সেনাপতি তারিক ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে রডারিকের ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্যর মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন। সৈন্য সংখ্যার ব্যবধান তাকে মোটেও ভাবিয়ে তোলেনি কারণ তিনি জানতেন তাদের আসল শক্তি লোকবল নয় বরং ঈমানের অফুরন্ত শক্তি। ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে, স্পেনের মাটিতে পা রেখেই সমস্ত সৈন্যদের নামিয়ে আনলেন তারিক। জ্বালিয়ে দিলেন তাদেরকে বয়ে আনা জাহাজগুলো। তারপর সৈন্যদের লক্ষ্য করে বললেন- প্রিয় বন্ধুগন, এখন তোমাদের সামনে স্পেন, রডারিকের সেনাবাহিনী আর পিছনে ভূ-মধ্য সাগরের উত্তাল জলরাশি। তোমাদের সামনে দুটোপথ। হয় লড়তে লড়তে জয়ী হওয়া, শাহাদাতের মর্যাদাসিক্ত হওয়া কিংবা সাগরের উত্তাল তরঙ্গের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাপুরুষের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। তার বক্তব্যে অনুপ্রাণিত সৈন্যগণ বিপুল বিক্রমে লড়াই করে সেদিন বিজয়ী হয় এবং রডারিক ওয়াডালেট নদীতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে।

সামহয়্যার ইনে একটা পুরানো পোস্ট খুঁজতে যেয়ে উপরের পোস্টাটাতে চলে যাই। তারেক বিন যায়াদের কাহিনী জানা ছিলো, তার ঐতিহাসিক ভাষনাটাও পড়া ছিলো। তারিকের সৈন্যদের ইমানী শক্তি যে পুরাপুরি ছিলো সেই বিষয়ে কোন সন্দেহঃ নাই। তবে সেই ইমানী শক্তির মূলে কি ছিলো সেটা লেখককে জানানোর জন্যই ইন্টারনেটে সার্চ দিলাম তারিকের ভাষনটার খোঁজে। পেলাম উইকিপিডিয়ার লিঙ্ক। উইকিপিডিয়াতে ভাষনটা পেয়ে মনে মনে খুশিই হলাম খুব বেশী কষ্ট
করতে হলো না বলে। তারিকের মূল ভাষনটা খুব একটা বড় না, ছোট ছোট তিনটা মাত্র প্যারাগ্রাফ। কিন্তু উইকির ভাষনটা পড়েই বুঝলাম গড়বড় আছে কোথাও। মনে হচ্ছে কিছু একটা মিসিং। কিন্তু সেটা কি চট করে মনে করতে পারছিলাম না। আরেকটু খুঁজতেই পুরো ভাষনটা পেয়ে গেলাম। উইকির ভাষনটায় মূল ভাষণের দাড়ি-কমা সহ সবই দেয়া আছে শুধু দ্বিতীয় প্যারার চারটা লাইন মিসিং। কি আছে সেই চার লাইনে? পাঠকদের জন্য দ্বিতীয় প্যারাটাকে ভেঙ্গে লাইন তিনটিকে মাঝখানে আলাদা করে বোল্ড করে দিলাম। ভাষনের প্রথম এবং তৃতীয় প্যারাগ্রাফ দুটো উইকির লিঙ্কে পাবেন।

Remember that if you suffer a few moments in patience, you will afterward enjoy supreme delight. Do not imagine that your fate can be separated from mine, and rest assured that if you fall, I shall perish with you, or avenge you.

You have heard that in this country there are a large number of ravishingly beautiful Greek maidens, their graceful forms are draped in sumptuous gowns on which gleam pearls, coral, and purest gold, and they live in the palaces of royal kings.

The Commander of True Believers, Alwalid, son of Abdalmelik, has chosen you for this attack from among all his Arab warriors; and he promises that you shall become his comrades and shall hold the rank of kings in this country. Such is his confidence in your intrepidity. The one fruit which he desires to obtain from your bravery is that the word of God shall be exalted in this country, and that the true religion shall be established here. The spoils will belong to yourselves.

সূত্র: Medieval Sourcebook: Al Maggari: Tarik’s Address to His Soldiers, 711 CE, from The Breath of Perfumes

ভাষন পড়লেই বোঝা যায় তারিকের মূল বক্তব্য কি! কি সেই মূলা যা সেই সব নও মুসলিমদের জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। আর তাছাড়া তাদের পিছনে হটার রাস্তাও তো বন্ধ! যাই হোক, তারিকের মূল কথা ছিলো…. যুদ্ধ করো, জেতো, সম্পদ লুন্ঠন করো, প্রাসাদ বন্দিনীদের রেপ করো….. আর বিনিময়ে মুসলিম জাহানের নেতা আল ওয়ালিদ কি চায়? সে চায় আল্লাহর নাম আন্দালুসের (স্পেনের) সবার মুখে মুখে থাকবে এবং একমাত্র সত্য ধর্ম ইসলাম আন্দালুসে (স্পেন) প্রতিষ্ঠিত হবে। তরবারী দিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার সবচাইতে উৎকৃষ্ট প্রমাণ বোধহয় তারিকের ভাষনটা। পাঠক মনে রাখবেন খৃষ্ঠান ধর্মও সে যুগে তরবারীর মাধ্যমেই সবচাইতে বেশি প্রতিস্ঠিত হয়েছে।

এখানে একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। তারিকের ভাষণে গ্রীক রমনীদের কথা বলা হয়েছে তার কারণ সম্ভবতঃ এই যে অষ্টম শতাব্দীতে স্পেন ছিলো বাইজেন্টাইন (রোম) সাম্রাজ্যের অধীনে যার রাজধানী ছিলো কনস্টানটিনোপলে। তখনকার বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সরকারী ভাষা ছিলো গ্রীক। আর সেই সময়কার আরবদের কাছে শত্রু মানেই গ্রীক। কিন্তু সবকিছু বিবেচনায় করলে স্পেনের প্রাসাদের মেয়েরা ভিসিগথ (জার্মান) ছিলো বলেই মনে হয়। তারা কি আসলেই গ্রীক ভাষায় কথা বলত, সেটা জানার কোন উপায় এখন আর নাই। আর রাজা রড্রিক কি আসলেই নদীতে ডুবে মরেছিলো? উত্তর হলো না, সে তারিক বাহিনীর হাতেই নিহত হয়েছিলো।

According to a ninth-century chronicle, a tombstone with the inscription Hic requiescit Rodericus, rex Gothorum (here rests Roderic, king of the Goths) was found at Egitania (modern Idanha-a-Velha, Portugal).

আর যুদ্ধে লুন্ঠনকৃত সম্পদের পরিমান কেমন ছিলো?

“He took up the pearls, the armour, the gold, the silver, and the vases which he had with him, and found that quantity of spoils, the like of which one had not seen. … he wrote to Musa Ibn Nossevr informing him of the conquest of Andalus, and of the spoils which he had found… Afterwards Musa Ibn Nosseyr set out for Andalus…Tarik then met him, and tried to satisfv him, saving: “I am merely thy slave, this conquest is thine.” Musa collected of the monev a sum, which exceeded all description. Tarik delivered to him all that he had plundered.”

সূত্র: History of the Conquest of Spain by the Moors
by Ibn Abd-el-Hakem 860 A.D.

কিন্তু কেন আলোচ্য ওই তিনটি লাইন উইকিপিডিয়ায় চেপে যাওয়ার প্রয়াস? তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে উইকি তথ্যসূত্র হিসাবে খুব একটা নির্ভর যোগ্য না হলেও বহু সংখ্যক মানুষ ইদানীং উইকির উপর নির্ভরশীল হয়ে পরছে খুব সহজেই তথ্য খুঁজে পেতে। ইতিহাস ইতিহাসই। সেখানে ইচ্ছাকৃত ভাবে লাইন গুলো চেপে যেয়ে তারিক ইবনে যায়াদ কিংবা তার যোদ্দাদের মহামানব বানাবার এই প্রচেষ্টা কেন? এমনতো না যে তখনকার দিনের ইউরোপের সব রাজ-রাজড়ারা এর থেকে ভালো কিছু ছিলো। বরং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এর চেয়ে আরো খারাপ ছিলো। তবে তারা যদি সেগুলোকে স্বীকার করে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে তবে মুসলিমদের এই হীনমন্যতা কেন? মুসলিমরা কেন পারেনা ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে বর্তমান নিয়ে ভাবতে?

গত কয়েকদিনে ব্লগে হুমায়ুন আহমেদের “ঘেটু পুত্র কমলা” সিনেমা নিয়ে একশ্রেনীর ব্লগার বেশ হৈ চৈ করলেন। এদের একজন বলছেন, “আমার জানা মতে বাংলাদেশে ঘেটুপুত্রের প্রচলন কখনোই ছিলো না। পশ্চিমবঙ্গে প্রচলন থাকতে পারে কিন্তু মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে কখনোই ছিল না। বাংলাদেশে সমকামীতা প্রসঙ্গটি হনুমান হুমায়ন আহমেদের কল্পনাপ্রসূত; ঐতিহাসিক কোন ঘটনার অবলম্বনে নয়।”

ইতিহাসকে অস্বীকার করার কি নির্লজ্ব প্রয়াস!! উনি জানেন না তাই হতে পারে না। আর হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গে থাকতে পারে কিন্তু মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে থাকতে পারে না। কি দারণ কথা… মুসলিমরা এরকমটা করতেই পারে না। কয়েকদিন আগে আফগানিস্হানে এই একবিংশ শতাব্দীতেও ঘেটু পু্ত্রদের মতই প্রচলিত “বাচ্চা বাজি” নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। সেখানে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে সমাজের প্রভাবশালী একশ্রণীর মুসলিমদের মধ্যে অনেকেই কিভাবে বর্তমান সময়েও ছোট ছোট বাচ্চাদের মানসিক, শারিরীক এবং যৌন নির্যাতন করে থাকে।

লিঙ্ক: বাচ্চা বাজি (bacha bazi) : আফগানিস্হানে প্রচলিত বিকৃত শিশু (যৌন) নির্যাতনের সংস্কৃতি।

প্রায়ই দেখা যায় কোরানের কোন আয়াত কিংবা সহী হাদীস গ্রন্হের কোন হাদীসের সমালোচনা করলে বিশ্বাসীরা সবচাইতে সহজ রাস্তাটা বেছে নেয়। কোরানের আয়াতের ব্যাখ্য বা হাদীসটিকে ভুল বলে চালিয়ে দেয়া। ভুলকে ভুল কিংবা অসত্যকে অসত্য বলে মেনে না নিয়ে কোনদিন কোন জাতি উন্নতি করতে পেরেছে বলে আমার মনে হয়না। আর সেকারনেই হয়ত বিশ্বে মুসলিমরা আজও সব কিছুতে পশ্চাদপদ।
আশা করি ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে আমরা সবাই ইতিহাসকে ইতিহাস হিসাবেই মেনে নিতে শিখব। আর ইতিহাসের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতের মানুষের জন্য একটা সুন্দর সুস্হ আবাসযোগ্য পরিবেশের পৃথিবী গড়ে তুলতে সাহায্য করব।

[1061 বার পঠিত]