ব্যবধান

By |2017-04-25T01:18:36+00:00ফেব্রুয়ারী 11, 2011|Categories: বই, ব্লগাড্ডা|6 Comments

আমি ধরেই নিয়েছিলাম হবেনা। মাত্র এক, দেড় মাস সময়ে একেবারে ‘স্ক্র্যাচ’ থেকে শুরু করে একটা বই পাবলিশ করা কি মুখের কথা? কিন্তু সেই অসম্ভব কাজটাই সম্ভব করলো ‘বিদ্যাপ্রকাশ’ প্রকাশনী। গত বছরের একুশে বইমেলায় আমার লিখিত প্রথম বই, ‘আমেরিকার গল্পঃ রঙ দিয়ে যায় চেনা’ প্রকাশ করে ‘অনুপম’ প্রকাশনী। বইটা মূলত ‘মুক্তধারা’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মুক্তধারা কোনো কারনে আমার সাথে যোগাযোগ করতে যথেষ্ট দেরী করে এবং অনুপম প্রকাশনী ইতিমধ্যে বইটা প্রকাশে আগ্রহ দেখালে স্বভাবতই আমি তাদের সাথে বই প্রকাশে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পড়ি। মুক্তধারা আমার বইটা প্রকাশ করতে না পারায় অসুন্তুষ্টি প্রকাশ করে এবং অনুপম প্রকাশনীকে দিয়ে বইটা প্রকাশ করানোয় অনুযোগ করে।

আমার দ্বিতীয় ছোটগল্পের বইয়ের পান্ডুলিপি এবার সেকারনেই আমি মুক্তধারাকে পাঠাই অনেকটা অপরাধবোধ থেকেই। এবারের একুশের বইমেলাকে সামনে রেখে গত বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ আমি ‘ব্যবধান’ বইয়ের পান্ডুলিপি মুক্তধারার কাছে পাঠাই। আমাকে অক্টোবরের মাঝামাঝি মুক্তধারা জানিয়ে দেয় তাদের পক্ষে এ বই অবিকল প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যদিও বইয়ের প্রত্যেকটা গল্পই তাদের পছন্দ হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে গল্পের কিছু কিছু বিষয় নাকি বেশ সংবেদনশীল এবং সে হিসেবে পান্ডুলিপির অর্ধেকের মত গল্পই নাকি তাদের নিজস্ব প্রকাশনার মূলনীতির পরিপন্থী। এবং সেই গল্পগুলো বাদ দিতে হবে বই থেকে। মুক্তধারা আমাকে অনুরোধ করে নতুন করে আরও কতগুলো গল্প লিখে পাঠানোর জন্যে যেন বইয়ের সাইজ অন্তত ৮০ পাতা পার হয়। ওনারা অক্টোবরের বাকি ক’দিন এবং পুরো নভেম্বর মাস আমাকে সময় দেন গল্প পাঠানোর জন্যে। অসম্ভব ব্যস্ততাপূর্ণ প্রবাস জীবনে মাত্র দেড় মাসে এতগুলো গল্প লেখা কি মুখের কথা? আমি দেড় মাসে মাত্র দেড়খানা গল্প লিখে শেষ করলাম।

২০১২-এর বইমেলা টার্গেট করে আরও বছরখানেক হয়ত দেরী করা যেত মুক্তধারাকে দিয়ে বইটা প্রকাশ করার জন্যে। তাতে আমার তেমন আপত্তিও ছিলনা। কিন্তু মনের ভেতর খঁচখঁচ করে একটা কাটা বিঁধতেই থাকলো, “এত কষ্ট করে এতগুলো গল্প লিখলাম সমাজ পরিবর্তনের মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। সেগুলো সারাজীবন অপ্রকাশিতই থেকে যাবে? অন্য কোনো প্রকাশনীকে দিয়ে চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি?” মুক্তধারার কাছে জানতে চাইলাম অন্য কোনো প্রকাশনীকে আমার পান্ডুলিপি দিলে ওনাদের আপত্তি আছে কিনা। ওনারা জানালেন, ওনাদের আপত্তি নেই। ততদিনে ডিসেম্বরের শেষাশেষি। বেশ ক’টা প্রকাশনীকে আমার পান্ডুলিপির কপি পাঠালাম এই আশায় যে, একুশের বইমেলার ঝামেলা-টামেলা মিটে যাওয়ার পর ওনারা মার্চ, এপ্রিল নাগাদ আমার পান্ডুলিপিটা পড়ে দেখার সুযোগ পাবেন এবং এরপর ওনাদের কেউ আগ্রহী হলে সুযোগমত বইটা প্রকাশের ব্যাপারে আলোচনা করা যাবে।

পান্ডুলিপিটা হাতে পাওয়ার ঠিক দু’তিন দিন পরই বিদ্যাপ্রকাশ প্রকাশনী থেকে ফোন এলো ঢাকায় আমার এক ভাগ্নের কাছে। পান্ডুলিপিতে ও’র কন্টাক্ট ফোন নাম্বার দেয়া ছিল। বিদ্যাপ্রকাশ প্রকাশনী আমার বইটা অবিকল প্রকাশ করতে আগ্রহী এবং তা এই বই মেলাতেই। সময়ের স্বল্পতার কথা ভেবে আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করে আমার অবিশ্বাস প্রকাশ করলে বিদ্যাপ্রকাশ প্রকাশনী জানালো, আমার কাছে বইয়ের সফ্‌ট্‌ কপি থেকে থাকলে মেলার মাঝামাঝি সময়ে তারা বইটা মেলায় নামাতে পারবে বলে তাদের বিশ্বাস। আমি তাদের কাছে সফ্‌ট্‌ কপি পাঠালাম। ততদিনে জানুয়ারী মাস শুরু হয়ে গেছে। কম্পিউটারে ওনারা ফাইল খুলে দেখলেন, ফন্ট মেলেনা। কিচ্ছু পড়া যায়না। পুরো বই নতুন করে কম্পোজ করতে হবে কম্পিউটারে। সব শুনে আমি দমে গেলাম। কিন্তু বিদ্যাপ্রকাশ প্রকাশনী দমলো না।

‘ব্যবধান’ বইটা সত্যি সত্যিই বের হচ্ছে এবারের বইমেলায়। মেলার শেষভাগে (১৯~২০ ফেব্রুয়ারী নাগাদ) বইটা মেলাতে পাওয়া যাবে বিদ্যাপ্রকাশ প্রকাশনীর ষ্টলে (ষ্টল নাম্বার ১৪৫, ১৪৬ ও ১৪৭)। প্রকাশক আমাকে তেমনটাই আশ্বাস দিয়েছেন। মোট ১৫ টা ছোটগল্প থাকছে বইটাতে। পৃষ্টা সংখ্যা ১০৬। প্রচ্ছদ এঁকেছেন আল-আমিন ফারুক (সময়ের সংক্ষিপ্ততার কারনে এবং কাজের অতিরিক্ত চাপে ধ্রুব এষ শেষ পর্যন্ত প্রচ্ছদটা করতে পারেননি)। মুদ্রিত মূল্য ১৫০ টাকা। আর গল্পগুলো হলোঃ

ব্যবধান (শ্রেনী বৈষম্য নিয়ে গল্প)
আত্মহনন (সম্পর্কের টানাপোড়েনে মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত, বুয়েটে পড়ুয়া এক যুবকের আত্মহত্যার দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে গল্প)
একজন শুকুর আলীর গল্প (মালয়েশিয়ায় কর্মরত, স্বল্প শিক্ষিত এক বাংলাদেশী শ্রমিকের করুন মৃত্যুর গল্প)
মিজানুর রহমানের প্রবাস যাপন (গল্পটা ‘রঙ দিয়ে যায় চেনা’ বইটাতে ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে)
আলাউদ্দিনের বেহেশত বাস (মধ্যপ্রাচ্যে উট রেসে এক বাংলাদেশী শিশুকে জকি হিসেবে ব্যবহারের গল্প)
কারাবাস (কারাবাস সমতূল্য সংসার জীবন নিয়ে ব্যতিক্রমী একটা মজার গল্প)
নির্বাসন (একটা সংখ্যালঘু পরিবারের বাংলাদেশ থেকে ভারতে মাইগ্রেশনের গল্প)
তুফান (নদী পাড়ের এক নিম্নবিত্ত পরিবারের তুফানে আক্রান্ত হওয়ার গল্প)
রায়ট (ভারতের গুজরাটে এক মুসলিম যুবকের রায়টে নিহত হওয়ার গল্প)
ঘুষ (সচিবালয়ের এক কর্মচারীর ঘুষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প)
শিরচ্ছেদ (ইরাকে একজন আমেরিকান নাগরিকের জিম্মি হওয়ার ও তাকে শেষপর্যন্ত ‘বিহেড্‌’ করার গল্প)
ঈভ টিজিং (ঈভ টিজিং নিয়ে গল্প)
রাজাকার (একাত্তরে একজন রাজাকারের একটা সংখ্যালঘু পরিবারকে ভিক্টিম বানানোর গল্প)
বড় বউ (লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে গল্প)
টেররিষ্ট (আমেরিকায় একজন পাকিস্থানীকে টেররিষ্ট সন্দেহে নির্যাতনের গল্প)

বইয়ের ভেতরের মোড়কে (ফ্ল্যাপে) বই সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ভূমিকা লিখতে গিয়ে আমি লিখেছিঃ

“সমাজে এমন অনেক বিষয় আছে, প্রতিনিয়ত এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কলাম লেখাসহ বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশিত অসংখ্য বই চোখে পড়ে বাজারে। যেমন, সংখ্যালঘূ নির্যাতন, শ্রেনী বৈষম্য কিম্বা লিঙ্গ বৈষম্য। অথবা বর্তমান সমাজে ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে পড়া ঘুষ কিম্বা ঈভ টিজিং-এর মত মারাত্মক ক্ষতিকর বিষয়গুলো। তবে এসব বিষয় নিয়ে একদল কল্পিত চরিত্রের সমন্বয়ে ছোট ছোট গল্প লেখা আমার ধারনা মতে নতুন একটি পদক্ষেপ। আর এই নতুন পদক্ষেপটিই আমি নিয়েছি আমার এই বইটিতে যেখানে এসব বিষয়ে রচিত অনেকগুলি ছোট গল্পের সংকলন করা হয়েছে। বই প্রকাশনার জগতে আমার এই বইটি ব্যতিক্রমী একটি পদক্ষেপ রাখতে এবং একই সাথে সূধী পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে সমর্থ হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস”।

ব্লগের সমস্ত পাঠকদের প্রতি অনুরোধ রইলো বইটা সংগ্রহ করার জন্যে এবং পাশাপাশি পরিচিতজনদেরকে বইটা সম্পর্কে জানানোর জন্যে।

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, এবারের বই মেলাতেও অনুপম প্রকাশনীর ষ্টলে (ষ্টল নাম্বার ১২৯, ১৩০ ও ১৩১) আমার লিখিত প্রথম বই ‘আমেরিকার গল্পঃ রঙ দিয়ে যায় চেনা’ পাওয়া যাবে। তবে সেটাও পাওয়া যাবে মেলার মাঝামাঝি সময়ের দিকে (অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারী নাগাদ)। গতবছর যারা বইটা সংগ্রহ করার সুযোগ পাননি, তারা এবার মিস্‌ করবেননা আশা করি। ‘রঙ দিয়ে যায় চেনা’ বইটার গল্পগুলো হলোঃ

ভ্যালি ফোর্জের পিকনিক
একজন মিজানুর রহমানের গল্প
বাংলাদেশ এবং একজন আমেরিকানের গল্প
৯-১-১
স্ট্যানলি উইলিয়ামসের মৃত্যুদন্ড
ব্রায়ান ওয়েবার
টুথ ফেইরি
বাংলাদেশের রাজনীতি ও আমরা প্রবাসী বাংলাদেশীরা
নামে কিইবা আসে যায়?
স্বপ্নের বাংলাদেশ
বারাক ওবামার চিঠি
কাংক্ষিত ডাইভারসিটি
ভাষা কাহিনী
রঙ দিয়ে যায় চেনা

“বই কিনে কেউ দরিদ্র হয়না”। বই কিনুন। প্রিয়জনদের বই উপহার দিন।

আমি বিশ্বাস করি, পাঠক ও পরিচিতজনদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কেউ লেখক হতে পারেনা। একজন লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে আপনাদের শুভ কামনা, সক্রিয় অংশগ্রহন ও পৃষ্ঠপোষকতা আমার একান্ত প্রয়োজন।

সবাইকে ধন্যবাদ।

আব্দুর রহমান আবিদ
ফেব্রুয়ারী, ২০১১

আমেরিকা প্রবাসী লেখক।

মন্তব্যসমূহ

  1. ফাহিম রেজা ফেব্রুয়ারী 11, 2011 at 9:41 পূর্বাহ্ন - Reply

    @আব্দুর রহমান আবিদ, অভিনন্দন জানবেন (F) । আপনার লেখার ভক্ত আমি, আপনার আগের লেখাগুলোও মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। তবে এই লেখাটায় এতবার বইটা কেনার কথা বলেছেন যে বহুদিন পরে কেমন যেন বিটিভির সেই বিজ্ঞাপনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল 😉 ।

    • আব্দুর রহমান আবিদ ফেব্রুয়ারী 13, 2011 at 10:41 পূর্বাহ্ন - Reply

      @ফাহিম রেজা,

      অভিনন্দনের জন্যে ধন্যবাদ। বিজ্ঞাপন বোধহয় একটু বেশী মাত্রাই হয়ে গেছে। যাহোক, এখন বিফলে না গেলেই হয়। কমপ্লিমেন্টস্‌-এর জন্যে ধন্যবাদ।

  2. তামান্না ঝুমু ফেব্রুয়ারী 11, 2011 at 8:27 পূর্বাহ্ন - Reply

    @আব্দুর রহমান আবিদ,
    আপনার গল্পগুলোর বিষয়বস্তু ভাল।লেখনীর মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।দেশে থাকলে অবশ্যই কিনতাম।প্রকাশিত বইয়ের জন্য অভিনন্দন (F)

    • আব্দুর রহমান আবিদ ফেব্রুয়ারী 13, 2011 at 10:37 পূর্বাহ্ন - Reply

      @তামান্না ঝুমু,

      ধন্যবাদ অভিনন্দনের জন্যে। সুযোগ থাকলে বইটা কিনতেন শুনে খুশী হলাম।

  3. রৌরব ফেব্রুয়ারী 11, 2011 at 6:49 পূর্বাহ্ন - Reply

    অভিনন্দন (F) । দেশে থাকলে আপনার বই কিনতাম।

    • আব্দুর রহমান আবিদ ফেব্রুয়ারী 13, 2011 at 10:34 পূর্বাহ্ন - Reply

      @রৌরব,

      অভিনন্দনের জন্যে ধন্যবাদ। দেশে থাকলে বইটা কিনতেন শুনে খুশী হলাম।

মন্তব্য করুন