কিছুদিন আগে সিদ্ধার্থ একটি চমৎকার প্রবন্ধ লিখেছিলেন মুক্তমনায় ‘ঈশ্বর ও নৈতিকতা‘ শিরোনামে। প্রবন্ধটিতে তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছিলেন ধর্মকেন্দ্রিক নৈতিকতার অসারতা। তার উপসংহার ছিলো নৈতিক বিধানের উৎস অনুসন্ধানের জন্য ‘ঈশ্বর’ নামক অনুকল্পের কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। যথার্থ মূল্যায়ন, এ নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। কিন্তু একটি জায়গায় কিছুটা অসুম্পূর্ণতা রয়ে গিয়েছিলো আমার মতে। নৈতিকতার উৎস সন্ধানের জন্য ঈশ্বর বা ধর্মের প্রয়োজন নেই সত্যি, কিন্তু আমাদের বিবর্তনীয় ইতিহাস পরিক্রময়ায় দেখাতে হবে কীভাবে সমাজে নৈতিকতার উদ্ভব ঘটেছিলো। এটি এড়িয়ে গেলে কিন্তু চলবে না। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি না দেখাতে পারলে সম্পূর্ণতার স্বাধ বোধ হয় আস্বাদন করা যায় না। ব্লগার সংসপ্তক সিদ্ধার্থের লেখাটিতে মন্তব্য করতে গিয়ে চমৎকার একটি লাইন লিখেছিলেন –

নৈতিকতাকে তাই স্বতন্ত্র কোন প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে বিবর্তনের আলোকেই দেখা উচিৎ।

আমার আজকের প্রবন্ধটি মূলত সংসপ্তকের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। আমি এই প্রবন্ধে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের বিবর্তনীয় উৎস সন্ধান করতে সচেষ্ট হয়েছি। বিবর্তনের যাত্রা পথে হাটতে হাটতে আমরা খুঁজে নিতে চেষ্টা করব কীভাবে স্বার্থপর প্রতিযোগিতার মাঝেই পরার্থিতার বীজ লুকিয়ে থাকে, আর তারপর এক সময় মহীরূহ আকারে জীবজগতে উদ্ভুত হয় সহযোগিতা, নৈতিকতা আর মূল্যবোধের মত অভিব্যক্তিগুলো। প্রবন্ধটি দুই পর্বে সীমাবদ্ধ রাখতে চেষ্টা করবো। আজকে দেয়া হল এর প্রথম পর্ব।

:line:

বিবর্তনের দৃষ্টিতে নৈতিকতার উদ্ভব

কয়েকদিন আগে জীবন মানে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা নামে সহিংসতা নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলাম ( | | | )। সিরিজটিতে সহিংসতার একটি নৃতাত্ত্বিক এবং সামাজিক বিশ্লেষণ হাজির কারার চেষ্টা ছিলো আধুনিক বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের পটভূমিকায়। এই প্রবন্ধে আমরা দেখব সহিংসতার বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে গিয়েই কিভাবে একসময় পরার্থপরায়ণতা, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের উদ্ভব ঘটেছিলো মানব সমাজে।

সহিংসতা আর নৈতিকতা – দুটি  বৈশিষ্ট্যকে সাদা চোখে দুই বিপরীত মেরুর বাসিন্দা মনে হবে। কিন্তু বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন সহিংসতা আর নৈতিকতার মধ্যে একধরণের অলিখিত সম্পর্ক আছে। গবেষক স্যামুয়েল বাওয়েল তার একটি সাম্প্রতিক গবেষণায়  দেখিয়েছেন আদিম শিকারী সংগ্রাহক সমাজে বিদ্যমান নৃশংস সহিংসতা থেকেই শেষ পর্যন্ত সহযোগিতা আর সহমর্মিতার উদ্ভব হয়েছিলো[1]। ব্যাপারটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। আমরা জানি আমাদের ২৫ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ইতিহাসে শতকরা প্রায় ৯৯ সময়ই আমরা শিকারী-সংগ্রাহক  হিসেবে কাটিয়েছি। শিকারী সংগ্রাহক সমাজের শতকরা ৯০ ভাগ গোত্রই হানাহানি মারামারিতে লিপ্ত থাকতো, আর ১৫ থেকে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে সম্ভাবনা থাকতো যুদ্ধ কিংবা খুনোখুনিতে মানুষের মারা যাবার। বাওয়েল তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আদিম শিকারী সংগ্রাহকদের এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যে গোত্রের সদস্যরা অনেক বেশি নিজেদের মধ্যে সাহায্য সহযোগিতা করেছে, স্বার্থত্যাগ করে সদস্যদের জীবন রক্ষায় কাজ করতে পেরেছে, তারাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাকুঁনিতে তারাই টিকতে পেরেছে অন্যদের চেয়ে বেশি।  অর্থাৎ, সোজা বাংলায় বললে, মূঢ় সহিংসতা থেকেই একসময় জন্ম হয়েছে মূঢ় পরার্থিতার, নীচের কার্টুনটিতে তার একটি আলামত তুলে ধরা হয়েছে –

violence_altruism_sm2

চিত্র: মূঢ় সহিংসতা থেকেই কি এক সময় জন্ম হয়েছিলো মূঢ় পরার্থিতার?

 

কিন্তু কিভাবে স্বার্থপরতা কিংবা সহিংসতার মত বদ খদ ব্যাপার স্যাপার থেকে নৈতিকতার মতো একটি ‘আপাত বিপরীতমুখী’ গুণাবলীর জন্ম হতে পারে? আসুন ব্যাপারটি একটু বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি। তবে এ ব্যাপারটি বুঝতে আগে হলে আমাদের চোখ মেলে প্রকৃতির দিকে তাকাতে হবে, তাকাতে হবে প্রাণীজগতের দিকেও। আমাদের জানতে হবে নৈতিকতার ব্যাপারটি কি কেবল মানব সমাজেরই একচেটিয়া নাকি অপরাপর প্রানীজগতেও এর হদিস মেলে?

 প্রাণীজগতে পরার্থিতা এবং নৈতিকতা

১৯৯৬ সালের আগাস্ট মাসের ১৬ তারিখ। শিকাগোর ব্রুকফিল্ড চিড়িয়াখানা। বিন্তি জুয়া (Binti Jua) নামে এক মেয়ে গরিলা  খাঁচার  ভিতর পায়চারী করছিল। হঠাৎ,খাঁচার বাইরে দর্শকদের মধ্য থেকে একটি তিন বছরের শিশু দেয়ালের উপর বসে গরিলাকে দেখতে গিয়ে খাঁচার ভিতরে প্রায় বিশফুট নীচে কংক্রিটের মেঝেতে আছরে পড়ে। পড়েই জ্ঞান হারায় ছেলেটি। বিন্তি পায়চারী বাদ দিয়ে ছেলেটির দিকে এগিয়ে যায়। ১৬০ পাউণ্ডের দীর্ঘদেহী গরিলাটিকে ছেলেটির দিকে এগিয়ে যেতে দেখে দর্শকদের মধ্যে মুহূর্তেই চীৎকার চ্যাচামেচি শুরু হয়ে যায়। বিন্তি কাছে গিয়ে অনেক মনোযোগ দিয়ে ছেলেটিকে দেখতে লাগলো। তারপর এক সময় দুই হাতে শিশুটিকে বগলদাবা করে ফেললো। দর্শকদের মধ্যে তখন আতংক চরমমাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে।অনেকেই ভাবছিলেন, এবারে নিশ্চয়ই বাচ্চাটাকে ছিঁড়ে খুরে খেয়ে ফেলবে ঐ পাষণ্ড গরিলা। কিন্তু তারপরে যা ঘটল, তার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলো না। এ কাহিনী কেবল আমরা রূপকথাতে কিংবা কল্পকাহিনীতেই শুনেছি। বিন্তি শিশুটিকে নিয়ে বিশফুট দেয়াল পার হয়ে খাঁচার এক প্রান্তের একটি প্রবেশ দ্বারে এসে দাঁড়িয়ে  থাকলো যাতে নিরাপত্তাকর্মীরা তার কাছ থেকে এসে নিয়ে যেতে পারে। নিরাপত্তাকর্মীরা বিন্তির কাছ থেকে বাচ্চাটি নিয়েই সোজা হাসপাতালের দিকে ছুটলেন।  শিশুটি পরিপূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করলো দিন কয়েকের মধ্যেই। এভাবেই ব্রুকফিল্ড চিরিয়াখানার বিন্তি নামের গরিলাটি  বাঁচিয়ে দিয়েছিলো একটি ছোট্ট শিশুর জীবন।

binti_jua1

চিত্র: বিন্তি জুয়া নামের গরিলাটি বিশ ফুট নীচে পড়ে যাওয়া ছেলেকে কোলে তুলে নিচ্ছে। ১৯৯৬ সালের আগাস্ট মাসের ১৬ তারিকে এভাবেই গরিলাটি বাঁচিয়েছিলো  ছেলেটির জীবন।

এ ধরণের পরার্থপরতামূলক কাজ যে কেবল বিন্তিই নামের পশুটিই করেছে তা কিন্তু নয়। ১৯৮৬ সালে জার্সি চিরিয়াখানায় জাম্বো নামে আরেকটি গরিলাও ঠিক এমনিভাবে আরেকটি মানব শিশুর জীবন বাঁচিয়েছিল। সেখানেও শিশুটি খাঁচার ভিতরে পড়ে গিয়েছিল, আর জাম্বো বিন্তির মতো শিশুটিকে কোলে করে নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে তুলে না দিলেও বহুক্ষণ ধরে শিশুটির কাছে দাঁড়িয়ে তাকে রক্ষা করেছিল, যাতে অন্য গরিলারা আক্রমণ করতে না পারে।  এতোদিন মানবিকতা, সহিষ্ণুতা, পরার্থপরায়ণতা, সহযোগিতা, নৈতিকতা প্রভৃতি শব্দগুলোকে ‘মানুষের’ একচেটিয়া সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করার যে রেওয়াজ ছিল,  বিন্তি কিংবা জাম্বোর প্রয়াস সে সব স্বতঃসিদ্ধ ধারণার প্রতি শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলো যেন।  বিজ্ঞানীরা বলেন, শুধু গরিলা নয় শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং,কিংবা বনোবোদের মধ্যে এ ধরণের পরার্থিতার সন্ধান খোঁজ করলেই পাওয়া যায়, তারা একে বলেন আবেগানুভুতি (empathy)। আবেগানুভূতি মানুষ শুধু নয়,অন্যান্য অনেক প্রাণীর মধ্যেও দৃশ্যমান (animal empathy)। আর আবেগানুভূতির সাথে নৈতিকতার একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে। বিজ্ঞানী ফ্র্যান্স ডি ওয়াল তার ‘আওয়ার ইনার এপ’ গ্রন্থে বিন্তির ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে অভিমত দিয়েছেন যে, নৈতিকতার ব্যাপারগুলোকে কেবল মানব সমাজের সাংস্কৃতিক অংগ বলে ভেবে নেওয়া হত তা মোটেও ঠিক নয়; আসলে মানব সমাজে নৈতিকতার উদ্ভবের উৎস লুকিয়ে আছে আমাদের বিবর্তনীয় যাত্রা পথে[2]।  ছয় মিলিয়ন বছর আগে আমরা আমাদের শিম্পাঞ্জি জাতীয় পূর্বপুরুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলাম।  বিজ্ঞানী ফ্রান্স ডি ওয়াল তার সাম্প্রতিক ‘প্রাইমেটস এণ্ড ফিলোসফারস’[3] গ্রন্থে বেশ কিছু আকর্ষনীয় উদাহরণ হাজির করে দেখিয়েছেন যে শিম্পাঞ্জি এবং বনমানুষেরাও অনেকটা মানুষের মতো করেই ব্যাথা বেদনায় আক্রান্ত হয়, এমনকি গোত্রে যুদ্ধে  পরাজিত হলে পরাজিত শিম্পাঞ্জিকে অন্য একটি শিম্পাঞ্জি সান্ত্বনা জানানোর উদাহরণও তিনি বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন। কাজেই শিম্পাঞ্জি, গরিলা, বনোবোসহ আমাদের খুব কাছাকাছি প্রজাতিগুলোর আবেগানুভূতি বিশ্লেষণের মাধ্যমেই মানব সমাজে নৈতিকতার প্রকৃত উৎস বৈজ্ঞানিকভাবে জানা সম্ভব  বলে বিজ্ঞানীরা আজ মনে করেন।

chimps_consolation

চিত্র: যুদ্ধে পরাজয়ের পর পরাজিত শিম্পাঞ্জির পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে আরেকটি শিম্পাঞ্জি (উৎস : Frans de Waal, Primates and Philosophers, 2006)

নৈতিকতার ব্যাপারটি মানুষ,  গরিলা কিংবা কিংবা অন্য প্রাইমেটদেরই আছে তা কিন্তু নয়।  ছোট স্কেলে তথাকথিত অনেক ‘ইতর প্রাণী’র মধ্যেও কিন্তু এটি দেখা যায়।  রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার বাদুরেরা নিজেদের মধ্যে খাদ্য ভাগাভাগি করে,  বানর এবং গরিলারা তাদের দলের কোন সদস্য মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত থাকলে তাকে সহায়তা করার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করে,  এমনকি ‘দশে মিলে’  কাজ করে তার জন্য খাবার পর্যন্ত নিয়ে আসে।  ডলফিনেরা অসুস্থ অপর সহযাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে সৈকতের দিকে নিয়ে যায়,  যার ফলে অসুস্থ ডলফিনটির পর্যাপ্ত আলো বাতাস পেতে সুবিধা হয়,  তিমি মাছেরা তাদের দলের অপর কোন আহত তিমি মাছকে দ্রুত সারিয়ে তুলতে চেষ্টা করে।  হাতীরা তাদের পরিবারের অসুস্থ বা আহত সদস্যকে বাঁচানোর জন্য সবোর্চ্চ ত্যাগ স্বীকার করে[4]। এ ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল নয়। অনেক সময় পরার্থপরায়ণতার ব্যাপারটি কেবল নিজেদের প্রজাতিতেই সীমাবদ্ধ  থাকেনা, বহু ক্ষেত্রেই অতিক্রম করে প্রজাতির আঙ্গিনা।  যেমন, ডলিফিনেরা হাঙ্গরের আক্রমণ থেকে বিপন্ন মানুষজনকে বাঁচিয়েছে এমন বেশ কিছু নথিবদ্ধ ঘটনার উল্লেখ আছে বিজ্ঞানীদের গবেষনায়[5], [6], [7]।

 স্বার্থপরতা থেকে সহযোগিতা

প্রকৃতিতে প্রতিযোগিতা আছে, আছে নিষ্ঠুরতা – এ কথা বোধ হয় আমরা সবাই জানি। কিন্তু কতটুকু নিষ্ঠুরতা? প্রকৃতি যে আসলে ঠিক কি পরিমাণ নিষ্ঠুর তা বোধ হয় অনেক সময় আমাদের  চিন্তাতেও আসে না। হোরাস সম্প্রতি প্রানীজগতে নিষ্ঠুরতার বেশ কিছু নমুনা  মুক্তমনা ব্লগে হাজির করেছেন[8]। সেই লেখাটি থেকেই কিছু উদাহরণ হাজির করা যাক।

মায়ের গর্ভে থাকা অবস্হাতেই শিশু হাঙরেরা একজন আরেকজনকে আক্রমণ করে হত্যা করে এবং তাদের খেয়ে ফেলে যা তাদের পুষ্টি জোগায়। শুরুতে ২০টির মত শিশু হাঙর মায়ের গর্ভে বড় হতে শুরু করলেও ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে একটি মাত্র স্যান্ড শার্কের শিশু বেঁচে থাকে। মার কাছে রাখা কোলের শিশু অরক্ষিত হয়ে পরলে পুরুষ সিফাকা লিমারেরা শিশু লিমারটিকে মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পেট দুভাগ করে মাটিতে ফেলে দেয়।

তারপর ধরুন পাখিদের মধ্যে বিদ্যমান নিষ্ঠুরতার উদাহরণগুলো। কোকিলের নিষ্ঠুরতার উদাহরণ তো আমাদের সবারই জানা। একে তো কোকিল প্রতারণা করে অন্য পাখির রাসায় ডিম পাড়ে। শুধু তাতেই সীমাবদ্ধ থাকলে না হয় কথা ছিলো। কোকিল শিশু ডিম থেকে ফুটে বের হওয়ার সাথে সাথেই যে কাজটি করে তা হলো অন্য ডিমগুলোকে বাসা থেকে ফেলে দেয়া, এমনকি আশে পাশের ডিম ফুটে সদ্য জন্ম নেয়া বাচ্চাকেও। শিশু কোকিলের পিঠে বিশেষ ধরণের একটি খাঁজের মত থাকে যেটা দিয়ে সে ডিমগুলোকে পাখির বাসার বাইরে ফেলে দিতে সাহায্য করে। বলা বাহুল্য,  কোকিল শিশুরা এই কাজটি সহজাত প্রবৃত্তির বশেই করে থাকে। আবার,  ব্লু ফুটেড বুবিস নামক পাখিরা খাদ্যস্বল্পতার সময় (যখন সবচাইতে বাচ্চাদের ওজন স্বাভাবিকের চাইতে ২০ ভাগের বেশী কমে যায়), বড় বাচ্চাটি তখন অন্য সহোদরদের ঠোকর দিয়ে মেরে ফেলে অথবা বাসা থেকে বের করে দেয়। ফলশ্রুতিতে ছোট বাচ্চাটি খাদ্যের অভাবে কিংবা অন্য প্রাণীদের আক্রমণের শিকার হয়ে মারা যায়।

কীটপতঙ্গের  ক্ষেত্রেও নিষ্ঠুরতা প্রবল। মৌমাছিদের কথাই ধরা যাক। রাণী মৌমাছি যখন লার্ভা থেকে পিউপাতে পরিণত হয়,  তখন প্রথম মৌমাছিটা সাথে সাথেই সে অন্যান্য সকল প্রতিদ্বন্দী সহোদরাদের হুল ফুটিয়ে মেরে ফেলে। তার বোনদের একজনও তার হাত থেকে নিস্তার পায় না। তবে প্রকৃতির সম্ভবতঃ সবচেয়ে চরম নিষ্ঠুরতার উদাহরণ পেয়েছিলাম যখন আমাদের মুক্তমনা সদস্য পৃথিবী একবার ইমেইল করে আমাকে ইকনিউমেন (Ichneumon) প্রজাতির একধরণের প্যারাসিটোয়েড বোলতার কথা জানিয়েছিলেন। এরা একটি শুঁয়োপোকাকে হুল ফুটিয়ে প্যারালাইজড করে ফেলে এবং সেটার দেহে ডিম পাড়ে। অর্থাৎ, শিকারকে সরাসরি হত্যা না করে দৈহিকভাবে অবশ করে দিয়ে সেই শিকারের দেহের ভেতরে ডিম পাড়ে। এই ডিম ফুটে যে শূককীট (larva) বের হয়, তা শিকারের দেহের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খেয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। স্ত্রী বোলতাগুলো তার শিকারের প্রত্যেকটি স্নায়ুগ্রন্থি সতর্কতার সাথে নষ্ট করে দেয় যাতে তাদের শিকার পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

ichneumon

চিত্র: ইকনিউমেন প্রজাতির বোলতা শুয়োপোকাকে হুল ফুটিয়ে দৈহিকভাবে অবশ করে দিয়ে সেই শিকারের দেহের ভেতরে ডিম পাড়ে,আর তার দেহকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে।

প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার এই নির্বিচারী উন্মাদনা দেখে সময় সময় বিচলিত হয়েছেন আস্তিক, নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী, প্রকৃতিবাদী, মানবতাবাদী, সংশয়বাদী – সকলেই। বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স এই ইকনিউমেন প্রজাতির বোলতার উদাহরণটিকে তার গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ বইয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি রবিন উইলিয়ামসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘এই প্যারাসিটোয়েড বোলতাগুলোর নিষ্ঠুরতা দেখলেই বোঝা যায় যে পরম করুণাময় ঈশ্বরের মতো কোন পরিকল্পণাকারী দ্বারা এই মহাবিশ্ব তৈরি হলে তিনি একজন স্যাডিস্টিক বাস্টার্ড ছাড়া আর কিছু হবেন না’[9]।  প্রকৃতির এই ঢালাও নিষ্ঠুরতা দেখে এক সময়  বিচলিত হয়েছিলেন ডারউইনও। তিনি প্যারাসিটোয়েড বোলতাগুলোর বীভৎসতা দেখে পরম করুণাময় ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়েন; তিনি মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন[10] –

আমি ভাবতেই পারিনা, একজন পরম করুণাময় এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কোন ঈশ্বর এইভাবে ডিজাইন করে তার সৃষ্টি তৈরি করেছেন যে, ইকনিউমেনগুলোর খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্য একটি জীবন্ত  কিন্তু প্যারালাইজড শুয়োপোকার প্রয়োজন হয়।

 ঈশ্বরের  ‘ভুল ডিজাইনের’ কথা না হয় বাদ থাকুক । আমরা বরং বৈজ্ঞানিকভাবেই খুঁজে দেখার চেষ্টা করি কেন প্রকৃতিতে এই  ঢালাও নিষ্ঠুরতা এমনিভাবে টিকে আছে! বলা বাহুল্য, এই প্রশ্নের একটি সর্বজনগ্রাহ্য বিজ্ঞানভিত্তিক উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন চার্লস ডারউইনই, ১৮৫৯ সালে প্রস্তাবিত  বিবর্তন তত্ত্বের মাধ্যমে। ডারউইন বুঝেছিলেন যে, প্রকৃতিতে প্রতিটি জীবের বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা যত, সে পরিমাণ খাদ্যের যোগান প্রকৃতিতে কখনোই থাকে না।শুধু খাদ্য নয়, আশ্রয়, বাসস্থান  এমনকি প্রজনন সঙ্গীরও ঘাটতি থাকে।এ সব নিয়ে প্রতিনিয়ত অন্তঃপ্রজাতি (intra-species) এবং আন্তঃপ্রজাতি (inter-species) প্রতিযোগিতা চলে। জীবজগতে সবাইকেই বেঁচে থাকার, অধঃবংশ রেখে যাওয়ার অর্থাৎ এক কথায় টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম চলে। তিনি এর নাম দেন জীবনের জন্য সংগ্রাম বা জীবন-সংগ্রাম (struggle of existence)। ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন- জীবন সংগ্রামের কারণেই প্রকৃতির জীবজগৎকে কিছু ক্ষেত্রে চরম নিষ্ঠুর হতে হয়েছে। 

এখন ডারউইন প্রস্তাবিত বিবর্তনীয় পটভুমিকায় প্যারাসিটোয়েড বোলতার নিষ্ঠুরতার ব্যাপারটা আরেকবার চিন্তা করা যাক। উত্তর খুঁজে পাওয়া খুব একটা কঠিন হবে না। শুয়োপোকার জীবন্ত দেহ নিঃসন্দেহে শূককীটের জন্য খুব ভাল আশ্রয় এবং নিরাপদ খাদ্যের যোগান।কাজেই বিবর্তনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এমন কোন জীব খুঁজে পেলে নিশ্চয় আমরা অবাক হব না যে কিনা খাদ্যের চালান এবং আশ্রয় বজায় রাখার জন্য শুয়োপোকাকে নিস্তেজ করে তার দেহকে ব্যবহার করার সুযোগ নিতে চাইবে। প্যারাসিটোয়েড বোলতাগুলো সেই সুযোগেরই  সফল সদ্ব্যাবহারকারী মাত্র।

ডারউইইন যখন বিবর্তন তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন তখন তিনি জিনের ব্যাপার স্যাপারগুলো মোটেই জানতেন না। জানবেনই বা কি করে? জেনেটিক্সের তখন জন্মই হয়নি। এমনকি মেণ্ডেলের সমসাময়িক হওয়া সত্ত্বেও মেণ্ডেলের জিন নিয়ে প্রাথমিক কাজগুলো তার দৃষ্টির অগোচরে থেকে গিয়েছিলো।শুধু ডারউইনই নন, সেসময়কার সমসাময়িক কোন বিজ্ঞানীই মেণ্ডেলের কাজের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন নি, তার কাজ মূলত হারিয়েই গিয়েছিলো বিস্তৃতির অন্তরালে। মেণ্ডেলের মৃত্যুর ১৬ বছর পরে সেগুলো পুনরাবিস্কৃত হয় ইউগো দ্য ফ্রিস, কার্ল করেন্স এবং এরিখ ফন শেরমাখ- সেসেনাগ প্রমুখ বিজ্ঞানীদের দ্বারা। তারপর থেকে বিশেষতঃ আধুনিক বংশগতিবিদ্যার উন্মেষের পর থেকে আমরা জিন সম্বন্ধে সম্যক ধারণা অর্জন করেছি। চল্লিশের দশকে জনপুঞ্জ বংশগতিবিদ্যার অভ্যুদয়ের পর প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাথে বংশগতির সম্মিলন ঘটে। জনপুঞ্জে জিন কিভাবে বংশানুসৃত হয়, তা ব্যাখ্যা করেছিলেন গনিতবিদ জি এইচ হার্ডি এবং জার্মান চিকিৎসক ভিলহেল্ম ওয়েইনবার্গ। পরে পরিসংখ্যানবিদ ইউল দেখিয়েছিলেন যে ডারউইনের অবিচ্ছিন্ন পরিবৃত্তি যে মেন্ডেলবাদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, পরিসংখ্যান দিয়ে তা প্রমাণ করা যায়। জীববিদ নিলসনের গবেষনায় ইউলের প্রকল্পের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে সর্বাধিক ইনফ্লুয়েনশিয়াল ছিলো ১৯৩৭ সালে ডবজাবনস্কির ‘জেনেটিক্স এন্ড অরিজিন অব স্পিশিজ’ নামক বইটির প্রকাশ। এই বইয়ের মাধ্যমেই আসলে আধুনিক বংশগতিবিদ্যার সাথে ডারউইনবাদের সমন্বয় ঘটে। রঙ্গমঞ্চে আসে বিবর্তনের সংশ্লেষনী তত্ত্ব তথা আধুনিক বিবর্তনের তত্ত্ব, যা এখনো বিবর্তনের স্বীকৃত তত্ত্ব হিসেবে জীববিজ্ঞানের পরিমণ্ডলে রাজত্ব করে চলেছে।

সেই আধুনিক বিবর্তন তত্ত্ব আমাদের খুব ভালভাবে দেখিয়েছে জিনগত স্তরে এক ধরণের স্বার্থপরতা কাজ করে[11]। আমরা সবাই অবগত যে, মানুষ সহ যে কোন প্রানীর মধ্যেই সন্তানদের প্রতি অপত্য স্নেহ প্রদর্শন কিংবা সন্তানদের রক্ষা করার জন্য মা বাবারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে। অর্থাৎ, নিজের দেহকে বিনষ্ট করে হলেও পরবর্তী জিনকে রক্ষা করে চলতে সচেষ্ট হয় জীবগগতের প্রায় সকল সদস্যরাই। কারণ, ‘পরবর্তী জিন’ রক্ষা না পেলে নিজের দেহ সুন্দর, কিংবা সুরক্ষিত হোক না কেন, বিবর্তনের দিক থেকে কোন অভিযোজিত মূল্য নেই। সেজন্যই নেকড়ে যখন আক্রমণ করে, গোত্রের ছোট বাচ্চাদের রক্ষা করার জন্য বুনো মোষেরা বাচ্চাদের চারিদিকে ঘিরে শিং উঁচিয়ে  নেকড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করে হলেও। এভাবেই   জীব নিজেকে বিবর্তনের পথ ধরে  এমনভাবে নিয়ে চলে যাতে তার জিন-বিস্তারে কিংবা ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষায় উদ্যোগী হয়, টিকে থাকার প্রয়োজনেই। আসলে যার সাথে সে বেশী জিন বিনিময় করবে, যত ঘনিষ্ঠতা বাড়াবে, তত বাড়বে নিজের জিন বিস্তারের সম্ভাবনা, সেজন্যই, জীব নির্বিশেষে সন্তানের প্রতি, পরিবারের প্রতি, নিকটাত্মীয়রের প্রতি এবং গোত্রের প্রতি একধরনের জৈবিক টান উপলব্ধি করে, এবং তাদেরকে রক্ষার চেষ্টা করে। কাজেই জিনের উদ্দেশ্য যদি কেউ বলেন – কেবল স্বার্থপরভাবে প্রতিলিপি করা আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা – তাহলে সেটা অত্যুক্তি হবে না মোটেই। সেজন্যই স্বনামখ্যাত বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স তার সেলফিশ জিন গ্রন্থে অনুপম কাব্যিক ভঙ্গিমায় বলেন[12] –

আমরা সবাই একেকটি টিকে থাকার যন্ত্র (survival machine)- অন্ধভাবে প্রোগ্রাম করা একটি নিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিক বাহন মাত্র – যার উদ্দেশ্য কেবল স্বার্থপরভাবে এক ধরণের জৈবঅনুকে সংরক্ষণ করা। … তারা আমার ভেতরে আছে, তারা রয়েছে আপনার ভেতরেও; তারাই আমাদের সৃষ্টি করেছে, আমাদের দেহ আর আমাদের মন; আর তাদের সংরক্ষণশীলতাই আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত মৌলিকত্ব। ওই অনুলিপিকারকেরা এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। এখন তাদেরকে জিন বলে ডাকা হয়, আর আমরা হলাম তাদের উত্তরজীবীতার যন্ত্র।

কাজেই জৈব যন্ত্র যে স্বার্থপর তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। জিনগত স্তরে স্বার্থপরতা থাকার কারণেই  অনেকটা ‘ টিকে থাকার যন্ত্র’ হিসেবে কাজ করে যায়। কিন্তু বিস্ময়কর যে ব্যাপারটি গবেষণায় বেরিয়ে আসলো তা হল – জিনের এই স্বার্থপরতা থেকেই পরার্থতার মতো এক ধরণের বিপরীতমুখি অভিব্যক্তির উদ্ভব ঘটতে পারে ।  ‘দ্য এন্ট এন্ড পিকক’ গ্রন্থের লেখিকা জীববিজ্ঞানী হেলেনা ক্রনিন  তার ‘দ্য বেটেল অব সেক্সেস রিভিসিটেড’ নামের প্রবন্ধে বলেন[13] –

Among genes all is selfishness, every gene out for its own replication. But from conflict can come forth harmony; the very selfishness of genes can give rise to cooperation. For among the potential resources, that genes can exploit is the potential for cooperation with other genes. And if it pays to cooperate, natural selection will favor genes that do so.

স্বার্থপর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরার্থপরায়ণতার উদ্ভবের ব্যাপারটি  শিক্ষায়তনে গবেষণার মাধ্যমে প্রথমবারের মত তুলে ধরেন বিজ্ঞানী জর্জ উইলিয়ামস এবং উইলিয়াম হ্যামিলটন[14]। পরবর্তীতে ধারনাটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন  রিচার্ড ডকিন্স তার উপরে উল্লিখিত ‘দ্য সেলফিশ জিন‘ বইয়ের মাধ্যমে[15]। তারা দেখালেন, স্বার্থপর জিন যেমন আত্মত্যাগ কিংবা পরার্থতা তৈরি করে, ঠিক তেমনি আবার প্রতিযগিতামূলক জীবন সংগ্রাম থেকেই জীবজগতে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরণের পারষ্পরিক সহযোগিতা, মিথোজীবীতা কিংবা সহ-বিবর্তন। টিকে থাকার প্রয়োজনেই কিন্তু এগুলো ঘটে।

clown_fish_coevolution

চিত্র: ক্লাউন মাছ আর এনিমোনের সহবিবর্তন গড়ে উঠে তাদের নিজেদের স্বার্থের কারণেই।

এমনি একটি চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে ‘কালারফুল  ক্লাউন’ মাছের সাথে এনিমোনের সহবিবর্তন।   এ ধরনের মাছ তার গাঢ় রঙের কারণে সহজেই অন্যের শিকারে পরিণত হতে পারে, আত্মরক্ষার জন্য গাঢ় রঙের সামুদ্রিক এনিমোনের শুঁড়ের ভিতর প্রায়শঃই আত্মগোপন করে। এভাবে ক্লাউন মাছগুলো শিকারী মাছের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে সমর্থ হয়। আবার অন্যদিকে এনিমোনগুলোও ক্লাউন মাছের কারণে উপকৃত হয়। কারণ ক্লাউন মাছগুলো এনিমোনভোগী ছোট মাছকে তাড়িয়ে দেয়। এনিমোন এবং ক্লাউন মাছের সহবিবর্তনের ফলে উপকৃত হচ্ছে দুই প্রজাতিই। নিঃস্বার্থ ভাবে একে অপরের সেবা করার জন্য  তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠেনি, বরং বন্ধুর প্রকৃতিতে আত্মরক্ষা আর টিকে থাকার প্রয়োজনেই তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে তাদের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক। এ ধরণের অনেক সম্পর্কই প্রকৃতিতে আছে। হামিং বার্ডের সাথে অর্নিথোপথিলাস ফুলের সহবিবর্তন, এংরাকোয়িড অর্কিডের সাথে আফ্রিকান মথের সহবিবর্তন এগুলোর প্রত্যক্ষ উদাহরণ । অত্যন্ত স্বার্থপর কারণেই তাদের মধ্যে সহমর্মিতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে; আর সেই নিতান্ত স্বার্থপর কারণটি হল – সফলভাবে টিকে থাকার ইচ্ছে। স্বার্থপরতার কারণেই কীভাবে সহযোগিতার গুণাবলী প্রকৃতিতে  বেড়ে উঠে সেটি বিশ্লেষণ করতে গিয়েই বিজ্ঞান লেখক ম্যাট রিডলী তার ‘নৈতিকতার উৎস’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন-‘উই কোঅপারেট ইন অর্ডার টু কম্পিট বেটার’। ব্যাপারটা নির্জলা সত্য।

আমরা ছোটবেলায় কামিনী রায়ের অনেক পরার্থপরতামূলক কবিতা পড়েছি –

“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি,
এ জীবন মন সকলই দাও
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও। …”

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ ‘ আপনার কথা ভুলিয়া পরের কারণে স্বার্থ বিলিয়ে’ দেয়ার মতো করে প্রকৃতির জীবজগৎ করে কাজ করে না।  ডারউইন অনেক আগেই ধারণা করেছিলেন যে, তার বিবর্তন তত্ত্ব সত্যি হলে, প্রকৃতিতে এমন কোন জীব পাওয়া যাবে না যে শুধু নিঃস্বার্থভাবে অন্য প্রজাতির সেবা করার জন্য বেঁচে থাকে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিয়মেই সে বিলুপ্ত হয়ে যেতে বাধ্য। ডারউইন তার ‘অরিজিন অব স্পিশিজ’ বইতে তার পাঠকদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এ ধরণের একটা প্রজাতি খুঁজে বের করার জন্য, এবং স্বাভাবিক কারণেই আজ পর্যন্ত কেউ সে চ্যালেঞ্জের উত্তর দিতে পারেনি। এই সহজ ব্যাপারটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। আমাদের দেহের ভিতরেই অসংখ্য উপকারী ব্যকটেরিয়া  বাস করে, এগুলো আমাদের দেহে থাকার ফলে আমরা যেমন তাদের দিয়ে উপকৃত হচ্ছি, তেমনি আবার ব্যাকটেরিয়াগুলোও বেঁচে থাকার নানা রসদ খুঁজে পাচ্ছে আমাদের দেহে। এমন কিন্তু নয় যে, আমরা ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সেবা করার পশরা সাজিয়ে বসে আছি তাদের উপকার করার জন্য।কিংবা উল্টোভাবে ব্যাক্টেরিয়াগুলো সাহায্যের দোকান খুলে বসে আছে মানব সমাজকে নিঃস্বার্থ সেবা দেয়ার লক্ষ্যে। বরং দুইপক্ষের স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে বলেই এই সহযোগিতার সম্পর্কগুলো টিকে রয়েছে।অর্থাৎ, পরার্থতা বলি কিংবা সহযোগিতা যাই বলি না কেন এর মূলে কিন্তু রয়ে যাচ্ছে সেই মোটা দাগে লোভাতুর স্বার্থপরতাই। বিজ্ঞানী জর্জ উইলিয়ামস সেজন্য খুব চাঁছাছোলাভাবেই বলেছেন[16] –

যখন একজন জীববিজ্ঞানী দেখেন কোন প্রানী অন্য কারো উপকার করে চলেছে, তিনি সহজাত নিয়মেই ধরে নেন যে,প্রানীটিকে উপকারের নামে আসলে তাকে কাজে লাগানো হচ্ছে,কিংবা এর পেছনে রয়েছে কোন প্রচ্ছন্ন স্বার্থপরতা।

একই ব্যাপার চোখে পড়েছিলো বিজ্ঞানী হ্যামিলটানেরও। তিনি পিঁপড়ে, মৌমাছি সহ বিভিন্ন সামাজিক কীট পতঙ্গের কাজ এবং আচার ব্যবহার বহুদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে আসেন যে, তাদের পরার্থতামূলক কাজগুলো আসলে ঢালাওভাবে পরার্থতামূলক নয়, বরং তাদের বিভিন্ন কাজের পেছনে আসল অভিসন্ধি হচ্ছে খুব স্বার্থপরভাবে জিনের রক্ষা আর বহুপ্রতিলিপি রেখে যাওয়ার পথ সুগম করা। পিঁপড়েরা একসাথে খাদ্যের অন্বেষণ করে, সঙ্ঘবদ্ধভাবে বিরাট কলোনি গড়ে তুলে। মৌমাছিরাও তাই। তাদের মধ্যে আছে এমনকি বন্ধ্যা সৈন্যের (sterile worker) উপস্থিতিও, যারা পুরো জীবন ব্যয় করে দেয় রাণীর সেবা যত্নে, নয়তো গোত্রকে রক্ষা করে শত্রুর আক্রমণ থেকে। জৈবিকভাবে চিন্তা করলে এরা তো পরার্থতার চূড়ান্ত! কারণ নপুংসক এই বন্ধ্যা সৈন্যদের কখনো কোন সন্তান হয় না।তারা কেবল খোঁজা প্রহররীর মত হেরেম পাহার দেয়! সাদা চোখে দেখলে জৈবিকভাবে এদের নিজের জিন রক্ষার তাগিদ একেবারে শূন্য। তাহলে ? কলুর বলদের মতো বেগার খাটা এই সৈন্যরা বিদ্রোহ করছে না কেন? এই ধাঁধাই সমাধান করলেন ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী উইলিয়াম ডোনাল্ড হ্যামিলটন। তিনি তার গবেষনায় দেখালেন যে মৌমাছি কিংবা  পিঁপড়েদের সমাজ খুব জটিল। সেখানে রাণী মৌমাছির সাথে কর্মী মৌমাছির (যার অধিকাংশই নিজের সন্তান) সম্পর্কের এক জটিল টানাপোড়েন চলে প্রতিনিয়ত। দেখা গেছে, রানী মৌমাছি দিনে প্রায় আড়াই হাজার ডিম পাড়ে। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই কলোনিতে ডিমের সংখ্যা তিন লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। সেই ডিমের কিছু অংশকে রাণী নিষেক ঘটায় পুরুষ মৌমাছির শুক্রাণু দিয়ে, আবার বহুসংখ্যক ডিম নিষেক ছাড়াই পড়ে থাকে।নিষেক ঘটানো ডিমগুলো থেকে জন্ম হয় কেবল নারী মৌমাছির।এরা ডিপ্লয়েড। এদের ক্রোমজোমে থাকে যুগল বন্ধন। এই যুগল সেটটির অর্ধেক আসে বাবার কাছ থেকে আর অর্ধেক মায়ের। কিন্তু অন্যদিকে পুরুষ মৌমাছিরীরা হ্যাপ্লয়েড, তাদের জন্ম হয় অনিষিক্ত ডিম থেকে জন্ম । এদের কেবল একটিই ক্রোমোজম থাকে, যা সরাসরি তাদের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। ফলে কর্মী নারী মৌমাছিরা তাদের বোনদের সাথে এমনকি শতকরা ৭৫ ভাগ সদৃশ জিনের অংশ বিনিময় করে, যেখানে তার মার সাথে কিংবা তার নিজের সন্তানের সাথে জিনের সাদৃশ্য তাকে শতকরা ৫০ ভাগ, এবং তার ভাইদের সাথে মাত্র ২৫ ভাগ। অর্থাৎ, একটি কর্মী মৌমাছি যদি নিজের বংশ রক্ষার চেয়ে যদি তার সহদোর বোনদের  প্রজননে পরোক্ষভাবে সুবিধা করে দেয়, কিংবা তার রানী মৌমাছির সন্তানদের রক্ষা করায় সচেষ্ট হয়, তাবেই তার অধিকতর জেনেটিক সাফল্য থাকবে। হিসেব কষলে কিন্তু তাই পাওয়া যাচ্ছে। পিঁপড়া, মৌমাছি কিংবা উইপোকা – যাদের এ ধরণের জটিল সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে, তাদের সবার মধ্যেই এ ধরণের জটিল সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠে।কিন্তু এই সহযোহিতা ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়ে বলি’ টাইপের সহযোগিতা নয়, বরং এই সহযোগিতার মূলে থাকে সেই একই স্বার্থপরতাই – জিনের আত্মপরাণয়নতা। সেজন্যই ম্যাট রিডলী তার ‘দ্য অরিজিন অব ভার্চু’ বইয়ে বলেন[17] –

‘In the world of biology, an ant slaves away celibate on behalf of its sisters not out of goodness of its little heart, but out of the selfishness of genes.’

ant_reproduction_diagram চিত্র: পিঁপড়েদের মধ্যে বিদ্যমান জটিল জেনেটিক সম্পর্কের কারণেই তাদের মধ্যে একধরণের সামাজিক সহযোগিতা গড়ে উঠে।

 

বিজ্ঞানী হ্যামিলটন দেখিয়েছেন এই সহযোগিতার মূলে থাকে জিনকেন্দ্রিক স্বার্থপরতাই। কিভাবে পরার্থতামূলক অভিব্যক্তি গড়ে উঠে তা নির্ণয়ের জন্য  হ্যামিলটন একটি নিয়ম প্রস্তাব করেন, যা জীববিজ্ঞানে  হ্যামিলটনের সূত্র হিসেবে পরিচিত। সূত্রটির গাণিতিক সংজ্ঞায়ন এরকম[18] –

b>c/r

যেখানে,

c হচ্ছে পরার্থতার ব্যয় (cost)
b হচ্ছে গ্রাহকের পাওয়া উপযোগিতা (benefit)
r হচ্ছে সম্পর্কের গুণাঙ্ক (coefficient of relationship)

অর্থাৎ, সোজা বাংলায়,যখন কোন প্রজাতির মধ্যে সহযোগিতার উপযোগিতা তার ব্যয়কে অতিক্রম করে যায় তখনই পরার্থতা উদ্ভুত হবে। হ্যামিলটনের এই নীতিটিকেই বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী মায়নার্ড স্মিথ নামকরণ করেছিলেন স্বজাতি নির্বাচন (kin selection) হিসেবে। স্বজাতি নির্বাচনের মোদ্দা কথা হল, জিনের নৈকট্য (অর্থাৎ হ্যামিলটনের সূত্রে rএর মান) যত বেশী হবে, তত বেশি হবে পরার্থতাসূচক মনোভাব। সেজন্যই দেখা যায় সবাই  নিজের সন্তান এবং পরিবারের প্রতি সবার আগে পরার্থতা প্রদর্শন করে । পরিবারের কেউ বিপদে পড়লে সবার আগে  চিন্তিত হয় সবচেয়ে কাছের জেনেটিক সদস্যরাই,তারপরে একটু দুরের  আত্মীয় স্বজন। সেজন্যই সন্তানের প্রতি বাবা মার আত্মত্যাগের ব্যাপারটি সব সংস্কৃতিতেই পাওয়া যায়, আসলে যা কিনা জীববিজ্ঞানীদের চোখে স্বজাতি নির্বাচনের মাধ্যমে জিনপুল রক্ষার প্রয়াস। একইভাবে ছোট ভাইকে ছিনতাইকারীর হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে বড়ভাইয়ের আত্মত্যাগের নানা ঘটনাও বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাগুলোতে পাওয়া যায়।

‘স্বজাতি নির্বাচন’- প্রকৃতিতে খুব চমৎকারভাবে কাজ করে বলেই আমরা দেখি –  কোন হিংস্র শিকারী পাখি যখন কোন ছোট পাখিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করে, তখন অনেক সময় দেখা যায় যে গোত্রের অন্য পাখি চিৎকার করে ডেকে উঠে তাকে সতর্ক করে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে সেই শিকারী পাখি আর তার আদি লক্ষ্যকে তাড়া না করে ওই চিৎকার করা পাখিটিকে আক্রমণ শুরু করে। এই ধরনের পরার্থতা এবং আত্মত্যাগ কিন্তু প্রকৃতিতে খুব স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায়। এই ব্যাপারগুলো স্বজাতি নির্বাচনের মাধ্যমেই উদ্ভুত হয়েছে। হ্যামিলটন বা মায়নার্ড স্মিথের গবেষণার অনেক আগে থেকেই জীববিজ্ঞানীরা ‘কমন সেন্স’ হিসেবে জানতেন। যেমন ১৯৩০ সালে একবার বিজ্ঞানী জ়ে বি এস হালডেনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, তিনি তার ভাইয়ের জন্য জীবন বিপন্ন করবেন কিনা। তিনি রসিকতা করে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘না একটিমাত্র ভাইয়ের জন্য নয়; কিন্তু দুটি ভাই কিংবা আটটি কাজিনের জন্য হলে  আমি আছি’। বলা বাহুল্য, হালডেন মনে মনে স্বজাতির নৈকট্য হিসেব করেই তার এই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন।

এবারে আরেকটু গভীরে ঢুকি।হ্যামিলটন-স্মিথের প্রস্তাবিত স্বজাতি নির্বাচনের ব্যাপারটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু আমাদের ব্যাখ্যা করতে হবে স্বজাতি নির্বাচন ব্যাপারটা সার্বিকভাবে জীবজগতে কাজ করে কিভাবে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, স্বজাতি নির্বাচনের মাধ্যমে পরার্থতা এমনি এমনি কোথাও কাজ করে না, এটি মূলত কাজ করে হয় বিবর্তনের ক্রীড়াতত্ত্ব বা গেম থিওরীর মাধ্যমে ঘটা স্থিতিশীল কৌশল রাজত্ব করার কারণে।

ক্রীড়াতত্ত্ব বা গেম থিওরীর যাত্রা শুরু হয়েছিল হাঙ্গেরীর প্রতিভাধর গণিতবিদ জন ভন নিউম্যানের হাত দিয়ে ১৯৪৪ সালের দিকে। পরে ১৯৫১ সালের দিকে আরো শক্ত গাঁথুনি দেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ জন ন্যাশ (হ্যা, সেই জনপ্রিয় বিউটিফুল মাইন্ড সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্র – স্কিজোফ্রেনিয়া রোগী এবং পরবর্তীতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক), তৈরি করেন ন্যাশ স্থিতাবস্থার মডেল (Nash Equilibrium)। প্রথমদিকে অর্থনীতির বিভিন্ন স্ট্র্যাটিজির ব্যাখ্যায় গেম তত্ত্ব ব্যবহৃত হলেও পরে দেখা গেলো জীববিজ্ঞানেও এটি সমানভাবে কার্যকরী।  জন মায়নার্ড স্মিথ সহ অন্যান্য বিজ্ঞানীই গেম তত্ত্বের সাহায্যে দেখিয়েছেন যে, শুধু প্রতিযোগিতা কিংবা স্বার্থপরতা দেখালে জীনপুলকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় বাঁচিয়ে রাখা যায় না, সাথে আনতে হয় সহযোগিতা এবং পরার্থতার কৌশলও।

কিন্তু কথা হচ্ছে, কতকগুলো ভারী ভারী কথা বলে দিলেই তো হল না। কিভাবে বিবর্তনের গেম থিওরী জীবজগতের উপর কাজ করে সেটা পরিষ্কারভাবে বোঝা চাই।  এটি বুঝতে হলে আমাদের সবার প্রথমে তাকাতে হবে জেলখানায় বন্দী আসামীদের  উভয়-সংকটের দিকে।

 আসামীর সংকট

গাণিতিকভাবে গেম থিওরীর বুৎপত্তি না ঘটলেও এই ধরনের স্ট্র্যাটেজিক সমস্যাগুলো প্রাচীনকালে দার্শনিক আর রাজনীতিবিদদেরও আকৃষ্ট করেছিলো পুরোমাত্রায়। প্রাচীন কালে রাজাবাদশাহরা নিজেদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে নানা ধরণের ‘গেম প্ল্যান’ করতেন।কখন কোন্‌ রাজার সাথে ভাল সম্পর্ক রাখতে হবে, কখন পাশের রাজ্য আক্রমণ করতে হবে, আর কখন বা আবার আক্রমণ ভুলে দেশ রক্ষায় মনোনিবেশ করতে হবে – এগুলো নিয়ে তারা চিন্তিত থাকতেন অহর্নিশি। যারা এ ব্যাপারে ভাল কূটবুদ্ধি দিয়ে রাজাদের সাহায্য করতে পারতেন, তাদেরককে রাজসভায় আপ্যায়ন করে নিয়োগ দেয়া হতো। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের কথা আমরা সবাই জানি – কূটবুদ্ধির জাল বুনে কিভাবে রাজাকে  সহায়তা  করা যায় – তার শক্তিশালী দলিল এটি। রাজনীতি আর অর্থনীতির নানা প্যাচ ঘোচ খুঁজে প্রজাদের রোষ থেকে রাজার গদি রক্ষার তল্পিবাহক হিসেবে কৌটিল্যকে এখন অভিযুক্ত করা হলেও কৌটিল্যই সম্ভবত ছিলেন মানবেতিহাসের প্রথম অর্থনীতিবিদ যিনি গেম থিওরীর মত স্ট্র্যাটেজিক প্রক্রিয়ায় রাজনীতির বিদ্যমান সমস্যাগুলোর এক ধরণের যৌক্তিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। শুধু রাজনীতিবিদেরাই নন, অর্থনীতিবিদ, গণিতবিদ কিংবা দার্শনিক থেকে শুরু করে যে কোন সাধারণ মানুষই বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজি পর্যালোচনা করেই জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নেন। হাতে একাধিক ভাল চাকরীর অফার থাকলে  আমরা নতুন চাকরীর বেতন, চাকরীর স্টেবিলিটি কিংবা চাপ, সেখানকার পরিবেশ, তেলের খরচ, বাড়ি থেকে যাত্রাপথের দূরত্ব কিংবা সময় প্রভৃতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেই কোন্‌ চাকরীতে  যোগ দিব। সামাজিকভাবে বন্ধুত্ব কিংবা মেলামিশির ক্ষেত্রেও আগাপাশতলা সব কিছু বিবেচনা করেই নেয়া হয় কার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে, আর প্রতি থেকে যাওয়া হবে নিরপেক্ষ। ফেসবুকে বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিংবা বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখির ক্ষেত্রেও অনেকে নানা স্ট্রেটেজির আশ্রয় নেন – কাকে সমালোচনা করা হবে, আর কার প্রতি যোগাতে হবে প্রচ্ছন্ন সমর্থন। আসলে আমরা নিজেদের অযান্তেই খেলি ক্রীড়াতত্ত্বের জটিল খেলা। প্রাচীন কালে যখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এখনকার মতো ছিলো না, পরিস্থিতি ছিলো যুদ্ধাংদেহী, তখন প্রাচীন কালের মানুষদের মধ্যে ব্যাপারগুলো আরো স্পষ্ট ছিলো। তারা বুঝতে পেরেছিলো যে, এমন অনেক পরিস্থিতিই জীবনে আসে যখন নিজের একতরফা জয়লাভ করতে যাওয়ার চেয়ে ভাল কোন স্ট্র্যাটেজি করে প্রতিপক্ষকে দীর্ঘক্ষণ ঘায়েল করে রাখতে পারলে সুবিধা বেশি।কিংবা কখনো সরাসরি প্রতিযোগিতায় না নেমে তৃতীয় পক্ষের সাথে ঝামেলা তৈরি করে দিতে পারলে বেশি সুফল পাওয়া যেতে পারে। কখনো আবার এগুলো কোনটাতেই না গিয়ে স্রেফ জনসমর্থন বাড়িয়ে কিংবা কিংবা সাময়িক সহযোগিতার মাধ্যমেও সর্বোচ্চ সুফল আদায় করে নেয়া সম্ভব।

স্ট্র্যাটিজির ব্যাপারগুলো বোঝার জন্য এবার একটি পরিচিত ধাঁধা নিয়ে আলোচনা করা যাক। গেম থিওরীর প্রয়োগ সংক্রান্ত অত্যন্ত সহজ সরল কিন্তু শক্তিশালী এই ধাঁধাটির নাম দেয়া হয়েছে আসামীর সংকট (Prisoner’s dilemma)। মুক্তমনায় অপার্থিব ‘বিবর্তনের দৃষ্টিতে নৈতিকতার উদ্ভব’  নামের একটি চমৎকার লেখায় আসামীর সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করেছিলেন[19]। ব্যাপারটা অনেকটা এরকমের –

ধরা যাক একজন পুলিশ একটি হত্যা মামলায় দুই জন আসামীকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমাণ খুবই অপ্রতুল। ফলে পুলিশ কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। এখন আসামীদের দুজন সত্যই অপরাধ করেছে কিনা কিংবা কে আসল অপরাধী তা নির্ধারণ করতে নীচের শর্তগুলো আসামীদের সামনে হাজির করা হল –

১) একজন আসামী যদি দাবী করে (বিশ্বাসঘাতকতা)যে, অপর জন অপরাধী আর অপর জন যদি নিশ্চুপ থাকে (সহযোগিতা), তাহলে প্রথম জন মুক্তি পাবে, এবং দ্বিতীয়জন ৫ বছরের কারাদণ্ড পাবে।

২) উভয়েই যদি নিশ্চুপ থাকে (দুজনের মধ্যে সহযোগিতা) তাহলে উভয়েরই ২ বছরের কারাদন্ড হবে।

৩) উভয়েই যদি একে অপরকে দোষারোপ করে অপরাধী বানানোর চেষ্টা করে (দুইজনের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা), তবে তাদের প্রত্যেকের ৪ বছরের কারাদন্ড হবে।

এখন তাহলে আসামীদ্বয় কি করবে? তারা উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করবে, কি করে নিজের সর্বোচ্চ লাভ হবে কিংবা নিজের সর্বোচ্চ ক্ষতি এড়ানো যাবে। প্রথমে হয়তো এক আসামী ভাববে, আমি যদি অপরককে দোষী বানাতে পারি, তাহলে আমি মুক্তি পাব। সুতরাং সে অপরজনকে দোষারোপ করবে। এখন দ্বিতীয়জন যদি নিশ্চুপ থাকতো তাহলে প্রথমজন মুক্তি পেয়ে সর্বোচ্চ লাভ অর্জন করে ফেলতো। কিন্তু মুশকিলটা হলো – দ্বিতীয় আসামী যে নিশ্চুপ থাকবে তার তো কোন গ্যারান্টি নেই। দ্বিতীয়জনও যদি প্রথমজনের মতই অপরকে দোষারোপের কৌশল নেয়, তাহলেই হবে সমস্যা। দুইজনেরই সর্বোচ্চ ৪ বছর করে কারাদন্ড হয়ে যাচ্ছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, দুজন দুজনকে দোষারোপ করতে গিয়ে নিজেরাই সর্বোচ্চ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তারচেয়ে বরং দুইজনই যদি নিশ্চুপ থাকত,তখন হয়তো শাস্তিরমাত্রা কমে আসতো। এই পুরো খেলাটা একাধিকবার পরিচালনা করা হলে হয়তো কারাবন্দিদের মধ্যে একটা সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠবে, ফলে তারা নিজেদের মধ্যে বোঝাপরা করে গেম থিওরীর মাধ্যমে ঘটা স্থিতিশীল কৌশল আয়ত্ব করে নেবে। বাস্তবেও তাই হয়। সেজন্যই আমরা দেখি দাগী ভঙ্কর সব আসামীদের মধ্যেও কিংবা মাফিয়া চক্রের মধ্যেও এক ধরণের সহযোগিতার সম্পর্ক থাকে। তারা পারতপক্ষে একে অপরকে ধরিয়ে দেয় না।

prisoner_s-dilemma

চিত্র: আসামীর সঙ্কট – ক্রীড়াতত্ত্বের একটি অতি পরিচিত উদাহরণ।

ট্রপিকাল রেইন ফরেস্টের দীর্ঘকায়া গাছগুলো আসামীর সংকটের বাস্তব উদাহরণ। সেখানে গাছগুলোকে কেবল বংশবৃদ্ধির ব্যাপারটিই কেবল দেখতে হয় না, পাশাপাশি বাড়াতে হয় নিজেদের উচ্চতাকেও। সেই ঘন বণভূমিগুলোতে সূর্যের আলো নীচ পর্যন্ত পৌঁছয় না। কাজেই উচ্চতায় খাটো হলে  থেকে যায় সূর্যের আলো না পেয়ে  মারা যাবার সম্ভাবনা। কাজেই অন্য জায়গার গাছেদের মতো উচ্চতা বাদ দিয়ে কেবল বংশবৃদ্ধি করা কোন অপশনই নয় তাদের জন্য। তাই রেইন ফরেস্টের গাছের জন্য কখন বংশবৃদ্ধি করতে হবে, আর কখন উচ্চতা বাড়াতে হবে – এ নিয়ে সবসময় চলে ক্রীড়া তত্ত্বের জটিল এক খেলা। ক্রীড়া তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় জমিতে  কৃষকদের কীটনাশক প্রদানের ক্ষেত্রেও। কৃষকেরা দেখেছেন যে একটি কীটনাশক ব্যবহার করে কোনো একটি ক্ষতিকর কীট ধ্বংস করলে অনেক সময় হিতে বিপরীত হয় – দেখা যায় সেই কীট মরলেও তার প্রতিযোগী অন্য কোন ক্ষতিকর কীটের সুবিধা করে দেবার ঘটনা ঘটছে; যার নীট ফলাফল ফসলের জন্য ক্ষতি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকেই কৃষকেরা সিদ্ধান্ত নেন কখন কীটনাশক প্রয়োগ করবেন, কখন ছাড় দেবেন, আর প্রয়োগ করলে কোন কোন কীটের জন্য ওষুধ প্রয়োগ  করবেন ইত্যাদি। আসলে কৃষকের মনে চলতে থাকে আসামীর সংকটের মতোই গেম তত্ত্বের নিরন্তর খেলা। জীবজগতের বিবর্তন ভারসাম্যও কিন্তু অনেকটা এভাবেই কাজ করে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবর্তন আদিমকালের মানুষের মধ্যে বহু সংঘর্ষ, সহাবস্থান, পারষ্পরিক যোগাযোগ, প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক লাভ ক্ষতির হিসেবে থেকে এক ধরণের নৈতিক চেতনার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটিয়েছে। কীভাবে  সেটা সম্ভব তা বুঝতে হলে আমাদের রিচার্ড ডকিন্সের স্বার্থপর জিন তত্ত্বের মাধ্যমে ঘটা ‘বিবর্তনীয় স্থিতিশীল কৌশল’ সম্বন্ধে একটু জানতে হবে। আর এটা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী পর্বের জন্য।

চলবে…

—————————————-

তথ্যসূত্র:

[1] Samuel Bowles, Did Warfare Among Ancestral Hunter-Gatherers Affect the Evolution of Human Social Behaviors?, Science 5 June 2009: Vol. 324. no. 5932, pp. 1293 – 1298
[2] Frans De Waal, Our Inner Ape, Riverhead Books; 2005.
[3] Frans de Waal, Stephen Macedo and Josiah Ober, Primates and Philosophers: How Morality Evolved, Princeton University Press, 2006
[4] অভিজিৎ রায়, নৈতিকতা ও ধর্ম,স্বতন্ত্র ভাবনা (সম্পাদনা সাদ কামালী ও অভিজিৎ রায়, চারদিক, ২০০৮) গ্রন্থে সংকলিত।  
[5] Caldwell, M. C. & Caldwell, D. K. (1966). Epimeletic (caregiving) behaviour in cetacea. In: Whales, Dolphins and Porpoises. (Ed. K. S. Norris). University of California Press. pp. 755-789.
[6] V. G. Cockcroft and W. Sauer, Observed and inferred epimeletic (nurturant) behaviour in bottlenose dolphins, Aquatic Mammals 1990, 16.1, 31-32
[7] Connor R.C. and K.S. Norris. Are dolphins reciprocal altruists?. American Naturalist. 119: 358-374.
[8] হোরাস, পরিকল্পিত ডিজাইনঃ God Must Be Crazy, মুক্তমনা।
[9] Richard Dawkins, The Greatest Show on Earth: The Evidence for Evolution, Free Press, 2009; p 370.
[10] Darwin’s letter to Asa Gray, 22 Mary 1860 ; Quoted in Richard Dawkins, The Greatest Show on Earth, পূর্বক্ত, p 370.
[11] Richard Dawkins wrote a very popular book called the Selfish Gene that explained, for a popular audience, many of the exciting new theories and discoveries being made in evolutionary biology in the 1960’s and 70’s. The metaphor Dawkins chose, the selfish gene, was an extremely powerful metaphor, so powerful that it has often overshadowed the science itself! The controversies that swirl around EP are often tightly bound up with Dawkins� metaphor. If our genes are selfish, are we all, deep down, unalterably selfish ourselves? Why did Dawkins chose this metaphor, what does it really mean, and what are its implications for EP and human nature?  To read more in technical terms Why are genes selfish, please refer to Edward H. Hagen, Institute for Theoretical Biology, Berlin, Why are genes selfish? http://www.anth.ucsb.edu/projects/human/epfaq/selfishgene.html  
[12] Richard Dawkins, The Selfish Gene: 30th Anniversary Edition, Oxford University Press, USA; 3 edition, 2006; অনুবাদের কিয়দাংশ – অনীক আন্দালিব, সেলফিশ জিন, মুক্তমনা।
[13] Helena Cronin, The Ant and the Peacock: Altruism and Sexual Selection from Darwin to Today, Cambridge University Press, 1993
[14] Hamilton W.D., The genetical evolution of social behaviour I and II. — Journal of Theoretical Biology 7: 1-16 and 17-52, 1964.
[15] Richard dawkins, The Selfish Gene. Oxford: Oxford University Press. 1976.
[16] Paradis, J. and G.C. Williams, T.H. Huxley’s Evolution and Ethics : with New Essays on its Victorian and Sociobiological Context. Princeton University Press, Princeton, N.J, 1989.
[17] Matt Ridley, The Origins of Virtue: Human Instincts and the Evolution of Cooperation, Penguin;  1998
[18] W. D.  Hamilton, “The Genetical Evolution of Social Behavior”. Journal of Theoretical Biology 7 (1), 1964
[19] অপার্থিব জামান, বিবর্তনের দৃষ্টিতে নৈতিকতার উদ্ভব, বিজ্ঞান ও ধর্ম – সংঘাত নাকি সমন্বয়, মুক্তমনা ই-বুক, মুক্তমনা দ্রষ্টব্য

[1013 বার পঠিত]