পাণ্ডুলিপি পুন-লেখন

By |2011-03-06T15:17:50+00:00মার্চ 6, 2011|Categories: গল্প|24 Comments

গতকাল মধ্যরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল হঠাতই। দেখি, মাথার কাছে রহমান বসে। প্রথমটাই চিনতে পারি নি। পরে ও বৃত্তান্ত বলাই চিনতে অসুবিধে হল না। আমার কলেজ জীবনে শুরু করা একটা গল্পের নায়ক ছিল রহমান। গল্পটি মাঝ অব্দি লিখে ফেলে রেখেছিলাম। ঐ সময় কবি হওয়ার ঝোঁক মগজে এতটাই ঝেঁকে বসেছিল যে রহমানের ভবিষ্যৎ চাপা পড়ে রইল পুরানো নথি-পত্রের ভেতরে। আমি তখন কবি হওয়ার নেশায় নেশা ধরিয়েছি গাঁজায়। এ পাড়া সে পাড়া চষে জিরিয়ে নিয়েছি বেশ্যা পাড়ায়। পাগলামো বেড়েছে সংসারে, আঁতলামো বেড়েছে স্বভাবে। লোকে আমাকে খোর বলেছে, চোর বলেছে অনেকেই, কিন্তু কবি বলেনি কেউ। রহমানের অভিশাপে কি না জানি না, আমার আর কবি হওয়া হয়নি। গল্পে আবার ফিররো ফিরবো করে ফেরা হয়ে ওঠেনি। সংসারের চাপে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম রহমানকে।

গতকাল সন্ধ্যায় পুরনো কাগজ-পত্রগুলো বিক্রি করে দেবো ভেবে বারান্দায় ফেলে রেখেছিলাম, ওখান থেকেই সুযোগ বুঝে সটকে এসেছে রহমান।

এতদিন পরে এভাবে আবার রহমানের সাথে দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি। ওকে দেখে ভালোলাগার সাথে সাথে একধরনের শঙ্কাও কাজ করছিল ভেতরে ভেতরে। এতদিন পর ও কি চাই আমার কাছে ?

‘মুক্তি’,- রহমান দৃঢ় কণ্ঠে বলল। ‘আমি মুক্তি চাই এ-বন্দি জীবন থেকে।’

কিন্তু আমি তো কবেই গল্প লেখা ছেড়ে দিয়েছি। ইনফ্যাক্ট, কিছুই লিখি না আর।

‘তুমিই না একদিন বিপ্লবের বীজ বপন করেছিলে আমার অন্তরে। একজন বিপ্লবী আর কতদিন ঘুমবে, আর কতদিন ঘুম পাড়িয়ে রাখবে তাকে?’

কিন্তু সময় এখন পাল্টেছে। বদলেছে জীবন। তুমি বরং ফিরে যাও তোমার গোপন জায়গাটিতে। সেই ভালো তোমার জন্য, আমার জন্যেও।

‘সে বড় একঘেয়ে। তুমি বরং এই সময়ের মাঝেই ছেড়ে দাও আমাকে- আমার মত করে।’

রহমান এতটাই জেদ করে বসলো যে আমি আর না করতে পারলাম না।

পরদিন মধ্যরাতে পুরানো সেই চেয়ারটাতে পুনরায় বসলাম। পাশের চেয়ারটা আরও পাশে টেনে বসলো রহমান। গল্পটা আবার লিখতে বসলাম। রহমান তার ইচ্ছে মত লিখিয়ে নিলো সব। আমার সেই তেজ আর স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য গত হয়েছে কবেই তাই নীরবে মেনে নিতে হল ওর নির্দেশ। একসময়ের ফাস্ট ক্লাস পেয়ে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া রহমান এখন এ প্লাস পেয়ে নর্থ সাউথে ভর্তি হয়েছে। পাল্টে গেছে পোশাক আশাকেও- ঢিলে ঢোলা শার্ট-প্যান্টের বদলে এখন সে জিনস আর টি-শার্ট পরে। যে কিনা একদিন রাজনীতিবিদ হয়ে দেশের সেবা করতে চেয়েছিল এখন সে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ গমনের ধান্দা করছে। পারলে থেকে যাবে ওখানেই। আমি লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠে দেখি রহমান উধাও। রাস্তা ঘাট তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম, এ-গলি সে-গলি কোথাও বাদ রাখলাম না- রহমানের কোন হদিশ পেলাম না।

বহু বছর পর ঢাকার নাম করা এক রেস্তোরায় রহমানের সাথে দেখা। প্রথমটাই ও আমাকে চিনতে পারেনি, বিস্তারিত বলায় আমাকে চিনতে তার অসুবিধে হল না। এ-কথায় সে-কথায় জানতে পারলাম, এখন সে আমেরিকা প্রবাসী। তার জীবনের বাকিটা কিছুটা পাঠক কিছুটা সে নিজেই গড়ে নিয়েছে। আমাকে বলল, পরের বছর সময় করে এসে নামটা বদলে যাবে, রহমান নামটা নাকি বড্ড বেমানান ওখানে!

জন্ম সন : ১৯৮৬ জন্মস্থান : মেহেরপুর, বাংলাদেশ। মাতা ও পিতা : মোছাঃ মনোয়ারা বেগম, মোঃ আওলাদ হোসেন। পড়াশুনা : প্রাথমিক, শালিকা সর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শালিকা মাদ্রাসা। মাধ্যমিক, শালিকা মাধ্য বিদ্যালয় এবং মেহেরপুর জেলা স্কুল। কলেজ, কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন। স্নাতক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি অনার্স, ফাইনাল ইয়ার)। লেখালেখি : গল্প, কবিতা ও নাটক। বই : নৈঃশব্দ ও একটি রাতের গল্প (প্রকাশিতব্য)। সম্পাদক : শাশ্বতিকী। প্রিয় লেখক : শেক্সপিয়ার, হেমিংওয়ে, আলবেয়ার কামু, তলস্তয়, মানিক, তারাশঙ্কর প্রিয় কবি : রবীন্দ্রনাথ, জীবননান্দ দাশ, গ্যেটে, রবার্ট ফ্রস্ট, আয়াপ্পা পানিকর, মাহবুব দারবিশ, এলিয়ট... প্রিয় বই : ডেথ অব ইভান ঈলিচ, মেটামরফোসিস, আউটসাইডার, দি হার্ট অব ডার্কনেস, ম্যাকবেথ, ডলস হাউস, অউডিপাস, ফাউস্ট, লা মিজারেবল, গ্যালিভার ট্রাভেলস, ড. হাইড ও জেকিল, মাদার কারেজ, টেস, এ্যনিমাল ফার্ম, মাদার, মা, লাল সালু, পদ্মা নদীর মাঝি, কবি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিলে কোঠার সেপাই, ভলগা থেকে গঙ্গা, আরন্যক, শেষের কবিতা, আরো অনেক। অবসর : কবিতা পড়া ও সিনেমা দেখা। যোগাযোগ : 01717513023, [email protected]

মন্তব্যসমূহ

  1. মাহবুব সাঈদ মামুন মার্চ 8, 2011 at 1:03 পূর্বাহ্ন - Reply

    দারুন।

    মুক্তি,বিপ্লব আর আমেরিকা সব মিলিয়ে একাকার।

    • মোজাফফর হোসেন মার্চ 9, 2011 at 12:23 পূর্বাহ্ন - Reply

      @মাহবুব সাঈদ মামুন, ধন্যবাদ মামুন ভাইয়া। কেমন আছেন ?

      • মাহবুব সাঈদ মামুন মার্চ 9, 2011 at 12:30 পূর্বাহ্ন - Reply

        @মোজাফফর হোসেন,

        মেইল বা ফোন দিবো।

        ভালো থেকো।

        • মোজাফফর হোসেন মার্চ 9, 2011 at 12:37 পূর্বাহ্ন - Reply

          @মাহবুব সাঈদ মামুন, আচ্ছা ভাইয়া। অপেক্ষায় থাকলাম…ভালো থাকবেন।

  2. হামিদা রহমান মার্চ 7, 2011 at 2:29 অপরাহ্ন - Reply

    লিটলম্যাগ সতীর্থে আপনার একটা গল্প পড়লাম “হায়াত” দারুন লেগেছে…

    এই লেখাটিও অনেক ভালো লাগলো

    ভালো থাকবেন

    • মোজাফফর হোসেন মার্চ 8, 2011 at 12:14 পূর্বাহ্ন - Reply

      @হামিদা রহমান, ও আচ্ছা। খুব ভালো লাগলো শুনে। গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।ভালো থাকবেন।

  3. লাইজু নাহার মার্চ 7, 2011 at 2:45 পূর্বাহ্ন - Reply

    এবারের লেখাটি মাটির কাছাকাছি মনে হয়েছে!

    • মোজাফফর হোসেন মার্চ 7, 2011 at 7:46 পূর্বাহ্ন - Reply

      @লাইজু নাহার, শুনে খুব ভালো লাগলো। ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।

      • গীতা দাস মার্চ 8, 2011 at 12:09 পূর্বাহ্ন - Reply

        @মোজাফফর হোসেন,
        গল্পের আঙ্গিকটি অভিনব এবং যে রহমানরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নর্থ সাউথে ভর্তি হয় তারাই তো

        পরের বছর সময় করে এসে নামটা বদলে যাবে, রহমান নামটা নাকি বড্ড বেমানান ওখানে!

        চমৎকার। আধুনিক যাপিত জীবনের সাথে বৈশ্বায়ন এবং সেপ্টেম্বর পরবর্তী আমেরিকায় মুসলমান নামের উপর নেতিবাচক প্রভাবেরও ইঙ্গিত রয়েছে।
        ভাল লেগেছে।

        • মোজাফফর হোসেন মার্চ 9, 2011 at 12:25 পূর্বাহ্ন - Reply

          @গীতা দাস, ধন্যবাদ দিদি। নতুন বইগুলো কি পড়া শুরু করেছেন ?

  4. কাজী রহমান মার্চ 7, 2011 at 2:18 পূর্বাহ্ন - Reply

    কিন্তু সময় এখন পাল্টেছে। বদলেছে জীবন। তুমি বরং ফিরে যাও তোমার গোপন জায়গাটিতে। সেই ভালো তোমার জন্য, আমার জন্যেও।

    ‘সে বড় একঘেয়ে। তুমি বরং এই সময়ের মাঝেই ছেড়ে দাও আমাকে- আমার মত করে।’

    এই যায়গাটা পর্যন্ত কিন্তু দুর্বার গতিতে এগিয়েছে। চমৎকার লেগেছে। অন্য রকম অথচ খুবই স্বচ্ছ এবং আন্তরিক। পরের অংশ গুলোতে সন্ধি সন্ধি ভাব আমাকে কিছুটা ভাবিয়েছে, তবুও ভালো লাগলো।
    :clap

    • মোজাফফর হোসেন মার্চ 7, 2011 at 7:45 পূর্বাহ্ন - Reply

      @কাজী রহমান, ধন্যবাদ। আপনার ভালো লাগলো জেনে আনন্দিত হলাম।

  5. মোজাফফর হোসেন মার্চ 7, 2011 at 1:33 পূর্বাহ্ন - Reply

    হুম। ভালো বলেছেন। এ ছাড়া আর উপায় কি বলুন ! ধন্যবাদ।

  6. স্বপন মাঝি মার্চ 7, 2011 at 12:27 পূর্বাহ্ন - Reply

    গল্পের শুরু থেকেই আগ্রহ তৈরী হয়ে পাঠকের মনে। রহমানের সাথে লেখকের কথোপকথন, কথোপকথনের বিষয়বস্তু, প্রাণবন্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। তারপর, মনে হয় লেখক রহমানের সাথে আর এগুতে না পেরে র‍্যামনকে প্রবাসে ফেলে দিয়ে, নিজে আপন মনে কবিতার চাষ করে যাচ্ছেন।

  7. হেলাল মার্চ 6, 2011 at 8:24 অপরাহ্ন - Reply

    (Y) (Y) (Y) (Y) (Y)

  8. ফারুক মার্চ 6, 2011 at 7:53 অপরাহ্ন - Reply

    বহু আগে এমনি একটা গল্প পড়েছিলাম , যেখানে গল্পের চরিত্ররা লেখককে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করিয়েছিল। কার লেখা মনে নেই।

    ভাল লাগল । গল্পটা আরেকটু টেনে নিলে মনে হয় আরো জমত।

    • মোজাফফর হোসেন মার্চ 7, 2011 at 1:30 পূর্বাহ্ন - Reply

      @ফারুক, গল্পটা এখানেই শেষ করতে হল। আর আমার একটি নাটকের লেখককে তার চরিত্ররা একপ্রকারের কাঠগড়াই দাড় করাই। আমি লিংকটা দিলাম, পড়ে দেখতে পারেন, ধন্যবাদ।

      http://blog.mukto-mona.com/?p=7087

  9. রৌরব মার্চ 6, 2011 at 5:45 অপরাহ্ন - Reply

    ভাল লাগল 🙂

  10. আফরোজা আলম মার্চ 6, 2011 at 5:29 অপরাহ্ন - Reply

    বাহ! আলাদা লেখার স্বাদ। ভালো লাগলো।

  11. নিটোল মার্চ 6, 2011 at 4:14 অপরাহ্ন - Reply

    ভালো লাগলো।

মন্তব্য করুন