ইভ-টিজিং (Eve-Teasing) এর আদিকথা

আকাশ মালিক।

ইভ-টিজিং এর দ্বিতীয় স্তরের নাম সেক্সুয়েল হ্যারাসমেন্ট (Sexual Harassment) বা যৌন-হয়রানি। আজ বাংলাদেশে যা হচ্ছে তা মোটেই ইভ-টিজিং নয় এটা পূর্ণ সেক্সুয়েল হ্যারাসমেন্ট। বাংলাদেশের বখাটে যুবকদের ইভ-টিজিং আর ইংল্যান্ডের বখাটে ছেলেদের ইভ-টিজিং এক নয়। পশ্চিমা দেশের বেকার বখাটেদের দলে শুধু কিশোর যুবকেরাই নয় কিশোরী যুবতিরাও আছে। একই দলে কিশোর কিশোরীর উপস্থিতিই প্রমান করে এরা Eve Teasing আর Sexual Harassment এর পার্থক্য বুঝে। পশ্চিমের যুবকেরা Sexual Offence কী, এবং এর পরিণতি বা শাস্তি সম্মন্ধেও সচেতন।

ভারতবর্ষে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত রাস্ট্রের দন্ড-বিধিতে Sexual Harassment এর কথা উল্লেখ ছিলনা, এমন কি এ নিয়ে পশ্চিমেও তেমন কোন আলোচনা হতো না। ভারতবর্ষে Sex শব্দটাই ছিল অশ্লীল, ঘৃণীত, প্রকাশের ও আলোচনার টেবিলে তুলার অনুপযুক্ত। ১৯৭৩ সালে ডঃ মেরি রো (Dr Mary P. Rowe) ততকালীন আমেরিকার Massachusetts Institute of Technology (MIT) এর প্রেসিডেন্ট ও চ্যান্সেলার (Jerome Bert Wiesner) কে দেয়া এক রিপোর্টে লিঙ্গ-বৈষম্যের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে Sexual Harassment বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করেন। এর কিছু আগে ষাটের দশক থেকে নারী নির্যাতন ভারত উপমহাদেশে আলোচনার টেবিলে আসে, এবং খবরের কাগজে বিভিন্ন সংস্থায়, প্রতিষ্ঠানে, সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারী নির্যাতন, লীঙ্গ বৈষম্যের বাস্তব চিত্র প্রকাশিত হতে থাকে। তখনো ইভ টিজিংকে যৌন হয়রানি বা Sexual Harassment হিসেবে ধরা হতো না। ১৮৩৭ সালের ১৪ অক্টোবর টমাস বাবিংটন ও তার সহযোগীদের প্রস্তাবিত (২৩ বছর পর ১৮৬০ সালে গৃহীত) ইন্ডিয়ান Penal Code এ ইভ টিজিং আর সেক্সুয়েল হ্যারাসমেন্ট ব্যাপারটির কোন উল্লেখই ছিলনা। সেখানে তিন ক্যাটাগরিতে যে ভাবে যৌন নির্যাতনকে সঙ্গায়িত ও তদানুসারে শাস্তির বিধান করা হয়েছিল তাতে ইভ টিজিং বা Sexual Harassment কিংবা যৌন হয়রানির উল্লেখ না থাকারই কথা। মনে করা হতো, জোর পূর্বক দৈহিক মিলন বা ধর্ষণ অথবা গায়ে হাত না দেয়া পর্যন্ত Sexual Offence হয় না। অর্থাৎ ইভ টিজিং কোন অপরাধ হিসেবেই গণ্য হতো না। সুতরাং আইনের চোখে এর কোন শাস্তিও নেই।

অপরাধ আইনের দন্ড-বিধি, শাস্তির বিধান, সেই বৃটিশ আমল থেকে ভারত, তারপর পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত প্রায় অপরিবর্তিতই থেকে গেছে। সময়ের পরিবর্তনে অপরাধের আকার-ধরণ, রূপের পরিবর্তন ও বিস্তৃতি যেমন ঘটেছে, তেমনি আইনি পুস্তকে বা বিধানেও উভয় কুল (শ্যম ও ঘর) বজায় রেখে কিছুটা পরিবর্তন সংযোজন হয়েছে। মূলত ভারতে ৬০ সালেই ইভ টিজিং এর কুৎসিত চেহারা প্রকাশ হতে থাকে যদিও মুসলিম প্রধান দেশ পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারকগণ তা দেখতে সক্ষম হন নি, অথবা সচেতন ভাবেই তারা বিষয়টি আলোচনার বাইরে রেখেছিলেন। বলা বাহুল্য তারাও যে একই সিস্টেম বা ধারায়, একই কুসংস্কার ও প্রথায় বিশ্বাসী ছিলেন, এবং আজও আছেন। ভাবখানা এ রকম যে, আদমের পুত্র, ইভের মেয়েকে টিজিং করবে, এ এমন অপরাধ কি?

httpv://www.youtube.com/watch?v=dv052M99HWI

১৯৮৮ সালে সর্বপ্রথম ভারতে দ্যা নিউ দিল্লি প্রভিন্সিয়েল পার্লামেন্ট ‘The Delhi Prohibition of Eve-teasing Act- 1988’ নামে ‘ইভ টিজিং’ এর উপর একটি নতুন আইন পাস করেন। ৯৮ থেকে ভারতের প্রত্যেক প্রদেশই ‘ইভ টিজিং’ রোধে সক্রীয় হয়ে উঠে। ‘যৌন হয়রানি’ কে ‘বেইলের-অযোগ্য’ অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালে ‘দ্যা ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ অর্ডিন্যান্স’ (DMPO) ইভ টিজিং নাম পরিবর্তন করে ‘ওমেন টিজিং’ নাম দিয়ে একে সঙ্গায়িত করেন এভাবে – “willful and indecent exposure of ones person in any street or public place within sight of, and in such manner as may be seen by, any woman, whether from within any house or building or not, or willful pressing or obstructing any woman in a street or public place or insulting or annoying any woman by using indecent language or making indecent sounds, gestures, or remarks in any street or public place”. ‘ওমেন টিজিং’ এর শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদন্ড অথবা সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা জরিমানা। উল্লেখ্য জাতীয় পর্যায়ে এলাকা ভিত্তিক এই অধ্যাদেশের কোন কার্যকারিতা নেই।

২০০০ সালে এসে বাংলাদেশ সরকার নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্ত কঠিন! আইন প্রণয়নের উদ্দ্যোগ নেন। তখনই সর্বপ্রথম যৌন-হয়রানি বা sexual harassment এর ব্যাপারটি আলোচনায় তুলা হয়। ‘যৌন-হয়রানি’কে সঙ্গায়িত করা হয় এভাবে- “if a man, with a view to fulfilling his illegal sexual desire outrage a woman’s modesty or makes erotic gesture, such act of the man will amount to sexual harassment”. এই প্রথম বারের মত নীতিনির্ধারকগণ বুঝতে পারলেন, গায়ে হাত না দিয়েও নারীকে অপমান করা যায়। ২০০৩ সালে ‘যৌন-হয়রানি’র কারণে আত্মহত্যার ঘটনা সরকারের নজরে আসে। বলা হলো-‘যৌন-হয়রানি’র কারণে কোন নারী যদি আত্মহত্যা করে তাহলে অপরাধীর শাস্তি হবে সর্ব নিম্ন ৫ বছর ও সর্বোচ্চ দশ বছর কারাদন্ড। তবে শর্ত হলো অপরাধীর শাস্তি ততক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর করা হবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত না আত্মহত্যাকারী মৃত্যবরণ করেছে। যথার্থ আইনই বটে!

‘ইভ টিজিং’ এর শা’নে নুজুল-

সাপের (শয়তান) পরামর্শে আদি মাতা হাওয়া (ইভ) পিতা আদমকে ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করে জ্ঞানবৃক্ষের ফল ভক্ষণ করতে প্ররোচিত করেছিলেন। আদেশ অমান্য করার কারণে ঈশ্বর আদমকে চাষাবাদ করে খাওয়ার শাস্তি দিলেন আর হাওয়াকে দিলেন কঠিন প্রসব বেদনা। হাওয়াকে টিজিং শুধু ঈশ্বরই করেন নি, আদমও তাকে জয়তুন গাছের ডাল দিয়ে প্রহার করেছিলেন। আদিপুস্তক থেকে শুরু করে শেষ পুস্তক কোরান পর্যন্ত শত-সহস্র বৎসর যাবত সকল ধর্মগ্রন্থ এই শিক্ষাই মানুষকে দিয়ে আসছে যে, নারী হাওয়া, পুরুষ আদমের সেবিকা। আদমের ভোগ্য সম্পত্তি হিসেবে সৃষ্ট নারী ইভ একজন প্রতারণাকারিনী, নির্বোধ, আদেশ অমান্যকারিণী, অশুচী, অপবিত্র, ছলনাময়ী যার পাপের প্রায়শ্চিত্ব করতে স্বর্গসুখ ত্যাগ করে মানুষের পৃথিবীতে আগমন। যেদিন থেকে ধর্মগ্রন্থ ইভের জন্ম দিয়েছে, সেদিন থেকে ইভ-টিজিং এরও জন্ম। ধর্ম যেমন সারা বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে আছে তেমনি যুগে-যুগে দেশে-দেশে প্রতিটি সমাজে এই ইভ-টিজিং ছিল আজও অব্যাহত আছে। ইভকে আদম ও ঈশ্বর কর্তৃক টিজিং করার এই হলো শানে নুজুল।

ইভের কলংক দিয়ে রচিত কাহিনী যে মিথ্যা নাটক তা পৃথিবীর অন্যান্য যায়গায় যখন জানাজানি হয়ে গেছে, ধর্ম যাজকেরাও এ ব্যাপারে মুখ বন্ধ করে ফেলেছেন, মুসলিম দুনিয়ায় পুরোদমে তখন ইভের কলংককে সত্য বলে প্রমান করার জোর চেষ্টা চলছে। বলা হলো, রাস্তায় ইভকে দেখে পয়গাম্বরের বীর্যস্কলনের উপক্রম হয়, এ হতে পারেনা। ইভকে গৃহে বন্দী করে রাখা হউক। অগত্যা কোন কারণে যদি বাহিরে যেতে দিতে হয়, তাকে যেন বস্তা-বন্দী করে পাঠানো হয়। বোরকা, হিজাব, নিকাব না পড়া যদি ইভ টিজিং এর কারণ হতো, তাহলে পশ্চিমা দেশের সকল নারীরা আত্মহত্যা করে ফেলতো, সে সব দেশ এতদিনে নারীশুণ্য হয়ে যেত। বাংলাদেশে প্রকাশ্যে মাঠে ময়দানে হাজার মানুষের উপস্থিতিতে ইভকে তুলনা করা হয় মুল্যবান সম্পদ স্বর্ণালংকারের সাথে, কুকুরের লেজের সাথে, দুধাল গাভীর সাথে। দুধাল গাভী বাহিরে আসলে বুড়োরাও চোখ ফিরে তাকায়, যুবকেরা তো হাত দিয়ে ছুঁতে চাইবেই। ইভ হলো গাছের পাকা বরই, পাহারাহীন বরই গাছে যে কেউ ঢিল ছুঁড়তে পারে। এখানে যুবকদের আর কতটুকু দোষ দেয়া যায়? ১৯৮০ সালে সিলেট আলীয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে যে মৌলানা বাংলাদেশ মহিলা পু্লিশদেরকে অশ্লীল যৌনউত্তেজক নোংরা ভাষায় টিজিং করলেন তিনিই পরবর্তিতে হলেন এ দেশের সাংসদ। জন্ম থেকে যে যুবকটি তার সমাজ তার ধর্ম তার দেশ কর্তৃক ইভকে টিজিং করতে দেখেছে, তাকে ইভ টিজিং এর অপরাধে শাস্তি দেয়ার আগে আসল দোষীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিৎ নয় কি?

httpv://www.youtube.com/watch?v=aJTWwmilkQ0

[398 বার পঠিত]