তওবা

তওবা

-মোকছেদ আলী*

….ধর্মের ভয়, শাস্তির ভয় দেখাইয়া সাময়িকভাবে ভালো কাজ করানো যায় মাত্র। প্রকৃত সংশোধনের জন্য দরকার বিবেকের পরিচালনা

দোকান হইতে যে প্রায়ই সুতা রং খোয়া যায় তাহার হদিশ অদ্য পাওয়া গেল। যে সমস্ত জেলেরা আমার কাছে ২০ নং সুতা ক্রয় করিত, তাহারা আর আমার কাছে সুতা খরিদ করে না। বলে- “২০ নং সুতা আমরা ঘরে বসে ১৪ টাকা মোড়া পাই, আপনি ১৫ টাকা চান। আমরা বাড়িতে বসেই সুতা নেব।” এই সুতাটা কে কিভাবে দেয় জিজ্ঞাসা করিতেই নরোত্তমের মেয়ে কহিল, “আপনার যে মোজা বানায় তার ভাই রোজ সুতা নিয়ে আমাদের পাড়ায় বিক্রি করে আর বলে, “আমি এই সুতা ঈশ্বরদী থেকে নিয়ে আসি।” এমন তথ্যও পাওয়া গেল- আমার কর্মচারী নজরুলই দোকান থেকে সুতা চুরি করে ওর ভাই নিমুক দিয়া বিক্রি করায়।

আগামীকাল নজরুলের ভাই ও বাপকে লইয়া জেলে পাড়ায় গিয়া মোকাবিলা করিয়া ওকে কাজ হইতে বাদ দিব। কারণ গোক্ষুর সাপ দুধকলা দিয়া পোষা ঠিক নয়। কিন্তু ভাবি এক, হয় অন্য রকম। সকাল থেকেই বৃষ্টি। বৃষ্টির জন্য নজরুলের বাপকে আনিতে পারিলাম না। মনে করিয়াছিলাম, আগামীকাল সকালে নজরুলের বাপ ও ভাইকে লইয়া আলোচনা করিয়া একটা ফয়সালা করা যাইবে। কিন্তু বৃষ্টির জন্য যাওয়া হইল না। দুপুরে যাইবো, আবার বৃষ্টি। আল্লাহর রহমতের পানি। যাক- বিকালে যাইবো।

বিকালে নরোত্তম হালদারের সঙ্গে দেখা করিয়া সবকিছু খোলাখুলি আলোচনা করিয়া তাহাকে পরামর্শ দিলাম- আপনি নজরুলকে বুঝাইয়া বলিবেন, ‘সে যে কাজ করিয়াছে তাহা অতি অন্যায়। যে পাতে খাও সেই পাতে ছেদা করো।’

সন্ধ্যার সময় নরোত্তম আসিয়া নজরুলকে সব কথা খুলিয়া বলিল। বলিল- যদি ভাল চাও তবে অকপটে সব স্বীকার করে তোমার ওস্তাদের পা জড়িয়ে ধরে মাফ চাও আর সুতা বিক্রির টাকা তাকে সব ফেরত দাও। কেউ জানবে না। তোমারও কাজ কাম বহাল থাকবে। আর যদি অস্বীকার কর তবে আমাদের পাড়ায় যাদের কাছে সুতা বিক্রি করেছ, তারা সবাই সাক্ষী দেবে। লোক জানাজানি হবে, তোমার ইজ্জতের হানি হবে। তোমার ওস্তাদের বদদোয়া পড়বে তোমার উপর। জীবনে শান্তি পাবে না। কোন উন্নতি করতে পারবে না।

নজরুল আমার কাছে আসিয়া সব অপরাধের কথা অকপটে স্বীকার করিল। আমি উহার উপরই বিচারের ভার দিলাম। নজরুল আর মুখ তুলিয়া আমার পানে চাহিতে পারিল না। মাথা মাটির দিকে নত করিয়া রহিল। পরে বলিল- ‘আমি তওবা করিলাম। আর জীবনে আপনার কোন ক্ষতি করিব না। আমাকে কাজ থেকে বাদ দিবেন না।’

আমি কহিলাম, “চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী। তুমি যে আবার সুযোগ বুঝিয়া আমার ক্ষতি করিবে না তাহার নিশ্চয়তা কি? ছোটকালে তোমার বাপ তোমাকে আমার কাছে দিয়াছিল অভাবের তাড়নায়। আমি তোমাকে বুকে করিয়া লেপের মধ্যে শোয়াইয়া রাখিয়াছি। মুখের খাবার তোমার পাতে তুলিয়া দিয়াছি। ইতোপূর্বে তুমি আমাকে নানাভাবে হয়রানী ও ক্ষতি করিয়াছ, তাহা সত্বেও তোমাকে ফেলি নাই, বা তাড়াইয়া দেই নাই। তোমার বাপের অসুখে ১৮৫ টাকা দিলাম। তোমার বিয়েতে ৫০০ টাকা দিলাম। সব ভুলিয়া গেলে। তুমি যখন যেভাবে টাকা চাও, সেই ভাবেই দেই। কোন ওজর আপত্তি করি নাই। তা সত্ত্বেও এতবড় নেমক হারামী করিলে? তোমাকে রাখা যায় না। যে লোকের কাছেই আমি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলিয়া যদি পরামর্শ চাই যে নজরুলকে আর রাখা চলে কি-না; সবাই পরামর্শ দিবে- দুধ কলা দিয়া কাল সাপ কেহ পুষে না। যদি পুষে তবে তাহার ফল হয় অতি মারাত্মক। কাজেই বুঝিতে পারিতেছ যে, তোমাকে আবার সুযোগ দেওয়া মানে আমার ক্ষতি তুমি আবার করিবে। কাজেই আমার কারখানা বন্ধ থাকুক। যদি আমার চালানোর মুরোদ হয় চালাবো। না হয় বন্ধ থাকিবে। তবে জানিয়া রাখ- আমার কাছ হইতে তুমি চলিয়া গেলে আমারও যেমন কাজের লোকের অভাব হইবে না, তোমারও তেমনি কাজের অভাব হইবে না। খোদা তোমাকেও সৃষ্টি করিয়াছেন, আমাকেও সৃষ্টি করিয়াছেন। সুতরাং তোমারও আহার যোগাইবে, আমারও আহার যোগাইবে। তবে তুমি আমার কাছে, তোমার শ্বশুড় শাশুড়ী, বাপ মা, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পরিচিত সবার কাছেই তুমি ঘৃণার পাত্র হইয়া থাকিবে। কেহই তোমাকে বিশ্বাস করিবে না। যেহেতু তুমি চোর। চোরকে কেহই সুনজরে দেখে না। যে শুনিবে, সেই তোমাকে ধিক্কার দিবে।”

নরোত্তম কহিল- “বাবাজী, মানুষ সংশোধন হয়। কাজেই ওকে ভালো হওয়ার, মানুষ হওয়ার সুযোগ দেন। এবারকার মত ওকে মাফ করিয়া দেন। আর সুতা যদি সব বেঁচিয়া না থাকে তবে কাল সব ফেরত আনিবে। যদি না আনে তবে যাহা কিছু তছরুপ করিয়াছে তাহার মূল্য ওর নামে খরচ লিখিবেন।”

আমি নরোত্তমের কথা অমান্য করিলাম না। কহিলাম, “তবে ওকে কোরান শরীফ স্পর্শ করিয়া শফথ করিতে হইবে যে, সে যতদিন আমার কারখানায় কাজ করিবে, ততদিন কোন তছরুপ করিতে পারিবে না।”

অবশেষে তাহাই সাব্যস্ত হইল। নজরুলকে কহিলাম, “ওজু করিয়া আয়। এখানে কোরান শরীফ আছে।” কিছুক্ষণ দম ধরিয়া বসিয়া রহিল। তারপর ওজু করিয়া আসিল। কোরান শরীফ তাহার হাতে দেওয়া হইল। সে কোরান শরীফখানা তাজিমের সহিত হাতে করিয়া বেড়ার আড়ালে গেল। আমি তাহাকে শপথ করাইলাম।

বল্ – বিছমিল্লাহের রাহমানে রহিম। তওবা, আসতাগফেরুল্লাহ। আমি আল্লাহর কালাম পবিত্র কোরান মজিদ হাতে করিয়া প্রতিজ্ঞা পূর্বক শপথ করিতেছে যে, আমি যতদিন আপনার অধীনে কাজ করিব, ততদিন কোন অবস্থাতেই আপনার কোন জিনিস চুরি বা তছরুপ করিব না। আপনার কথা অমান্য করিব না। আপনার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করিব না। মনপ্রাণ দিয়া কাজ করিব। যদি কোনরূপ চুরি বা তছরুপ বা অন্যায় করি তাহা হইলে এই পবিত্র কোরানের মর্যাদা হানি করা হইবে। তাহার জন্য আল্লাহর গজব যেন আমার উপর নাজেল হয়। আল্লাহ পাক এই শপথ রক্ষা করিয়া চলিবার তৌফিক দান কর। আমিন।

আচ্ছা, যা। যখন কারখানায় কাজে আসবি, তখন এই পবিত্র কোরান ছুইয়া শপথ করার কথা মনে করবি।

দেখা যাক। তবে একেবারে লাগাম ছাড়িয়া দিলে ঠিক হইবে না। নজর রাখিতে হইবে। কথায় বলে- সুযোগ পাইলে সাধুও শয়তান হয়। কাজেই অত সুযোগ দেওয়া চলিবে না। চোখে চোখে রাখিতে হইবে। প্রলোভন প্রবল হইলে ধর্মের কোন ভয়ই কামে আসে না। মসজিদের মোল্লা, মন্দিরের পুরোহিতরা পর্যন্ত অন্যায় করিয়া বসে। অর্থ কেলেঙ্কারী, নারী কেলেঙ্কারী এসব তো হর হামেশাই শোনা যায়। আর নজরুল তো ধর্ম কর্ম পালনই করে না। তবে ধর্মের শাস্তির ভয় আছে ওর মধ্যে।

বড় বড় কারাখানায় যেমন গেট দিয়া শ্রমিক কারখানায় প্রবেশ করার সময় সার্চ করিয়া ঢুকায়, আবার ছুটির সময়, তেমনি সার্চ করে। তদ্রুপ সার্চ করিতে হইবে; প্রতিদিন হয়তো সম্ভব হইবে না। তবে আকস্মিকভাবে সার্চ করিতে হইবে। ওর ছোট ভাই নিমুকে কিম্বা পাড়ার কোন ছেলেপেলে যাতে ওর সঙ্গে কারাখানায় বসিয়া গল্প গুজব না করে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হইবে। বলিয়া দিতে হইবে যে, তোর ভাই নিমু তোর জন্য ভাত দিয়া যাইবে আমাদের বাড়ীর ভিতর। কারখানায় সে প্রবেশ করিতে পারিবে না। শাসাইয়া দিতে হইবে। যদি কারখানায় ঢোকে তবে পিঠের খাল খসাইয়া ফেলিব। চোখে চোখে রাখিলে, সার্চ করিলে ভয় থাকিবে। সহজে অন্যায় করিতে পারিবে না।

মোজাফ্ফর না থাকায় ওরা এই সুযোগ লইয়াছে। আগে যখন মোজাফ্ফর কারাখানায় কাজ করিত, তখন ওরা কোন তছরুপ করিতে সাহস পাইত না। মোজাফ্ফর আজ কয়েক মাস হইল চলিয়া গেছে। সেই কয়মাস ধরিয়াই ও চুরি করিয়াছে। অবশ্য আমার এক বৃদ্ধ কর্মচারী আয়েত আলী- গত বৎসর আমাকে সতর্ক করিয়াছিল যে, নজরুলকে একটু চোখে চোখে রাখিবেন। আপনার শেষ সর্বনাশ হইবে। কিন্তু আমি সেই সময় কথাটায় খুব একটা কান দিই নাই। কিন্তু আজ তাহার ফল হাড়ে হাড়ে টের পাইতেছি। অতি স্নেহ, অতি বিশ্বাস ক্ষতির কারণ হয়।

কেউ যদি কাহারো সম্বন্ধে কোনো কথা বলে তবে একটু চিন্তা করিয়া দেখা উচিত। ধর্মের ভয়, শাস্তির ভয় দেখাইয়া সাময়িকভাবে ভালো কাজ করানো যায় মাত্র। প্রকৃত সংশোধনের জন্য দরকার বিবেকের পরিচালনা।

রচনাকাল: ২৬ শে জৈষ্ঠ ১৩৮৩ বাং।

============

*মোকছেদ আলী (১৯২২-২০০৯)। স্বশিক্ষিত। সিরাজগঞ্জ জেলার বেলতা গ্রামে জন্ম।

About the Author:

বাংলাদেশ নিবাসী মুক্তমনা সদস্য। নিজে মুক্তবুদ্ধির চর্চ্চা করা ও অন্যকে এ বিষয়ে জানানো।

মন্তব্যসমূহ

  1. সুমিত দেবনাথ অক্টোবর 14, 2010 at 2:45 পূর্বাহ্ন - Reply

    লেখাখানি পড়লাম হ্যাঁ লেখাখানি শিক্ষামূলক। ধর্মের ভয় যে মানুষের নৈতিকতা তৈরী করতে পারে না তা এই পোষ্টই তার জ্বলন্ত প্রমান। তবে আমার একটা প্রশ্ন মোকছেদ আলী কি লেখাটা লিখেছিলেন না আপনি লিখেছেন? আর তা হলে মোকছেদ আলীর কোন সংকলন কি পাওয়া যায় না আপনার কাছেই শুধু আছে। জানালে উপকৃত হব।

  2. Mahbub অক্টোবর 11, 2010 at 1:38 পূর্বাহ্ন - Reply

    অনেকদিন পর একটা অসাধারণ পোস্ট পরে ভালো লাগলো !

    • মাহফুজ অক্টোবর 11, 2010 at 6:59 পূর্বাহ্ন - Reply

      @Mahbub,
      আপনার ভালো লাগলো জেনে, আমারও ভালো লাগছে। ধন্যবাদ পড়ার জন্য।

  3. Russell অক্টোবর 10, 2010 at 10:07 পূর্বাহ্ন - Reply

    ধর্মের ভয়, শাস্তির ভয় দেখাইয়া সাময়িকভাবে ভালো কাজ করানো যায় মাত্র। প্রকৃত সংশোধনের জন্য দরকার বিবেকের পরিচালনা।

    খুবই ভাল লাগল, সত্য সুন্দর একটা কথা।

  4. আফরোজা আলম অক্টোবর 10, 2010 at 9:04 পূর্বাহ্ন - Reply

    মোকসেদ আলির প্রত্যেকটা পর্বই আমার ভালো লাগে।এইটাও তার মাঝে অন্যতম।

    • মাহফুজ অক্টোবর 10, 2010 at 4:48 অপরাহ্ন - Reply

      @আফরোজা আলম,
      মোকছেদ আলীর লেখা ভালো লাগলেই, মনে মনে ভাবি- পরিশ্রম বৃথা যাচ্ছে না।

      ধন্যবাদ, ভালো লাগার মনোভাব ব্যক্ত করার জন্য।

    • মাহফুজ অক্টোবর 10, 2010 at 4:51 অপরাহ্ন - Reply

      @আফরোজা আলম,
      মোকছেদ আলীর লেখা ভালো লাগলেই, মনে মনে ভাবি- পরিশ্রম বৃথা যাচ্ছে না।

      ধন্যবাদ, ভালো লাগার মনোভাব ব্যক্ত করার জন্য।

  5. মোজাফফর হোসেন অক্টোবর 10, 2010 at 7:27 পূর্বাহ্ন - Reply

    মোজাফ্ফর ? বাহ, নিজেকে গল্পের চরিত্র দেখে বেশ ভালো লাগছে।

    • মাহফুজ অক্টোবর 10, 2010 at 8:30 পূর্বাহ্ন - Reply

      @মোজাফফর হোসেন,
      আমি ঐ মোজাফফরকে চিনি। চিনি নজরুলকেও। মোকছেদ আলীর মৃত্যুর সময় নজরুল এসেছিল। খাটিয়ায় পায়ের কাছে বসে নজরুলকে খুব কাঁদতে দেখেছি। বলতে শুনেছি- ওস্তাদজী, আমায় মাফ করে দেন, কত অপরাধ করেছি আপনার কাছে।

      আমি তখনও এই তওবা পান্ডুলিপি পড়িনি। যখন পেলাম, তখন মনে পড়েছে- নজরুলের কথা।

      মোজাফফর লোকটি চমৎকার। অবশ্য মোকছেদ আলীর মৃত্যুর সময় তাকে দেখিনি। তাকে দেখেছিলাম প্রায় ৫/৬ বৎসর আগে। বিত্তিপাড়া গ্রামে তার বাড়ি। কোনোদিন যদি ভেড়ামারা যাই তবে তার সাথে দেখা করার চেষ্টা করবো। অবশ্য জানি না বেচে আছে কিনা?

মন্তব্য করুন