পাতা ঝরার গান : পতিত শ্রমণ

By |2010-08-09T10:45:28+00:00আগস্ট 9, 2010|Categories: ব্লগাড্ডা|8 Comments


(গল্পের আগের নোট : আমি ভাই পুরা আস্তিক মানুষ। আস্তিক মানুষের ভাবনায় শ্রমণ শব্দটি প্রিয়। আস্তিকের গল্প পড়ছেন ধরে নিয়েই পড়বেন। না পড়লে সমস্যা নাই। আস্তিক মানুষের জয় হোক। )
………………………………………………………………………………………………………………………………

গারবেজ ক্যানের উপর বসে থাকি। পা ঝুলিয়ে। শির শির করে বাতাস আসে। চুলের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
হাঁটুর উপরে কাগজ রেখে আঁকিবুকি করি।একটা লম্বা আঁকাবাঁকা রেখা আঁকি। কী একটা পাতা। গোল গোল সুতোর মতো মেঘ আঁকি। আর ফুট ফুট তারা। ঝিকমিক করে ওঠে। কী হাওয়ায় দোলে।

দুএকজন লোক একটু দাঁড়িয়ে যায়। ভ্রু কুচকে দেখে। আবার চলে যায়।

এ সময় চেলসি নামের একটি মেয়ে এসে দাড়িয়েছে। হাসি হাসি মুখ। ছবির মতো। কিন্তু হাসি নেই। নিঃশব্দ।
অনেক ক্ষণ পরে গাল ফুলিয়ে বলে, আমাকে এঁকেছ? এঁকেছ আমাকে? আমার ছবিটা?

আমি আঁকছি এলানো ঢেউয়ের রেখা। তার উপরে অনেক উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি। পাখিটার একটা লেজ দেই। এতো বড়ো লেজ- আকাশ আর জল ভাইবোন গলাগলি করে হাঁটে। একটা মাছও লাফিয়ে উঠেছে।

চেলসি চলে যায়। পিছনে ফিরে দেখেনি- মাছটির চোখে একটি চাঁদের চাদের পাহাড়। আর কখনো চেলসিকে দেখিনি। পাহাড়ের গায়ে বুনো ফুল। চেলসি চলে গেছে অন্য কোথাও। অন্য কোন কারো কাছে। কোনো গাছের কাছে। অথবা নদীর কাছে। সত্যিকারের পাহাড়ের ধারে।

কে একজন ডাকাবুকো মেয়ে কি মহিলা কোমরে হাত দিয়ে দাড়াল। সোজা করে বলল, তুমি চেলসির ছবিটা আঁকনি? আঁকনি?
-কে চেলসি?
-আমার মেয়ে। তুমি আঁকনি ওর ছবি? লাল হয়ে উঠেছে মুখটি। রাতজাগা চোখ। চুলে ধুলোর কাগজ।
আমি আঁকছি- পাহাড় থেকে একটি পাথর ছিটকে পড়ছে নিচে। আলোর রোশনাই উছলে উঠেছে চারিদিকে। আর কে যেন গান গাইছে, আমি এমনি এসে ভেসে যাই..

আমার কাগজটি থাবা দিয়ে নিয়ে চলে গেল। যে যায় – সে আর ফেরে না।
অনেকদিন পরে এক বুড়ি এসে বসল আমার গারবেজ ক্যানটির পাশে। আমি লিখছি-

ইকড়ি মিকড়ি চাম চিকড়ি
চাম কাটে জমিদার
ধেয়ে এলো দামোদর-

বুড়িটা বসে রইল অনেক দুরে তাকিয়ে। চুলগুলো সাদা। চামড়া কুঁচকে গেছে।
বলল, ওগো ভালমানুষের ছেলে। চেলসি খুব হেসেছিল তোমার ছবিটা পেয়ে। খুব হেসেছিল।
-হেসেছিল কেন?
-ওর ছবিটা তুমি একেঁছ ঠিক ঠিক। কিভাবে জানলে ওকে?
-হেসেছিল কেন?
– হেসেছিল একদিন। সেই একবারই হেসেছিল। চাঁদের আলোর মতো। হাওয়ার গানের মতো। নদীর স্রোতের মতো। প্রাণের স্রোতের মতো হেসেছিল। তুমি ঠিকই চিনতে পেরেছ ওকে, হে ভালমানুষের ছেলে।

বুড়ি কথা বলে পাতা ঝরার মতো করে। কথার মধ্যে বেদনা লুকিয়ে বোনে। ফিসফিস দীর্ঘশ্বাস। বলে, এলসাকে দেখতে চেয়েছিল হাসি শেষ করে। এলসাকে পাবে কোথায়। ও দিনমানে ঘোরে পার্কে পার্কে। রাতে শেকড় ছড়িয়ে দাড়িয়ে থাকে দীর্ঘ ওক গাছের মত। শিশির ঝরে টুপটাপ। পাতা থেকে ডালে। ডাল থেকে হাওয়ায়। হাওয়া থেকে ঘাসে। ঘাস থেকে মাটিতে। ঠিক সকালে গাছটি তো আর গাছ থাকে। পাতা। ঝরা পাতা হে।

বুড়ি বলে, ওর বাবাতো মাতাল। ওটা আসল বাবা কিনা কে জানে। হা হা করে হাসে। হু হু করে কাঁদে । ফোস ফোস করে ঘুমায়। একটি পোকার মতো। খোলস পাল্টানো শুয়োপোকার মতো। চেলসি হাসতে হাসতে এলসাকে দেখতে চেয়েছিল। বলতে চেয়েছিল, মা। বাবা। নাকি বলতে চেয়েছিল, ভালবাসি। বলতে চেয়েছিল, আহ্? তুমি জান ও কাঁদতে কাঁদকে কী বলতে চেয়েছিল? কী বলার ছিল ওর?

আমি পার্কের পুরনো জুবুথুবু গার্বেজ ক্যানের উপরের বসে থাকি। একা একা। মাথা নিচু করে লিখি। লিখি-

ইকড়ি মিকড়ি চাম চিকড়ি
চাম কাটে জমিদার
ধেয়ে এলো দামোদর

বুড়িটা নেই। চলে গেছে। অথবা বুড়িটা ছিল না। একটা হুসহুসে হাওয়া ছিল। অথবা পাতা ঝরার শব্দ। মাটির শব্দ। জলের শব্দ। নৈঃশব্দের শব্দ।

About the Author:

শর্তহীন পরীমানব

মন্তব্যসমূহ

  1. আলী রেজা আগস্ট 12, 2010 at 9:31 অপরাহ্ন - Reply

    পরাবাস্তববাদী গল্প। ভাল লেগেছে।

  2. প্রদীপ দেব আগস্ট 10, 2010 at 6:39 অপরাহ্ন - Reply

    চমৎকার। ভাষা নিয়ে এমন কারুকাজ একজন নিপুণ শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব। আর শিল্পী আস্তিক কি নাস্তিক তা নিয়ে কে মাথা ঘামায়?

  3. রিমন আগস্ট 10, 2010 at 11:46 পূর্বাহ্ন - Reply

    জনাব আপনাকে অনেক ধন্যবাদ যে আপনি আস্তিক মানুষ।
    আপনার লেখার বিষয়ে পরে বলব।

  4. সংশপ্তক আগস্ট 10, 2010 at 2:21 পূর্বাহ্ন - Reply

    মনোবিজ্ঞানে , স্টিমুলির (stimuli) অবর্তমানে অামাদের পারসেপশনে অনেক অবাক করা ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে । এমনকি চেতন মনেও । স্টিমুলির প্রত্যাবর্তনে এসব অবাক করা ঘটনা আবার অদৃশ্যে মিলে যায় ।

  5. বন্যা আহমেদ আগস্ট 9, 2010 at 10:41 অপরাহ্ন - Reply

    কুলদা রায়, অপূর্ব লিখেছেন, পড়ে কিছুক্ষণ বসে ছিলাম চুপ করে। আপনার ক্ষুরধার লেখনীর কথা আগেই শুনেছিলাম, এবার তার প্রমাণ পেলাম। তবে গল্পের আগের নোটটা পড়ে হেসেছি, এটা কি মুক্তমনার নাস্তিক পাঠকদের জন্য আলাদা করে বললেন 🙂 । আমার কাছে এই আস্তিক নাস্তিকের দেওয়ালগুলো কেন যেন আজকাল আর ভালো লাগে না, এরকম গল্পের লেখকের কাছ থেকে কোন কৈফিয়তের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আশা করি আপনার কাছ থেকে আরও এরকম লেখা পাবো ভবিষ্যতে।

    • কুলদা রায় আগস্ট 9, 2010 at 10:49 অপরাহ্ন - Reply

      @বন্যা আহমেদ, একটু মজা করলাম আর কি। বিষণ্ন গল্প তো।
      আস্তিক আর নাস্তিকের সাইন বোর্ড উঁচিয়ে চলতে দেখলে আমার হাসি পায়। তাই, একটু হাসি–চোখের জল।

  6. ফারুক আগস্ট 9, 2010 at 7:35 অপরাহ্ন - Reply

    দুঃখিত , মাথার উপর দিয়ে গেল। কিছুই বুঝিনি।

    • মাহফুজ আগস্ট 9, 2010 at 11:59 অপরাহ্ন - Reply

      @ফারুক,
      অযাচিতভাবেই ঢুকে পড়লাম আপনার মন্তব্যে।

      বেশ কিছুদিন আগে লীনা রহমান প্রত্যাবর্তন নামে একটা গল্প লিখেছিলেন। গল্পটি পড়ে একজন মন্তব্য করেছিলেন- ” তেমন কিছু বুঝতে পারিনি। সমস্যার কিছু নেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, বুঝেই ছাড়ব।”

      আপনিও এমন পণ করুন।

মন্তব্য করুন