একটি শিশুর মৃত্যু ও গোরস্থান

একটি শিশুর মৃত্যু ও গোরস্থান

-মোকছেদ আলী*

গত কয়েকদিন ধরে শীত যায় যায় করেও যাচ্ছে না। দরিদ্র লোকদের মায়া কেটে চলে যেতে শীতের বড়ই কষ্ট হচ্ছে। ফাল্গুনের প্রথম থেকেই বৃষ্টি আর বৃষ্টি। রাতের বেলা আকাশ ফর্সা থাকে। তারাগুলি ঝিকমিক করে হাসতে থাকে। মেঘের নামগন্ধও থাকে না। সকাল হলেই কোথা থেকে মেঘ এসে সমস্ত নীল আকাশখানাকে কালো চাদরে ঢেকে দেয়। শীত পালাবার পথ পায় না।

ফাল্গুনের ২০। গোসল করে রান্না ঘরের মেঝেতে রৌদ্রের আঁচে বসে ভাত খাচ্ছি। পিঠের উপর দেহের ছায়া ফেলে বলল, “দুলাভাই, জাহাঙ্গীরের ছেলেটা মারা গেছে, মাটি দিতে যাবেন?”

মাখানো ভাত হাতের মুঠায় রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে মন্টুর মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছিল?” মন্টুর মুখে সহজ কণ্ঠে উচ্চারিত হল, “তিন মাসের গেদা ছেলে, নিউমোনিয়া।” আমার স্ত্রী ভাতের হাড়ির গোড়ায় বসে আলু ছ্যানা করছিল। আলু ছ্যানা করা বন্ধ করে জিজ্ঞেস করল, “ছেলে কি এখানে মরেছে নাকি ওর নানার বাড়ি?” মন্টু বলল, “এখানেই মারা গেছে। ওর নানার বাড়ি থেকে আজ ১০/১২ দিন হোল এসেছে।”

আমি ভাতের গ্রাস মুখে তুলে গিলতে লাগলাম। গিন্নি সিন্নির মত করে একটু জাল্লা আলু ভর্তা আমার পাতে ভাতের উপর আলগোছে রেখে দিল। ভাতের সঙ্গে মিকচার করে সেটাকে অন্ধকার গোডাউনে চালান দিলাম। হাত মুখ ধুয়ে এক গ্লাস পানি ভাতের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে মন্টুকে বললাম, চল, দেরী করে কাজ কি?

দুইজনে দুই খানা সাইকেল চালিয়ে সোজা চলে এলাম। আমগাছ তলায় কয়েক লোক বাঁশের খাবাচি কাটছে। একজন মুসুল্লী গোছের লোক একটা চেয়ারে বসে আছে। মুখখানা মলিন বিমর্ষ।

কে এক ছোকড়া একখানা চেয়ার এনে আমায় উদ্দেশ্য করে বলল, “খালু বসেন।” না বসে একেবারে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলাম। সব আত্মীয়া মহিলা বিলাপ করে ক্রন্দন করছে। বারান্দায় মহিলাদের ভীড়। পাড়ার অনেক মহিলাই এই শোকাবহ সংবাদ শুনে ছুটে এসেছে। শহর আর পল্লীর মধ্যে এই একটি ক্ষেত্রেই বিরাট ব্যবধান। শহরের বুকে পাষাণের মতই তাদের হৃদয়, তাই কবি বলেছেন-

ইট পাথরের বাড়ি ওসব ইট পাথরের ঘর,
কেউ আসে না কারো বাড়ি সবাই যেন পর।’

আর পল্লী দরদের কথা-
‘এই গায়ের সবাই যেন বড় আপনজন,
একের দুঃখে বিপদপাতে অন্যের গলে মন।’

অকালে ৩ মাসের শিশু মায়ের আদরের কোল খালি করে চলে গেল। এরজন্য দায়ী কে? ধর্মপ্রাণ মহিলাগণ শোকার্ত আত্মীয়-স্বজনকে শান্তনা দেবার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় চেতনাযুক্ত বাক্য বলছেন- “কেঁদে আর কি হবে, আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়ে গেছে। আর এই শিশুই আখেরাতের মহাসম্পদ হবে। বাপ মা, গোনাহর ভারে দোযখ সাব্যস্ত হয়ে গেছে; ফেরেস্তারা বাপ মাকে দোযখের দিকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাবে, তখন এই মাসুম মানে যারা এই দুনিয়াতে কোন পাপ কার্য করে নাই, মানে পাপ বা গোনাহ করার সুযোগ পায় নাই; আল্লাহপাককে বলবে- ‘আমাকে আমার পিতা-মাতার সঙ্গে দোযখে পাঠিয়ে দেন। কারণ দুনিয়াতে আমি বাপ-মায়ের কোনো খেদমত করতে পারি নাই। তাই দোযখের মধ্যেই যদি পিতা মাতার খেদমত করতে পারি।’ তখন আল্লাহ রাহমানুর রাহিম ফেরেস্তাদের হুকুম দিবেন- ‘হে ফেরেস্তারা, তোমরা এই মাসুম বাচ্চার পিতামাতাকে দোযখে না নিয়ে এই শিশুর সঙ্গে বেহেস্তে পাঠিয়ে দাও।’ তখন ফেরেস্তারা খুব তাজীম সম্মান করে ঐ বাচ্চার সঙ্গে বেহেস্তে পাঠিয়ে দিবেন। আল্লাহর লাখো শুকরিয়া করে ঐ পিতামাতা বলবে, ‘হে পরম প্রভু, তুমি আমার এই মাসুম বাচ্চাকে দুনিয়ার বুকে মৃত্যু না দিতে তাহলে আজ আমাদের কি দুর্গতিই না হোতো। তাই আল্লাহ তোমার লাখো শুকরিয়া আদায় করছি।’ তাহলে চিন্তা কর, এই মাসুম বাচ্চা পিতা মাতার কত বড় সম্পদ। সুতরাং এই মাসুম বাচ্চার জন্যে কান্দা কাটি করে নিজের ক্ষতি ছাড়া কোন লাভ নাই।”

এইভাবে সান্ত্বনার বাণী দিচ্ছে। উঠান ভর্তি মহিলা। কারো কারো কোলে শিশু। একটি মহিলা, তার শিশু বাচ্চাকে স্তন্যদান করছে; তার দুচোখ অশ্রু ভেজা। নিজের বুকের সন্তানটাকে দুই হাতের চাপে আরো ঘন করে বুকের সাথে চেপে ধরছে। সন্তানহারা মায়ের বুকের বেদনা মহিলগণই যে সম্যক উপলব্ধি কোরছে তাতে কোনই সন্দেহ নাই।

কাফনের কাপড় আনা হয়েছে। “আপনাকে ডাকছে খালু”, চেয়ে দেখি আমার ছোট শ্যালিকার ছেলে মুক্তা। আমি বাড়ির বাইরে আম তলায় এলাম। একটা মাদুরের উপর পলিথিন ব্যাগের মধ্যে সাদা কাপড়। চেয়ারে উপবিষ্ট জাহাঙ্গীরের শ্বশুড় আমার দিকে দৃষ্টি দিয়ে অনুরোধ করল- বেয়াই সাহেব, কাফনের কাপড়টা কেটে দেন। আমি তো সামাজিক জীব। সমাজে বাস করি বলেই সামাজিক কিছু নিয়ম-কানুন আমাকে পালন করতেই হয়। আমি দ্বিরুক্তি না করে মাদুরে বসে ব্যাগ থেকে কাপড় বের করে সাট করে দেখতেই মোনায়েম বলল- দেড় গজ এনেছি। বললাম- এতেই হবে। মোনায়েমকে হুকুম দিলাম, একটা পাটখড়ি দিয়ে ছেলের লম্বা মাপ নিয়ে আয়। প্রতিবেশী একটি ছেলে একখানা কেচি এনে বলল, হুজুর এই কেচি নেন। আমি হাত বাড়িয়ে কেচিখানা গ্রহণ করলাম। ইতোমধ্যে মোনায়েম পাট খড়ি হাতে চলে এল। পাট খড়ি আমার হাতে দিয়ে বলল- পা থেকে মাথা পর্যন্ত মাপ নিয়েছি। বললাম- ঠিকই আছে। তারপর কাফনের কাপড় ঠিকমত কাটলাম। পুরুষ ছেলে সুতরাং তিনখানা কাপড় লাগবে। দুইখানার নাম চাদর। দুইখানা প্রায় একই মাপের। আরেকটি পিরান। সেটা চাদরের চেয়ে একটু বেশি লম্বা। আর কিঞ্চিৎ কাপড় বাঁচিয়ে নাকে কানের তুলা তৈরী করে রাখলাম। আর মাথায় ও পায়ের কাছে বাধন দেবার জন্য দুটা সুতলী তৈরী করলাম। মাঝখানে আরেকটি বাধন দেবার জন্য আরেকটি সুতলী তৈরী করে কাপড় রেখে দিলাম।

মধ্য বয়সী এক মুসল্লী এসে বলল, দেখি কাফন ঠিক মত হয়েছে কিনা? আমি কাফন তার দিকে এগিয়ে দিলাম। সে খুব মনোযোগ দিয়ে কাফন দেখে বলল ঠিক হয়েছে, তবে, পিরানের কাপড় বেশি হয়েছে, বলেই কেচি দিয়ে প্রায় দুই আঙ্গুল কেটে দিল। তারপর কাফন কাপড় হাতে চুনট করে গিলা করা কুচির মত হয়ে গেল। এটা তার বুদ্ধিতে ঠিকই হলো। কারণ অযথা দুই আঙ্গুল কাপড় বেশি দিয়ে অপব্যায়ের গোনাহে লিপ্ত হব কেন? আসল কথা তো তা নয়। উপস্থিত জনতার মধ্যে নিজেকে দক্ষ বলে প্রমাণ করা।

যাহোক, কাফন তৈরী হয়ে গেছে। এখন ছেলের ত্বরিৎ গোসল দিলেই দাফন কার্য্য করা যাবে। আমি বাড়ির ভিতর গিয়ে যায়েদাকে বললাম, “লোকজন সবাই প্রায় এসে গেছে। ছেলেকে গোসল দিতে হবে। যায়েদা জিজ্ঞেস করল, “দুলাভাই ছেলেকে আমি গোসল করাতে পারব?” আমি সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে বললাম- বড় মসজিদের ইমাম সাহেব এসেছেন, তার নিকট মাছলাটা জেনে আসি, বলে আমি ইমাম সাহেবের কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হুজুর, ছেলের লাশকে কি কোন মহিলা গোসল দিতে পারবে? তিনি বললেন, জ্বী হ্যাঁ, পারবে, কারণ সে তো গেদা মাসুম বাচ্চা; তাকে তার দাদী বা নানী গোসল দিতে পারবে। আমি শুনে এসে জায়েদাকে ইমাম সাহেবের কথাটা বললাম। শুনে একজন বর্ষিয়সী মহিলা প্রতিবাদ করে বলল, “তা হতে পারে না। গেদা মাসুম হলেও সে তো পুরুষ। সুতরাং পুরুষ মাসুম বাচ্চা হলেও তাকে গোসল দিতে পারে না। শরিয়তে এরূপ কোন বিধি নাই। আমি আর প্রতিবাদ না করে তার কথায় সায় দিলাম। কারণ, মহিলাগণ সকলেই বর্ষিয়সীর কথায় সায় দিলেন। তখন আমি আনসারকে লাশ গোসল দিতে নির্দেশ দিলাম। আরও একটি যুবক সেচ্ছায় আনসারের কাজে সাহায্য করতে আগ্রহ প্রকাশ করল।

জায়েদা বাড়ির পশ্চিমদিকে বাঁশ ঝাড়ের নিচে স্থান করে দিল। সেই বর্ষিয়সী বাধা দিয়ে উঠানের পূর্ব কোণায় স্থান নির্দেশ করে দিল। মহিলার নির্দেশ অন্য সব মহিলা সমর্থন দিল। আমি গোসলের নিয়মকানুন বাতলিয়ে দিতে লাগলাম। গোসল সম্পন্ন হল। উঠানের মাঝখানে একটি মাদুর পেতে কাফনের কাপড় দিতে দিলাম। কাপড় পড়ানো হয়ে গেল।

আমি কোলে করে লাশ গোরস্থানে নিয়ে চললাম। জানাজা গোরস্থান ময়দানে হবে। লাশ কোলে করে বাড়ির বাইরে বের হওয়া মাত্র ছেলের নানী দাদী মা সবাই চীৎকার করে বিলাপ করে ক্রন্দন করতে লাগল। রাস্তায় বের হতেই কুষ্টিয়ার দিক থেকে এক মোটর সাইকেল আরোহী কাফনে জড়ানো মিরতা দেখে থেমে গেল। লাশকে অতিক্রম করে যাওয়া বেয়াদপি, এই চিন্তাতেই মোটর সাইকেলওয়ালা থেমেছে নাকি ভীড় দেখে থেমেছে বলা মুশকিল। আমরা মেইন রাস্তা থেকে গোরস্থানের রাস্তায় চলতে লাগলাম। মোটর সাইকেল আরোহী চলে গেল।

এই গোরস্থান। আজ থেকে ৬০ বৎসর পূর্বে এই গোরস্থান স্থাপিত হয়। এখন চারিদিকে ওয়াল দিয়ে গোরস্থানকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। এই গোরস্থানকে গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক বলা যায়। এখানে ধনী দরিদ্র সকলের নিরাপদ আশ্রয়। রাজা হোক আর প্রজা হোক, শিশু হোক আর বৃদ্ধ হোক, দূর্বল হোক আর কৃপন হোক, জ্ঞানী বিদ্বান হোক আর নাদান মূর্খ হোক, নর হোক আর নারী হোক, সুন্দরী হোক আর কুৎসিৎ হোক, চোর কিম্বা দূর্ধষ্য ডাকা হোক, বিনয়ী হোক কিম্বা উদ্ধত প্রকৃতির লোক হোক, বামনাকৃতি হোক কিম্বা লম্বাকৃতি হক, খ্যাতিমান দিগবিজয়ী পুরুষ হোক কিম্বা ঘরকুনো অখ্যাতিমান লোক হোক, সুকণ্ঠ গায়ক হোক কিম্বা গর্দভের ন্যায় কর্কশ কণ্ঠী হোক, যাদুকর হোক কিম্বা পীর আওলিয়া- পয়গম্বর হোক, অনলবর্ষী বক্তা হোক কিম্বা মুক বধির বোবা হোক, চিররুগ্ন কংকালসার হোক কিম্বা মেদ ভুড়িওয়ালা মৈনাক পাহাড় হোক, চতুর চালাক হোক কিম্বা বর্বর বোকা হোক। সকলেই এখানে সমান। পরম শান্তির স্থান। এখানে অশ্লীল চীৎকারে কোন কোলাহল নাই। আইল ঠেলাঠেলি নিয়ে মারামারি নাই। যুদ্ধবিগ্রহ নাই। নীরব নিশ্চুপ, যেন পরম শান্তির লীলাভূমি।

সেই পূণ্যভূমি কবরস্থানে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ পথে সবাই নিজ নিজ পাদুকা খুলে নগ্নপদে প্রবেশ করে বিমর্ষ মনে ধীর পদক্ষেপে কলেমা শাহাদত পাঠ করতে করতে সদ্য খননকৃত কবরের দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। ক্রোড়পরি নিষ্পাপ শিশুর মৃত দেহ। ভাবনা চলে গেলো দুই যুগ পিছিয়ে। এইখানে আমার পরম শ্রদ্ধেয় নানী শাশুড়ীর গোর। কিন্তু গোরের অবস্থান স্মরণে নাই। শুধু ক্ষীণ স্মৃতিতে ধরে আছে এই গোরস্থানে তিনি শায়িতা। আমার আরও বহু আত্মীয় বন্ধু বান্ধব, পরিচিত ব্যক্তি নীরবে শায়িত। তাদের হাড্ডি গোস্ত মাটিতে মিশে গেছে। কতদিন কতবার এসেছি এই গোরস্থানে। হাজী হাসান উদ্দিনের দাফনে শরিক হতে এসেছিলাম, তা ৪ বৎসর বিগত হয়েই গেছে।

মনে পড়ে গেল আরেকটি ঘটনা: আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা সদৃশ শ্বশুড়ের কথা। তিনি মৃত্যুর আগে আমাকে ওসিয়ত করেছিলেন, যেন তার মৃতদেহ এই গোরস্থানে দাফন করে দেই। আশ্বিন মাসের ১৫ তারিখ। বিগত ৮ দিন ধরে এক নাগাড়ে বৃষ্টি। সে বৎসর প্রবল বন্যা। সংবাদপত্রে উল্লেখ, চারশত কোটি টাকার উঠতি ফসল বিনষ্ট। হয়েছে। সেদিন শুক্রবার, সকাল ৮ টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন আমার শ্বশুড়। ভেড়ামারা বাজারের প্রখ্যাত দর্জি আজিরুদ্দিন খলিফা। সেদিন আকাশ নির্মল। কোথাও মেঘের চিহ্ন পর্যন্ত নাই। রৌদ্র ঝলমল করছে। আমি স্বয়ং কয়েকজন লোক নিয়ে কবর খনন করার জন্য এলাম। সমগ্র গোরস্থান এক কোমর পানি। নিচে ডুবে আছে। আশে পাশের শষ্য ক্ষেত্রগুলো প্রায় এক বুক পানির নিচে কবর দেয়া মোটেই সম্ভব নহে। সবাই পরামর্শ দিলো- কোদালিয়া পাড়ার হিরিমদিয়া গোরস্থানে। শুষ্ক ভূমি। বালু মাটি। হাজার বৃষ্টি হলেও কাদা হয় না। ভেড়ামারা এলাকার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উচু ভূমি। কেহ মন্তব্য করেন, রেল লাইনের চেয়েও নাকি এক হাত বেশি উচু। সেই গোরাস্থানে গোর দিলাম আমার শ্বশুড় সাহেবকে।

আমাদের ভেড়ামারা এলাকায় ৪ টা বড় বড় গোরস্থান। একটি কোদালিয়া পাড়ায় আরেকটি ফারাকপুরের উত্তরে। আরেকটি এই চাঁদগামে। এই গোরস্থান সংলগ্ন ঈদগাহ। পরিচ্ছন্ন প্রশস্ত সমতল ভূমি। এখানে জানাজার নামাজ হলো । মুসল্লীগণ কবরের চারপাশে দাঁড়িয়ে রইল। ছোট্ট তকতকে ঝকঝকে কবর। লাশ কবরে শোয়ানো হল। মোল্লা বললেন, বিছমিল্লাহে আলা মিল্লাতে রাসুলুল্লাহ। যে দুজন কবরে লাশ শোয়ায়ে দিলেন, তারাও মোল্লার সাথে সাথে উচ্চারণ করলেন, বিছমিল্লাহে আলা মিল্লাতে রাসুলুল্লাহ। কাঁচা বাঁশের খাবাচিগুলি কবরের উপর বিছায়ে দেয়া হোল। খাবাচি দিয়ে কবর ঢাকা হয়ে গেলে তার উপর কলার পাতা বিছায়ে দেওয়া হোল। এবার কবরের উপর মাটি দেবার পালা। সকলেই এগিয়ে এলো কবরের কাছে। আলগা মাটি একমুট করে তুলে কবরের উপর দিতে লাগল। মোল্লাজী দোয়া বললেন, “মিনহা খালাকনাকুম অফিহা নইদুকুম। ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা।” “এই মাটি দিয়ে তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল, এই মাটিতে তোমাকে স্থাপন করা হল। আবার এই মাটি থেকেই তোমাকে উত্তোলন করা হবে।”

ক্রমে ক্রমে সকলেই মাটি দিয়ে দিল। মাটি দেওয়া শেষ হলে মোল্লাজী নির্দেশ দিলেন, ফাতেহা পাঠ করুন।

প্রথমে ওস্তাগফেরুল্লাহ ১৫ বার, তারপর সুরা ফাতেহা মানে আলহামদো সুরা বিছমিল্লার সাথে ১০ বার, তৎপর সুরা এখলাস বা কুলহু আল্লাহু সুরা ১০ বার এবং সর্বশেষ দরুদ শরীফ ১১ বার এবং সর্বশেষে দরুদ শরীফ ১১ বার পড়ুন। সবাই নীরবে দরুদ শরীফ পড়ে শেষ করলেন। সকলেই একবার মাথা ঘুরায়ে মোল্লাজীর শ্বশ্রুমণ্ডিত মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করল। মোল্লাজীর দোয়া পাঠ শেষ হয়েছে। মোল্লাজীও একবার মুসল্লীদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলেন, সকলের দোয়া পড়া শেষ হয়েছে কিনা। দোয়া পড়া শেষ।

মোল্লাজী সমবেত মুসল্লীদের উদ্দেশ্য করে বললেন, সকলেই কবর জিয়ারতের নিয়তে আল্লাহর দরবারে হাত উঠান। মোল্লাজীর আদেশমাত্র জনতা মোনাজাতের নিমিত্ত দুই হাত কিছু চাওয়ার ভঙ্গিতে উচু করল। মোল্লাজী পুনরায় বললেন, খুব মহব্বতের সঙ্গে বলুন, ইয়া আল্লাহ ইয়া রাব্বুল আলামিন, আপনার সর্বাপেক্ষা প্রিয় নবী, রসুলে মকবুলের মহা ইজ্জতের খাতিরে আমাদের দোয়া কবুল করুন। সমবেত জনতার কেহ উচ্চ কণ্ঠে কেহ নীরবে মোল্লাজীর বাক্যগুলির পুনরুক্তি করল। মোল্লাজী করুন কণ্ঠে কাঁদ কাঁদ স্বরে, আল্লাহর দরবারে তার আকুল আবেদন পেশ করতে লাগলেন, হে রাব্বুল আলামিন আল্লাহ, আপনি মহিয়ান, গরিয়ান আপনার অদেখা অজানা কিছুই নাই। আপনি সর্বদর্শী। আপনি দেখছেন আমরা আপনার কতিপয় গোনাহগার মিসকিন বান্দা, আপনার আলীশান শাহী দরবারে হাত উঠায়েছি। ইয়া আল্লাহ, আপনি আলেমুল গায়েব, আপনি আমাদের সকলেরই অন্তরের সব খবর জানেন। আমরা এতক্ষণ যে ফাতেহা শরিফ পাঠ করেছি, আপনি সব দেখেছেন শুনেছেন। হে রাব্বুল আলামিন আমরা নাদান, মুর্খ আপনার শরিয়তের এলেম কালাম কিছুই জানি নারে মাবুদ। আমরা এই ফাতেহা শরিফের পাঠে কত ভুল ত্রুটি গলতি বিচ্যুতি করেছি, আপনি সব শুনেছেন, দেখেছেন। আপনি ক্ষমা করনেওয়ালা, আপনি যে গফুরুর রহিম। আপনি দয়া করে মহা অনুগ্রহ করে আমাদের ত্রুটি তা কসুর বেয়াদপি সব মাফ দিয়ে ক্ষমা করে দিয়ে দয়া করে কবুল করে নেন। আল্লাহ কবুল করে নেন।

মোল্লাজীর কন্ঠস্বরে ক্রন্দনের সুর। সমবেত জনতাও গদ গদ কণ্ঠে আমিন আমিন ইয়া রাব্বুল আলামিন বলে তাদের আকুল আবেদন আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য আকুতি পেশ করতে লাগলো। মোল্লাজী কণ্ঠস্বর আরো গাঢ় করে পেশ করতে লাগলেন, হে আল্লাহ আপনি আমাদের মাবুদ, সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও মৃত্যুদানকারী। আপনি আপনার ইচ্ছাতেই আজ আপনার এক মাসুম নিষ্পাপ বান্দাকে এই দুনিয়ার বুক থেকে আপনার আশ্রয়ে নিয়ে গেছেন। কুল্লু নাফসান জায়েকাতুল মউত। এই মউতের পেয়ালা আমাদের সবাইকে পান করতে হবে। হে মাবুদ, সেই দিন আসার পূর্বেই যেন আমরা আপনার ক্ষমা লাভ করতে পারি। আমাদের সকলের জীবনের তামাম গোনাহ মাফ করে দিন, মাবুদ। হে মাবুদ, এই ফাতেহা শরিফের ভুল ভ্রান্তি মাফ করে দিয়ে দয়া করে কবুল করে নিন। আল্লাহ গো সহিসালামতে কবুল করে নিন। কবুল করে নিয়ে, এর যা কিছু সওয়াব ও নেকি হয় তাহা অনুগ্রহ করে পৌছায়ে দেন, মানব দরদী, উম্মতের কান্ডারী, তামাম সৃষ্টির সেরা সায়েদুল আম্বিয়া সারোয়ারে কায়েনাত মোফাখ্খারে মওজুদাত, আকায়ে নামদার তাজেদারে মদিনা হযরত মুহাম্মদ মোস্তাফা আহম্মদে মুজতবা সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের রূহ মোবারকের উপর, সোনার মদিনায় তাঁর পাক রওজা শরিফে পৌছায়ে দেন মাবুদ।

জনতা এবার জোরে জোরে কাঁদ কাঁদ কণ্ঠে আমিন আমিন বলে আল্লাহর দরবারে কবুলিয়াতের জন্য আবেদন পৌছাতে লাগলো। মোল্লাজী একেবারে ক্রন্দরত কণ্ঠে বলতে লাগলেন, হে মাবুদ, আপনি এই মিসকিনদের তরফ থেকে আরো পৌছায়ে দেন রসুলে মকবুলের আল-আওলাদ বংশ বুনিয়াদ সাহাবায়ে কেরাম, তাবে তাবেঈন, শহিদে কারবালার যত শহিদান ও অন্যান্য জেহাদের সমস্ত শহিদানের রূহ মোবারকের উপর এর হাদিয়া পৌছে দেন। আরো পৌছে দেন হযরত আদম হতে আজতক পর্যন্ত আপনার যে সমস্ত নেক বান্দা-বান্দি কবরে শুয়ে আছেন, তাদের সকলের রূহের উপর বকশেষ করে দিন। আরো বকশেষ করে দিন আল্লাহ, যত নবী অলি গওস কুতুব, সিদ্দিকীন, শাহেদীন, সালেহিন, চার তরিকার পীর ও তাদের নেসবতে যত ওলীআল্লাহ আছে, তাদের সকলের রূহের উপর এর ছওয়াব পৌছায়ে দিন। মাবুদ, আপনার পিয়ারা হাবিবের ইজ্জতের দোহাই তার পবিত্র ইজ্জতের খাতিরে আমাদের এই দোয়া কবুল করে নিন। মাবুদ কবুল করে নিন। জনতা আবারও উচ্চ কণ্ঠে আমিন আমিন বলে তাদের আবেদন আল্লাহর আরশে পাঠাতে লাগল।

একটা উত্তরে বাতাস সমস্ত গাছপালার ডাল পালা নাড়া দিয়ে গেল। বাঁশের ঝাঁড়ে দুইটা কানা কুয়া পাখি করুণ সুরে আকাশ বাতাস ধ্বনি তুলে ডেকে উঠল পুত পুত পুত। একটা হৃদয় স্পর্শকারী পরিবেশের সৃষ্টি হল।

মোল্লাজী আবার বলতে লাগলেন, আয় আল্লাহ এই মাসুম বাচ্চার অছিলা করে আজ আমরা তোমার এই পবিত্র গোরস্থানে দাঁড়িয়ে তোমার কাছে হাত উঠায়েছি। হযরত আদম হতে যে সমস্ত পয়গম্বর নবী, রসুল, হযরত নবী করিম পর্যন্ত দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। সেই এক লাখ চব্বিশ হাজার পয়গম্বরদের রূহের ইজ্জতের দোহাই, হে মাবুদ আপনি দয়া করে আমাদের এই মোনাজাত কবুল করুন। হে আল্লাহ, এর অছিলায় এই গোরস্থানে যত মোর্দা আছে তাদের সকলের গোর আজাব কেয়ামত তক মাফ করে দেন। আয় আল্লাহ আমরা যারা আপনার শাহী দরবারে হাত উঠায়েছি, আল্লাহ গো, আমাদের জীবনের সকল গোনাহ মাফ করে দেন। আল্লাহ খাস করে এই মাসুম বাচ্চার পিতা মাতা আত্মীয় স্বজন দাদী নানী সকলকে শোক সহ্য করবার শক্তি দান করুন। সবুর দান করুন। এই মাসুম বাচ্চা নিষ্পাপ রূহের অছিলায় তার পিতামাতার গোনাহ মাফ করে দেন। হে আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করেন। সমবেত জনতা আবার আল্লাহর আরশে তাদের দোয়া পৌছাতে লাগল। সকলেই ক্রন্দন করতে করতে বলল, আমিন, আল্লাহ আমিন ছুম্মা আমিন।

তারপর মোল্লাজী বাংলা ভাষার মোনাজাত ছেড়ে আল্লাহর খাস কালামের ভাষা আরবীতে শুরু করলেন। রাব্বানা আতিনা ফিদদুনিয়া হাসানাতাও, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিন্না আজাবান্নার, আল্লাহুম্মাগ ফিরলি হাইয়িনা ওয়া মাইয়িতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা ওয়া সাগিরিনা ও কাবিরিনা ওয়া উনছানা। আল্লাহুম্মা মান আহয়িয়াতাহু মিন্না ফাতাওয়াক্কায়তাহু আলাল ইমান, বেরাহমাতিকা ইয়া আর হামার রাহিমিন। সোবহানা রাব্বিকা রাব্বিল ইজ্জাতে আম্মা ইয়াসিকুন। ওয়া সালামুন আলাল মুরসালিন। ওয়াল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

মোনাজাত শেষ। সকলেই হাত মুখে ঘষলো। কেহ হাতের তালু গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে চুমা খেলো। এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল সকলেই। কেহ জুতা হাতে, কেহ জুতা দূরে রেখে আসা লোকজন, নগ্নপদে গেটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। কবরের দিকে কেহ কেহ দৃষ্টি দিয়ে দেখছে, কবর বাঁশের চেগারে ঘেরা দেওয়া হয়েছে।

বাবলা গাছে, শিশু গাছে অনেকগুলি পাখি কলরব করছে। শিশু গাছের এক ডালে বসে একটি হলদে পাখি শ্রবণ সুখকর মধুর কণ্ঠে বলছে- একটা খোকা হউক। বাঁশ ঝাড়ে কতকগুলি নানান ধরনের পাখি কিচির মিচির করছে। একটি কাঠঠোকরা পাখি শুকনা বাঁশের উপর শক্ত ঠোটের ঠোক দিয়ে ঠরর্র্র শব্দ তুলছে। হোলদে পাখিটি বিরামহীনভাবে ডেকেই চলছে ‘একটা খোকা হউক’।

আমি আমার শ্যালক মন্টুকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার ছ্যান্ডেল কোথায় রেখেছিস। ‘এই যে’ বলে তার হাতে রক্ষিত স্যান্ডেল, হাতখানা একটু এগিয়ে আমায় দেখালো। আমি বললাম, হাতেই রাখ।

অনেক মুসল্লী গোরস্থান থেকে বের হয়ে গেল। আবার যাদের ঘনিষ্ট আত্মীয় স্বজন এই পবিত্র গোরস্থানে শুয়ে আছে। তাদের কবরের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। একজন তার সঙ্গীকে কার কবর আঙ্গুলের ইশারায় দেখিয়ে দিচ্ছে। কেহ কেহ কবরস্থানের প্রশংসা করছে। বিশেষ করে সারি সারি শিশুগাছগুলির প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

হঠাৎ মন্টু জিজ্ঞেস কোরল। আচ্ছা দুলাভাই, আমার নানীর কবর কোন জায়গায়? আমি একটু রশিকতা করে বললাম, ঐ খানে তোর নানীর কবর বাবলা গাছের তলে, ১৭ বৎসর পান্তা করেছি দুনয়নের জলে। মন্টু হেসে বলল, পান্তা করছেন তো, কি দিয়ে খাবেন? আমরা তো নুন আর কাঁচা মরিচ পেয়াজ দিয়ে খাই।

আজ থেকে ১৭ বৎসর পূর্বে নানীকে এই পবিত্র গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সেই গোরস্থান বলতে বিঘা খানেক উলুর জমি। তারপর গঙ্গা কপোতাক্ষ ক্যানেল কাটা হল এই গোরস্থানের পাশ ঘেসে। ক্যানেলের পাড় দিয়ে তৈরি হল মোটর চলাচলের রাস্তা। কত পরিবর্তন। ভেড়ামারার পূর্ব দিকের লোকজন এই গোরস্থানকে বড় করার জন্য অগাধ অর্থ দান করল। জমি কেনা হল। মাটি ফেলে উচু করা হল। পুরাতন কমিটি ভেঙ্গে নতুন কমিটি করা হোল। নবীন তরুনগণ হোল এই কমিটির সদস্য। তারা আধুনিক যুগের উপযোগী করে গোরস্থানের পশ্চিম দিকের জমিতে ঈদগাহ তৈরি করলো। ঈদগাহ সংলগ্ন করে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করলো। যেন দ্বীনি এলেম সহজেই তালিম দেয়া যায়, তারও সুব্যবস্থা কোরল। চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন সদস্যগণও আপ্রাণ চেষ্টা করে, দৃষ্টি আকর্ষণকারী গেট তৈরি করে দিল। ক্যানালে সিড়ি তৈরী করে অজুর সহজ ব্যবস্থা কোরল। শিশু গাছগুলি এরূপ মোটা হয়েছে যে এগুলি বিক্রয় করলে বিক্রয় লব্ধ অর্থ দ্বারা আরো কিছু জমি কেনা যাবে। তবে গাছ এখনই বিক্রয়ের কোন প্রয়োজন নাই।

গোরস্থানের উত্তর পার্শ্বে অনেকগুলি বাড়ি হয়েছে। পাড়াটার যথেষ্ঠ উন্নতি হয়েছে। গোরস্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, ঈদগাহ, মাদ্রাসা। আরো অনেক পরিকল্পনা আছে কমিটির। এখানে একটি বাজার লাগাতে পারলে আয় দ্বারা আরো কিছু উন্নতি সম্ভব বলে অনেকে ধারণা করেন। গোরস্থানের দক্ষিণ মাঠে প্রচুর ইরিধান। ক্যানালের কল্যাণে ভেড়ামারার মানুষেরা শান্তির পথ খুঁজে পেয়েছে। তারা এখন ইরিধানের আবাদ করে পেটের ক্ষুধা নিবারনের সহজ পথ পেয়েছে। প্রত্যেকের বাড়িতেই করগেট টিনের ঘর। অনেকের বাড়ি পাকা দালান। দরিদ্র শব্দটাকে তারা তাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এই ক্যানেলের বদৌলতে চাষীদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সাড়া জেগেছে। নিজেদের স্বার্থ তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারা নিজেদের জমি সমতল করে নিজেরাই টার্সারী ক্যানেল কেটে পানি নিয়ে ইরি ধান ফলাচ্ছে। আগে যেখানে শুধু উলুখড়, কাঁশের বন ছিল। এখন সেখানে সেচের পানির কল্যাণে প্রচুর ধান ফলাচ্ছে। যেখানে আগে বৎসরে বিঘা প্রতি মাত্র ৬ মন ধান হোতো এখন সেখানে বৎসরে দুইটা আবাদে বিঘা প্রতি ৬০ মন ধান হচ্ছে। মানুষ কেন সুখী হবে না। আজকাল আবার অনেক চাষী ধানের পরিবর্তে কচুর আবাদ করছে। প্রথমে কচু তুলে আষাঢ় শাউন মাসে ধানের আবাদ করে, তাতে চাষীদের টাকার অংকে লাভের সংখ্যা বেশি হয়।

আমি আর মন্টু ক্যানেলের পাড় ধরে সোজা বাড়ি এলাম। বাড়ি থেকে শুধু আমি একা যাই নাই, গিন্নিও গিয়েছিল। শোকার্তদের সান্ত্বনা দান করা কর্তব্য। সেই কর্তব্য পালন করতে বাড়ির সবাই গিয়েছিল।

রচনাকাল: ৪/৩/১৯৯০ ইং

===========================================================

*মোকছেদ আলী (১৯২২-২০০৯)। স্বশিক্ষিত। সিরাজগঞ্জ জেলার বেলতা গ্রামে জন্ম। গ্রামটি বর্তমানে নদীগর্ভে বিলীন।

About the Author:

বাংলাদেশ নিবাসী মুক্তমনা সদস্য। নিজে মুক্তবুদ্ধির চর্চ্চা করা ও অন্যকে এ বিষয়ে জানানো।

মন্তব্যসমূহ

  1. শামীম খান এপ্রিল 21, 2011 at 4:43 পূর্বাহ্ন - Reply

    সাধারন ভাষায় অসাধারন লেখা।
    অভিনন্দন।

  2. লাইজু নাহার সেপ্টেম্বর 2, 2010 at 2:23 পূর্বাহ্ন - Reply

    নিখুঁত গল্প!
    মনকে ছুঁয়ে গেল!

  3. রিমন সেপ্টেম্বর 1, 2010 at 11:48 পূর্বাহ্ন - Reply

    অসাধারণ, :rose2:
    মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জীবন্ত ঘটনা।

  4. রৌরব আগস্ট 31, 2010 at 10:58 অপরাহ্ন - Reply

    মর্মস্পর্শী :rose: ।

    প্রশ্ন: জায়েদা/যায়েদা কে?

    • মাহফুজ সেপ্টেম্বর 1, 2010 at 5:04 পূর্বাহ্ন - Reply

      @রৌরব,
      ধন্যবাদ।
      যায়েদা এবং জায়েদা একই ব্যক্তি। যেহেতু মোকছেদ আলীকে দুলাভাই বলে সম্বোধন করছেন, অতএব ইনি মোকছেদ আলীর শ্যালিকা। জাহাঙ্গীরের মাতা। নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়া তিন মাসের শিশুটির দাদী।

  5. ফারুক আগস্ট 31, 2010 at 6:57 অপরাহ্ন - Reply

    সাধারন গল্প লেখার গুনে অসাধারন লাগল।

    • মাহফুজ আগস্ট 31, 2010 at 9:45 অপরাহ্ন - Reply

      @ফারুক,
      সাধারণের মাঝেই তো অসাধারণ লুকিয়ে থাকে।

      ধন্যবাদ সুন্দর উপলব্ধির জন্য।

  6. সংশপ্তক আগস্ট 31, 2010 at 1:49 অপরাহ্ন - Reply

    মোকসেদ আলীর লেখায় খুবই সরল মনের নির্লোভ একজন মানুষের ছায়া দেখা যায় । একটি শিশুর মৃত্যু ও গোরস্থান গল্পটায় আমাদের পরিচিতজনদের কাউকে না কাউকে চরিত্রানুযায়ী বসিয়ে দেয়া যায় । মাহফুজ, আপানার ব্লগিং আমার ভাল লাগে কারণ আমি দম্ভহীন আবেগ সংগ্রহ করি ।

    • মাহফুজ আগস্ট 31, 2010 at 9:43 অপরাহ্ন - Reply

      @সংশপ্তক,
      একটি শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যা যা ঘটেছে লেখক সেটাই তুলে এনেছেন। যা সচরাচর আমাদের সমাজে ঘটে থাকে।

      ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।

  7. সাইফুল ইসলাম আগস্ট 31, 2010 at 1:20 অপরাহ্ন - Reply

    মাহফুজ ভাই,
    আমি মোকছেদ আলীর সব লেখা পড়ি নাই। তবে প্রত্যেক লেখকের কিন্তু লেখার একটা ধাচ থাকে আলাদা। পড়লে বোঝা যায় লেখাটা কার। মোকছেদ আলীর লেখা পড়ে কখনওই আমি বুঝতে পারি না। প্রত্যেকটা লেখাই আলাদা লাগে আমার কাছে। ব্যাপারটা আজব না? কাহিনী কি?? :-/

    • মাহফুজ আগস্ট 31, 2010 at 9:39 অপরাহ্ন - Reply

      @সাইফুল ইসলাম,

      আমি মোকছেদ আলীর সব লেখা পড়ি নাই।

      প্রত্যেকটা লেখাই আলাদা লাগে আমার কাছে।

      আপনার উপরোক্ত দুটি বাক্যের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজতে চেষ্টা করছি। ব্যাপার কী? :-/

      একজন লেখক বা কবি সব সময় একই ধাচে লিখবেন এমন নয়। লেখক তার লেখার স্টাইল বদলাতে পারেন।

  8. আফরোজা আলম আগস্ট 31, 2010 at 10:32 পূর্বাহ্ন - Reply

    অনেকদিন পর মোকছেদ আলীকে পাওয়া গেল। খুব ভালো লাগল।

    • মাহফুজ আগস্ট 31, 2010 at 9:48 অপরাহ্ন - Reply

      @আফরোজা আলম,
      ধন্যবাদ। আপনাদের এই অনুপ্রেরণাতেই তাঁর লেখা পোষ্ট করতে উৎসাহিত হই।

মন্তব্য করুন