কয়েকটি কবিতা ও ছায়া-কাব্য

By |2011-05-23T02:19:55+00:00মে 23, 2011|Categories: আবৃত্তি, কবিতা|13 Comments

যেভাবে আবিষ্কার হয় সত্য

যে শিশুটিকে গলা টিপে হত্যা করেছি
তুমি আর আমি,
মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য পুড়িয়ে ছাই
করেছি তার দেহ।
আরও কিছু যাতে না ঘটে সেই ভয়ে
কিছুটা ছাই ভাসিয়ে দিয়েছি সমুদ্রে
কিছুটা উড়িয়ে দিয়েছি ঝড়ো বাতাসে
আর কিছুটা চাপা দিয়েছি অন্ধকারে।

শিশুটি এখন আমাদের ভেতরে আবাস
গেড়েছে, বাস করতে করতে জমাট বেধে
উঠেছে তার অসিত্মত্ব, আমাদের ভেতরের
রক্তই একটু একটু করে গাড়-ঘন করে
তুলেছে সর্বাঙ্গ।

আমাদের শরীর চিরে কোনও এক
অমাবশ্যার রাতে এক আকাশ আলো নিয়ে
জন্ম হল তার।
এভাবেই জন্ম হল আরও একটি সত্যের
আমরা যার মৃত্যু নিশ্চিত করেছিলাম
সর্বান্তকরণে।
২০.৫.১১

ভরদুপুরের কাব্য

একদিন বারান্দায় প্রচুর রৌদ্রুর এসে জড় হয়েছিল
ভিড় করেছিল একদল দস্যু বাতাস
ওদের অত্যাচারে গোলাপ গাছটির প্রাণটাই যায় যায়!
বাধ্য হয়েই বারান্দায় তোমার ভেজা কাপড় মেলতে দিইনি আর-
ব্লাউজ, ব্রা, পেটিকোট আর শাড়ীর অাঁচল এখন অন্ধকারে শুকায়!

আজকাল বের হলেই রৌদ্রুর আমাকে শাসিয়ে যায়
হাত-পা বেধে রাস্তায় ফেলে দেই বাতাসের দল।
ওদের দাবি আমি বুঝি- তোমার শরীরে ভাগ বসাতে চায়।
কিন্তু যে গাছটি দেহের সমস্ত রক্ত জমাট করে
তোমার জন্য ফোটাল ঐ টুকটুকে গোলাপটি
তার হিস্যাকে অস্বীকার করি কেমন করে?
১.০৪.১১

সময়ের নস্টালজিয়া

একবার এক সন্ধ্যায়–
চোর সিপাহী খেলতে খেলতে–
আমাদের নোনা বাড়ির ছাদ থেকে
পা ফসকে পড়ে যায়।
সে কবেকার কথা…!
সেই থেকে বাড়ির কথা মনে হলেই
আমার ভয়ে গায়ে কাটা দেয় ।।
সে অনেক দিন আগের কথা
সেই নোনা বাড়ির ছাদ ইতিহাস হয়েছে কবে!

এখন মাঝে মাঝে যখন
আমি চোখ বন্ধ করে অনুভব করি
আমার ভালোলাগাকে–
আমার নোনা বাড়ির ছাদ আমাকে
ডাক দেয়
আমি ভয়ে আৎকে উঠি
দানাবাধে বেঁচে থাকার দ্বিগুণ ইচ্ছে
সেই স্যাঁতসেঁতে নোনা বাড়ির ছাদ
এখন আমার বেঁচে থাকার খোরাক যোগায় ।
১.৪.২০০২

ছায়া-কাব্য অথবা ছায়া-পাগলের কাহিনী

ক.
স্টেশনে বসে আছি ঠায়। ট্রেন এসে আবার চলে যায়। বুক পকেটের টিকিট শরীরের ভাপে ভিজে জবুথবু। কেউ আসবার কথা নই। আমি ফিরে যাব কারও কাছে এই শহরে এমন কেউ নেই। কাউকে পাঠাবনা ভেবে যে চিঠিখানা লিখেছিলাম, দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলেছি পরিত্যক্ত এক পুকুরে। আর বালিকা বেশ্যার মধ্যগগণে চুমু খেয়ে উঠে এসেছি মধ্যদুপুরে, চুপিসারে। এর বেশি কিছুই রেখে যাচ্ছি না এই শহরে।
আরও একবার ভালো করে দেখে নিতে চেষ্টা করি শরীরের প্রতিটা ভাজ, হাত গলিয়ে পড়ে শূন্যে। এদিক ওদিক ভালো করে দেখি – আমি কারও ছায়া, একাকী অপেক্ষমাণ। আমার অস্পষ্ট অস্তিত্ব চোখে পড়ছে না কারও। আমি স্টেশনের প্রতিটা দেহের সাথে মিলিয়ে দেখলাম নিজেকে। বুঝলাম আমাকে রেখেই ফিরে গেছে সে, অন্য কোনও ছায়ার সন্ধানে।

বিমূর্ত আমি মূর্ত হওয়ার সন্ধানে খুঁজে ফিরি শরীর। ছয়ফিট ছিপছিপে গড়ন – একটু এদিক-ওদিক হলেও ক্ষতি নেই, কে কার ছায়া মেপে দেখে! শরীর বড় দরকার, মেয়েটি শরীর ছাড়া ভালোবাসা বোঝে না একদমই।


ট্রেন থেকে নেমেই হাঁটা দিই রাজপথের আইল ধরে। সূর্য তখন সম্মুখদিকে। ফাকা রাস্তায় পিছন ফিরে দেখি, ছায়াটি নেই সাথে। কি সর্বনাশ! দ্রুত ছুটে যাই স্টেশনে। তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম তাকে শত শত মানুষের ভিড়ে। কোনও ছায়াই মিলল না আমার সাথে – না আকার, না প্রকারে!

ফিরতি ট্রেনে ফিরে গেলাম ফেলে আসা শহরে। রাস্তায় অলিতে-গলিতে ছায়ার সন্ধানে। চলতি পথে প্রতিটি ছায়ার সাথে মিলিয়ে দেখি নিজেকে। এখন বুঝতে পারছি, ওকে চিনে ও দেখে রাখবার বড় দরকার ছিল।

শেষ পর্যন্ত না পেয়ে জনসমুদ্রের মাঝখান থেকে অন্য একটি ছায়াকে নিয়ে সটকে এসেছি নীরবে। এখন আমি ওকে চোখে চোখে রাখি। সূর্যের নীচে দাঁড়িয়ে পরখ করি ঘনঘন। মাঝে মধ্যে কথাও বলি ওর সাথে। অন্যের ছায়াকে নিজের করার চেষ্টায় এখন কেটে যাচ্ছে আমার দিন রাত্রি।

গ.
লোকটি (যার ছায়া আমি ছিনতাই করেছিলাম) এতদিনে নিশ্চয় ছিনতাই করেছে অন্য একটি ছায়া। তারপর সেই লোকটি আর এক জনের। অতঃপর ঐ লোকটি অন্য কারও কিংবা আপনার…! এই ভাবে শুরু হয়েছে ছায়া ছিনতায়ের কাহিনী। আজকাল আমি আলোর নিচে ছায়া সমেত শরীর দেখলেই জিজ্ঞেস করি – আপনার ছায়াটি আসলেই আপনার তো ? তাই আমাকে পাগল বলে কেউ কেউ, এমনি করে সমাজের চোখে আমি ‘ছায়া-পাগল’ হয়ে উঠি।

বি দ্র : সবকটি কবিতা বা অকবিতা পড়ে সময় নষ্ট করার আগেই কেটে পড়ুন। হাহা!

জন্ম সন : ১৯৮৬ জন্মস্থান : মেহেরপুর, বাংলাদেশ। মাতা ও পিতা : মোছাঃ মনোয়ারা বেগম, মোঃ আওলাদ হোসেন। পড়াশুনা : প্রাথমিক, শালিকা সর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শালিকা মাদ্রাসা। মাধ্যমিক, শালিকা মাধ্য বিদ্যালয় এবং মেহেরপুর জেলা স্কুল। কলেজ, কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন। স্নাতক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি অনার্স, ফাইনাল ইয়ার)। লেখালেখি : গল্প, কবিতা ও নাটক। বই : নৈঃশব্দ ও একটি রাতের গল্প (প্রকাশিতব্য)। সম্পাদক : শাশ্বতিকী। প্রিয় লেখক : শেক্সপিয়ার, হেমিংওয়ে, আলবেয়ার কামু, তলস্তয়, মানিক, তারাশঙ্কর প্রিয় কবি : রবীন্দ্রনাথ, জীবননান্দ দাশ, গ্যেটে, রবার্ট ফ্রস্ট, আয়াপ্পা পানিকর, মাহবুব দারবিশ, এলিয়ট... প্রিয় বই : ডেথ অব ইভান ঈলিচ, মেটামরফোসিস, আউটসাইডার, দি হার্ট অব ডার্কনেস, ম্যাকবেথ, ডলস হাউস, অউডিপাস, ফাউস্ট, লা মিজারেবল, গ্যালিভার ট্রাভেলস, ড. হাইড ও জেকিল, মাদার কারেজ, টেস, এ্যনিমাল ফার্ম, মাদার, মা, লাল সালু, পদ্মা নদীর মাঝি, কবি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিলে কোঠার সেপাই, ভলগা থেকে গঙ্গা, আরন্যক, শেষের কবিতা, আরো অনেক। অবসর : কবিতা পড়া ও সিনেমা দেখা। যোগাযোগ : 01717513023, [email protected]

মন্তব্যসমূহ

  1. কাজী রহমান মে 25, 2011 at 9:29 পূর্বাহ্ন - Reply

    মাথাব্যাথা ঝিম ঝিম নিয়ে শুন্য চোখে তাকিয়েছিলাম; পুরো পাতার পাগলামি পড়ে মন ভালো হয়ে গেল, মাথা বাথ্যা উড়ে গেল। কাব্যিক পাগলদের জয় হোক :))

  2. বৈষ্ণব রায় মে 24, 2011 at 10:12 পূর্বাহ্ন - Reply

    (I) মে 24th, 2011 at 10:08 পূর্বাহ্ণ
    আমার অপটু হাতের কবিতা দিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি——
    ব্লাকহোল —বৈষ্ণব রায়
    চারি দিকে একটা অপ্রতিরোধ্য টানে
    তোমার আমার সামান্য সঞ্চয় ,
    শুভ চিন্তা , মুল্যবোধ ,
    প্রেম অথবা প্রতিরোধ
    সব কিছু ,
    সব কিছু তলিয়ে যাচ্ছে
    এক অন্ধকার গহ্বরে।
    এক চিলতে জমি, একটা শিকড়
    একটা ক্ষুদ্র কক্ষপথ বয়ে চলার
    একফোটা আলো প্রায় নিভে যাওয়া জ্যোতিষ্কের
    নিশ্বেঃষিত অসীমতার ভারী অন্ধকারে
    ফুটপাথের শুয়ে থাকা -ওই মানুষ গুলির জন্য!
    সময় থেমে গেছে তাদের নুন আর পান্তা ভাতে
    সর্বগ্রাসী ব্লাকহোলে।
    সভ্যতার অর্জিত – ব্রহ্মাণ্ডের
    সব কিছু নিয়ে
    ডুবে যাবে আসীম অন্ধকার গভীরতায় ।
    গ্যালাক্সির ভাজে ভাজে বিকশিত
    ছোট বড় ব্লাকহোল গুলি মিলে গেছে
    শোষনের দুর্নিবার ক্ষমতায়
    আরো ও গভীর আন্ধকারে,
    প্রানে ভরা গ্রহ গুলির মিলনের আগে!
    এসো একটা বিগব্যাংগ দিয়ে
    শুরু করি নতুন বিন্যাস।

    • মোজাফফর হোসেন মে 28, 2011 at 12:56 পূর্বাহ্ন - Reply

      @বৈষ্ণব রায়, বাহ ! খুবই ভালো লাগলো কবিতাটি। ধন্যবাদ।

  3. টেকি সাফি মে 24, 2011 at 6:54 পূর্বাহ্ন - Reply

    কীসব ছিনতায় ফিনতায় লিখেছেন!! এসব সকিবতা অকবিতা লিখে দেশের তরুন সমাজকে পুরানষ্ট ও আধানষ্ট করার জন্য যথাক্রমে ৩ দিন ও ৩ টেরাটিলিয়ন আলোকবছর আয়ু ছিনিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছি! :guli: :guli:

  4. প্নার‍্য মে 24, 2011 at 2:16 পূর্বাহ্ন - Reply

    ভালো লেগেছে।

  5. সাইফুল ইসলাম মে 23, 2011 at 8:39 অপরাহ্ন - Reply

    শেষেরটা আমার কাছে অনবদ্য মনে হল। যদিও কিছু কিছু জায়গায় একটু বেশী গদ্যময় মনে হয়েছে, কিন্তু তারপরেও, চমৎকার।
    অনেক অনেক তাড়াতাড়ি আরো চাই। 🙂

    • মোজাফফর হোসেন মে 28, 2011 at 12:55 পূর্বাহ্ন - Reply

      @সাইফুল ইসলাম, আপনার মন্তব্য আমার ভালো লাগলো। ধন্যবাদ। আরও পাবেন।

  6. স্বপন মাঝি মে 23, 2011 at 11:35 পূর্বাহ্ন - Reply

    এভাবেই জন্ম হল আরও একটি সত্যের
    আমরা যার মৃত্যু নিশ্চিত করেছিলাম
    সর্বান্তকরণে।

    চমৎকার বলেছেন। এটাই এখন হয়ে চলেছে। আমরা মধ্যবিত্ত বাতাসে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে নতুন মাত্রা যোগ করে চলেছি তুমুল করতালিতে। আসুন এবার মোহন রায়হানের “তালগাছের চূঁড়ায় বসে মদ খাই”।

    অন্যের ছায়াকে নিজের করার চেষ্টায় এখন কেটে যাচ্ছে আমার দিন রাত্রি।

    আমরা পথে ঘাটে ছিঁচকে ছিনতাইকারীদের খুব চিনি কিন্তু ধ্রুপদী ছিনতাইকারীদের?

মন্তব্য করুন