মডারেটর নোটঃ ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে ঘাতকদের আক্রমণের শিকার হন হুমায়ুন আজাদ। সেই ন্যাক্কারজনক হামলার শোকাবহ স্মৃতির প্রেক্ষিতে একদিন দেরিতে হলেও পুরোন এই লেখাটি আবার পাঠকদের উদ্দেশ্যে পেশ করা হলো।

:line:

“যখন আমরা বসি মুখোমুখি, আমাদের দশটি আঙুল হৃৎপিন্ডের মতো কাঁপতে থাকে
দশটি আঙুলে, আমাদের ঠোঁটের গোলাপ ভিজে ওঠে আরক্ত শিশিরে,
যখন আমরা আশ্চর্য আঙুলে জ্বলি, যখন আমরাই পরষ্পরের স্বাধীন স্বদেশ,
তখন ভুলেও কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা জিজ্ঞেস করো না;
আমি তা মূহূর্তেও সহ্য করতে পারি না, -তার অনেক কারণ রয়েছে।
তোমাকে মিনতি করি কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না।
জানতে চেয়ো না তুমি নষ্টভ্রষ্ট ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের কথা, তার রাজনীতি,
অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যমন্ডলি, জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ,
মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন ক’রে আমাকে পীড়ন কোরো না;
আমি তা মুহূর্তেও সহ্য করতে পারি না, – তার অনেক কারণ রয়েছে ।

তোমাকে মিনতি করি কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না।
জানতে চেয়ো না তুমি নষ্ট ভ্রষ্ট ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ
মাইলের কথা: তার রাজনীতি
অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যমন্ডলী
জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ
মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন
করে আমাকে পীড়ন কোরো না

তার ধানক্ষেত এখনো সবুজ, নারীরা এখনো রমনীয়, গাভীরা এখনো দুগ্ধবতী,
কিন্তু প্রিয়তমা, বাঙলাদেশের কথা তুমি কখনো আমার কাছে জানতে চেয়ো না;
আমি তা মুহূর্তেও সহ্য করতে পারি না, তার অনেক কারণ রয়েছে।“
হুমায়ুন আজাদ। কাব্যগ্রন্থঃ পেরোনোর কিছু নেই।

তাঁর জন্ম ১৯৪৭ এর এপ্রিলে। ২৮শে এপ্রিলে। প্রচন্ড বোশেখে, নানা বাড়ি কামারগাঁয়ে। বড় হয়েছেন রাড়িখালে। তিনি কবি। তিনি প্রথাবিরোধী। তিনি বিশ্বাসবিমুখ। তিনি অবিশ্বাসী। তিনি নাস্তিক। তাঁর বাবার দেয়া নাম হুমায়ুন কবীর। আমার কাছে, সমগ্র বাংলাদেশের কাছে তাঁর পরিচিতি হুমায়ুন আজাদ নামে।

হুমায়ুন আজাদ। অক্ষরের হিসেবে নামটা খুব একটা বড় না হলেও এ নামের দ্যোতনা ব্যাপক। এ নামের পরিব্যপ্তি “ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল”- বাংলাদেশ। অসম্ভব আলোকিত এ নাম। এ নামের প্রখর ঔজ্জ্বল্য সহ্য করতে না পেরে আধাঁরকামে কম্পিত কিছু মহাপুরুষ তাঁকে পৈশাচিক উল্লাসে ক্ষত বিক্ষত করেছিল অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে। যে ক্ষতের জীবাশ্ম তাঁকে বইতে হয়েছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

তাঁর কন্ঠস্বরে কোন সেন্সরশীপ ছিল না। অন্যদের মত কথা বলার আগে সেন্সরবোর্ডের কাছে তিনি তাঁর বক্তব্য জমা দেননি। যার ফলে তাঁর বক্তব্য কেঁটে ছেঁটে পবিত্রগ্রন্থের সাথে মিলিয়ে প্রকাশ করা যেত না। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। তাঁর কথা তাঁর জীবদ্দশাতেই ফলে গেছে। নষ্টরা তাঁকে আতিথীয়তা দেখাতে কার্পণ্য করে নি। এ দিক থেকে দেখলে তাঁর অন্যসকল গুণের সাথে ভবিষ্যতদ্রষ্টা গুণটিও উল্লেখযোগ্য।

তিনি লিখেছেন পাক সার জমিন সাদ বাদ নামের একটি বিস্ফোরক পুস্তক। একটি প্রামাণ্য দলিল। যেটা দেশের মৌলবাদীদের পশ্চাৎদেশে লাগিয়েছিল এক প্রবল লাথি। গালে প্রচন্ড চপেটাঘাত। স্বাভাবিকভাবেই তাদের নুরাণী দেহে আঘাতের প্রতিবাদ স্বরূপ তারা দৃঢ় হাতে তার জবাব দিয়েছিল। পার্থক্য হল হুমায়ুন আজাদের প্রতিবাদের অস্ত্র ছিল কলম আর নূরানী পক্ষের অস্ত্র ছিল চাপাতি।

তিনি লিখেছেন নারী । বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত বই। যার সাথে তুলনা করার মত পুস্তক এখনও এদেশে লেখা হয় নি। হয়েছেন বিপুলভাবে আলোচিত, সমালোচিত, নন্দিত এবং একই সাথে নিন্দিত। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয়(?) (অ)ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ যে বই পড়ে বলেছিলেন “বইটি খুবই কুৎসিত”। আর আজাদের একজন ছাত্রীর ভাষায়, “ এই বই পড়েই আমি যে নারী তা উপলব্ধি করেছি। এ বই প্রকাশের সাথে সাথে মৌলবাদীর ভুমিকায় অবতীর্ণ হয় স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্র। বইটি নিষিদ্ধ হয়। পুনঃপ্রকাশিত হয় নিষিদ্ধ হবার চার বছর পরে।

তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এত কিছু থাকতে আপনি নারী নিয়ে বই লিখলেন কেন?
তার উত্তর ছিলঃ ”……… নারী খুবই গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। নারীবাদীদের বই পড়ে আমি মুগ্ধ হই, যা এতো দিন আমার মনে অস্পষ্টভাবে ছিলো তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে; আমি নারী সম্পর্কে একটি সম্পুর্ণবই লেখার পরিকল্পনা করি। নারিবাদীদের বই আমার বোধকে তীক্ষ্ণ করেছে।

আপনি কি নিজেকে নারীবাদী মনে করেন?
– হ্যাঁ।”

তিনি আরো লিখেছেন আমার অবিশ্বাস। যার তীব্র আলোয় আলোকিত হয়েছে হাজারও তরুন প্রান। হুমায়ুন আজাদ জনপ্রিয় অপন্যাসিকদের মতন শাড়িচুরিলিপস্টিকময় শিল্প তৈরী করেন নি। যদিও তিনি অজনপ্রিয় নন। তিনি তৈরী করতে চেয়েছেন নিখাদ শিল্প। এবং বস্তুত, সচেতন পাঠক মাত্রেই জানেন তিনি তা করেছেনও।

তাঁর ভাষায় তিনি জন্মেছেন অন্যদের সময়ে। যেখানে কোন কিছুই তাঁর নিজের নয়। যেখানে সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। এখানে আমরা তাঁর বহুল পঠিত
সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে নামক কবিতাটি পাঠ করতে পারিঃ

আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
নষ্টদের দানব মুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ পরিষদ;-চ’লে যাবে অত্যন্ত উল্লাসে
চ’লে যাবে এই সমাজ সভ্যতা-সমস্ত দলিল-
নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র
আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চ’লে গেছে নষ্টদের
অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর গ্রাম ধানখেত
কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক
মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ নির্জন প্যাগোডা।
অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;
চাষার সমস্ত স্বপ্ন আঁস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন
সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।

আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার রাত
নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ
শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে।
রবীন্দ্রনাথের সব জ্যোৎস্না আর রবীশংকরের
সমস্ত আলাপ হৃদয়স্পন্দন গাথা ঠোঁটের আঙ্গুল
ঘাইহরিণীর মাংসের চিৎকার মাঠের রাখাল
কাশবন একদিন নষ্টদের অধিকারে যাবে।
চ’লে যাবে সেই সব উপকথা: সৌন্দর্য প্রতিভা-
মেধা;-এমনকি উন্মাদ ও নির্বোধদের প্রিয় অমরতা
নির্বোধ আর উন্মাদদের ভয়ানক কষ্ট দিয়ে
অত্যন্ত উল্লাস ভরে নষ্টদের অধিকারে যাবে।

আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
সবচে সুন্দর মেয়ে দুই হাতে টেনে সারারাত
চুষবে নষ্টের লিঙ্গ; লম্পটের অশ্লীল উরুতে
গাঁথা থাকবে অপার্থিব সৌন্দর্যের দেবী। চ’লে যাবে
কিশোরীরা চ’লে যাবে, আমাদের তীব্র প্রেমিকারা
ওষ্ঠ আর আলিঙ্গন ঘৃণা ক’রে চ’লে যাবে, নষ্টদের
উপপত্নী হবে। এই সব গ্রন্থ শ্লোক মুদ্রাযন্ত্র
শিশির বেহালা ধান রাজনীতি দোয়েলের ঠোঁট
গদ্যপদ্য আমার সমস্ত ছাত্রী মার্কস-লেনিন,
আর বাঙলার বনের মতো আমার শ্যামল কন্যা-
রাহুগ্রস্ত সভ্যতার অবশিষ্ট সামান্য আলোক-
আমি জানি তারা সব নষ্টদের অধিকারে যাবে।
-কাব্যগ্রন্থঃ সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।

হুমায়ুন আজাদ বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব, অন্যতম আলোচিত নাম। অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। হুমায়ুন আজাদ আজ অতীত। আজ হুমায়ুন আজাদ ইতিহাস। তাঁর সমন্ধে কিছু লিখতে হলে, কিছু বলতে হলে ব্যাকরনের অতীতকালের নিয়ম মেনে লিখতে ও বলতে হয় যা তার পাঠক ও ভক্তদের জন্য বেদনাদায়ক। বাংলাদেশ জানে হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর বদলা নেয়া হয় নি, এবং এও জানে ভবিষ্যতেও ওকাজটি আর করা হয়ে উঠবেনা। হুমায়ুন আজাদ আশার থেকে হতাশাকেই দার্শনিকভাবে বেশী মূল্যবান ভাবতেন। হতাশার মাঝে আশা দিয়ে জীবনকে অর্থময় করতে চাইতেন।
তেমনিভাবে আমরা জানি এ হত্যার প্রতিশোধ নেয়া হবে না কিন্তু আশা করি তা হবে। কেননা আশা করতে তো দোষ নেই, তাই না?

হুমায়ুন আজাদ মানে……
হুমায়ুন আজাদ মানে, বিনাপ্রশ্নে মেনে না নেয়া
হুমায়ুন আজাদ মানে, বস্তুত ব্যাতিক্রম, শুদ্ধতা
হুমায়ুন আজাদ মানে, মিথ্যের বিরুদ্ধে চমকপ্রদ সত্য
হুমায়ুন আজাদ মানে, অবিশ্বাস, বিশ্বাসের রাহিত্য
হুমায়ুন আজাদ মানে নিস্তব্ধ বাংলাদেশে সরব উপস্থিতি।
হুমায়ুন আজাদ মানে, সৌন্দর্যে কেঁপে ওঠা থরথর অনুভুতি
হুমায়ুন আজাদ মানে চমৎকার সাতটি কাব্যিক ইশতেহার।
হুমায়ুন আজাদ মানে, শৃঙ্খল ভাঙার হাতিয়ার
হুমায়ুন আজাদ মানে মুক্ত প্রেমে থরথর কেঁপে ওঠা
হুমায়ুন আজাদ মানে, চাঁদ, ফালি ফালি করে কাটা
হুমায়ুন আজাদ মানে, ‘লাল নীল দীপাবলী’।
হুমায়ুন আজাদ মানে, সত্যের বুলেটে মিথ্যে আবেগের তীক্ষ্ণ জলাঞ্জলি
হুমায়ুন আজাদ মানে, কবি ও কবিতা হাঁটছে আগুপিছু
হুমায়ুন আজাদ মানে, এবং, আরো অনেক, অনেক কিছু।।

সাইফুল ইসলাম
২৭-০২-২০১১

[241 বার পঠিত]