গীতা দাস তাঁর সংখ্যালঘুর মানচিত্র (১২) তে বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মালম্বীদের সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। । আমি ওই লেখায় একটা মন্তব্য করেছিলাম। নিজের জন্মভূমি  ছেড়ে ভারতে যাবার পরে এই সমস্ত লোকেরা নিজেদেরকে কীভাবে খাপ খাওয়ায় সেই বিষয়টা জানার উদ্দেশ্যেই মন্তব্যটা করা হয়েছিল। মন্তব্যটা ছিল এরকমঃ

 

কোন পরিস্থিতিতে পড়লে মানুষ নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় সেটা বুঝি বলে এ নিয়ে আমার কোনো ছ্যুঁৎমার্গ নেই সুখে থাকলে নিশ্চয়ই কেউ দেশত্যাগ করে নাতবে, আমার একটা ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন আছেদেশ ছেড়ে হিন্দুরা যখন ইন্ডিয়াতে যান, তখন কি সত্যিই সত্যিই তারা ভাল থাকেন দেশের চেয়ে? এ বিষয়ে কি কারো কোনো অভিজ্ঞতা জানা আছে? বিহারিদের ক্ষেত্রে যেমন একবার পত্রিকায় একটা রিপোর্ট পড়েছিলামবাংলাদেশে আটকে পড়া অনেক বিহারি-ই পাকিস্তানকে তাঁদের স্বপ্নের দেশ বলে মনে করেনঅনেকেই চোরাই পথে পাকিস্তানে পাড়িও জমিয়েছেনকিন্তু পাকিস্তানে যাবার পরে তাঁদের বোধোদয় ঘটেছে যে ওটা আসলে তাঁদের দেশ নয়এঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার চোরাই পথে ফিরে এসেছেন বাংলাদেশেএ কারণেই মনে হয় নতুন প্রজন্মের বিহারি-রা বাংলাদেশি বনে যাবার দিকেই বেশি ঝুঁকেছে

 

আমার মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ভজন সরকার, সংশপ্তক এবং সেন্টু টিকাদার ভারতে চলে যাওয়া বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বা কোন ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন সে বিষয়ে বেশ কিছুটা আলোচনা করেন। এর পরপরই আমি আমার দ্বিতীয় মন্তব্য করি। সেই মন্তব্যটা ছিল এরূপঃ

আমি যখন জানতে চেয়েছিলাম যে, বাংলাদেশের দেশত্যাগী হিন্দুরা ভারতে গিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে ভাল থাকেন কি না, তখন যে বিষয়গুলো আমার মাথার মধ্যে ছি্ল, তার দুটো হচ্ছে এঁদের বাঙাল উচ্চারণ এবং ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবার বিষয়টিএ দুটো বিষয়ই আপনার বিশদ এবং ভজনদার সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে উঠে এসেছেএর বাইরে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁরা নিজেদেরকে কীভাবে খাপ খাওয়ায় সে বিষয়টাও জানার আগ্রহ রয়েছে আমার এটা নিশ্চয় খুব সহজ কাজ নয়আজন্ম পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন একটা দেশে মিথ্যা নাগরিক সেজে সেখানে শিকড় গাড়াটা ভয়ংকর কঠিন কাজই হবার কথাজান-মাল বা সম্মানের উপর আসন্ন হুমকি এলে ভিন্ন কথা, কিন্তু অনাগত দিনে আক্রমণ হতে পারে, এই আশংকায় যাঁরা দেশ ছাড়েন, তাঁরা কি বিনিময় মূল্যটা একটু বেশি-ই দিয়ে ফেলেন না?

আমার এই মন্তব্যটা আপাত দৃষ্টিতে নিরীহ বলেই মনে হবে। কিন্তু এর শেষ লাইনটা মারাত্মক রকমের অসংবেদনশীল ছিল। যদিও অনিচ্ছাকৃত, কিন্তু অসংবেদনশীল যে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই। তবে, দুঃখজনক হচ্ছে যে, মুক্তমনার কেউ-ই আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে এটি দেখিয়ে দেন নি। কমল নামের একজন ভদ্রলোক চার লাইনের একটা অতি পুরাতন কবিতা পোস্ট করেন মন্তব্য হিসাবে। এই কবিতার চারটা লাইন আমাকে চাবুকের মত আঘাত হানে। আমার উপলব্ধি ঘটে এই ভেবে যে, তাইতো একজন হিন্দু কোন বিনিময় মূল্যের হিসাবে দেশ ছেড়ে ভারতে যাচ্ছেন সেটা বোঝার ক্ষমতাতো আমার থাকার কথা নয়। আমিতো এর মধ্য দিয়ে যাই নি। আমাকে প্রতিনিয়ত মালাউন বলে গালি শুনতে হয় নি। জন্মের পরেই জানতে হয় নি যে এই দেশে আমি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। আমার ধর্মের কারণে আমার দেশপ্রেম নিয়ে কটাক্ষ শুনতে হয় নি। যদিও যোগ্যতা ছিল না, তবুও কখনো উপলব্ধি হয় নি যে, এই দেশের রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ে কোনো পদে যেতে গেলে আমার ধর্ম বিশ্বাস বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সাম্প্রদায়িক কোনো উত্তেজনাকর মুহুর্তে জান হাতে রেখে দুরুদুরু বুকে আমাকে ঘাতকদের পদধ্বণি শুনতে হয় নি। কিংবা ছোট বোনকে ধর্ষণ করার জন্য বখাটেরা রাতের বেলা সারি বেঁধে এসে দাঁড়ায় নি আমাদের বাড়ির উঠোনে। এর কোনো কিছুই যখন আমাকে সামলাতে হয় নি, তাহলে কোন অধিকারে আমি একজন মানুষের দেশত্যাগের বিনিময় মূল্য কম না বেশি ধার্য্য করি?

আমার জন্ম এবং বেড়ে উঠা পুরোটাই ঢাকা শহরে। এই বিশাল শহরে সাম্প্রদায়িকতা খুব একটা দৃশ্যমান নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আমার বন্ধুদের একটা বড় অংশ ছিল হিন্দু। এদের কারণে ক্যাম্পাস জীবনের একটা বিরাট সময় আমাকে কাটাতে হয়েছে জগন্নাথ হলে। এরপর শিক্ষকতার কারণে আমাকে চলে যেতে হয় ময়মনসিংহে। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল লোকজনের প্রাচুর্যের কারণে সাম্প্রদায়িকতা থাকে কম, তার উপরে ময়মনসিংহ সবসময় হিন্দু প্রধান শহর ছিল ইতিহাসের এক দীর্ঘ সময় জুড়ে। বর্তমানে সংখ্যার হিসাবে হিন্দুরা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রভাব প্রতিপত্তি খুব একটা কমেনি এই শহরে এখনো তাদের। হিন্দু প্রধান হবার কারণে হোক বা দীর্ঘদিন হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি থাকার কারণেই হোক, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অত্যন্ত চমৎকার ময়মনসিংহে। ফলে, সাম্প্রদায়িকতার ভয়াল চেহারাটা চাক্ষুস করা হয় নি কখনো আমার। যা কিছু সবই পত্রিকা পড়ে বা এর ওর কাছ থেকে শুনে। এতে করে বিষয়টা জানা যায় হয়তো, কিন্তু এর সঠিক উত্তাপটা গায়ে লাগে না সেরকম করে। উপলব্ধিটা শাণিত হয় না প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অভাবে। 

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার সূত্রপাত ঘটেছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্মের সময়ে। এর আগে শতশত বছর ধরে হিন্দু এবং মুসলমানেরা পূর্ববাংলায় বড় ধরনের কোনো ঝামেলা ছাড়াই সহাবস্থান করে এসেছে। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে হালকা পাতলা ঝগড়াঝাটি এবং মনকষাকষি যে হয় নি তা নয়, তবে দাঙ্গা-ফ্যাসাদের মত রক্তারক্তি কাণ্ডে তা রূপান্তরিতি হয় নি কখনো। এই বিষবৃক্ষের বীজ বপন করেছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রটিই। তার জন্মের প্রয়োজনে এবং পরবর্তীতে টিকে থাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টায়।

পাকিস্তানের জন্মের সময়ে পূর্ববাংলায় হিন্দুর সংখ্যা ছিল প্রায় তিরিশ শতাংশ। এই তিরিশ শতাংশের হাতেই ছিল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র হিন্দুদের প্রতি বৈরী হবার কারণে এই শক্তিকে তাঁরা কাজে লাগাতে পারেন নি। বরং তাঁদের শক্তিকে খর্ব করার জন্য রাষ্ট্র একে একে নানান ধরনের আইন-কানুন পাশ করতে থাকে। আর এতে করেই বিপন্নবোধ করতে থাকে হিন্দুরা। রাষ্ট্রের এই একপেশে আচরণের কোনো পালটা জবাব তাঁদের হাতে ছিল না। এই বিপন্নতার কারণেই শুরু হয় হিন্দুদের ভারতগামী সমুদ্রসম মিছিল। ১৯৪১ সালের আদমশুমারীতে বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলে যেখানে হিন্দুর সংখা ছিল ঊনত্রিশ শতাংশ, সেখানে ১৯৯১ সালে সেটা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশে। ২০০১ সালের আদমশুমারীতে এই সংখ্যা মাত্র ৯ শতাংশ। এই হারে চলতে থাকলে বাংলাদেশ যে একদিন হিন্দুশূন্য মোসলমানের দেশ হয়ে যাবে সে কথা বলাই বাহুল্য।

পাকিস্তান আমলে হিন্দুদের কফিনে শেষ পেরেকটা মারা হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পরে শত্রু সম্পত্তি আইন করে। মজার বিষয় হচ্ছে যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেও এই আইনটি বাতিল হয় নি। নিজের দেশের লোককে শত্রু বলতে লজ্জা লাগার কারণেই হয়তো এখন এর নতুন নামকরণ করা হয়েছে অর্পিত সম্পত্তি আইন। তবে নাম যাই হক না কেন এর মূল বিষয়বস্তু একই। এবং মূল কাজও একই। ছলে বলে কৌশলে এবং শক্তি প্রয়োগে হিন্দুদের সহায় সম্পত্তি দখল করে নেওয়া।

একটা দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র যদি কোনো এক শ্রেণীর নাগরিককে শত্রু দেশের নাগরিকদের মত বিবেচনা করে তবে তাঁদের পক্ষে সেই দেশে থাকাটা একটু অসম্ভবই হয়ে পড়ে। তা সে যত সদিচ্ছাই থাকুক না কেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র তার সর্বশক্তি দিয়ে পূর্ববাংলাকে হিন্দুশূন্য করতে চেয়েছে। পাকিস্তান যে রকম সাম্প্রদায়িক দেশ তাতে তারা এটা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে, বাংলাদেশের জন্মের পরে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র যন্ত্রটিও তার নাগরিকদের বিরুদ্ধে একই ধরনের কাজ করেছে। যে দেশের জন্ম হয়েছিল প্রতিক্রিয়াশীলতা থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে, ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে, সেই দেশও পাকিস্তানের মত পিছন দিকেই হেঁটেছে। অথচ এর প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছিলেন যে বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু বলে কিছু থাকবে না। তাজউদ্দীনের দেখানো সেই পথে অন্যেরা বাংলাদেশকে নেন নি।

দেশ স্বাধীনের পরে বাহাত্তর সালেই প্রথম হামলা ঘটে হিন্দুদের উপরে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর করা হয় পূজামণ্ডপ। রাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। এর পর পঁচাত্তর সালের পর থেকে পুরোপুরি প্রতিক্রিয়াশীল লোকজনেরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেই। বাংলাদেশের কাছ থেকে যে নিরাপত্তা এবং আশ্বাস আশা করেছিল হিন্দুরা, সেই নিরাপত্তা এবং আশ্বাস শূন্যে মিলিয়ে যায়। পাকিস্তান আমলের মতই হিন্দুরা জেনে যায় যে, তাঁদের নিজেদের দেশেও এখন তাঁরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। যত মেধাই থাকুক না কেন তাঁরা কোনোদিনও এই দেশে রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে না, প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না, সেনাবাহিনীর প্রধান হতে পারবে না, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হতে পারবে না, পারবে না কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত হতে। শুধু অধিকার বঞ্চিতই নয়, একই সাথে তাঁদের জীবনকে বিপন্ন করতেও রাষ্ট্র তাঁর উদার হাত বাড়িয়ে দেয় গুন্ডা-বদমায়েশদের দিকে। কোনো হিন্দু লোকের সম্পত্তি দখল করতে হবে। খুব সোজা কাজ। প্রথমে হুমকি দাও প্রাণের। তাতেও যদি কাজ না হয় তবে স্ত্রী বা মেয়ের সম্মানহানির হুমকি দাও। এই হুমকির পরে দেশ ছাড়বে না এমন সাহসী হিন্দু বাংলাদেশে কয়টা আছে? 

বৈরী পরিস্থিতির শিকার হয়ে যাঁদেরকে জন্মভূমির শিকড় ছেড়ে ভিন্ন দেশে অবমাননাকর উদ্বাস্তুর জীবন বেছে নিতে হয়, তাঁদের মানসিক অবস্থা বোঝার সাধ্যি হয়তো আমাদের কোনোদিনই হবে না। কলাগাছে ছাওয়া রাস্তা দিয়ে অচেনা দেশ, অজানা ভবিষ্যতের দিকে হেঁটে যেতে যেতে তাঁরা কি বার বার ফিরে তাকান না তাদের অতিপ্রিয় ভিটে মাটির দিকে। যে মাটিতে পোতা রয়েছে সাত পুরুষের নাড়ি, সেই মাটি ছেড়ে যাওয়া কি এতই সহজ? ভিনদেশে যাওয়ার পরেও হয়তো মানুষের নিষ্ঠুর নির্মমতাকে ভুলে গিয়ে দেশের কথাই ভাবেন তাঁরা। মানুষের প্রতি মানুষের রাগ থাকতে পারে, আক্রোশ থাকতে পারে। কিন্তু মমতাময়ী মাটির জন্য যে শুধু ভালবাসাই থাকে মানুষের বুকের ভিতরে। যত দুরেই থাকুক না কে, যত ভিন্ন দেশেই বসত হোক না কেন, ঠিকই কোনো এক নিভৃত সময়ে মনের গহনে উঁকি দিয়ে যায় পুকুর পাড়ে নিজের হাতে লাগানো হিজল গাছটির কথা। বুক উজাড় করে হয়তো বের হয়ে আসে বড়সড় একটা দীর্ঘশ্বাস। সেই হিজল গাছ থেকে টুপটুপ করে জলের উপরে পড়া ফুলগুলোর জন্য একটু হলেও হয়তো চোখের কোণে জমে উঠে একবিন্দু মুক্তোর মত অশ্রুকণা।

 

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

 

 

উদ্বাস্তু

 

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত  

 

চল, তাড়াতাড়ি কর,
আর দেরি নয়, বেরিয়ে পড় এক্ষুনি
ভোররাতের স্বপভরা আদুরে ঘুমটুকু নিয়ে
আর পাশে ফিরতে হবে না
উঠে পড় গা ঝাড়া দিয়ে,
সময় নেই-
এমন সুযোগ আর আসবে না কোন দিন
বাছবাছাই না করে হাতের কাছে যা পাস
তাই দিয়ে পোঁটলাপুঁটলি বেঁধে নে হুট করে
বেড়িয়ে পড়,
দেরি করলেই পস্তাতে হবে
বেরিয়ে পড়-


ভূষণ পাল গোটা পরিবারটাকে ঝড়ের মতো নাড়া দিলে
কত দূর দিগন্তের পথ-
এখান থেকে নৌকা করে ষ্টিমার ঘাট
সেখান থেকে রেলষ্টেশন-
কী মজা, আজ প্রথম ট্রেনে চাপবি,
ট্রেনে করে চেকপোষ্ট,
সেখান থেকে পায়ে হেঁটে-পায়ে হেঁটে-পায়ে হেঁটে-
ছোট ছোলেটা ঘুমমোছা চোখে জিজ্ঞেস করলে,
সেখান থেকে কোথায় বাবা?
কোথায় আবার! আমাদের নিজেদের দেশে


ছায়াঢাকা ডোবার ধারে হিজল গাছে
ঘুমভাঙা পাখিরা চেনা গলায় কিচিরমিচির করে উঠল
জানালা দিয়ে বাইরে একবার তাকাল সেই ছোট্ট ছেলে,
দেখলো তার কাটা ঘুড়িটা এখনো গাছের মগডালে
লটকে আছে,
হাওয়ায় ঠোক্কর খাচ্ছে তবুও কিছুতেই ছিঁড়ে পড়ছে না
ঘাটের শান চটে গিয়ে যেখানে শ্যাওলা জমেছে
সেও করুণ চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করছে, কোথায় যাবে?
হিজল গাছের ফুল টুপ টুপ করে এখনো পড়ছে জলের উপর,
বলছে, যাবে কোথায়?
একটু দূরেই মাঠে কালো মেঘের মত ধান হয়েছে-
লক্ষীবিলাস ধান-
তারও এক প্রশ্ন- যাবে কোথায়?
আরো দূরে ছলছলাৎ পাগলী নদীর ঢেউ
তার উপর চলেছে পালতোলা ডিঙি, ময়ূরপঙ্খি
বলছে, আমাদের ফেলে কোথায় যাবে?
আমারা কি তোমার গত জন্মের বন্ধু?
এ জন্মের কেউ নই? স্বজন নই?

তাড়াতাড়ি কর- তাড়াতাড়ি কর-
আঙিনায় গোবরছড়া দিতে হবে না,
লেপতে হবে না পৈঁঠে-পিঁড়ে,
গরু দুইতে হবে না, খেতে দিতে হবে না,
মাঠে গিয়ে বেঁধে রাখতে হবে না
দরজা খুলে দাও, যেখানে খুশি চলে যাক আমাদের মত

আমাদের মত! কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়?
তা জানিনাযেখানে যাচ্ছি সেখানে আছে কী?
সব আছেঅনেক আছে, অঢেল আছে-
কত আশা কত বাসা কত হাসি কত গান
কত জন কত জায়গা কত চেল্লা কত জমক

সেখানকার নদী কি এমন মধুমতি?
মাটি কি এমন মমতামাখানো?
ধান কি এমন বৈকুন্ঠবিলাস?
সোনার মত ধান আর রুপোর মতো চাল?
বাতাস কি এমনি হিজলফুলের গন্ধভরা
বুনো-বুনো মৃদু মৃদু?

মানুষ কি সেখানে কম নিষ্ঠুর, কম ফন্দিবাজ কম সুবিধাখোর?


তাড়াতাড়ি করো, তাড়াতাড়ি করো-
ভূষণ এবার স্ত্রী উপর রীতিমত ধমকে উঠল:
কী ত বাছাবাছি বাঁধাবাঁধি করছো,
সব ফেলে ছড়িয়ে টুকরো-টুকরো করে এপাশে-ওপাশে বিলিয়ে দিয়ে
এগিয়ে চলো

চারধারে কী দেখছিস? ছেলেকে ঠেলা দিল ভূষণ-
জলা-জংলার দেশ, দেখবার আছেটা কী!
আসল জিনিস দেখবি তো চল ওপারে,
আমাদের নিজেদের দেশে, নতুন দেশে,
নতুন দেশের নতুন জিনিস-মানুষ নয়, জিনিস-
নতুন জিনিসের নতুন নাম-উদ্বাস্তু

ওরা কারা চলেছে আমাদের আগে-আগে-ওরা কারা?
ওরাও উদ্বাস্তু
কত ওরা জেল খেটেছে তকলি কেটেছে
হত্যে দিয়েছে সত্যের দুয়ারে,
কত ওরা মারের পাহাড় ডিঙিয়েছে
পেরিয়ে গিয়েছে কত কষ্টক্লেশের সমুদ্র,
তারপর পথে-পথে কত ওরা মিছিল করেছে
সকলের সমান হয়ে, কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে,
পায়ে-পায়ে রক্ত ঝরিয়ে-
কিন্তু ক্লান্ত যাত্রার শেষ পরিচ্ছেদে এসে
ছেঁড়াখোঁড়া খুবলে-নেওয়া মানচিত্রে
যে হঠাৎ দেখতে পেল আলো-ঝলমল ইন্দ্রপুরীর ইশারা,
ছুটল দিশেহারা হয়ে
এত দিনের পরিশ্রমের বেতন নিতে
মসনদে গদীয়ান হয়ে বসতে
ঠেস দিতে বিস্ফারিত উপশমের তাকিয়ায়

হ্যাঁ, ওরাও উদ্বাস্তু
কেউ উৎখাত ভিটেমাটি থেকে
কেউ উৎখাত আদর্শ থেকে

পথের কুশকন্টককে যারা একদিন গ্রাহ্যের মধ্যেও আনেনি
আজ দেখছে সে-পথে লাল শালু পাতা হয়েছে কিনা,
ড্রয়িংরুমে পা রাখবার জন্যে আছে কিনা
বিঘৎ-পুরু ভেলভেটের কার্পেট
ত্যাগব্রতের যাবজ্জীবন উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে
যারা এত দিন ট্রেনের থার্ড ক্লাসে চড়েছে
সাধারণ মানুষের দুঃখদৈন্যে শরিক হয়ে
তারাই চলেছে এখন রকমারি তাকমার চোপদার সাজানো
দশঘোড়ার গাড়ি হাঁকিয়ে
পথচারীদের হটিয়ে দিয়ে, তফাৎ করে দিয়ে

আরো আগে, ইতিহাসেরও আগে, ওরা কারা?
ঐ ইন্দ্রপুরী-ইন্দ্রপ্রস্থ থেকেই বেরিয়ে যাচ্ছে
হিমালয়ের দিকে-
মহাভারতের মহাপ্রস্থানের পঞ্চনায়কও তাদের সঙ্গিনী
স্ব- স্বরূপ- অনুরূপা-
যুদ্ধ জয় করেও যারা সিংহাসনে গিয়ে বসল না
কর্ম উদযাপন করেও যারা লোলুপ হাতে
কর্মফল বন্টন করল না নিজেদের মধ্যে,
ফলত্যাগ করে কর্মের আদর্শকে রেখে গেল উঁচু করে,
দেখিয়ে গেল প্রথমেই পতন হল দ্রৌপদীর-
পক্ষপাতিতার
তারপর একে একে পড়ল আর সব অহঙ্কার
রূপের বিদ্যার বলের লোভের-আগ্রাসের-
আরো দেখালো, দেখালো
শুধু যুধিষ্ঠিরই পৌছো
যেহেতু সে ঘৃণ্য বলে পশু বলে
পথের সহচর কুকুরকেও ছাড়ে না
 

 

[311 বার পঠিত]