আল্লায় বহুত যত্তন গরি মানুষ বানাইয়ে। আশরাফুল মখলুকাত বানাইয়ে। কদুন নালায়েক নাফরমান শতানেডকদ্দে – মানুষ নাকি আইস্যেদে বান্দরত্তুন। নাউজুবিল্লাহ। আঁই হিয়ান বিশ্বাস ন গরি। কিন্তু তর মিক্কা চাইলে মনে অয় দে হিতারা ঠিক কতা ক-অর পাল্লায়। তরে আল্লায় ন-বানায়, তুই হারামজাদা হুয়ররবাইচ্চা বান্দরত্তুন পয়দা হইয়স দে

– চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় এরকম বাণী ক্লাস সেভেন থেকে নাইন পর্যন্ত আমাকে প্রায়ই শুনতে হতো আমাদের ইংরেজি স্যার আবু মির্জা’র কাছ থেকে। স্যারের কথাগুলোকে প্রমিত বাংলায় রূপান্তর করলে শোনাবে এরকমঃ “আল্লাহ অনেক যত্ন করে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির সেরা জীব বানিয়েছেন। কিছু নালায়েক নাফরমান শয়তান বলে- মানুষ নাকি বানর থেকে এসেছে। নাউজুবিল্লাহ। আমি তা বিশ্বাস করি না। কিন্তু তোর দিকে তাকালে মনে হয় তারা সম্ভবত ঠিক কথা বলছে। তোকে আল্লাহ সৃষ্টি করেনি। তুই হারামজাদা শূকরের বাচ্চা জন্মেছিস বানর থেকে”। তখনকার দিনে স্কুলে শিক্ষকদের গালিগালাজ, কানমলা, বেত্রাঘাত এগুলোর সাথে আদর স্নেহের একটা পরশও এতই সহজলভ্য ছিল যে আলাদা করে এগুলো নিয়ে ভাবিই নি কখনো।

‘বানরের পেটে জন্ম নেয়া শূকরের বাচ্চা!’ – কী এক অদ্ভুত জন্তুর সাথে তুলনা করতেন আমাকে আবু মির্জা স্যার। শূকর আর বানরের শংকর প্রজাতির কথা স্যার কীভাবে কল্পনা করেছিলেন জানি না। আজ এতগুলো বছর পর কথাগুলো মনে পড়লো বিবর্তন-বিদ্যা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতে গিয়ে। আরো নির্দিষ্টভাবে বলা যায় নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মার একটা মন্তব্য পড়ে। বিবর্তন তত্ত্বের দুটো ক্লাসিক বই বন্যা আহমেদের ‘বিবর্তনের পথ ধরে’ [1] এবং অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদের ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’ [2]। বই দুটো সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা মুক্তবুদ্ধির চর্চার অনুকূল পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন- “বন্যা, অভিজিৎ, ফরিদ কি দেশে থাকলে এসব বই লিখতেন? আমি ৯৯ ভাগ নিশ্চিত যে লিখতেন না” [3]। দ্বিজেন স্যারের সাথে শত ভাগ সহমত প্রকাশ করার কোন কারণ আমার নেই। বাংলাদেশে বসে যদি দ্বিজেন শর্মা “ডারউইনঃ পিতামহ সুহৃদ সহযাত্রী” লিখতে পারেন, আখতারুজ্জামান স্যার ‘বিবর্তন বাদ’ [4] লিখতে পারেন, তবে বন্যা আহমেদ, অভিজিৎ রায় বা ফরিদ আহমেদ পারবেন না কেন? কিন্তু অনুকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতির ব্যাপারটা বিবর্তনের একটি প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ। সে রকম একটা পরিবেশ এখন বৈজ্ঞানিক যোগাযোগের উন্নতির সুযোগে ক্রমশ তৈরি হচ্ছে। আজ বাংলাদেশে বসে কাজ করে যাচ্ছেন অসংখ্য যুক্তিবাদী তরুণ-তরুণী। তাই তো দেখতে পাচ্ছি অনন্তের ‘যুক্তি’র ডারউইন সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে আলোচনা হচ্ছে [5]। তবুও একটা কথা স্বীকার করতেই হবে- ইউরোপ আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় বসে বুদ্ধির মুক্তি ঘটানো বা যুক্তিবোধে শান দেয়া যত সহজ, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে একই কাজ- অনেক বেশি কঠিন। আজ অস্ট্রেলিয়ায় আছি বলেই হয়তো সুযোগ পাচ্ছি পেছন ফিরে দেখার- কোথায় কীভাবে ঘটেছিল বিবর্তনবাদের সাথে আমার পরিচয়।

স্কুলের বইতে ডারউইনের কথা লেখা ছিল না কোথাও। তাই কলেজে ওঠার আগ-পর্যন্ত চার্লস ডারউইনের নামই শুনিনি কারো কাছে। আমার পঁচিশ বছর পরে যারা স্কুলে গেছে- তাদের অবস্থাও দেখছি প্রায় একই রকম। বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কল্যাণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সমস্ত বই এখন অন-লাইনে পাওয়া যাচ্ছে (www.nctb.gov.bd)। প্রথম শ্রেণী থেকে নবম-দশম শ্রেণীর সব বই খুঁজে দেখলাম কোথাও ডারউইন এবং বিবর্তনবাদ সম্পর্কে কিছু পাওয়া যায় কি না। শুধুমাত্র নবম-দশম শ্রেণীর জীববিজ্ঞান [6] বইয়ের তৃতীয় পৃষ্ঠায় চার্লস রবার্ট ডারউইন (১৮০৯ – ১৮৮২) সম্পর্কে লেখা আছে –

“ইংরেজ প্রকৃতি বিজ্ঞানী ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদের (Theory of Natural Selection) প্রবর্তক। গেলাপেগোস দ্বীপপুঞ্জের জীবসম্প্রদায় পর্যবেক্ষণ করে ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত গবেষণা পুস্তক ‘Origin of Species by means of Natural Selection’এ তিনি তাঁর মতবাদ প্রকাশ করেন”।

তারপর চতুর্থ পৃষ্ঠায় চার্লস ডারউইন এর একটা হাতে-আঁকা ছবি ছাপানো হয়েছে। পুরো বইয়ের আর কোথাও ডারউইন বা বিবর্তন তত্ত্ব সম্পর্কে আর কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। আমার মনে হয় না বিদ্যালয়ের কোন শিক্ষক এই ৩-৪ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত ডারউইন সম্পর্কিত লাইন দু’টো ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন মনে করবেন। স্কুলগুলোতে ‘আবু মির্জা’র মত শিক্ষকের অভাব নেই। সুতরাং এটা বুঝা যায় যে বাংলাদেশের স্কুল পর্যায়ের কোন শিক্ষার্থীর পক্ষে স্কুলের পড়া থেকে বিবর্তন-বাদ সম্পর্কে কিছুই জানা সম্ভব নয়।

ধরে নিলাম বিবর্তন সম্পর্কে স্কুল-পর্যায়ে না পড়লেও চলে। কিন্তু তৃতীয় শ্রেণী থেকেই যে ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে! কী লেখা আছে ধর্মীয় শিক্ষার বইগুলোতে? তৃতীয় শ্রেণীর ‘ইসলাম-শিক্ষা’ [7] বইয়ের একেবারে প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম অনুচ্ছেদে একটা ছবির পাশে লেখা আছে-

 “ছবিতে আমরা কী দেখি? আমরা দেখি আম গাছ, কাঁঠাল গাছ, নারিকেল গাছ, সুপারি গাছ। আমরা আরও দেখছি নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, চাঁদ-তারা ও ফসলের মাঠ। তোমরা কি বলতে পার, এ সবকিছু কে সৃষ্টি করেছেন? মহান আল্লাহ এসব সৃষ্টি করেছেন। মানুষ, পশু-পাখি, পোকা-মাকড় ইত্যাদিও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তিনি এদের রিয্‌কদাতা ও পালন-পালনকারী”। (পালন-পালনকারী-ই লেখা আছে, লালন-পালনকারী নয়)।

তৃতীয় শ্রেণীর ‘হিন্দুধর্ম শিক্ষা’ [8] বইয়েরও একেবারে প্রথম পৃষ্ঠায় একটি নিসর্গ দৃশ্য, এবং তার নিচে লেখাঃ

“সুন্দর এই পৃথিবী। এই পৃথিবীর অনেক রূপ। কোথাও উঁচু পাহাড়-পর্বত। কোথাও সমতল ভূমি, কোথাও মরুভূমি। আবার কোথাও নদী, কোথাও সাগর। মাথার উপর নীল আকাশ। ডালে ডালে পাখি। আরও কত যে জীবজন্তু। এসব কিছু কে সৃষ্টি করলেন? এর এক জন স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তা আছেন। যেমন কাঠমিস্ত্রি তৈরি করেন চেয়ার-টেবিল। রাজমিস্ত্রি তৈরি করেন দালান। তেমনি সব কিছুর একজন স্রষ্টা আছেন। একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীর। এ সৃষ্টিকর্তার নাম কী? অনেক নাম তাঁর। তাঁকে কেউ বলে ঈশ্বর। কেউ বলে গড। কেউ বলে আল্লাহ। যেমন একই জলকে কেউ বলে ওয়াটার। কেউ বলে পানি। আমরা হিন্দু। হিন্দুরা সৃষ্টিকর্তাকে বলে ঈশ্বর”।

তৃতীয় শ্রেণীর ‘খ্রিষ্টধর্ম শিক্ষা’ [9] বইতেও একই অবস্থা। প্রথম পৃষ্ঠাতেই লেখা আছে

“আমাদের মনে অনেক সময় প্রশ্ন জাগে, আলো কেন সব সময় থাকে না? আলো কে সৃষ্টি করল? কোথা থেকে অন্ধকার আসে? অন্ধকার কেন নেমে আসে? মানুষ কি আলো বা অন্ধকার সৃষ্টি করতে পারে? যিনি এসব সৃষ্টি করেছেন তিনি কে? ইত্যাদি। যিনি এসব সৃষ্টি করেছেন তিনিই সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর। তিনি সব কিছু মাত্র ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। প্রথম দিনে তিনি সৃষ্টি করেছেন আলো। দ্বিতীয় দিনে তিনি সৃষ্টি করেছেন আকাশ। এসব সৃষ্টি করার জন্য ঈশ্বরের কোন কিছুরই দরকার হয়নি। শুধু কথার দ্বারাই তিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন”।

তৃতীয় শ্রেণীর ধর্মশিক্ষার বইগুলোর মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ‘বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা’ [10]। এ বইয়ের কোথাও সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। চতুর্থ থেকে নবম-দশম শ্রেণী পর্যন্ত ইসলাম, হিন্দু এবং খ্রিস্ট ধর্মের সবগুলো বইতেও আল্লাহ, ভগবান, আর ঈশ্বরের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা আলোচনা করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো- যে শিক্ষার্থী এরকম বাধ্যতামূলক ধর্মশিক্ষার নামে স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্বে মগজ-ভর্তি করে কলেজে ওঠে- তার পক্ষে হঠাৎ বিবর্তন-তত্ত্বে আস্থাশীল হয়ে ওঠা কতখানি সহজ?

আমাদের সময়ে ধর্ম-শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল না। স্কুলে বিকল্প বিষয়ের ব্যবস্থা থাকলে ধর্মশিক্ষা ছাড়াও এসএসসি পাস করা যেতো। কিন্তু এরশাদ সাহেব ক্ষমতায় এসে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার পাশাপাশি স্কুলে ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছিলেন। উচ্চ মাধ্যমিকের কোন কোন প্রাণিবিজ্ঞান বইয়ের পেছনের দিকে বিবর্তনবিদ্যার ওপর একটা অধ্যায় থাকলেও তা কখনো পড়ানো হয়নি, পড়াও হয়নি। এখনো এ অবস্থার একটুও উন্নতি হয়নি। অধ্যাপক আখতারুজ্জামান ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন-

“বেশ কয়েক বছর থেকে দেশে বিজ্ঞানবিরোধী সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ মৌলবাদের চলছে রমরমা। এক শ্রেণীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তকচ্চ প্রসার ঘটছে মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার। জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা প্রতিষ্ঠা করার একটি সচেতন ও সংগঠিত প্রচেষ্টা চলছে এসব স্থানকে কেন্দ্র করে। তাই বলা যায় এগুলো হয়ে পড়েছে মধ্যযুগীয় মুর্খতা প্রচার কেন্দ্র” [1]।

১৯৮৬ সালে আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই- সীমিত পরিসরে বিবর্তনবিদ্যা পড়ানো হতো প্রাণিবিদ্যা বিভাগে। কিন্তু কয়েক মাস পরেই ইসলামী ছাত্র শিবিরের সশস্ত্র উত্থান ঘটে। তাদের চাপের মুখে বিবর্তনবাদ বাদ পড়ে যায়। ক্রমে ক্রমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসেও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে বিবর্তনতত্ত্ব। ২০০৬ সালে দৈনিক সমকালে ‘বাংলাদেশে কি বিবর্তন পড়ানো হচ্ছে?’ শিরোনামে হুমায়ূন রশীদ রচিত একটি সিরিজ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়[1,11]। সেখানে অনেক শিক্ষার্থী বলেছিলেন পরীক্ষায় পাসের জন্য হয়তো বিবর্তনতত্ত্ব তাদের পড়তে হয়, কিন্তু তারা বিবর্তন তত্ত্বে বিশ্বাস করে না। এখন অবশ্য অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে পরীক্ষা পাসের জন্যও কাউকে বিবর্তনতত্ত্ব পড়তে হয় না। কারণ পরীক্ষাতেও বিবর্তনতত্ত্ব থেকে কোন প্রশ্ন আসে না।

শিবিরের রাজত্বকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যিকারের অন্ধকারের যুগ নেমে এসেছিল। আর সেই আঁধার সময়েই পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হুজ্জোত আলী প্রামাণিক লিখলেন “Religious and Scientific views of the Universe”। সেই সময়ে প্রামাণিক স্যারের সংস্পর্শে এসে বিবর্তনবিদ্যা সহ আরো অনেক আলোকিত দরজা খুলে যায় আমার। তখন স্বাভাবিকভাবেই বইটি প্রকাশ করতে রাজী হয়নি ইউনিভার্সিটি প্রেস কিংবা অন্য কোন প্রকাশক। কিন্তু দুঃসাহসী প্রামাণিক স্যার দমে যাবার পাত্র নন। তিনি তিন-দিন ব্যাপী এখলাস উদ্দিন স্মারক বক্তৃতা’র বিষয় নির্বাচন করলেন “Religious and Scientific views of the Universe”। তখন দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ডীন থেকে শুরু করে আরো অনেক “বিজ্ঞানী”র বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার নামে মারমুখী বিজ্ঞান-ধর্ষণ। বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও উপাত্ত দাখিল করে প্রামাণিক স্যার ব্যাখ্যা করলেন কোরান বা বাইবেলে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্ব কেন ভুল, ন্যূহের বন্যা কীভাবে অসম্ভব, জীব-জগত ‘সৃষ্টি’ হয়নি- বিবর্তনের ফলে ‘উৎপন্ন’ হয়েছে। বক্তৃতার দ্বিতীয় দিন শিবিরের ছেলেরা স্যারের হাত কেটে নেবে বলে হুমকি দিলো। স্যার হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে বক্তৃতা দিলেন। শেষের দিন বক্তৃতা-কক্ষে তালা লাগিয়ে দেয়া হলো। স্যারের বাসার সামনে বোমা পড়লো। প্রক্টর এসে আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখার স্বার্থে বক্তৃতা-মালার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করলেন। সৃষ্টিবাদীদের পেশির দাপট তখনো ছিল- এখনো আছে।

একটা ব্যাপার সবসময় চোখে পড়ে – সেটা হলো ধর্মবাদী সৃষ্টিবাদীদের অসহিষ্ণুতা, গোয়ার্তুমি। তারা যে ধর্মশিক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের একেবারে শিশুবয়স থেকেই যতসব গাঁজাখুরি অবৈজ্ঞানিক মিথ্যা-কথা [7-9] শেখাতে শুরু করেন তাতে যুক্তিবাদী বিজ্ঞান-মনস্কদের গাত্রদাহ হলেও তারা কিন্তু কাউকে তেড়ে মারতে আসেন না, ধর্মশিক্ষার বই ছিঁড়েও ফেলেন না বা নিষিদ্ধ করার দাবীও তোলেন না। অথচ সৃষ্টিবাদীদের দেখুন- কার্যকরী বিবর্তনতত্ত্বকে ঠেকানোর জন্য এমন কোন হীন কাজ নেই যা তারা করেন নি বা করার চেষ্টা করেন নি। মধ্যযুগীয় পেশিশক্তির দাপট যেখানে অচল সেখানে ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন নামক অপবিজ্ঞান চালু করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। সেই অপচেষ্টায় শরিক হয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ থেকে শুরু করে আরো অনেক উচ্চশিক্ষিত অপবিজ্ঞানী। (বিস্তারিত তথ্যের জন্য পড়ুন বিবর্তনের পথ ধরে [1]-র দশম অধ্যায়)।

আমেরিকানদের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ানরা অনেক বেশি উদারপন্থী বলে আমার ধারণা। অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একজন নাস্তিক মহিলা যিনি বিয়ে না করেও তাঁর বয়ফ্রেন্ডের সাথে থাকেন। অস্ট্রেলিয়ান গ্রিন পার্টির প্রধান সিনেটর বব ব্রাউন একজন সমকামী। কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা কখনোই এ প্রসঙ্গে একটাও কটুবাক্য বলেন না। এমনকি চার্চের কট্টর পাদ্রীদেরও চুপ করে থাকতে হয় রাষ্ট্রের ব্যক্তিস্বাধীনতার নীতির কারণে। দেখা যাক এরকম একটা দেশে ডারউইনের তত্ত্বের কী অবস্থা।

চার্লস ডারউইন তাঁর বিখ্যাত বিগল সমুদ্র-যাত্রার পথে থেমেছিলেন অস্ট্রেলিয়াতেও। ১৮৩৬ সালের জানুয়ারিতে নিউ সাউথ ওয়েল্‌স এর ব্লু-মাউন্টেনের জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য দেখেছিলেন ডারউইন। তাঁর সম্মানে অস্ট্রেলিয়ার নর্দান টেরিটরির রাজধানী শহরের নামকরণ করা হয়েছে – ডারউইন। ১৮৬৯ সালে ২৩৩ বর্গ-কিলোমিটারের এই শহরটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত এর নাম ছিল পামারস্টন। ডারউইন শহরের সমুদ্র-বন্দরের নাম ‘পোর্ট ডারউইন’। ক’বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘চার্লস ডারউইন ইউনিভার্সিটি’।

ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের হাজারো প্রমাণ ছড়িয়ে আছে অস্ট্রেলিয়ার আনাচে কানাচে। মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন প্রকান্ড একটা দ্বীপ হওয়ার কারণে পুরু দ্বীপটাই হয়ে ওঠেছে বিবর্তনের পরীক্ষাগার। এতবড় দ্বীপটার আবহাওয়া বিচিত্র। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মরুভূমি এখানে। নানারকম আবহাওয়ার সাথে টিকে থাকার জন্য এখানে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিবর্তন ঘটেছে অনেক। মাত্র কয়েক প্রজাতির ইউক্যালিপ্টাস থেকে বিবর্তিত হতে হতে এখন প্রায় আটশ’ প্রজাতির ইউক্যালিপ্টাস বা গাম ট্রি পাওয়া যায় অস্ট্রেলিয়ায়। এদের মধ্যে আছে নিচু এলাকায় নদীর পানিতে টিকে থাকা ‘রেড রিভার গাম’, একদম শুকনো বালিতে টিকে থাকা ‘হোয়াইট গাম’, বরফের মধ্যে টিকে থাকা ‘স্নো গাম’। গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড উত্তাপে প্রায়ই আগুন লেগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় মাইলের পর মাইল ইউক্যালিপ্টাসের বন। কিছুদিন পর দেখা যায় সেই পোড়া গাছ থেকেই জন্ম নিচ্ছে নতুন গাছ। প্রতিকূল পরিবেশের সাথে টিকে থাকার জন্য জিন-গত পরিবর্তন ঘটে চলেছে এ গাছগুলোর মধ্যে।

অস্ট্রেলিয়ায় বিবর্তন তত্ত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো অস্ট্রেলিয়ান খরগোশের উৎপত্তি। ইউরোপিয়ানরা এসে ঘাঁটি করার আগপর্যন্ত কোন ধরনের খরগোশ ছিল না অস্ট্রেলিয়ায়। মাত্র বারোটি খরগোশ নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে ভিক্টোরিয়ায় এসেছিলেন এক ইংরেজ পরিবার ১৮৫৯ সালে। কয়েক বছরের মধ্যেই Oryctolagus cuniculus প্রজাতির এই বারোটি খরগোশ দ্রুত বংশবিস্তার করতে থাকে। বছরে প্রায় একশ’ কিলোমিটার হারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পড়তে ১৮৮৬ সালের মধ্যেই ভিক্টোরিয়া থেকে সাউথ অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গেলো হাজার হাজার খরগোশ। ১৯০৭ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লো কয়েক কোটি খরগোশ। গাছ-পালা ফলমূল শাকসব্জি সব চলে যেতে শুরু করলো খরগোশের পেটে। মেরে, কেটে, বিষ দিয়ে- যত ধরণের পদ্ধতি জানা ছিলো সব প্রয়োগ করেও কিছুতেই কিছু করা গেলো না। খরগোশের সংখ্যা বেড়েই চললো। Rabbit-proof fence এর প্রচলন ঘটে এ সময়। কিন্তু কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না খরগোশের বংশবৃদ্ধি। অস্ট্রেলিয়ার গরু আর ভেড়ার ফার্ম মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ে গেলো, কারণ গরু-ভেড়ার সব ঘাস চলে যাচ্ছে খরগোশের পেটে [12]।

সব অস্ত্র ব্যর্থ হবার পর বিজ্ঞানীরা জীবাণু অস্ত্র ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর অস্ত্র তৈরি হলো- মশা বাহিত ভাইরাস মাইজোম্যাটোসিস। এই ভাইরাস কেবল ইউরোপিয়ান খরগোশ মেরে ফেলবে, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার অন্য কোন প্রাণীর ক্ষতি করবে না। ১৯৫০ সালে এ ভাইরাস ছাড়া হলো। দু’বছরের মধ্যেই খরগোশের মড়ক লেগে গেল। খরগোশের মৃত্যুর হার দাঁড়ালো প্রায় ৯৯.৯%। কিন্তু জীববৈজ্ঞানিক বিবর্তন শুরু হলো। শতকরা শুন্য দশমিক এক ভাগ খরগোশের জিনের মিউটেশানের ফলে ক্রমশ এক নতুন ধরনের খরগোশের উৎপত্তি হলো যা ইউরোপিয়ান খরগোশ থেকে আলাদা- অস্ট্রেলিয়ান খরগোশ যারা মাইজোম্যাটোসিস ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারে। যে প্রজাতির খরগোশ ইউরোপ থেকে আনা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায় – সে প্রজাতির সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটেছে। বর্তমান প্রজাতির অস্ট্রেলিয়ান খরগোশের মাইজোম্যাটোসিস ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকে থাকার ক্ষমতা প্রায় ৬০%।

চোখের সামনে ঘটা বিবর্তন দেখেও বাইবেলান্ধ পাদ্রীর অভাব নেই অস্ট্রেলিয়ায়। বিশেষ করে চার্চ থেকে যখন প্রচুর টাকা-পয়সা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। তাই তো দেখা যায় ২০০৫-০৬ সালে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের পালে হাওয়া দিয়েছে অনেকগুলো অস্ট্রেলিয়ান চার্চ ও খ্রিস্টান স্কুল [13]। আমেরিকার স্কুলিং সিস্টেম ফেডারেল গভমেন্টের অধীন। সেখানে ধর্মীয় স্কুলে রাষ্ট্রীয় সাহায্য দান আইনের পরিপন্থী। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় স্কুল শিক্ষা রাজ্য সরকারের অধীন। রাজ্য সরকার ইচ্ছে করলে যে কোন ধর্মীয় স্কুলেও সরকারী সাহায্য দিতে পারে। ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনওয়ালারা সে সময় অনেক ক্যাথলিক স্কুলের বিজ্ঞানের সিলেবাসে আই-ডি অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু প্রচন্ড সমালোচনা শুরু হয় মিডিয়ায়। এগিয়ে আসে দেশের প্রায় সত্তর হাজার বিজ্ঞানী এবং তাদের প্রতিনিধি ‘অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অব সায়েন্স’। সৃষ্টিবাদ ও ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন সম্পর্কে এক কড়া বিবৃতিতে অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অব সায়েন্স পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেয় যে ‘Intelligent design is not science’ (www.science.org.au/policy/creation.html)। আমেরিকান একাডেমি অব সায়েন্সও যে এরকম বিবৃতি দিয়েছে তা অভিজিৎ রায় ও বন্যা আহমেদ বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেছেন ‘বিবর্তনের পথ ধরে’ [1]-র দশম অধ্যায়ে। ন্যাশনাল একাডেমিক প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘সায়েন্স এন্ড ক্রিয়েশানিজম’ বইটার [14] কথাও এখানে উল্লেখযোগ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সুবাদে অনেক মতবাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সাথে আলোচনা করার সুযোগ হয় আমার। তাদের মধ্যে বিবর্তন তত্ত্বে বিশ্বাসীর সংখ্যা অনেক বেশি। হতে পারে পদার্থ-বিজ্ঞানের মানুষ বলে এ ধরণের মানুষের সাথেই আমার আলাপ হয় বেশি। তবুও এটা বলা যায় যে এদেশে গায়ের জোরের চেয়েও যুক্তির জোর প্রবল। সুস্থ সমাজে এটাই তো কাম্য। ক্রমশ যুক্তিবাদী হয়ে উঠবে সারা পৃথিবীর মানুষ – ডারউইন দিবসে এটাই আমার কামনা।

তথ্যসূত্রঃ

[1] বন্যা আহমেদ. বিবর্তনের পথ ধরে. ঢাকা: অবসর, ২০০৭.
[2] অভিজিৎ রায়, ফরিদ আহমেদ. মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে. ঢাকা: অবসর, ২০০৭.
[3] দ্বিজেন শর্মা. ডারউইনঃ বিশ্বে ও মহাবিশ্বে. প্রথম আলো ২৯ জুন. ঢাকা, ২০০৭.
[4] ম আখতারুজ্জামান. বিবর্তনবাদ. ঢাকা: হাসান বুক হাউজ, ২০০০.
[5] অনন্ত বিজয় দাশ. যুক্তি http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=13155 ২০১১.
[6] ডঃ ইকবাল আজীজ মুত্তাকী, নাসিম বানু, ডঃ মোঃ আবুল হাসান, গুল আনার আহমেদ. মাধ্যমিক জীববিজ্ঞান নবম-দশম শ্রেণী. ঢাকা: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড,, ২০০৮.
[7] অধ্যাপক আ ন ম আবদুল মান্নান খান, অধ্যাপক মুহাম্মাদ মনসুরুর রহমান, অধ্যাপক মুহাম্মদ তমীযুদ্দীন, মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান. ইসলাম-শিক্ষা তৃতীয় শ্রেণী. ঢাকা: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড,, ২০০৯.
[8] সুনীত কুমার ভদ্র, নিরঞ্জন অধিকারী, মলয় কুমার সাহা. হিন্দুধর্ম শিক্ষা তৃতীয় শ্রেণী. ঢাকা: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড,, ২০০৯.
[9] ফাদার আদমে এস পেরেরা সিএসসি, সিস্টার ফিলোমিনা কুইয়া সিএসসি, যোসেফ গোমেজ. খ্রিষ্টধর্ম শিক্ষা তৃতীয় শ্রেণী. ঢাকা: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড,, ২০০৯.
[10] ডক্টর সুনন্দা বড়ুয়া, নার্গিস বেগম. বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা তৃতীয় শ্রেণী. ঢাকা: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড,, ২০০৯.
[11] হুমায়ূন রশীদ. পরীক্ষায় পাশের জন্য পড়ি. দৈনিক সমকাল জুলাই ১৫,. ঢাকা, ২০০৬.
[12] Alice Alstone. Book of Australian Facts. Sydney: Reader’s Digest, 1992.
[13] Robyn Willams. Unintelligent Design why god isn’t as smart as she thinks she is,. Sydney: Allen & Unwin, 2006.
[14] National Academy of Sciences. Science and Creationism A view from the National Academy of Sciences,. Washington DC,: National Academy Press, 1999.

[120 বার পঠিত]