মনোবিজ্ঞানী বি. এফ. স্কিনার। অল্প কয়জন মনোবিজ্ঞানীর নাম নিতে গেলেও যার নাম অবধারিতভাবেই চলে আসে। প্রাণী আচরণ নিয়ে গবেষণা করতেন তিনি। ২০০২ সালে Review of General Psychology-এর একটি জরিপে স্কিনার বিংশ শতাব্দির সবচেয়ে প্রভাবশালী মনোবিজ্ঞানী হিসেবে নির্ণীত হন। ১৯৯০ সালে তার মৃত্যু হয়। একই বছর The Behavior Analyst-এ তার To Know the Future লেখাটি প্রকাশিত হয়। বর্তমান লেখাটি সে লেখারই অনুবাদ।

বার্ট্রান্ড রাসেলের জীবনের দু’টি মহৎ লক্ষ্যের একটি ছিল জ্ঞানের পরিধিকে জানা। অন্তত তেমনটাই রাসেল একবার বলেছিলেন। সেরকমভাবে যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আমি বলবো, জাননেওয়ালা বলতে আসলে কি বোঝায়, সেটা উদ্ধার করাটাই হল আমার জীবনের অন্যতম মহৎ উদ্দেশ্য। রাসেলের দৃষ্টিতে প্রকৃতিটা প্রস্তুত হয়ে পড়ে থাকে রাসেলের জেনে নেওয়ার অপেক্ষায়। তিনি এখন প্রকৃতি সম্পর্কে জানবেন কি জানবেন না, সেটা একান্তই যেন তার নিজের ব্যাপার। কিন্তু ব্যাপারটা হয়তো উল্টো। হয়তো প্রকৃতিই আসলে হাতে ধরে জ্ঞানটা শেখায়।

এ ধরনের বিপরীত দিক থেকে চিন্তা করার একটা উৎস খুঁজে পাওয়া যায় জেনেটিক্সে। আমরা একটা বাচ্চাকে বলি মায়ের সন্তান; মানে এটা তার নিজের সন্তান, তার নিজের উৎপাদন। এর মত অন্য কিছু কখনো ছিল না। যদিও সত্যি কথাটা হল এই যে, বাচ্চাটার কোন বৈশিষ্ট্যের কৃতিত্বই তার মায়ের নয়। । বাচ্চাটাকে কেবল অর্ধেক জিন দান করেছে সে, তবে সেটা সে একইভাবে পেয়েছে তার নিজের বাবা মায়ের কাছ থেকে। (আর এর মধ্যে কোন প্রকার তারতম্য যদি কিছু হয়ে থাকে, সেটা কেবলই দৈবাৎ)। আমরা প্রজাতিকূলের বিবর্তনগত উৎপত্তির কথা যতটা জানি, প্রাণীর আচরণের উৎসের ব্যাপারে যদি ততটাই জানা যেত, জ্ঞানের পরিধি আবিষ্কারকদের ক্ষেত্রেও তখন মা-সন্তানের ক্ষেত্রের মত একটা উপমা ব্যবহার করা সম্ভব হত।

জ্ঞান তিন ধরনের নির্বাচন আর তারতম্যের মাধ্যমে জাননেওয়ালার কাছে ধরা দেয়। প্রথমটা প্রাকৃতিক নির্বাচন, যার মাধ্যমে প্রজাতির আচরণ গঠিত হয়। এর মাধ্যমে মানুষ থেকে শুরু করে সকল পশু টিকে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ করে। দ্বিতীয় উপায়ের কারণে একটা সত্তা তার জীবদ্দশায় জ্ঞান-আহরণ করে। এই দ্বিতীয় ধরনটা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মত এত স্পষ্ট করে আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারি নি। তবে এর পর্যবেক্ষণগত ও পরীক্ষামূলক গবেষণা প্রাকৃতিক নির্বাচনের চেয়ে অনেক সহজ এবং আমরা এ ব্যাপারে অনেককিছুই ইতোমধ্যে জেনেছি। আর তৃতীয় উপায়টা একটু ভিন্ন ধরনের। এই উপায়ে জ্ঞান আসে সামাজিক পরিবেশের বিবর্তনের মাধ্যমে, যাকে আমরা বলি সংস্কৃতি। এর মাধ্যমে একটা সত্তা অন্য আরেকটা (হয়তো ভিন্ন সময়ে বেঁচে থাকা) সত্তার অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান-আহরণ করতে পারে। রাসেল যাকে জ্ঞান বলেন, তার একাংশ আসে প্রকৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়ার ফলে, যাকে বলা যায় “অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান”। বাকিটা শেখা হয় অন্যদের শেখা থেকে ধার করে, অর্থাৎ সেটা “বর্ণনামূলক জ্ঞান”।

বিজ্ঞানী ও বিদ্বান পণ্ডিতগণের অধিকাংশের জ্ঞানই বর্ণনামূলক জ্ঞান। দর্শন আর গণিত নিয়ে রাসেল যা কিছু জানতেন, তার একটা ক্ষুদ্র অংশ হল অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান। স্যামুয়েল বাটলার একবার বলেছিলেন, একটা ডিম আরও ডিম উৎপাদনের নিমিত্ত হিসেবে মুরগিকে ব্যবহার করে। আধুনিক পরিভাষায় – একটা সত্তা হল তার জিনের দাস। একইভাবে আমরাও বলতে পারি, দর্শন আর বিজ্ঞানের সংস্কৃতি যাতে এমন আরও আরও সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে রাসেল হলেন সেটার নিমিত্তমাত্র। এ ধরনের কথা অবশ্য রাসেল মহাশয়কে নিয়ে বলার চেয়ে একটা মুরগিকে নিয়ে বলাটাই বেশি সহজ। কারণ আমরা প্রজাতিকূলের উৎপত্তি বা বিবর্তন নিয়ে অঢেল জানি, কিন্তু আচরণের উৎস নিয়ে সে অনুপাতে কিছুই জানি না (এবং একইভাবে আমরা জিন ও ক্রোমজোম নিয়ে অনেক জেনে গেলেও সে অনুপাতে, জটিলতার বিচারে, মস্তিষ্ক নিয়ে তেমন কিছুই জানি না)। আমরা যে মনে করি, ডিমকে মুরগি ব্যবহার করে আরেকটা মুরগি তৈরি করতে, বাটলার সে ধারণাটাকে ঠিক উল্টে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃত কথাটা হল যে ডিম-মুরগি-ডিম-মুরগি-ডিমের একটা অবিরাম ধারা বিরাজ করছে। একইভাবে বিরাজ করছে ব্যক্তি-সংস্কৃতি-ব্যক্তি-সংস্কৃতি-ব্যক্তির একটি অবিরাম ধারা। সত্তা এখানে অপরিহার্য। মুরগি না থাকলে আর কোন ডিমও তৈরি হবে না, দার্শনিক না থাকলে তৈরি হবে না আর কোন দর্শন। কিন্তু কালাতিক্রম করে যে বস্তুগুলো টিকে থাকে, তা হল কেবল জিন আর সংস্কৃতি।

উপমাটা মুরগির চেয়ে রাসেলের ক্ষেত্রে মেনে নেয়াটা আরও একটা কারণে কঠিন। এতে যেটা হয়, একজন সত্তাকে সামান্য একটা বস্তু হিসেবে কল্পনা করা হয়, যার উপর ঘটনা কেবল ঘটে যেতে থাকে। মুরগির ক্ষেত্রে ঘটে টিকে থাকার সংগ্রাম এবং তার সাথে হয়তো একান্ত দৈবক্রমে তার প্রজাতির বিবর্তনে কিঞ্চিৎ অবদানের মত ঘটনা ঘটে যায়। রাসেলের ক্ষেত্রেও একইভাবে টিকে থাকার সংগ্রাম ঘটতে থাকে। আর তার সাথে একটা দুর্ঘটনার মত করে দর্শন আর গণিতের বিবর্তনে অবদানের একটা ঘটনা ঘটে যায়। রাসেলের অবদান যে প্রকৃতির সাথে তার মিথস্ক্রিয়ার একটা বিশেষ তারতম্যের ফল, এমনটা ভাবতে আমাদের ভালো লাগে না। আমরা ভাবি, নিশ্চয়ই রাসেলের অবদান তার থেকে বেশি কিছু। আমরা ভাবতে পছন্দ করি, রাসেলের অবদান তার নিজের ভিতর থেকেই উৎসারিত। তেমনটা আমরা আমাদের নিজেদের ব্যাপারেও ভাবি। আমরা মনে করি, যা কিছু আমরা করি, তা আমাদের নিজেদের ভেতর থেকেই শুরু হয়। আমরা মনে করি রাসেল সত্তাটি নিজ থেকেই কিছু সৃষ্টি করেছিলেন এবং তার জন্যে যথাযথ স্বীকৃতি তার প্রাপ্য। বিবর্তনকে আমরা প্রজাতি উৎপত্তির তত্ত্ব হিসেবে মেনে নিলেও একেকজন সৃষ্টিশীল ঈশ্বর হিসেবে জন্ম বলেই আমরা নিজেদের ব্যাপারে ভাবতে পছন্দ করি।

একজন ঈশ্বর আমাদেরকে জেনেসিসের বর্ণনানুসারে তৈরি করেছেন, এমনটা কল্পনা করাও কিন্তু আমাদের জন্যে সহজ। আলোর দুটো শ্রেষ্ঠ উৎস হিসেবে চন্দ্র ও সূর্যের উৎপত্তি, সেখান থেকে জল, স্থল, উদ্ভিদ, ফল এবং সবশেষে প্রাণী – স্ত্রী ও পুং। তুড়ি দিয়ে সৃষ্টির ক্ষমতা যদি আমাদের থাকতো, জগতটা কিন্তু আমরা এভাবেই তৈরি করার কথা ভাবতাম। এর থেকে অযুতগুণে কঠিন একটি বিগ ব্যাং থেকে সবকিছু সৃষ্টির কল্পনা করা, যেখান থেকে কতগুলো নিরন্তর সূত্রের প্রবাহমানতায় বাকি সবকিছু – ছায়াপথ, নক্ষত্র আর গ্রহ তৈরি হবে, আর গ্রহগুলোর মধ্যে কোথাও প্রাণের উৎপত্তির জন্য দৈবক্রমে একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, সেখান থেকে ঘটবে বিবর্তন আর তৈরি হবে জটিল থেকে জটিলতর প্রাণী। আমরা এভাবে সৃষ্টির কথা কল্পনা করতাম না। আমরা কোনকিছুই এ পন্থায় তৈরি করি না, কিন্তু মহাকাশবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান আর জৈবরসায়ন জগতের উৎপত্তির ব্যাপারে এমন তথ্যই আমাদের দিচ্ছে।

আমরা ভেবে এসেছি যে মানুষ সৃজনশীল কারণ তার মন আছে। মন ভৌতজগতের ঊর্ধ্বে, “আধিবিদ্যক”, ফলে এর কোন ভৌত সীমাবদ্ধতা নেই। গত দু হাজার বছর ধরে দার্শনিক এবং মনোবিজ্ঞানীরা অন্তর্দশনের মাধ্যমে তাদের নিজেদের মনকে বোঝার চেষ্টা করে গেছেন, কিন্তু তাদের এই দেখা নিয়ে তারা কখনোই একমতে পৌঁছাতে পারেন নি। অনেক মনোবিজ্ঞানী তাই মনের অন্তর্দশনকে পরিত্যাগ করে তত্ত্বের উপর নির্ভর করা শুরু করেছেন। যেকোন একটা সৃজনশীল কর্মের ব্যাখ্যামূলক তত্ত্ব প্রদান করা মোটেও কঠিন ব্যাপার না, কিন্তু কঠিন ব্যাপারটা হল তত্ত্বের যাচাই, আর সে কারণে মনোবিজ্ঞানীরা ঝুঁকতে থাকলেন মস্তিষ্ক-বিজ্ঞানের দিকে।

মনকে মস্তিষ্কের একটা “কর্ম” বলেই মনে হয় এবং এ কারণে একে ব্যক্তি-নিরপেক্ষভাবে যাচাইও করা সম্ভব। মস্তিষ্ক শরীরের একটা অংশ মাত্র। ফলে মনকে বলা যায় শরীরের একটা অংশের কর্ম মাত্র। পুরো শরীরের কর্ম উপরে বলেছি তিন ধরনের নির্বাচন আর তারতম্য দ্বারা নির্ধারিত হয়। মস্তিষ্ক যেহেতু পদার্থবিজ্ঞান আর রসায়নের সূত্র মেনে চলা একটা কাঠামো, একে তাই একটা বিশেষ সৃষ্টিক্ষমতাসম্পন্ন কিছু মনে করার সুযোগও কম। (আমরা যেমনটা করি, আমাদের কর্মের কোন একটা কিছুকে ব্যাখ্যা করতে না পারলেই তাকে একটা বিশেষ সৃজনশীল বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করি, তবে বিজ্ঞানের এটাই বৈশিষ্ট্য যে এর প্রতিটি নতুন আবিষ্কারের সাথে আমাদের চির প্রত্যাশিত ও কল্পিত বিষয়গুলোর অস্তিত্বের সম্ভাবনা একটু একটু করে কেবল হ্রাস পায়।)

আমরাই আমাদের নিজেদের আচরণের সূত্রপাতকারী (এবং ফলশ্রুতিতে এ ব্যাপারে আমরা দায়বদ্ধও), এমনটা অত্যন্ত দৃঢতার সাথেই আমরা বিশ্বাস করি। এর কারণ আমরা কি করি সে ব্যাপারে আমরা সচেতন থাকি, এবং নির্বাচন আর তারতম্যের ইতিহাসই যে আমাদের বিভিন্ন কর্মের জন্যে দায়ী সে ব্যাপারটা আমরা ভুলে থাকি। তবে এমনটা বিশ্বাস করার সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত এটাই যে এমনটাই আমাদেরকে সবসময় বলে আসা হয়েছে। এটা করা হয়েছে একটা ব্যবস্থায় প্রচলিত পুরস্কার আর শাস্তিগুলোকে বৈধ করার জন্যে। আমরা যখন কাউকে আঘাত করি কিংবা সরকারি আইন ভঙ্গ করি, আমাদেরকে তখন আমাদের হেন কর্মের জন্যে দায়ী সাব্যস্ত করে শাস্তি প্রদান করা হয়। আমাদের পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে কর্মের ব্যাপারে আমাদের দায়বদ্ধতাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়, যেমন, কারও জন্যে কাজ করলে বিনিময়ে আমাদের বেতন দেয়া হয়। ধর্মের আইন ভাঙ্গলে শাস্তির ভয় দেখানো হয়, মেনে চললে দেয়া হয় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি। আমাদেরকে আমাদের কর্মের জন্যে দায়ী সাব্যস্ত করে পুরস্কার বা শাস্তি এ কারণেই দেয়া হয় যে আমদের দ্বারা যা ঘটে, যার জন্যে প্রকৃত অর্থে আমাদের জিনগত, ব্যক্তিগত আর সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার ইতিহাসই দায়ী, সেগুলো আমাদের আয়ত্ত্বের বাইরে। (মজার ব্যাপার হল, আমাদের যে প্রাত্যাহিক জীবনের পুরস্কার/তৃপ্তি আর শাস্তি/অতৃপ্তির ঘটনা, সেখানে কিন্তু আমরা নিজেদের দায়ের প্রশ্ন তুলি না। যেমন, কোন কিছু খেতে সুস্বাদু হলে আমরা সেটা আবার খাই। বিস্বাদ হলে অতৃপ্ত হই, সেটা আর খাই না। তখন কিন্তু আমরা বলি না যে আমরাই আমাদের এই খাওয়া না খাওয়ার আচরণের জন্যে দায়ী। খাবারটাই তখন আমাদের আচরণের জন্যে দায়ী হয়। কেবল রাষ্ট্র, শিল্প কারখানা আর ধর্ম যখন আমাদের আচরণের উপর প্রভাবমূলক নিয়মনীতি চাপিয়ে দেয়, ওই নিয়মনীতি নয়, বরং আমরাই তখন আমাদের আচরণের জন্যে দায়ী সাব্যস্ত হই। যারা চাপায়, তারা কিন্তু মাঝখান দিয়ে সুন্দর তাদের নিজেদের দায়টা এড়িয়ে চলে।)

কৃতকর্মের আলাপের ক্ষেত্রে এটা ভাবাটা সহজ হলো যে আমরা কেবল এক ধরনের বস্তু যার উপর ঘটনা ঘটে যেতে থাকে। কিন্তু এই ভাবনাটা অনেক বেশি আতঙ্কাজনক হয়ে দাঁড়ায় যখন আমরা ভবিষ্যতের করণীয় নিয়ে ভাবতে বসি। বিবর্তন তত্ত্বের প্রথম সারির শিকার হল একটা পরিকল্পিত জগতের ধারণা। একটা জীবন বা সংস্কৃতি একটা বিশেষ পরিকল্পনা মাফিক এগুতে পারে এমন ভাবনাও একই ভাগ্য বরণ করতে চলেছে। ঘটনীয়ের একটা বিরাট অংশ নির্ভর করবে দৈব নির্বাচন আর অদেখা তারতম্যের উপর। ভবিষ্যতটা হল অনিশ্চয়তার একটা ফলাফল, তাই ভবিষ্যত নিয়ে আলাপ করতে গেলে আশঙ্কিত হতেই হয়। যে দূষিত, জনাকীর্ণ, দারিদ্রতাপূর্ণ ভবিষ্যত আমাদেরকে হুমকির মুখে ফেলছে, তার অল্পই পরিকল্পিত ছিল। এই ভবিষ্যত বরং অনিবার্য বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে, এবং এর জন্যে দায়ী হচ্ছে বিবর্তনে নির্বাচন আর তারতম্যের প্রক্রিয়ার একটি দুর্লঙ্ঘনীয় ত্রুটি। সেই ত্রুটিটা হল এই যে, বিবর্তন একটি প্রজাতিকে, একটি সত্তাকে বা একটি সংস্কৃতিকে কেবল সেই ভবিষ্যতের পরিবেশের জন্যেই সক্ষম করে তোলে, যে রকমের পরিবেশে তারা অতীতে সফলভাবে টিকে গেছে। পরিবেশের পরিবর্তন ঘটলে, একটা প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। একটা পরিবেশে অর্জিত আচরণ অন্য পরিবেশে আর কার্যকর নাও থাকতে পারে। জগতের একটা অংশে বা অবস্থায় সমৃদ্ধিলাভ করা সরকার, শিল্প কারখানা বা ধর্মব্যবস্থা অন্য অবস্থায় সমৃদ্ধিলাভ নাও করতে পারে। যেমন, পৃথিবীর ইতিহাসে একটা সময়ে প্রজননগত আচরণের একটা মূল্য ছিল টিকে থাকার প্রেক্ষিতে। সে মূল্য আমাদের কেবল প্রজাতিগতভাবেই ছিল না, যে সংস্কৃতি এমন আচরণের কদর করেছে, তার কাছেও এই মূল্য যুক্ত হয়েছে। কিন্তু পৃথিবী এখন জনাকীর্ণ হয়ে গেছে, এর মূল্য তাই বদলেছে। ইতিহাসের একটা পর্যায়ে খাদ্য ঘাটতির সময়গুলোতে কাজে লাগানোর জন্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণ মজুদ করার আচরণের একটা শক্তিশালী বিবর্তনগত মূল্য ছিল। কিন্তু এখন এটা কেবল অপচয় আর দূষণ তৈরি করে। একটা সময়ে ধর্ম-বিশ্বাস মানুষকে জন্ম-মৃত্যু সংক্রান্ত জটিল সব প্রশ্নে উত্তরের নিশ্চয়তা দিয়ে আশ্বস্ত করে রেখেছিল। এখন সে মানুষকে তার ভবিষ্যত সম্পর্কে আরও কার্যকর প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে বাঁধা দিচ্ছে।

আমরা আমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে যতটুকু জানি, তার প্রায় পুরোটাই এসেছে বিজ্ঞান থেকে। বিজ্ঞান বলে আমরা দূষণ, ঘাটতি এবং জনবিস্ফোরণ দ্বারা আক্রান্ত হতে চলেছি। এর অনেকটা ইতোমধ্যেই বর্তমান; আমরা আমাদের সেই ভবিষ্যতটায় ইতোমধ্যেই কিছুটা ঢুকে গেছি। কেবল বিজ্ঞানের মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি, এই ভবিষ্যত কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে। কেবল বিজ্ঞানই আমাদেরকে সৌর বা নিউক্লিয়ার বিকিরণের সমসাময়িক বিপদগুলো সম্পর্কে জানায়। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রায় পুরোটাই বর্ণনামূলক জ্ঞান, যা পূর্বাভাস-নির্ভর এবং ফলতঃ অনেকটা কম নির্ভরযোগ্য । ফলে একটা মৌলিক পার্থক্যের নির্দেশ প্রয়োজন।

আমরা প্রকৃতির উপরে ক্রিয়া সাধনের মাধ্যমে অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান লাভ করি। আমরা সেই জ্ঞানকে ধারণ করি পরবর্তী ক্রিয়াসমূহ সাধনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক একটি আচরণ হিসেবে একে রপ্ত করে। আমরা বর্ণনামূলক জ্ঞান লাভ করি যখন অন্য কারও মাধ্যমে আমরা প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারি। সেই জ্ঞানকে আমরা ধারণ করি অন্যের বা নিজের কাছে বর্ণনাটার পুনরুচ্চারণের মাধ্যমে। ফলে এই জ্ঞান সরাসরি ক্রিয়ায় ধৃত হয় না। এই জ্ঞানটা ক্রিয়ায় রূপান্তরিত হওয়ার জন্যে আরেক ধাপ পার হতে হয়। একই ধরনের পার্থক্য আমাদের কাছে ধরা দেয়, যখন আমরা একটা শহর সম্পর্কে পড়া বা শোনা (বর্ণনামূলক) জ্ঞানের সাথে নিজে দেখে, শুনে, ছুঁয়ে, স্বাদ আস্বাদন করে নেয়া (অভিজ্ঞতামূলক) জ্ঞানের তুলনা করি। সে শহরে যতই থাকি, পার্থক্যটা ততই বড় হয়। এখন কিভাবে আমরা আমাদের অনাগত ভবিষ্যতকে মোকাবিলা করব, যেখানে ভবিষ্যতটাকে আমরা জানি কেবলমাত্র বর্ণনামূলক জ্ঞানের মাধ্যমে?

এখন আমাদের কি করা উচিত, এমন প্রশ্ন কিন্তু অসঙ্গতিপূর্ণ। আমরা কি করতে যাচ্ছি ভবিষ্যতে, কেবলমাত্র এই প্রশ্নটাই আমরা এখানে করতে পারি। আর আমাদের ভবিষ্যত ক্রিয়া নির্ভর করে আমাদের জিনগত ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের উপর। তবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের উপর নির্ভর করার এখানে কোন সুযোগ নেই। বর্তমানের পরিবর্তনের যে গতি, সেই গতির সাথে বিবর্তনগতভাবে তাল মিলিয়ে, ব্যাপক তেজস্ক্রিয়তা, ভয়ানক পানি কিংবা বায়ু দূষণের সাথে খাপ খেয়ে টিকে থাকা একটা প্রজাতিতে সহসাই অভিযোজিত হবার কোন আশা আমাদের নেই। নতুন সাংস্কৃতিক চর্চায় বিবর্তিত হওয়াটাই বরং অধিক সম্ভাবনাযুক্ত এবং এ ব্যাপারে আমাদের আশান্বিত হবার কিছু সুযোগ এখনই তৈরি হয়েছে। যদিও আমরা ক্রিয়ার সূচনা ঘটাতে পারি না, আমরা অন্তত ব্যাপারগুলো অবলোকন করে যেতে পারি।

ইতোমধ্যেই আমরা একটি অবিরাম বিবর্তিত সংস্কৃতিকে অবলোকন করছি, যেটাকে আমরা বলি বিজ্ঞান। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের ভবিষ্যত ফলাফল উদ্ঘাটন করে যাচ্ছে। আর শিক্ষক, লেখক এবং সংবাদমাধ্যম প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানের এই সকল উদ্ঘাটনকে আরও আরও সর্বজনগ্রাহ্য করে তুলছে। আমরা সরকারগুলোকে দেখতে পাচ্ছি, তারা অপব্যয়ীকে, পরিবেশ দূষণকারীকে শাস্তি দিচ্ছে, এবং অন্তত একটা ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি অধিক সন্তান গ্রহণকে শাস্তিযোগ্য করে তুলতে। এতে দেখে মনে হচ্ছে তারা ভবিষ্যতের প্রতিভূকেই যেন তৈরি করছে। ভবিষ্যতে আমরা আমাদের এসব আচরণের জন্যে (দূষণ, অধিক জনসংখ্যা) যে বিপাকে পড়তে যাচ্ছি, সেই ভবিষ্যত ফলাফল বা দুর্ভোগটাকেই যেন সরকারগুলো বর্তমানে প্রদান করছে প্রতিরোধমূলক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আকারে। ক’টা দিন আগেও একটা সরকারের পক্ষে অপ্রতুল নয় এমন সম্পদের ব্যবহারকে সীমাবদ্ধ করাটা ছিল নিজেদের ভবিষ্যতকেই বিপদাপন্ন করার নামান্তর। পূর্বে একটা শিল্প কারখানা যদি এমন পণ্য উৎপাদন করতো যেটা ব্যবহারে কিছুটা অসুবিধাজনক, কিন্তু যার ফলে পরিবেশের একটা অনুমিত দূষণের হার সামান্য কমে, তাতে তাদের বাজার হারানো ছাড়া কোন গতি ছিল না। যতদিন যাবৎ পৃথিবীতে সবার বসবাসের জন্যে যথেষ্ট স্থান ও রসদ ছিল, ধর্মগুলোর পক্ষে তাদের বিশ্বস্ততা হারানো ব্যতিরেকে জন্ম-মৃত্যু নিয়ে তাদের প্রচলিত বক্তব্যগুলো পাল্টানো সম্ভব ছিল না।

তবে অবস্থা বদলে গেছে। এমন পরিস্থিতি পূর্বে কখনোই তৈরি হয় নি। এ পরিবর্তন – সরকার, শিল্প কারখানা এবং ধর্ম থেকে ভিন্ন – একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। এখন ভবিষ্যত সম্পর্কে আমাদের লব্ধ জ্ঞানটা (অবশ্যই তা বর্ণনামূলক) অজস্র মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে, এবং যেসব সরকার, শিল্প কারখানা আর ধর্ম এই জ্ঞানকে তোয়াক্কা করে না, মানুষ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে একাট্টা হচ্ছে। বলা চলে, ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রচলিত চর্চা পরিবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করার মাধ্যমে আমরা আসলে ভবিষ্যত সম্পর্কে আমাদের বর্ণনামূলক জ্ঞানকে অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞানে পরিবর্তন করছি। এভাবে ভবিষ্যত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানটা যদি যথেষ্ট সংখ্যক মানুষের ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে হয়তো পৃথিবীটা আরেকটু বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে পারবে।

আমরা ঘটনার সূচনাকারী নই, আমরা বরং এমন বস্তু যার উপর ঘটনা ঘটে যায়, অনেকে এমন চিন্তাকে মানুষের আচরণের একটি হতাশাজনক ও নিরৎসাহিত দৃষ্টিভঙ্গি মনে করবেন। তারা বলবেন, আমরা আমাদের ভবিষ্যতকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো যদি আমরা এই বিশ্বাসেই স্থিত থাকি যে আমাদের ভাগ্য আমাদের হাতেই নির্ভর করে। এই বিশ্বাস বহু শতক ধরে টিকে থাকা একটি বিশ্বাস এবং এর ফলে হয়তো অনেক অর্জনও আমরা করেছি। কিন্তু সে সকল অর্জনই কিন্তু আমাদের কর্মের কেবল তাৎক্ষণিক পরিণতি। এখন ওগুলোর অন্যান্য পরিণতিও আমরা জেনে গেছি। আমরা জেনে গেছি যে ওগুলোর কারণে আমাদের ভবিষ্যত এখন আরও হুমকির সম্মুখীন। যে কর্মের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভাগ্যের এই দশা করেছি, সে কর্মকে আমরা হয়তো হিতোপদেশ হিসাবে আর রেখে যেতে চাইব না।

বি. এফ. স্কিনারের ছবি

[169 বার পঠিত]