পোষ্টম্যানের কথা: ১ এপ্রিল, ২০১০ তারিখে প্রদীপ দেব ‘জগদীশচন্দ্র বসু’ নামে একটি জীবনচরিত উপহার দিয়েছিলেন। ঐ সময় লেখাটি মাত্র ৩৩ বার পঠিত হয় এবং ৩ টি মন্তব্য আসে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে জীবন চরিত পাঠে মুক্তমনাদের আগ্রহ খুবই কম। অভিজিৎ রায় মন্তব্যে বলেছিলেন- “শিক্ষানবিস অনেকদিন ধরেই বলছিলো বাংগালী বিজ্ঞানীদের জীবনী এবং কাজ নিয়ে আর্কাইভ তৈরি করবে।”

এমন মহতী উদ্যোগের প্রশংসা করতেই হয়। সেই মহতী উদ্যোগকে ফলপ্রসূ করতে মুক্তমনা লেখকদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। এখন পর্যন্ত মুক্তমনায় বাঙ্গালী বিজ্ঞানীদের জীবনী নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য পোষ্ট নাই বললেই চলে।

প্রদীপ দেব জগদীশ চন্দ্রের জীবন-চরিতে উল্লেখ করেন- “জগদীশচন্দ্র ছিলেন মাতৃভাষা ও স্বদেশী ভাবধারার বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ। ১৮৯১ সাল থেকে তিনি বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। ‘মুকুল’, ‘দাসী’, ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’ প্রভৃতি পত্রিকায় লিখেছেন। তাঁর ‘অব্যক্ত’ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন।”

‘অব্যক্ত’ বইটি জগদীশচন্দ্রের সমগ্র রচনার একমাত্র সংকলন। এটি প্রথম প্রকাশ হয় বাংলা ১৩২৮ সনে। পরবর্তীতে প্রকাশ করে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র; এবং ভূমিকা লেখেন আব্দুল হক খন্দকার। জগদীশ চন্দ্র বইটি রবীন্দ্রনাথকে উপহার দিয়েছিলেন। উপহার পেয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন– “…..যদিও বিজ্ঞানরাণীকেই তুমি তোমার সুয়োরানী করিয়াছ তবু সাহিত্যসরস্বতী সে পদের দাবী করিতে পারিত- কেবল তোমার অনবধানেই সে অনাদৃত হইয়া আছে”।

আব্দুল হক খন্দকার বলেন– “…প্রবন্ধগুলোতে তিনি যে সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন তা অনন্যসাধারণ। এসব রচনায় বিজ্ঞানের গাম্ভীর্যই যে শুধু অনুপস্থিত তাই নয়, এগুলিতে এমনই কাব্যরসের মাধুর্য ও সুষমার সংমিশ্রণ ঘটেছে যে তা উচ্চাঙ্গের সাহিত্য পদবাচ্য হয়ে উঠেছে।”

অফ টপিকে একটা কথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, মুক্তমনার বিজ্ঞান বিষয়ক অনেক লেখকের লেখাগুলোও উপরোক্ত মহিমার সাথে তুলনীয়। তাদের রচনাগুলো পড়লে সাহিত্যের রস আস্বাদন করা যায়। এতে কোনই সন্দেহ নাই।

জগদীশচন্দ্র ‘অব্যক্ত’ বইয়ের কথারম্ভে আছে– “বন্ধুবর্গের অনুরোধে বিক্ষিপ্ত প্রবন্ধগুলি পুস্তকাকারে মুদ্রিত করিলাম। চতুর্দিক ব্যাপিয়া যে অব্যক্ত জীবন প্রসারিত, তাহার দু-একটি কাহিনী বর্ণিত হইল।”

‘অব্যক্ত’ বইয়ের প্রবন্ধগুলো বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় যে জগদীশচন্দ্র ছিলেন দার্শনিক-বিজ্ঞানী। বইটিতে ‘নবীন ও প্রবীণ’ নামে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। সেই প্রবন্ধের একটি অংশ ‘দলাদলি’ নামে স্থান পেয়েছে। আজ মুক্তমনা পাঠকদের উদ্দেশ্যে সেটি তুলে দিলাম যা আমাদের অব্যক্ত জীবনেরই অংশ। মুক্তমনায় মাঝে মাঝে বিতর্ক হয়, সেই বিতর্ক কখনও কখনও অন্যদিকে মোড় নেয়। কখনও কখনও পক্ষ-বিপক্ষের মাঝে ব্লগের পুরো পরিবেশটাই হয়ে ওঠে আনন্দমুখর। আবার কখনও কখনও অবস্থাটা হয় দুঃখভারাক্রান্ত।

গত ২৭ জানুয়ারী, ২০১০ তারিখে প্রবীণ লেখক ড. নৃপেন্দ্র সরকার ‘মুক্তমনা মডারেশন – আমার অনাবশ্যক ভাবনা’ নামে একটি পোষ্ট দিয়েছিলেন দুঃখভারাক্রান্ত পরিবেশটাকে ভারমুক্ত করার লক্ষ্যে। কিন্তু সেটা নিয়ে প্রবীণ ও নবীনদের মধ্যে মতপার্থক্যমূলক মন্তব্য স্থান পায়। তিনি প্রথম বাক্য শুরু করেছিলেন- “প্রথমেই মাফ চেয়ে নিচ্ছি – ঘোড়া ডিংগিয়ে ঘাস খাওয়ার জন্য”; আর শেষ করেছিলেন- “মুক্তমনায় ভুল বুঝাবুঝি নিরসনে কল্পে আমার সামান্য প্রচেষ্টা মাত্র। মুক্তমনার সুস্থ পরিবেশ চিরজীবি হউক” বাক্যগুলো দিয়ে।

কেশব অধিকারী মন্তব্যে বলেন- “…যেহেতু লিখে আমরা কথা বলি, তাই কিছু অব্যক্ততা তো থেকেই যায়, বোধ্যা পাঠক মাত্রই তা বুঝে নেন নিজ অভিজ্ঞায়। আমরা তো মাত্র ক’জনা, এখানে মতভেদ থাকবে, কথা চালাচালি থাকবে আর যা থাকবে তা হলো নতুন তথ্য এবং সংবাদ। নতুন চিন্তা। আমি খুব প্রাণময় দেখি যখন তরুণ প্রজন্মের অনেক অনেক মেধা চিরাচরিত পথে না যেয়ে নতুন ভাবনা মুক্ত মন নিয়ে এখানে এই স্রোতে সামিল হন।…”

কেশব অধিকারী পোষ্টটিতে ড. নৃপেন্দ্র সরকারকে উদ্দেশ্যে করে বলেছিলেন- “আপনার আজকের এই পোষ্টটির সাথে আমি একমত না দ্বিমত পোষন করি এটি বড় কথা নয়, বড় কথা হলো, এখানে অনেকেই এতো বড় যে আমি কয়েকবার জন্মালেও হয়তো তাঁদের ছুঁতে পারবো না। কাজেই ভাবুন পরিবারটি কতো সমৃদ্ধ! এরকম একটি ছাঁয়ায় আছি বলে আমার গর্বের শেষ নেই! যে যাই বলুক না কেনো, আমি আপনার এই পোষ্টটিকে একটি সতর্ক বার্তা হিসেবেই দেখি। নিশ্চয়ই এর প্রভাব আমাদের সবার মনেই পড়বে কম আর বেশী।”

যাহোক ঐসব মুহূর্তগুলোতে বার বার জগদীশচন্দ্র বসুর ‘দলাদলি’ লেখাটির কথা মনে পড়ছিল। আশা করা যায় ‘দলাদলি’টা আমাদের যথেষ্ঠ উপকার করবে এবং আমাদের সকলেরই বিশেষত আমাদের মত নবীনদের কিছু না কিছু বোধোদয় ঘটাবে। লেখাটি আমাদের জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ।

————————————————–

দলাদলি
লেখক: জগদীশচন্দ্র বসু

জীবনের বহু বাধাবিপত্তির সহিত সংগ্রাম করিয়া ও নানা দেশ পরিভ্রমণের ফলে জানিতে পারিয়াছি, সফলতা কোথা হইতে আসে এবং বিফলতা কেনই বা হয়। আমি দেখিয়াছি যে, যে অনুষ্ঠানে কর্তৃত্ব শুধু ব্যক্তিবিশেষের উপর ন্যস্ত হয়, যেখানে অপর-সকলে নিজেদের দায়িত্ব ঝাড়িয়া ফেলিয়া দর্শকরূপে হয় শুধু করতালি দেন, না হয় কেবল নিন্দাবাদ করেন, সেখানে কর্ম শুধু কর্তার ইচ্ছাতেই চলিতে থাকে। দেশের কল্যাণের জন্য যে শক্তি সাধারণে তাঁহার উপর অর্পণ করিয়াছিল, এমন একদিন আসে, যখন সেই শক্তি সাধারণকে দলন করিবার জন্য ব্যবহৃত হয়। তখন দেশ বহু দূরে সরিয়া যায় এবং ব্যক্তিগত শক্তি উদ্দামভাবে চলিতে থাকে। ইহাতে দলাদলির যে ভীষণ বহ্নি উদ্ভূত হয় তাহা অনুষ্ঠানটিকে পর্যন্ত গ্রাস করিতে আসে। দলপতি যদি তাঁহার সহকারীদিগকে কেবল যন্ত্রের অংশ মনে না করিয়া প্রত্যেকের অন্তর্নিহিত মনুষ্যত্বকে জাগরূক করিয়া তুলিতে চেষ্টা করেন তাহা হইলেই দেশের প্রকৃত কল্যাণ সাধিত হয়। এই কারণে সাহিত্য পরিষদে ব্যক্তিগত প্রাধান্যের পরিবর্তে সাধারণের মিলিত চেষ্টা যাহাতে ফলবতী হয় সেজন্য বিবিধ চেষ্টা করিয়াছি। প্রতিষ্ঠিত কোনো সাহিত্য-সমিতিকে খর্ব করিয়া নিজেরা বড়ো হইবার প্রয়াস আমি একান্ত হেয় মনে করি বলিয়া প্রত্যেক সমিতির আনুকূল্য ও শুভ ইচ্ছা আদা-প্রদানের জন্য চেষ্টিত হইয়াছি। সাধারণ সদস্যদিগের উদ্যমের উপর পরিষদের ভাবী মঙ্গল যে বহুল পরিমাণে নির্ভর করে, একথা স্মরণ করাইয়া তাঁহাদিগকে লিখিয়াছিলাম- ‘পরিষদের সভাপতি, সম্পাদক ও কার্যনির্বাহক সভা সাহিত্য পরিষদের মূখ্য উদ্দেশ্য সাধনের উপলক্ষ মাত্র।’ আরও লিখিয়াছিলাম যে, ‘সদস্যগণ যদি নিজেদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়া নিঃস্বার্থ ও কর্তব্যশীল সভ্য নির্বাচিত করেন তাহা হইলেই পরিষদের উত্তরোত্তর মঙ্গল সাধিত হইবে। এ সম্বন্ধে তাঁহাদের শৈথ্যল্যই ভবিষ্যৎ-দূর্গতির কারণ হইবে।’ এই সহজ পথ অপেক্ষা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে অবলম্বিত উপায় কি শ্রেয় হইবে? তথায় প্রতিযোগিতারই পূর্ণ প্রকাশ। সহযোগিতা কি আমাদের সাধনা নয়? রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে পক্ষ ও বিপক্ষের ভেদ প্রবল হইয়া উঠে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের ছিদ্র অন্বেষণ করে ও কুৎসা রটায়, অন্য পক্ষও জবাবে এক কাঠি উপরে উঠেন। ইহার শেষ কোথায়? যে চিত্তবৃত্তির মহৎ উচ্ছাসে সাহিত্য বিকশিত হয় তাহা কি এইরূপ পক্ষে নিমজ্জিত হইবে?

নবীন ও প্রবীণের মধ্যে একটা বৈষম্য আছে। তবে তাহাই বিসংবাদের প্রধান কারণ নহে। ব্যক্তিবিশেষের আত্মম্ভরিতাই প্রকৃত দলাদলির কারণ; ইহা প্রবীণ ও নবীন কাহারও নিজস্ব নহে। প্রবীণ অতি সাবধানে চলিতে চাহেন, কিন্তু পৃথিবীর গতি অতি দ্রুত। যদিও বার্ধক্য তাহার শরীরে জড়তা আনয়ন করে, মন তো তাহার অনেক উপরে, সে তো চিরনবীন। মন কেন সাহস হারাইবে? অন্য দিকে নবীন, অভিজ্ঞতা অভাবে হয়তো অতি দ্রুত চলিতে চাহেন এবং বাধার কথা ভাবিয়া দেখেন না। যাহারা বহুকাল ধরিয়া কোনো অনুষ্ঠানকে স্থাপিত করিয়াছেন, তাঁহাদের সেই প্রয়াসের ইতিহাস ভুলিয়া যান। হয়তো কখনও প্রবীণের বহু কষ্টে অর্জিত ধন নবীন বিনা দ্বিধায় নিজস্ব করিতে চাহেন। প্রবীণ ইহাতে অকৃজ্ঞতার ছায়া দেখিতে পান। সে যাহা হউক, ধরিত্রী প্রবীণকেও চায়, নবীনকেও চায়। প্রবীণ ভবিষ্যতের অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনে যে উদ্বিগ্ন না হন, আর নবীনও যেন প্রবীণের এতদিনের নিষ্ঠা শ্রদ্ধার চক্ষে দেখেন। যে দেশে আমাদের সামাজিক জীবনে নবীন ও প্রবীণের কার্যকলাপের মধ্যে সামঞ্জস্য সাধিত হইয়াছে, সে স্থানেও কি একথা আমাকে বুঝাইয়া দিতে হইবে?

পরিষদের কার্য সাধারণ সদস্যগণের নির্বাচিত কার্যনির্বাহক সমিতি দ্বারা পরিচালিত হয়। তাঁহারাই সাধারণর প্রতিভু হইয়া আসেন; তাঁহাদের অধিকাংশের মতের দ্বারাই প্রতি বিষয় নির্ধারিত হইয়া থাকে। ইহা ব্যতীত কার্য সম্পাদনের অন্য উপায় নাই। যদি ইহাতে ব্যক্তিবিশেষের মত গৃহীত না হয় এবং তজ্জন্য যদি কেন পরিষদের সকল কর্ম ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইতে চাহেন তবে উহাকে ছেলেদের আবদার ছাড়া কি বলা যাইতে পারে? আর একটা কথা – অতীতের ত্রুটি সম্পূর্ণ মুছিয়া না ফেলিলে কোনো নূতন প্রচেষ্টা একেবারেই অসম্ভব।
যে সব ত্রুটির কথা বলিলাম তাহা একান্ত সাময়িক। বাদানুবাদের অনেক কথা শুনিয়াছিলাম। অনুসন্ধান করিয়া জানিলাম, তাহার অনেকটা তিলকে তাল করিবার অভ্যাস হইতে। আমি উভয় পক্ষকেই, তাঁহাদের সহিত এ বিষয়ে আলোচনা করিয়াছি। দেখা গেল, বিবাদের প্রকৃত কারণ কিছু নাই বলিলেই হয়।

———————

ড. আহমদ শরীফের উক্তি:
১. দেখতে শুনতে বলতে করতে যা কুৎসিত, তা পরিহার করে চলা, নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিশ্বাসের মাপে যা অসত্য, অন্যায়, অসততা, অসঙ্গত, অবাঞ্ছিত, চিন্তা-কর্ম আচরণে তা এড়িয়ে চলা, সমাজ-সদস্য হিসেবে যথাস্থানে যথাসময়ে যথাপ্রয়োজনে যথাযোগ্য ও যথাসাধ্য নৈতিক-সামাজিক-মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করাই আমার ধর্ম।

২. কোন্‌ প্রয়োজনে কোন্‌ অবস্থায় ও অবস্থানে আমাদের কি কর্তব্য, কোন্‌ বিপদ এড়ানোর জন্যে কোন্‌ উপায় বা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, কার সঙ্গে কোন্‌ পরিস্থিতিতে কিরূপ ব্যবহার করা সমীচীন, তা আমরা অতীতের অপরের অভিজ্ঞতা থেকে তথা আমাদের অর্জিত জ্ঞান থেকে বুঝতে পারি।

৩. নির্লোভতা ও প্রয়োজনে ক্ষতি স্বীকারের শক্তিই ব্যক্তিজীবনে অপরাজেয় শক্তি।

৪. অনুতপ্তের অপরাধবোধ থেকে সহজেই দ্রুত জাগ্রত হয় বিবেক এবং জাগ্রতবিবেক সদ্বুদ্ধি ও সদিচ্ছা যোগায়।

৫. যে মানববাদী নয়, মানবতার অনুশীলন যার নেই, যে মানুষের প্রতি প্রীতিমান নয়, সে মানুষের হিতকামী হতে পারে না, মানবসেবী হওয়ার যোগ্যতা তার থাকে না।

[79 বার পঠিত]