ফানুস ২ খন্ড( ৭১ দিনলিপি)

[পর্ব-১০]

দেশভাগের বেশ কিছু পরে একজন সাদামাটা নিরীহ মানুষ দুই সন্তান সহ এই পূব অঞ্চলে পা রাখেন। দু’চোখে তাঁর বেঁচে থাকার স্বপ্ন। মনে বড় আশা এই স্বল্প মাইনের চাকরি হয়তো তাঁর একটা নিঃশ্চিন্ত জীবন দেবে।তাঁর অভাবি সংসার হলেও স্বস্তি পাবেন।
চারিদিকে বন জঙ্গলময় নারায়নগঞ্জ শহর তখন এমনই ছিল। এখনকার মত যাতায়াতের সুব্যবস্থা ছিলনা।
অবিভক্ত ভারতের দাঙ্গা হাঙ্গামায় যখন সবার জীবন বিপর্যস্ত, নেহেরুর মত মানুষদের জন্য ছিল বিরাট সাফল্য। আর ক্ষুদিরামের মত নির্বোধ তরুণদের জন্য ছিল ফাঁসিকাষ্ঠ।সূর্য সেন ,প্রীতিলতার জীবন যেন তৈরী ছিল ফাঁসির মঞ্চে আত্মাহুতি দেবার জন্য।

এই সাদামাটা মানুষটি ভেবেছিলেন,একদিন সব ভেদাভেদ ঘুঁচবে। দেশে যখন স্ব-রাজ হবে,ইংরেজ যখন চলে যাবে তখন হয়তো সবার মুখে হাঁসি ফুটবে।
আস্তে আস্তে তাঁর ধারণা পালটে গেল। তিনি দেখলেন যারা বলবান তারা আরো বলশালী হয়েছে। দূর্বলকে কেবল নিপীড়িত হতে হয়েছে। রাজনীতির নামে চিরস্থায়ী করে রেখে গেল ইংরেজরা হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা।
স্ত্রী আর সন্তানকে গ্রামের বাড়িতে রেখেও শান্তি হলনা।
চাকরি ক্ষেত্রেও দেখতে লাগলেন বৈষম্য। মাথা তাঁর নতজানু থেকে আরো নতজানু হতে শুরু করল।
স্ত্রী সন্তানদের কোলকাতায় এনে মানুষ করার স্বপ্ন তাঁর ধুলিস্যাত হয়ে গেল।
পিছুটানকে দূরে ঠেলে মনের মধ্যে একরাশ আশার আলো নিয়ে তিনি পা রাখলেন পূর্বপাকিস্তান নামক পূর্ব অঞ্চলে।
বড় ভাই তার আগেই এসেছিলেন এই অঞ্চলে। তিনি দুই কামরা বিশিষ্ট একটা বাড়ি নিয়েছিলেন। ছোটভাই বড়ভাইকে পত্রযোগে জানিয়েছিলেন যে তিনি আসছেন স্ব-স্ত্রীক।
বাড়িটায় পা রেখে তিনি কিছুটা হকচকিয়ে গেলেন। দেখেন বাড়িতে বিরাট একটা তালা ঝুলছে। ভাবলেন ভুল ঠিকানায় এলামনা তো? ঠিকানা মিলিয়ে একে-তাকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলেন,নাহ ভুল ঠিকানায় তিনি আসেননি। তবে বড় ভাইয়ের তো থাকার কথা ছিল।
শুরু হলো অপেক্ষার পালা। এক সময় ক্লান্ত অপরাহ্নে দেখা পেলেন বড় ভাইয়ের। রৌদ্র যখন চৌকাঠ পেরিয়ে উঠোনে ম্লান আলো ফেলেছে।
তিনি তালা খুলতে লাগলেন আর আপন মনে কি বিড় বিড় করে বকে গেলেন তা ছোটভাইয়ের বোধগম্য হলনা। তিনি শুধু নিঃশ্চিন্ত হলেন, একটা আশ্রয় তো পাওয়া গেল।

রাত্রে স্ত্রীর পুঁটুলিতে থাকা অবশিষ্ট যা খাবার ছিল তা খেয়ে চাটাই বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন সন্তানদের নিয়ে।
আর কল্পনা করতে লাগলেন অনাগত দিনের সূচনা করবেন কী করে?

শাহপুর নামের গ্রামে মুর্শিদাবাদ জেলায় ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত একটা প্রাইমারি স্কুল ছিল। সেখানে পড়া শেষ করলে তাঁর বাবা বেশ দূরে এক সদরে পাঠালেন পড়াশোনা করতে। জায়গীর থেকে পড়াশোনা খুব কষ্টকর।
ঐ বাড়িতে খাবার দাবারেও ছিল কৃপণতার ছোঁয়া। তিনি কষ্টে থাকলেও তাঁর বাবাকে বলেননি কোনদিন এই কথা। এমন কষ্টে স্কুল জীবন পার করে কোলকাতায় পাড়ি দিলেন কলেজে পড়ার উদ্দেশ্যে।
ভর্তি হলেন যে কলেজটায় তার নাম “ইসলামিয়া কলেজ”। বাসস্থান হল “বেকার হোস্টেল” নামে হোস্টেলে।

[পর্ব-১১]

তারপর লেখাপড়ার জীবন শেষ করে গ্রামে বসে থাকা তাঁর কাছে সমীচীন মনে হলনা। তিনি কোলকাতায় এক আত্মীয়ের বাসায় উঠলেন।
ইংরেজি স্টেটসম্যান কাগজে কর্মখালি দেখে তাঁর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নোট বুকে লিখে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির দরখাস্ত পাঠাতে লাগলেন।
ব্রিটিশ শাসনে একটা চাকরি পাওয়া দুরুহ ব্যাপার ছিল। এমন পরিস্থিতিতে তিনি অন্ধকার দেখলেন। সুন্দর সুদর্শন স্বাস্থ্যবান আবার অন্য ধর্মীয়দের সাথেও তাঁকে প্রতিযোগিতা করতে হবে। তাঁর কোনো মামা চাচার জোর নাই। ইন্টারভিউ বোর্ডে যে ভালো করবে সেইই চাকরি পাবে। তখন এখনকার দিনের মত চাকরির ক্ষেত্রে এতো কলুষিত হয়ে ওঠেনি।

তাই জ্ঞান আর মনোবল সম্বল করে ঐ যুবক মনেমনে নিজেকে তৈরী করতে লাগলেন। বেশ কয়েক জায়গা থেকে ইন্টারভিউয়ের ডাক এলো। দৃঢ় মনোবল নিয়ে তিনি ইন্টারভিউ বোর্ডের মুখোমুখি হলেন।
এর মধ্যে ডেপুটি একাউটেন্ট জেনারেল পোষ্ট এন্ড টেলিগ্রাফ,চীফ একাউটেন্টস অফিসার ইস্ট ইন্ডিয়া রেইলওয়ে থেকে আসল।
তিনি ইন্টারভিউতে বেশ ভালো করলেন। তবু মনে সংশয় কাটেনা কী জানি কী হয়।
সেই সময় তাঁর জীবনে চাকরি মানে অনেককিছু। এর মাঝে বাড়ির টাকা ক্রমশঃ শেষ হতে চলল। তিনি দেখতে গৌর বর্ণের না হলেও উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ,সুঠাম,ছিপ ছিপে দেহ,নিয়মিত ব্যায়ামে পুষ্ট ছিলেন।

ক’দিন পরে সকালে নাস্তা খেয়ে বাইরে বের হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, এমন সময় এক সাথে থাকা বন্ধু একজন তাঁকে একটা খাম এনে হাতে দিল।
খামের উপরে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেইলওয়ের মনোগ্রাম। তড়িঘড়ি খাম খুলে চিঠি পড়ে নিলেন।
বিশ্বাস করতে পারছেন না যে চাকরি হয়েছে। আবার দুই চোখ কচলিয়ে নিয়ে দেখলেন, নাহ ভুল না,ঠিকই দেখছেন। ইস্ট ইন্ডিয়ান রেইলওয়েতে তাঁর চাকরি, এবং পোস্টিং লক্ষ্ণৌতে, মাসিক বেতন একশো টাকা।
তাঁর মনে হল পাহাড় জয় করেছেন।আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন।

হঠাৎ মনে হল তিনি বঙ্গ সন্তান,উর্দূ ,হিন্দি কিছুই জানেন না, কেবল “কাঁহা যাতা হ্যায় , কাঁহা খাতা হ্যায়” ছাড়া কিছুই জানেন না।
এই বিদ্যে নিয়ে খাঁটি উর্দূ ভাষা-ভাষী দেশে কি করে চলবে। তবু মনের মধ্যে আনন্দের তুফান।বেশি সময় নেই শীঘ্রই চাকরিতে যোগ দিতে হবে।

হাওড়া ষ্টেশন থেকে জেনে নিলেন দেরাদুন এক্সপ্রেস ট্রেনটা ছাড়ে বেলা সাড়ে নয়টায়। সুতরাং তাঁর বাসা থেকে আট’টায় রওয়ানা হন বাক্স প্যাটরা নিয়ে। ট্রাম ধরে ষ্টেশনে আসতে সাড়ে আট’টা বেজে গেল। তাড়াতাড়ি টিকিট করে প্ল্যাটফর্মে এসে দেখেন ট্রেন লেগে আছে। কিন্তু, প্যাসেঞ্জারে একেবারে ভর্তি।
হতাশ হয়ে গেলেন এমন অবস্থায় উঠবেন কী করে? এমন সময় সম্ভবতঃ একবিহারী কুলী এসে জিজ্ঞেস করল,
–বাবুজী আপ কাঁহা যাইয়ে গা?
জানালেন এই ট্রেনেই উঠবেন তিনি। কুলী বললো,
–“আপ ঘাবরাইয়ে মাত, হাম আপকো উঠা দেঙ্গে, মাগার এক চৌ আনি লাগেগা”
তিনি বলেন, –“ কেনো? যেখানে গভর্নমেন্ট চারপয়সা কুলীর ভাড়া ঠিক করে দিয়েছে সেখানে কেন চার আনা লাগবে?” কুলী বলে,
–“ বাবুজী,পেহলে মেরা কাম দেখিয়েগা,উসকা বাদ পয়সা দিজিয়ে গা”

[পর্ব-১২]

ওদিকে লড়াইয়ের ডামাডোল বাজারে। সেপ্টেম্বর মাসের ৯ তারিখ মদমত্ত হিটলারের একনায়কতন্ত্র, অপর দিকে সাম্রাজ্য বাদ। হিটলারের পদধ্বণীতে সারা দুনিয়া কম্পমান। ভয়ে সবাই পথ ছেড়ে দিচ্ছে।
পোল্যান্ড,যুগস্লাভিয়া,বুলগেরিয়া নিঃশব্দে পথ ছেড়ে দিল। পেছনে শত্রু রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয় বলে জার্মানি থেকে সমস্ত ইহুদী হয় মেরে ফেলল,নয়তো বিতাড়ন করে দিল। এদের মধ্যে ভালো ভালো ইহুদী বৈজ্ঞানিকরা আমেরিকায় গিয়ে প্রাণ বাঁচালো। বেলসেম বলে একটা কারাগারে কয়েক হাজার ইহুদীকে বন্দী করে গ্যাস দিয়ে মেরে ফেলল।
যাকে লোকে আজো “বেলসেম হত্যা” বলে আতঙ্কের সাথে স্মরণ করে। হিটলারের সাথে থাকলো,
ইটালী,আবিসিনিয়া(ইথিওপিয়া) আর জাপান।
ওদিকে সাম্রাজ্যবাদ দেশগুলো প্রমাদ গুনলো। এলায়েড ফোর্স বলে একজোট গ্রহণ করলো।
“এলায়েড ফোর্সের” মধ্যে বৃটেন, আমেরিকা,ফ্রান্স,রাশিয়া প্রভৃতি দেশ।
হিটলার বলতে লাগলো “আল্লাহ যেনো আমাদের ক্ষমা করেন,কেননা আমার হাতে এমন একটা অস্ত্র আছে যা দিয়ে পৃথিবীর বৃহৎ অংশ সেকেন্ডের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারবো”
পৃথিবীর সব দেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সম্ভবতঃ তিনি এটম বোমার কথাই চিন্তা করেছিলেন। বৃটেন জাপানকে ঠেকানর জন্য প্রিন্স অফ ওয়েলস ও রিপালস বলে অত্যাধুনিক অস্ত্র সজ্জিত দুইটা যুদ্ধ জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েন করল ও দম্ভের সাথে জানালো,
“পৃথিবীর এমন শক্তি নেই যে এই জাহাজ দু’টো কে ধ্বংস করে”।
প্রশান্ত মহাসাগর উত্তল তরঙ্গায়িত। সারা দুনিয়া টালমাটাল।

[পর্ব-১৩]

কিন্তু,এই সব চিন্তা করলে ঐ যুবকের চলেনা। কুলীটা বলল,
-“বাবুজী আপ হামার ঘাড়ে উপরে ছড়িয়ে বসেন”।
তিনি তাই করলেন,ট্রেন ছাড়তে দু’মিনিট বাকী আছে।সে এক অবাক কান্ড। কুলীটা ট্রেনের জানালা দিয়ে ভিতরে তাঁকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল।তিনি এক মহা ঠেলাঠেলিতে পড়লেন। ভিতরে হৈচৈ শব্দ। এদিকে কুলীও নাছোড়বান্দা।যা হোক কুলীটা ঢূকিয়ে ছাড়লো। এদিকে গার্ড সবুজ পতাকা উড়িয়ে দিলেন।ষ্টেশন মাষ্টার ঠং-ঠং হুকুম দিয়েছেন।তাঁর বিছানা,পেঁটরা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দিলো।তিনি ভিতর থেকে একটা চারআনি কুলীর উদ্দেশ্যে প্ল্যাটফর্মে ছুঁড়ে দিলেন।ট্রেন ছুটে চললো।
গাড়ি তীব্রবেগে ছুটে চলল। এতো ভিড়ে বিহার আসলো,উত্তরপ্রদেশ ট্রেন ঢুকলো। কতোই না ষ্টেশন গেলো। এ দিকে কোলকাতার যুবক চলতে লাগলেন তাঁর ভবিষ্যত তৈরির স্বপ্নে।

হঠাৎ ঐ ভদ্রলোক আবিষ্কার করলেন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। স্ত্রীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বললেননা। তরুণী স্ত্রীটির ঘুম ভেঙ্গে গেল কিছু পরে।নতুন জায়গা নতুন পরিবেশ,কোথায় এতোক্ষণ স্বপ্নে বিভোর ছিলেন সেই যুদ্ধ সেই চাকরি? অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এলেন।

রান্না ঘরে গিয়ে দেখেন সেখানে তালা ঝুলছে। তিনি খুব বিস্মিত, এবং আহত হলেন। কি ভাবে রান্না হবে চিন্তা তাঁর মাথায়।স্ত্রী বলেন,”ক’টা মাটির হাড়ি এনে দিলেই রান্না করতে পারব”।
তিনি ছুটলেন বাজারে। নানাজনকে জিজ্ঞেস করে কিছু আনাজপাতি আর মাটির তৈজস নিয়ে এলেন। স্ত্রী খুব দ্রুত রুটি তৈরি করতে গিয়ে দেখেন বেলুন পিঁড়ি নাই,হাতে চাপড়ে রুটি বানালেন।ইঁট দিয়ে উনুন বানালেন,রুটি সেঁকতে গিয়ে দেখেন তাওয়া নাই,সমস্যা নাই,তিনি মাটির পাতিল উপুড় করে রুটি সেঁকে সেদিন স্বামীকে অফিস পাঠালেন।
এই শুরু হল তাঁদের নতুন দেশে সংগ্রামময় জীবন। এখানে তাঁরা বেশি দিন থাকলেন না। বড় ভাইয়ের নীরব দূর্ব্যবহারে খুব শিঘ্র তাঁর স্বামী অন্যত্র বদলী নিয়ে নিলেন। সেখানে একাকী জীবন শুরু হলেও সুখ না থাকুক শান্তি পেলেন।

[পর্ব-১৪]

কয়েক সপ্তাহ ইতিমধ্যে পার হয়ে গিয়েছে। দেশের পরিবেশ বদলায়নি।বড় আপার চাকরি হারানোর
খবরে বাবা বলেন” ভালোই হয়েছে।এই ভয়ংকর সময় শুধু শুধু আসা যাওয়া করা সেই সাথে সবার চিন্তা”।
পাশের বাড়ির মেয়েটি আসে প্রায়ই। মা নাম জিজ্ঞেস করেন একদিন,
–নাম কী তোমার?
–মিতু
–তোমাদের বাসায় রোজ ঝগড়ার আওয়াজ পাই,কী হয়েছে? কেউ অসুখ?
মিতু বলে,–ঐ যে চাচারা ঝগড়া করে,দাদী বলে গ্রামে যেতে কেউ যেতে চায়না।
আসলে এতোদূরে আমাদের দেওয়াল তারপরেও রোজ প্রায়ই তাদের ঝগড়ার আওয়াজ শোনা যায়।

বর্ষা মনে হয় শেষ হয়ে গেল। এর মাঝে রোজা শুরু হয়ে গেল। কেও রোজা রাখে কেউ রাখেনা।
রমজান মাসেও ফুফু আসেন,চাচা আসেন। কেমন এই দূর্দিনেও সুখী সুখী চেহারা। বড় আপার অস্বস্তি লাগে যখন দুলাভাইয়ের অফিসের কথা জিজ্ঞেস করে কেউ।
বাবা প্রায়ই গম্ভীর ভাবে মায়ের সাথে কি সব কথা বলেন। কানে আসে,
–আমরা তো ভিখারি।আমরা এক দেশ থেকে আর এক দেশে এসেছি,এতোগুলো বছর পার হয়ে গেল,তবু মানুষজন কেমন চোখে তাকায়।
–কী করা এখন তো কিছু করার নেই। এ দেশকে যে আমরা কতো ভালোবাসি, তা কে বুঝবে। মা কিছুটা সান্তনা জানায়।
ঈদের দিন কিছু তেমন রান্না হলনা। বড়ভাই কোথা থেকে এক’দুই জোড়া কানের দুল এনে দিলো আমার হাতে।
মা বলেন” ,ঈদ এখন নয়।সবার বিপদ কাটুক, দেশে শান্তি ফিরে আসুক,আর আমরা যদি বাঁচি তবে সেইদিনই ঈদ হবে”।
পরে শুনেছি চাচার বাড়ি,ফুফুর বাড়ি আরো অনেক বাড়িতেই ধুম-ধাম করে ঈদ পালন করে।

হঠাৎ একটা খবর এলো,মিলিটারি কাছেই এগিয়ে এসেছে,আজ হয়তো এই এলাকায় আসবে।ওরা এলে নাকি রাত্রেই আসে বেশি।
আর কথা নেই। ঐ দিন রাত্রিবেলা সবাই বাতি নিভিয়ে চুপচাপ নিঃশব্দে থাকল। পাশের বাড়ির পেছনে পুকুর ছিলো।তারা পুকুর পাড়ে চলে গেল। কেউ গলা সমান পানিতে ডুবে থাকলো।
এই মুহুর্তে কিছুই করার নেই। সবাই আছে প্রতিক্ষায়। ছোট ভাগ্নি বলে,
–মা হাগু
–চুপ চুপ, বড় বোন থামিয়ে দেয়। বাথরুম অনেক দূরে। আসলে ভয় কোন যুক্তি মানেনা। একটা প্রচন্ড ভয় নিঃশব্দে চুপিসারে আমাদের সবাইকে গ্রাস করে ফেললো। মনে হচ্ছে ভয়টা অন্ধকার কোন থেকে বিড়ালের মত লাফিয়ে বের হবে।
এই ভাবে অপেক্ষার পালা যেনো শেষ হয়না। রাত শেষের দিকে কে কি ভাবে ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুম এমন একটা ব্যপার,যা মৃত্যুর ভাবনাকেও ভুলিয়ে দেয়।

পরের দিন সকালে শোনা গেল ওরা এসেছিল তবে এই দিকে নয়।কেমন করে ভাগ্যের খেয়ালে তারা অন্যত্র চলে গিয়েছিল।শোনা গেল সেখানকার মানূষ আতঙ্কে কেউ পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিল।একদল মানুষ ছোটাছুটি করেছে বাঁচার জন্য। তবু একত্রে অনেক মানুষ মেরেছে মিলিটারি। ঝাঁকে-ঝাঁকে ব্রাস ফায়ার করতে করতে চলে যায়।
যাবার সময় ধরে নিয়ে যায় অধিকাংশ যুবতী মেয়েদের।
মা বাবার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। বড় আপা যুবতী,মেজ বোন কিশোরী। কোথায় একটা শূন্যতা অনূভব করতে লাগল সবাই।ফেলে আসা সুন্দর স্মৃতিগুলো মুছে গিয়ে,স্বপ্নগুলো হারিয়ে গিয়ে এক প্রগাঢ় অন্ধকারে ডুবে যেতে লাগল সবাই। মা’কে বলি,
-মা আমার বমি পায়।
মা লেবুপানি করে দেয়। আগে আমরা সবাই আশার আলো দেখতাম। এখন ক্রমশঃ অন্ধকার আমাদের ঘিরে ফেলতে লাগলো।

[চলবে]

About the Author:

মুক্তমনা সদস্য এবং সাহিত্যিক।

মন্তব্যসমূহ

  1. আতিক রাঢ়ী জুন 26, 2010 at 5:47 অপরাহ্ন - Reply

    গল্প হোক আর স্মৃতিচারন হোক আমার কোন সমস্যা নাই। আমার কাছে পড়তে খুব ভাল লাগছে। আশাকরি আপনি আমাদের জন্যই লিখে যাবেন।

    আপনার দ্রুত আরোজ্ঞ কামনা করছি।

    • আফরোজা আলম জুন 27, 2010 at 2:45 অপরাহ্ন - Reply

      @আতিক রাঢ়ী,
      আপনাদের জন্যেই লিখব। তবে,আগে সুস্থ্য হয়ে উঠি। দোয়া করবেন।

    • মাহফুজ জুন 27, 2010 at 3:21 অপরাহ্ন - Reply

      @আতিক রাঢ়ী,
      আরোজ্ঞ নয় হবে আরোগ্য।

      • আতিক রাঢ়ী জুন 27, 2010 at 10:55 অপরাহ্ন - Reply

        @মাহফুজ,

        সন্দেহ তখনও হয়েছিল, কিন্তু যাচাই করা হয়নি। আলসেমির জন্য ক্ষমা প্রার্থী।

  2. ব্রাইট স্মাইল্ জুন 26, 2010 at 5:06 পূর্বাহ্ন - Reply

    @আফরোজা আলম,
    আপনার ৭১ দিনলিপি পড়লাম। সাবলীল লেখা, ভালো লাগলো। চালিয়ে যাবেন।
    আপনার সুস্থ্যতা কামনা করছি। ভালো থাকবেন।

    • আফরোজা আলম জুন 26, 2010 at 2:24 অপরাহ্ন - Reply

      @ব্রাইট স্মাইল্,
      আসলে আমি খুবই অসুস্থ্য,মাত্র এলাম পি সি তে। ভাবছি শুরুটা যেভাবে করেছিলাম,শেষ মনে হয় তা পারবোনা।নানা বিধ কারণ,তার মাঝে
      ১-শারিরীক অসুস্থ্যতা

      ২- মানষিক ভাবে কেন জানিনা ভালো লাগছেনা। আপনাদের মত ক’জন আছেন বলে শেষ করতেই হবে।
      আপনাকে ধন্যবাদ।

  3. বকলম জুন 26, 2010 at 2:27 পূর্বাহ্ন - Reply

    আপু আপনাকে একটি ই বার্তা পাঠিয়েছি।

    • আফরোজা আলম জুন 26, 2010 at 2:19 অপরাহ্ন - Reply

      @বকলম,
      আপনার বার্তা পেয়েছি,জবাব ও দিয়েছি।

  4. আকাশ মালিক জুন 25, 2010 at 3:14 পূর্বাহ্ন - Reply

    আদিল মাহমুদের প্রশ্ন তুলার কারণ আছে-

    পর্ব ১৩ থেকে পর্ব ১৪ মনে হয় একটু আচমকাই হয়ে গেল। ভদ্রলোক তো নিশ্চয়ই আপনার বাবা?

    স্মৃতিচারণ না গল্প?
    প্রশ্নটা হয়তো আরো অনেক পাঠকেরও।
    আগের পর্বগুলোর লিংক যোগ করে দিলে ভাল হয়।

    • আফরোজা আলম জুন 25, 2010 at 8:40 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আকাশ মালিক,

      লিঙ্ক দিয়ে দেব।পাঠক চাইলে আমার প্রোফাইলে গেলে সব এক সাথে পাবেন। আচমকা এসেছে ঠিক।
      আসলে লিখতে গেলে অনেক কিছুই মনে হয় তুলে ধরা দরকার,গল্পের আকারে মাল মশলা মিশিয়ে সত্য তুলে ধরা বড্ড কঠিণ কাজ। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

      অফ টপিক ঃআপাততঃ আমি ক’দিন অসুস্থ্য আছি তাই বেশ কিছু দিন লিখতে পারছিনা।

  5. আদিল মাহমুদ জুন 24, 2010 at 11:04 অপরাহ্ন - Reply

    শুনেছিলাম ৭১ সালের রোজার ঈদ শীতকালে হয়েছিল। নিশ্চিত নই যদিও।

    পর্ব ১৩ থেকে পর্ব ১৪ মনে হয় একটু আচমকাই হয়ে গেল। ভদ্রলোক তো নিশ্চয়ই আপনার বাবা?

    • আফরোজা আলম জুন 25, 2010 at 8:36 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আদিল মাহমুদ,
      যদ্দুর মনে হয় তা নয়। কেননা,তবু আর কারো জানা থাকলে ভাল হত।

    • আফরোজা আলম জুন 25, 2010 at 8:45 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আদিল মাহমুদ,
      আমার বাবা কিনা সরাসরি জবাব দিলাম না। একটু বুঝে নিন কষ্ট করে। আর ঈদ যদি শীতে হয়ে থাকে।তবে ঐ ভাবে ভেবে নিতে অনূরোধ করছি। পরে আবার সাজিয়ে এডিট করে দেব।

  6. মাহফুজ জুন 24, 2010 at 1:01 অপরাহ্ন - Reply

    ‘ফানুস’কে গল্প হিসেবে উল্লেখ না করে স্মৃতিচারণ হিসেবে উল্লেখ করাটাকেই বেশী বাঞ্ছনীয় মনে করছি। কারণ:
    ১) গল্প- সাধারণত সত্য হয় না, সেখানে বানানো কিম্বা মিথ্যা কিছু থাকে।
    ২) স্মৃতিচারণ- স্মৃতিশক্তির কারণে ভুল হতে পারে, কিন্তু সত্যের পাল্লায় ভারী থাকে।

    • আফরোজা আলম জুন 24, 2010 at 1:06 অপরাহ্ন - Reply

      @মাহফুজ,
      তাই দিলাম,দেখুন ঠিক আছে কিনা।আপনাকে ধন্যবাদ।

  7. আফরোজা আলম জুন 24, 2010 at 12:08 অপরাহ্ন - Reply

    উল্লেখ্য আমার ঠিক মনে নেই,আসলে ৭১ যুদ্ধের সময় ঈদ হয়েছিল কিনা,এইটা মনে আছে ,ঈদ একটা হয়েছিল,তবে তা স্বাধীণ হবার আগে না পরে কোনো পাঠকের জানা থাকলে আমি পরবর্তিতে ঠিক করে নেব। ঈদ হয়েছিল এইটা মনে আছে সঠিক টাইম বা মাস মনে নেই।আর আমার মা যেহেতু ্বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছেন তিনি আমি যে সময়টার উল্লেখ করেছি সম্ভাব্য সেই সময়টাই জানালেন। বাকী কারো মনে নেই। অনূগ্রহ করে কারো জানা থাকলে আমায় বলে দেবেন।

    • নৃপেন্দ্র সরকার জুন 25, 2010 at 4:41 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আফরোজা আলম,

      স্ত্রী খুব দ্রুত রুটি তৈরি করতে গিয়ে দেখেন বেলুন পিঁড়ি নাই,হাতে চাপড়ে রুটি বানালেন।ইঁট দিয়ে উনুন বানালেন,রুটি সেঁকতে গিয়ে দেখেন তাওয়া নাই,সমস্যা নাই,তিনি মাটির পাতিল উপুড় করে রুটি সেঁকে সেদিন স্বামীকে অফিস পাঠালেন।
      এই শুরু হল তাঁদের নতুন দেশে সংগ্রামময় জীবন।

      এত কিছুর পরেও ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছেন নিজের পায়ে। আমাদের জগদীশ তা পারেনি। ষাট বছর বয়সে ভিটেমাটি ত্যাগ! তিনি আত্মহননের পথই বেছে নিয়েছিলেন।

      • আফরোজা আলম জুন 25, 2010 at 8:34 পূর্বাহ্ন - Reply

        @নৃপেন্দ্র সরকার,
        যিনি দেশ ভাগের পরে এ দেশে আসেন,তিনি চাকরি সূত্রে আসতে পেরেছিলেন।তবে,তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।এই পর্বটা তারই কিয়াদংশ।

মন্তব্য করুন