হূমায়ূন আহমেদের আজ রবিবার একটি জনপ্রিয় হাসির নাটকষোল আনা হাসির সাথে এক আনা সময় নিয়ে বত্রিশ আনা রূঢ় বাস্তব সত্য কথাটি ধরিয়ে দিতে হূমায়ুন আহমেদের জুড়ি নেইহিমু জীবন-বিমূখ একটি অদ্ভূত চরিত্রনাটকে উপস্থিতি নেই বললেই চলেহলুদ রংএর কাপড় গায়ে রাতের বেলা ঘুরে বেড়ায়নাটকের মূল বিষয়বস্তুতে হিমুর কোন অংশ নেইঅর্থ, বিত্তমত্ত সমাজের বাইরে যে বিরাট একটি অবহেলিত ক্ষুধার্ত সমাজ আছে নাটকের শেষ মিনিটে হিমু সেটাই দেখায়হিমুর গান আমাকে সোনার খাঁচার দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়  

গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু-মুসলমান

মিলিয়া বাউ্লা গান আর মুর্শিদী গাইতাম

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম

 

সোনার খাঁচার দিন গুলি মোর রইল না গ্রামের মাঝখানে কালি ভিটা, শতাব্দীর সাক্ষী পাহাড়ের  মত সুউচ্চ বটবৃক্ষ (এত উচু গাছ আমি কোথাও দেখিনি, শুনিনি)সামনে খেলার মাঠশতাধিক হিন্দু আর গোটা তিরিশেক মুসলমান পরিবার নিয়ে সংস্কৃতিমনা ঈর্শনীয় একটি আদর্শ গ্রামখালেক মুসলমানের ছেলে আর আমি হিন্দুর ছেলে আমরা কেউ বুঝতাম নালেখাপড়ায় আশেপাশের কোন গ্রামই সমকক্ষ ছিল নাএই গ্রাম থেকে প্রচুর পিএইচডি, ডাক্তা্‌র, ইঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ সহ সব ধরণের টেকনোক্র্যাট বেরিয়েছেবাংলাদেশ সরকারের অর্থ উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদ সদস্য, বিদেশী দূতাবাসে সচিব সহ রাস্ট্রদূত পর্য্যন্ত এই গ্রাম থেকে হয়েছেএক সময়ের মাত্র ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটির উপচার্য্যও হয়েছেন এই গ্রাম থেকেসূর্য্য ডুবার পরে বাইরে খেলতে গেলে বাঘের ভয়ে চোখকান খোলা রাখতে হতকখন সংবাদ আসে – বাঘ এ পথেই আসছে; খেলার সরঞ্জাম ফেলে সবাই একেবারে ভ্যানিসএই ব্যাঘ্রটির নাম ছিল জগদীশ চন্দ্র রায়১৯৬০ সালের দিকের কথাজগদীশ রায় তখন আমাদের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেনতখন প্রতি বছর টিমে টিমে খেলা হতবিশ মাইল ব্যাসের মধ্যে কোন গ্রাম ছিল না আমাদের গ্রামকে টেক্কা দিতে পারে

 

১৯৮৮ সালে বন্যায় দেশ ভেসে গেছেঢাকা নগরীতে তখন নৌকা চলেটেলিভিশনে নিত্যদিনের খবরের দৃশ্য – প্রেসিডেন্ট এরশাদ বুক জলে হেটে টাকা বিলাচ্ছেনশাপলা চত্ত্বরের পাশেই পুবালী ব্যাঙ্করিকশার পাদানি জলে ডুবা, পা উচুপুবালী ব্যাঙ্কের বারান্দায় লাফ দিয়ে নামলামময়মনসিংহের পুবালী ব্যাঙ্কে দু হাজার ডলারের সমপরিমাণ অর্থ জমা দিয়ে এসেছিএখান থেকে একটি সার্টিফিকেট দিবেসেটা টেক্সাস এ এন্ড এমএ পাঠাতে হবেঅগ্রিম টুইসন ফীঅফিসার বললেন – ময়মনসিংহ পুবালী ব্যাঙ্কে ফিরে যানওরা এইখানে ভুল করেছেঠিক করে নিয়ে আসুনকোন অসুবিধা নেইআপনার অসুবিধা নেই, কিন্তু আমার তো মহা মসিবত ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড তখন জলের নীচেশেষ বাসে এসেছিএখন তো যাওয়াই যাবে না  হাতে সময়ও নেই

 

আইন বহির্ভূত কাজ আমরা করি নাআপনি যান ঠিক করিয়ে নিয়ে আসেনঅসুবিধা নাই  

সব বন্ধ, যাই কী করে? আর তা ছাড়া ভুল তো আমি করিনিআপনাদের এক শাখাই করেছেতার জন্য আমাকে বিপদে ফেলছেন কেন?    

 

কে আমার কথা শুনেবাইরে জলমগ্ন শাপলা চত্ত্বরলোকজন পা রিক্সাওয়ালার সীটে তুলে বসে আছেআর বেচারা রিক্সাওয়ালারা রিক্সা টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছেআমার চোখে অন্ধকারঢাকার অফিসেও আমার জন্য বিপদ!  সামনেই কাচের দেওয়ালের ভেতরে ম্যানেজার সাহেব বসে কাজ করছেনভেতরে কেউ নেই আমি ভীতু প্রকৃতির জীবমানুষের কাছ থেকে ঠেলা খেতে খেতে আরও ভীতু হয়ে গেছি পৈত্রিক নামটিও লুকিয়ে রাখিরাস্তায় নামলেই ঘরের জল পানিতে ভাষান্তরিত হয় অন্তরাত্মা বলল, তোর তো আর হারানোর কিছু নেইকরে দেখ একটা শেষ চেষ্টা!  

 

ম্যানেজারটি ভদ্র বংশীয় হবেন। (নামটি টুকে রাখিনি নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে এখন।) মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝলাম, ভদ্রলোক বুঝে ফেলেছেন, নিশ্চয় বড় কোন বিপদে পড়েই আমি তাঁর দ্বারস্থ হয়েছি সমস্যার কথা বললামসমস্যাটি্র ধারে কাছে না গিয়ে সহসাই জিজ্ঞেস করলেন,

আপনার দেশ কোথায়?

ঢাকা

ঢাকা কোথায়?

ধামরাই

ধামরাই কোথায়?

আপনি ধামরাইএর সব চিনেন নাকি?

বলেন না, ধামরাই কোথায়?

 

আমি ততক্ষনে ভরশা পেতে শুরু করেছিবললাম,

কুশুরা

কুশুরা কোথায় সেইটা বলেন

গ্রামের নাম বলব?

বলেন

বৈন্যা

 

যেন কোন মন্ত্র কাজ করছে ম্যানেজার সাহেব আর কিছু বললেন নাকলিং বেল টিপলেনএক পিয়ন প্রবেশ করলবললেন, এই ফাইলটা নিয়ে যাও মহিউদ্দিনের কাছেসব ঠিক-ঠাক করে দিতে বল এখনইযদি কোন ঝামেলার কথা বলে, বলবে সব দ্বায়িত্ব আমার   

 

আমি হতভম্বঅবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি একি স্বপ্ন, নাকি মায়া! নাকি আর কিছু!   

 

ম্যানেজার সাহেব কথা বললেনপচিশ-তিরিশ বছর আগের কথা আপনি মনে করিয়ে দিলেনআমার বাড়ি এলাশিনআপনার গ্রাম থেকে বিশ মাইল উত্তরেআপনি নরেশ এবং রমেশের গ্রামের ছেলেএই দুটো ছেলে আমাদের ফুটবল টিমের জন্য ছিল ত্রাসের কারণদুজন সামনে দু পাশে খেলত আর হরিণের গতিতে এরা ছুটতচোক্ষের নিমিষে গোল করে ফেলতআমরা সবাইকে হারিয়ে ফাইনালে উঠতামকিন্তু বৈন্যার সাথে পারার আশা করতে পারতাম না শুধু এই দুজনের কারণে

 

রমেশ-নরেশ এরা কী করে এখন? কেমন আছে?

দুজনেই ইন্ডিয়া চলে গেছে

কেন, ইন্ডিয়া গেল কেন?

যে কারণে অন্য হিন্দুরা যায় সেই কারণেই

ওদের তো কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়

তা ঠিকহয়তো ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছেদিন দিনই তো খারাপ হচ্ছে

ওখানে কী করছে ওরা, কেমন আছে?

রমেশদার কথা জানিনা নরেশদা মারা গেছেন

 

ম্যানেজার সাহেব খুবই কষ্ট পেলেনএমন একটা দুঃসংবাদের জন্য প্রস্তুত ছিলেন নাউনার মস্তিষ্কে নরেশ-রমেশরা এখনও সেই আঠার-বিশ বছরের তরুণই আছে  মাথাটি নীচু হয়ে গেলনিঃশব্দে কয়েকটি মিনিট চলে গেলতারপর অস্ফুটে বেরিয়ে এল নরেশ মারা গেছে!

 

আমি তখন ছোট, খুবই ছোট আমার নাম কোন ক্লাশে তালিকাভূক্ত হয়েছে কিনা তাইই মনে নেই১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি হবেবিরাট নৌকা করে আমাদের টিম যাচ্ছে খেলতেআমিও যাবখেলা দেখার আকর্ষণে নয় নৌকায় কোথাও যাওয়াটাই আসল কথানৌকায় যেই এক পা দিয়েছি, সহস্র মুখে একই প্রশ্ন, আরে, তুই কোথায় যাবি, নাম, নাম  

 

পেছনের গলইএর দিকটা থেকে মাথা বেড় করলেন ছয় ফুট লম্বা আমাদের দলের গোল-রক্ষক, আবু হোসেন ভাইবললেন, ওকে আসতে দেপাশ পেয়ে বান্নল গ্রামের মাঠে খেলা দেখতে গেলামখেলা শুরু হলআমরা মাঠের পুব পাশেমিনিট পাঁচেকের মাথায় গন্ডগোল শুরু হয়ে গেলআমাদের লেফট হাফ যতীনদার পায়ে কেউ ঠ্যাঙ্গা মেরেছে    

jatinda

 যতীনদা – ২৩ শে ডিসেম্বর ২০০৮

 

 

বান্নলের মাঠচতুর্দিকে সারা গ্রামের মানুষআমি বাদে আমরা বড়জোড় বিশ-পচিশ জনহলে কি হবে! আমাদের বাঘের মাথায় তখন রক্ত চড়ে গেছেকানের নত্তি ছেড়ার সময় হয়েছেপড়নে ধূতি, হাতে ছাতা ছাতিপেটা করার জন্য এক লাফে জগদীশ রায় মাঠের মধ্যিখানে চলে গেছেন   

 

কোন বানর ওর গায়ে হাত দিয়েছেকানের নত্তিটা ছিড় আগে  

 

এই হল তখনকার দিনের বাঘ, জগদীশ চন্দ্র রায়বাঘ তো নয়, শের – ব্যাঘ্রএখন স্বপ্নেও ভাবা যায় না ধূতি পড়ে কোন হিন্দু মাঠের মাঝখানে প্রবেশ করবেতাও আবার ভিন গ্রামে ওদেরই কারো কানের নত্তি ছেড়ার জন্য

 

ইয়াছিন ভাই রাইট হাফ থেকে দৌড়ে এসেছেনজগদীশদা আপনি মাঠের বাইরে যান তোআমার খেলা এখনও শুরু হয়নিইয়াছিন শুরুতে প্রতিপক্ষের দুটি ভাল খেলোয়ার সনাক্ত করবেনতারপর বল নিয়ে কাছে যাবেন রেফারিও বুঝতে পারবে নাশুধু দেখা যাবে খেলোয়ারটি মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছেসেই খেলাটি এখনও শুরু করেননি 

 

p10100031

 

                                        ১৫ মে ২০০৭ এর ইয়াছিন ভাই

ইয়াছিন ভাই যতীনদার কানের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন – কয় নম্বর জার্সি

 

মাত্র এক মিনিটইয়াছিন ভাই এক ঠ্যাঙ্গা মেরে ফেলে দিলেন খেলোয়ারটিকেসঙ্গে সঙ্গে ওদের দুজন ইয়াছিন ভাইএর ঘাড়ের উপরইয়াছিন ভাইএর পিঠাপিঠি বড়ভাই ইউসুফ ভাই মিড-ফরোয়ার্ডে খেলেনতিনি দুই লাথি মেরে দুটোকে ফেলে দিলেনমাঠ ততক্ষনে জনারণ্যে পরিনত হয়েছেসবাই ইউসুফ ভাইকে মারবেকানাই তাড়াতাড়ি নিজের গায়ের জামাটা খুলে ইউসুফ ভাইএর জার্সির উপর দিয়ে পড়িয়ে দিলেনইউসুফকে আর খুঁজে পাওয়া গেল নাএকেবার হাওয়াগন্ডগোল থামলে খেলা শুরু হল আমরা এক গোলে জিতে বাড়ি ফিরলাম    

 dsc00797cropped

  কানাই লাল বিশ্বাস১২ ডিসেম্বর ২০০৮

কানাই দেশ ছেড়েছেন ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি সময়েএখন থাকেন কুচবিহার জেলার একটি গ্রামেছবি থেকে বুঝা যাচ্ছে হতদরিদ্র অবস্থাপাশের বাড়ি থেকে মেজো ছেলেটি প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে এল আমাকে আর আমার ভাতিজাকে বসতে দেয়ার জন্য

 

২০০৩ সালে আবু হোসেন ভাইকে শেষ বারের মত দেখেছি২০০৭ সালে যেয়ে শুনলাম মারা গেছেনদেখা হল ইউসুফ ভাইএর সাথে স্ত্রী বিয়োগ হয়েছেকানে এইড লাগিয়েও ভাল শুনতে পান না২০০৮ সালে যেয়ে শুনি ইউসুফ ভাইও গত হয়েছেন

 

এর পরের ঘটনাগুলো বিষাদময় ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে অনেক গুলো রায়ট হয়ে গেছেএক একটি রায়ট শেষ হয় আর জানিয়ে দিয়ে যায়, তোমরা হিন্দু, ভারত তোমাদের দেশএতদিন রায়ট হত ঢাকা কেন্দ্রিক; ঢাকা, জয়দেবপুর, সাভার, টুংগীএগুলো নাকি বিহারীরা করে থাকে গ্রামাঞ্চলে বিহারীরা থাকে নাতাই রায়টের হিংস্র থাবা তখনও প্রবেশ করেনিতবে অনেকের হাত চলকানি শুরু হয়ে গেছেরায়ট কী ভাবে হয়! শুধু ঢাকাতে কেন! এখানে হলে মন্দ কি! দেখতাম হিন্দু গুলো কেমন করে! শুরুটা আর হচ্ছে না

 

১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে অপেক্ষার অবসান হলবেরশ স্কুলের কুক্ষাত হেডমাস্টার, চান খার নেতৃত্বে স্কুল গৃহে মিটিং হলতারপর এক নিকষ কালো রাত্রিতে শকুনেরা ঝাপিয়ে পড়ল নিরীহ গ্রামবাসীর উপর তিন তিনটি গ্রামে নারকীয় তান্ডব চললপরে কোন এক পর্বে এ বিষয়ে লেখার আশা রইল

 

দিনে দিনে বাড়তে থাকে বেদনাবহ মর্মান্তিক ঘটনা সমূহ১৯৬৪ এর রায়ট বাঘটিকে গর্জন বন্ধ করার ইঙ্গিত দিয়ে গেলতারপর ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ হিন্দুদের জীবন বিষময় করে তুললবাঘটি আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে এলদেশ স্বাধীন হল ১৯৭১এনতুন আশাভাবল এবার বুঝি সবকিছু ১৯৫০ দশকের মত হবেমান-সন্মান নিয়ে বেঁচে থাকা যাবেবছর দুই যেতে না যেতেই সে ভুল তাঁর ভাংগল

 

২০০১ সালে যখন দেশে যাই তখন জগদীশ রায়ের সাথে শেষ বারের মত দেখাবাঘের গর্জন অনেক আগেই শেষএবারে মুখের ভাষাও স্তিমিতদৈনন্দিন প্রয়োজনে বাজারে যান আর আসেনএই তাঁর নিয়মিত কর্মসূচী সামান্য কারণে উনার হাটুর বয়েসী এক নেতা উনাকে অপদস্ত করেছেবাংলাদেশের সংবিধানের ৯৯৯এর অনুচ্ছেদে লেখা আছে হিন্দুরা শুধুই আওয়ামী লীগের সমর্থক থাকবেঅন্যের সমর্থক হওয়া সংবিধান বহির্ভূত কার্যকলাপ আর বাংলাদেশ সরকার তার সাজা দেওয়ার দ্বায়িত্ব দিয়েছে ঐ নেতার উপরনেতাটি একটি সম্ভ্রান্ত রক্ষনশীল পরিবারের সন্তান আমার শিশুপাঠ সময় থেকেই বন্ধুআমার জন্য হাটু জলে নামার দরকার হলে বন্ধুটি এখনও গলা জলে নামেওদের অন্দর বাড়িতে বাইরের কোন মুসলমানেরও প্রবেশ নিষেধকিন্তু এরও ব্যতিক্রম আছে – সেটি শুধু আমার জন্যতার বাবার সাথে নাকি আমার বন্ধুত্ব আরও গাঢ় এসব নিয়ে অন্য আর এক পর্বে আলোচনা করার আশা রাখি

 

আমার বন্ধু তাঁকে অপদস্ত করেছেতাই অনুযোগটি আমাকেই শুনতে হলএককালের বাঘভয়, শ্রদ্ধা, সন্মান সবই ছিলো সারা গাঁয়েবন্ধুটির বাবাও তাঁকে যথাযথ সন্মান ও স্নেহ করতেনঅথচ মামূলি বিষয় নিয়ে আজকাল অপদস্ত করতে কেউ দ্বিতীয়বারটি চিন্তা করে নাবুক ভরা কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারেন নাকেউ কোনদিন বলেও না এর একটা বিহিত হওয়া দরকার, বা  আমরা একটা কিছু করব, ইত্যাদিএক সময় বলেই ফেললেন দেশে আর থাকতে পারলাম না, ওপারে যাওয়া ছাড়া আর পথ দেখছি না

 

এই বয়সে আর কোথায় যাবে! থাকা যাবে না এই কথাটা হরহামেশাই হিন্দুরা বলে থাকেএতে একটু কষ্ট লাঘব হয়তার উপর ষাট বছর বয়সে দেশত্যাগ আর আত্মহত্যা একই কথা  

 

বন্ধুটির বড়ভাই ছেলেদের সাথে দীর্ঘদিন যাবত বিদেশে বসবাস করছেনটেলিফোনে উনার সাথে আমার নিয়মিত আড্ডা চলে আমরা কেউ কাউকে দেখিনাতাই আড্ডাটা কখনও কখনও বেশ নীচু স্তরেই নেমে যায়২০০২ সালের প্রথমার্দ্ধে বড়ভাইটি দীর্ঘদিন পর বিদেশ থেকে দেশে গেলেনতারই বর্ণনা দিচ্ছিলেনএক সময় হঠাত করে হাজার জনের পেটের কথা তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল

 

   এতদিন পরে দেশে গেলামঅনেকেই দেখা করতে এলকিন্তু জগদীশ আমার বাড়ির পাশ দিয়ে বাজারে যায় আসে, আমার সাথে দেখা করতে এল নাএকদিন ডাকালামবললাম, প্রত্যেকদিন আপনি বাড়ীর পাশ দিয়ে যান, আসেন; অথচ আমার সাথে দেখা করেন না, ব্যাপারটা কী? পিস্তলটা বের করে দেখালামবললাম, এতদিন আমরা আপনাকে আদাব দিয়েছিএদেশে থাকতে হলে এখন আমাদেরকে আপনারই আদাব দিয়ে থাকতে হবে

 

আমি হতবাক! আমি ঠিক শুনছি তো! এই পরিবারটির প্রতি আমি দারুণ শ্রদ্ধাশীলসারাটি গ্রামের মাথা এই পরিবারটিযে কয়টা হিন্দু পরিবার এখনও টিকে আছে এই পরিবারটির ভরশাতেই আছেএদের জন্যেই অনেকে হিন্দুদের গায়ে আচড় দিতে এক পা এগিয়ে দু পা পিছিয়ে  যায়সেই বাড়ীর সন্তান কীভাবে জগদীশের মত একটি ইতিহাসকে এই ভাষায় কথা বলতে পারে! মাথা ঠিক আছে তো? মাথা আসলে ঠিকই আছেএই বড় ভাইটি বিশেষ একটি ব্যক্তিত্বের ছেলে হওয়া ছাড়া জীবনে তেমন কিছু একটা করতে পারেন নি ছোট বেলার আসল চেহারাটি মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ে, যা অন্য ভাইদের সন্মান হানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়তিনি বিদেশ থেকে এলে জগদীশ কেন, তেমন কারোরই যে দেখা করতে যাওয়ার কোন কারণ নেই তিনি সেটিও বুঝেন না

 

আমি একটা দম নিলামবছরের পর বছর টেলিফোনে আড্ডা দিয়েছিসেই থেকে অনেক কিছু বলার সাহসও পেয়েছিসেটিই কাজে লাগালামবললাম বাংলাদেশে হিন্দুরা অতিশয় নিরীহ জীবএদেরকে পিস্তল কেন, লাঠি দেখানোটাও বেশী বেশী বাড়াবাড়িআপনার এত যদি সাহস থাকে, দেখান না আপনার পাশের বাড়ির কাউকেআপনার আশেপাশের বাড়ির অর্দ্ধেক লোকও আপনার ভাইকে কখনও ভোট দেয় নাপিস্তলটা একদিন ওদের দেখাবেনদেখি কত বড় বীর আপনি

 

২০০২ সালের মাঝামাঝি একদিন আমার এক দাদা বললেন জগদীশ ওপারে চলে গেছেওপারের অর্থ মৃত্যু নয়বাংলাদেশের হিন্দুরা ভারতে যাওয়াকে ওপারে যাওয়া বলেকেউ শুনে ফেললে আবার কোন বাড়তি বিপদ হয় তাই সংকেতে কথা বার্তাঘরের ভিতর থেকেও একই সংকেতে কথা বলতে শুনেছিএত ভয়

 

দিনে দিনে জগদীশের হৃদয়ে দুঃখ-বেদনা পূঞ্জীভূত হয়েছেকেউ কোন দিন অনুভব করার কথা ভাবেও নাইহিন্দু হয়েছিস তোরা তো আওয়ামী লীগেই ভোট দিবিমুসলমানের বিএনপি করাতে দোষ নেইহিন্দু হয়ে বিএনপি করা মানে দেশের গঠনতন্ত্র বিরোধী কাজহিন্দুরা একগালে থাপ্পড় খেয়ে আর একগাল আগিয়ে দেয়তবু প্রাণটা তো বাঁচুকএভাবেই দয়া আর দাক্ষিণ্য নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখে গেছে এই নির্জীব জীব গুলো

 

ভারতে জগদীশের জন্য কেউ বাড়িঘর বানিয়ে বসে নেইদেশত্যাগ আঠারবিশ বছর বয়সে ঠিক আছেষাট বছর বয়সে দেশ ছাড়ার সময় নয়এ যে আত্মহত্যার পথে পা বাড়ানোআমি দাদাকে বললাম জগদীশ দুবছরের বেশী বাঁচবে নাআমার কথাই ঠিক হলকেউ জানল না, শুনল নাএকফোটা চোখের জলও কেউ ফেলল নাভিন গায়ের মাঠে সেই গাঁয়েরই খেলোয়ারের কানের নত্তি ছিড়তে যাওয়া ধূতি পড়া ব্যাঘ্রটি এক বছরও টিকল নাপৃথিবী থেকে একবুক কষ্ট নিয়ে একদিন নীরবে চলে গেল

 

কৃষ্ণপক্ষে চাঁদের ক্ষয় শুরু হয়চাঁদটি ক্রমশঃ ছোট আর দূর্বল হতে থাকেতারপর একদিন নিঃশেষ হয়ে যায়আকাশে ঐ চাঁদ আর উঠে নানতুন চাঁদ তার জায়গাটি দখল করে নেয়

 

১২ জুন ২০১০, টেক্সাস

 

 

 

[49 বার পঠিত]