। দিন তিনেক পরেই এটির মৃত্যু ঘটে।

উপরে নীচে একই লাইনে তিনটি লাউ। একই দিন কোন এক বিকেলে তিনটিরই পরাগায়ন হয়েছে। কিন্তু গাছ ছোটটিকে পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করেছে। ছোট হলুদ বর্ণ ধারণ করল। শুধু শুধু বেঁচে থাকার জন্য যে নূন্যতম পুষ্টি দরকার গাছ এটিকে তাও দিচ্ছে না। দিন দুইএর মধ্যে ছোটটি ঝরে পড়ল।


পিয়ার্স গাছ। শীতের শেষে সাদা ফুলে ভর্তি। ভাবলাম পিয়ার্স বড় হলে সব গুলো ডালই ভেঙ্গে পড়বে। গাছের মাথায় বুঝি কোন ভূত চাপল। ফুল উধাও। কচি পাতায় গাছ ছেয়ে গেল। এখানেই শেষ নয়। বিশেষ কয়েকটি ডালের উপরেও গাছটি নাখোশ হল। তার প্রত্যেকটি পাতাকে যেন রাতারাতি গলাটিপে মেরে ফেলল।

স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর লেখাতেই প্রথম জেনেছি। গাছেরও প্রাণ আছে। নিজের যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন। আঘাত পেলে এরা কাঁদে, খুশীতে আনন্দ করে। প্রাণ থাকলে আমাদের মত মস্তিষ্কও নিশ্চয় আছে। যেখানে মনের কথা লুকিয়ে থাকে। সমগ্র অংগ-প্রত্যংগ পরিচালনার জন্য নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (ব্রেইন) আছে। একটি ডালা বা পাতা ছিড়লে জীব-জন্তুর রক্তের মত কষ্‌ বের হয়। জলের পাইপ অজৈব বস্তু। ফেটে বা কেটে গেলে একজন কারিগর মেরামত না করলে জল পড়তেই থাকে। কিন্তু জীব-জন্তুদের মস্তিষ্ক আছে। মস্তিষ্ক রক্তপড়া বন্ধের জন্য ততপর হয়ে উঠে। রক্ত জমাট বাঁধে। পড়া বন্ধ হয় আপনা থেকেই। গাছেদেরও কষ্‌ পড়া নিজ থেকেই বন্ধের ব্যাপার আছে। কে করে এই কাজটি? কোথায় থাকে গাছেদের মস্তিষ্ক?

চার্লস ডারউইন[1] গাছের অংগ-প্রতংগের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ পূর্বক ১৮৮০ সালে “The Power of Movements in Plants” নামে একটি বই বের করেন। বলেন, বীজ থেকে প্রথমেই যে অংশটি (root-tip) বেরোয় সেটি নিম্ন শ্রেনীর প্রাণিদের ব্রেইনের মতই কাজ করে। ব্রেইনটি বেরোনো অংশের শীর্ষস্থানেই অবস্থান করে। জগদীশ চন্দ্র বসু[2, 3] পরীক্ষা (১৯০০) করে বলেন, প্রতিটি গাছ এবং প্রতিটি অংগেই যেন একটি স্নায়ুতন্ত্র আছে। ক্লেভ ব্যাক্সটার [4,5] (১৯৬৬) মনে করেন গাছ অন্যান্য প্রাণীকুলের সাথেও যোগাযোগ করতে পারে।

লতানো গাছগুলোর বেড়ে উঠার জন্য অবলম্বন দরকার। যাকে তাকে এরা অবলম্বন করবে না। Lowe’s or Home Depot থেকে কৃত্রিম সহায়ক নিয়ে আসুন। পাতি গুলো চ্যাপ্টা হলে গাছের এন্টিনা গুলো ওদিকে তাকাবেই না। তিন হাত দূরে যদি কোন কঞ্চি থাকে তবে তার জন্যই আতি-পাতি করবে। খ্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরের সংবাদ দাতা প্যাট্রিক জনসন [৬] বলেছেন – ক্ষুদে পরগাছা স্ট্র্যাংগলউইড ধারে কাছে শত্রু বা মিত্র আছে কিনা তা বুঝতে পারে। বন্ধু হলে কাছে আসবে। নতুবা মুখ ঘুরিয়ে থাকবে।

আপনি হয়ত বুদ্ধি করে দুটো জাংলা বানিয়েছেন। একটাতে লাউ করবেন আর একটাতে ছিম। মাঝখানে চার ফুট ব্যবধান রেখেছেন। আপনি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করবেন। লাউ গাছ আপনার দেওয়া জায়গার গোটাটা দখল না করেই লুল পুরুষের মত ছিম গাছের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে ওটিও দখল করতে। কারণ সে জানে আপনি যতটুকু ব্যবস্থা লাউএর জন্য করেছেন তা ভবিষ্যতে যথেষ্ঠ হবে না।

খৃষ্টের জন্মেরও ২৮০ বছর আগে এরিষ্টটল গাছের বুদ্ধিবৃত্তি দর্শনে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বাস করেছিলেন গাছের আত্মা আছে, আছে সংবেদনশীলতা। ছেলে ফ্র্যান্সিসের লেখা বইতে ডারউইন লিখলেন, বীচি থেকে প্রথম যে শিকড়টি বের হয় তারই ডগায় থাকে গাছের বিস্তৃত মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্কই বিভিন্ন অংগ থেকে অনুভূতি একত্রিত করে এবং সীমিত নড়াচড়া নিয়ন্ত্রন করে। এই ধারায় neurobiological গবেষনা চলে Bose [7], Simons [8], Roshchina [9]। কিন্তু Frantisek, Stefano, and Dieter [10] বিষয়টি ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। এঁরা বলেন, শিকড়ের ডগায় (root apex or tip) বিশেষ ধরণের একগুচ্ছ কোষ থাকে যার হাতেই থাকে মস্তিষ্ক সদৃশ যত গুনাবলী। আজকাল বিজ্ঞানী মহলে স্বীকৃত যে, গাছেরা পরিবেশ থেকে নানাবিধ সংকেত আহরণ করতে এবং ত্বড়িত বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। এমন কি কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে সে বিষয়ে পূর্বেই পরিকল্পনা করতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় যে ভুল-ভ্রান্তি বিশ্লেষণ এবং মেমরি ব্যবস্থাপনা বিষয়েও নাকি গাছেরা সম্যক জ্ঞান রাখে।

[1] http://en.wikipedia.org/wiki/Plant_intelligence#Senses_in_plants
[2] ^ Bose, J.C., The Nervous Mechanisms of Plants, Longmans, Green and Co., London. 1926
[4]^ “The Nervous Mechanism of Plants”. Nature 118 (2975): 654–655. 1926. Bibcode 1926Natur.118..654.. doi:10.1038/118654a0.
[৪]^ C Backster. Evidence of a primary perception in plant life. International Journal of Parapsychology, 1968
[৫] ^ Horowitz, K. A.; Lewis, D. C.; Gasteiger, E. L. (1975). “Plant “Primary Perception”: Electrophysiological Unresponsiveness to Brine Shrimp Killing”. Science 189 (4201): 478. Bibcode 1975Sci…189..478H. doi:10.1126/science.189.4201.478. PMID 17781887
[৬] http://www.csmonitor.com/2005/0303/p01s03-usgn.html
[7] BOSE, J. C. 1926. The nervous mechanism of plants. Langmans, Green and Company, London, New
York.
[8] SIMONS, P. 1992. The action plant. Blackwell Publishers, Oxford, England
[9] ROSHCHINA, V. V. 2001. Neurotransmitters in plant life. Enfield, Science Publishers Inc.
[10] František Baluška, Stefano Mancuso, Dieter Volkmann & Peter Barlow. Root apices as plant command centres: the unique
‘brain-like’ status of the root apex transition zone. Biologia, Bratislava, 59/Suppl. 13: 1—, 2004
(http://ds9.botanik.uni-bonn.de/zellbio/AG-Baluska-Volkmann/plantneuro/pdf/NeuroPlantTZ-Biologia.pdf)

নৃপেন্দ্র নাথ সরকার
টেক্সাস, ২ জুন ২০১১

[217 বার পঠিত]