হে! হে! প্রধানমন্ত্রী আসছে !!

By |2010-11-28T09:54:43+00:00নভেম্বর 28, 2010|Categories: রম্য রচনা, রাজনীতি|2 Comments

পাখিদের কিচির মিচির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় আমার। অলস জীব আমি, নয়-দশটা পর্যন্ত না ঘুমালে আমার চলে না, কিন্তু আজ পাখিটের হট্টগলে উঠতেই হল।

বাইরের সাথে যোগাযোগ আমার এমনিতেই কম। প্রতিদিনের কোলাহল, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান এসব আমাকে ডাকে না। ওরা বেশ ভালো করেই জানে যে আমি অসামাজিক প্রকৃতির-সাত পাঁচ নিয়ে ভাবি না। ব্রাশটা হাতে নিয়ে অলসতায় ভর করে একপা একপা করে এগিয়ে গেলাম। বড় বড় বাড়িগুলোর কোলঘেষে বেরিয়ে আসলাম রাজপথে-দেখি রাস্তার পাশের গাছগুলোর একেবারে লন্ডভন্ড অবস্থা। কারও মাথা নেয়, যার মাথা আছে তার আবার ডালপালা নেয়। যেন নিষ্ঠুর-বর্বর কোন হাত মমতার পরশ বুলিয়ে গেছে ওদের ওপর! আচ্ছা, রাতে কি বড় কোন ঘুর্নিঝড় এসেছিল? জিজ্ঞেস করি ঘরছাড়া পাখিদের। কোন উত্তর মেলে না। সদ্য ডানা গজানো একটি ছানাপাখি লাফিয়ে ওঠে আনন্দে, ‘মহাপতঙ্গ আসছে, মহাপতঙ্গ আসছে!’ মা পাখিটি ধমকের সুরে বলে, ‘চুপ কর, যে আসতে না আসতে ঘর হারালি, সে এসে গেলে না জানি কিই ঘটে!’ মা পাখিটির চোখে মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ। আমি অস্থির হয়ে উঠি, দৃষ্টি অবনত করে দেখি, চকচকে রাস্তা, পিচ ঢালা হয়েছে আরও একবার। সুযোগ বুঝে মাটিও শুষে নিয়েছে তার কিছুটা। বেশ ভালোই লাগছে। কিন্তু এমন খাপছাড়া আয়োজন কেন? জিজ্ঞেস করি টোকাইদের কাছে। ‘জানেন না প্রধানমন্ত্রী আসছে! হেঃ হেঃ !’ হেসে ওঠে টোকাই, হেসে উঠি আমি, হেসে ওঠে ন্যাংটো চারপাশ। প্রধানমন্ত্রী আসছে! প্রধানমন্ত্রী আসছে!

টোকাইদের পরনে বস্ত্র নেয়, অন্ন নেয় পেটে অথচ পিচঢালা রাস্তায় উপচে পড়ছে প্রধানমন্ত্রীর আগোমনী আয়োজন। টোকাইদের আপসোস নেয় তাতে, এতো সব সে বোঝে না, বোঝে না যে বাতাস খেয়ে তার হাড়গুলো ফুলিয়ে রেখেছে তার আয়োজনও এখন হুমকির মুখে।

আমি বাড়ি ফিরে আসি। খবরটা দিই কয়েকদিন আগে পৃথিবী আলোতে আসা আমার ছেলেকে,-কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রধানমন্ত্রী আসছে। আনন্দে লাফিয়ে ওঠে সে, আবার থমকে যায়, জানতে চায় আমার কাছে, ‘আচ্ছা বাবা, তাঁর আসতে এত খরচ হয় কেন?’ আমি দাঁত কেলিয়ে জবাব দিই, সিকুইরিটি দরকার যে! ‘যেখানে প্রধানমন্ত্রীর সিকুইরিটি দরকার সেখানে আমাকে সিকুইরিটি দেবে কে বাবা?’ আমি বোকার মত হাসতে হাসতে বলি, কেন আমি!

‘আর তোমার?’

আমি থেমে যাই। থেমে যায় আমার হাসি।

‘যেখানে একটা জীবন্ত মানুষের পেট চিরে বেরিয়ে আসলাম আমি; তাজা রক্ত এখনো আমার দেহে লেগে, সেখানে আমাকে নিয়ে কেউ ভাবছেনা কেন? বের হচ্ছে না কেন কোন মিছিল?’

আমি থেমে যাই, থেমে যায় আমার সকল অনুভূতি। আবার লাফিয়ে ওঠে সে- ‘হে! হে! প্রধানমন্ত্রী আসছে! প্রধানমন্ত্রী আসছে!’ লাফিয়ে উঠি আমি, লাফিয়ে ওঠে বিপন্ন মানবতা : প্রধানমন্ত্রী আসছে! প্রধানমন্ত্রী আসছে!

বি দ্র : লেখাটি ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আসার একদিন আগে একটি লোকাল পত্রিকায় ছাপা হয়। আমি তখন উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। প্রকাশিত হবার পর আমাকে বড় আকারে হুমকি দেওয়া হয়। এবং ঐ অঞ্চলের কাগজে নিশিদ্ধ ঘোষনা করে।

জন্ম সন : ১৯৮৬ জন্মস্থান : মেহেরপুর, বাংলাদেশ। মাতা ও পিতা : মোছাঃ মনোয়ারা বেগম, মোঃ আওলাদ হোসেন। পড়াশুনা : প্রাথমিক, শালিকা সর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শালিকা মাদ্রাসা। মাধ্যমিক, শালিকা মাধ্য বিদ্যালয় এবং মেহেরপুর জেলা স্কুল। কলেজ, কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন। স্নাতক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি অনার্স, ফাইনাল ইয়ার)। লেখালেখি : গল্প, কবিতা ও নাটক। বই : নৈঃশব্দ ও একটি রাতের গল্প (প্রকাশিতব্য)। সম্পাদক : শাশ্বতিকী। প্রিয় লেখক : শেক্সপিয়ার, হেমিংওয়ে, আলবেয়ার কামু, তলস্তয়, মানিক, তারাশঙ্কর প্রিয় কবি : রবীন্দ্রনাথ, জীবননান্দ দাশ, গ্যেটে, রবার্ট ফ্রস্ট, আয়াপ্পা পানিকর, মাহবুব দারবিশ, এলিয়ট... প্রিয় বই : ডেথ অব ইভান ঈলিচ, মেটামরফোসিস, আউটসাইডার, দি হার্ট অব ডার্কনেস, ম্যাকবেথ, ডলস হাউস, অউডিপাস, ফাউস্ট, লা মিজারেবল, গ্যালিভার ট্রাভেলস, ড. হাইড ও জেকিল, মাদার কারেজ, টেস, এ্যনিমাল ফার্ম, মাদার, মা, লাল সালু, পদ্মা নদীর মাঝি, কবি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিলে কোঠার সেপাই, ভলগা থেকে গঙ্গা, আরন্যক, শেষের কবিতা, আরো অনেক। অবসর : কবিতা পড়া ও সিনেমা দেখা। যোগাযোগ : 01717513023, [email protected]

মন্তব্যসমূহ

  1. বিপ্লব রহমান নভেম্বর 29, 2010 at 6:24 অপরাহ্ন - Reply

    টোকাইদের পরনে বস্ত্র নেয়, অন্ন নেয় পেটে অথচ পিচঢালা রাস্তায় উপচে পড়ছে প্রধানমন্ত্রীর আগোমনী আয়োজন।

    খবরটা দিই কয়েকদিন আগে পৃথিবী আলোতে আসা আমার ছেলেকে,-কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রধানমন্ত্রী আসছে।

    ছো্ট্ট লেখাটি ভালো লাগলো। তবে এটি রম্য রচনা না হয়ে ব্লগাড্ডা হলেই ভালো হতো। লেখায় কিছু টাইপো আছে, আশাকরি ঠিক করে দেবেন।

    চলুক। :yes:

  2. গীতা দাস নভেম্বর 28, 2010 at 11:12 অপরাহ্ন - Reply

    লেখাটি ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আসার একদিন আগে একটি লোকাল পত্রিকায় ছাপা হয়। আমি তখন উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। প্রকাশিত হবার পর আমাকে বড় আকারে হুমকি দেওয়া হয়। এবং ঐ অঞ্চলের কাগজে নিশিদ্ধ ঘোষনা করে।

    ২০০৩ সাল থেকে দৃশ্যপট বদলায়নি, তবে এসব ক্ষেত্রে এলাকা ও লোকাল পত্রিকা নাম দিলে লেখাটির গুরুত্ব বাড়ত।

মন্তব্য করুন