পর্যবেক্ষণের জগত ও বাস্তবতার অস্তিত্ব

বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দর্শনমতে – যা কিছু পর্যবেক্ষণ করে যাচাই করা যায় না, তা নিয়ে কথা বলা অর্থহীন। অর্থাৎ অধিবিদ্যা নিয়ে কথা বলা অর্থহীন। গণিত কষে একটা কাল্পনিক মহাবিশ্ব দেখালাম, যাকে পর্যবেক্ষণ করার কোনোই উপায় নাই, সেটার অস্তিত্বকে সত্য দাবী করে কথা চালানোও অর্থহীন।

এখানে, এই অর্থহীন শব্দটি কি অর্থে ব্যবহৃত? সেটা নিয়ে দ্বিধা বিভক্তি আছে। অনেকে একে ব্যবহার করেন অর্থশূন্যতা (meaningless) অর্থে। মানে এমন যেন অন্য কিছুর অর্থ আছে, কিন্তু এসব আলাপ, যেগুলো পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট না, কেবল এদেরই কোনো অর্থ নেই। এখানে প্যাঁচ হচ্ছে যে, অর্থকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। আর অবজেক্টিভ-ভাবে একটা জিনিসকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়? এই অর্থহীনতার আরেকটি বিদ্যমান অর্থ করা হয় – অযথা, অবান্তর (pointless)। মানে কাজের কিছু না। ঈশ্বর সংক্রান্ত দাবীর সত্যাসত্য পর্যবেক্ষণ দিয়ে যেহেতু যাচাই করা যাবে না, তাই তার আছে নাই এর তর্ক অকাজের। সারা জীবন তর্ক করেও এর আগা মাথা কোনো কিছুতে পৌঁছানো যাবে না।

কিন্তু ঈশ্বর আছে দাবী করাটাতো দেখা যায় খুব কাজের। মানে এটা দাবী করে অনেক দুর্বল মানুষ সাহস নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, এটাতে বিশ্বাস করাতে পারলে পুরোহিতরা দু পয়সা করে খেতে পারে, কিছু মানুষের উপর প্রভাবও খাটাতে পারে। ব্যাপারটা কি তাহলে? এখানে “ঈশ্বর আছে” কথাটাকে দুইভাবে দেখতে হবে। ঈশ্বর আছে এই কথাটার সত্য মূল্য নির্ধারণ করা অকাজের, কারণ তা পর্যবেক্ষণগতভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাস বিশ্বাসীদের জগতে পর্যবেক্ষণগত পরিবর্তন সাধন করতে পারে। তার সাথে কিন্তু ঈশ্বরের অস্তিত্বের সত্যমূল্যের কোনো সম্পর্ক নেই। উইচ বা ডাইনিতে বিশ্বাসেরও ভৌত প্রভাব আছে। ডাইনিতে বিশ্বাসের কারণ মধ্যযুগে ইউরোপে হাজার হাজার নারীর মৃত্যু হয়েছে, যেটা একটা পর্যবেক্ষণ-সাধ্য প্রভাব। কিন্তু এ কারণে ডাইনির অস্তিত্ব সত্য হয়ে যায় না।

তাহলে পর্যবেক্ষণের বাইরের বিষয়ের সত্যাসত্য নির্ধারণ অসম্ভব ও তাই অকাজের। এখন পর্যবেক্ষণ সাধ্য জগতটা কতটা সত্য? কারো মতে এই পর্যবেক্ষণ-সাধ্য জগতটাই বাস্তব। কারো মতে এই জগত আসলে বাস্তব নয়, বাস্তবতার চিত্র আসলে ভিন্ন। আবার কারো মতে বাস্তবতা নির্ধারণ অসম্ভব। শেষেরটি অর্থহীনতার অবান্তর হবার সংজ্ঞার সাথে যায়। কারণ পর্যবেক্ষণ এখানে সত্যাসত্য নির্ধারণের পরশপাথর। পর্যবেক্ষণের নিজের সত্যাসত্য বা বাস্তবতা যাচাইয়ের অন্য আরেকটি পরশপাথর নেই, তাই পর্যবেক্ষণ-সাধ্য এই জগত বাস্তব কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর অসম্ভব ও অবান্তর।

দর্শকের আকাঙ্ক্ষা

এই পর্যবেক্ষণ-সাধ্য জগতটা বাস্তব কিনা সেটাই জানি না, তাহলে পর্যবেক্ষণ আমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ আমাদের মাঝে আছে প্রবল আকাঙ্ক্ষা। প্রতি নিয়ত যেহেতু আমরা পর্যবেক্ষণ গ্রহণ করি, আমাদের পর্যবেক্ষণ-সংশ্লিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করেই আমাদের বেশিরভাগ আকাঙ্ক্ষা তৈরী হয়। আমরা অনেককিছু দেখি, এবং সেখান থেকেই কিছু একটা পাবার একটা আকাঙ্ক্ষা আমাদের মাঝে তৈরী হয়। না দেখলে সেটা পাবার আকাঙ্ক্ষাও তৈরী হত না। এবং পর্যবেক্ষণ-অসংশ্লিষ্ট আকাঙ্ক্ষাও মানুষের আছে। যেমন মাদকাসক্তের ভিন্ন বাস্তবতার আকাঙ্ক্ষা। তথাপি, সাধারণভাবে আমাদের আকাঙ্ক্ষা পর্যবেক্ষণ-সাধ্য জগতকে ঘিরেই।

ফলে এই পর্যবেক্ষণ-সাধ্য জগতকে বাস্তব ধরে নিলে ক্ষতি নেই, ব্যাপারটা কেবল এই ধরাধরির। শুধু কেউ যদি দাবী করতে আসে, এই জগত আসলে এমন নয়, এই জগতের আরো দশটা পাখা আছে যেগুলো দেখা যায় না, অথবা আমরা আসলে হয়ত একজন গবেষকের ল্যাবরেটরির কম্পিউটারের র্যামে বসবাস করি, তাহলে আমি বাগড়া দেব, এধরনের স্টেটমেন্ট-এর পর্যবেক্ষণগতভাবে যাচাইয়ের উপায় জানতে চাইব। এবং সঙ্গত কারণেই আমি মনে করি, এধরনের কোনো স্টেটমেন্ট-এরই যাচাই সম্ভব নয়, তাই বলাটাও অবান্তর।

আর পর্যবেক্ষণ-সাধ্য জগত নিয়ে আমাদের যেসব আকাঙ্ক্ষা তৈরী হয়, সেগুলো পূরণ করা যে সহজ নয়, সেটা আমরা উপলবদ্ধি করি। যেমন চাঁদ দেখে সেখানে যাবার শখ হলেও আমরা চাইলেই সেখানে যেতে পারি না। অনেকে মনের জোরে চলে যান। কিন্তু সেটার পক্ষে তার কোনো পর্যবেক্ষণগত প্রমাণ থাকে না। সমাজে প্রভাব থাকলে, চরিত্রগত ক্যারিশমা থাকলে কিছু মানুষ হয়ত মুখের কথাতেই বিশ্বাস করে নেয়। কিন্তু পর্যবেক্ষণগত প্রমাণ সে দাবীতে অনুপস্থিত।

তাই, পর্যবেক্ষণ-সাধ্য জগতে কিছু একটা দেখে সেটা পেতে চাইলে সহজে পাওয়া যায় না। উড়তে চাইলেই (পর্যবেক্ষণ-সাধ্যভাবে, মনে মনে নয়) ওড়া যায় না। কাউকে দেখতে চাইলেই দেখা যায় না। কারো সাথে কথা বলতে চাইলেই বলা যায় না। তবে একেবারে উপায় নেই তাই না। এই পর্যবেক্ষণ-সাধ্য জগতের পর্যবেক্ষণে কিছু নিয়ম বা রেগুলারিটি বিদ্যমান থাকতে দেখা যায়। কার্যকারণ বিদ্যমান থাকতে দেখা যায়। আমাদের দেখা অধিকাংশ পর্যবেক্ষণই র্যান্ডম নয়। তাদের মাঝে কিছু সাধারণ নিয়ম বা সূত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পানিকে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। ফলে পাত্র থেকে পানি ঢাললে আমরা প্রতিবার আশা করতে পারি পানিটা নিচে চলে যাবে। এই সূত্রটি জানা আমাদের জন্য অনেক কাজের। এই সূত্রটি জানি দেখে গোসল করার সময় আমরা নিজেদেরকে পানি ভরা পাত্রের নিচে রাখি। পানি যদি একেকবার একেক দিকে গড়াতো, আমরা কোনো সাধারণ সূত্র পেতাম না, গোসল করাও একটা কঠিন কাজ হয়ে যেত, অন্তত পানির পাত্রের নিচে নিজেদের সমবসময় রাখতাম না।

প্রকৃতির পর্যবেক্ষণের এই সূত্র সবগুলো এমন সহজ নয়। এমন কি পানির এই গড়িয়ে পড়ার সূত্রটির বিস্তারিতও এমন সহজ নয়। যখন বৃহদাকারে এই পানিকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে, যেমন নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ, তখন পানি সম্পর্কে আরো বিস্তর জানতে হয়। এবং সেই জ্ঞান পানির গড়িয়ে পড়ার মত এত সহজ নয়। আর এখানে চলে আসে বিজ্ঞান আর বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

বিজ্ঞান: পূর্বাভাসের ক্ষমতা, ব্যাখ্যা নয়

বিজ্ঞান হচ্ছে পর্যবেক্ষণের সূত্র বের করার সাধনা। তার মানে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার সাধনা? আমি এখানে আবার সতর্ক হয়ে যাই। বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণের সূত্র বের করবে। কিন্তু বিজ্ঞানের সূত্র আবার পর্যবেক্ষণগতভাবে যাচাইযোগ্যও হতে হবে। বিজ্ঞানকে ব্যাখ্যা বললে এই ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করা হয়। সেখানে কোনো কিছু ঘটে যাবার পর অংকের সূত্র দিয়ে একটা গ্রহণযোগ্য ও সুসংগত মডেল উপস্থাপন করা হয় এবং তাকে দাবী করা হয় ঘটনাটার ব্যাখ্যা হিসেবে, পর্যবেক্ষণগত যাচাই ছাড়াই। বিজ্ঞানের যে রূপটি মিডিয়ায় জনপ্রিয়, সেখানে অহরহ নিত্যনতুন গাণিতিক মডেলকে প্রকৃতির স্বরূপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় পাঠকের সামনে। অনেক গবেষকও এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন নন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞানের মূল কাজ পর্যবেক্ষণ নিয়ে, এখানে লব্ধ কোনো জ্ঞানও পর্যবেক্ষণ দ্বারাই যাচাই করতে হবে। আর পর্যবেক্ষণে রেগুলারিটি থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিলো না। এবং একটি অংশে রেগুলারিটি আছে বলে অন্য অংশে থাকবে এমন সাধারণীকরণও এখানে ফ্যালাসি। ফলে পর্যবেক্ষণের বিশ্ব সদাসর্বদা গণিত মেনে চলে, এই পূর্ব-ধারণা প্রমাদযুক্ত। প্রকৃতি গণিত মেনে চলে, এটা একটা ত্রুটিপূর্ণ বা অবান্তর ধারণা। বরং আমরা গণিত ব্যবহার করি প্রকৃতির পর্যবেক্ষণকে বোঝার জন্য।

এখন কি করে বুঝব যে একটা গাণিতিক মডেল পর্যবেক্ষণকে ঠিক মত বুঝতে পেরেছে? একমাত্র উপায়, মডেলটা আবার পর্যবেক্ষণের উপরে যাচাই করে নেয়া। ফলে ঘটে যাবার পর একটা সুসংহত মডেল তৈরী করে সেটাকে পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা দাবী করা চলবে না। পুনরায় তদ্রূপ অবস্থা পুনর্নির্মাণ করতে হবে, পর্যবেক্ষণ নেয়ার আগে মডেলটিকে বলতে পারতে হবে পরিমাপক যন্ত্রে কি পরিমাপ করা হবে বা চোখে কি দেখা যাবে। মানে মডেলের পূর্বাভাসযোগ্যতা থাকতে হবে। যে মডেল পর্যবেক্ষণের উপর পূর্বাভাস দিতে পারে না, সেটা বৈজ্ঞানিক মডেল নয়, প্রকৃতির সেই ব্যাখ্যা কোনো বৈজ্ঞানিক প্রকল্প নয়। আর পূর্বাভাসক্ষম মডেলগুলোর মধ্যে যে মডেলের পূর্বাভাস ভুল হয়, সে মডেল ভুল মডেল। আর যে মডেল পর্যবেক্ষণের সঠিক পূর্বাভাস দেয়, সেটা প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব।

অনেক পূর্বাভাসক্ষম বৈজ্ঞানিক মডেল এরকম ভুল-ঠিক টাইপের হয় না। পর্যবেক্ষণের যে পরিমাপ পরিমাপক যন্ত্রে পাওয়া যাবে, সে পরিমাপ সম্পর্কে একটা পূর্বাভাস মডেলটা দেয়, কিন্তু দেখা যায় পূর্বাভাসের সাথে পরিমাপের রিডিংয়ের পার্থক্য থাকে। এসব ক্ষেত্রে মডেলটাকে বাইনারি ভুল ঠিক না বলে পূর্বাভাস কতটা ভুল সে হিসাব করা হয় এবং এর চেয়ে নিঁখুত পূর্বাভাস দেয়া মডেলের অবর্তমানে এই মডেলকে অনেকসময় ফেলে দেয়া যায় না। কেনো? পূর্বাভাসে যেহেতু (আংশিক) ভুল আছে, এটাতো নিশ্চিত যে এই মডেল সংশ্লিষ্ট-পর্যবেক্ষণটার সার্বিক মডেল না? কারণ ওই যে, মানুষের অনেক আকাঙ্ক্ষা আছে, আর পর্যবেক্ষণ নিয়ে মানুষের একটি বড় উদ্দেশ্য হলো পর্যবেক্ষণের রেগুলারিটিকে কাজে লাগিয়ে তার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা। ফলে ওই মডেল অন্তত আংশিক কাজের। পর্যবেক্ষণের একটা কাছাকাছি আভাস এই মডেল দিতে পারে। এই মডেল ছাড়া খালি হাতে সেই পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে মানুষ হয়ত কোনো আঁচই করতে পারে না। আর তার সাথে এই ব্যাপারটিতো আছেই যে প্রকৃতির সকল অংশের একশভাগ রেগুলারিটি থাকবে এমন কোনো কথা নেই। কে জানে কি নিয়ম মেনে এই সব পর্যবেক্ষণ তৈরী হচ্ছে। আমার হাতের মডেল বা সূত্রগুলো সেই পর্যবেক্ষণেরই গতি-প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাই বলে এই সূত্রটিই প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সূত্র, এমন স্টেটমেন্ট আধিবিদ্যিক, যাচাইঅযোগ্য ও অবান্তর। যেমনভাবে, কোনো ঈশ্বর এই রেগুলার বা ইররেগুলার পর্যবেক্ষণ তৈরী করেছেন এমন দাবী করা যাচাইঅযোগ্য ও অবান্তর।

ফলে এই পর্যবেক্ষণকে নিয়েই মানুষের অধিকাংশ আশা আকাঙ্ক্ষা পরিব্যাপ্ত হয়। এর অনেকগুলো হলো দেখা গেছে বা দেখা যায় এমন কিছু একটা পেতে চাওয়া, আর একটা বড় আকাঙ্ক্ষা হলো, এই পর্যবেক্ষণগুলোকে নেহায়েত তার নিজের আগ্রহের কারণে বুঝতে চাওয়া, এর কোনো দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে। দুটার জন্যই মানুষের একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়ে পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে পূর্বাভাস তৈরির ক্ষমতা অর্জন। পূর্বাভাস করতে পারলেই বলা যায়, পর্যবেক্ষণগুলোকে আমি বুঝতে পেরেছি। “বুঝতে পারার” বা জ্ঞানের এটাই হলো বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা। (জ্ঞান হলো পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত পূর্বাভাস করার ক্ষমতা)। পূর্বাভাস করতে পারলেই বলা যায়, পর্যবেক্ষণগুলোর উপর আমার জ্ঞান হয়েছে। আর পর্যবেক্ষণ-সাধ্য কোনো কিছু পাবার যে আকাঙ্ক্ষা, সেটা বাস্তবায়নের জন্যও পর্যবেক্ষণের উপর পূর্বাভাসের ক্ষমতা অপরিহার্য।

পর্যবেক্ষণের এই জগতে কিছু পাবার আকাঙ্ক্ষা পূরণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যে জ্ঞান, সেটা হলো ক্রিয়া-শর্তাধীন জ্ঞান। পানি নিচের দিকে পড়ে, এটা হলো ক্রিয়া-`অ’শর্তাধীন জ্ঞান। আমার ক্রিয়ার উপর এই (পর্যবেক্ষণ-সংক্রান্ত) সত্য নির্ভর করে না। আর পাত্র থেকে পানি ঢাললে পানি নিচের দিকে পড়ে, এটা ক্রিয়া-শর্তাধীন জ্ঞান। বলে লাথি দিলে বল কোনদিকে যাবে সেই জ্ঞান ক্রিয়া-শর্তাধীন জ্ঞান। নদীতে বিশ ফুট বাঁধ দিলে পানির গতি-প্রকৃতি কেমন হবে সেই জ্ঞান ক্রিয়া-শর্তাধীন জ্ঞান। একটা এটমে একটা ইলেকট্রন সজোরে ছুঁড়ে দিলে কি হবে সে জ্ঞান ক্রিয়া-শর্তাধীন জ্ঞান। মানে এখানে (পর্যবেক্ষণ-সংক্রান্ত) সত্য আমার ক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। কৌতুহলের বিজ্ঞান সবসময়ে ক্রিয়া-শর্তাধীন জ্ঞান নিয়ে চিন্তিত না। কিন্তু কিছু পেতে চাওয়ার যে বিজ্ঞান, সেটাতে এগুতে হলে নতুন কোনো হাতিয়ার সৃষ্টি জরুরি, যেটা সাহায্য করবে আকাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পেতে। যেমন, নদীর গতি-প্রকৃতি পরিবর্তনের জন্য বাঁধ তৈরী জরুরি, ড্রেজ করা জরুরি, নিউক্লিয়ার শক্তি পাবার জন্য রিয়াক্টর তৈরী জরুরি, চাঁদে যাবার জন্য রকেট তৈরী জরুরি, দূরের মানুষের সাথে কথা বলার জন্য টেলিফোন তৈরী জরুরি, আমার জটিল গণনাগুলো করে দেবার জন্য কম্পিউটার সৃষ্টি জরুরি। আর কিছু সৃষ্টি করার জন্য ক্রিয়া-শর্তাধীন জ্ঞান অপরিহার্য। কারণ মানুষের ক্রিয়া-সাধন ব্যতিত নিজে নিজে প্রাকৃতিক নিয়মে বা কেবল ইচ্ছাশক্তি দ্বারা এগুলো সৃষ্টি সম্ভব না।

পর্যবেক্ষণের দুনিয়ায় ক্রিয়া-শর্তাধীন অথবা ক্রিয়া-অশর্তাধীন ঘটনার পূর্বাভাস করার যে প্রক্রিয়া, সেটাই বিজ্ঞান। পর্যবেক্ষণের দুনিয়া নিয়ে একমাত্র কাজের জ্ঞান।

অধিবিদ্যা, বিজ্ঞান এবং আমরা

মানুষের মনে রয়েছে প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা। মানুষ তা কিভাবে পূরণ করবে সে তার নিজের উপর। যে পর্যবেক্ষণ-সাধ্য জগতকে সে দেখছে, সেটা বাস্তব কিনা সে জানে না, জানার উপায় নেই। তার নিজের অস্তিত্ব বাস্তব কিনা, সে জানার কোনো উপায় নেই। সত্যিকারের বাস্তবতা আসলে কোনটা, সেটা জানারও কোনো পথ নেই। তবে তার ইন্দ্রিয় আর অনুভূতির জগতে পর্যবেক্ষণ বলে সুন্দর একটি জিনিস আপতিত হয়। সেই পর্যবেক্ষণের জগত নিয়ে কিছু স্টেটমেন্ট রাখা যায়, যেগুলো ওই পর্যবেক্ষণের উপরই যাচাই করা যায়। আর সেজন্য তার হাতে রয়েছে বিজ্ঞান। এই পর্যবেক্ষণের জগত এমন কি মিথ্যা হলেও দর্শকের কাছে স্বকীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে মানুষের পর্যবেক্ষণ-অসাধ্য, কল্পনার জগত, সেখানে বিচরণ করে মানুষের অধিবিদ্যা। সেগুলোও অসংখ্য স্টেটমেন্ট তৈরী করে, ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা, নৈতিকতা, উচিত-অনুচিত। কিন্তু সেগুলোর কোনো প্রকারেরই কোনো যাচাই নেই, সেটা সম্ভব না। এসব স্টেটমেন্টের যাচাইয়ে এমনকি বিজ্ঞানের আনয়নও অসম্ভব, কেননা এগুলোতো পর্যবেক্ষণই করা যায় না। যাচাই কিভাবে হবে? এগুলোকে বিদায় করার কোনো উপায় নেই, মানুষের আকাঙ্ক্ষার বদল হওয়া ছাড়া।

মানুষ কি আকাঙ্ক্ষা করবে সেটা তার নিজের ব্যাপার। কোন জগতকে বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করে নিবে, বা গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে সে তার নিজের ইচ্ছা। তবে পর্যবেক্ষণের এই জগতকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে, পর্যবেক্ষণ-সাধ্য কিছু নিয়ে আকাঙ্ক্ষা করলে সেটা পূরণের জন্য বিজ্ঞানের কাছে ফিরে আসতে হবে। মুখের বুলিতে কাজ হবে না। আপনি আর পিটার যদি একই জিনিস চান, আপনি যদি সেটা পাবার জন্য চব্বিশ ঘন্টা প্রার্থনা করেন আর পিটার যদি সেটা পাবার জন্যে বিজ্ঞান, নতুন তৈরী হাতিয়ার ইত্যাদি ব্যবহার করে, ওই জিনিস নির্ঘাত পিটার পাবে আপনি নন। সে নিউক্লিয়ার শক্তি হোক, মঙ্গল গ্রহে যাওয়া হোক, আর ভেসে ভেসে অফিস যাওয়া হোক। এবার আপনার জায়গায় মুসলমান জাতি বা বাঙালি জাতি বা বাঙালি মুসলমান জাতিকে বসান, আর পিটারের জায়গায় পশ্চিমাদের। চিত্রটা তখন মোটামুটি এরকমই। মুসলমানেরা মোটের উপর মুখের তুড়ি ছুটিয়েই নতুন সহস্রাব্দে পা রাখল। তাদের বিজ্ঞানী ইবন আল হাশেম যদিও এক হাজার বছর আগেই বলেছিলেন “কেতাবিরা নয়, বরং যুক্তি আর উপাত্ত যাচাইকারীরাই প্রকৃত সত্যের সন্ধানী”, জাতি হিসেবে তারা বিজ্ঞানের এই দর্শনকে কখনই কদর করে নি। তাই এই দর্শনের ধারাবাহিকতাও মুসলমান বিজ্ঞানীদের মধ্যে থাকে নি। অথচ তাদের জাতিগত একটা বড় আকাঙ্ক্ষা পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত: পৃথিবীতে শরীয়তি শাসন কায়েম করা। শরীয়তি শাসনই উত্তম, এই স্টেটমেন্ট নৈর্ব্যক্তিকভাবে যাচাই অসম্ভব। একটা যাচাই-অযোগ্য, ব্যক্তিক বিশ্বাস সকল মানুষের উপর জোরপূর্বক চাপানোর এই ইচ্ছাটাই দুঃখজনক, তার ওপর আবার সেটা অর্জনের জন্য মারেফতের উপর ভরসা করা। যেনো সোনায় সোহাগা!

বাঙালিও জাতিগতভাবে খুব মারেফতি। আধ্যাত্মিকতা তার মজ্জাগত। পর্যবেক্ষণগত জগতটা নিয়ে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা কম। তা থাকুক না বাঙালি তার আধ্যাতিক জগতের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, পিটার থাকুক পর্যবেক্ষণের জগত নিয়ে। ক্ষতি কি? পর্যবেক্ষণ জগতে যখন আঘাত আসে, আধ্যাত্মিক জগতের ভিতরে বসবাস প্রলম্বিত করা তখন কঠিন হয়ে যায়। এবং আঘাত আসতে পারে, কারণ প্রাপ্তিসাধ্য পর্যবেক্ষণের জগত সীমিত। রসদ সীমিত। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবশ্যম্ভাবী। আপনি প্রতিযোগিতায় নাম না লেখালেও আপনি একজন প্রতিদ্বন্দ্বী। কারণ আপনি অন্তত পর্যবেক্ষণ-সাধ্য জগতের একটা স্থান দখল করে আছেন বলেই প্রতীয়মান হয়। সেটার দখল ধরে রাখতে হলে, অচিরেই মাটিতে বিশ্লিষ্ট ও অক্রিয়াশীল হতে না চাইলে আপনাকে পর্যবেক্ষণ জগতের কৌশল জানতে হবে, বিজ্ঞান জানতে হবে। আধ্যাত্মিকতা দিয়ে পর্যবেক্ষণ জগতের কিছুই লাভ করা সম্ভব নয়। যদি মনে করেন অন্যায্য তারপরেও একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা পর্যবেক্ষণ জগতে বিদ্যমান আছে। এখানে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু অন্য মানুষেরা নয়, বরং প্রকৃতি নিজেই, সেটা মনে রাখতে হবে। এখানে পিছিয়ে পড়ারাই হেরে যায়। এই হারাটা হেরে যেতে যদি না চান, এখানে আধ্যাত্মিকতা তবে কোনোই সহায় নয়।

বাঙালি যদি আধ্যাত্মিকতা ভালবাসে, যদি তার অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষায় আধ্যাত্মিকতা মজ্জাগত হয়, সে আধ্যাত্মিকতা করেই যাবে। কিন্তু এই পর্যবেক্ষণের জগতে আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য না হোক, টিকে থাকার জন্যে হলেও বিজ্ঞান জানতে হবে। আমরা ছোটবেলায় সবাই যে আলাউদ্দিনের চেরাগ কল্পনা করি, মনে মনে – আধ্যাত্মিক জগতে যে আলাউদ্দিনের চেরাগ আমরা হাজারবার পেতে পারি, পর্যবেক্ষণের এই জগতে সেটা এনে দিতে পারে কেবল বিজ্ঞান। আর সেটা চর্চার প্রথম পদক্ষেপ হলো পর্যবেক্ষণ-অসাধ্য তথা অর্থহীন সকল তত্ত্ব/প্রকল্পকে পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা হিসেবে বাতিল করতে শেখা এবং এমন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা যা পূর্বাভাস দিতে পারে (can predict observation), এমন হাতিয়ার তৈরী করা যা পর্যবেক্ষণের জগতটাকে তার নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। পর্যবেক্ষণের জগতে ভবিষ্যত বলতে পারার ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় ক্ষমতা। এটাই আমরা সবাই চাই। আমরা জানতে চাই, কি করলে আমরা প্রমোশন পাবো, কি করলে বোনাস পাবো, কি করলে আয় বাড়বে, জানতে চাই টাকা ব্যাংকে রাখলে ভালো হবে না ব্যবসায় খাটালে। রাজনীতিবিদরা জানতে চায় কি করলে মানুষ ভোট দিবে, সংখ্যালঘুর পক্ষে বললে ভোট বাড়বে না কমবে। রাষ্ট্র জানতে চায়, প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ বাঁধলে কে জিতবে, জনসংখ্যা বাড়লে কি লাভ, কি ক্ষতি। পর্যবেক্ষণের দুনিয়াসংক্রান্ত আমাদের সকল প্রশ্নই এক অর্থে ভবিষ্যত জানতে চাওয়া। কি ঘটবে আগে থেকে বলে দিতে পারা, এটা কোনো দৈব-শক্তি দ্বারা সম্ভব নয়, সম্ভব হলে কেবলমাত্র সম্ভব বিজ্ঞান দ্বারা।

কেউ যদি জিগ্গেস করেন আমি আস্তিক নাস্তিক না অজ্ঞেয়বাদী, সে প্রশ্নের উত্তর হবে এই পুরো প্রবন্ধটি। এটাই হলো আমার অবস্থান। আসলে এই প্রশ্নের উত্তর আস্তিক নাস্তিক বা অজ্ঞেয়বাদী এই তিনটির যেকোনো একটি হলেই কিন্তু এক অর্থে মেনে নেয়া হলো যে ঈশ্বর আছে কিনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি প্রশ্নটিকেই অবান্তর মনে করি, তখন আমার পরিচয় কি?

[360 বার পঠিত]