পূর্ববর্তী পর্ব (পর্ব ৪)

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর থেকে অপেক্ষা করছি, কবে সেই মেয়েটির গায়ে ধাক্কা লাগার পর তার নোট-খাতা সব মাটিতে পড়ে যাবে, আর আমি ‘সরি’ ‘সরি’ বলে সেটা তুলে দিতে গিয়ে তার চোখে চোখ পড়বে। তারপর আর পায় কে? লাইলী-মজনুকেতো দুই মাসেই ছাড়িয়ে যাব। কিন্তু হায়! এ কি! এ যে দেখি মরুভূমি। আজ-কালকার মেয়েগুলোও হয়েছে এমন, বই-খাতা-ব্যাগ পড়াতো দূরে থাক, মাথার একটা চুলও মাটিতে পড়বার জো নেই। আশাহত মনে দিন-মাস-বছর যায়। কিন্তু এভাবে আর কয়দিন বেদনার বর্ণবিহীণ, স্বপ্নের দিনের অপেক্ষা করে থাকা।

ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট ভর্তি হলে, সিনিয়রদের দেখি কেমন জানি একটু রোমান্টিক হয়ে উঠে; এই বুঝি বসন্ত এলো বলে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের স্টুডেন্ট এবং সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সাথে আমি কখনো ছয় মাস পার হবার আগে কথা বলি না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সাথে সাথে প্রথম বর্ষের স্টুডেন্টরা প্রচুর আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশিদের কাছ থেকে ভালো স্টুডেন্ট হবার সুখ্যাতি তথা সনদপত্র পেয়ে থাকে। তাই নতুন নতুন পাখা মেলে উড়ে বেড়ায় স্বপ্নের আকাশে। হয়তো আমার মত করে তারাও ভাবে, এইতো আর কয়দিন, তার পরেই লাইলী-মজনু খেলায় মেতে উঠবে। কিছুদিনের জন্য তারা ভুলে যায়, তাদের সিনিয়র যারা, তারাও ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশির কাছ থেকে সনদপত্র নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। কল্পনার আকাশ থেকে নামতে, কিছুটা সময় তাদের লাগে।

অন্যদিকে, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক, যারা নিজেদেরকে অবধারিতভাবে বুদ্ধিজীবী হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে এবং আর মাসখানেক পরে টিভি চ্যানেলে গিয়ে জ্ঞানগর্ভ কথা বলে সাধারণের বিরক্তির কারণ হবার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে, কল্পনার আকাশ থেকে নামতে তাদেরও সময় লাগে। তাদের বুদ্ধিও-যে সাধারণ একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টদের থেকে এক তিলও বেশি নয়, ক্ষেত্রবিশেষে বরং কম, সেটা বুঝতে কিছুটা সময় নেন তারাও। তাই, এই দুই শ্রেণীর সবুজ ও অবুঝ মানব সন্তানদের সাথে কথা বলা শুরু করবার জন্য আমাকে কমপক্ষে ছয়মাস অপেক্ষা করতে হয়।

কিন্তু এই বঙ্গীয় ব-দ্বীপে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে কিছু না করে, শুধু অপেক্ষা করে বসে থাকলে লাইলীও-যে আসবে না, মজনুও-যে হাসবে না, সেটা বুঝতেই আমার মাস গড়িয়ে বছর গেলো। অবশেষে অনুধাবন করতে পারি, কিছু একটা করার সময় এসেছে, টাইম টু প্লে সাম্ র‌্যান্ডম গেইম। কিন্তু গেইম খেলার প্রথম শর্ত হচ্ছে প্রতিপক্ষকে ভালো করে চিনে নেয়া। যে-মেয়েটা আমার সাথে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, যে-মেয়েটা আমার ক্লাসমেইট, তার যোগ্যতা কখনোই আমার সমান নয়; আমার থেকে অনেক বেশি। আমি রাতের দশটায় কোচিং থেকে বাসায় ফিরতে পেরেছি, সে পারে নি। আমাকে দেখে গলির মোড়ে ছেলেরা শিষ দেয়নি, তাকে দেখে দিয়েছে। পরীক্ষার রাতে আমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব আসেনি, তার কাছে এসেছে। রক্ষণশীল বাংলার প্রতিবন্ধকতার দেয়াল পার হতে তাকে যত পরিশ্রম করতে হয়েছে, আমাকে সেটা করতে হয়নি। অতএব, বুদ্ধিভিত্তিক দিক থেকে আমার প্রতিপক্ষ আমার চেয়ে এগিয়ে।

অন্যদিকে, পুরুষ শাসিত বাংলায় নারীদের প্রতিটা পদক্ষেপই ঠিক করে দেয় কোন না কোনো মহাপুরুষ। কখনো ভাই, কখনো বাবা, বিয়ের পর আবার পতিদেবতা। পৃথিবীর কুৎসিতম বাক্যগুলোর একটি ‘স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেস্ত’; অথচ যেটা খুব নান্দনিকভাবেই হতে পারতো স্বামীর হৃদয়ের মাঝে স্ত্রীর বেহেস্ত’। তবে, নারীর এমন একটা পৃথিবী আছে, এমন একটা রাজ্য আছে, যেখানটাতে কারো নজরদারী, কোনো পুরুষীগিরি চলে না। জোর করে তাকে বিয়ে দেয়ানো সম্ভব, কিন্তু তাকে দিয়ে ভালোবাসানো সম্ভব না। অতএব, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রথম যখন স্বাধীনতার দেখা মেলে, নারী তার এই ভালোবাসার স্বাধীন জায়গাটিতে একটু আধটু যদি নিয়ম মেনে না চলে, একটু আধটু যদি স্বৈরাচারী হয়ে উঠে, তাহলে অবাক হবার কিছু নেই। অতএব, ভালো করেই বুঝতে পারি, আমার প্রতিপক্ষ যে-কোনো সময় খেলার মাঝখানে বলতে পারে, আমি আর খেলবো না। এই সমস্ত সবকিছু মাথায় রেখে, বসন্তের কোন এক মাতাল সমীরণে, প্রেমের সাগরে টাইটানিক ভাসালাম আমি।

কত নগর, কত বন্দর, কত সুরম্য শহর, প্রেমের রাজ্যে পৃথিবী পদ্যময়। আমার সাদা-কালো জীবন অজান্তেই রঙিন হয়ে উঠলো। ডাক শুনে কেউ না আসলে একলা চলার কথা জানি, কিন্তু ডাক শুনে অনেকজন আসলে কিভাবে চলতে হয়, সেটাতো রবীন্দ্রনাথ বলে যাননি। প্রেম যমুনার মাতাল ডিঙ্গায় মাতোয়ারা আমি জীবনকে দেখলাম হাতের মুঠোয় নিয়ে। কি পৃথিবী, কি সংসার সবকিছু চোখের নিমিষেই তুচ্ছ হয়ে গেল। মানুষের মানসিক শক্তি যে কি পরিমাণ হতে পারে, ধ্বংস হবার জন্য ট্রয়কেও খুব ছোট্ট একটা নগরী মনে হতে লাগলো। আমার শারদও প্রাত, আমার মাধবী রাত এক-এক সময় এক-এক জন দখল করে ফেললো। বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে একশ আটটা নয়, খুঁজে এনেছি আটশো একটা নীল পদ্ম। আছে আলো-অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার, কি আলো কি অন্ধকার কিছুই বাদ পড়েনি। আমার দরজায় আঘাত করে কেউ কখনো ফিরে যায়নি, তবে আঘাত করবার সুযোগ তাদেরকেই দিয়েছি যাদেরকে ফিরে যেতে হবে না। বাংলার বনলতা সেন’রা বিপুল বিক্রমে আমাকে অর্জন করে চলে, আমিও হাজার বছর ধরে পথ হাঁটি স্বপ্নময় পৃথিবীর রোমাঞ্চ-রাজ্যের পথে।

আছে সুখ, আছে দুঃখ; আছে প্রীতি, আছে ভীতি; আছে স্নেহ, আছে মায়া; আছে রৌদ্র, আছে ছায়া; জীবনের কতগুলো বসন্ত পার করে আমি দেখা পেয়েছি রঙিণ সব বসন্তের। আমার ভেতর যে অন্য আরেকটা আবেগের-মাতাল-সুন্দর জগত আছে তাকে দেখতে পাই, তাকে চিনতে পাই। কিন্তু এই ভালোবাসার রাজত্বে আমি যখন রাজা, তখন কোন এক বিনম্র দুপুরে দক্ষিণা বাতাস এসে বলে দেয়, সব মিথ্যা, সব সাজানো। এতদিন আমার হৃদয়কে আমি নিজেই চালিয়ে নিয়ে গেছি ভালোবাসার রাজ্যে, নিজেই তার নাম দিয়েছি ভালোবাসা। হৃদয় কখনো আমাকে পরিচালিত করেনি, টেনে নিয়ে যায়নি ভালবাসার রাজ্যে।

ডিপার্টমেন্ট অব কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা; আমার সেই ছোট্ট আঙ্গিনায়, আমার সমস্ত পৃথিবী উলোট-পালোট করে দিয়ে সে আসে খোলা চুলে, হাসির ঝংকার তুলে। বুঝতে পারি, এই প্রথম আমার হৃদয় আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। ক্যাম্পাসেই বড় হয়েছে, তাই সমস্ত ক্যাম্পাসই তার নিজের আঙ্গিনা। কি অপূর্ব মায়া আর সরলতা নিয়ে সে আসে দশদিক আলো করে। সূর্যে তাহার নেই প্রয়োজন দেখছি হয়ে চুপ / এক মুখেতেই সেই ধরেছে দশ সূর্যের রূপ। কিছুক্ষণের জন্য যেন সময় থমকে গেছে, সবকিছু স্থবির হয়ে গেছে। সেই থেমে যাওয়া সময়ে আমি মনে মনে ভাবলাম, আজ নয়, কালও নয়, এখনটাতে নয়। এখন শুধুই অপেক্ষা সঠিক সময়ের, সঠিক নিয়মের। ডিপার্টমেন্ট অব কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা; ডিগ্রি তুমি আমাকে দাও আর না দাও, কিছু একটাতো দিতেই হবে, কিছু একটা নিয়ে আমি যাবোই। কারণ, আমি জানি, কি করে সেটা অর্জন করতে হয়। আজ হোক আর কাল হোক, দেখা তার আমি পাবোই। হবেই হবে দেখা, দেখা হবে বিজয়ে।

পরবর্তী পর্ব (পর্ব ৬)

(চলবে…)

[email protected]
December 22, 2010

[75 বার পঠিত]