আমার ছোটবেলা থেকেই আরব দুনিয়া সম্পর্কে একটা কৌতুহল ছিল। বিশাল মরুভূমি ও তেলের দেশ সেখানের জীবন যাত্রা সম্পর্কে জানার তীব্র কৌতুহল। কিন্তু বিশাল ভাবে জানার তেমন কোন উপায় ছিল না। পরবর্তী সময়ে ইন্টারনেটের দৌলতে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছে। আর যে বর্বরতা, নিষ্ঠূরতা আমার চোখে জল এনে দিয়েছিল তা মেয়েদের উপর বর্বচিত ধর্মীয় আইন প্রয়োগ। এই লেখায় আমি সংক্ষেপে তুলে ধরব। তবে পাঠকবৃন্দ বিশেষ কারও ধর্মীয় ভাবনায় আঘাত করা আমার লক্ষ্য নয়। যেখানেই আমি নিষ্ঠুরতা দেখি তার প্রতিবাদ করি তা হিন্দু ধর্ম হোক, মুসলিম ধর্ম হোক, খ্রীষ্ঠান ধর্ম হোক আর নাস্তিক গোড়ামী হোক। পাঠকবৃন্দ আপনারা কোন গোঁড়ামী চিন্তাধারা না রেখে মানবিক দৃষ্টি কোন থেকে উপলব্দি করার চেষ্ঠা করবেন।

হ্যাঁ তা ঠিক মহম্মদের আমলে মেয়েদের অবস্থা আরও খারাপ এবং বিশৃঙ্খল ছিল। তিনি তার পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা পরবর্তী সময়ে পরিবর্তনের বদলে নিষ্ঠুরতার পরিবর্ধন হতে লাগল। শরিয়ত আইনের নামে যে মধ্যযুগীয় বর্বরতা জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে বিদ্যমান তা শুনলে শরীরে শীতকাটা দেয়। এবং এই শরিয়ত আইন অনেক মুসলিম দেশের রাষ্ট্রিয় আইন হিসাবে বিবেচিত। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে দাবীয়ে রাখার জন্য কত ধরণের বাহানা ধর্মের নিয়ম কানুন কখনও আলাহ আশ্রয় কখনও ভগবানের আশ্রয় কখন গড়ের আশ্রয়। আর এই মহান পরম করুণাময় দয়াময় সৃষ্টি কর্তারা সব সুযোগ সুবিধা পুরুষের হাতেই দিয়ে রেখেছেন কারণ ধর্মগ্রন্থগুলি তো পুরুষের হাতেই তৈরী। মেয়েদের উপর শাসন করার এবং দাসত্বের শিকার বানাবার একছত্র অধিকার সৃষ্টিকর্তা দিয়ে রেখেছেন পুরুষের উপর।

বোরকায় ঢাকা মহিলা
বোরকায় ঢাকা মহিলা

বেশী ভাগ আরব দেশগুলিতে মেয়েদের বিবাহ খুব কম বয়সে হয়ে যায় যাকে আমরা বাল্য বিবাহ বলি এবং বিবাহ হয় বাবার পছন্দ অনুসারে। সেখানে মেয়ের পছন্দ অপছন্দের কোন মূল্য নেই। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় আইনে মেয়েদের বিয়ের বয়স সাধারণত ৯ বৎসর। স্বামী তার স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে কোন মুহুর্তে তালাক দিতে পারে। ইজিপ্ট, ওমান, লিবিয়া, জরডান, সোদি আরব এইসব দেশে কোন মেয়ে কোন পুরুষ আত্মিয়ের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোথাও যাওয়া নিষেদ্ধ। আর স্ত্রী প্রহার তো দিগন্ত বিস্তৃত সেখানে কোন প্রতিবাদ নেই নৈতিকতার বিচারবোধের তো প্রশ্ন নেই কারণ এই অধিকার কোরাণ পুরুষকে দিয়েছে। তা হলে তো স্ত্রী প্রহার নৈতিক কর্তব্য তাই না ? আর নারীরাও মেনে নেন স্বামী কতৃক প্রহার বিবাহিত জীবনের স্বাভাবিক একটা অংশ। অনার কিলিং পরিবারের সন্মান রক্ষাত্রে কোন নারীকে মেরে ফেলার নামই হল অনার কিলিং। সেক্ষেত্রে নারীটি দোষী হতে পারে কারও দ্বারা ধষির্তা হয়ে। এইক্ষেত্রে ধর্ষক হতে পারে নারীটির বাবা, ভাই, বা নিকট কোন পুরুষ আত্মীয়। সেইক্ষেত্রে পুরুষকে নিষ্পাপ হিসাবে ধরা হয়। আর ধর্ষিতা নারীই হয় যত দোষী। কারণ হিসাবে সেই নারীর আচরণের কারণেই সে ধষির্ত হতে হয়েছে। বা কারণ হতে পারে বিবাহে অস্বীকৃতি জানানো বা শুধুমাত্র একটা পুরুষের সাথে কথা বলার অপরাধে। সেই ক্ষেত্রে নারীটি যদি নিজের দোষও মেনে নেয় তবু তার মৃত্যু রোখা সম্ভব নয়। কারণ এই খুন করা তার পরিবারের কর্তব্য, সামাজিক কর্তব্য এবং সংস্কৃতি। কোন স্বামী যদি তার স্ত্রীকে পরকীয়ার দোষে দোষী পায় তা হলে খুন করতে পারবে বা জখম করতে পারবে কিন্তু উল্টা ঘটনা যদি ঘটে তা হলে স্ত্রীর শাস্তি হয়ে যাবে। সোদি আরবে মেয়েদের জন্য কড়া আইন। কোন মহিলা সরকারের অনুমতি ছাড়া কোন নন সৌদিকে বিয়ে করতে পারবে না কোন মোটর যান বা বাই সাইকেল চালাতে পারবে না।

ধর্মীয় পুলিশ দ্বারা অত্যাচার
ধর্মীয় পুলিশ দ্বারা অত্যাচার

পাবলিক বাসে মেয়েদের পেছনের সীটে পুরুষদের থেকে লুকিয়ে বসতে হয়। রিয়াদের কিং সৌদ ইউনিভার্সিটিতে কোন পুরুষ প্রোফেসার বা ল্যাকচারার যদি ক্লাস নেন তা হলে মেয়েদের অন্য রুমে গিয়ে ক্লোজ সার্কিট টিভিতে ক্লাস করতে হয়। মেয়েদের রাস্তায় আপাদমস্তক ঢেকে ব্যর হতে হয়, না হলে ধমীর্য় পুলিশের দ্বারা শারীরিক নিপীড়নের শিকার হতে হয়। শুধুমাত্র ৫% মহিলাকে কর্মক্ষেত্রে আছেন। আর ৩.৪% আছেন পার্লামেন্টে। ইউ,এন এর একটা রিপোর্ট অনুযায়ী আরব দেশগুলির বড় সমস্যা ধর্ষণ, বৈবাহিক ধর্ষণ, নারীদের উপর পারিবারিক হিংসা। আর পরিবর্তন যা হচ্ছে তা কচ্ছপ গতিতে। অনেক সেচ্ছাসেবি সংঘটন কাজ করছে তবে দাঁত ফোঁটাতে কষ্ঠ হচ্ছে। আসুন এবার একবার দেখে নেই নরককুন্ড তালিবান শাসিত আফগানিস্তানের নারীদের অবস্থা কি? তালিবান আমলে তালিবানদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল নারী দমন। ১৯৯৬ সালে তালিবান ক্ষমতায় এসে নারীদের পাবলিক স্থানে বোরকা পরা বাধ্যতা মূলক করল আর তা কেউ না মানলে শারীরিক অত্যাচার বা পাথর ছুড়ে হত্যার সম্মুখীন হতে হত। পুরুষ আত্মীয় ছাড়া বাইরে কাজ নিষিদ্ধ ছিল সেই ক্ষেত্রে নারীটি লেখিকা, অধ্যাপিকা, অনুবাদক, ডাক্তার, উকিল, শিল্পী, লেখিকা যে পেশারই হন না কেন।

জারমিনা নামেএক মহিলাকে তালিবানরা মেরে ফেলছে
জারমিনা নামে এক মহিলাকে তালিবানরা মেরে ফেলছে

ঘরের জানালাবন্ধ বা ইসদচ্ছ কাঁচ দ্বারা বন্ধ রাখতে হবে যাতে মেয়েদের দৃষ্টি বাইরে না যায়। মেয়েদের কথা ঘরের বাইরে গেলে তা শাস্তি যোগ্য অপরাধ। আফগানিস্তানের নারীদের বাস ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় কারণ পান থেকে চুন খসলেই হত্যা বা পাশবিক নিষ্ঠূর রক্তাক্ত নির্যাতন। মেয়েদের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই কম এক সাংবাদিকের বর্ণনা মতে অনেক হাসপাতালে মৃতদেহ পাওয়া যায় বোরকা পরিহিত অবস্থায়। অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু বোরকা নামক খোলসের ভিতরই থাকতে হবে। বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা যায় মেয়েদের মধ্যে মানসিক অসুস্থতা চুড়ান্ত পর্যায়ে কেউ আত্মহত্যা করে, কেউ রাস্তার পাশে কান্না, চিৎকার চেচামেচি করছে। আবার কেউ ভীত সন্ত্রস্থ কখন কি হয়? আফগান স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক রিপোর্টে জানালেন শুধু এই বৎসর ২৩০০ মহিলা আত্মহত্যা করেছে যার ৯০% কারণ ডিপ্রেশন । যাই হোক তালিবানরা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে কারজাই সরকার এসেছেন। মনে করেছিলাম এইবার বোধ হয় আফগানিস্থানের অবস্থার উন্নতি হবে। কিন্তু দেশের উন্নতির জন্য কোন আইন আসুক আর না আসুক পার্লামেন্টে আইন পাশ হল কোন নারী যদি স্বামীর যৌন আবেদন খারিজ করে তা হলে তার খাবার বন্ধ করে দিতে হবে। যদিও বারাক ওবামা কারজাইকে ডেকে এই আইন বদলের জন্য বলেছিলেন। কারজাই বলেছিলেন দেশে ফিরে তিনি আইনটি বদলের পুন:বিবেচনা করবেন। তার পর কি হল আমি জানতে পারি নাই। পাকিস্থানের একটি স্বাস্থ্য বিষয়ক সাইট আছে noorclinic.com এরা জনগনের স্বাস্থ্য সচেতন করার জন্য সাইটটি খুলেছেন। এখানে একজন সাইকোলজি বিভাগের প্রোফেসার লেখালেখি করেন নাম প্রোফেসার আরসাদ জাবেদ (এম.এ সাইকোলজি, কালিফোর্নিয়া, ইউ,এস,এ)। যাই হোক উনার একটা আর্টিকল পড়ছিলাম তাতে তিনি পরিবার পরিকল্পনা এবং জন্ম নিয়ন্ত্রনের কথা বলতে গিয়ে বলেন যদিও আমাদের ধর্ম হিসাবে জন্ম নিয়ন্ত্রন নিষেধ তবু আমি বলব আজকালকের যুগে বেশী সন্তান থাকলে তাদের খাওয়াবেন কি আর মানুষ করাও কষ্ট।?(জন্ম নিয়ন্ত্রন বলতে গিয়ে ধর্মকে টানার কারণ আমি বুঝতে পারি নি।) তিনি মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলছেন স্বামী যখনই যৌন আবেদন করবে তা খারিজ না করার জন্য। উদাহরণ দিয়ে বলেছেন যদি আপনি রুটি বানাতেও থাকেন তবু আপনাকে সাড়া দিতে হবে। বাহ! একজন প্রোফেসারের যদি এই রকম কুসংস্কাছন্ন মানসিকতা হয় তা হলে সাধারণ মানুষের কি হবে? নিজেদের সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন, নিষ্ঠুরতা, আদিম প্রবৃত্তি যদি না ছাড়তে পারি তা হলে। মহাকাশে পাড়ি দিয়ে কি হবে। আর এই মানব সভ্যতার কি মানে?

নির্যাতনের বিভৎস চিত্র দেখুন এই সাইট থেকে।

তথ্যসুত্র :-

‌1. www.jewishvirtuallibrary.org/jsource/myths/mf16.html
2. Arab Human Development Report 2002, NY: UN, 2002
3. Women’s Rights in Muslim Countries.html
4. en.wikipedia.org/wiki/Women_in_Islam
5. meria.idc.ac.il/journal/2006/issue2/jv10no2a2.html
6. http://www.guardian.co.uk/world/2009/mar/31/hamid-karzai-afghanistan-law
7. ছবিগুলি যথাক্রমে commons.wikipedia.org, RAWA.org থেকে সংগৃহিত।

[590 বার পঠিত]