ব্লগানুবাদঃ দ্য সেলফিশ জিন (৩য় অধ্যায়) (৩/৩)

এই অধ্যায়ের মূল কথাটি বলে ফেলেছি। তবে আমি কিছু কিছু জটিলতাকে এড়িয়ে গেছি, কিছু কিছু অনুমান বিষয়ে বিস্তারিত বলি নি। প্রথম জটিলতাটি এর আগে সংক্ষেপে বলেছিলামঃ প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে জিনগুলো যতোই স্বাধীন আর মুক্ত হোক না কেন, ভ্রূণের ওপর নিয়ন্ত্রণে তারা ততোটা মুক্ত আর স্বাধীন না। ভ্রূণের গঠন ও উন্নয়নে তাদের পারষ্পরিক মিথষ্ক্রিয়া ও সহযোগিতা ব্যাখ্যাতীত জটিল ভাবে ঘটে। এই মিথষ্ক্রিয়া যেমন নিজেদের মধ্যে, তেমনি বাইরের পরিবেশের সাথে। কথাচ্ছলে আমরা ‘লম্বা পায়ের জন্যে দায়ী জিন’ বা ‘পরার্থপর আচরণের জন্যে দায়ী জিন’ এরকম উল্লেখ করে থাকি, কিন্তু এগুলো আসলেই কি বোঝাচ্ছে সেটা জেনে নেয়া জরুরি। এমন কোন জিন নেই যে একাই একটা লম্বা বা খাটো পা তৈরি করে। একটা পা বানানোর জন্যে অনেকগুলো জিনকে একসাথে সংগঠনের মতো কাজ করতে হয়। বাইরের পরিবেশের প্রভাবও অনস্বীকার্য। আসলে তো খাবার খেয়ে খেয়েই লম্বা পা লম্বা হতে পারে! কিন্তু আমরা যদি সবকিছু ধ্রুব ধরে নেই, তাহলে হয়তো এমন একটা জিন আছে, যেটার কারণে সেই পা’টা একটু বেশি লম্বা হতে পারে। আবার সেই জিনের অ্যালিলটি সক্রিয় হলে হয়তো অতোটা লম্বা পা হতো না।

আরেকটা সদৃশ উদাহরণ দেখি। গমের বৃদ্ধিতে সারের প্রভাব, যেমন নাইট্রেট সারের প্রভাবের কথা চিন্তা করুন। সবাই জানে যে নাইট্রেট সার দেয়া হলে গম আকারে বড়ো হবে, নাইট্রেটের অভাবে বড়ো হবে না। কিন্তু কেউ এমন বেকুব না যে দাবি করবেন কেবল নাইট্রেটের কারণেই গম বেড়ে ওঠে। বীজ, মাটি, সূর্য, পানি, আর বিভিন্ন খনিজ লবণও গমের জন্যে জরুরি। কিন্তু যদি বাকি সবকিছুকে ঠিক রাখা হয়, এমনকি যদি কিছু পরিমাণ কমবেশিও করা হয়, তখন নাইট্রেটের প্রভাবেই গম লম্বায় বেশি বৃদ্ধি পাবে। একই ব্যাপার জিনের বেলাতেও খাটে ভ্রূণের বৃদ্ধির সময়ে। ভ্রূণের উন্নয়ন এতোটাই সংবদ্ধ-সম্পর্কের জটিল জটাজালে নিয়ন্ত্রিত হয় যে বরং সেই বিষয় নিয়ে খুব গভীরে গিয়ে চিন্তা না করি। কোন জিনগত বা পরিবেশগত উপাদান একটি শিশুর কোন অংশের জন্যে একাই ‘দায়ী’ বলে বিবেচনা করা যায় না। একটি শিশুর সকল অঙ্গ মূলত অসীম-সংখ্যক পূর্ববর্তী কারণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। কিন্তু এক শিশু থেকে আরেক শিশুর পার্থক্য দেখতে গেলে, যেমন তাদের পায়ের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য দেখতে গেলে আমরা হয়তো একটি বা কয়েকটি পূর্ববর্তী কারণ বের করতে পারবো। সেই কারণ জিনগতও হতে পারে, পরিবেশগতও হতে পারে। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এই পার্থক্যটাই আসল ব্যাপার। এবং বিবর্তনের এলাকায় জিন-নিয়ন্ত্রিত পার্থক্যগুলোই কেবল জরুরি।

একটা জিনের কাছে তার নিজের অ্যালিলটিই একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। বাকি অন্যান্য জিনগুলো তার পরিবেশের অংশ, যাদের তুলনা করা যায় তাপমাত্রা, খাদ্য, শিকারি, কিংবা সহচরের সাথে। জিনটার প্রভাব নির্ভর করে তার পরিবেশের ওপর। এই পরিবেশের মধ্যে অন্যান্য জিনেরাও অন্তর্ভুক্ত। অনেক সময় এক ধরনের জিনের উপস্থিতিতে জিনটি একরকম আচরণ করে, আবার ভিন্ন আরেক ধরনের জিনের উপস্থিতিতে পুরোপুরি ভিন্ন আচরণ করে। বাকি জিনের পুরো সেট তার জন্য এক রকম জিনগত আবহাওয়া বা পটভূমি তৈরি করে দেয়, একইসাথে তার আচার-আচরণেও প্রভাব ফেলে।
এই দেখুন, এখন এক প্যারাডক্সে পড়ে গেলাম। যদি একটি শিশু তৈরি অসংখ্য জিনের এক আন্তঃসম্পর্কীয় উদ্যোগ হয়ে থাকে, যদি নিজের কাজ সম্পন্ন করতে প্রতিটা জিনেরই অন্য আরো হাজারটা জিনকে দরকার হয়, তাহলে সেটা কেমন করে আমার প্রস্তাবনার সাথে মিলে? আমি যে অবিভাজ্য জিনের কথা বলছি, যা অমর কৃষ্ণসার হরিণের মতো শরীর থেকে শরীরে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে, যে পুরোপুরি মুক্ত, যে অদম্য, সে কীভাবে জীবনের স্ব-নিয়ন্ত্রিত বাহক হতে পারে? এই সবই কি তাহলে আগডুম বাগডুম? মোটেই না। আমি হয়তো কথায় কথায় অনেকদূর চলে এসেছি, কিন্তু একটি কথাও ভুল বলি নি। আর এখানে সেরকম কোন সত্যিকারের প্যারাডক্স আদৌ নেই। আমি সেটা ব্যাখ্যা করবো আরেকটি সমতুল্য উদাহরণ দিয়ে।

অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের নৌকা বাইচে একজন দাঁড়ি কোনোভাবেই একা জিততে পারবে না। জিততে হলে তার আটজন সতীর্থ-দাঁড়ি দরকার। তারা প্রত্যেকেই নৌকার এক এক জায়গায় বসে দাঁড় টানায় পারদর্শী। কেউ হালের দিকে, কেউ গলুইয়ের দিকে। নৌকা বাইচের দাঁড় টানা একটা সমবায়ী কাজ, কিন্তু আটজনের মাঝে কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে বেশি সক্ষম হয়ে থাকে। এখন ধরা যাক একজন কোচ অনেকগুলো প্রার্থীর মধ্যে থেকে দল বাছাই করবেন। প্রার্থীদের মধ্যে কেউ গলুইয়ে বসে চালাতে পারদর্শী, কেউ হালে বসে চালাতে পারদর্শী। দল বাছাইয়ের সময়ে কোচ নিচের নিয়মে নির্বাচন করলেন। প্রতিদিন তিনি দৈব চয়নের ভিত্তিতে প্রতিটি স্থানের জন্যে তিনজন করে নতুন সদস্য বেছে নিলেন। এরপর এই তিন দলকে একে অপরের সাথে নৌকা বাইচে পাঠালেন। কয়েক সপ্তাহ পরে দেখা যাবে যে বিজিত নৌকায় ঘুরে ফিরে কিছু নির্দিষ্ট দাঁড়িই জায়গা করে নিচ্ছে। এদেরকে চৌকস-দাঁড়ি হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। বাকি দাঁড়িরা নিয়মিতভাবে অপেক্ষাকৃত ধীর নৌকা চালাচ্ছে বলে একসময় এদেরকে বাদ দেয়া হলো। এমন হতে পারে যে একজন দুর্দান্ত দাঁড়ি হয়তো ধীর-দলের সদস্য। বাকিদের খারাপ চালনায় বারবার তার নৌকা পিছিয়ে পড়ছে। কিংবা হয়তো তার কপালটাই খারাপ, হয়তো কোনোদিনই বাতাস তার অনুকূলে থাকে না। দেখা যায় যে গড়ে সেরা দাঁড়িরাই বিজয়ী দলে অবস্থান করে।

এই উদাহরণে দাঁড়িরা হলো জিন। নৌকার একটি জায়গার জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িরা হলো অ্যালিল যারা ক্রোমোজোমের একই জায়গার জন্য জিনের সাথে লড়াই করতে থাকে। নৌকা দ্রুত চালানো রূপকার্থে বুঝায় এমন দেহ গঠন করা যা সফলভাবে টিকে থাকবে। বাতাস হলো বাইরের পরিবেশের রূপক আর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলো জিন-সমষ্টির রূপক। একটি দেহের টিকে থাকার সফলতা বিবেচনায় আনলে সকল জিন একটি নৌকায় রয়েছে। অনেক ভালো জিন খারাপ দেহে পড়ে যায়, তখন তাকে অন্য একটি মরণশীল জিনের সাথে সেই দেহে অবস্থান করতে হয়। মরণশীল জিনের কারণে সেই দেহটি হয়তো শৈশবেই মারা যায়। তখন ভালো জিনটিও একইসাথে মারা পড়ে। কিন্তু এটা তো কেবলই একটি শরীর, এই ভালো জিনের অনেকগুলো নকল আছে যেগুলো অন্যান্য দেহে ছড়িয়ে আছে। সেখানে হয়তো কোন কোন দেহে মরণশীল জিন থাকে না। এভাবে অনেক ভালো জিনই অকালে হারিয়ে যেতে পারে অপর খারাপ জিনের সাথে একই দেহে থাকার কারণে, অনেকে হয়তো দুর্ভাগ্যবশত হারিয়ে যায়। হয়তো তাদের দেহটি বজ্রপাতের শিকার হলো। কিন্তু সংজ্ঞামতে সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য একেবারেই এলোপাথাড়ি ঘটনা। তাই কোন জিন যদি সবসময় দুর্ভাগ্যের শিকার হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেটা আসলে একটা খারাপ জিন।

অনেকের সাথে মিলে দলগত ভাবে কাজ করা নৌকার দাঁড়িদের আরেকটি ভালো গুণ। দলের সবার সাথে মিলেমিশে কাজ করা একধরণের সামর্থ্যের ব্যাপার। এই গুণটি নিজের শক্ত পেশী থাকার মতোই জরুরি। প্রজাপতির বেলায় আমরা দেখেছি যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন অনেক সময় অসতর্ক ইনভারশন বা ক্রোমোজোমের বড়ো অংশের সামগ্রিক বদলের মধ্যে দিয়ে একটি জিন কমপ্লেক্স ‘সম্পাদনা’ করতে পারে। এর ফলে কিছু জিন একে অপরের সংস্পর্শে চলে আসে যেগুলো সহযোগিতায় ভালো হয়। আরো একটা বিষয় চিন্তা করতে হবে যে অনেক জিনের মাঝে হয়তো কোন আপাত-যোগসূত্র নেই, কিন্তু তাদের পারষ্পরিক উপযুক্ততার কারণেই তাদের নির্বাচন করা যায়। যে জিন অধিকাংশ জিনের সাথে সহযোগী আচরণ করে, তার পরবর্তী দেহগুলোতে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এখানে জিন সমষ্টির বাকি জিনের চাইতে সে বেশি সুবিধা পায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কর্মক্ষম মাংসাশী প্রাণীর দেহে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন। যেমন – ধারালো কর্তন-দাঁত, মাংস হজমের জন্যে বিশেষ অন্ত্র-নালী, এরকম আরো অনেক বৈশিষ্ট্য। অপরদিকে একটি কর্মক্ষম তৃণভোজীর শরীরে দরকার চ্যাপ্টা পেষণ-দাঁত, একটি দীর্ঘতর অন্ত্র আর হজমের জন্যে আলাদা ধরণের পাচন-রসায়ন। এই তৃণভোজীর জিন-সমষ্টিতে পূর্বপুরুষের কাছ থেকে কোন মাংসভুক দাঁতের নতুন জিন এলে খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না। তার মানে এই না যে মাংস খাওয়া সবার জন্যে খারাপ। মাংস খেয়ে ঠিকমতো হজম করতে হবে, সেজন্য অন্ত্রটাও সেই অনুযায়ী হওয়া দরকার। এছাড়াও মাংসাশী হওয়ার অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলোও থাকতে হবে। ধারালো, মাংসভুক দাঁতের জিন নিজে খারাপ না। তারা কেবল এমন জিন-সমষ্টির কাছে খারাপ, যেখানে তৃণভোজীর সহায়ক জিনেরা রাজত্ব করছে।

এই ধারণাটি বেশ সূক্ষ্ম, একই সাথে জটিল। জটিল কারণ একটি জিনের ‘পরিবেশ’ মূলত অন্যান্য জিন গড়ে তোলে, যে জিনগুলো আবার ওই পরিবেশের সাথে সহযোগী আচরণ করে বলে বাছাই করা হয়েছে। একটি তুলনা এই জটিল পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে ব্যক্ত করতে পারি। তবে তা দৈনন্দিন জীবনের উদাহরণ না। এটা মানুষের ‘গেইম থিউরি’ সাথে জড়িত, যেটা আমরা পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচনা করবো। এই থিউরি একেকজনের মানুষের মধ্যে আক্রমণাত্মক প্রতিযোগিতাকে বিশ্লেষণ করে। তাই আপাতত এই বিষয়ক কথাবার্তা এই অধ্যায় শেষ না হওয়া পর্যন্ত মুলতুবি রাখি। চলুন, মূল বিষয়ে ফিরে যাই। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মৌলিক একক কোন প্রজাতি, সমষ্টি, বা একক প্রাণী নয়; বরং কিছু জিনগত উপাদান যাদের আমরা জিন বলে সংজ্ঞায়িত করতে পারি।

আগে যেমন বলেছি, আমাদের এই ধারণাটির আবশ্যকীয় ভিত্তি হলো আমরা জিনকে সম্ভাব্য-অমর ধরে নিয়েছি, এবং আমাদের দেহ এবং অন্যান্য বৃহৎ এককগুলো ক্ষণস্থায়ী বলেই জানি। এই অনুমান দুইটি সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে – একটি হলো যৌন জনন এবং ক্রসিং-ওভার, আরেকটি হচ্ছে একক প্রাণীর মরণশীলতা। এই দুইটি ব্যাপার অমোচনীয় সত্য। কিন্তু এগুলো কেন সত্য, সেই প্রশ্ন চলে আসে। আমরা বা অন্যান্য যন্ত্রগুলো কেন যৌন জননে অংশ নেই? কেন আমাদের ক্রোমোজোমে ক্রসিং-ওভার ঘটে? আর কেনই বা আমরা অমর হতে পারি না?

কেন বুড়ো হয়ে একসময় আমরা মরে যাই, এই প্রশ্নের জবাব বেশ জটিল, আর এতোটাই বিস্তারিত আলাপ যে তা এই বইয়ের আওতার বাইরে চলে যাবে। কিছু নির্দিষ্ট কারণের পাশাপাশি কয়েকটি সাধারণ কারণও বর্ণনা করছি। যেমন ধরুন, একটি তত্ত্ব হলো বার্ধক্য মূলত জিনের ক্ষয়ক্ষতি এবং নকল তৈরির ভুলের যোগফল, যা মানুষের জীবদ্দশার এক পর্যায়ে ঘটতে শুরু করে। আরেক দিকে, স্যার পিটার মেডাওয়ার প্রদত্ত আরেকটি মত আছে যা জিন নির্বাচনের বিবর্তনীয় চিন্তার ভালো উদাহরণ হতে পারে। মেডাওয়ার প্রথমেই প্রথাগত পুরনো মতগুলোকে নাকচ করে দিয়েছেন। একটা মত এমন যে, বুড়োরা মারা যায় বাকি প্রজাতির জন্যে এক প্রকারের পরার্থপর আচরণ থেকে। কারণ তারা যদি জনন-অক্ষম হওয়ার পরেও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকেন তাহলে পৃথিবী ঘিঞ্জি হয়ে উঠবে, এতে কারো কোন লাভ হবে না। মেডাওয়ার প্রথমেই উল্লেখ করেছেন যে এধরণের যুক্তি আসলে চক্রাকার-যুক্তি। এটি যা প্রমাণ করতে চায় (বৃদ্ধরা জনন-কাজে অংশ নিতে অক্ষম), সেটাকেই শুরুতে সত্য ধরে নিয়েছে। এছাড়াও এটি গোষ্ঠী-নির্বাচন বা প্রজাতি-নির্বাচনের মতো শিশুতোষ ব্যাখ্যা, যদিও এই ব্যাখ্যার কিছু কিছু দিক আরেকটু সম্মানজনক ভাবে উপস্থাপন করা যেতো। মেডাওয়ারের নিজস্ব তত্ত্বটির একটা অসামান্য যুক্তি রয়েছে। আমরা সেই যুক্তিকে এখন ধীরে ধীরে গড়ে তুলবো।

আমরা এরই মাঝে জিজ্ঞাসা করেছি যে ‘ভালো’ জিনের সবচেয়ে সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী, এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে ‘স্বার্থপরতা’ সেই বৈশিষ্ট্যের অন্যতম। কিন্তু এটি ছাড়াও আরেকটি বৈশিষ্ট্য সকল ভালো আর সার্থক জিনের মধ্যে থাকবে, যা হলো অন্তত প্রজননের আগে নিজেদের যন্ত্রকে তারা মরতে দিবে না। এটা ঠিক যে হয়তো আপনার কোন কাজিন বা চাচাতো-দাদা শৈশবেই মারা গেছেন। কিন্তু আপনার কোন পূর্বপুরুষই কম বয়সে মরেন নি। পূর্বপুরুষেরা অল্প-বয়সে মরবেনই না!

যে জিন তার বাহককে মেরে ফেলে তাকে মারণ জিন (lethal gene) বলা হয়। একটি প্রায়-মারণ জিনের (semi-lethal gene) শরীরকে দুর্বল করে দেয়ার শক্তি আছে, যেমন এটা হয়তো অন্য কারণে মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। সব জিনই কোন না কোন সময় শরীরের ওপর তার সর্বোচ্চ প্রভাব খাটায়, মারণ এবং প্রায়-মারণ জিনও এর ব্যতিক্রম নয়। বেশিরভাগ জিন তাদের ক্ষমতা দেখায় ভ্রূণাবস্থায়, বাকি জিন দেখায় শৈশবে, কোন কোনটি তরুণাবস্থায় আর কোন কোনটি মধ্যবয়সে, আর কিছু জিন কাজ করে বৃদ্ধাবস্থায়। (এইখানে চিন্তা করে দেখুন একটু শুঁয়োপোকা এবং প্রজাপতি একই জিনের বাহক)। অবশ্যই, মারণ জিনগুলো জিন-সমষ্টি থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা থাকে। কিন্তু এটাও সমান সম্ভাবনা যে জিন-সমষ্টিতে ভ্রূণাবস্থায় সক্রিয় মারণ জিনের চাইতে বৃদ্ধাবস্থায় সক্রিয় মারণ জিনের টিকে থাকার সুযোগ বেশি। যে মারণ জিন বৃদ্ধ বয়সে প্রভাব ফেলে তার জিন-সমষ্টিতে থেকে যেতে সফল হয়, কারণ তার মারণ-ক্ষমতা দেহটি প্রজননে অংশ নেয়ার অনেক পরে দেখা দেয়। যেমন যে জিন বৃদ্ধের শরীরে ক্যান্সার তৈরি করে, সেই জিন সেই মানুষের অনেক সন্তানের শরীরে প্রবাহিত হতে পারে, কারণ ক্যান্সার রোগ হবার আগেই সে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। অপরদিকে, যে জিনের কারণে শিশুদের দেহে ক্যান্সার হয়, সেই জিন পরবর্তী বংশের সবার মাঝে প্রবাহিত হয় না। আর যে জিনের কারণে শিশুটি ক্যান্সার রোগে মারা যায় সেটি কারো মাঝেই আর প্রবাহিত হয় না। এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করে বলা যায় যে জরাগ্রস্ততা আসলে বৃদ্ধাবস্থায় আক্রমণকারী মারণ ও প্রায়-মারণ জিনের মোট প্রভাবের কারণে ঘটিত ক্ষয় ছাড়া আর কিছুই না। এই জিনগুলো জিন-সমষ্টির মধ্যে রয়ে যায় ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাকনিতে আটকা পড়ে না কারণ এগুলো অনেক দেরিকে সক্রিয় হয়।

মেডাওয়ার যে বিষয়ে জোর দিয়ে বলেছেন, তা হলো, নির্বাচন এমন জিনকেই সুবিধা করে দিবে, যেগুলো অন্যান্য মারণ জিনের সক্রিয়তাকে বাধা দেয়, কিংবা সেসব জিন যেগুলো ভালো জিনের প্রভাবকে দ্রুত করে। এমন হতে পারে যে বিবর্তনের অনেকাংশই নির্ভর করে কিছু কিছু জিনের সক্রিয়তার সময়কে অন্য জিন কমিয়ে বাড়িয়ে দেয়ার ওপরে।

এখানে উল্লেখ্য যে এই তত্ত্বে প্রজননের কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়া হচ্ছে না। এখানে শুধু ধরে নেয়া হচ্ছে যে সকল প্রাণীই জীবদ্দশার কোন না কোন পর্যায়ে সন্তানের জন্ম দিবে। মেডাওয়ারের তত্ত্ব দ্রুত সিদ্ধান্ত দিচ্ছে যে জিন-সমষ্টিতে দেরিতে সক্রিয় হওয়া ক্ষতিকর জিন জমা হয়। পাশাপাশি এটাও বলছে যে এই কারণে বৃদ্ধ বয়সে প্রজননের প্রবণতাও কমে যায়।

এই তত্ত্বের ভালো দিক হলো এর থেকে আমরা বেশ কিছু চমৎকার ধারণা পাই। যেমন – আমরা যদি মানুষের আয়ু বাড়াতে চাই তাহলে দুটো পথ খোলা আছে। প্রথমত, আমরা একটি নির্দিষ্ট বয়স, ধরুন চল্লিশের আগে প্রজনন নিষিদ্ধ করে দিতে পারি। কয়েক শতাব্দী পরে এই সর্বনিম্ন বয়সের সীমা বাড়িয়ে পঞ্চাশ করে দেয়া যায়, এভাবে চলতে থাকবে। অনুমান করতে পারি যে এভাবে মানুষের আয়ু কয়েকশ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। আমি কল্পনা করতে পারি না যে কেউ সত্যি সত্যি এই পন্থা জারি করার চেষ্টা করবে।

দ্বিতীয়ত, আমরা কিছু কিছু জিনকে ‘বোকা’ বানাতে পারি, মনে করাতে পারি যে তাদের বাহক শরীরের বয়স এখনো কম। কার্যত এর মানে হচ্ছে বয়সের সাথে সাথে শরীরের ভিতরে রাসায়নিক পরিবেশের বদলগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। এই বদলের যে কোন একটাই হয়তো সেসব মারণ জিনের ‘জেগে ওঠার’ জন্যে ‘ঠেলা’ হিসেবে কাজ করে। আমরা একটি তরুণতর দেহের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য শরীরে জারি রাখতে পারলে এই মারণ জিনের জেগে ওঠা ঠেকানো যাবে। মজার ব্যাপার হলো বার্ধক্যের রাসায়নিক সংকেতগুলো যে নিজেরাও ক্ষতিকর সংকেত হতে হবে এমন কোন কথা নেই। যেমন ধরা যাক তরুণদের চাইতে বৃদ্ধদের শরীরে ঞ নামক পদার্থের ঘনত্ব বেশি থাকে। ঞ পদার্থটি হয়তো নিজে তেমন ক্ষতিকর কিছু না, হয়তো এটি কোন খাদ্যের অংশ যা আমাদের শরীরে জমা হয়। একটি জিন হয়তো শরীরে ভালো জিনের মতো আচরণ করে, তাই জিন-সমষ্টিতে সেটা বাছাই করা হয়েছিলো। কিন্তু ঞ পদার্থের নির্দিষ্ট পরিমাণের উপস্থিতিতে তা একসময় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে শুরু করবে। এই জিন তখন দেহের বার্ধক্যের জন্যে দায়ী বলে বিবেচিত হবে। সমাধান হলো শরীর থেকে ঞ-কে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলতে হবে।

এই তত্ত্বের যুগান্তকারী দিক হচ্ছে যে ‘ঞ’ নিজে বার্ধক্যের একটি চিহ্নমাত্র। কোন ডাক্তার যদি খেয়াল করেন যে ঞ-র প্রাচুর্যের কারণে মৃত্যু ঘটছে, তাহলে মনে করতে পারেন যে এটা হয়তো কোন ধরণের বিষ। তারপর হয়তো ঞ-র সাথে দৈহিক সমস্যার যোগসূত্র খুঁজতে খুঁজতে মাথা খারাপ করে ফেলবেন। কিন্তু বিষয়টা তো আদতে তা নয়, ডাক্তার খামাখাই সময় নষ্ট করছেন!
আবার, এই শরীরেই এমন আরেকটি পদার্থ ঙ থাকতে পারে, যা তারুণ্যের চিহ্ন। অর্থাৎ বুড়োদের চাইতে তরুণদের শরীরে ঙ-র ঘনত্ব বেশি থাকে। একইভাবে বলা যায়, এমন জিন নির্বাচিত হবে যারা ঙ-র উপস্থিতিতে ভালো প্রভাব ফেলে আর ঙ-র অভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। আমরা এই ঞ অথবা ঙ আসলে কী, তা না জেনেই অনুমান করতে পারি যে এরকম পদার্থগুলোর পরিমাণ কম বেশি করে বুড়ো শরীরকে আমরা যতোটা তরুণ শরীরের মতো বানিয়ে রাখতে পারবো, ততোই তার আয়ু বেড়ে যাবে।

আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে এগুলো মেডাওয়ারের তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে কিছু অনুমান মাত্র। এটা ঠিক যে, মেডাওয়ারের তত্ত্বে অবশ্যই কিছু না কিছু যৌক্তিক সত্য আছে। কিন্তু তার মানে এই না যে জরা ও বার্ধক্যজনিত ক্ষয়ের যে কোন বাস্তব উদাহরণের পেছনে এটাই একমাত্র সঠিক ব্যাখ্যা। যা প্রাসঙ্গিক, তা হলো মানুষ বুড়ো হলে মরে যেতে থাকে, এই সত্যের সাথে আমাদের জিন-নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন প্রস্তাবের কোন বিরোধিতা নাই। এই অধ্যায়ের যুক্তির মূলে একক প্রাণীর মরণশীলতার যে ধারণা, তা তত্ত্বের কাঠামোর ভিতরে থেকেই প্রতিপাদন করা যায়।

অন্য যে অনুমানকে আমি একটু পাশ কাটিয়ে গেছি, যৌন জনন ও ক্রসিং-ওভারের অস্তিত্ব, তা প্রতিপাদন করা আরেকটু কঠিন। ক্রসিং-ওভার সবসময় হতেই হবে এমন কোন কথা নেই। পুং ফ্রুট-ফ্লাইয়ে ক্রসিং-ওভার ঘটে না। নারীদেহেও এমন একটি জিন আছে যার প্রভাবে ক্রসিং-ওভার বাধা পায়। যদি মাছির জিনগুলো সর্বজনীন থাকে, সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখে চাষ করে জনসমষ্টি গড়ে তোলা হয়, তাহলে ‘ক্রোমোজোম-সমষ্টির’ এক একটি ক্রোমোজোমই হয়ে উঠবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের অবিভাজ্য একক। এক্ষেত্রে আমরা যদি আমাদের সংজ্ঞার দিক থেকে চিন্তা করি, তাহলে একটি পুরো ক্রোমোজোমকেই একটা ‘জিন’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবো।

আবার দেখুন, লিঙ্গের বিকল্পও আছে। স্ত্রী সবুজ-মাছি পিতৃহীন জীবিত স্ত্রী-সন্তানের জন্ম দিতে পারে, যাদের সবার মধ্যে তার মায়ের সকল জিন অক্ষত অবস্থায় থাকে। (ঘটনাক্রমে মায়ের জঠরে ভ্রূণের ভিতরে আরেকটা ভ্রূণ থাকতে পারে। সুতরাং বলা যায় স্ত্রী সবুজ-মাছি একইসাথে মেয়ে ও নাতনিকে জন্মদান করে, দু’জনই অভিন্ন-যমজের সমতুল্য।) অনেক উদ্ভিদ চোষকের সাহায্যে অঙ্গজ ভাবে (vegetatively) বংশবিস্তার করে। একে প্রজননের চেয়ে বৃদ্ধি বলা ভালো; আরেক দিক দিয়ে দেখলে অঙ্গজ জননের সাথে দৈহিক বৃদ্ধির খুব বেশি পার্থক্য নেই, দুইটাই যেহেতু মাইটোটিক কোষ বিভাজনের মাধ্যমে ঘটে। মাঝে মাঝে অঙ্গজ জননে উৎপন্ন উদ্ভিদ তার ‘অভিভাবক’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্য ক্ষেত্রে, যেমন দেবদারু গাছের বেলায় যোগসূত্র (suckers) বজায় থাকে। আসলে পুরো দেবদারু বনকেই এক অভিন্ন একক হিসেবে চিন্তা করা যায়।

এখন প্রশ্ন হলো, যদি সবুজ মাছি বা দেবদারু গাছ না করে, তাহলে আমরা কেন এতো ঝামেলা করে অন্যের জিনের সাথে নিজেদের জিন মিশিয়ে সন্তান জন্ম দেই? মনেই হচ্ছে পদ্ধতিটা বেশ খাপছাড়া। বিপরীত লিঙ্গের যৌন জনন, সেই আদি এবং সরাসরি অনুলিপিকরণ থেকে সরে এসে এই উদ্ভট বিকৃতির আদৌ কী দরকার ছিলো? লিঙ্গের সুবিধাটা কী?

বিবর্তনবাদীর জন্যে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া অসম্ভব কঠিন কাজ। এই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে সবচেয়ে চিন্তাশীল পথটি গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার পথ। কেবল একটা বিষয় উল্লেখ করে আমি এই পথটি এড়িয়ে যাবো। সেটা হলো লিঙ্গের বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাত্ত্বিকরা মুশকিলে পড়েন তার কারণ তারা অভ্যাসবশত ধরে নেন যে একক প্রাণী নিজের সর্বোচ্চ জিন বাঁচাতে সচেষ্ট। এভাবে বললে, লিঙ্গ স্ববিরোধী আচরণ করছে বলে মনে হয়। কারণ একজনের পক্ষে নিজের জিন প্রবাহিত করার জন্যে এটি এক ‘অকার্যকর’ পদ্ধতি। প্রত্যেক সন্তানকে সে মাত্র ৫০ ভাগ জিন দিতে পারছে, বাকি ৫০ ভাগ আসছে যৌন-সঙ্গীর কাছ থেকে। যদি কেউ সবুজ মাছির মতো কেবল নিজের অনুলিপি জন্ম দিতো, তাহলে সে নিজের জিনের ১০০ ভাগই পরের প্রজন্মের প্রত্যেক সন্তানের মাঝে দিয়ে যেতে পারতো। এই আপাত-স্ববিরোধ কোন কোন তাত্ত্বিককে গোষ্ঠী-নির্বাচনবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কারণ গোষ্ঠী পর্যায়ে যৌন জননের সুবিধা চিন্তা করা সহজতর। যেভাবে ডব্লিউ. এফ. বডমার সংক্ষেপে বলেছেন, লিঙ্গ ‘ভিন্ন ভিন্ন মানুষ থেকে উৎপন্ন উপকারী পরিব্যক্তিকে একজন মানুষের মধ্যে পুঞ্জীভূত করতে সাহায্য করে’।

কিন্তু এই স্ববিরোধকে খুব একটা স্ববিরোধ বলে মনে হয় না, যদি এই বইয়ের যুক্তিকে আপনি গ্রহণ করেন। আমার যুক্তিতে একজন মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী জিন তৈরির ক্ষণস্থায়ী যন্ত্র হিসেবে চিন্তা করতে হবে। তখন একক প্রাণীর দৃষ্টিতে ‘কার্যকারিতা’র বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। যৌন জনন বনাম অযৌন জনন তখন কেবলই একটি বৈশিষ্ট্য, যা একটি মাত্র জিন দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যেমন নীল চোখ বনাম খয়েরি চোখ জিন-নিয়ন্ত্রিত একটি বৈশিষ্ট্য, ঠিক তেমনি। নিজের স্বার্থপর উদ্দেশ্য সাধনে যৌন জননের জিন অন্য সব জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে। ক্রসিং-ওভারের জন্যেও একটি জিন এমন কাজ করে। মিউটেটর নামের এমন কিছু জিনও আছে যাদের কাজ হলো অন্য জিনের নকল-বিভ্রাটের হার নিয়ন্ত্রণ করা। সংজ্ঞানুযায়ী, নকল-বিভ্রাটের কারণে একটি জিনের ক্ষতি বা বিনষ্টি হতে পারে। কিন্তু যদি এই বিভ্রাটের ফলে স্বার্থপর মিউটেটর জিনের উপকার হয়, তাহলে সেটি তা ঘটতে দেয় এবং জিন-সমষ্টির ভিতরে ছড়িয়ে পড়তে দেয়। একইভাবে, ক্রসিং-ওভারের কারণে যদি কোন জিনের উপকার ঘটে, তাহলে সেই ক্রসিং-ওভার প্রক্রিয়াও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। আর এই মত অনুযায়ী, যদি প্রজননের পদ্ধতি হিসেবে অযৌনের চাইতে যৌন প্রক্রিয়ায় জিনের সুবিধা হয়, তাহলে সেই পথই বেছে নেয়া হয়। বাকি সব জিনের জন্যে সেটা উপকারী কি না, সেটা আদৌ জরুরি না। এই স্বার্থপর জিনের চোখে দেখলে, যৌন জনন একেবারেই বিচিত্র কিছু না।

এই যুক্তিটি আশঙ্কাজনক ভাবে বৃত্তাকার যুক্তির কাছাকাছি চলে আসে – যেহেতু আমরা যৌন জননের অস্তিত্বকে তর্কের পূর্বশর্ত ধরে নিয়েছি, সেহেতু জিনকে নির্বাচনের একক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আমি মনে করি এই বৃত্তাকার পথ থেকে বেরুনোর অনেকগুলো রাস্তা আছে। কিন্তু এই বইয়ের আলোচ্য বিষয় তা নয়। লিঙ্গ এবং যৌন জনন আছে, ঘটে। এটুকু সত্য। লিঙ্গ এবং ক্রসিং-ওভার থেকেই ক্ষুদ্র জিনগত একক বা জিনের প্রসঙ্গ আসছে, যাকে আমরা বিবর্তনের মৌলিক ও স্বাধীন এককের কাছাকাছি বস্তু হিসেবে গণ্য করছি।

যখন থেকে আমরা স্বার্থপর জিনের দৃষ্টি থেকে চিন্তা করতে শুরু করবো, তখন লিঙ্গের মতো আপাত-স্ববিরোধী আরো কিছু বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠবে। যেমন ধরুন, যে কোন প্রাণী বা উদ্ভিদের দেহ গঠনে যতোগুলো ডিএনএ প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক ডিএনএ তাদের শরীরে থাকে। এই ডিএনএ’র একটি বিরাট অংশ কখনই আমিষ গঠনে অংশ নেয় না। কেবল ওই প্রাণী বা উদ্ভিদের দিক থেকে দেখলে এই ব্যাপারটি বিভ্রান্তিকর। যদি ডিএনএ’র উদ্দেশ্যই হয় দেহ গঠনের কাজকে নিয়ন্ত্রণ করা, তাহলে এর এতো বড় অংশ কোন কাজকর্ম না করে অলস বসে আছে, এটা তো বিস্ময়কর। জীববিজ্ঞানীরা একসময় ভেবে ভেবে মাথার চুল পাকিয়ে ফেলেছেন, যে এই বাড়তি ডিএনএ আসলে কী কাজ করছে? কিন্তু স্বার্থপর জিনের দৃষ্টিতে দেখলে, এখানে কোন বিভ্রান্তিই নেই। এই বাড়তি ডিএনএ’র মূল কাজ হলো কেবল টিকে থাকা, এর বেশিও না, কমও না। এই উদ্বৃত্ত ডিএনএকে খুব সহজে পরজীবীর সাথে তুলনা করা যায়। কিংবা একজন নিরাপদ কিন্তু অকেজো যাত্রী হিসেবে কল্পনা করতে পারেন, যে অন্য ডিএনএ’র তৈরি গাড়িতে লিফট নিচ্ছে।

অনেকে বিবর্তনের এই অতিমাত্রায় জিন-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আপত্তি তুলেন। তাদের মতে, আসলে তো একক প্রাণীটিই নিজের সমস্ত জিনসহ বেঁচে থাকে বা মারা যায়। আশা করি, এই অধ্যায়ে আমি যা বলেছি তাতে এটা স্পষ্ট হবে যে তাদের মতে আমার দ্বিমত নেই। যেভাবে একটি সম্পূর্ণ নৌকা জিতে বা হারে, ঠিক সেভাবে একক প্রাণী বেঁচে থাকে বা মারা যায়। আর প্রাকৃতিক নির্বাচনের তাৎক্ষণিক প্রয়োগ প্রায় সবসময়ই একক প্রাণীর স্তরেই ঘটে থাকে। কিন্তু এমন নির্দিষ্ট একক প্রাণীর মৃত্যু ও প্রজনন-সাফল্যের কারণে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, সেটি মূলত জিনসমষ্টিতে জিনের সংখ্যাকেই প্রভাবিত করে। আদি অনুলিপিকারকের সংরক্ষণে আদিম-সুপ যে ভূমিকা পালন করতো, এখন জিনসমষ্টিও আধুনিক অনুলিপিকারকের জন্যে সেই ভূমিকা পালন করছে। লিঙ্গ এবং ক্রোমোজোমের ক্রসিং-ওভার আদিম-সুপের তারল্য বজায়ে রাখার ক্রিয়া সম্পন্ন করছে। এদের কারণে জিনসমষ্টিতে ক্রমাগত মিশ্রণ ঘটছে, জিনগুলো আংশিকভাবে অদল-বদল হচ্ছে। বিবর্তন হলো এমন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কিছু জিনের সংখ্যা একটু বেড়ে যাবে, আর বাকি জিনগুলোর সংখ্যা জিনসমষ্টিতে একটু কমে যাবে। এখন থেকে যখনই কোন বৈশিষ্ট্যের বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে হবে, যেমন পরার্থপরতার আচরণ বা এরকম কিছু, তখন এইভাবে বলার অভ্যাস করা ভালো – “জিনসমষ্টিতে জিনের সংখ্যার ওপরে এই বৈশিষ্ট্যের কী রকম প্রভাব পড়বে?” মাঝে মাঝে জিনের ভাষা একটু ক্লান্তিকর, একঘেয়ে লাগতে পারে, তখন সেটাকে প্রাণবন্ত করে তুলতে আমরা রূপকের ব্যবহার করতে পারি। পাশাপাশি রূপকগুলোর ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে, যেন দরকার পড়লেই সেখান থেকে আমরা জিনের ভাষায় ফিরে আসতে পারি।

জিনের দিক থেকে জিনসমষ্টি মূলত নিজের আবাসস্থলের ভিতর নতুন ধরনের সুপ ছাড়া কিছুই না। এই সুপে অর্থাৎ সমষ্টিতে জিনগুলো বসবাস করে। আদিম অবস্থার খুব একটা বদল ঘটে নি, যা বদলেছে, তা হলো এখন একটি জিন একই জিনসমষ্টি থেকে নেয়া অন্য জিন-সহচরের দলবল নিয়ে একটার পর একটা জীবিত-যন্ত্র তৈরি করে যাচ্ছে। পরের অধ্যায়ে আমরা দেখবো জিনসমূহ কীভাবে এই যন্ত্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করছে।

============
(তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত)

About the Author:

একটি মন্তব্য

  1. হেলাল মার্চ 26, 2011 at 9:07 পূর্বাহ্ন - Reply

    @আন্দালিব,
    চল্লিশের আগে প্রজনন নিষিদ্ধ করে দিতে পারি। কয়েক শতাব্দী পরে এই সর্বনিম্ন বয়সের সীমা বাড়িয়ে পঞ্চাশ করে দেয়া যায়, এভাবে চলতে থাকবে। অনুমান করতে পারি যে এভাবে মানুষের আয়ু কয়েকশ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব
    দারুণ আইডিয়া। জনসংখ্যাও কমে আসত দ্রুত।
    যথারীতি অসাধারণ অনুবাদ।
    আশা করি নিয়মিত আপনার লেখা পাব। :clap

মন্তব্য করুন