বেদনার নীল

By |2010-07-16T07:25:11+00:00জুলাই 16, 2010|Categories: ই-বই, গল্প|8 Comments

বেদনার নীল

এখানকার তথাকথিত নিচু শ্রেণীর লোকদের সাথে আমার সম্পর্কটা বেশ জমে উঠেছে। কেননা আমি ওদের মত নই, যারা গরীবদের কাছে গিয়ে তাদের দুরবস্তা নিয়ে ঠাট্রা করে তাদের বেদনা আরও বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য আমি জানি পৃথিবীর ধনী-গরীব এক হবার নয় এবং ওদের দুঃখ-কষ্টও ঘুচবার নয়; কারণ আমাদের সাথে সাথে প্রকৃতিও এই দুই শ্রেণীর মাঝে একটা হিম শীতল ব্যবধান বাঁচিয়ে রেখেছে। তবে আমি মনে করি যারা আত্মসম্মানের খাতিরে গরীব অন্ত্যজদের কাছ থেকে দূরে থাকে তারা সেই সব কাপুরুষদের মতই হীন, যারা পরাজয়ের ভয়ে শত্রু থেকে দূরে লুকিয়ে থাকে।

সম্প্রতি একদিন আমি মাঠে গিয়েছিলাম। দেখি একজন বয়স্ক লোক বোঝা ওঠাতে পারছেনা। আমি কাছে যেতেই লোকটা কেমন সংকোচ বোধ করল; আমি জোর করে বোঝা উঠিয়ে দিলাম। বাবুদের মত ঠক করে ধন্যবাদ না দিলেও তার চোখে মুখে যে বিনয়ের ছাপ ফুটে উঠলো তাতে মনে হল আমি তার দেবতা।

সব মিলিয়ে আমি কিন্তু বর্তমানে বেশ সুখি; তারপরও মনটা কেমন জানি পালাই-পালাই করছে । ইচ্ছে করছে কিছুদিনের জন্য দূরে কোথাও হারিয়ে যাই। সত্যি বলতে মানুষের এই মেপেজুখে চলা আমার আয়ত্বের বাইরে; একঘেয়ে সুখকেও ঠিক মেনে নিতে পারিনা। তাই হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলাম, সিলেট যাব। নতুন পরিবেশে নিজেকে নতুন করে জানা হবে। সবকিছু প্রায় ঠিকঠাক, শুধু খারাপ লাগছে ঐ ঝুনু পাগলিটার জন্য। এখানকার সকলের চেয়ে ও আবার আমাকে একটু বেশিই ভালবাসে। বর্তমানে পাগলিটাও আমার কাছে বিশেষ কেউ হয়ে উঠেছে। পৃথিবীতে যত কোটি মানুষ ঠিক তত কোটি ভাষা আছে, আর তা হল চোখের ভাষা। মুখের ভাষায় আমরা সহজে পটি আর চেখের ভাষায় হয়ে পড়ি অসহায়। আমাকে ও বেঁধেছে চোখের ভাষায়। যে আমি ফুটন্ত জ্যোস্নার মধ্যো দিয়ে হেঁটে গেছি অনুভূতিহীন, রঙধনু মাখানো সন্ধ্যায় ঘুমিয়েছি আয়েশ করে, বহুবার হাতে নিয়েও পড়তে পারিনি শেষের কবিতা, Sunflower দেখতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি অসময়ে, সেই আমি রাস্তার নোংরা এক পাগলীর ভালবাসাকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছি নিজের অজান্তেই- পৃথিবীর অনেক কিছু জানলাম, নিজের মনকে জানা হল না আজো !

বলতে দ্বিধা নেই, পাগলিটাকে বেশ আমি আপন করে ফেলেছি যদিও তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানিনা। লোক মুখে শুনেছি বছর বিশেক আগে ও এ অঞ্চলে এসেছে তারপর আর কোথাও যায়নি। হাঁটার সময় পুঁটলির ভিতর ঝুন্-ঝু্ন্ করে কি যেন একটা বাজে এজন্য সকলে ওকে ঝুনু পাগলি নামেই ডাকে। এতদিনেও একটা জিনিস আমি বুঝলাম না – ছোট বাচ্চাদের দেখলেই ও কেমন জানি ছটফট করে। এইতো সেদিন রাস্তা থেকে একটা বাচ্চা তুলে নিয়ে পালাচ্ছিল, লোকজন তো মেরেই ফেলতো, শেষমেষ আমি হয়ে রক্ষা। এর আগেও ওকে আমি এমন ঘটনার হাত থেকে বেশ কয়েকবার বাঁচিয়েছি। হয়ত তারই জন্যে ও আমাকে এত ভালবাসে। আমার চলে যাওয়াটা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছেনা। জামা কাপড় গোছগাছ দেখে ভেবেছে আমি ওকে চিরদিনের জন্যে ছেড়ে যাচ্ছি। পাগলি তো তাই কোন কথাই বোঝানো গেলোনা, অভিমান করে ইনিয়ে-বিনীয়ে কি যেন সব বলে গেল!

ভোর ছ’টায় ট্রেন; তৈরী হচ্ছি এমন সময় একটা বাচ্চা ছেলে এসে বলল-“ঝুনু পাগলিটা Road Accident করেছে”। আমি আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলাম না। সংগাহীন এক ভালবাসার টানে ছুটে গেলাম তার লাশের পাশে। মনের অজান্তেই কয়েক ফোটা অশ্রু মিশে গেল রক্তে।

একি দুর্ঘটনা নাকি স্বেচ্ছায় হনন? আচ্ছা ওতো আমাকে প্রচন্ড ভালবাসতো, এমনতো হতে পারে আমি চলে যাচ্ছি বলেই… নাকি এটা আমার দুর্বলতা! মাঝবয়সী এক লোক ওর এতদিনের সযত্নে লালন করা পুঁটলিটা ঝেড়ে ফেলল; বের হয়ে আসলো বাচ্চা ছেলের কয়েকটা পোষাক, একটা ঝুমঝুমি ও একটা ফটো, কিন্তু একি দেখছি! এতো আমার-ই বাল্যকালের ছবি তাহলে কি এই পাগলিটাই আমার…! তাই বা হয় কি করে আমার মা’তো মারা গেছেন অনেক আগে। আর দেরি না করে চলে আসলাম বাবার কাছে; ছবিটা দেখা মাত্রই কেমন যেনো মুষড়ে গেলেন তিনি। অতঃপর চলে গেলেন অন্য এক জগতেঃ “ কলেজে আমাদের প্রথম পরিচয়; ঘটনাচক্রে আমাদের ঘনিষ্টতা আড়ালে আবডালে আলোচনা-সমালোচনার বেশ জনপ্রিয় বিষয়ে পরিনত হয়। দুটি ভিন্ন সপ্রদায়ের এই সখ্যতা যেন সমাজের মাথা ব্যঁথার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরাও যেনো সমাজকে ভুল প্রমানিত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলাম। এক পর্যায়ে আমরা পরস্পরকে ধর্ম, সামাজিক রীতি-নীতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা সবকিছু ছাড়িয়ে ভাবতে থাকি; যদিও জানতাম, দুটো মানুষ একটা পরিবার তৈরি করতে পারে, একটা সংসার তৈরি করতে পারে কিন’ কখনো একটা সমাজ তৈরি করতে পারে না। সমাজ মানেই অনেকের সমষ্টি, দুইজন মিলে একাধিক হওয়া যায় অনেকে হওয়া যায় না। কিন্তু সেই সময়টাই ছিল এমন যেন আমরা কোনকিছুতেই দমবার পাত্র নই; বলা যেতে পারে ‘লাভ ইন লাভ’। সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ে করার, সমাধানটা হল এমন – একদিকে মসজিদ অন্যদিকে মন্দির মাঝখানটা একান্তই দুজনার, তৃতীয় কোন ইস্যু থাকবেনা সেখানে । বেশ ভালই কাটছিল; তারপর জন্ম হল তোমার। তোমার আগমনে বেশ কিছু নিয়মেরও পরিবর্তন জরুরী হয়ে উঠল। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি হলাম না। আমি চাই তুমি বড় হয়ে আমার অনুসারী হবে, শিপ্রা চায় তার। শুরু হল কলহ, বিশৃংখলা। এক পর্যায়ে আমি আশ্রয় নিলাম পুরুষত্বের, সবকিছু একবাক্যে নস্যাৎ করবার সর্ব শক্তি যেখানে নিহিত। যে ক্ষমতা পরিবর্তনে ধর্ম পরিবর্তিত হয় সেখানে শিপ্রা তো একজন নারী ! তাই জোর খাটিয়ে বললাম, হয় তুমি আমার সব কথা মেনে চলবে নতুবা সংসার ছাড়বে। শিপ্রা আমার কাছে আশ্রয় চেয়েছিল একজন মানুষ হিসাবে নই একজন হিন্দু হিসাবে, কিন্তু আমি ততদিনে সর্বাংশে একজন সমাজের কেউ; সমাজস্থ কিছু লোকের প্ররোচনায় শিপ্রাকে মারধর করে বাড়ী থেকে বের করে দিলাম। বছর খানেকের মাথায় নিজের ভুল বুঝতে পেরে শিপ্রাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করি। এক সময় দেখা পেলেও কোন লাভ হয়নি কেননা ততোদিনে সে এক বদ্ধ উম্মাদ…! তাই অনেকটা ভেবে চিন্তে এবং তোমার অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে এতদিন তোমাকে আমি মিথ্যে বলে এসেছি। ইনিই তোমার গর্ভধারিনী…..!”

আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। পায়ের তলার মাটি যেন সরে সরে যাচ্ছে। বিশাল এক ভূমিকম্প বয়ে যাচ্ছে সমস- দেহে। টলতে টলতে নেমে আসলাম রাজপথে। দুই আঙ্গুলের মাঝখানে জমে থাকা নীল বর্ণের রক্ত দেখে মাথার ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল। দৃষ্টি মেলে দিলাম শূণ্যেঃ চারিদিকে শুধু নীল আর নীল;- আমার বেদনার নীল।

০১/০১/২০০৩; ড্রিমল্যান্ড, পি.টি.আই. রোড, কুষ্টিয়া।

জন্ম সন : ১৯৮৬ জন্মস্থান : মেহেরপুর, বাংলাদেশ। মাতা ও পিতা : মোছাঃ মনোয়ারা বেগম, মোঃ আওলাদ হোসেন। পড়াশুনা : প্রাথমিক, শালিকা সর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শালিকা মাদ্রাসা। মাধ্যমিক, শালিকা মাধ্য বিদ্যালয় এবং মেহেরপুর জেলা স্কুল। কলেজ, কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন। স্নাতক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি অনার্স, ফাইনাল ইয়ার)। লেখালেখি : গল্প, কবিতা ও নাটক। বই : নৈঃশব্দ ও একটি রাতের গল্প (প্রকাশিতব্য)। সম্পাদক : শাশ্বতিকী। প্রিয় লেখক : শেক্সপিয়ার, হেমিংওয়ে, আলবেয়ার কামু, তলস্তয়, মানিক, তারাশঙ্কর প্রিয় কবি : রবীন্দ্রনাথ, জীবননান্দ দাশ, গ্যেটে, রবার্ট ফ্রস্ট, আয়াপ্পা পানিকর, মাহবুব দারবিশ, এলিয়ট... প্রিয় বই : ডেথ অব ইভান ঈলিচ, মেটামরফোসিস, আউটসাইডার, দি হার্ট অব ডার্কনেস, ম্যাকবেথ, ডলস হাউস, অউডিপাস, ফাউস্ট, লা মিজারেবল, গ্যালিভার ট্রাভেলস, ড. হাইড ও জেকিল, মাদার কারেজ, টেস, এ্যনিমাল ফার্ম, মাদার, মা, লাল সালু, পদ্মা নদীর মাঝি, কবি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিলে কোঠার সেপাই, ভলগা থেকে গঙ্গা, আরন্যক, শেষের কবিতা, আরো অনেক। অবসর : কবিতা পড়া ও সিনেমা দেখা। যোগাযোগ : 01717513023, [email protected]

মন্তব্যসমূহ

  1. সাইফুল ইসলাম জুলাই 17, 2010 at 4:38 অপরাহ্ন - Reply

    আপনি তো আরও অনেক ভালো লিখতে পারেন নিঃসন্দেহে।অনেক ভালো হয়েছে কিন্তু আপনি আরো ভাল লেখেন। আমার মনে হয়েছে এটা আপনার মত হয় নি। 🙂 সুতরাং আরও ভালো কিছু লিখে ছাপান তো দেখি তাড়াতাড়ি। 😀

    • মোজাফফর হোসেন জুলাই 18, 2010 at 12:29 পূর্বাহ্ন - Reply

      @সাইফুল ইসলাম, জেনে ভালো লাগলো। চেষ্টা করবো অবশ্যই। ধন্যবাদ।

  2. মাহফুজ জুলাই 17, 2010 at 11:08 পূর্বাহ্ন - Reply

    বরাবরের মতই ভালো লাগলো।
    লেখার সর্বনিম্নে দেখলাম পিটিআই রোড, কুষ্টিয়া। প্রায় সাত বছর আগের লেখা।

    আপনি তো দেখছি লালনের এলাকার। এই অঞ্চলকে সাংস্কৃতির রাজধানী বলা হয়। সেই অঞ্চলের মানুষের নিকট থেকে তো ভালো জিনিস পাবোই, তাই না?

    মুক্তমনায় বেশ কয়েকজন আছেন গল্প, কবিতার সমঝদার। তাদের মধ্যে আফরোজা আলম এবং লাইজু নাহার অন্যতম। কোনো গল্প কবিতা পোষ্ট হলেই তারা মন্তব্য করবেনই। আমারও ভালো লাগে তবে তাদের মত এত নিবেদিত প্রাণ হতে পারিনি। চেষ্টা করছি।

    • মোজাফফর হোসেন জুলাই 18, 2010 at 12:27 পূর্বাহ্ন - Reply

      @মাহফুজ, হ্যা আপনি যথার্ত বলেছেন। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। । ভালো থাকবেন

  3. আফরোজা আলম জুলাই 16, 2010 at 12:46 অপরাহ্ন - Reply

    খুব ভালো লাগলো,তবে লাইজু নাহার এর সাথে আমি ও একমত।

    আপনাকে একটা কথা বলবার আছে,
    আপনি প্রায়শঃ লেখা দিয়ে চলে যান।আরো বাকী লেখকদের লেখা পড়েন কিনা জানিনা,তবে মন্তব্য দেখিনা। এই ব্যপারটা খেয়াল করবেন।সবাই সবার লেখায় কিছু না কিছু ভালো লাগা মন্দ লাগা মন্তব্য করুক আশা করে। আশা করি ভুল বুঝবেন না।

    • মোজাফফর হোসেন জুলাই 17, 2010 at 12:51 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আফরোজা আলম, ধন্যবাদ আপু। আসলে আমি নেটে বসার সময় খুব কম পাচ্ছি। প্রায় দুই মাস ধরে পরীক্ষা দিচ্ছি। কাল শেষ হবে। আবার পরীক্ষার মাঝেই শাশ্বতিকীর অনুবাদ সংখ্যার কাজ করছি। এটা আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশ করতে হবে। জানেন, আমি এই এক মাস হল ঘুম কাকে বলে ভুলে গেছি-খুব অসুস্থ মনে হচ্ছে নিজেকে। পড়াতে আমার ক্লান্তি নেই। মুক্তমনার অনেক লেখায় পড়ি তবে সেটা পিসিতে কপি করে অফলাইন থেকে। দিনে নেটের লাইন থাকে না বলে অনেক সময় ইচ্ছে হলেো কমেন্ট করতে পারিনা।

      তবে পরের মাস থেকে মুক্তমনার লেখকদেরকে কমেন্ট করে জালিয়ে মারব আশা করি।
      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

  4. লাইজু নাহার জুলাই 16, 2010 at 3:29 পূর্বাহ্ন - Reply

    ভাল লাগল!
    মাঝে কিছু সংলাপ থাকলে মনে হয় আরও প্রানবন্ত হোত।

    • মোজাফফর হোসেন জুলাই 17, 2010 at 12:33 পূর্বাহ্ন - Reply

      @লাইজু নাহার, ধন্যবাদ। আপনার সাথে আমি একমত। এটা অনেক আগে লেখা, দেখি এডিট করতে পারি কিনা !

মন্তব্য করুন