মনে করুন, এক শীতের সন্ধ্যায় আপনি বাসার বাইরে বেরুলেন শরীরে অপর্যাপ্ত পরিমানে গরম কাপড় চাপিয়ে। খানিকটা সময় কেটে যাওয়ার পর আপনার শীত লাগতে শুরু করবে, শরীর কাঁপতে থাকবে আপনার; হাঁটুতে হাঁটুতে, দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে খটখট শব্দ হবে। আস্তে আস্তে এই কাঁপুনী ছড়িয়ে পড়বে শরীরের প্রত্যেকটি মাংশপেশীতে, কাঁপতে থাকবে শরীরের প্রত্যেকটি মাংশপেশীই। আপনি স্বেচ্ছায় চাইলে সেই কাপুনী হয়তো কয়েক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ রাখতে পারবেন, কিন্তু তারপর আবারও স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শুরু হয়ে যাবে আপনার সেই কাঁপুনী রিফ্লেক্স। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেনো এটা হয়? ওয়েল- এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, অপেক্ষাকৃত তুচ্ছ দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাটি কিন্তু ডেমনস্ট্রেট করে প্রকৃতির একটি গুঢ় মূ্লনীতিকে; রসায়ন ও ফিজিওলজির এক শাশ্বত, সনাতন নিয়মকে।

সেই শাশ্বত নিয়মটি হচ্ছে- একটি জটিল সিস্টেমে নিয়ন্ত্রন স্থাপিত হয় সর্বদাই ফিড প্রক্রিয়ায়! জীবদেহ অগনিত চলক যেমন- রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, শ্বসনহার, রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব, রক্তের পিএইচ ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল জটিল সিস্টেম। একটি চলক যখন সমগ্র জীবটির বেঁচে থেকে বংশবৃদ্ধি করার সুবিধার্থে অপটিমালি চালিত হয় তখন আমরা বলি চলকটি রেগুলেটেড। যেমন- কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি বা সেল প্রলিফেরেশন যখন রেগুলেশন হারায় তখন আমরা লাভ করি ক্যান্সার যেটি কিনা সমগ্র জীবের বেঁচে থেকে বংশবৃদ্ধি করে চলার পখে মোটেও সুবিধাজনক কিছু নয়। ফিড প্রক্রিয়া হচ্ছে এমন প্রক্রিয়া যেখানে একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে একটি রেগুলেটেড চলকের মান নিয়ন্ত্রিত হয় অন্য একটি কন্ট্রোল্ড চলকের মানের তারতম্যের সাহায্যে। যেমন- আমাদের রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব প্রতি লিটারে ৪ থেকে ৬ মিলিমোল, রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব এর থেকে কম কিংবা বেশী হলে সেটা আমাদের বেঁচে থাকার পক্ষে কাল হয়ে দাঁড়াবে, তাই এটি একটি রেগুলেটেড চলক। এই চলকটি রেগুলেটেড রক্তে ইন্সুলিনের ঘনত্ব দ্বারা। ফলে, কোনভাবে রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব বেড়ে গেলে (যেমন- আহারের পরে), রক্তে ইনসুলিনের ঘনত্বও বেড়ে যাবে। এই মাত্রাতিরিক্ত ইনসুলিন অনুঘটিত করবে কোষ অভ্যন্তরে গ্লুকোজের আপটেক, ফলে রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব কমে আসবে। অর্থাৎ, ‘রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব’ চলকটি রেগুলেটেড হচ্ছে ‘রক্তে ইনসুলিনের ঘনত্ব’ কন্ট্রোল্ড চলকটি দ্বারা। এটি একটি ফিড প্রক্রিয়ার উদাহারণ, আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে একটি ফিডব্যাক প্রক্রিয়ার উদাহারণ। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে একটি রেগুলটেড চলক খুবই সীমিত উইন্ডোতে উঠানামা করে যেমন আমাদের উপরোক্ত উদাহারণে রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব চলকটির রেগুলেশন উইন্ডো প্রতি লিটারে ৪ থেকে ৬ মিলিমোল। অপরপক্ষে একটি কন্ট্রোল্ড চলক কিন্তু উঠানামা করতে পারে একটি সুবিস্তৃত উইন্ডো জুড়ে, এর কারণ হচ্ছে গিয়ে কন্ট্রোল্ড চলকের এই যথেচ্ছ উঠানামা জীবের বেঁচে থাকার উপর প্রাথমিক কোন প্রভাব ফেলে না। একটি শরীরবৃত্তিয় সিস্টেমের সবগুলো রেগুলেটেড চলক নিয়ন্ত্রণাধীন থাকাটাকে বলে হোমিওস্ট্যাসিস। প্রমিত হোমিওস্ট্যাটিক অবস্থা থেকে বিচ্যুতিকে বলে রোগ বা ব্যাধি।

ফিড প্রক্রিয়া হতে পারে দুই ধরণের, ফিডব্যাক ও ফিডফরওয়ার্ড। ফিডব্যাক লুপ হচ্ছে একটি প্রতিকারবাদী গমনপথ যেখানে রেগুলেটেড চলক প্রমিত অবস্থা থেকে বিচ্যুত হবার পর কন্ট্রোল্ড চলকের উঠানামা শুরু হয় রেগুলেটেড চলককে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে। অপরপক্ষে ফিডফরওয়ার্ড হচ্ছে একটি প্রতিরোধবাদী গমনপথ যেখানে কন্ট্রোল্ড চলক আগেই উঠানামা শুরু করে যাতে রেগুলেটেড চলক প্রমিত অবস্থা থেকে বিচ্যুত হতে না পারে। এই প্রপঞ্চ দুটির উদাহারণও দেয়া যায় ইনসুলিন সংকেত সংবহন গমনপথের মধ্য দিয়ে। যেমন- খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যাচ্ছে, রক্তে গ্লুকোজের অধিক্য ঘটাচ্ছে রক্তস্রোতে ইনসুলিন নিষ্ক্রমন, নিষ্ক্রান্ত ইনসুলিন অনুঘটিত করছে কোষাভ্যন্তরে গ্লুকোজের আপটেক, ফলে রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব কমে আসছে, গ্লুকোজের ঘনত্ব কমে আসার ফলে রক্তস্রোতে ইনসুলিন নিষ্ক্রমনও কমে আসছে, এভাবে চলতে চলতে একটা সময় পর রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব প্রতি লিটারে ৪ থেকে ৬ মিলিমোলের মধ্যে নেমে আসছে বিধায় নতুন করে রক্তস্রোতে ইনসুলিন নিষ্ক্রমনের দরকার ফুরোচ্ছে।। এটা একটি ফিডব্যাক লুপের উদাহারণ। ফিডব্যাক লুপের সাথে সাথে অবার ফিডফরওয়ার্ড লুপের মধ্য দিয়েও কিন্তু এই রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব রেগুলেটেড হয়। আপনি যখনই খাবারের ঘ্রাণ পাচ্ছেন বা খাবার খেতে রান্নাঘরে বা কোন রেস্টোরেন্টে ঢুকছেন সাথে সাথে আপনার মস্তিষ্কের কোর্টিকাল অঞ্চলগুলো হতে আমিগডালা ও ব্রেইনস্টেমের মধ্য দিয়ে অটোনোমিক গমনপথ কার্যকর হচ্ছে। স্নায়ুকোষের মধ্য দিয়ে সংকেত চলে যাচ্ছে আপনার অগ্নাশয়ের আইলেটস অফ ল্যাঙ্গারহান্সের বেটা কোষগুলোতে, সেই কোষগুলো রক্তে ইন্সুলিন ছেড়ে দিচ্ছে রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব সেন্স করার আগেই, কেননা মস্তিষ্ক অগ্নাশয়ের বেটা কোষগুলোকে বলছে যে- এখনও না পেলেও, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে!! এটার ফলে লাভ যেটা হচ্ছে- লুপের ডিলে কমছে, রক্তে গ্লুকেজের উপস্থিতির আগেই ইন্সুলিনের উপস্থিতির ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাড়তি ইন্সুলিন দেহকোষে আপটেক হতে পারছে, ফলে সিস্টেম বেশী এফিসিয়েন্ট হচ্ছে। এটি একটি ফিডফরওয়ার্ড লুপের উদাহারণ। বস্তুত, এন্ডোক্রিনোলজির আলোকে মস্তিষ্ক অঙ্গটিকেই আপনি সংজ্ঞায়িত করতে পারেন এমন একটি সিস্টেম হিসেবে যার কাজ হচ্ছে কিনা ফিডফরওয়ার্ড লুপ সংঘটিত করার মধ্য দিয়ে সম্পুর্ণ দেহযন্ত্রকে বেশী এফিশিয়েন্ট করে তোলা! আমাদের জ্ঞান, আবেগ, প্রজ্ঞা, দর্শন সবকিছুকেই এই বি-শা-ল একটি ফিড ফরওয়ার্ড লুপের অংশ হিসেবে চিন্তা করা যেতে পারে। এর উপস্থিতির কারণেই আমারা পতঙ্গের মতো মোমের আলোয় পড়ে পুড়ে মরি না কেননা মস্তিষ্ক আমাদের সক্ষম করে এই অভিজ্ঞতা শিক্ষা করতে যে- আগুনে পড়লে পুড়ে মরতে হয়!

এতক্ষণের এই আলোচনার পর আমরা আমাদের প্রথম প্রশ্নের একটি উপযুক্ত উত্তর বোধগম্য করতে পারি। কেনো ঠান্ডায় শরীর কাঁপে? ওয়েল, আমাদের দেহের তাপমাত্রা রক্ষা করে বেইসাল মেটাবোলিক রেইট বা বিএমআর নামক একটি চলক। কাঠ যেটি কিনা বস্তুত কার্বন, পুড়িয়ে যেমন আমরা তাপ উতপন্ন করি তেমনি আমাদের খাদ্যে গ্রহন করা কার্বনও কিন্তু খুব ধীর গতিতে পুড়ে আমাদের শরীরকেকে গরম রাখে। বস্তুত আমরা যেই খাদ্য খাই তার ৫০% ব্যায় হয় আমাদের থার্মোরেগুলেশনের পেছনে! এইখানে একটা মজার ব্যাপার উল্লেখ করা যেতে পারে, এইযে আমরা বলি একটি ডিমে এতো ক্যালোরি শক্তি রয়েছে, একটি শশায় এতো ক্যালোরি শক্তি রয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি এটা আমরা কিভাবে নির্ধারণ করি? ওয়েল, আমরা একটি ডিম বা শশা নিয়ে আগুন জ্বেলে সেটা সম্পুর্ণ পুড়িয়ে ফেলি, এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে উতপাদিত হয় কার্বন ডাইঅক্সাইড, পানি এবং প্রচুর পরিমানে গিবস ফ্রি এনার্জি। অতপর আমরা কেলোরিমেট্রি করে পরিমাপ করি কতোটুকু ফ্রি এনার্জি বিমুক্ত হলো, যতো ক্যা্লোরি ফ্রি এনার্জি বিমুক্ত হলো একটি ডিমে ঠিক ততো ক্যালরি শক্তিই রয়েছে! মজাদার তথ্য না? এখানে উল্লেখ্য, কার্বন অক্সিডাইজ করে কার্বন ডাইঅক্সাইড, পানি ও শক্তি উতপন্ন করার মধ্য দিয়ে এই একই প্রক্রিয়ায় কিন্তু আমরাও আমাদের দেহে তাপ উতপন্ন করি। যদিও বিক্রিয়া একই কিন্তু বিক্রিয়ার গমনপথ ভিন্ন। প্রকৃতির দহন গমনপথে কার্বনের অক্সিডেশন খুব অল্প সময়ে বিমুক্ত করে বিপুল পরিমানে তাপ শক্তি, আমাদের শরীরে এই একই গমনপথ ব্যাবহার করলে আমরা পুড়েই কয়লা হয়ে যেতাম! দহন ব্যাবহার করিনা আমরা, আমরা ব্যাবহার করি অন্য একটা আরও অনেক অনেক জটিল গমনপথ যেটা কিনা অনেক ধীরগতিতে এই কার্বনের অক্সিডেশন প্রসুত ফ্রি এনার্জি বিমুক্ত করে, ফলে আমরা গরম থাকি যদিও, পুড়ে কয়লা হয়ে যাইনা! যাই হোক, ঠান্ডায় যখন কিনা আমাদের শরীর থার্মোরেগুলেশন করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এটা সক্রিয় করে দুটি গমনপথ, প্রথমত আমাদের রক্তস্রোতে থাইরয়েড হর্মোন যেমন টি৩ ও টি৪ নিষ্ক্রমন বেড়ে যায়, টি৩ ও টি৪ আমাদের বিএমআর বাড়িয়ে দেয় ফলে দেহে খাদ্যের অক্সিডেশন প্রসুত ফ্রি এনার্জি বিমুক্তির হার বৃদ্ধি পায়। তাতেও কাজ না হলে মাংশপেশীর কাঁপুনী শুরু হয়, এই কাঁপুনী সংঘর্ষি বা ফ্রিকশনের ফলে উতপন্ন করে বিপুল পরিমানে তাপ শক্তি। ঠান্ডা যতোই বাড়ে কাঁপুনী ততোই বাড়ে, ঠান্ডা কমে আসলে কাঁপুনি বন্ধ হয়ে যায়। এটি একটি ফিডব্যাক লুপের উদাহারণ। এবার ভাবুন, একই সমস্যা কিন্তু মস্তিষ্ক অনুঘটিত ফিডফরওয়ার্ড প্রক্রিয়ায়ও সমাধান করার ব্যাবস্থা রয়েছে আমাদের ফিজিওলজিতে। সেটি কি? ওয়েল, সেটি হচ্ছে- থার্মোমিটারে সাহায্যে বাইরের তাপমাত্রা দেখে, ঠান্ডা লাগার আগেই প্রয়োজনানুসারে গরম কাপড় পড়ে বাইরে বেরুনো!!

এখন, ফিডব্যাক লুপও কিন্তু আবার দুই ধরণের হতে পারে, নেগেটিভ ফিডব্যাক লুপ এবং পজিটিভ ফিডব্যাক লুপ। নেগেটিভ ফিডব্যাক লুপে একটি চলকের প্রমিত অবস্থা থেকে বিচ্যুতি সেন্স করে রেগুলেশনের জন্য কন্ট্রোল্ড চলকের উঠানামা শুরু হয়, রেগুলেশন যতোই সম্পন্ন হতে থাকে কন্ট্রোল্ড চলকের উঠানামাও ততো স্তিমিত হতে হতে একসময় শুণ্যে মিলিয়ে যায়। যেমন- আমাদের উপরোক্ত ইনসুলিন এবং থার্মোরেগুলেশনের উদাহারণের ফিডব্যাক লুপ দুটি। অপরপক্ষে পজিটিভ ফিডব্যাক লুপে রেগুলেশন যতোই সম্পন্ন হতে থাকে কন্ট্রোল্ড চলকের উঠানামা ততোই বাড়তে থাক। জীবজগতে পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের উদাহারণ খুবই কম দেখা যায়, তবে বেশ কিছু দেখা যায় আমাদের ম্যামালিয়ান প্রজননতন্ত্রে। বস্তুত পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের অনুপস্থিতিতে আমরা কেউ ভুমিষ্ঠই হতাম না! আমরা যখন জেস্টেশন সম্পন্ন করে ভুমিষ্ঠ হবার জন্য অপেক্ষা করছি মাতৃজঠরে, ইউটেরাসে; আমাদের মায়ের লেবর শুরু হবার সাথে সাথে একটি রেগুলেটেড চলক প্রমিত অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়েছিলো। সেটা চলকটি ছিলো এই যে- ‘এই ভ্রুণটির জেস্টেশন সম্পন্ন হয়েছে, মাতৃজঠরে এখন আর এর কোন জায়গা নেই’। রেগুলেটেড চলককে এর প্রমিত অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বা অন্যকথায় দেহ থেকে ভ্রুণটি বের করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তখন মায়ের মস্তিষ্কে পিটুইটারির পোস্টেরিয়র লোব হতে রক্তস্রোতে নিষ্ক্রান্ত হয় অক্সিটোসিন নামক একটি হর্মোন। এটির টার্গেট ছিলো ইউটেরাইন মাংশপেশী। অক্সিটোসিন গমনপথের চুড়ান্ত ফলাফল হচ্ছিলো- ইউটেরাইন মাংশপেশী ক্রম সঙ্কোচন যার ফলে আমরা বেরিয়ে আসছিলাম ইউটেরাস থেকে বার্থ কেনালের (অগর্ভবতী অবস্থায় যেই দেহগহ্বরটাকে কিনা বলা হয় যোনী) দিকে। আমাদের যাত্রাপথের মাঝে ছিলো সার্ভিক্স নামক একটি অপেক্ষাকৃতি ন্যারো সুড়ঙ্গ। সার্ভিক্সের দেয়ালে শরীর দিয়ে আমরা যখন চাপ দিচ্ছিলাম, সার্ভিক্সের গায়ে অবস্থিত অসংখ্য স্ট্রেচ রিসেপ্টর স্নায়ুকোষ সেই সংকেত পৌছে দিচ্ছিলো মায়ের মস্তিষ্কের পোস্টেরিয়র পিটুইটারি লোবে। এই সংকেত রক্তস্রোতে নিষ্ক্রান্ত করছিলো আরও বেশী অক্সিটোসিন, ফলে ইউটেরাইন মাংশপেশীর সঙ্কোচনও যাচ্ছিলো আরও বেড়ে, আমরাও এগিয়ে আসছিলাম আরেকটু সজোড়ে বার্থ কেনালের দিকে এবং সার্ভিক্সের দেয়ালে চাপও আমরা সৃষ্টি করছিলাম ততোটাই বেশী, ফলে সার্ভিক্সের গায়ে অবস্থিত স্ট্রেচ রিসেপ্টরগুলোর ফায়ারিঙ্গও যাচ্ছিলো ততোই বেড়ে, ফলে আরও বেশী অক্সিটোসিন রক্তস্রোতে নিষ্ক্রান্ত হচ্ছিলো। এভাবে চাপ বাড়তে বাড়তে একসময় আমরা মাতৃজঠর ছেড়ে বেরিয়ে আসি এরপর বেরিয়ে আসে আমাদের প্লাসেন্টা যেটি কিনা মাতৃজঠরে আমাদের খাওয়াচ্ছিলো, অক্সিজেন দিচ্ছিলো এবং করছিলো বর্জ্য নিষ্কাশন। সন্তান এবং প্লাসেন্টা বেরিয়ে আসার ফলে সার্ভিক্সে আর কোন চাপ সৃষ্টির উত থাকলো না, স্ট্রেচ রিসেপ্টরও ফায়ারিং বন্ধ করলো এবং বন্ধ হলো রক্তস্রোতে অক্সিটোসিন নিষ্ক্রমন। এটি একটি পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের উদাহারণ। ঠিক সন্তান প্রসবের মতোই, পুলক বা ওর্গাজম লাভও কিন্তু অনুঘটিত হয় একটি পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের দ্বারা। নিজ মনে কল্পনা করুনতো ওর্গাজম লাভের এই পজিটিভ ফিডব্যাক সার্কিট্রিটির স্বরূপ? আপনার কল্পনা ভাগাভাগি করতে পারেন মন্তব্যে, আলোচনার একটি খোরাক হবে সেটি!

অক্সিটোসিন আমার খুবই খুবই প্রিয় একটি অনু। আমি খুব নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করেছি অক্সিটোসিন টোটাল সিনথেসিস, যেই আবিষ্কারটি কিনা ১৯৫৫ সালে ফার্মাকোলজিস্ট ভিন্সেন্ট ডু ভিগ্নউডকে জেতায় কেমিস্ট্রিতে নোবেল পুরষ্কার। অক্সিটোসিন বস্তুত একটি সাইক্লিক পেপটাইড, আধুনিক সলিড স্টেইট কেমিস্ট্রির যুগে অক্সিটোসিন টোটাল সিনথেসিসের জন্য কোন মানুষও এমনকি প্রয়োজন নেই, অটোমেটেড পেপটাইড সিন্থেসাইজার নিজেই অক্সিটোসিন সংশ্লেষ করতে পারবে তুড়ি মেরে। কিন্তু ভিন্সেন্ট ডু ভিগ্নউড তার আমলে যেই সলিউশন ফেইজ সিন্থেসিস করেছিলেন সেটা ছিলো অনেক অনেক কষ্টসাধ্য। যাই হোক, অক্সিটোসিনের কিন্তু একটি ডাকনামও রয়েছে, এটিকে ডাকা হয় ‘লাভ হর্মোন’ নামে, কেননা এটি আমাদের যৌন আচরণে ব্যাপক ব্যাপক প্রভাব ফেলে থাকে। যেমন- মনে করুন মিল্ক ইজেকশন রিফ্লেক্সের কথা। শুধু সন্তান ভুমিষ্ঠ করাই নয়, ভুমিষ্ঠ সন্তানকে দুগ্ধপান করানোও অনুঘটিত করে অক্সিটোসিন। স্তনবৃন্তের চারপাশে যেই বৃত্তাকার সীমানাটা থাকে, সেটিকে কিনা বলা হয় এরিওলা, এই এরিওলা ইনার্ভেট করে বিপুল সংখ্যক সেন্সরি নিউরোন। বস্তুত স্তনবৃন্ত ও এরিওলা যে স্নায়বিকভাবে খুবই খুবই সক্রিয় এই উপসংহারে পৌছতে ফিজিওলজি বিশেষজ্ঞ হওয়াটাও নিষ্প্রয়োজন 😀 ! যাই হোক, নবজাতক যখন এরিওলা চোষে, তখন সেই সেন্সরি নিউরোন মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়, যেই সঙ্কেতের চুড়ান্ত ফলাফল গিয়ে হয় কিনা পোস্টেরিয়র পিটুইটারি লোব হতে রক্তস্রোতে অক্সিটোসিন নিষ্ক্রমন। এইবার অক্সিটোসিনের টার্গেট হয় স্তনের ল্যাক্টোগ্লান্ডগুলোর সংগ্রাহক ডাক্টগুলো ঘিরে থাকা স্মুথ মাংশপেশীগুলো। অক্সিটোসিন এই ল্যাক্টগ্লান্ড স্মুথ মাংশপেশীকোষে অবস্থিত রিসেপ্টররগুলোর সাথে সাফল্যের সহিত বন্ধন স্থাপন করলে একটি জটিল প্রাণ্রাসায়নিক ক্যাসকেড সুচীত হয়, যেই ক্যাসকেডের চুড়ান্ত ফলাফল হয় , একটি উল্লেখযোগ্য চাপ সহকারে দুগ্ধ বেরিয়ে আসে স্তন থেকে। অক্সিটোসিন ছাড়া মিল্ক ইজেকশন রিফ্লেক্স সুচীত করার আর কোন পদ্ধতি নেই!

এখন চলুন একটি প্রশ্ন করা যাক। যদি এরিওলাতে সাকলিং ওই জননীর নবজাতক দ্বারা না হয়ে অন্য কারো দ্বারা সুচীত হয়ে থাকে (নো পান ইন্টেন্ডেড!) তাহলেও কি এই অক্সিটোসিন অনুঘটিত মিল্ক ইজেকশন রিফ্লেক্স সুচীত হবে? ওয়েল, এই প্রশ্নের উত্তর উন্মুক্ত। ইমোশনালী কানেক্ট না থাকলে এই গমনপথ পুরোপুরিভাবে সক্রিয় হয় না। যেইজন্য দেখে থাকবেন গ্রামে দুধ দোহনের আগে বাছুরকে দিয়ে এরিওলা চুষিয়ে নেওয়া হয়। ফলে গাভী সন্তানের সাথে ইমোশনালি কানেক্ট হয় এবং মিল্ক ইঞ্জেকশন রিফ্লেক্স সুষ্ঠভাবে সুচীত হয়, নতুবা আশানুরুপ পরিমানে দুধ দোহন করা যায় না! মানুষের বেলাতেও এটি সত্য। এই তথ্যটির সারমর্ম হচ্ছে গিয়ে- জীবের সঙ্কেত সংবহন গমনপথগুলো আসলে স্বাধীন স্বাধীন উপায়ে কাজ করে না, বরং একটি আরেকটির সাথে জুড়ে একটি জটিল ওয়েব সৃষ্টি করে যেখানে কিনা স্বতন্ত্র গমনপথগুলোর মধ্যে চলে সর্বদাই কিচিরমিচির আদান-প্রদান। বৈজ্ঞানিক ভাষায় এই কিচিরমিচিরকেই আমরা বলি ক্রসটক। সঙ্কেত সংবহন গমনপথগুলো একে অপরের সাথে সর্বদাই ফিসফাস কথা বলে, এর একটি উদাহারণ হতে পারে আড্রেনালিন গমনপথ যেটি কিনা ইনহিবিট করে দেয় আমাদের ইনসুলিন গমনপথকে!! উপরোক্ত এই ফিড প্রক্রিয়াগুলোই কিন্তু রেগুলেট করে আমাদের শরীরবৃত্তিয় অসংখ্য অসংখ্য সকল চলক। যেখানেই আপনি অসংখ্য চলকের সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল সিস্টেম দেখবেন সেখানেই আপনি আশা করতে পারেন এই ফিড প্রক্রিয়াগুলো। এটা জীব ফিজিওলজির একটি অকাট্য নিয়ম!

এইবার আমি আলোচনা করতে চাই কিভাবে এই এন্ডোক্রিনোলজির জ্ঞান আমাদের আধুনিক থেরাপিউটিক্সকে বিপ্লবায়িত করেছে। ভেন্টোলিনের নামতো আপনারা শুনেছেন নিশ্চয়ই, এই পোস্ট পড়ুয়া পাঠকদের মধ্যে অন্তত একজন হয়তো এটি পকেটে নিয়ে বসেও আছেন খুব সম্ভবত! কেননা একিউট এস্থমা এটাক একটি খুবই খুবই প্রিভেলেন্ট উপসর্গ, এই মুহুর্তে আমি ডজনখানেক রোগের নাম করতে পারবো যাদের একটি উপসর্গ হবে গিয়ে কিনা এই একিউট এস্থমা এটাক। এই উপসর্গেরই একটি প্রাথমিক উপসম হচ্ছে গিয়ে এই ভেন্টোলিন ইনহেলার যার ফার্মাকোলজিকাল নাম কিনা সালবিউটামল। এইখানে একটা ছোট কথা বলে নেই, ঔষধের এই জেনেরিক নাম দেবার পাশে পাশে কেনো দাঁতভাঙ্গা ফার্মাকোলজিকাল নামও আমরা দেই? উত্তর হচ্ছে গিয়ে, পেটেন্ট এক্সপায়ার হয়ে যাওয়ার পরে একটি ঔষধ একাধিক কোম্পানী একাধিক ট্রেডমার্কে ছাড়তে পারে, যেমন আমাদের উপরোক্ত উদাহারণ- সালবিউটামল বৃটিশ কোম্পানী গ্লাক্সোস্মিথক্লিন বাজারজাত করে ভেন্টোলিন নামে, আবার জার্মান কোম্পানী মার্ক বাজারজাত করে প্রভেন্টিল নামে। যদিও নাম আলাদা তাদের একটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট কিন্তু একই, তাই সেই একটিভ ইনগ্রেডিয়েন্টটির নামেই সাধারণত তাদের ডাকা হয় বৈজ্ঞানিক সমাজে। যাই হোক, প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে একিউট এস্থমা এটাক উপসম ঘটায় সালবিউটামল, কি কাজ করে এটি এবং কেনোই বা কাজ করে?

ওয়েল, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ৫০০ মিলিয়ন বছর আগে অজানা কোন অতল সুমুদ্রে ক্যাম্ব্রিয়ান বিষ্ফোরণের পরপরেই যখন কিনা প্রথম বিবর্তিত হয় আমাদের আড্রেনাল ব্যাবস্থা বা ফ্লাইট-ফাইট রেসপন্স। প্রকৃতি সেখানে ছিলো ততোটুকুই রুক্ষ আর নির্দয়, যতোটুকু রুক্ষ আর নির্দয় প্রকৃতির পক্ষে সর্বোচ্চ হওয়া সম্ভব। আমাদের সর্বপ্রধান হুমকী ছিলো প্রিডেশন আর মেইটের জন্য, বাসস্থানের জন্য কিংবা খাদ্যের জন্য অন্তপ্রজাতি কম্পিটিশন। টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে দাড়িয়েছিলো আমাদের একটি ইমার্জেন্সি ব্যাবস্থা। এমন একটি ব্যাবস্থা যা কিনা শিকারির আগমনের পদশব্দ শোনার সাথে সাথেই আমাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিবে, মাংশপেশীর তার গ্লাইকোজেন ভেঙ্গে গ্লুকোজ প্রস্তুত করে শরীরকে প্রস্তুত রাখবে যুদ্ধ করার জন্য কিংবা প্রাণ নিয়ে পালানোর জন্য, শ্বসনহার বৃদ্ধি পেয়ে নিশ্চিত করবে যেনো কোষে কোষে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌছে যায়, যুদ্ধ হলে যুদ্ধলব্ধ ইঞ্জুরীকে সবচেয়ে স্বল্পসময়ে নিরাময় করার জন্য এবং ক্ষতস্থানের ইনফেকশন রোধ করার জন্য রেডেলার্টে রাখবে আমাদের প্রতিরোধ ব্যাবস্থাকে, ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি জপতে জপতে অপ্রয়োজনীয় সকল প্রাণরাসায়নিক গমনপথ যেমন- ডাইজেশ্চন, ইরেকশন ইত্যাদি বন্ধ করে দিবে মুহুর্তের মধ্যে শক্তি সেইভ করার জন্য, মুহুর্তের মধ্যে শ্রবনযন্ত্র ও দৃষ্টিযন্ত্রকে করবে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক অনেক বেশী সংবেদনশীল, বোধবুদ্ধি লোপ পাইয়ে দেবার মধ্য দিয়ে শক্তি সেইভ করবে, এছাড়াও ফাইট দিতে হলে হাইপারএকটিভ করে তুলবে এগ্রেশন রেসপন্স এবং ফ্লাইট দিতে হলে হাইপারএকটিভ করবে এস্কেইপ রেসপন্স ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি!

ফ্লাইট-ফাইট রেসপন্স কিন্তু খুবই খুবই চমতকার একটা জিনিষ, জীবজগতের অনেক কিছুকেই এটা খুব সুসংহতভাবে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ। যেমন- জনসমাবেশ যেমন- কনসার্ট, হজ্ব বা এইধরণের কোন পিলগ্রিমেইজ ইত্যাদিতে স্টাম্পিডে পদপৃষ্ঠ হয়ে মানুষ মারা যায় শুনে থাকবেন বোধহয়। কি হয় স্টাম্পিডে? ওয়েল, হঠাত করে খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে একসাথে সিঙ্ক্রোনিতে অনেকগুলো মানুষের এস্কেইপ রেসপন্স সক্রিয় হয়ে যায়, মানুষ জ্ঞানবুদ্ধি হারিয়ে ছোটাছুটি শুরু করে এবং পদপৃষ্ঠ হয়ে মারা যায়। এখানে উল্লেখ্য স্টাম্পিড কিন্তু হয়ে থাকে শুধুই স্তন্যপায়ী ক্রাউডে, কয়েকলাখ সরীসৃপ একসাথে রেখে দিয়ে তাদের যতোপ্রকারের স্টিমুলি-ই দেওয়া হোক না কেনো স্টাম্পিড হয়না সাধারণত! এই জিনিষটা প্রদর্শন করে স্তন্যপায়ী জীবের একটি ইউনিক বৈশিষ্ট, পরস্পর নির্ভরশীলতা। আমরা একে অপরের উপর নির্ভর করি, একটি সমাবেশে হঠাত একজনের এস্কেইপ রেসপন্স কার্যকর হলে যখন সে হতবিহ্বল হয়ে যায়, তার দেখাদেখি অন্যান্যরাও এটা বিশ্বাস করে নেয় যে এর এস্কেইপ রেসপন্স যেহেতু কার্যকর হয়েছে তাহলে নিশ্চয়ই আসলেই এস্কেইপ রেসপন্স কার্যকর হওয়া উচিত এমন কোনো বিপদই ঘটেছে, যেমন- আগুন লেগে থাকোতে পারে, ফলে আমার এস্কেইপ রেসপন্সও কার্যকর হওয়া উচিত এই মুহুর্তেই! চেইন রিএকশনের মতো হতবিহ্বলতা ছড়িয়ে পড়ে ক্রাউডে এবং সুচীত হয় স্টাম্পিড। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কি কি স্টিমুলি স্টাম্পিডের সুচনা করে? ওয়েল, এমন যে কোনোকিছুই যা কিনা জীবকে বিপদাপন্ন বোধ করাতে পারে। যেমন- কিছুদিন আগেই কম্বোডিয়ায় একটি ঝুলন্ত ব্রিজের উপর স্টাম্পিডে সাড়ে তিনশো মানুষ মারা যায় সংবাদে দেখে থাকবেন বোধহয়, সেই স্টাম্পিডটির সুচনাকারী স্টিমুলি ছিলো মানুষের ভীরে ঝুলন্ত ব্রিজটির দোদুল্যমানতা, মানুষ বুঝতে পারেনি যে একটি ঝুলন্ত ব্রিজ দোদুল্যমান হওয়াটাই স্বাভাবিক, মানুষের চাপে সেই দোদুল্যমানতা বরং একটু বেশী প্রনান্সডই হবে, এর বেশী কিছু নয়; মানুষ মনে করতে থাকে যে ব্রিজটি ভেঙ্গে পড়তে যাচ্ছে, তাদের এস্কেইপ রেসপন্স সুচীত হয় এবং সুচীত হয় স্টাম্পিড।

যাই হোক, প্রসঙ্গে ফিরে যাই, আমাদের ফাইট-ফ্লাইট রেসপন্স অনুঘটিত করে অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম তার আড্রেনার্জিক নিউরনগুলোর নিউরোট্রান্সমিটার নোর‍্যাড্রেনালিনের মাধ্যমে, এবং আমাদের এন্ডোক্রাইন ব্যাবস্থা ফাইট-ফ্লাইট রেসপন্স অনুঘটিত করে তার হর্মোন আড্রেনালিনের মধ্য দিয়ে। বস্তুত অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমের সমস্ত নিউরোনকে কার্যক্রম অনুসারে আপনি যদি ভাগ করতে চান, তবে ভাগ করতে পারেন তাদের এড্রেনার্জিক, কোলিনার্জিক, ডোপামিনার্জিক এবং গাবা বা গামা এমিনো বিউটারিক এসিড নিষ্কৃতকারী নিউরোন হিসেবে। এদের মধ্যে এড্রেনার্জিক, কোলিনার্জিক ও ডোপামিনার্জিক নিউরোন হচ্ছে উত্তেজক বা এক্সাইটেটরি, অপরপক্ষে গাবা নিষ্কৃতকারী নিউরোন প্রশমক বা ইনহিবিটরি। অর্থাৎ, একটি এড্রেনার্জিক কিংবা কোলিনার্জিক কিংবা ডোপামিনার্জিক নিউরোন ফায়ার করলে, তার সিনাপ্টিক টার্গেট নিউরোনটিও ফায়ার করবে, অপরপক্ষে একটি গাবা নিষ্কৃতকারী নিউরোন ফায়ার করলে তার সিনাপ্টিক টার্গেট নিউরোন ফায়ার করা বন্ধ করবে বা ফায়ার করতে পারবে না! যাই হোক, সিম্প্যাথেটিক নিউরোনের নিউরোট্রান্সমিটার নোর‍্যাড্রেনালিন কিংবা কিডনীর আড্রেনাল গ্লান্ড হতে রক্তস্রোতে নিষ্কৃত আড্রেনালিন আমাদের কোষে এক্সপ্রেসড আড্রেনার্জিক রিসেপ্টরগুলোর সাথে বন্ধন স্থাপন করে। এক্সপ্রেশন প্যাটার্ন যখন আমরা পর্যালোচনা করি, তখন দেখা যায় যে এই আড্রেনার্জিক রিসেপ্টরগুলো হয় বস্তুত তিন প্রকারের- ১। আলফা আড্রেনার্জিক রিসেপ্টর যা কিনা এক্সপ্রেসড হয় প্রায় সারা শরীর জুড়েই, বিশেষত শিরা ও ধমনী এবং প্রজননতন্ত্রে, ২। বেটা আড্রেনার্জিক রিসেপ্টর যা কিনা এক্সপ্রেসড হয় ফুসফুস ও হৃতপিন্ডে, এবং ৩। গামা আড্রেনার্জিক রিসেপ্টর যা কিনা এক্সপ্রেসড হয় মেদকোষে বা আডিপোসাইটে।

ফাইট-ফ্লাইট রেসপন্স সুচীত রক্তে নিষ্কৃত আড্রেনালিন বা সিনাপ্টিক ক্লেফ্টে নিষ্কৃত নোর‍্যাড্রেনালিন আমাদের হৃতপিন্ডে এক্সপ্রেসড বেটা আড্রেনার্জিক রিসেপ্টরগুলোর সাথে বন্ধন করলে পরে যেই কোষীয় গমনপথটির সুচনা হয় তার চুড়ান্ত ফলাফল হয় গিয়ে ভেইসোকন্সট্রিকশন বা রক্তনালীর সঙ্কোচন। রক্তনালীর এই সঙ্কোচন রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। মেকানিকালি রক্তচাপ চলকটি নির্ভরশীল মোটামুটি দুটি চলকের উপর হৃতপিন্ডের কর্মক্ষমতা বা কার্ডিয়াক আউটপুট এবং রক্তনালীর ব্যাস। রক্তনালীর ব্যাস যতো বড় হয় ফ্রিকশন বা সংঘর্ষ হয় ততোই বেশী; একই মুলনীতির প্রভাবে ভেইসোকন্সট্রিকশনের ফলে রক্তনালীর ব্যাস ছোট হলে ফ্রিকশন হয় কম বিধায় প্রেসার যায় বেড়ে। এভাবেই ভেইসোকন্সট্রিকশনের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় আড্রেনাল প্রতিক্রিয়ার একটি উদ্দেশ্য, রক্তচাপ বৃদ্ধি। এখন লক্ষ্য করুন, এই বেটা আড্রেনার্জিক রিসেপ্টর কিন্তু খুবই খুবই সম্ভাবনাময় একটি ড্রাগটার্গেট। আমি আমার আগের একটি পোস্টে এটিনোলল নামক একটি ড্রাগের কথা বলেছিলাম, যেটি কিনা একটি বেটা এন্টাগনিস্ট। এটিনোলল এই বেটা আড্রেনার্জিক রিসেপ্টরগুলো ইনহিবিট করে দেয় ফলে আড্রেনালিন বা নোর‍্যাড্রেনালিন আর এই রিসেপ্টরগুলোর সাথে বন্ধন করতে পারে না, ফলে আড্রেনাল ব্যাবস্থাও সক্রিয় হয়না এবং ব্লাডপ্রেসারও বাড়ে না! কাদের জীবন বাঁচায় এটা? ওয়েল, উচ্চরক্তচাপ বা হাইপারটেনশন রোগীদের। বেটা এন্টাগোনিস্টকে অনেকে বিচার করে থাকেন ফার্মাকোলজির ইতিহাসে একটি অন্যতম বৈপ্লবিক অবদান হিসেবে। প্রতি তিনজনে একজন আমরা হৃদরোগে মারা যেতে যাচ্ছি, এই পরিসংখ্যান সম্ভবত হালালও করে তাদের এই মতামতটিকে! বেটা এন্টাগোনিস্ট আবিষ্কার ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ফার্মাকোলজিস্ট স্যার জেইমস ব্ল্যাক কে নোবেল জেতায় ১৯৮৮ সালে। স্যার জেইমস ব্ল্যাক যেই ড্রাগটি আবিষ্কার করেছিলো এর নাম ছিলো প্রোপ্রানোলল। এটির সমস্যা ছিলো, এটি ছিলো অনেক অনেক বেশী লাইপোফিলিক, ফলে এটা সহজেই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার অতিক্রম করতো, ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দিতো দুঃস্বপ্ন। ক্রনিক দুঃস্বপ্ন অ্যাটাকে ভোগা একজন হাইপারটেনশন রোগীর জন্য বলাই বাহুল্য কোন সুখবর নয়, তাই আমরা প্রোপ্রানোললকে একটু ঘঁষে মেজে এটিনোললে উন্নিত করি যেটি কিনা এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে মুক্ত!

যদিও হৃতপিন্ডে আড্রেনালিনের প্রতিক্রিয়া হয় কন্সট্রিকশনের মাধ্যমে রক্তচাপ বৃদ্ধি, ফুসফুসে আড্রেনালিনের প্রতিক্রিয়া কিন্তু পুরোপুরিই তার উল্টো! ফুসফুসের ব্রঙ্কিওল বা বায়ুনালীগুলো আড্রেনালিনের প্রতিক্রিয়ায় স্ফীত হ্যে উঠে যেটিকে কিনা বলা হয় ব্রঙ্কিওডায়লেশন। ব্রঙ্কিওডায়লেশনের ফলে বেশী বায়ু ফুসফুসে প্রবেশ করে, ফলে রক্তে অক্সিজেনের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, এভাবেই আড্রেনাল প্রতিক্রিয়া অর্জিত হয়। ফুসফুসে এক্সপ্রেসড এই বেটা আড্রেনার্জিক রিসেপ্টরগুলোও কিন্তু খুবই সম্ভাবনাময় ড্রাগটার্গেট। এবং সালবিউটামল বা ভেন্টোলিন হচ্ছে এই রিসেপ্টরগুলোর এগনিস্ট। এখন, একটি থেরাপিউটিক অনু একটি রিসেপ্টরের সাথে দুইভাবে বন্ধন করতে পারে- এগনিস্ট হিসেবে এবং এন্টাগোনিস্ট হিসেবে। এন্টাএগোনিস্ট হিসেবে বন্ধন করলে রিসেপ্টরটি ইনহিবিট হয়, যেমন আমাদের উপরের উদাহারণে বেটা এন্টাগনিস্ট এটিনোলল হৃতপিন্ডের বেটা আড্রেনার্জিক রিসেপ্টরগুলোর সাথে বন্ধন করে সেগুলো ইনহিবিট করে দিয়েছে আমরা দেখলাম, ফলে আড্রেনাল প্রতিক্রিয়া অর্জিত হতে পারেনি বা রক্তনালীর সঙ্কোচন ঘটতে পারেনি। অপরপক্ষে থেরাপিউটিক অনু এগোনিস্ট হিসেবে রিসেপ্টরের সাথে বন্ধন স্থাপন করলে রিসেপ্টরটি সক্রিয় হয়। সালবিউটামল ফুসফুসের বেটা আড্রেনার্জিক রিসেপ্টরগুলোর সাথে বন্ধন করলে যেই কোষীয় গমনপথটি সক্রিয় হয় এর চুড়ান্ত ফলাফল হয় গিয়ে, বায়ুনালীর প্রসারণ সংঘটিত হয়। ফলে বেশী বায়ু ফুসফুসে প্রবেশ করে ক্রনিক এস্থমা এটাকের উপসম ঘটায়!

[321 বার পঠিত]