মুক্তিযুদ্ধ – জয়বাংলাদের বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ

By |2010-08-19T02:53:37+00:00আগস্ট 18, 2010|Categories: গল্প, ভারত, মুক্তমনা|9 Comments

মুক্তিযুদ্ধ – জয়বাংলাদের বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ
[মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রচুর পেয়েছি আমি। সে ঋণ শোধ করা সম্ভব নয় কোনভাবেই। এই লেখাটি ঋণগ্রস্থের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার চেষ্টা মাত্র। লেখাটিতে ভাল কিছু থাকলে তা আতীক রাঢ়ীর জন্য। না থাকলে গঠনমূলক মন্তব্যের জন্য আরও একবার ধন্যবাদ।]

কুচবিহার থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। বগলতলায় বহুদিনের পুরণো একটি এটাসি ব্যা্গে আমার সংসার। একটি জামা, একটি লুংগি, আর একটি টুথ ব্রাশ। প্যান্টটা তো পড়নেই আছে। টুথ পেস্ট আর দাড়িকাটা যখন যেখানে থাকি তাদেরটা দিয়ে চালিয়ে দেই। কিন্তু মুশকিল টুথ ব্রাশটা নিয়ে। ওটা চালানো যায় না।

আমার সামনেই প্রথম শ্রেণীর একটি কামড়া এসে দাঁড়াল। জয়বাংলাদের টিকিট লাগে না। প্রথম শ্রেণীতে গেলেও যা, তৃতীয় শ্রেণীতেও তা। উঠে পড়লাম। ফাঁকা একটা কক্ষে আমি একাই রাজা। দেশে কখনও প্রথম শ্রেণীতে চড়া হয়নি। নরম সীট। দারূণ মজা। কিন্তু আমার এটাসী ব্যাগটা দেখে একটা টিটি(?) নিশ্চয় বুঝে ফেলেছে আমি জয়বাংলা। তিনি চলতি ট্রেনেই এসে উঠলেন। প্রথমেই আমার কক্ষটায়।

জিজ্ঞেস করলেন – টিকিট আছে?

বললাম – পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছি। রিফিউজি।

তিনি সামনের সীটে এসে বসলেন। কোন ডিস্ট্রিক্টে বাড়ি ছিল জিজ্ঞেস করলেন। তারপর তার নিজের স্মৃতি কথা সংক্ষেপে মনে করলেন। পঞ্চাশের দশকের শেষে নারায়গঞ্জ ছেড়ে চলে এসেছেন। আর যাওয়া হয়নি। কত স্মৃতি। স্কুল, পৈত্রিক ব্যবসা, নৌকা ভ্রমণ, ইলিশ মাছ, ইত্যাদি। একসময় তিনি উঠলেন। বললেন – আপনারা টিকিট করতে পারেন না জানি। প্রথম শ্রেণীতে গেলে আমাদের অসুবিধা হয়। সামনে নেমে তৃতীয় শ্রেণীতে অনেক সীট পাবেন। কেউ কিছু বলবে না।

টিটিটা খারাপ কিছুই বললেন না। কিন্তু আমি মরমে মরে গেলাম। বিনা পয়সায় যেতে পারছি। এই তো যথেষ্ঠ। প্রথম শ্রেণীতে উঠার লোভটা কেন সামলাতে পারলাম না। একটা জিনিষ খেয়াল করলাম। আলাপ হলেই দেখি প্রায় সবাই পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, না হয় বিক্রমপুর। গৌহাটী রেল স্টেশন থেকে বেরোতে গিয়ে ধরা পড়লাম। তার বাড়ী ছিল নোয়াখালীতে।
মাস দুই পরে কলকাতা মাসির বাসায় এলাম। শিয়ালদা স্টেশনে চেকার গুলো ভিখেরীর মত টিকিটের জন্য হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে। হাত ঠেলে চলে যাই। বুঝতেই পারেনা আমার monthly ticket নেই। যাই হরিদাস বাবুর বাড়ীতে কিম্বা তাঁর অফিসে। তিনি নীলরতণ মেডিকেল কলেজের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের প্রধান। ছ্যাক খেয়ে দেশ ছেড়েছেন পঞ্চাশের দশকে। আর বিয়ে করা হয়নি।

মাসির বাসায় বোর হয়ে গেছি। ভাবলাম ঘুরে আসি নদীয়া থেকে। ওখানে বাবার দুই পিসতুত ভাইএর বাড়ি। একটু দূরেই থাকে সুধীর মামা। বাংলাদেশ বর্ডার ঘেষে ফুলিয়া ফার্ম। তার ম্যানেজার। পকেটে দীর্ঘদিনের সহযাত্রী একটি সিকি। শিয়ালদা থেকে প্রায় দুই ঘন্টা ট্রেনে। বাম পাশে বসা আমার মত এক জয়বাংলা। উনিশ কি বিশ। আমার বয়েসী। ট্রেনের দোলায় দুলতে দুলতে ঘুমিয়ে পড়েছে। বার বার আমার গায়ে এসে পড়ছে। ঠেলে সরিয়ে দেই। আবার এসে পড়ে। ভারি বিরক্তিকর। টিটি মশাই তার ডানায় কয়েকবার ধাক্কা দিলেন। ঘুম ভেংগে টিটিকে দেখে আবার চোখ বুঝলো ছেলেটি। আবার ধাক্কা দিলেন। টিকিট চাইলেন। ছেলেটির চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ। মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে বিরক্তিমাখা উত্তর দিল – জয়বাংলা।

আর যায় কোথায়? টিটি মশাই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। – জয়বাংলা! জয়বাংলা, তাতে হয়েছেটা কী? এত বছর হল আমরা এদেশে এসেছি। একটা দিন আলিপুর চিড়িয়াখানা যেতে পারলাম না। আপনারা বিনা টিকিটে মাসির বাড়ি, পিসির বাড়ি, চিড়িয়াখানা ঘুরে বেড়াবেন। টিকিট চাইলেই মেজাজ দেখাবেন। আপনার চেহারা দেখে কি আমাদেরকে বুঝতে হবে যে আপনি পাকিস্তান থেকে এসেছেন? আপনাদের কাছে টিকিট চাওয়া কি অন্যায়?

আমারও একই কেস। টিকিট নাই। পকেটে একটা সিকি। ভিতরে আমি ঘেমে গেছি। বাথরুমে যাওয়া দরকার মনে হচ্ছে। টিটি মশাই রাগে গজ গজ করছেন। ওটাকে ছেড়ে দিয়ে আমার কাছে টিকিট চাইলেন। আমি ভীষন নার্ভাস হয়ে গেছি। এযাত্রায় আর বুঝি রক্ষা নেই। সবিনয়ে উঠে দাঁড়ালাম। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে তার ভাঁজ খুলে এগিয়ে দিলাম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের সম্পাদক সুব্রত মুখার্জি কি প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সীর স্বাক্ষরিত চিঠি। বাংলাদেশ থেকে আগত এই ছাত্রটিকে যথাসাধ্য সাহাযের আবেদন।

টিটি মহাই আকাশ থেকে নেমে এলেন। ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে দ্বিতীয় দফা শুরু করলেন – এনাকে দেখুন। শিখুন। আমিও ঐ দেশেরই মানুষ। আজ আপনারা বিপদে পড়েই এসেছেন। পশ্চিম বঙ্গের অবস্থা ভাল নয়। এত লোক। দারূণ চাপ। তবু যতটা পারছি করছি। বিনা টিকিটে ট্রেনে ফাঁকা জায়গায় বসে যাবেন। অসুবিধা কী? এটা আমাদের জন্য তেমন অতিরিক্ত বোঝা নয়। কিন্তু আমরা কি আপনাদের কাছ থেকে একটু ভদ্র ব্যবহার আশা করতে পারিনা?

টেক্সাস, ১৭ আগষ্ট ২০১০।

ড. নৃপেন্দ্র নাথ সরকার পেশায় শিক্ষক ও গবেষক। বর্তমানে তিনি টেক্সাসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, গবেষক এবং প্রোগ্রাম নিরীক্ষা সমন্বয়ক।

মন্তব্যসমূহ

  1. আদিল মাহমুদ আগস্ট 19, 2010 at 6:36 পূর্বাহ্ন - Reply

    আপনার সেই সময়কালীন অভিজ্ঞতাগুলি অনন্য।

    এভাবে গল্পের মত দৈন্দিন অভিজ্ঞতাগুলিই বলে যান। কোন জটিল কাহিনীর দরকার হবে না।

    • নৃপেন্দ্র সরকার আগস্ট 19, 2010 at 6:17 অপরাহ্ন - Reply

      @আদিল মাহমুদ,

      সেই সময়কালীন অভিজ্ঞতাগুলি অনন্য।

      এগুলো অলিখিত ইতিহাসের অংশ বিশেষ।

      বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার জন্য সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ সর্ব প্রথম বেড়িয়ে পড়েন বিশ্বের বিশেষ কয়েকটি দেশের নেতাদের সাথে মত বিনিময়ের জন্য। এপ্রিল কি মে মাসে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী শরনার্থী শিবির পরিদর্শনে আসেন তার পরে। কেনেডী হয়তো এমনিতেই আসতেন। হয়ত জয়প্রকাশ নারায়ণের বিশ্বভ্রমণ এর পেছনে কাজ করেছে। জানিনা। এসবের কোন বিশ্লেষণ কোথাও নেই। থাকবেও না। জয়প্রকাশের কথাও ইতিহাসে জায়গা পাবে না। জয়প্রকাশ নারায়ণের কথা বলতে গেলে হাজার জনের কথা বলা উচিত। একটি দেশের জন্ম একটি বিশাল ব্যাপার। সেখানে একক অবদান তুচ্ছ। আবার কোন কিছুই তুচ্ছ নয়। বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তলে সাগর অতল। একহাতে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। সহস্র হাতের মিলিত প্রচেষ্টাতেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। প্রত্যেকের অবদানই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। অস্বীকার করার উপায় নেই। ভাবছি জয়প্রকাশের কথাটি এডওয়ার্ড কেনেডীর সাথে যোগ করে দেব আমার আগের পোস্টিংএ।

      • গীতা দাস আগস্ট 19, 2010 at 11:10 অপরাহ্ন - Reply

        @নৃপেন্দ্র সরকার,
        আপনার লেখায় আমার আরেকটি বিষয় মনে হল। রিফিউজি ক্যাম্পে জ্বালানি যোগাড় হতো আশে পাশের বন থেকে। টিকিট কেটে ঢুকতে হত। একজন যা পারে ডাল পালা কেটে আনত। কত টাকা বা কীভাবে তা ঠিক মনে নেই।তবে স্থানীয়দের থেকে টিকিটের দাম কম ছিল এটুকু মনে পড়ছে।
        ক্যাম্পে আমাদের ঘরের আশেপাশের এরা আনতে যেত। কোন কোনদিন দুইবারও যেত। এনে বেচত। টিকিটের দাম কমানোর উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে তারা ব্যবসা করত। আমার বাবা তাদের কাছ থেকেই আমাদের জ্বালানি কিনতেন।

        • নৃপেন্দ্র সরকার আগস্ট 19, 2010 at 11:39 অপরাহ্ন - Reply

          @গীতা দাস,

          আমার বাবা তাদের কাছ থেকেই আমাদের জ্বালানি কিনতেন।

          ব্যাপারটি মামুলি হয়েও মামুলি নয়। দুঃস্বপ্নের দিনগুলোর কত স্মৃতি মিশে আছে এই সব ছোট ছোট ঘটনাগুলোর সাথে।

  2. আদিল মাহমুদ আগস্ট 18, 2010 at 7:05 অপরাহ্ন - Reply

    মানুষ মানুষের জন্য……।

    এ জাতীয় কিছু ঘটনার জন্যই মাঝে মাঝে মনে হয় যে মানুষ আসলেই মানুষের জন্য।

  3. রাজেশ তালুকদার আগস্ট 18, 2010 at 6:20 পূর্বাহ্ন - Reply

    আপনার ভাগ্য তো বেশ ভালো বলতে হয় পকেটে সিকি নিয়ে জয় বাংলা দিয়ে
    পুরা কোলকাতাই চক্কর মার লেন। 🙂

    • নৃপেন্দ্র সরকার আগস্ট 19, 2010 at 2:48 পূর্বাহ্ন - Reply

      @রাজেশ তালুকদার,
      এখানে আমি মন্তব্য করেছি সকাল ছটার দিকে। ছিল অনেক সময়। এখনই দেখছি হাওয়া হয়ে গেছে। জানিনা কী ভাবে হল!

      দেখি Reproduce করতে পারি কিনা

      পকেটে সিকি নিয়ে জয় বাংলা দিয়ে
      পুরা কোলকাতাই চক্কর মার লেন

      আমার সেই দুঃসময়ে আমি প্রচুর পেয়েছি/নিয়েছি। আমার ঋণ শোধ হবে না কোন দিন। এই লেখাটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার চেষ্টা মাত্র।

  4. ব্রাইট স্মাইল্ আগস্ট 18, 2010 at 1:53 পূর্বাহ্ন - Reply

    @নৃপেন্দ্র সরকার,
    চমৎকার। ভালো লাগলো পড়ে। সত্যিতো টিটি ভদ্রলোকের ভদ্র ব্যবহার আশা করাটা অন্যায় কিছু ছিলনা।

    • নৃপেন্দ্র সরকার আগস্ট 18, 2010 at 6:48 পূর্বাহ্ন - Reply

      @ব্রাইট স্মাইল্, একটি মাত্র টিটি নয় কিন্তু।

      এত লোক। দারূণ চাপ। তবু যতটা পারছি করছি।

      বাদ দিবেন কীভাবে?

মন্তব্য করুন