গণিতে অন্তর্জ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা ২

By |2010-07-29T23:38:23+00:00জুলাই 18, 2010|Categories: গণিত, দর্শন, যুক্তিবাদ|1 Comment

অঁরি পোঁকারের Intuition and Logic in Mathematics থেকে অনুবাদ

ফরাসী গণিতবিদ পোঁকারে বিখ্যাত পোঁকারে অনুমানের জন্য সবচেয়ে পরিচিত, কিন্তু তিনি গণিতের বহু শাখায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। অনুদিত প্রবন্ধটি ১৯০৫ সালে লেখা বিজ্ঞানের মূল্য বইয়ের অন্তর্ভুক্ত। প্রবন্ধের ইংরেজী অনুবাদ, যেখান থেকে এই বাংলা অনুবাদ করা হচ্ছে, ইন্টারনেটে সহজলভ্য।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল, প্রাচীন গণিতবিদদের লেখা পড়লে তাদের সবাইকেই অন্তর্জ্ঞানবাদী বলে ঠাহর হয়। কিন্তু মানবপ্রকৃতি অপরিবর্তনশীল, কাজেই আমাদের শতাব্দীতে এসে হঠাৎ করে যুক্তিবাদী মনের আবির্ভাব ঘটেছে তা নিশ্চয়ই নয়। আমরা যদি ওই সময়কার প্রচলিত ভাবধারার প্রেক্ষিতে চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব এই প্রাচীন জ্যামিতিবিদদের অনেকেই গুপ্ত analyst ছিলেন। ইউক্লিড এর উদাহরণ হতে পারেন। তিনি যে বৈজ্ঞানিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন তার মধ্যে তাঁর সমসাময়িক বিজ্ঞানীরা কেউ কোন ভুল ধরতে পারেননি। এই বিশাল কাঠামোর ছোট ছোট অংশগুলিতে অন্তর্জ্ঞানের ব্যবহার থাকলেও, সবটা মিলিয়ে একজন যুক্তিবাদীর হাতের ছাপ এই এতদিন পরেও চিনতে ভুল হয় না।

মন নয়, পরিবর্তন হয়েছে চিন্তাপদ্ধতির — অন্তর্জ্ঞানবাদীরাও আছেন আগের মতই, কিন্তু তাঁদের পাঠকেরা আগের দিনের তুলনায় যুক্তির চর্চা একটু বেশিই প্রত্যাশা করেন।

এই বিবর্তনের কারণ কি? কারণ সোজা। অন্তর্জ্ঞান না দিতে পারে নিশ্চয়তা, না দিতে পারে নিশ্ছিদ্র প্রমাণ, এবং এটা ধীরে ধীরে খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করা গেছে। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। আজ আমরা জানি, এমন অবিচ্ছিন্ন ফাংশন আছে যার কোন ডেরিভেটিভ নেই। যুক্তিজাত এই সত্য অন্তর্জ্ঞান দিয়ে হজম করা দুষ্কর। আমাদের পূর্বপুরুষেরা বলতে দ্বিধা করতেন না, “প্রত্যেক অবিচ্ছিন্ন ফাংশনের যে ডেরিভেটিভ আছে এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট, কারণ প্রত্যেক curve এর একটি স্পর্শক রয়েছে”।

স্পর্শক

অন্তর্জ্ঞান এ ব্যাপারটায় ভুল করল কেন? এর কারণ, আমরা যখন একটা curve মনশ্চক্ষে দেখার চেষ্টা করি, তখন সেটাকে কিছুটা প্রস্থ সহই কল্পনা করি। ঠিক তেমনি আমরা যখন সরলরেখা কল্পনা করি, তখন আয়তাকার ফিতা হিসেবে কল্পনা করি। আমরা জানি যে রেখার কোন প্রস্থ নেই, কল্পনায় ফিতাটিকে পাতলা করবার চেষ্টা করতে থাকি, কিন্তু যতই চেষ্টা করিনা কেন, একেবারে শূন্য প্রস্থে কল্পনা পৌঁছাতে পারেনা। ফলে মনশ্চক্ষে এই দুই পাতলা ফিতাকে আমরা দেখতে পাই, একটি সোজা একটি বাঁকা, পরস্পরের ওপর উঠে আছে কিন্তু কেউ কাউকে অতিক্রম করেনি। যদি নিশ্ছিদ্র analysis এর সাহায্য না নিই, তবে এই চিন্তা আমাদের এই উপসংহারে নিয়ে যাবে যে প্রত্যেক curve এর একটি স্পর্শক রয়েছে।

আমি দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে নেব ডিরিকলেট নীতিকে, যার উপর গাণিতিক পদার্থবিদ্যার বহু তত্ব নির্ভরশীল। ইদানিং আমরা এই নীতিকে প্রমাণ করি অতি দীর্ঘ কিন্তু নির্ভুল যুক্তির সাহায্যে, কিন্তু আগে সংক্ষিপ্ততর প্রমাণে কাজ চালানো হত, প্রমাণটা এরকম — যেকোন ফাংশনের উপর নির্ভরশীল একটি সমাকলনের মান কখনও শূণ্য হতে পারেনা, অতএব এর একটা নিম্নতম মান থাকবে। আজ এই যুক্তির দুর্বলতা সহজেই চোখে পড়ে, কারণ ফাংশন একটি শক্তিশালী বিমূর্ত ধারণা, এবং সবচেয়ে সাধারণীকৃত অর্থে “ফাংশন” ব্যবহার করলে যে অনেক ধরণের জটিলতার উদ্ভব হয় এতথ্যের সাথেও আজ আমরা পরিচিত।

কিন্তু এই দুর্বলতা এত সহজে দৃষ্টিগোচর হত না, যদি আমরা, উদাহরণস্বরূপ, এই ফাংশনকে একটা তড়িৎ পটেনশিয়াল হিসেবে গণ্য করতাম। তখন এই দাবী যুক্তিসংগত ঠেকত যে বৈদ্যুতিক ভারসাম্যে উপনীত হওয়া সম্ভব। তারপরও হয়ত এই পদার্থবিদ্যা সঞ্জাত উদাহরণ সন্দেহের উর্দ্রেক করত। কিন্তু ধারণাটিকে জ্যামিতির ভাষায় লিখলে (মনে রাখতে হবে জ্যামিতি হচ্ছে পদার্থবিদ্যা আর analysis এর মাঝামাঝি এক ভাষা) এই সন্দেহের উর্দ্রেক হয়ত হত না, এবং আগে থেকে না জানলে এই ভাসা ভাসা প্রমাণটি অনেক পাঠক হয়ত হজম করে ফেলতেন।

অতএব, অন্তর্জ্ঞান আমাদের নিশ্চয়তা দিতে পারেনা। কাজেই যে বিবর্তনের কথা বলছিলাম সেটা অবশ্যম্ভাবী ছিল। এখন দেখি এই বিবর্তন কিভাবে ঘটেছে।

এটা প্রথমেই বোঝা গিয়েছিল যে যুক্তির কঠোরতার জন্য চাই সংজ্ঞার সুস্পষ্টতা। আগে এই সুস্পষ্টতা ছিলনা, গাণিতিক ধারণাগুলির জন্য কল্পনা বা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মোটামুটি ভাবে একটা আঁধাখেঁচড়া কাঠামো দাঁড় করানোই যথেষ্ট মনে করা হয়েছিল, যুক্তি প্রয়োগের জন্য যে স্পষ্টতার প্রয়োজন সেটার অভাব ছিল। যুক্তিবাদীদের প্রথম কাজ ছিল এই সমস্যাটার মোকাবেলা করা।

ইরেশনাল সংখ্যার ক্ষেত্রে এটি ঘটেছে। একই ভাবে কন্টিনিউটির ধারণা, যেটির উৎপত্তি অন্তর্জ্ঞানে, অবশেষে পূর্ণ সংখ্যা বিষয়ক বহু অসমতার এক জটিল কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়।

একই ভাবে লিমিট নেওয়া বিষয়ক অস্পষ্টতা, শূণ্য বা প্রায়-শূণ্য সংখ্যাবিষয়ক অস্পষ্টতাও অতীতের বিষয়। আজকের analysis এ অবশিষ্ট আছে শুধু পূর্ণ সংখ্যা, অথবা পূর্ণ সংখ্যা বিষয়ক অসংখ্য সমতা ও অসমতার জটাজাল। অন্য কথায়, যেমনটা অনেকেই বলে থাকেন, গণিত এখন একপ্রকারের পাটিগণিত।

চলবে…

About the Author:

ঘন বরষা

একটি মন্তব্য

  1. রামগড়ুড়ের ছানা জুলাই 19, 2010 at 3:29 পূর্বাহ্ন - Reply

    আপনার অনুবাদের হাত ভালো,চালিয়ে যান। :rose2:

    লেটেক ঠিকমত কাজ করছেতো? লেটেকের ব্যবহার নিয়ে একটি পোস্ট লিখে ফেলেন, খুব ভালো হবে।

মন্তব্য করুন