আমার ছোট মেয়েটির ছোট্ট গল্পটি

By |2010-07-27T11:31:40+00:00জুলাই 27, 2010|Categories: ব্লগাড্ডা|7 Comments

প্রজ্ঞা পারমিতার জলতল অথবা এ্যান্ডারসনের চকোলেট
কুলদা রায়


আমার ছোট মেয়ে প্রজ্ঞা পারমিতা। যেদিন বাড়িতে এলো, আমার বাগানে সেদিন বেগুন পাতায় টুনটুনিরা বাসা বানাল। ফুটে উঠল বর্ষার শেষে কয়েকটি গাদা ফুল। বড়ো মেয়ে পূর্বা ভয় পেয়ে পালিয়েছিল পালপাড়া। ফিরে এসে বোনের আঙুল ছুয়ে বলল, কী ছোটো, কী ছোটো। সারাক্ষণ এই নতুন বোনটির কাছে বসে রইল। মাঝে মাঝে মাছি তাড়াল। আগডুম বাগডুম খেলল। বোনের পাশেই ঘুমিয়ে পড়ল। আর তুলতুলে প্রজ্ঞা পারমিতা একজন সুখী মানুষের মতো হেসে উঠল খিল খিল করে।

বাসার সামনেই পুকুর। বেশ বড়ো। চারিদিকে নারিকেল গাছ। আর কয়েকটি দীর্ঘতরু- রেইনট্রি । একটি বরই গাছ বুড়ো মানুষের মতো জলের উপর ঝুঁকে আছে। ডালে ডালে অর্কিড। লাল লাল ফুল ফোটে। জলের উপরে ফুলের ছায়া পড়ে।


বড়ো মেয়েটির পিঠে দুটো ফিশিং বল বেঁধে দিলাম একদিন। সারা পুকুর জুড়ে ভেসে ভেসে বেড়াল। কিছদিন পরে ফিশিং বল দুটো খুলে ফেলল ও নিজেই। প্রজ্ঞা পারমিতা জানালা থেকে হাততালি দিল- দিদি। দিদি। দিদি।

দিদি তখন জলে থাকে। জলে ভাসে। ভাবে, সেও এক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এ্যান্ডারসনের মৎসকুমারী। বলে, বাবা দ্যাখোতো আমার পা দুটি লেজ হয়ে যাচ্ছে কিনা? বলে, মৎসকুমারী হলে তার চুল হবে সোনালী আর ঠোঁটে থাকবে সমুদ্রপাখির গান।

আমি তখন জলে জলে ঘুরে বেড়াই। সকাল থেকে সন্ধ্যে। কখনো অনেক রাত্তিরে। কখনো কচানদীতে, সন্ধ্যা, কালিগঙ্গা, বলেশ্বর, অথবা পানঘুচি নদীতে। কখনোবা সুগন্ধ্যা, কীর্তনখোলা, তেতুলিয়া, পায়রা, কালাবদরে। মাঝে মাঝে আড়িয়াল খাঁতে। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে- জল থেকে লাফিয়ে উঠছে ইলিশ। জেলে নৌকায় আচড়ে পড়ছে। কয়েকটা লাফ দিয়ে হয়ে যাচ্ছে নিথর। আহা, ইলিশ। ইলিশের যদি ডানা থাকত!


একদিন ছোটো মেয়েটি টলোমলো পায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো। একা। পেয়ারা গাছের নিচে বিউটির মা কাপড় কাচছে। তার আঁচল নিয়ে খেলল। তাঁর আঁচল মাথায় দিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। একটি শুকনো পেয়ারা পাতা ঘাস থেকে তুলল। নেড়ে চেড়ে দেখল। গুজে দিল পাকা চুলের ভিতর। দোতলার বারান্দায় ইঞ্জিনিয়ার ভাবি চাল বাছছেন। চেচিয়ে বলল, কাকী। কা-কী-ই।

আমার বড়ো মেয়ে পুকুরর পাড় ঘেসে জল ছিটিয়ে থৈ থৈ খেলছে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে। ছিটকে উঠছে জল। ঢেউ খল খল। এর মধ্যে প্রজ্ঞা এসে পড়ল। পাড় থেকে। গড়িয়ে। জলের মধ্যে। ওরা হৈ হৈ করে উঠল- প্রজ্ঞা সাঁতার শিখছে। সাঁতার শিখছে প্রজ্ঞা। জলের মধ্যে ওরা ঘিরে ঘিরে জল নিয়ে নতুন খেলা শুরু করছে।

রাতে ঘরে ফিরে দেখি, আমার স্ত্রী শুয়ে আছে। তার চোখ থেকে ঝরছে জলধারা। পিঠের আড়ালে ঘুমিয়ে পড়েছে পূর্বা অতন্দ্রিলা। ছোটটি নেই। বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠল। বলে উঠলাম, আমার কাটুস কই?

স্ত্রী কেঁদে উঠল শব্দ করে। বলল, আছে। আছে। এই দ্যাখো।

দেখি, বুকের মধ্যে কাদা হয়ে ঘুমিয়ে আছে ছোট মেয়ে প্রজ্ঞা পারমিতা। নিশ্চিন্তে। নিরাপদে। শান্তিতে। আঁচল দিয়ে ঢাকা। ঠোঁট চুক চুক করছে। ঘুমের মধ্যে হেসেও উঠছে মাঝে মাঝে। হাতের মুঠোয় একটি শুকনো পেয়ারা পাতা। পাকা চুল জড়ানো।

ওর মা বলল, বিউটির মা ফিরিয়ে এনেছে।

যদি না থাকত বিউটির মা পেয়ারা গাছের তলায়? যদি না থাকত ইঞ্জিনিয়ার ভাবি দোতলায় বারান্দায়?

একথা আমার ছোট মেয়েটির কিচ্ছু মনে নেই। এখন তার লম্ব চুল। বেনী বাঁধে। হাসে। স্কুলে যায়। বরফের উপর দিয়ে হাঁটে। পরীপাখির দিকে ফিরে গান গায় সমুদ্রপাখিদের মতো- তুম্বালা, তুম্বালা, তুম্বালাইকা।

ওর মনে আছে শুধু দেলোয়ার কাকার কথা। মুদি দোকানী দেলোয়ার কাকার চকোলেটের কথা। সারি সারি কাঁচের বয়ামের ভেতরে কাগজে মোড়ানো চকোলেট। খুব মিষ্টি। বলে, বাবা- চকোলেট না। ক্যান্ডি। ক্যান্ডি। বলো, ক্যান্ডি। য়ু আর নট স্মার্ট, ড্যাড!

বাবা কিচ্ছু জানেও না। জানে না- ও রকম মিষ্টি ক্যান্ডি আর কখনোই সে খায়নি। খেতে পারবে কি আর কখনো?


My little seeds to Flower
………………………………………………….
Progna Paromita

It was noon I gave my flower seeds to my mother and said can you plant my seeds mother please. Mother said okay progna. Then mother planted the seeds. I waited and waited. I watered it every day. After a week I saw nothing!

After a month and a half I saw a plant. I have waited 2 months for a flower and the seeds grew lots of flowers. I saw some ant and flies bothering the flower. I got angry. I squashed and smashed them. I felt better.

My father bought me a laptop. Sometimes I use my new laptop near the flower pot. My flower likes laptops and it wants one.

What should I do?

…………………………………………………………..
*গল্পটি প্রজ্ঞা পারমিতা ২০০৯ সালে লিখেছিল। তখন প্রজ্ঞা ফোর্থ গ্রেডে পড়ত।

About the Author:

শর্তহীন পরীমানব

মন্তব্যসমূহ

  1. সাইফুল ইসলাম জুলাই 29, 2010 at 5:04 অপরাহ্ন - Reply

    কুলদা রায়ের লেহা অনেক বালা পাই। লেহার মইদ্যে নদীর হোতের লাহান গতি আছে। বহুত বালা লাগে।
    আপনার লেখা ফেসবুকেও পড়েছি। সত্যি অসাধারন।

  2. বিপ্লব রহমান জুলাই 28, 2010 at 5:36 অপরাহ্ন - Reply

    অসাধারণ! :rose:

  3. সৈকত চৌধুরী জুলাই 28, 2010 at 12:49 পূর্বাহ্ন - Reply

    ভাল লাগল।
    প্রজ্ঞা পারমিতাকে অভিনন্দন। :rose2:

    অবশ্য আমার ছেলে বা মেয়ে কোনোটাই নেই। :-X

    • লাইজু নাহার জুলাই 28, 2010 at 1:57 পূর্বাহ্ন - Reply

      @সৈকত চৌধুরী,

      খুব তাড়াতাড়ি ছেলে বা মেয়ে পাবার শুভকামনা থাকল!

  4. সেণ্টূ টিকাদার জুলাই 27, 2010 at 8:54 অপরাহ্ন - Reply

    প্রজ্ঞা পারমিতা খুব সুন্দর লিখেছ।
    তাই খুব ভাল লাগল।
    কবিতা লেখ নাকি?
    আমার মেয়ে এখন ক্লাশ ফোরে পড়ে।ও বাংলায় কবিতা লেখে।
    ওর লেখা যে কবিতা গুলি আমার পছন্দ হয় না ও সেগুলিকে বলে এগুলি আধুনিক কবিতা।
    মাঝে মাঝে ভাবি ওর কিছু কবিতা এখানে প্রকাশের জন্যে মুক্তমনার এডিটর/মডারেটর সাহেবদের কে অনুরধ করি।

  5. লাইজু নাহার জুলাই 27, 2010 at 8:29 অপরাহ্ন - Reply

    ভাল লাগল!
    আমার মেয়ে নেই তবুও!
    নিজের ছোটবেলাকার কথা মনে পরে গেল!

  6. আফরোজা আলম জুলাই 27, 2010 at 4:39 অপরাহ্ন - Reply

    বড্ড মন কেমন করে উঠল। আমার ও দুই’মেয়ে কীনা ।

মন্তব্য করুন