কর্কশ রব তুলে সবগুলো কাক এলোমেলোভাবে উড়ে যাওয়ার আগে, মুহূর্মুহু গুলির শব্দে কেঁপে উঠলো শহীদুল্লাহ হলের আকাশ বাতাস। হলে অবস্থানরত প্রিয়জনকে দেখতে আসা আত্মীয়স্বজনরা চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলো, এইখানে এইসব হচ্ছেটা কি। নিজেদের দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষোভের সীমা থাকল না তাদের; আসবে না আসবে না করেও কোন কুক্ষণে যে আবার এই গুন্ডা-পান্ডাদের আস্তানায় আসবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, তার কোন কারণ তারা খুঁজে বের করতে পারলো না। ওদিকে, সহস্রবার না করবার পরও, এই ছেলেটাইবা কেন বিশ্ববিদ্যালয় হলের মত একটা বাজে জায়গায় থাকতে গেলো, সেটা ভেবেও তাদের রাগের মাত্রা বেড়ে গেলো আরো একটুখানি। আতঙ্কিত অতিথি এবং আতঙ্কিত হতে পারবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা নির্বিকার ছাত্রদের ঔৎসুক্যের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে জানা গেল, ক্ষমতাসীন দলের দেশ কিংবা জননেত্রী পল্টন ময়দানে ভাষণ দিয়ে দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করার চেষ্টা বা অপচেষ্টা জাতীয় কিছু একটা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু কোন অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের কোন এক নামীদামী ছাত্রনেতাকে ঘুম থেকে উঠানো সম্ভব না হওয়ায়, তাকে ঘুম থেকে উঠানোর জন্য রীতিমত ছয় রাউন্ড গুলির দরকার হয়ে পড়েছিলো।

ওদিকে ‘বিকল্প’ মেসে দুপুরবেলায় খাবারের মূল্য দশ টাকা থেকে বাড়িয়ে কেন সাড়ে দশ টাকা করা হচ্ছে, সেটা নিয়ে মেসের সদস্যদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। সদস্যদের দাবী খুব সাদামাটা- ‘সপ্তাহে অন্তত একদিন পোলাও কোর্মা খাওয়াতে হবে, এবং গরুর মাংসের কেজি দু’শ টাকা হয়ে গেলেও মিল প্রতি দশ টাকার বেশি নেয়া যাবে না।’ আরো একটু বেশি যুক্তিবাদী ছাত্ররা বলে ওঠে, ‘আরে বাবা! এগারো টাকায়তো রাজদরবারের খাবার খাওয়া যায়, আমরাতো সেটা চাচ্ছি না, আমরা চাচ্ছি সাধারণ খাবার, আতএব কেন মিলের দাম দশ টাকা থেকে বাড়ানো হবে? এসবের কোন মানে আছে?’ অন্যদিকে মেসের ম্যানেজার, যাকে দশটাকার বিনিময়ে কমদামী কিন্তু উন্নতমানের, সুস্বাদু খাবার ম্যানেজ করবার মত নিতান্ত সহজ কাজটি হাতে নিতে হয়, তার মানবেতর জীবন-যাপন শুরু হয়ে যায় দেখার মত করে। নিজের জন্য কোনো নতুন জিনিস ক্রয় করাতো দূরে থাক, পুরোনো জিনিস লুকোতে লুকোতেই পার করে ব্যস্ততম দিন। একটা টুথপেস্ট কিনলেও এমন লোকের অভাব হয় না, যারা নির্দ্বিধায় বলে ফেলবে, ‘মেসের টাকা মেরে টুথপেস্ট কিনে দাঁত ব্রাশ করছে, আবার সেই দাঁত নিয়ে হাসছেও।’

ওদিকে রাত্রি বাড়ার সাথে সাথে হলের ডিম, ভাজী আর পরটার ছোট ছোট দোকানগুলোর কার্যক্রম শুরু হতে থাকে আস্তে আস্তে করে। সমস্ত দিনের শেষে সব গল্পের ঝুলি নিয়ে শুরু হয় আড্ডাবাজী। পৃথিবীর খুব কম জিনিসই আমি দেখেছি। কিন্তু যতটুকু দেখেছি তা থেকে বলতে পারি, এর থেকে অনাবিল আনন্দদায়ক খুব কম জিনিসই আছে পৃথিবীতে। নির্ভেজাল সেই আড্ডা। পরিবারের চিন্তা নেই, ভবিষ্যতের চিন্তা নেই। একটা শব্দই পার্থিব সমস্ত দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য যথেষ্ট। বড়ই শান্তিময়ী সেই শব্দ- ‘স্টুডেন্ট’। গুটিকয়েক যে-কয়টা সুবিধা বাংলাদেশের মত অনুন্নত দেশেও প্রশংসনীয়ভাবে বিদ্যমান, তার একটা হলো, নাম মাত্র মূল্যে উচ্চশিক্ষা। হতে পারে সেটা সীমিত মাত্রায়, তারপরও রয়েছেতো। শিক্ষা খরচ বহন করতে হয় না বলেই হয়তো স্টুডেন্টরা তাদের পড়াশোনা কিংবা আড্ডাবাজীতে মনোনিবেশ করতে পারে কিছুটা নিশ্চিন্তেই।

আড্ডাবাজীর কোন না কোন সময় টিউশনি বাড়ির গল্পতো আসবেই। রসায়ন বিভাগের মাহমুদ ভাই, এলোচুল দুলিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘আজকে এক বাসায় গেলাম টিউশনির জন্য, মেয়ের বাবা বলে, ‘‘বিকালে নাস্তা করলে আপনি কত নেবেন? আর নাস্তা না করলে কত নেবেন?’’’ আমরা সবাই আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মাহমুদ ভাই, আপনি কি বললেন?’ মাহমুদ ভাই বলেন, ‘আমি উনাকে বললাম, ‘আঙ্কেল, ভাত খেলে কত দেবেন, আমি প্রতিদিন ভাত খেতে চাই?’ হলের অন্য আর সব স্টুডেন্টদের মত আমারো টিউশনির শুরু হলে থাকাকালীন সময় থেকেই। বারো রকমের মানুষের সাথে পরিচয় এই টিউশনির সূত্রে। প্রথম টিউশনি শুরু শহীদুল্লাহ হলের তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের প্রেসিডেন্টের মামাতো বোন ভিকারুননিসার ছাত্রীকে দিয়ে। সেই গল্প অন্য একসময় হবে। কিন্তু আমার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর টিউশনির গল্পটা করে ফেলি।

পৌষের কোন এক দুরন্ত বিকেলে হঠাৎ করে ইন্ডেপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির একজন ছাত্রী ফোন করে অনুরোধ করলো, যেভাবে হোক কয়টা দিন অন্তত পড়ানোর জন্য। উল্লেখ্য, আমার বিষয় কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং সে-সময় কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষক খুঁজে পাওয়া খুব একটা সহজ ছিল না। তাছাড়া, মেয়েদের কাকুতি মিনতিকে উপেক্ষা করার সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি হচ্ছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজী হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে, ব্যক্তিগতভাবে সৌন্দর্য্য এবং ভদ্রতা, এই দু’টো জিনিসের প্রতি আমার আকর্ষণ দুর্ণিবার। সমস্যা হলো, যে মেয়েটি ফোনে কথা বলল, তার কণ্ঠস্বর অত্যন্ত কর্কশ। তাতে কি! পড়াতে গিয়ে আমিতো আর সৌন্দর্য নিয়ে কথা তুলতে পারি না, নৈতিকতা বলে একটা কথা আছে না। তারপরো, নিজেকে নিজে বুঝালাম, আরে কণ্ঠ কর্কশতো হয়েছেটা কি? সেতো খুব সৌম্য চেহারার ভদ্র একটা মেয়েও হতে পারে। আরেকটা সমস্যা হলো, বাসা অনেক দূর, আমাকে হল থেকে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে যেতে হবে। কিন্তু তার অনুরোধ উপেক্ষা করা আমার মত দুর্বল চিত্ত সম্পন্ন মানুষের জন্য কষ্টকর। অবশেষে কি না কি ভেবে, রাজী হলাম। এবং যথা সময়ে উপস্থিতও হলাম তার বাসায়। তারপর আমার শুধু অবাক হবার পালা। সামান্য একটু কর্কশ কণ্ঠ হবার কারণে কত কিছুই না আমি ভেবেছি। অথচ, এখানে এসে দেখলাম, অন্য আর সবকিছুর তুলনায় কণ্ঠটাই তা-ও কিছুটা চলার মত।

সহ্যের একটা সীমা থাকা চাই। কিন্তু আমার সহ্যার দেখি সীমা নাই। অত্যন্ত যত্ন সহকারে পড়ানো শুরু করলাম। প্রতিদিন মনে হয় সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে আমি তার বাসায় যাই। আর প্রতিদিন আবধারিত ভাবে আমার জন্য প্রস্তুত থাকে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এক বাটি নুডুলস্। কিন্তু এখানেই শেষ না, মাঝে মাঝে সেই নুডুলস্ এর সাথে একটি করে কারো মাথার চুলও থাকে। তাই ভদ্রতা করে দু’এক চামচ মুখে দেয়ার আগে আমাকে খুঁজে বের করতে হত কোথায় সে চুল। অবশেষে, কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে, তার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে, টানা নয় মাস মাথার ঘাম পায়ে ফেলে স্বাধীনতা অর্জন করি।

কিন্তু কে কাকে স্বাধীন থাকতে দিতে চায়। পরাধীনতার দুষ্টু চক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে স্বল্প কিছু সময়ের জন্য এমন কিছু রাজা-বাদশা বসবাস করেন, যাদের হীণমন্যতা, রুচিহীণতা ম্লান করে দেয় সমস্ত অর্জন। টিভি রুমে বসে, পাশের সিটে চাবি রেখে বন্ধুর জন্য জায়গা রেখে টিভি দেখছিলো সুজিত। হঠাৎ করে একজন এসে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো সেই চাবির রিং। তারপর সেখানটাতে বসে পড়ল। ‘কি ব্যাপার এটা ফেলে দিলেন কেন?’-জিজ্ঞেস করে উঠল সুজিত। উত্তর আসল, ‘তুই আমাকে চিনিস?’ তারপর দুই গালে টানা বিরানব্বইটা চড় খেতে হলো সুজিতকে। কি, সুজিতের জন্য মায়া হচ্ছে? ঠিক দুই বছর পরের ঘটনা, পরিবর্তিত পরিস্থিতি। চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে, ভয়ে কাবু হয়ে প্রাণপণে হলের ভিতর দিয়ে দৌঁড়াচ্ছে, শহীদ। পিছনে চারজন তাকে স্টাম্প আর রড নিয়ে ধাওয়া করছে। আর সে চারজনের নেতৃত্বে যে রয়েছে, তার নাম কিন্তু ‘সুজিত’।

পরবর্তী পর্ব (পর্ব ২)

(চলবে…)

[email protected]
Nov 13, 2010

[90 বার পঠিত]