সাইকোহিস্ট্রি ||গ্যালাকটিক আলোয় আমরা

এখন রাত দুটো। পদ্মামেঘনার সঙ্গমস্থল থেকে মেঘনার দিকে ছুটে চলেছি। গুমগুম শব্দ। যাওয়ার পথে দ্বীপের মতো মনে হলো চাদপুরকে। টিম টিম আলো জ্বলছে। এ জায়গায় কংক্রিটের সৈকত দেখেছিলাম এবং অপর পাড়কে মনে হয়েছিল উপকথার জগৎ আর আয়োনীয়দের স্বপ্নের ঠিকানা। এরই মাঝখান দিয়ে অন্ধকার চিড়ে এগিয়ে যাচ্ছি আরো সামনে, কোনো এক ঠিকানার পথে। বাতাসের ঝাপটা, মাথার উপর দূর নাক্ষত্রিক আলোক পথ, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি এভাবেই লক্ষ তারার ব্যাপ্তি নিয়ে ছড়িয়ে আছে। যেন গ্যালাক্টিক নম্র আলো ঘিরে আছে আমাদের। এক গল্পের জগৎ ধীরে ধীরে তৈরি হলো, যেন ইতিহাসের সরলরেখা এলোমেলো করে দেওয়া এক রাত, এক সময়: ফিউডাল সোসাইটিকে পাশ কাটিয়ে আসার ফলে ভারতবর্ষের দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক অবক্ষয়ের গল্প। আমার সঙ্গের মানুষটির এ বিষয়ে উপলব্ধি অনেক গভীর। খুব বেশি মানুষ চেনে বলে মনে হয় না। কিন্তু যারা তাকে চেনে তারা বোঝে সে সভ্যতার পথিক, সমাজতত্ত্বে তার বসবাস, সমাজ বিবর্তনের পর্যবেক্ষক। তার চোখের সামনেই ঘটেছে ৪৭ -এর দেশ বিভাগ, ৭১ সাল আর সমাজতন্ত্রের পতন। কিভাবে ঘটনাগুলো সময়কে পরিবর্তন করে, সমাজকে এগিয়ে দেয়, আবার সভ্যতাকে দুমড়ে মুচড়ে আর শতাব্দীর অস্থিরতায় নিয়ে যায় তাই তিনি দেখেছিলেন। প্রবল বাতাসের শো-শো শব্দ, আর জাহাজের গুমগুম কেমন ঘোরের মধ্যে নিয়ে গেছে, যেন আমরা চলেছি দূর কোনো নক্ষত্রের পথে, এক মহাবৃত্তীয় সভ্যতার সন্ধানে।

যাত্রা শুরু করেছিলাম সুন্দর বন -৭-এ। সুন্দরবনকে না বলা যায় লঞ্চ, না জাহাজ। কিন্তু আকৃতিতে অনেক বড়ো। এরকম একটা জলযানে যাব বলে মনটা ভালো হয়ে গেলো। ৮ টা ৪০ মিনিটে ছাড়লো। ছাড়ার সময় সাইরেন যেন মহাকালের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ডেকে বসে চা খেতে খেতে আলাপ চলছিল। আমি আর দ্বিজেন শর্মা। ফিউডালিজমকে বাইপাস কথাটার অর্থ কি, এর ফলে উদ্বুত সমস্যাগুলো বা-কী? বাংলাদেশে এর রূপটা কী? এই কারণে কী আফ্রিকার নেলসন মেন্ডেলা সাদাদের সরাসরি তাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন, এক ধরনের সহবস্থানকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। পরের দিন বরিশাল শহরের মধ্যেদিয়ে যাওয়ার সময় বাড়ি ঘরের নির্মাণের পার্থক্য দেখিয়ে তিনি বললেন সামন্ততন্ত্রকেই শুধু নয় ধনতন্ত্রকেও পাশ কাটিয়েছি আমরা। আর তা করার ফলে এক ধরনের সঙ্কীর্ণ, রুচিহীন, বর্বর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফাকা স্থান, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, খালবিলের গুরুত্ব ক্রমশ হারাচ্ছে, পূর্বের বাড়িঘরের জায়গায় অপরিসর রুচিহীন ঘিঞ্জিটাইপ বাড়ীগুলো স্থান নিচ্ছে; ঢাকা শহরে তার চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছে। এক অর্থে ঢাকা শহরকে ডেড সিটি বা মৃত নগরি বলা যায়। মেঘনার মনোরম বাতাসে এ কথাগুলো ভাবনার গভীরে জায়গা করে নিচ্ছিল।
‘বিজ্ঞানের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক নিবিড় এবং বর্তমান যুগে মিথোজীবিতামূলক বলাও অত্যুক্তি নয়। একটি শিল্পশাসিত সমাজকেই ধনতান্ত্রিক সমাজ বলে এবং নানারূপে এটি আজ পৃথিবীর সকল দেশেই বিদ্যমান। জ্ঞান তিনটি সোস্যাল ফর্মেশন – সামন্ততান্ত্রিক, ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক, মার্কসের তত্ত্ব অনুসারে- উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের দন্ডের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত, কোথাও বিপ্লব ঘটিয়ে, কোথাও আপসে, আর এই উৎপাদিকা শক্তি বিকাশের চাহিদা থেকে এসেছে প্রযুক্তবিদ্যা – যা বিজ্ঞানের প্রায়োগিক রূপ। সামাজিক প্রয়োজনই সৃষ্টির উদ্দীপনা যোগায় এবং সামাজিক রূপান্তরের সময়তার উচ্ছ্রয় ঘটে। সামন্ততন্ত্র থেকে ধনতন্ত্রে উত্তরণে শুধু সমাজের কাঠামোই বদলায় না, মানুষের মনোজগতেও বিপ্লব ঘটে। কিছু পুরনো ধারণা পরিত্যাক্ত হয়, অনেকগুলি নতুন সমাজে আত্তীভূতও হয়, দেখা দেয় নতুন সমাজের সঙ্গে সঙ্গতিশীল নতুন নতুন চিন্তা, গড়ে ওঠে একটি নতুন সংস্কৃতি আর এটা সমাজে কতটা মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে তার সঙ্গে আনুপাতিকও।’ কথাগুলো একটানা বলে গেলেন দ্বিজেন শর্মা। কিন্তু কেন এ প্রক্রিয়া ভারতবর্ষে, বিশেষত বাংলায় বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে পারলো না?

ডেক থেকে আমরা আবার কেবিনে প্রবেশ করলাম। দ্বিজেন দা ইনসুলিনের ইনজেকশ নিলেন। আলোচনাটা নিয়ে কেবিনে আরো আটোগাটো হয়ে বসলাম। প্রাচীনকাল থেকে ব্রিটিশ শাসনের আগ পর্যন্ত বাংলায় বিদ্যমান সামন্ততন্ত্র ছিল এককেন্দ্রিক, স্থানীয় জমিদাররা ছিলেন রাজস্ব আদায়কারী, প্রজারা ছিল জমির যথার্থ মালিক। ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপে এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে। জমির মালিক হয়ে ওঠে জমিদার, প্রজারা ভূসম্পদের চিরকালীন মালিকানা হারায়। মুসলমান অধ্যূষিত জায়গায় হিন্দু জমিদার এবং হিন্দু অধ্যুষিত জায়গায় মুসলমান জমিদার সৃষ্টি করে জমিদার ও প্রজার মধ্যে এক স্থায়ী বৈরিতা তৈরি করা হয়, ফলে সামন্ততান্ত্রিকতা থেকে ধনতান্ত্রিকতা বা শিল্পউদ্যোগের বিকাশ স্বতস্ফর্তভাবে ঘটতে পারে না। যেটুকু হয় তা খুবই কৃত্রিমভাবে, ঔপনবেশিকদের নিজস্ব প্রয়োজনে যতটুক দরকার, আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে শুধুই শহরে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে, এদেশের গ্রামাঞ্চল মধ্যযুগেই থেকে যায়, একেই আমরা বাংলার রেনেসাঁ বলি। আর এই ব্যবস্থা অটুট ছিল ১৯৪৭ সালের ভারতবিভাগ পর্যন্ত। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে জমিদারী উচ্ছেদ হলে সামন্ততন্ত্রের পতন ঘটে। কিন্তু সমাজের কোন মৌলিক পরিবর্তনই হয় না, কেননা পাকিস্তানি শাসকরাও ছিলেন বিদেশী এবং এদেশে তারা আরেকটি ঔপনিবেশিক শাসন চালু করেন। অধিকন্ত, নিজেদের আধিপত্য আড়ালের জন্য তারা একটি পশ্চাদপদ ভাবাদর্শ, দ্বিজাতিতত্ত্ব চালু করেন, যা ছিল প্রগতির প্রতিপক্ষ এবং বাংলার জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এই ধরনের ব্যবস্থা দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখা যায় না, শুরু হয় রাজনৈতিক সংঘাত এবং শেষ পর্যন্ত – স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলাদেশ নামের একটি নতুন রাস্ট্রের অভ্যূদয় ঘটে। কিন্তু সেই স্বাধীন বাংলাদেশের পরিকল্পিতভাবে এমন একটি সমাজকাঠামো নির্মিত হবে যেখানে শিল্পের বিকাশ ঘটবে, সবস্তরের মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতার উচ্ছ্রয় ঘটবে, সৃষ্টি হবে একটি নতুন সংস্কৃতি এবং সেই চাহিদা মেটাতেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতি ঘটবে এমন একটি আশা জেগে উঠেছিল। কিন্তু তা ঘটে নি। কেন ঘটেনি সে প্রশ্ন খুবই জটিল, সোসিও সাইকোডাইনামিকস বা মনোসামাজিকগতি বিজ্ঞান গাণিতিকভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে হয়তো এ সম্পর্কে উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে।

চাঁদপুরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাস্টার কেবিনের সামনে দাড়ালাম। আবার প্রচণ্ড বাতাসের মুখোমুখি। পদ্মা- মেঘনার সঙ্গমস্থলের সেই বাতাসে ভেসে যেতে লাগলো জর্জ সার্টনের সুবিস্তৃত বিজ্ঞান ইতিহাসের নিরেপেক্ষতা, জ্যাকব ব্রনোওস্কির মানুষের অনন্যতার অনুসন্ধান, কার্ল সাগানের নাক্ষত্রিক সভ্যতার কথা, আইজ্যাক অসিমভের সাইকোহিস্ট্রি, আর্থার সি ক্লার্ক এর মনোলিথ ভাবনা। এ যে কী অদ্ভুত আলোড়ন! আর সেই আলোড়নে ইভান ইয়েফ্রেমভের মহাবৃত্তীয় সভ্যতার কথা চলে আসলো। আসলো তার মানবিক বিকাশের রূপ রেখা। ইয়েফ্রেমভের এন্ড্রোমিডা সম্ভবত মানবসমাজের উন্নতি নিয়ে এটিই সরলচিন্তার চূড়ান্তরূপ। এই মানবসভ্যতার গন্তব্য কী? আদৌ কি এভাবে নাক্ষত্রিক সভ্যতায় পৌছানো যায়। ১৯৯৮ সালে দ্বিজেন দার সঙ্গে প্রথম পরিচয় পর্বে আলেক্সান্দার বেলায়েভের উভচর মানুষ, পেন্সিল ও সর্বকর্মার অ্যাডভেঞ্চার, আমাদের চিড়িয়াখানা আর আর্কাদি গাইদারের স্কুল নিয়ে আলাপ করতে করতে বলেছিলাম এসব বই না থাকলে আমাদের ছোটবেলা কী এত আনন্দের হত। আর সেই আলাপের স্রোতে মহাবৃত্তীয় সভ্যতার কথা চলে আসলো। রাস্তা দিয়ে হাটার সময়, তার বড়লেখার শিমুলিয়ার বাগানে কাজ করার সময়, পাথারিয়ার পাহাড়ী পথে অথবা মাধবকুন্ডের টিলাময় প্রান্তর দিয়ে হেটে যাবার সময় এই প্রশ্ন করেছি: প্রাচীন মানবেরা আকাশের দিকে কেন তাকাতো, মহাজাগতিক বীক্ষাই বা কী?

হাজার বছর পরের মানবসভ্যতার বিজ্ঞান ও সামাজিক অবস্থার বিবরণ নিয়ে রচিত মহাজাগতিক বৈজ্ঞানিক কল্পোপন্যাস ‘এণ্ড্রোমিডা নিহারীকা’ সারা পৃথিবীতেই ব্যাপক খ্যাতি লাভ করে। মানবজাতির ভবিষ্যতকে নিয়েই এই উপন্যাস। এতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার অগ্রগতি, পৃথিবীর সংগে বহির্জাতিক সভ্যতার যোগাযোগ স্থাপন, নতুন সমাজব্যবস্থার জীবনযাত্রা ব্যাপক পরিসরে বর্ণনার চেষ্টা করা হয়েছে। একেই মহাবৃত্ত যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইভান ইয়েফ্রেমভ মানবজাতির একটি অংশের উন্নতি বা ভবিষ্যত বিকাশ দেখাননি বরং দেখিয়েছেন সমগ্র মানবসভ্যতার বিকাশের একটি স্বপ্নময় কিন্তু যুক্তিসংগত অবয়ব। তিনি বলেছেন যে, সমাজের উন্নতি নির্ভর করে মূলত বিজ্ঞান ও প্রাযুক্তিক উন্নতির উপর ভিত্তি করে কিন্তু সেই সমাজ কতটা সুষম, সুবিন্যস্ত, সুরময় ও মানবিক তা নির্ভর করে সাংস্কৃতিক অবস্থানের উপর। সাহিত্য সংজ্ঞায়িত হয় মানুষের উপর গবেষণা হিসেবে, কিন্তু ইভান ইয়েফ্রেমভ যা রচনা করেছিলেন তা-ছিল মানবজাতির উপর গবেষণা। এরকম একটি সমাজে নারী পুরুষের সম্পর্ক কেমন হতে পারে? এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত প্রাণ উৎপত্তির গবেষক জেবিএস হ্যালডেন বলেছিলেন, ‘আদর্শ সমাজ প্রতিটি নারী ও পুরুষকে তাদের অন্তগর্তভাবনা মূর্ত করে তোলার সুযোগ দেবে। তাই এর থাকতে হবে দুটি বৈশিষ্ট্য। প্রথমত, স্বাধীনতা, যা মানুষকে তার নিজস্ব ধারায় বিকশিত হতে দেবে এবং সবাইকে এক ছাঁচে ফেলতে চেষ্টা করবে না, সেটা যতোই প্রশাংসারযোগ্য হোক। দ্বিতীয়ত, সুযোগের সমতা থাকবে, যার অর্থ হলো যে, মানুষের পক্ষে যতোটা সম্ভব, প্রত্যেক নারী-পুরুষ সমাজে সেই স্থান পাবেন যেজন্য প্রকৃতিগতভাবে তারা সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

কিন্তু এগুলো সম্ভভ হলেও, বর্তমান অবকাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন ছাড়া মানব সভ্যতার পক্ষে কী নাক্ষত্রিক সমাজে পৌছানো সম্ভব হবে? আদিম সমাজ আমাদের শিখিয়েছিল প্রকৃতির সঙ্গে সহবস্থান, সামন্ততন্ত্র দিয়েছে সেই বোধ যেখানে সমস্ত যন্ত্রনা সত্ত্বেও সামনের দিকে এগোতে গেলে একতাবদ্ধভাবে বসবাস করতে হয়, ধনতন্ত্র আমাদের শিখিয়েছে ইকোনোমিক্যাল অর্গনাইজিং (অর্থনৈতিক সাংগঠনিক ক্ষমতা)। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে মুনাফার চিন্তার কথা এড়িয়ে তার অকল্পনীয় দক্ষ সাংগঠনিক ক্ষমতা যদি ব্যবহার করা যেত। মানুষ যদি সেই পরিমিতবোধ অর্জন করতে পারতো। আমার কাছে মনে হয় সামন্ততান্ত্রিক, পুজিতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক জগতের মধ্যকার বিরোধের উপর জোর না দিয়ে আমাদের উচিত সৃষ্টিশীল সব শক্তিকে, গঠন মূলক সব আন্দোলনকে যথাসম্ভব একই ধারার মধ্যে নিয়ে আসার কথা চিন্তা করা। কিন্তু তাতেও ওই ধরনের একটি সমাজ ব্যবস্থায় পৌছানো সম্ভব?
আলাপচারিতায় কেন যেন মনে হলো সমাজে নবায়নযোগ্য জ্বালানী, প্রকৃতির সঙ্গে সহবস্থান আর নিগুঢ় সম্পর্ক ছাড়া মানুষ আসলে স্বার্থপরতা থেকে বের হতে পারবে না। কারণ এরফলেই ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ সম্ভব আর সেখানে ক্ষমতার দম্ভ কম। সমাজ সমাজতন্ত্রের মধ্যে থেকে কিছু মানবিকগুণাবলী অর্জন করলেও সেখানেও রাস্ট্রের ক্ষমতা ছিল চূড়ান্তভাবে এককেন্দ্রীক, যা ক্ষমতার দম্ভ তৈরি করে। এ কথাগুলোই অনেক স্বচ্ছতার সাথে দ্বিজেন শর্মার একসময়কার সতীর্থ এক আইরিশ পরিবেশবাদীর কথা থেকেও অনুভব করেছিলেন। এ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে মানুষ হয়তো টাইপ টু সিভিলাইজেশনের দিকে ধাবিত হবে। টাইপ-টু সিভিলাইজেশন, যাদের ফসিল ফুয়েল থেকে উত্তোরণ ঘটেছে এবং নিরাপত্তার জন্য সম্পদের কুক্ষিগতকরণ থেকে তারা সরে আসছে। — — আবার বর্তমানে চলে আসলাম, মেঘ সরে গেছে, পূর্ণিমার চাঁদে চারিপাশের জগৎটাকে কেমন অপার্থিব দেখাচ্ছিলো। মেঘনার বিশালতা আর উপকথার মায়াবীরা হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। আবার কেবিনের ঢোকা। কেবিনের আলো আধারিতে অদ্ভুত সব অনুভূতি খেলা করে। মনে হয় জীবনের অন্যরকম মানে। মাঝে মাঝে অন্যকোনো লঞ্চের কোলাহল ঘোর ভঙ্গ করে। এখন রাত তিনটা বাজে। —

কিন্তু সত্যিকারের এক মানবিক সমাজ বলতে কী বোঝায়, এর তাৎপর্য বা কী? সবকিছুই কী এত সরল? এত অগ্রগতি, এত প্রাযুক্তিক সাফল্য আর নিজেদের প্রতিবন্ধকতাগুলো জানারপরও মানবজাতি কেন সহাবস্থানে আসতে পারলো না? ধর্মের নীতি কথাগুলোই বা কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারলো না কেন? দ্বিজেন দা কে মাঝে মাঝেই বলতে শুনি আমাদের এই প্রজাতিটা বর্বর ও নিষ্ঠুর। আর্থার সি ক্লার্ক তার ফাইনাল অডিসিতে লিখেছেন ‘টাইকো মনোলিথ জিরো (টিএমএ জিরো) আমাদের পশ্চাতদেশে কষে বিবর্তনীয় লাথি মেড়েছে’। এই লাথির সবদিক এখনো পরিস্কার
হয়নি। তার বিশ্বাস, আমাদের মতো একটা নিষ্ঠুর প্রজাতির উন্মেষ হবার কথা নয়, আমরা মস্তিস্কের দিক দিয়ে অপূর্ণ, না হলে যুক্তির পথে চলতাম। সব প্রজাতিই বাঁচার জন্য কোনো না কোনো নিষ্ঠুর পন্থা বেছে নেয়, আমাদেরটা অনেকবেশি অমানবিক, অনেক বেশি খারাপ কাজ করেছি যা না করলেও চলতো। আর কোনো প্রাণী নিজ প্রজাতিকে এতটা কষ্ট দেয় না যেমনটা মানুষ মানুষের সঙ্গে করে? আর ধর্মের জন্ম ভয় থেকে। এটি রহস্যময়, বিরূপ প্রকৃতির উপজাত।

মানবজাতির কল্যাণের জন্যই এ ছিল এক প্রয়োজনীয় অকল্যাণ – কিন্তু কেন সেটা প্রয়োজনের বেশি অকল্যাণকর হয়ে গেলো – আর কেন তখনো টিকে থাকলো যখন এর দরকার নেই।ভয় সব প্রাণীকে নিষ্ঠুরতার দিকে ঠেলে দেয়। দ্বিজেন দা অদ্ভুতভাবে হাসলেন। এখন অনেক রাত। ঘুমাবার পালা।

রচনাকাল: ২০০৬ অক্টোবর
২০০৬ সালে অক্টোবরের ৮ তারিখে পদ্মা-মেঘনার সমস্থলের যাওয়ার সময় লেখার ধারণাটি মাথায় আসে

আসিফ
ডিসকাশন প্রজেক্ট

[37 বার পঠিত]