বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে ডারউইন: প্রাচ্যের সংস্কৃতি

ডারউইনের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে অন্যসব বিজ্ঞান সাময়িকীর মত বিশ্ববিখ্যাত নেচার সাময়িকীও ২০০৯ সালে বর্ষব্যাপি বিশেষ আয়োজন করেছিল। পত্রিকাটির ওয়েবসাইট ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে ব্লগে অনুবাদ করার জন্য বেশ কয়েকটি নিবন্ধ পেলাম, ধীরে ধীরে সেগুলো পোষ্ট করব। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ডারউইনবাদের প্রভাব নিয়ে চার পর্বের একটা সিরিজ পোষ্ট করার ইচ্ছা আছে, যার মধ্যে এই পোষ্টটিই হবে প্রথম পর্ব। নেটে ইংরেজি ও বাংলায় জৈববিবর্তন নিয়ে অনেক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক আলোচনা হয়, কিন্তু পশ্চিম ও প্রাচ্যের বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ এই বৈজ্ঞানিক ফ্যাক্টকে কিভাবে গ্রহণ করেছিল তা নিয়ে আলোচনা নেই বললেই চলে। জীববিজ্ঞানীরা সবসময়ই বিবর্তনবিদ্যাকে মহাকর্ষের মত শাশ্বত সত্য ধরে নিয়ে কাজ করেছেন, সৃষ্টিবাদীদের ঝাটার বাড়ি খাওয়ার আগে তাঁদের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে জীববিজ্ঞানের বাইরের বেশিরভাগ লোকজন তাঁদের সাথে এই বিষয়ে একমত না। বিবর্তনবিদ্যাকে সাধারণ মানুষের কাছে সঠিকভাবে এবং কার্যকরীভাবে উপস্থাপন করতে চাইলে আগে এই তত্ত্ব সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে কিছু গবেষণা করাটা বাঞ্চনীয়।

ডারউইন আইন্সটাইনের মত পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় বিজ্ঞানী না হলেও এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে তাঁর মত আর কোন বিজ্ঞানী এমন আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেননি। ডারউইনের গবেষণা কোপারনিকাস, ব্রুনো, গ্যালিলিওর মতই বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক স্ট্যাটাস কুওর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল, তবে ডারউইনের প্রভাবটি সর্বজনীন। ১৮৫৯ সালে অরিজিন অব স্পিসিজ ও ১২ বছর পর দ্যা ডিসেন্ট অব ম্যান এন্ড সিলেকশন ইন রিলেশন টু সেক্সপ্রকাশের মধ্যবর্তী সময়ে অসংখ্য ভাষায় তাঁর গ্রন্থ অনূদিত ও সমালোচিত হয়েছিল। ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত তাঁর জীবনী গ্রন্থে তিনি বিষ্ময় প্রকাশ করে লিখেছিলেন যে তাঁর তত্ত্ব সুদূর জাপানে পর্যন্ত্য আলোচিত হয়েছে। আরও মজা বিষয় হল, তাঁর অরিজিন গ্রন্থ নিয়ে হিব্রু ভাষায় তিনি একটি প্রবন্ধও খুজে পেয়েছিলেন যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে তাঁর তত্ত্ব নাকি অনেক আগে থেকেই ওল্ড টেস্টামেন্টে ছিল(তৎকালীন ইহুদিদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে জোকারদের অভাব ছিল না)! সারা বিশ্বে তাঁর এই খ্যাতির পেছনে প্রযুক্তিরও কিছু ভূমিকা ছিল। অরিজিন প্রকাশের সময়ই আটলান্টিক মহাসাগরের তলে প্রথমবারের মত টেলিগ্রাফের তার প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, তার পরের দু’ দশকে ভারত, চীন ও অস্ট্রেলেশিয়ার সাথে ইউরোপ সংযুক্ত হয়েছিল। প্রকাশনাশিল্পে যান্ত্রিক উন্নতিও দ্রুত গতিতে গোটা বিশ্বে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আশ্চর্যনক হলেও সত্য যে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে ফ্যাকটরটি ডারউইনের খ্যাতির পথকে প্রশস্ত করেছিল সেটি হল বিভিন্ন লোকধর্মের সাথে একে মানুষের অভিযোজন করিয়ে নেওয়া। কোলকাতা থেকে টোকিও এবং বেইজিংয়ের পন্ডিতরা পর্যন্ত্য দাবি করেছিল যে জৈববিবর্তনের ধারণা অনেক আগে থেকেই তাঁদের শিক্ষায়তনিক সংস্কৃতি ও প্রাচীন পুঁথিতে বিদ্যমান। অনেকে ডারউইনকে ধর্মের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে দেখলেও ডারউইন অবিশ্বাস্যভাবে পৃথিবীজুড়ে ধর্মীয় পুনঃজাগরণে ক্ষুদ্রভাবে হলেও ভূমিকা রেখেছিলেন। এ যুগে মুসলমান সৃষ্টিবাদীদের লম্ফঝম্ফ দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এঁদেরই ঊনবিংশ শতকের গুরুরা ডারউইন ইস্যুতে “সব ব্যাদে আছে” মার্কা বক্তব্য দিতেন।

মহাজাগতিক বিন্যাস

অষ্টাদশ শতকের নব্বইয়ের দশকে চীনা পন্ডিত ইয়ান ফু থমাস হাক্সলির ইভোল্যুশন এন্ড এথিক্স বইয়ের একটি জনপ্রিয় অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন যেখানে তিনি ডারউইন ও হাক্সলিকে কনফুসীয় নীতিশাস্ত্রের আলোকে উপস্থাপন করেছিলেন। হাক্সলি মনে করতেন যে মানুষ পরহিতব্রতের মাধ্যমে মহাজাগতিক শৃঙ্খলাকে বিনষ্ট করে। কিন্তু ইয়ান বিশ্বাস করতেন যে হাক্সলির এই বিষন্নকারক দৃষ্টিভঙ্গী ডারউইন ও কনফুসিয়াসের দর্শনের পরিপন্থী। প্রাচীন কনফুসীয় নীতিশাস্ত্র এবং ডারউইন সহ অন্য ভিক্টোরীয় প্রকৃতিবিদদের কর্মকে সংশ্লেষণ করে ইয়ান যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে স্বার্থপরতা ও পরার্থতার সঠিক ভারসাম্যের মাধ্যমেই কেবল একটি আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ডারউইন এভাবে ইয়ান এবং ইয়ানের পাঠকদেরকে কনফুসিয়াসের মতবাদকে পুনঃর্জীবিত করার অস্ত্র প্রদান করেছিলেন।

ডারউইনের কর্মকে একইভাবে ঊনবিংশ শতকের বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবি সমাজ হিন্দুদের মহাজাগতিক বিশ্বাসকে সমর্থন করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। এঁদেরই কেউ কেউ দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন যে প্রত্যক্ষবাদ(যে দর্শন দাবি করে যে পর্যবেক্ষণই প্রকৃত জ্ঞানের ভিত্তি) এবং বিবর্তনবাদ হিন্দু সৃষ্টিবাদের ভেতরেই নিহিত আছে। যেমন, ভারতীয় প্রত্যক্ষবাদী সমাজের একজন সক্রিয় সদস্য সতীশ মুখার্জী হিন্দুদের সাংখ্য দর্শনের মাঝে বিবর্তনের নির্যাস দেখতে পেয়েছিলেন। সাংখ্য দর্শনের মতে, সৃষ্টি ও ধ্বংসের অবিরাম চক্রের মাধ্যমেই জগতসংসার উন্মোচিত হয়: চেতনা অথবা আত্মা পদার্থের রুপ নিয়ে আবার পদার্থকে ত্যাগ করে। এই চক্রগুলোকে প্রজাতির সৃষ্টি এবং মহাজগতের বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা হয়। আরও অনেক ভারতীয় চিন্তাবিদের মত মুখার্জীর কাছেও সাংখ্য দর্শন ছিল বিবর্তন তত্ত্বের একটি মহাজাগতিক রুপ।

মুসলমান বিশ্বে সমর্থক ও সমালোচক- দু’ গোত্রই দাবি করেছিল যে মুসলমান দার্শনিকরা অনেক আগেই প্রজাতি বা আনওয়া এর বিবর্তনের কথা বলে গিয়েছিলেন। একারণে আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষায় ডারউইনের প্রসঙ্গ আসলেই ধ্রুপদী আরব দর্শনসাহিত্যের উদ্ধৃতি প্রদান করা হত। দশম আর দ্বাদশ শতকে কিছু কিছু মুসলমান লেখক খনিজ থেকে উদ্ভিদ ও প্রাণীতে উত্তোরনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ইরানের বিশ্বকোষে বেশ কিছু ফারসী দার্শনিকের নাম দেওয়া আছে যাঁদের মাঝে জালালুদ্দিন রুমী, ইবনে ইয়ামিন ফারিয়ুমাদী, ফয়েজ কাসানী, আল-বিরুনী, আবু ইসহাক ইব্রাহিম বিন সাইয়ার নাজ্জাম প্রভৃতি ব্যক্তিত্বদের উদাহরণ দেওয়া যায়। তবে বিবর্তন সম্পর্কে তাঁদের চিন্তাভাবনা মূলত দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক ছিল, বৈজ্ঞানিক নয়।

সাম্রাজ্য এবং বিবর্তন

প্রাচ্যের পন্ডিতরা ঠিক কি উদ্দেশ্যে নিজেদের ধর্মের মধ্যে ডারউইনবাদকে খুজে ফিরছিলেন, ধর্মের বাজারে নিজের ধর্মকে মার্কেটিং করা জন্য? এটা হয়ত অতি সরলীকরণের দোষে দুষ্ট হবে। এসব পন্ডিতদের কর্মের পেছনের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদকে অর্ধচন্ত্র দেওয়ার তীব্র বাসনা। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের শিখরে শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠন্ম্যতা অবাধে বিদ্যমান ছিল। তাদের এই উন্নাসিকতার জবাব দেওয়া ও প্রাচ্যের উপর লেপে দেওয়া পশ্চাতপদতা ও কুসংস্কারের পশ্চিমা অপলাপ মুছে ফেলার জন্য প্রাচ্যের পন্ডিতরা তাঁদের নিজ নিজ ধর্মে আধুনিক বিজ্ঞানের পূর্বাভাস প্রমাণে উঠে পড়ে লেগেছিলেন। ডারউইনকে গ্রহণ করে তাঁরা দেখাতে চেয়েছিলেন যে খ্রীষ্টধর্মই কেবল বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক।

মিশরের মুহাম্মদ আব্দুহ উসমানী সাম্রাজ্যের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় খ্রীষ্টধর্মপ্রচারকদের অতর্কিত হামলা নিয়ে শংকিত ছিলেন। তিনি মানতে নারায ছিলেন যে বিজ্ঞান ও ইসলামের মাঝে কোন বিরোধ থাকতে পারে। একারণে তিনি তাঁর সায়েন্স এন্ড সিভিলাইজেশন ইন খ্রিশচিয়ানিটি এন্ড ইসলাম (১৯০২) গ্রন্থে ডারউইনবাদকে কোরানের অঙ্গীভূত করার প্রয়াস নিয়েছিলেন।

ডারউইনকে যেমন কেউ কেউ তাঁদের সভ্যতাকে মহিমাম্বিত করার জন্য ব্যবহার করেছেন, কেউ কেউ আবার নিজেদের পিছিয়ে পড়াকে ব্যাখ্যা করার জন্যও ব্যবহার করেছেন। ১৮৯৯ সালে মিশরীয় বুদ্ধিজীবি এবং নারীবাদি কর্মী কাসিম আমিন বলেছিলেন, “পশ্চিমা সভ্যতা বাস্পীয় ইঞ্জিন আর তড়িৎ দ্বারা চালিত হয়ে তার জন্মভূমি থেকে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে”। তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে দুর্বলরা এই আগ্রাসন থেকে রক্ষা পাবে না। আমিনের মতে একমাত্র সমাধান ছিল সমাজ সংস্কার। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কোরীয় এবং ভারতীয় জাতিয়তাবাদীরাও একই রকম চিন্তাভাবনা করতেন। রাজনৈতিক “বিবর্তন” উৎসাহিত করতে গিয়ে ইউরোপের বাইরের রাজনীতিবিদরা বিপ্লবের পথ না ধরে ডারউইনীয় বিবর্তনের মন্থর গতিসম্পন্ন পর্যায়ভিত্তিক ডেভেলপমেন্ট অবলম্বন করেছিলেন।

টোকিও ইমপেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনবিদ হিরুয়োকি কাতো বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ডারউইনের তত্ত্বকে ব্যবহার করে জাপানের রাজতন্ত্রকে ন্যায্যতা প্রদান করার চেষ্টা করেছিলেন। সে সময় সম্রাট মেইজির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন চলছিল। কাতো, যিনি প্রতি সপ্তাহে সম্রাটকে সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক আইনের উপর দীক্ষা দান করতেন, প্রচন্ডভাবে কেন্দ্রীয়ভূত রাজকীয় শাসনব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। ডারউইনের তত্ত্বকে তিনি জাপানের সংকট নিরসনে সমাজকাঠামোর আমূল সংস্কারের দাবি বিপক্ষে বৈজ্ঞানিক যুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কাতো ডারউইনের “বেঁচে থাকার সংগ্রাম”কে নৈতিকতা অর্জনে ধীর গতির সংগ্রাম হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গীকে আত্মাহুতি দেওয়ার সামুরাই নীতিরই একটি অংশ বলা যায়, তবে তিনি এই “সামুরাই নীতি” বলতে সম্রাটের প্রতি অন্ধ অনুকরণকেই বুঝতেন। একজন সামুরাইয়ের মৃত্যু যেমন তাঁর চূড়ান্ত জয়, তেমনই নৈতিকতার জন্য সংগ্রাম আসলে বৃহত্তর কোন স্বার্থের জন্য শাহাদাত গ্রহণ করা।

এখানে ডারউইনবাদের প্রতি ইউরোপের বাইরের সংস্কৃতিগুলোর মনোভাবের আরেকটি বৈশিষ্ট্য উন্মোচিত হয়- বেশিরভাগ প্রাচ্যবাসীর কাছে ডারউইনের তত্ত্বের পেছনে মূল প্রশ্নটি ছিল প্রকৃতি থেকে নৈতিকতার কোন মডেল দাঁড়া করানো যায় কিনা। কাতোর মত আরও অনেকের মতেই শুধু বেঁচে থাকাটাই নীতিশাস্ত্রের সবকিছু হতে পারে না। এই জীবনের বাইরে আর যদি কিছু না থাকে, তবে জীবনের উদ্দেশ্য কি? পাকিস্তানী দার্শনিক মোহাম্মদ ইকবালের মতে, ডারউইনের তত্ত্বের মূল সমস্যা হল এটি মরণকে একদম নীরস ও জাগতিক করে ফেলে। একারণেই হয়ত অনেকে ডারউইনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে নিজের মত অনুবাদ করে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব থেকে একটি নীতিব্যবস্থায় রুপান্তরিত করেছিলেন।

সংশয়বাদের প্রতিনিধি?

পশ্চিমে ডারউইন নিয়ে সব আলোচনা মূলত খ্রীষ্টধর্মের সাথে বিবর্তনের সংঘাত কেন্দ্রীক, একারণেই ডারউইনবাদ যে খুব সহজেই অন্য অনেক সংস্কৃতিতে গৃহীত হয়েছে তা জনসাধারনের অগোচরেই রয়ে গিয়েছে। লাইমলাইটটা সবসময় পশ্চিমের চিন্তাবিদদের উপরই ছিল, তাই পশ্চিমের মত প্রাচ্যেও ডারউইনের প্রতি একধরণের শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। ১৮৫৯ সাল থেকেই বিজ্ঞানের সমর্থকরা ধর্মের বিরুদ্ধে ডারউইনকে আবাহন করে এসেছেন, তাই আধুনিক বিজ্ঞানে ডারউইন ধর্মীয় সংশয়বাদের প্রতিনিধি হিসেবেই বিদ্যমান রয়ে গিয়েছেন।

তবে ডারউইনের তত্ত্ব ঠিকই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মাঝের সীমারেখাটিকে উজ্জ্বল করে তুলেছিল। ডারউইনের একনিষ্ঠ সমর্থক এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু থমাস হাক্সলি মনে করতেন যে ডারউইনের প্রায়োগিক পদ্ধতি জ্ঞানকে বিশ্বাস এবং ফ্যাক্টকে কল্পকাহিনী থেকে আলাদা করতে সাহায্য করে। ইংরেজ চার্চও থেমে থাকেনি, বিশপরা ফতোয়া দিয়েছিলেন যে ডারউইনের তত্ত্বকে গ্রহণ করা মানে আত্মাকে নরকের দিকে ঠেলে দেওয়া।

অনেকেই জানেন না যে ধর্ম সম্পর্কে ডারউইনের কোন সুনির্দিষ্ট মতামত ছিল না। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন করার সময় তিনি খুব ধার্মিক ছিলেন, বিগল জাহাজেও তিনি বাইবেল হাতে উঠেছিলেন। বিগল থেকে ফেরার পর তাঁর মধ্যে ধর্ম নিয়ে সংশয় ডানা বাধে। প্রিয় কন্যা এ্যানি ডারউইনের অকাল প্রয়ান তাঁর সংশয়কে আরও তীব্র করে। তাঁর অরিজিন গ্রন্থের শেষ বাক্যে তিনি ইঙ্গিত করেন যে পৃথিবীর প্রথম প্রাণীটির মধ্যে প্রাণ উৎসারণ করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি প্রজাতির ক্রমবিকাশের মধ্যে ঈশ্বরকে কোন মতেই জায়গা করে দিতে রাজি ছিলেন না। আমৃত্য তিনি ঈশ্বর প্রশ্নে ছিলেন একজন সংশয়বাদী। এতদসত্ত্বেও কিছু কিছু ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট তাঁদের বিশ্বাসে জৈববিবর্তনের জন্য জায়গা করতে পেরেছিলেন। আসলে কেবল পশ্চিমা সমাজেই তিনি বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরায়ত সংঘাতে আগুন ঢেলেছিলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তিনি বরং প্রাচীন দার্শনিকদের নতুন প্রাণ দিয়েছিলেন।

মূল:- Global Darwin:Eastern Enchantment, Nature vol461|29 October 2009, Marwa Elshakry, associate professor of history at Columbia University.

পাদটীকা

১) ডারউইনবাদ বলতে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় descent with modification ও এর সংস্লিষ্ট বিষয়াদিকে বুঝাচ্ছি, বিবর্তনবিদ্যায় জেনেটিক্সের উপকরণগুলো থেকে আলাদা করার জন্যই এই বিশেষ নাম ব্যবহার করলাম। সৃষ্টিবাদীরা সাধারণত একটা ধর্মবিদ্বেষী রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য “ডারউইনবাদ” শব্দটি ব্যবহার করেন, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা মূলত শব্দটিকে ডারউইনের প্রস্তাবিত বিষয়গুলোকে অভিহিত করার জন্যই এই বিতর্কিত শব্দটি ব্যবহার করেন। বলে রাখা ভাল, আধুনিক বিবর্তনবিদ্যার দৃষ্টিতে ডারউইনের গবেষণা আসলে অনেকটাই সরলীকৃত, বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করার জন্য জেনেটিক্স না আনলে বিবর্তনের ধারণাটা অনেকটাই অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।

২) http://www.iranica.com/articles/evolution

About the Author:

মন্তব্যসমূহ

  1. লীনা রহমান ফেব্রুয়ারী 7, 2011 at 10:13 অপরাহ্ন - Reply

    ভাল একটা উদ্যোগ নিয়েছ পৃথিবী। এ বিষয়গুলো নিয়ে সবসময়েই লেখা উচিত তবু ডারুইন দিবস যেহেতু সামনে সে হিসেবে এই লেখার আবেদন আরেকটু বেশি। তোমাকে তুমি করেই বললাম, কারণ তুমি অনেক জুনিয়র হবে আমার। পরের পর্বগুলোর অপেক্ষায় রইলাম ভাইয়া।
    অঃটঃ তোমার সাথে দেখা করতে পারলে মন্দ হয়না। মেলায় আসলে যোগাযোগ কইর। আমার নাম্বার ই-বার্তায় পাঠিয়ে দিচ্ছি

  2. সংশপ্তক ফেব্রুয়ারী 6, 2011 at 9:58 পূর্বাহ্ন - Reply

    একজন সত্যিকারের বিজ্ঞানীর যদি কোন ধর্ম থেকে থাকে তবে সেই ধর্ম হবে ‘সন্দেহ ধর্ম’ । সন্দেহ করাই বিজ্ঞানের মূল চালিকা শক্তি। ক্রমাগত সন্দেহের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালানোই বিজ্ঞানের কাজ যা একটা সদা চলমান প্রক্রিয়া , একটা বাইসাইকেলের মত। সন্দেহের অনুপস্থিতি বিজ্ঞান একটা থেমে যাওয়া বাইসাইকেলের মতই ভূমিতে পতিত হবে।

    সত্যিকারের বিজ্ঞান কখনও ধর্ম , সাহিত্যিক কিংবা ভাববাদী শব্দমালা ব্যবহার করে না বা তা নিয়ে মাথা ঘামায় না কারন , বিজ্ঞানের কর্মধারা ও বিচরণভূমি খুবই পরিস্কার এবং সুনির্দিষ্ট – প্রাকৃতিক জগতের বর্ণনা এবং ব্যাখ্যা প্রদান।

    এক শ্রেনীর বিজ্ঞানী আছেন যারা কিছু রুটিন দায়িত্ব পালন করার বিনিময়ে মাসিক বেতন গ্রহন করেন। তারা আসলে কেরানী মাত্র ,বিজ্ঞানী নন । এদের সংখ্যাই বেশী এবং বিজ্ঞানের পেছনে এদের কোন অবদান নেই।

  3. অভিজিৎ ফেব্রুয়ারী 6, 2011 at 9:28 পূর্বাহ্ন - Reply

    ভাল লাগলো লেখাটি পড়ে। পরবর্তী পর্বগুলোর অপেক্ষায় থাকলাম। এ লেখাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডারউইন দিবসে আপনার কাছ থেকে একটি লেখা আশা করছি।

  4. সৈকত চৌধুরী ফেব্রুয়ারী 5, 2011 at 1:42 পূর্বাহ্ন - Reply

    অনেকেই জানেন না যে ধর্ম সম্পর্কে আরউইনের কোন সুনির্দিষ্ট মতামত ছিল না।

    ডারউইন হবে। আরেক জায়গায় ‘উৎসারন’ লেখেছ, হবে ‘উৎসারণ’।

    একজন বিজ্ঞানী ব্যক্তিগত জীবনে কি ছিলেন- ধর্মবিশ্বাসী নাকি নিধার্মিক, উদার নাকি গোঁড়া, ভাল মানুষ নাকি খারাপ এগুলো কোনো ব্যাপার বলে আমি মনে করি না।

    • পৃথিবী ফেব্রুয়ারী 5, 2011 at 9:27 পূর্বাহ্ন - Reply

      @সৈকত চৌধুরী, সংশোধনীগুলোর জন্য ধন্যবাদ।

      একজন বিজ্ঞানী ব্যক্তিগত জীবনে কি ছিলেন- ধর্মবিশ্বাসী নাকি নিধার্মিক, উদার নাকি গোঁড়া, ভাল মানুষ নাকি খারাপ এগুলো কোনো ব্যাপার বলে আমি মনে করি না।

      আসলে একজন বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা তাঁর গবেষণার বৈজ্ঞানিক মেরিটকে প্রভাবিত না করলেও তাঁর গবেষণার পাবলিক পারসেপশনে সেটি প্রগাঢ় ভূমিকা রাখে। একারণেই এই প্রবন্ধে ডারউইনের ধর্মবিশ্বাসকে হাইলাইট করেছি, যেহেতু প্রবন্ধটি ডারউইনের পাবলিক পারসেপশন নিয়েই লেখা।

      • অভিজিৎ ফেব্রুয়ারী 6, 2011 at 9:36 পূর্বাহ্ন - Reply

        @পৃথিবী,

        ডারউইনের ধর্মবিশ্বাস (কিংবা বিশ্বাস থেকে বিচ্যুতি) নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ লেখা আছে মুক্তমনায় –

        My Religious Belief by Charles Darwin

        লেখাটি ডারউইনের অটোবায়োগ্রাফি থেকে নেয়া। ডারউইন সাধারণতঃ ধর্ম নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাইতেন না। এই লেখাটি তার ব্যতিক্রম। লেখাটিতে ডারউইন পরিস্কারভাবে প্রকাশ করেছেন কিভাবে বিবর্তন তত্ত্বের সত্যতা বুঝবার সাথে সাথে তার ধর্মবিশ্বাস ক্রমশঃ উবে যেতে শুরু করেছিলো, এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ধার্মিক ব্যক্তি থেকে অজ্ঞেয়বাদী ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে উঠেন। …

        I cannot pretend to throw the least light on such abstruse problems. The mystery of the beginning of all things is insoluble to us; and I for one must be content to remain an Agnostic.

  5. সৈকত চৌধুরী ফেব্রুয়ারী 5, 2011 at 1:26 পূর্বাহ্ন - Reply

    বেশ লেখেছ। এ মাসে বিবর্তন নিয়ে অনেক অনেক লেখা চাই।

    বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ডারউইনবাদের প্রভাব নিয়ে চার পর্বের একটা সিরিজ পোষ্ট করার ইচ্ছা আছে, যার মধ্যে এই পোষ্টটিই হবে প্রথম পর্ব।

    জেনে খুশি হলাম।

    মত মুখার্জীর কাছেও সংখ্যা দর্শন ছিল

    সাংখ্য হবে, সংখ্যা নয়। কয়েকবার লিখেছ। উইকিতে হিন্দিতে লেখেছে ‘सांख्य’ পাশে বাংলা উচ্চারণটাও থাকতে পারত। এখানে দেখতে পার।

    বিবর্তনবিদ্যাকে মহাকর্ষের মত শ্বাসত সত্য ধরে

    বানান হবে ‘শাশ্বত’। এডিট করে নিও।

    অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।

  6. লাইজু নাহার ফেব্রুয়ারী 5, 2011 at 12:59 পূর্বাহ্ন - Reply

    ভাল লাগল!

  7. হোরাস ফেব্রুয়ারী 5, 2011 at 12:31 পূর্বাহ্ন - Reply

    (তৎকালীন ইহুদিদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে জোকারদের অভাব ছিল না)!

    ইহুদীরা কেন এত বেশী নোবেল পায় তা এটা থেকেই বোঝা যায়। সেই তখনই ওরা বুঝতে পেরেছিলো বিজ্ঞান দিয়ে ধর্মকে সত্যায়িত না করলে উপায় নাই, বিজ্ঞানের চর্চা ছাড়া উন্নতি সম্ভব না। :))

মন্তব্য করুন জবাব বাতিল