চার্লস ডারউইন-এর ধর্ম বিশ্বাস

[পোষ্টম্যানের কথা: চার্লস ডারউইন তাঁর আত্মজীবনী রচনা করেন ১৮৭৬ সালে। বাংলা ভাষায় সেই আত্মজীবনী অনুবাদ করেন আনোয়ারুল হক খান। নাম দেন- “চার্লস ডারউনের আত্মচরিত”।
আমি ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে সেই বইটির পিডিএফ ফাইল পাই। ফাইলটি দেখে মনে হলো বইটি অনেক পুরোনো এবং লেটার প্রেসে ছাপানো। ১০৮ পৃষ্ঠার বইটি কোন প্রকাশনী ছাপিয়েছিল তার উল্লেখ নাই। মাঝে মাঝে অক্ষরগুলো অস্পষ্ট। ভাবলাম, বইটি কম্পোজ করে মুক্তমনায় তুলে দিলে ভালো হবে। কেউ যদি বইটির প্রকাশনী সম্পর্কে জানেন তাহলে দয়া করে জানাবেন।
বইটির সুচিপত্রে রয়েছে: ১. আমার স্বভাব ও চরিত্রের বিকাশের অনুস্মৃতি …. ২. আমার জন্ম থেকে কেমব্রিজ গমন পর্যন্ত ৩. কেমব্রিজ জীবন ৪. বীগল-এর সমুদ্রযাত্রা ৫. স্বদেশ প্রত্যাবর্তন থেকে আমার বিয়ে অবধি ৬. ধর্মবিশ্বাস ৭. আমার বিয়ে ও লণ্ডন বাস থেকে ডাউনে ৮. আমাদের স্থায়ী বসবাস ৯. ডাউনের বসবাস ১০. আমার কয়েকটি প্রকাশনা।
আমি ধারাবাহিকভাবে বইটি দেবো না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অংশ দেবো। আজ তুলে দিলাম ধর্মবিশ্বাস]

চালর্স ডারউইনের ধর্মবিশ্বাস

এই দু’বছর আমার ঝোঁক হয়েছিল ধর্ম নিয়ে প্রচুর চিন্তাভাবনা করতে। বীগল-এ থাকার সময় আমি বেশ গোঁড়া ছিলাম। মনে পড়ে নৈতিকতার কোনো প্রসঙ্গে অকাট্য প্রমাণ হিসাবে বাইবেলের উদ্ধৃতি দেওয়ায় আমি কয়েকজন অফিসারের হাসির খোরাক হয়েছিলাম (তারা নিজেরা যদিও গোঁড়া ছিল)। আমার ধারণা আমার যুক্তির অভিনবত্বে তারা মজা পেয়েছিল। কিন্তু ক্রমে ক্রমে আমি বর্তমানে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কিংবা বর্বরদের বিশ্বাসগুলির মত ওল্ড টেস্টামেন্টেও আর আস্থা রাখা যায় না। ওল্ড টেস্টামেন্টে স্পষ্টভাবে বর্ণিত জগতের মিথ্যা ইতিহাস, শিরীনের বুরুজ (Tower of borbel), রংধনুকে প্রতীক হিসাবে দেখা ইত্যাদি এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ অত্যাচারীর অনুভূতি ঈশ্বরে আরোপ বিবেচনা করলে এই বইটিতে আর আস্থা রাখা চলে না। তখন সব সময় আমার মনে জাগতো যে প্রশ্ন এবং যাকে কিছুতেই তাড়াতে পারতাম না—এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে ঈশ্বর যদি এখন হিন্দুদের কাছে কোনো প্রত্যাদেশ পাঠান তাহলে সেটা বিষ্ণু শিব ইত্যাদিতে বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আমার কাছে এটা চরম অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল।

খ্রিস্টধর্ম সম্বন্ধে আরও চিন্তাভাবনা করে আমি কিছু কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। যে সব অলৌকিক ঘটনার উপর খ্রিস্টধর্ম প্রতিষ্ঠিত তাতে যে কোনো বিবেকী ব্যক্তির আস্থা জাগাতে হলে সুস্পষ্ট প্রমাণের প্রয়োজন। প্রকৃতির অটল সূত্রগুলি সম্বন্ধে আমরা যত বেশি জানবো, অলৌকিক ঘটনাগুলি তত বেশি অবিশ্বাস্য হবে। সে সময়ের মানুষেরা যে কতখানি অজ্ঞান ও সহজ বিশ্বাসী ছিল তা আমাদের প্রায় ধারণাতীত। গসপেল (Gospel-খ্রিস্টের উপদেশাবলী বা জীবন কাহিনী) যে ঘটনার সাথে যুগপৎভাবে লেখা হয়েছিল তা প্রমাণ করা যায় না, বহু গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিনাটিতে তাদের মধ্যে প্রভেদ রয়েছে, এই প্রভেদ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের স্বাভাবিক ভ্রম হিসাবে গণ্য করা চলে না বলে আমার মনে হয়েছিল। এই যে সব চিন্তা-ভাবনার উল্লেখ করেছি তাদের আদৌ কোনো অভিনবত্ব বা মূল্য না থাকলেও তারা আমাকে প্রভাবিত করেছিল এবং খ্রিস্টধর্মকে ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ হিসাবে মেনে নিতে আমি ক্রমে ক্রমে অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলাম। পৃথিবীর বহু বিস্তৃত অঞ্চলে অনেক মিথ্যা ধর্ম যে বিদ্যুৎচমকের মত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এটারও কিছু প্রভাব আমার উপর পড়েছিল। নিউ টেস্টামেন্টের নীতিকথা খুবই সুন্দর সন্দেহ নেই, কিন্তু এটা আদপেই অস্বীকার করা চলে না যে, এর সর্বাঙ্গসুন্দরতা অংশত নির্ভর করে কিভাবে রূপক-বর্ণনা ও রূপকালঙ্কারকে আমরা ব্যাখ্যা করি তার উপর।

কিন্তু আমার বিশ্বাস ত্যাগ করতে আমি খুবই অনিচ্ছুক ছিলাম। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কারণ আমার বেশ মনে আছে যে আমি ঘন ঘন অলীক কল্পনার জাল বুনে চলেছিলাম যে গসপেলের প্রতিটি বাণীকেই উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিপাদন করেছে সেই সব প্রাচীন চিঠিপত্র বা বিশিষ্ট রোমানদের মধ্যে লিখিত হয়েছিল এবং সেই সব পাণ্ডুলিপি যা পম্পেই কিংবা অন্যত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল। আমার কল্পনাকে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়ার পরে আমি টের পেলাম যে আমার বিশ্বাসকে বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণের উদ্ভাবনা উত্তরোত্তর কঠিন হয়ে উঠেছে। এই অবিশ্বাস খুব ধীরে ধীরে আমার মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছিল, তবে শেষ পর্যন্ত পাকাপোক্ত হয়েছিল। এই গতি এত ধীর ছিল যে আমি কোনো বেদনাবোধ করিনি, এবং তখন থেকে আমার সিদ্ধান্তের সঠিকতা মুহূর্তের জন্যও সন্দেহ পোষণ করিনি। আমি আদৌ বুঝি না কিভাবে কোনো ব্যক্তির পক্ষে খ্রিস্টধর্মের সত্যতার আশা রাখা উচিত। কারণ এটা সত্য হলে বাইবেলের সরল অর্থ অনুযায়ী অবিশ্বাসীরা অনন্তকালব্যাপী শাস্তি ভোগ করবে এবং এই অবিশ্বাসীদের মধ্যে আছেন আমার বাবা, ভাই এবং প্রায় সব শ্রেষ্ঠ বন্ধুরা।

এবং এটা একটা জঘন্য মতবাদ।

যদিও আমার জীবনের খুব শেষের দিকে না পৌছানো পর্যন্ত আমি প্রাতিজনিক ঈশ্বরের (Personal god) অস্তিত্ব নিয়ে বেশি মাথা ঘামাই নি, তবু যেসব আবছা সিদ্ধান্তে আমি এসেছিলাম তার বিবরণ এখানে দেব। প্যালের দেওয়া পূর্বনির্দিষ্ট নিয়তির যে পুরাণ যুক্তি আগে আমার কাছে চূড়ান্ত মনে হয়েছিল সেটা অচল হয়ে পড়েছে যেহেতু এখন প্রাকৃতিক নির্বাচনের সূত্র নিগ্রহের হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা আর এ যুক্তি প্রয়োগ করতে পারি না যে, বিরুদ্ধে তৈরি দরজার কব্জার মত প্রাণীর দ্বিপুটক খোলকের সুন্দর জোড়ও হলো বৃদ্ধিমান প্রাণীর সৃষ্টি। বাতাসের গতিপথের মত জীবের বিভিন্নতায় এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের কর্মকাণ্ডে কোনো পূর্বনির্দিষ্ট নিয়তির কেরামতি আছে বলে মনে হয় না। প্রকৃতিতে সব কিছুই অনড় সূত্রের লব্ধি। তাছাড়া আমার ‘গৃহপালিত জীবজন্তু এবং উদ্ভিদের প্রকারণ’ বইটির পরিশিষ্টে আমি আমি এই বিষয়টি আলোচনা করেছি এবং সেখানে যেসব যুক্তি দেওয়া হয়েছে, আমার মতে সেগুলো কখনও খণ্ডন করা হয়নি।

সর্বত্র আমরা যে অসংখ্য সুন্দর অভিযোজন দেখি তা থেকে এ প্রশ্ন উঠতে পারে যে জগতের এই সাধারণভাবে কল্যাণকর বিন্যাসকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে? কিছু লেখক জগতে দুঃখ-দুর্দশার গুরুভাবে বাস্তবিকই এতটা প্রভাবিত যে পৃথিবীর সব চেতন সত্ত্বার কথা বিবেচনা করে তাঁরা সন্দিহান এখানে। দুঃখের মাত্রা বেশি না সুখের, পৃথিবীটা মোটামুটি একটা ভালো না মন্দ জায়গা। আমার বিচারে সুখের পাল্লাই নিশ্চিতভাবে ভারী, যদিও এটা প্রমাণ করা খুব কঠিন। যদি এই সিদ্ধান্তের সত্যতা মেনে নেওয়া হয় তাহলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলাফলের সাথে সেটা সুন্দরভাবে খাপ খায়। যদি কোনো প্রজাতির সকল সদস্যরাই অভ্যাসগতভাবে প্রচণ্ড মাত্রায় দুঃখ ভোগ করত তাহলে তারা নিজেদের বংশ বিস্তারে অবহেলা করত। কিন্তু এমনটি সব সময় কিংবা অন্তত প্রায়শঃ ঘটেছে বলে বিশ্বাস করার মত কোনো যুক্তি আমাদের নেই। উপরন্তু ভিন্ন কিছু বিবেচনা এই বিশ্বাসে উপনীত করে যে, সাধারণ নিয়ম অনুসারে, সকল চেতন সত্ত্বার সৃষ্টি হয়েছে সুখ ভোগের জন্য।

আমি যেমন বিশ্বাস করি, অন্য কোনো ব্যক্তি যদি সে রকম বিশ্বাস করে যে দৈহিক ও মানসিক সকল অঙ্গই (সেই সব অঙ্গগুলি বাদে যা মালিকের পক্ষে সুবিধাজনকও নয়, অসুবিধাজনকও নয়) প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে কিংবা চর্চা ও অভ্যাসসহ যোগ্যতমের উদবর্তনের ভিত্তিতে উন্নীত হয়েছে, তাহলে তিনি স্বীকার করবেন যে এই অঙ্গগুলি এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে তার মালিকরা অন্য প্রাণীদের সাথে সফলভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে এবং এভাবে বংশ বৃদ্ধি করতে পারে। এখন, কোনো প্রজাতিকে তার সর্বোত্তম মঙ্গলের জন্য এমন কর্মপন্থা অনুসরণ করানো যেতে পারে যা পীড়াদায়ক—যেমন, যন্ত্রণা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং ভয় কিংবা পানভোজন ও বংশবৃদ্ধি প্রভৃতি আনন্দময় কর্মের মাধ্যমে তাকে তার মঙ্গলের লক্ষ্যে চালিত করা যায়। খাবার খাদ্য সন্ধানের মত কাজ, যা এই দু’রকম কাজের সংমিশ্রণ, তার মাধ্যমেও তাকে তার মঙ্গলের লক্ষ্যে চালানো যায়। কিন্তু যে কোনো ধরণের যন্ত্রণা ও কষ্টভোগ যদি দীর্ঘকাল চালানো হয় তাহলে সেটা উৎসাহ ও উদ্যম নষ্ট করে এবং কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়; তথাপি কোনো বড় কিংবা আকস্মিক বিপদ থেকে প্রাণীকে রক্ষা করার জন্য এই যন্ত্রণাভোগ সুন্দরভাবে অভিযোজিত। অপরদিকে, তৃপ্তিকর সংবেদন কোনো বিষন্ন প্রভাব ছাড়াই দীর্ঘকাল চালানো যায়; সম্পূর্ণ বিপরীতে গোটা তন্ত্রটাকে তারা বর্ধিত কর্মে অনুপ্রাণিত করে। এজন্য ব্যাপারটা এ রকম দাঁড়িয়েছে যে, বেশিরভাগ কিংবা সকল সচেতন সত্ত্বা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে এমনভাবে উন্নীত হয়েছে যে তৃপ্তিকর সংবেদনগুলো তাদের অভ্যাসী পরিচালক হিসাবে কাজ করে। আমরা এটা উপলব্ধি করি মেহনত করা থেকে পাওয়া তৃপ্তির মধ্যে, এমন কি কখনও কখনও দেহ ও মনের কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে—আমাদের দৈনিক ক্ষুন্নিবৃত্তির আনন্দে এবং বিশেষভাবে সামাজিক মেলামেশা এবং পরিবারের প্রতি ভালোবাসা থেকে পাওয়া তৃপ্তিকর অনুভূতিতে। আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে অভ্যাসী কিংবা বারবার আবৃত্তিশীল এইসব আনন্দের সমষ্টি বেশির ভাগ সচেতন সত্তাকে দুঃখকষ্ট ভোগ করে। এরকম কষ্টভোগ প্রাকৃতিক নির্বাচনে বিশ্বাসের সাথে সুসঙ্গত। প্রাকৃতিক নির্বাচন স্বীয় কর্মে নিখুঁত নয় বরং বিস্ময়কর জটিল ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে প্রত্যেক প্রজাতিকে অন্য প্রজাতিদের সাথে জীবনযুদ্ধে যতটা সম্ভব সফল করার জন্য প্রয়াস চালায় মাত্র।

জগতে যে অনেক ভোগান্তি আছে এটা কেউ বিতর্ক করে না। কিছু ব্যক্তি মানুষের বেলায় এটাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন এই কল্পনার সাহায্যে যে এটা তার নৈতিক উন্নতি ঘটায়। কিন্তু জগতে অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানুষের সংখ্যা অতি নগণ্য এবং এই অন্য প্রাণীরা কোনো নৈতিক উন্নয়ন ছাড়াই প্রায়শঃ কঠিন কষ্টভোগ করে। ঈশ্বরের মত এত শক্তিমান ও জ্ঞানবান যে সত্ত্বা এই বিশ্ব সৃষ্টি করতে পারেন, আমাদের সীমিত মানসে তিনি সর্বশক্তিমান এবং সর্বজ্ঞ। তাঁর সদাশয়তা অসীম নয় ভাবতে আমাদের বুদ্ধি বিতৃষ্ণা বোধ করে, কারণ তাহলে প্রায় অন্তহীন কালব্যাপী এইসব কোটি কোটি ইতর প্রাণীর নিগ্রহের কি সার্থকতা থাকতে পারে? একটা বোধশক্তিসম্পন্ন স্রষ্টার অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এই দুঃখভোগের স্থিতি থেকে উদ্ভূত পুরাণ যুক্তি আমার কাছে খুব জোরালো বলে মনে হয়। অপরপক্ষে যেটা সবেমাত্র উল্লেখিত হয়েছে, সব প্রাণীই যে প্রকারণ এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে এই ধারণার সাথে প্রচুর দুঃখভোগের বাস্তবতা বেশ সঙ্গতিপূর্ণ।

বেশির ভাগ ব্যক্তি অন্তরে প্রত্যয় ও বোধের যে গভীর অভিজ্ঞতা লাভ করেন তা থেকেই আজকাল একজন বুদ্ধিমান ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে সবচেয়ে স্বাভাবিক যুক্তি দেখানো হয়। কিন্তু এটা সন্দেহ করা চলে না যে হিন্দুরা, মুসলমানরা এবং অন্যান্য এক ঈশ্বরের বা বহু ঈশ্বরের বা বৌদ্ধদের মত ঈশ্বরের নাস্তিক পক্ষে একইভাবে এবং সমান জোরালো যুক্তি দেখাতে পারে। আমরা যাকে ঈশ্বর বলি, অনেক বর্বর গোষ্ঠি যে সেই ঈশ্বরে বিশ্বাস করে—এটা সত্যতার সাথে বলা চলে না। তারা বাস্তবিকই ভূত ও প্রেতে বিশ্বাস করে এবং এটার ব্যাখ্যা করা যায়, যেমন টাইলার ও স্পেনসার দেখিয়েছেন কিভাবে এরকম বিশ্বাস উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা।

যেসব অনুভূতির কথা এখনই উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্বে আমিও সেই সব বোধের দ্বারা চালিত হয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বে এবং অবিনশ্বরতায় দৃঢ় বিশ্বাসী হয়েছিলাম (যদিও আমার মনে হয় না ধর্মগত ভাবপ্রবণতা আমার মধ্যে কখনও প্রবল আকার ধারণ করেছিল)। আমার জার্নালে আমি লিখেছিলাম যে, ব্রাজিলীয় অরণ্যের মোহনীয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার সময়, ‘বিস্ময়, শ্রদ্ধা ও ভক্তি যে উচ্চতর অনুভূতি মনকে পরিপূর্ণ ও উত্তোলিত করে তার বিশদ ধারণা দেওয়া সম্ভব নয়।’ মানুষ যে শুধুমাত্র দেহসর্বস্ব জীব নয়, আমার এই প্রত্যয়ের কথা আমার ভালো রকম মনে আছে। কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে মোহনীয় কোনো দৃশ্যও আমার মনে এরকম বিশ্বাস ও বোধ জাগাতে পারবে না। এটা বাস্তবিকই বলা চলে যে আমার অবস্থা সেই মানুষের মত যে বর্ণান্ধ হয়ে গেছে, আর লৌহিত্যের অস্তিত্বে মানুষের বিশ্বজনীন বিশ্বাস আমার উপলব্ধির এই বর্তমান ক্ষতিকে প্রমাণ হিসাবে কোনো মূল্যই দেয় না। এই যুক্তি সত্য হত যদি সব জাতির সব মানুষেরই এক ঈশ্বরের অস্তিত্বে অভিন্ন আত্মিক বিশ্বাস থাকতো। কিন্তু আমরা জানি যে ব্যাপারটা মোটেই সে রকম নয়। অতএব কোনো কিছুর অস্তিত্বের প্রমাণ হিসাবে এই সব অন্তরস্থ বিশ্বাস ও বোধের আদৌ মূল্য আছে বলে আমার মনে হয় না। মহান দৃশ্যাবলী আগে আমার মনে যে ভাবাবেশ জাগাতো সেটা ভগবদবিশ্বাসের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিল। যাকে প্রায়ই বলা হয় উন্নত ভাবাবেশ তার থেকে এটা আসলে ভিন্ন কিছু ছিল না। এই চেতনার সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করা যত কঠিন হোক, এটাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে আদৌ কোনো যুক্তি হিসাবে খাড়া করা চলবে না। সঙ্গীতও মনে একই রকমের জোরালো কিন্তু অস্পষ্ট অনুভূতির জন্ম দেয়। তাই অন্তরস্থ এই ভাবাবেশকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসাবে চালানো যায় না।

আত্মার অবিনশ্বরতা যে কতটা জোরালো এবং প্রায় সহজ-প্রবৃত্তিজাত বিশ্বাস সেটা আমার কাছে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে অধিকাংশ পদার্থ বিজ্ঞানীদের বর্তমান ধারণাকে বিবেচনা করে। তাঁদের ধারণা যে যথাসময়ে সব গ্রহসহ সূর্য এমন ঠাণ্ডা হলে যে জীবনের অস্তিত্ব সম্ভব হবে না, যদি না বাস্তবিকই কোনো বৃহৎ বস্তু প্রবলবেগে সূর্যের মধ্যে ঢুকে তাকে নতুন জীবন দান করে। আমি যেহেতু বিশ্বাস করি যে সুন্দর ভবিষ্যতে মানুষ বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি সর্বাঙ্গসুন্দর প্রাণী হবে, তাই এ রকম দীর্ঘকাল-চালিত মন্থর অগ্রগতির পর মানুষসহ সব প্রাণীর নিয়তি সম্পূর্ণ বিনাশ একটা অসহনীয় চিন্তা। মনুষ্য আত্মার অবিনশ্বরতায় যারা পুরো বিশ্বাস করে তাদের কাছে আমাদের এই জগতের বিনাশ ততা ভয়ঙ্কর মনে হবে না।

ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসের আর একটি সূত্র অনুভূতির সাথে নয় বরং যুক্তির সাথে সম্পৃক্ত এবং এটাই আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সুদূর অতীত ও দূর-ভবিষ্যতকে বিচারে সমর্থ মানুষসহ এই বিশাল ও বিস্ময়কর বিশ্বকে অন্ধ আপতন বা প্রয়োজনের পরিণাম বলে ধারণা করা অত্যন্ত কঠিন বা প্রায় অসম্ভব। এভাবে অনুচিন্তা করার সময় আমি এমন একজন স্রষ্টার প্রত্যাশা করতে বাধ্য হই যার কিছুটা মানুষের অনুরূপ বুদ্ধিমান মন রয়েছে, আর তাই আমি আস্তিক বলে গণ্য হওয়ার যোগ্য।

আমার যতদূর মনে পড়ে, যখন আমি ‘প্রজাতির উৎপত্তি’ লিখেছিলাম মোটামুটি সে সময় আমার মন এই সিদ্ধান্তই প্রবল ছিল। কিন্তু তারপর থেকে খুব ক্রমান্বয়ে এবং অনেক কমা-বাড়ার সাথে সাথে এটা দূর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু তখনই সন্দেহ জাগে—ইতরতম প্রাণীর অনুন্নত মন থেকেই মানুষের মন পূর্ণতা পেয়েছে বলে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করি, তাই এহেন মন যখন মহান সিদ্ধান্তে উপনীত হয় তখন কি তাকে বিশ্বাস করা চলে? কার্য-কারণ সূত্রের পরিণাম হিসাবে যেটা আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় মনে হয়, আসলে এমন কি হতে পারে না যে এটা বংশগতিসূত্রে পাওয়া অভিজ্ঞতা মাত্র। আমাদের এ সম্ভাবনাটুকুও উপেক্ষা করা ঠিক নয় যে শিশুদের মনে ভগবদবিশ্বাস অবিরত ঢোকালে তাদের আপাত অপরিণত মস্তিষ্কে জোরালো এবং সম্ভবত বংশগত প্রভাব সৃষ্টি করে। ফলে তাদের পক্ষে ভগবদবিশ্বাস ঝেড়ে ফেলা ততটা কঠিন—ঠিক যেমন একটা বানরের পক্ষে সর্পদর্শনে তার প্রবৃত্তিজাত ভয় ও ঘৃণা ঝেড়ে ফেলা কঠিন।

এরকম দুর্বোধ্য সমস্যার উপর সামান্যতম আলোকপাত করতে পারি বলে আমি ভান করতে পারি না। সবকিছুর সূত্রপাতের রহস্য সমাধান করা আমাদের অসাধ্য। আর তাই আমার মত লোকের পক্ষে অজ্ঞাবাদী হিসাবে সন্তুষ্ট থাকা উচিত।

যে ব্যক্তির নিজস্ব ঈশ্বরের অস্তিত্বে নিশ্চিত ও সনাতন বিশ্বাস নেই এবং শাস্তি ও পুরস্কারসহ পুনর্জন্মে আস্থা নেই, আমার জ্ঞানবুদ্ধি অনুযায়ী তিনি জীবনের পথনির্দেশক নীতি হিসাবে অনুসরণ করতে পারেন সেই সব আবেগ ও সহজ-প্রবৃত্তি যেগুলো সবচেয়ে জোরালো কিংবা যেগুলো তার কাছে সর্বোৎকৃষ্ট মনে হয়। কুকুরেরা এভাবেই আচরণ করে, কিন্তু এটা তারা করে অন্ধভাবে। অপরদিকে মানুষ অতীত ও ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করে এবং তার অনুভূতি, অভিলাষ এবং অনুস্মৃতির তুলনামূলক বিচার করে। সব শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিদের রায় অনুসারে সে তখন উপলব্ধি করে যে যাকে সামাজিক প্রবৃত্তি বলে সেই সব নির্দিষ্ট আবেগের অনুসরণে পরম সন্তোষ লাভ করা যায়। অন্যের কল্যাণের জন্য কাজ করলে সে তার সগোত্র মানুষের অনুমোদন পাবে এবং যাদের মধ্যে সে বাস করে তাদের ভালোবাসা পাবে এবং নিঃসন্দেহে এই শেষের লাভটাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আনন্দ। ক্রমে ক্রমে তার উচ্চতর আবেগের পরিবর্তে ইন্দ্রিয়গত আবেগের অনুসরণ তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠবে। এই উচ্চতর আবেগের অনুসরণ যখন অভ্যাসগত হয়ে ওঠে তখন তাকে প্রায় সহজ প্রবৃত্তি বলা চলে। কখনও কখনও তার বিচারবুদ্ধি তাকে অন্যদের মতের বিরুদ্ধে কাজ করতে বলতে পারে, তখন সে তাদের অনুমোদন পাবে না। কিন্তু নিজের অন্তরতম নিয়ন্তা বা বিবেকের অনুসরণ করেছে জেনে সে তবুও দৃঢ় সন্তোষ লাভ করবে। আমার নিজের সম্বন্ধে আমি বিশ্বাস করি যে অবিচলিতভাবে বিজ্ঞানের অনুসরণ করে এবং নিজের জীবনকে বিজ্ঞানে উৎসর্গ করে আমি সঠিক কাজ করেছি। বড় রকমের কোন পাপ করার মনস্তাপ আমি বোধ করি না। কিন্তু আমার সগোত্র মানুষের প্রত্যক্ষ কল্যাণের জন্য আমি আরও কিছু করিনি ভেবে বার বার দুঃখ বোধ করেছি। আমার একমাত্র ও দূর্বল অজুহাত হল অত্যন্ত খারাপ স্বাস্থ্য ও আমার মানসিক গঠন, যেটা আমার পক্ষে এক বিষয় বা পেশা থেকে অন্য প্রসঙ্গে মন দেওযা কঠিন করে তোলে। লোকহিতৈষণায় নিজের পুরো সময়টা কাজে লাগানোর কল্পনা আমাকে পরম আনন্দ দেয়, কিন্তু সময়ের অংশবিশেষ নয়, যদিও এটা অনেক উন্নততর আচরণবিধি হত।

আমার জীবনের শেষ অর্ধে সংশয়বাদ বা যুক্তিবাদের যে বিস্তার ঘটেছিল তার চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য আর কিছু নয়। বিয়েতে জড়িয়ে পড়ার আগে আমার বাবা আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন নিজের সন্দেহগুলিকে যত্নের সাথে গোপন রাখতে। কারণ হিসাবে তিনি বলেছিলেন যে এগুলো বিবাহিত ব্যক্তিদের জীবনে চরম দূর্দশা ঘটিয়েছে বলে তিনি জেনেছেন। স্বাস্থ্য ভেঙে না পড়া পর্যন্ত সবকিছু সুন্দরভাবে চলে। কিন্তু তারপর কিছু মহিলা স্বামীদের মোক্ষলাভের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে ওঠেন এবং চরম দুঃখভোগ করেন এবং একইভাবে স্বামীদের যন্ত্রণাভোগ করান। বাবা আরও বলেছিলেন যে, তাঁর গোটা জীবনে তিনি মাত্র তিনজন মহিলাকে সংশয়বাদী বলে জেনেছেন। এটা মনে রাখা উচিত যে বহু মানুষের সাথে তাঁর ভালো পরিচয় ছিল এবং তাঁর অসাধারণ ক্ষমতা ছিল আস্থা অর্জনের। আমি এই তিন মহিলার পরিচয় জানতে চাওয়ায় তাঁকে স্বীকার করতে হয়েছিল যে তাঁদের মধ্যে একজন তাঁর শ্যালিকা কিটি ওয়েজউড। তিনি অবশ্য জানিয়েছিলেন যে তাঁর কাছে কোনো ভালো প্রমাণ নেই, শুধুমাত্র খুব আবছা আভাস, যেটা এই দৃঢ় বিশ্বাস দ্বারা পুষ্ট হয়েছে যে এরকম স্বচ্ছদৃষ্টিসম্পন্ন মহিলা ভগবদবিশ্বাসী হতে পারেন না। বর্তমানে আমার পরিচিত জনের ক্ষুদ্র পরিধির মধ্যে আমি বেশ কয়েকজন বিবাহিত মহিলাকে জানি (কিংবা জেনেছি) যাঁরা তাঁদের স্বামীদের তুলনায় খুব বেশি বিশ্বাসী নন। বাবা একটা অকাট্য যুক্তি উদ্ধৃত করতেন। মিসেস বারলো নামের এক মহিলা বাবার ধর্মবিশ্বাসে সন্দেহ পোষণ করতন। বাবাকে ধর্মে দীক্ষিত করার আশায় ঐ মহিলা এই অকাট্য যুক্তি প্রয়োগ করেছিলেন—“ডাক্তার, আমি জানি যে চিনি আমার মুখে মিষ্টি লাগে এবং আমি জানি যে আমার ত্রাণকর্তা যীশুখ্রিস্ট বেঁচে আছেন।”

[124 বার পঠিত]