আক্কেল টাক্কেল

আক্কেল টাক্কেল
মোকছেদ আলী।*

[পোষ্টম্যানের কথা: ছয়টি পর্বে বিভক্ত হলেও, পর্বগুলো ছোট ছোট। একত্রে না পড়লে পুরো পরিবেশটা ভিন্ন দিকে গড়িয়ে পড়তে পারে। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকে নজর না দিয়ে মনোভাবগুলোর প্রতি নজর দিতে অনুরোধ করছি।]

১ম পর্ব

পিতা তার সদ্য এসএসসি পাশ করা মেয়ের হাতের দিকে লক্ষ্য করে শুধালো, “বেলী তোর হাতের চাড়ায় লাল লাল কি?” পিতা বয়স্ক সংসারাভিজ্ঞ লোক, দেখামাত্রই বুঝতে পেরেছেন এই লাল রংটা নেইল পলিশ ছাড়া অন্য কিছু নয়। তবুও সাধারণভাবে প্রশ্ন করার অভ্যাসহেতু শুধালেন। মেয়ে সহজ কণ্ঠে জবাব দিল, “নেইল পলিশ।” পিতা স্নেহজড়িত কণ্ঠে বললেন, “শোনো, আমরা মুসলমান, নেইল পলিশ নখে নিলে অজু হয় না। নেইল পলিশ মাখতে হয় না।” মেয়ে অনুযোগের সুরে বলল, “নাহ্ মাখতে হয় না, কত লোকে মাখে। আমি কোনদিন নেইল পলিশ মাখিনি, তাই মেখেছি। ভাবী মাখে; ভাবী মাখে তাতে দোষ হয় না, আমি মাখলেই দোষ হয়।”

পিতা অন্যরুমে চলে গেলেন। বেলীর বড় বোন কেলী, বেলীর কণ্ঠস্বরে অনুযোগের সুর শুনে জিজ্ঞেস করল, “কিরে বেলী, কি হয়েছে?” বোনকে কাছে পেয়ে বেলী মনে মনে খুব খুশী হল। মনের ক্ষোভটা সবিস্তারে প্রকাশ করল। বলল, “এই নেইল পলিশ নিয়েছি, আর আব্বা বকছে। নেইল পলিশ ক্যান? নেইল পলিশ নিবি না। মুসলমান মেয়েদের নেইল পলিশ নিতে হয় না। নেইল পলিশ নিলে ওজু হয় না। নামাজ কালাম হয় না। ফের যদি নেইল পলিশ নিস্ তো হাত বাইরা ভাইঙ্গ্যা ফেলব।”- বলেই সে কাঁদ কাঁদ হয়ে চোখ মুছল।

কেলী ছোট বোনের অনুযোগ শুনে পিতার প্রতি তার মন খুবই ক্ষুব্ধ হল। পিতার উদ্দেশ্য কিছু একটা বলবে। কিন্তু বিশেষণটা কি দিবে, সে যুৎসই মত কিছু খুঁজে পাচ্ছিল না। বোকা, গাধা, পাগল নাকি রাগিত। অবশেষে বিশেষণ না লাগিয়েই সরাসরি মন্তব্য করল- আব্বার স্বভাবটাই ঐ রকম। মেয়েদের কোন ভাল আব্বা দেখতে পারে না। তার পুত্রবধুরা যে অহরহ নেইল পলিশ মাখে তাতে কিছু হয় না। বড় ভাবী তো আশি টাকা দামের নেইল পলিশ মাখে, আর মেজভাবী শুধু নেইল পলিশ নয়, ঠোটে লিপিষ্টিক মেখে পরী ম্যাম সাজে, সেদিকে চোখ পড়ে না। তখন চোখ বন্ধ করে অন্ধ সাজে। বলেই ছোট বোনটাকে ঢালাও হুকুম দিল- “তুই মাখবি, ১০ টাকা দামের নেইল পলিশ মাখলে অজু নষ্ট হয় না। ৮০ টাকা দামের নেইল পলিশ নখে লাগালে অজু নষ্ট হয়।”

বেলী কেলীদের চাচী আম্মা হঠাৎ এসে হাজির। ওদের অজু নষ্ট অজু নষ্ট কথা শুনে জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁরে কেলী তোরা অজু নষ্ট অজু নষ্ট নিয়ে কি সব আলোচনা করছিলি?” কেলী তর্কশাস্ত্রে বি এ পাশ। চাচীর প্রশ্ন শুনে খুব উৎসাহিত হয়ে বলল, “দেখেন আন্টি, আমাদের বাবার কি কিছু বুদ্ধি সুদ্ধি আছে?” আন্টি মেয়ের এহেন প্রশ্নবানে বিরক্ত না হয়ে হাসি মুখে বললেন, “ওর বুদ্ধি সুদ্ধি খুবই ছিল, ও আমার কোলেই তো মানুষ। ওর বুদ্ধি দেখে তোদের দাদী ওর কাছ থেকে অনেক বুদ্ধি ধার নিত। এমন কি তোর চাচাও কিছু কিছু ধার নিত। ও বুদ্ধি ধার দিতে দিতে সবই প্রায় ফুরে গেছে, অল্প একটু যা ছিল তা তোরা থারটিন ভাইবোনে নিয়ে নিয়েছিস। আর থাকে কি?”

কেলী তর্কশাস্ত্রে বি এ পাশ। বলল, “বুদ্ধি ধার দিলে কি কমে যায়? নাকি ফুরে যায়? বুদ্ধি বিদ্যা ধার দিলে তো আরো বেড়ে যায়।” চাচী হেসে বলল- “তোর কথা ১৬ আনাই রাইট। কিন্তু বয়সের একটা সীমারেখা আছে না? যৌবনের সীমা পার হলে সবই কমতে থাকে। শুধু বুদ্ধি নয়, দেহের যা কিছু আছে সবই কমতে থাকে। এই গায়ের বল শক্তি, চোখের দৃষ্টি শক্তি, বুকের সাহস, স্মরণ শক্তি, হজম শক্তি, কথা বলার শক্তি, দাঁত পড়ে যায়, জিহ্বার স্বাদের শক্তি, কাজ করার শক্তি সবই তো কমে যায়। তারপর একদিন নিঃশ্বাসের শক্তিটাও শেষ হয়ে যায়। বাস্। সব শক্তির অবসান হয়ে গেল। তোদের বাবার অবস্থা তো তাই। কখন যে নিঃশ্বাসের শক্তিটা শেষ হয়ে যাবে, সেদিন বুঝতে পারবি বাবা কি ছিল?

২য় পর্ব

ঈদের দিন। আনন্দ, হৈ হল্লা। মেয়েরাই বেশী শরীক হয়েছে এই আনন্দে। পিতা জিজ্ঞেস করলো, টিউবী, তোর হাতের চাড়ায় লাল লাল কী? পিতা যদিও খুব ভালোভাবেই জানে, ঈদের দিনে আধুনিক যুগে, মেয়েরা সাজ গোজ করতে লিপিষ্টিক, নেইল পলিশ, চোখে কাজল, কপালে টিপ এসব ব্যবহার করে।

টিউবী, পিতার প্রশ্ন শুনে কাছে এল। পিতার কোল ঘেসে দাঁড়িয়ে হাতের আঙ্গুলগুলি পিতাকে দেখায়ে বলল, “মেইড ইন ইংল্যান্ড, কুইন নেইল পলিশ। খুব উজ্জল তাই না বাবা। বিলেতি জিনিস তো, উজ্জল হবেই।”

“তবে কি জানিস, এই নেইল পলিশ হাতে নিয়ে অজু করলে অজু শুদ্ধ হয় না, আর অজু শুদ্ধ না হলে তো নামাজও শুদ্ধ হবে না।”

“বাবা, আমি মুসলমান, এ মাসায়েল ভাল ভাবেই জানি। জেনে শুনে কেন নিলাম, তাহলে শুনুন। সকালে গিয়েছি ঠিকাদার খালুদের বাড়ী। খালুর মেজ মেয়েটা আর্জুমান্দবানু হাতে নেইল পলিশ নিচ্ছিল। আমায় দেখে হাতটা টেনে নিয়ে লাগিয়ে দিল। বাধা দিলাম না। মসলা মাসায়েলের কথাও বললাম না। কারণ ওরা তো নামাজই পড়ে না। তার আবার ওজু কি হবে? ওরা যুক্তি বিদ্যার ছাত্রী, শেষে মেলা তর্ক জুড়ে দিবে। ভাবলাম দিচ্ছে দিক, জোহরের নামাজ তো সেই দুইটার সময়। তখন নেইল রিমোভার দিয়ে ঘসলেই সব উঠে ছাফ হয়ে যাবে।”

টিউবীর বুদ্ধি দেখে পিতা খুব খুশী হলেন এবং প্রাণভরে নেক দোয়া করলেন।

৩য় পর্ব

জেলি বলল, “চাচাজান, আমি আজ কয়দিনই লক্ষ্য করেছি, বেলী কেলীরা নামাজ কালামও ঠিকমত আদায় করে না। এবং পর্দা পুশিদার সঙ্গে চলাফেরা করে না। ওদের তালিম দিবেন এবং তাবলীগ করবেন। চাচা, আপনার এলাকায় কি তালীম অর্থাৎ তাবলীগ জামাত থেকে যে তালীম হয় সে ব্যবস্থা কি আছে?”

“না মা, আমাদের এলাকায় এখনও সে রকম ব্যবস্থা গড়ে উঠে নাই। তবে আশা করি অচিরেই এই ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। আমার মেয়েদের বড় মামা তাবলীগ জামাতের আমীর। বড় মামীও খুব পর্দানশীল এবং শরীয়তের পাবন্দী। আশা করি ওদের প্রচেষ্টায় অত্র এলাকায় মেয়েদের তালীমের সুব্যবস্থা হবে।”

“চাচা, যতদিন এ ব্যবস্থা না হচ্ছে, ততদিন আপনিই ওদের তালীম দিবেন।”

চাচা দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলল, “মা, আমার কথা কোন মেয়েই মান্য করে না। এই সেদিন ছোট মেয়েটাকে শুধু বলেছি, নেইল পলিশ নিলে অজু হয় না। আরে বাপরে, মেয়ে কত কথা শুনিয়ে দিল। কি বলব, তারা এখন বড় হয়ে লেখাপড়া শিখেছে, বাপকে মান্য করতে পারছে না। জমি জাতি টাকা পয়সা সব হারা হয়ে আজ আমি দূর্বল, দূর্বলের কথা কে শোনে? তবে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কাল করেই আছি। তিনি অবশ্যই আমার সন্তানদের হেদায়েত করবেন।”

“চাচাজান, হ্যাঁ, এই দুনিয়ার নিয়মই এই। অর্থ না থাকলে তার মর্যাদা কেউই দিতে চায় না। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-আত্মীয়স্বজন সবাই তাকে দুর দুর ছেই ছেই করে। তবে আপনার কথা আলাদা। আপনি বেশী বেশী করে ওদের জন্য দোয়া করবেন। বাপের দোয়া আল্লাহ কবুল করবেনই। তখন দেখবেন, ওদের এই মনমানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে, ওরা হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়েছে। হেদায়েত দান তো আল্লাহ পাকের।”

“মা, তুমি ঠিকই বলেছ, দোয়া করা ছাড়া তো আমার আর কিছুই নাই। আজ আমি নিঃস্ব অসহায়। তুমিও ওদের হেদায়েতের জন্য মঙ্গলের জন্য দোয়া করো।”

“জ্বী চাচাজান! আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করুন।”

৪র্থ পর্ব

জেলি বলল, “বেলী কেলী আমি কাল চলে যাব।” কেলী বলল, “আরো দুদিন থাকেন, আপনারা আসায় আম্মা খুব খুশী হয়েছে। আম্মা বলছিল যে, আগামীকাল নারকেলের নাড়ু আর পিঠা বানাবে।”

“থাকার ইচ্ছা আমারও ছিল, কিন্তু বিরাট বাড়ী, তোর ভাই একা একা রয়েছে। রাত্রে নাকি ওর ভয় করে।”

বেলী কেলী একথা শুনে হেসেই খুন।

“ভাবী, কি যে বলো, অতবড় যোয়ান মর্দ বেটা ছেলে মানুষ, সে আবার ভয় করে নাকি? আসলে ভাইয়ের প্রতি তোমার মহব্বত বেশী তাই তাকে ছেড়ে…”

কেলীর কথাটা শেষ হতে দিল না জেলী। বাক্যের শেষ অংশটুকু পূরণ করে দিল, “থাকতে পারছি না।”

জেলীর কথা শুনে সবাই হেসে ফেলল। জেলী এবার মুরুব্বীয়ানা সুরে বলল, “শোন, আব্বা কেমন বৃদ্ধ হয়ে গেছে। মন মানসিকতা অনেক সময় ঠিক থাকে না। পয়সা কড়ি তো আর আগের মত নেই। সেদিকটা চিন্তা ভাবনা করে তার সেবা যত্ন তোরা করবি। যা কিছু বলে, সেতো তোদের মঙ্গলের জন্যই। শুনলাম বেলী নেইল পলিশ নখে নিয়েছে, চাচা বলেছে, নেইল পলিশ নিলে অজু হয় না। ঠিক কথায় তো বলেছে। আর বেলী তার জন্য চাচাকে কত কথা শুনিয়ে দিয়েছে। কেন, ও তো আর একেবারে অবুঝ না। যে ম্যাট্রিক ফাষ্ট ডিভিশনে পাশ করে, তার বুদ্ধি সুদ্ধি কথা বার্তা মার্জিত হওয়া উচিত। ঠিক কিনা?” কেলী বলল, “সেটা ঠিক।” জেলি বলল, “তাহলে ও খুব সহজ করে যদি বলত- মুছে ফেলে দেব, আর নেব না। তাহলে তো আব্বা খুশী হয়। কথাও বাড়ে না। যাহোক আমি তোমাদেরকে ‘ফাজায়েলে তাবলীগ’ কেতাবখানা সংগ্রহ করে পড়তে নির্দেশ দিচ্ছি। বইখানা পড়লেই দিলে বুঝ আসবে, আর তখন অন্য উপন্যাস গল্পের বই পড়তে ভাল লাগবে না। বুঝেছ?” কেলী এবার তার লজিকের বিদ্যা প্রয়োগ না করে খুব বিনীতভাবে বলল, “আমার নানীর কাছে ফাজায়েলে তাবলীগ কেতাবখানা আছে, বড় মামা ঢাকা থেকে এনে দিয়েছে।”

জেলী বলল, “তাহলে খুব ভালো কথা। এই মূল্যবান কেতাবখানা সংগ্রহ করতে তো তোমাদের আর কষ্ট করতে হবে না। নানীর কাছ থেকে নিয়ে এসে পড়বে, দিলে বুঝ আসবে, হেদায়েতের পথ আল্লাহ দিয়ে দিবেন। তোমরা সবাই ভাইবোন মিলে সুবিধামত একটা সময়ে একসঙ্গে বসে তালীম করবে। যার কণ্ঠস্বর ভাল এবং শুদ্ধ করে পড়তে পারে, সে পড়বে। আর সবাই মিলে শুনবে। তারপর একটা অনুচ্ছেদ শেষ হলে তা নিয়ে সবাই মিলে আলোচনা করবে। এবং সেই বিষয়টির উপর আমল করতে থাকবে। দেখবে, অচিরেই আল্লাহপাক সন্তুষ্ট হয়ে, তোমাদের দুঃখ কষ্ট দূর করে, তোমাদের নেক মনোবাসনা পূর্ণ করে দিবেন। তর্কাতর্কি করবে না। তর্ক করে কোনদিন কেউ জয়লাভ করতে পারে না। হয়ত এখন তর্ক করে কাউকে হারালে। সে কিন্তু আর তোমার বন্ধু থাকল না। মনে মনে সে তোমাকে দুশমন ভাববে এবং সুযোগ সুবিধা পেলে তোমার ক্ষতি করবে। কথা বুঝতে পেরেছো?”

কেলী বলল, “ভাবী, আপনি খুব মূল্যবান কথাই বলেছেন। আমি আজ না হোক কালকেই বড় মামীর কাছ থেকে ‘ফাজায়েলে তাবলীগ’ কেতাবখানা আনবো আর আপনার উপদেশ মত চলব।”

৫ম পর্ব

দুপুর বেলা। বেলী কেলীর মা চাল ঝাড়ছিল। এবং চালের ভেতর থেকে কালো চাল ও পাথরের টুকরা বাছাই করে চাল পরিষ্কার করছিল। বেলী বলল, “মা, ভাত বেশ চাল চাল করে শক্ত করে পাক করবা। আমি ঐ নরম ভাত খেতে পারি না। খুব নরম ভাত আমার ভাল্লাগে না।” কেলী বলল, “না মা, ভাত নরম করে পাক করবে। নরম ভাতে বরকত হয়, আর চাল চাল ভাত খেলে হজমের গোলমাল হয়। ফলে গ্যাস্ট্রিক হয়। এটা আমার কথা নয়। আমাদের গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বইয়ে লেখা আছে। আর নরম ভাত তো আসলেই ভাল। আব্বাও নরম ভাত ভালোবাসে। আব্বার দাঁত সব নড়বড়ে হয়ে গেছে।”

এমন সময় টিউবী এলো। ওদের মা কুলার উপর থেকে নজর তুলে মেয়েদের দিকে দৃষ্টি দিল। তারপর টিউবীকে শুধালো, “তুই কি রকম ভাত পছন্দ করিস। শক্ত না নরম?” টিউবী চট করে বলল, “শক্ত ভাত খেলে যে গ্যস্ট্রিক হয়। শক্তই যদি খাবে, তবে রান্না করার দরকার কি? ছোলা ভাজার মত চাল চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে পানি খাও, বেশ পেট ভরবে। খড়ি কাঠি ফুরাবে না। একেবারে ঝামেলামুক্ত।”

কেলী বলল, “দেখ বেলী, ভোটে তুই হেরে গেলি। মেজরিটি মাষ্ট বি গ্রান্টেড। আমি নরম, লোয়াপা নরম, মা নরম, আব্বা নরম।”

কেলী আরো বলল, “মা তুমি এক কাজ করবে, বেলীর জন্য শক্ত থাকতে একটা গামলায় কয়েক চামচ তুলে রাখবে। তারপর ভালোভাবে সিদ্ধ করে নরম করবে।”

বেলী বলল, “মা তুমি নরম করেই পাকাবে। আমিও নরম ভাত খেয়ে আমার গরম মেজাজটাকে নরম করে নেব।”

বেলীর কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।

৬ষ্ঠ পর্ব

বেলী কেলীর বাবা জানালার ধারে চৌকির উপর বসে কি একখানা ধর্মগ্রন্থ মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ণ করতেছিল। কত মানুষের কত হবি মানে সখ বা বাতিক থাকে। কেউ মাছ মারে। কেউ পুরাতন ডাকটিকিট সংগ্রহ করে এলবামে রাখে। কেউ পাখী পোষে খাচায় পুরে। কেউ রঙিন মাছ বড় কাঁচের বোয়ামে পুরে রাখে। কেউ কুকুর পোষে। কেউ জঙ্গলের বেজী, কেউ টিয়া পাখি। হবির অন্ত নেই। কেউ এডভেঞ্চার বই পড়ে। কেউ আবার হুমায়ুন আহম্মেদের উপন্যাস পড়ে গাটের পয়সা খরচ করে। এই অপচয় করাটাও একটা হবি। এই অপচয়ের হবি আছে বলেই গুলতেকিনের স্বামী হুমায়ুন আহমেদ বঙ্গোপসাগরের মধ্যে ছোট দ্বীপ, সেন্ট মার্টিনে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ২ বিঘা জমি গুলতেকিনের জন্য কিনলেন। বাড়ি তো ওদের মেলাই আছে। এতসব বাড়ি থাকতেও আবার সেন্ট মার্টিন দ্বীপে নতুন বাড়ি করবে। সমুদ্রের মধ্যে বাস করা কি আরাম! দ্বীপে অসংখ্য ডাব গাছ। দুর্মুখেরা বলে এ বাড়ি নাকি তার ভক্ত পাঠকেরা করে দিচ্ছে। মানে ১০ টাকা দামের বই ৪৫ টাকায় কিনে বাড়তি টাকাটা দিয়েই ডাকবাংলো সাইজের বাড়ি হবে। টেন্ডার দেয়া হয়ে গেছে। কন্টাক্টরগণ কনষ্ট্রাকশন শুরু করে দিয়েছে। বলছিলাম তো হবির কথা। বেলীর বাপেরও ঐ একটাই হবি আছে। বই পড়া। সব ধরনের বই। তবে এখন ধর্মগ্রন্থ (তা সে যে ধর্মেরই হোক) আর বিজ্ঞানের বই-ই বেশি পড়ে। যৌবনকালে সব ধরনের বই-ই পড়ত। চার আলমারী ভর্তি বই। অবশ্য একাত্তরে অনেক বই হারিয়ে গেছে। যাহোক, আগেই বলেছি চৌকির উপর জানালার ধারে বসে ধর্মগ্রন্থ খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল। হঠাৎ যোগটা বিয়োগ হয়ে গেল।

“তোমার কি কোন আক্কেল টাক্কেল আছে?”- বেলীর মায়ের কণ্ঠস্বরে মনোযোগটা বিয়োগে পরিণত হল। স্বল্পভাষী মানুষটা প্রশ্নবোধক দৃষ্টি স্ত্রীর মুখের দিকে নিক্ষেপ করলো। গিন্নির কণ্ঠস্বর থেকে বেড়িয়ে এলো কয়েকটি তেজোময় বাক্য। তারা আসছে আমার বাড়ী ২ দিনের জন্য বেড়াতে আর তুমি তাদের কাছে…, বাক্যটা শেষ করতে পারল না। হঠাৎ প্রবল কাশি উঠল। কাশতে কাশতে বাইরে চলে গেলো। উঠানের কোণায় গিয়ে এক দলা কাশ ফেলে গলাটা পরিষ্কার করে নিল। কিন্তু ঘরে ঢোকা আর হল না। ছোট ছেলেটা কানতে কানতে বই নিয়ে বাড়ীর ভিতরে এল।

“কানছিস ক্যা? স্কুল ছুটি না টিফিন?” একাধিক প্রশ্নের জবাব বহুবচনেই দিল, “তুষার ভাইয়া কলম কেড়ে নিয়েছে। টিফিন না, ছুটি।”

তারপর ক্রন্দন থামায়ে সহজ কণ্ঠে বলল, “ক্ষিধে লেগেছে, ভাত দাও।”

“বই থুয়ে হাতমুখ ধুয়ে আয়। ভাত দিচ্ছি।”

“হাতমুখ ধোয়াই আছে। তুমি ভাত দাও।”

“আয়।” বলে রান্নাঘরে গেল।

“কি দিয়ে ভাত?”

“ডাল আর ডাটা চচ্চরী।”

“আমি ডাল খাবো না। ডাল ভাল্লাগে না। ডাটাতো আমি খাই-ই না।”

“তাহলে কলা আর চিনি দিয়া খাও।”

“দেও, চিনি আছে?”

“টাকা নিয়ে দৌড় মেরে তোর সুখী নানার দোকান থেকে এক হালি কলা নিয়ে আয়।”

মা টাকা দিল। ছেলে কলা কিনতে চলে গেল। বেশ হলদে মোটা মোটা বেশ পুষ্টু কলা এক হালি নিয়ে ফিরে এল। মা কৌটা থেকে চিনি বের করে ভাতের উপর দিল। শিশির কলার খোশা ছাড়ায়ে পাতে দিয়ে বলল, “মা, তুমি মাখায়ে দেও।” ভাত মাখায়ে ছেলের মুখে তুলে খাওয়াতে লাগল।

এদিকে স্বল্পভাষী মানুষটা বই বন্ধ করে চিন্তা করতে লাগল। সে তো অনেকদিনের কথা, আক্কেল আছে, না মারা গেছে তা তো সঠিক জানে না। তবে মোজার কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে দক্ষ কর্মচারী আক্কেল আলী ঢাকায় গিয়ে একটা বড় গার্মেন্টসে কাজ করে। পরে বিয়ে সাদী করে, ঢাকায়ই থাকে। ওর বৌও গার্মেন্টস-এ চাকরী করে। বেশ ভালো বেতন পায়, ভাল আছে। এ তথ্য সে তার অন্য বিশ্বস্ত কর্মচারী সিরাজুলের কাছে শুনেছিল। তবে বেঁচে আছে না মরে গেছে, সে খবর জানে না। সম্ভবত বেঁচেই আছে। তথ্য জানা না থাকলে মরার চিন্তা করতে হয় না। বেঁচে থাকুক। বেঁচেই আছে। তা গিন্নির আক্কেলের কথা মনে পড়লো কেন? আহা আক্কেল ছেলেটা বড় ভালো ছিল। চাচীমা চাচীমা বলে ডাকতো তো।

মনোযোগ বিয়োগ হয়ে গেলে বই পড়া কি আর ভালো লাগে। তা সে ধর্মগ্রন্থই হোক কিম্বা আলাউদ্দীনের আশ্চর্য প্রদীপই হইক। তন্দ্রা এসে গেল। বইটা রেখে চৌকির উপর গৈড় দিল।

জানালা দিয়ে আসা ঝির ঝিরে ঠান্ডা বাতাস তন্দ্রা গাঢ় ঘুমে পরিণত হল। মানুষ নিষ্কর্মা হয়ে ঘুমিয়ে থাকলেও সময়ের ঘড়ির কাটা ঘুমিয়ে থাকে না। বেলা গড়িয়ে গেল। ঘুমের মাধ্যমে দূর্বল স্নায়ুগুলি সবল হলে মানুষের ঘুম ভেঙ্গে যায়। স্বল্পভাষী মানুষটারও ঘুম ভেঙ্গে গেল।

কি একটা কাজে বেলী কেলীর মাতা ঘরে এল। তখনকার অসমাপ্ত বাক্যটা বলার আর খেয়াল হল না। মানুষ মাত্রেরই স্মরণ শক্তি প্রবল থাকে না। সবার স্মরণশক্তি যদি প্রবল থাকত। তাহলে সংসারে অশান্তি বেশি হত।

তখনকার কথা ভুলে গেছে। বেলীর বাবা বলল, “তখন আক্কেলের কথা জিজ্ঞেস করলা, হাঁ আক্কেল বেঁচে আছে, ঢাকায় সিটি গার্মেন্টসে কাজ করে। খুব ভালো বেতন পায়।

ব্যাপারটা বেলীর মায়ের খেয়ালের মধ্যে ঢুকল না। হা করে তাকিয়ে রইল। তারপর শুধালো কোন আক্কেল?

কেন আমাদের কারখানার ছোট মেসিন চালাত। তোমাকে চাচীমা চাচীমা বলে ডাকতো। তুমি তখন শুধালে না তোমার আক্কেল টাক্কেল আছে, না নাই? তারপর তোমার কাশি উঠে, চোখমুখ উল্টে চলে গেলে।

এবার বেলীর মায়ের স্মরণকুঠুরী থেকে ব্যাপারটা বেরিয়ে এলো। কণ্ঠস্বরে জোর দিয়ে বলল, “আমি কি ঐ আক্কেলের কথা জিজ্ঞেস করেছি নাকি? ”

তবে কোন আক্কেলের কথা জিজ্ঞেস করলে?

এই তোমার, তুমি বলে খুব জ্ঞানী, বুদ্ধিমান।

হ্যা, বুদ্ধিমানই তো। তবে কিনা তোমাদের মত মহিলারা কোন দিনই বুদ্ধিমান হয় না।

এ যেন জলন্ত আগুনের উপর পেট্রলের ছিটা পড়ল। গলার দুই রগ ফুলিয়ে বলল, “কি তুমি আমাকে বোকা বলছো? ঠিক ঠিকই বলছ। বোকা বলেই তো তোমার ডজন ডজন ছেলেমেয়ের সংসার মাথায় করে ওদের তান্না সহ্য করছি।”

আহা, আহা, অত চটো কেন? তোমাকে কি আমি বোকা বলেছি নাকি? আর সংসার তো তোমারই, মাথায় তো তোমাকেই নিতে হবে। সংসার মাথায় না নিতে চাইলেও, ভয় পাওয়া শিশু যেমন তার মাকে আকড়ে জড়িয়ে ধরে, সংসারও তোমাকে জড়িয়ে ধরেই থাকবে।

পিতামাতার গরম গরম কথা শুনে টিউবী ঘরে প্রবেশ করল। ঢুকেই মাতব্বরের মত প্রশ্ন করল, মা তোমাদের কি হয়েছে? এই অবেলায় তোমরা ঝগড়া করছ ক্যান? ও ঘরে জেলী ভাবী, লোয়া চাচী, কণার মায়ের সাথে কথা বলছে, শুনলে কি বলবে।

দ্যাখনা, তোর বাপের আক্কেল, আমরা মেয়ে মানুষরা বলে বুদ্ধিমান না। কথা শুনলে গা জ্বলে উঠে না?

হ্যাঁ আব্বা তো ঠিকই বলেছে। মেয়েরা কষ্মিনকালেও বুদ্ধিমান হয় না। পুরুষরাই বুদ্ধিমান হয়, আর মেয়েরা হয় বুদ্ধিমতি।

টিউবীর কথা শুনে স্বল্পভাষী মানুষটা হা হা করে হেসে উঠল। সেই সঙ্গে বেলীর মাও।

টিউবী বলল, “বাজান হা করত।”

কেন?

আমি দেখবো তোমার আক্কেল মাড়ী আছে কি নাই।

স্বল্পভাষী মানুষটা হা করল। টিউবী মুখের ভিতর উকি দিয়ে দেখে বলল, “বুঝেছি বুঝেছি। ঐজন্য মা কথায় কথায় তোমার আক্কেল তুলে কথা বলে। আসলে তো তোমার আক্কেল মাড়ী নেই, বাজান।

ছিলোরে মা ছিল, পোকা ধরেছিল, যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে শেষে দাঁতের ডাক্তার দিয়ে দুই মাড়ীর দুইটাই তুলে দিয়েছি।

বাজান, কাল সুজা ডাক্তারের কাছে গিয়ে দুইটা আক্কেল মাড়ী লাগায়ে নিও, তাহলে মা তোমার আক্কেল তুলে কথা বলবে না।

৭ম পর্ব

স্লামালেকুম। ডাক্তার, তোমার বিরাট সাইনবোর্ডে লিখে রেখেছ, যত্ন সহকারে দাঁতের চিকিৎসা করা হয় ও দাঁত বাঁধানো হয়। তা হলে আমার দুইটা আক্কেল মাড়ী বাঁধায়ে দাও।

“আক্কেল মাড়ী বাধায়ে কি হবে? অসুবিধা কি হচ্ছে?”

“না, কোনই অসুবিধা হচ্ছে না।”

“তবে আর অকারণে ৪০০ টাকা খরচ করবেন কেন?”

“তোমার নানী প্রায়ই আক্কেল তুলে কথা বলে।”

“নানী ছাড়া আর কেউ কি বলে?”

“আর কার এমন সাধ্যি আছে যে আমার আক্কেল তুলে কথা বলবে?”

“তয় এক কাজ করবেন, নানী যখন আক্কেল তুলে কথা বলবে, তখন আপনি ঠসা আর বোবা সাজবেন।”

“ঠিক আছে এখন থেকে তোমার পরামর্শমত তাই করব।”

সমাপ্ত

রচনাকাল: ১৪/৯/৯৫, কলাবাগান, পাবনা।

*মোকছেদ আলী (১৯২২-২০০৯)। স্বশিক্ষিত। সিরাজগঞ্জ জেলার বেলতা গ্রামে জন্ম। গ্রামটি বর্তমানে নদীগর্ভে বিলীন।

About the Author:

বাংলাদেশ নিবাসী মুক্তমনা সদস্য। নিজে মুক্তবুদ্ধির চর্চ্চা করা ও অন্যকে এ বিষয়ে জানানো।

মন্তব্যসমূহ

  1. সংশপ্তক আগস্ট 13, 2010 at 5:32 পূর্বাহ্ন - Reply

    মাহফুজ সাহেব,
    আপনি চিত্রনাট্য লেখেন কি ? আপনার লেখার ধরন চিত্রনাট্যের জন্য আদর্শ ।

    • মাহফুজ আগস্ট 13, 2010 at 6:20 পূর্বাহ্ন - Reply

      @সংশপ্তক,
      সিনেমার ব্যবসায় নেমে পড়বো নাকি? ঐ ব্যবসায় সফল হতে পারবো তো?
      মোকছেদ আলী জীবিত থাকলে চলচ্চিত্র ব্যবসায় নামতে বলতাম।

      • আফরোজা আলম আগস্ট 13, 2010 at 8:16 অপরাহ্ন - Reply

        @মাহফুজ,
        চমৎকার।আপনার এই লেখায় আরো একটা নতূণ স্বাদ পেলাম।

  2. স্বাধীন আগস্ট 13, 2010 at 1:57 পূর্বাহ্ন - Reply

    মোকছেদ আলীর লেখাগুলো আমার বেশ ভাল লাগে। খুব সাধারণ ভাষায় সহজ করে বিষয়গুলো তুলে ধরেন। উনার এরকম আর কত পর্ব আছে? সবগুলো শেষ হলে একটি ই-বই বানিয়ে ফেলুন। আর যদি কোন প্রকাশক পান তবে তো কথাই নেই, বই আকারেও বের করে ফেলবেন।

    আমার নানার ছোট ভাই, (আমি নানাই বলতাম) ছিলেন এরকম একজন স্বশিক্ষিত মানুষ। উনাকে গ্রামের কেউ দেখতে পারতেন না, কারণ নামাজ/রোযা করতেন না। নিজস্ব একটি লাইব্রেরী ছিল এবং সারাক্ষন বই নিয়েই থাকতেন। কিন্তু উনি তেমন কিছু লিখে যাননি। তবে আমাকে পেলেই নানান গল্পে মেতে উঠতেন। আমাকে খুবই পছন্দ করতেন। আমি নিজেও উনার সাথে গল্প করে মজা পেতাম। শেষের দিকে দেখা যেত নানার বাড়ি যেয়ে উনার সাথেই সারা দিন/রাত কাটাতাম। নানা মারা যাবার আগে উনার লাইব্রেরীটুকু আমাকে দান করে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা বুঝে নেওয়া আর হয়নি, নানান জটিলতায়। নানা মারা যাবার পর, গ্রামে যাওয়া হয়নি। তারপর তো চলেই আসলাম বাহিরে। পরের বার দেশে গেলে বইগুলোর কি অবস্থা দেখতে হবে। আরো ভাল লাগতো যদি গ্রামে একটি লাইব্রেরী করা যেত। কিন্তু সেই ক্ষমতা হতে বহুদিন বাকি। ততদিন অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই। কিন্তু ইচ্ছেটুকু জীবিত আছে, থাকবে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন মোকছেদ আলীর লেখা কেন একটু বেশি ভাল পাই। উনার মাঝে নানার ছাঁয়া দেখতে পাই। যদি কোন সাহায্যে আসতে পারি জানাবেন। ভাল থাকুন, আর আমাদের উনার লেখা দিয়ে চলুন।

    • মাহফুজ আগস্ট 13, 2010 at 6:23 পূর্বাহ্ন - Reply

      @স্বাধীন,

      যদি কোন সাহায্যে আসতে পারি জানাবেন।

      ই-বার্তাই সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়েছি। আপাতত সেই সাহায্যটুকু করুন।

মন্তব্য করুন