| অস্পৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং একজন বাবাসাহেব |০৭/৮|

ambedkar
(পূর্ব-প্রকাশিতের পর…)

অস্পৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ পর্ব:[০১] [০২] [০৩] [০৪] [০৫] [০৬] [*] [০৮]

এক জীবনে বাবা সাহেব আম্বেদকর এবং…
অছ্যুৎ পরিবারে পিতা রামজী মালোজী শকপাল ও মাতা ভীমাবাঈ-এর ১৪ সন্তানের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন আম্বেদকর। পারিবারিক নাম ভীমরাও। যদিও চৌদ্দজন ভাই বোনের মধ্যে ৫ জন বেঁচে ছিলেন, ৩ ভাই ২ বোন। বলরাম, আনন্দরাও, মঞ্জুলা, তুলসী ও সর্বশেষ ভীমরাও। পৈতৃক বাড়ী ছিল তৎকালীন বোম্বাই প্রদেশের রত্নগিরি জেলার আম্বেদাবাদ গ্রামে। পিতা রামজী শকলাল মধ্যপ্রদেশের ‘মোউ’ সেনানিবাসে চাকুরিকালীন সময়ে ১৮৯১ সালের ১৪ এপ্রিল আম্বেদকরের জন্ম। পুত্রের নাম রাখা হলো ভীমরাও শকপাল। আম্বেদকর হলো পার্শ্ববর্তী এক গাঁয়ের নাম। স্কুলজীবনে প্রবেশের পর এক ব্রাহ্মণ শিক কৌতুহলবশত শকপালের স্থলে ভীমরাও এর সাথে জুড়ে দেন আম্বেদকর শব্দটি। সেই থেকে ভীমরাও শকপাল হয়ে গেলো ভীমরাও আম্বেদকর। তাঁর পূর্বপুরুষদের অনেকেই ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলেন। তাঁর পিতামহ মালোজী শকপালও সৈনিক ছিলেন। থানা জেলার অন্তর্গত মুরবাদ গ্রামের মুরবাদকর পরিবারের তাঁর মাতামহরাও ছিলেন সামরিক বাহিনীর সুবেদার-মেজর।

পিতা রামজী শকলাল মারাঠি ও ইংরেজিতে সাধারণ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন বলে শিক্ষানুরাগ ও ধর্মপরায়নতা তাঁর চরিত্রের অংশ হয়ে উঠেছিলো। ফলে সন্তানদেরকে শিক্ষাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতেন তিনি। সাথে সাথে উৎসাহিত করতেন হিন্দু ধর্মের ক্লাসিকগুলো অধ্যয়নের জন্য। সেনাবাহিনীর সুবেদার হিসেবে সামরিক বাহিনীর চাকুরি থেকে রামজী শকলাল ১৮৯৪ সালে যখন অবসর নেন তখন আম্বেদকরের বয়স সবে দুই বছর পেরিয়েছে। এর দু’বছর পরে রামজী বোম্বাই প্রদেশের সাতারার সেনাবানিবাসের একটি স্কুলে চাকুরি জোগাড় করে সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এরই মধ্যে আম্বেদকরের মাতা ভীমাবাঈ মারা গেলেন। ভীমাবাঈয়ের অকাল মৃত্যুতে শোকাভিভুত রামজী তাঁর একমাত্র বোন মীরাবাঈকে সংসার দেখাশুনার জন্য শ্বশুরবাড়ি থেকে নিয়ে এলেন। তিনি সাংসারিক কাজে খুব অভিজ্ঞ ও কর্মঠ ছিলেন। ইতোমধ্যে ১৮৯৮ সালে আম্বেদকরের বাবা রামজী শকপাল পুনরায় বিয়ে করেন। আম্বেদকরের বয়স তখন ৫/৬ বৎসর। পিতার এই দ্বিতীয় বিয়েকে আম্বেদকরের শিশুমন কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। ফলে অধিকাংশ সময় পিসীর সাহচর্যেই কাটাতেন। মাতৃহারা আম্বেদকরকে তিনি মাতৃস্নেহে বেঁধে রাখতেন।

ছেলের স্কুলে পড়ার বয়স হলে সেনাবাহিনীর চাকুরির সুবাদে বহু অনুনয় বিনয় করে রামজী শকলাল তার পুত্রকে সরকারি স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেলেন। আম্বেদকরের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষাজীবন শুরু হলো সাতারাতে। আর স্কুলজীবনের শুরুতেই হিন্দু সমাজের বর্ণবাদী জাতিভেদ প্রথা তথা অস্পৃশ্যতার অভিশাপের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা শুরু হলো তাঁর।

বাল্যকাল বা স্কুল জীবন থেকে প্রতি পদেক্ষেপে যেভাবে তিনি সামাজিক বঞ্চনা, নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হয়েছিলেন তখন থেকে তাঁর মধ্যে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবার স্বপ্ন জাগ্রত হয়েছিলো। তাঁর জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে অভীষ্ট লক্ষে পৌঁছাতে শক্তি যুগিয়েছে। একসময় স্কুলে লাঞ্ছনা-গঞ্জনার কারণে স্কুল এবং পড়াশুনার প্রতি ঘোর বিতৃষ্ণা জন্মে যায় এবং প্রায়শই স্কুল পালাতে থাকেন তিনি। তবু লক্ষ্যকে তাঁর দৃষ্টি থেকে কখনো ফিরিয়ে নেননি। এদিকে বিমাতাকে মোটেই সহ্য করতে পারছিলেন না। ফলে কচি আবেগের বশবর্তী হয়ে তিনি এ পরিস্থিতিতে স্বাধীন জীবিকার্জনের কথা চিন্তা করে বোম্বাইতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু সেখানে যেতে অনেক টাকা পয়সার প্রয়োজন। তাঁর কাছে কোন টাকা পয়সা নেই। অগত্যা পিসীমার কোমরে বাঁধা থলিটির দিকে ভীমের নজর পড়লে একদিন তা ভাগিয়ে নিয়ে থলিটিতে প্রত্যাশিত পয়সা না পেয়ে অতিশয় হতাশ হয়ে পড়েন। আর এই সময়টাতেই তাঁর জীবনের আমূল পরিবর্তন দেখা দেয়। তাঁর কথা থেকেই জানতে পারা যায় যে, এই পরিবর্তনের কারণেই তিনি পরবর্তীতে নিজেকে ড. আম্বেদকর হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন-

‘ঠিক করলাম যে আমি স্কুল পালানোর অভ্যাস ত্যাগ করবো এবং পড়াশুনার প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করবো, যাতে যত শীঘ্র সম্ভব স্কুলের পাঠ সেরে স্বাধীনভাবে জীবন যাপন শুরু করতে পারি।’

এরই মধ্যে চাকুরির কারণে রামজী শকপাল সপরিবারে বোম্বাই চলে এলেন। ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নিলেন যা ৬/৭ জন সদস্যের পক্ষে কোনক্রমেই মাথাগোজা সম্ভব নয়। আম্বেদকরকে মারাঠা হাইস্কুলে ভর্তি করানো হলো এবং স্কুলের অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ পিতার সযত্ন শিক্ষাদানে তাঁর পড়াশুনায় প্রভূত উন্নতি দেখা দিলো। অন্য ভাইদের পড়াশুনা আর না হলেও পিতা রামজী ভীমের পাঠস্পৃহা দেখে চরম অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর জন্য বিভিন্ন বইপত্র সংগ্রহ করে আনতেন। পড়াশুনায় উত্তরোত্তর মনোযোগ ও উন্নতি লক্ষ্য করে তাঁকে বোম্বাইর বিখ্যাত স্কুল এলফিনস্টোন হাইস্কুলে ভর্তি করানো হলো। আম্বেদকরই হলেন এলফিনস্টোন রোডের আশেপাশের এলাকায় এখানকার প্রথম ও একমাত্র অস্পৃশ্য ছাত্র।

এই নামকরা স্কুলে ভর্তি হয়ে শত অবহেলা অপমানের মধ্যেও পড়াশুনার প্রতি তাঁর মনোযোগ আরো বেড়ে গেলো। কিন্তু যে পরিবেশের মধ্যে তাঁকে পড়াশুনা করতে হয়েছে তা ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয়। সবার জন্য একটিমাত্র ঘর। সেখানে রান্নাবান্না, থাকা-খাওয়া, জ্বালানি কাঠের স্তুপ, ঘরের এক কোণে থাকতো একটি ছাগলও। থাকার জায়গার অভাবে পিতা রামজী একটি কৌশল বের করলেন। সন্ধ্যার পর আম্বেদকর ঘুমোতে যেত এবং পিতা রামজী জেগে থেকে তাঁর পাঠ তৈরি করে দিতেন। রাত দুটো বাজলে তিনি আম্বেদকরকে জাগিয়ে তার জায়গায় শুয়ে পড়তেন। আম্বেদকর সারারাত ধরে নিরিবিলিতে পড়াশুনা করতেন। একদিকে পারিবারিক অসুবিধা অন্যদিকে এলফিনস্টোন হাইস্কুলের মতো ঐতিহ্যবাহী স্কুলেও বর্ণহিন্দু সহপাঠি ও শিকদের কাছ থেকে লাঞ্ছনা ও বিষোদ্গার সত্ত্বেও ১৯০৭ সালে এলফিনস্টোন হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

সে সময়কালে একজন অস্পৃশ্য মাহার সম্প্রদায়ের ছেলের প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করা ছিলো অকল্পনীয় ব্যাপার। বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এলফিনস্টোন কলেজে আইএ ক্লাশে আম্বেদকরই হলেন ভারতবর্ষের প্রথম কোন অস্পৃশ্য ছাত্র। এই কৃতিত্বের জন্য তাঁর সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে একটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়, যার পৌরোহিত্য করেন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক এস.কে বোলে এবং সমাজসেবী শিক্ষক অর্জুন কেলুশকার, যিনি দাদা কেলুশকার নামে পরিচিত। কৃতিত্বের জন্য উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও উচ্চশিক্ষার জন্য উৎসাহিত করে অর্জুন কেলুশকার প্রীতি উপহার হিসেবে ‘গৌতম বুদ্ধের’ একটি জীবনী গ্রন্থ আম্বেদকরের হাতে তুলে দেন। এই বইটিই পরবর্তীকালে আম্বেদকরের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পট পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলো।

সে আমলে অল্প বয়সে বিয়ের রেওয়াজ থাকায় প্রবেশিকা পাশ করার পর আম্বেদকরের আপত্তি সত্ত্বেও তাঁর বিয়ের আয়োজন করা হলো। দাপোলীর সগোত্রীয় সম্প্রদায়ের ভিখু ওয়ালঙ্করের নয় বছর বয়েসী কন্যা রমাবাঈয়ের সাথে ভীমরাও আম্বেদকর ১৯০৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই রমণীর গর্ভে তাঁর তিন পুত্র ও এক কন্যার জন্ম হয়। কন্যা ইন্দু শৈশবেই মারা যায় এবং এক পুত্র রাজরত্ন ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসে মারা যায়।

১৯১০ সালে এলফিনস্টোন কলেজ থেকে আই.এ পাশ করার পর অর্থাভাবে তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হবার খবর পেয়ে শুভানুধ্যায়ী শিক্ষক অর্জুন কেলুশকার আম্বেদকরকে নিয়ে বরোদার মহারাজা সয়াজিরাও গাইকোয়াড়ের সঙ্গে দেখা করেন। সব শুনে মহারাজা তাঁর উচ্চশিক্ষা গ্রহণার্থে যাবতীয় সাহায্য প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন এবং তাঁকে একই কলেজে বি.এ পড়ার খরচ জোগান। ১৯১২ সালে সেখান থেকে বি.এ পাশ করেন এবং ঠিক তার পরের বছর ১৯১৩ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। তাঁর জীবনের অন্যতম সহায়ক শক্তির উৎস পিতার মৃত্যুতে তিনি অত্যন্ত শোকাভিভূত হয়ে পড়লেও বর্ণবাদের শিকার হয়ে শৈশবের অপমান, নির্যাতন, অবজ্ঞা, অত্যাচার ইত্যাদির বিরুদ্ধে অধিকার অর্জনের সংগ্রাম তাঁকে সর্বদাই তাড়িত করছিলো। আর এ শুধু তাঁর নিজের অধিকার আদায়ের লড়াই নয়, শত সহস্র বছরকাল ধরে নির্যাতিত, শোষিত, লাঞ্ছিত কোটি কোটি অস্পৃশ্য মানব সন্তানদের মানুষ হিসেবে অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বাঁচার লড়াই। তা করতে হবে সেই কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠিটার সাথে যারা বিদ্যা, বুদ্ধি, ক্ষমতা, অর্থ, কূটনীতি, ধূর্ততায়, শঠতায়, হিংস্রতায়, ধর্মান্ধতায় বহুগুণ শক্তিশালী। এদের সাথে লড়তে হলে প্রথমে নিজেকে সেভাবেই যথোপযুক্তভাবে প্রস্তুত করে তুলতে হবে। এই প্রস্তুতির জন্য চাই যতো বেশি সম্ভব জ্ঞানবলে বলীয়ান হওয়া। জীবনের এ পর্যায়ে এসে আম্বেদকর যে আর দমবার পাত্র নন। তিনি দমে যাননি।

ইতোমধ্যে বরোদার মহারাজা গাইকোয়াড়ের অর্থায়নে অস্পৃশ্য মেধাবী ছাত্র হিসেবে আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ মিলে গেলো। শর্ত হলো আমেরিকা থেকে ফিরে বরোদার মহারাজার অধীনে ১০ বছর চাকরি করবেন আম্বেদকর। আমেরিকায় পা দিয়ে এই প্রথম যেন তিনি মুক্তির স্বাদ পেলেন। স্বদেশের মতো এখানে নেই প্রতিনিয়ত জাত, পাত, বর্ণ ও অস্পৃশ্যতার ভণ্ডামি। সবার সাথে একত্রে খেতে পারা, বসতে পারা, প্রাণ খুলে কথা বলতে পারা, যেন নতুন এক স্বপ্নলোক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, মানববিজ্ঞান, নীতিবিজ্ঞান ও অর্থনীতিকে পাঠের বিষয় করে তিনি কঠোরভাবে পড়াশুনায় নিমগ্ন হলেন। ১৯১৫ সালে ‘Ancient Indian Commerce’ বিষয়ে অর্থনীতিতে এম.এ ডিগ্রী অর্জন করেন এবং ১৯১৬ সালের জুন মাসে ‘National Dividend of India- a Historic and Analytical Study’ বিষয়ে তাঁর লিখিত থিসিসের জন্য ডক্টরেট উপাধি লাভ করেন। ১৯১৭ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। শিক্ষাশেষে এর মধ্যেই তিনি জাহাজযোগে স্বদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন এবং ১৯১৭ সালের ২৪ আগস্ট বোম্বাইতে পৌঁছে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।

তাঁর কর্মজীবনের বহুমুখী কর্মকাণ্ডের মধ্যেও তিনি পুনরায় ১৯২০ সালের জুলাই মাসে উচ্চ শিক্ষার্থে বিলেত যান। সেখানে ‘London School of Economics and Political Science’ কলেজে ভর্তি হন এবং তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ ‘Provincial Decentralisation of Imperial Finance in British India’ বিষয়ের উপর M.Sc ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯২২ সালে ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও অর্থাভাবে সেবারের গবেষণা শেষ করতে পারেন নি। ১৯২৩ সালে পুনরায় লন্ডনে ফিরে এসে ‘The Problem of the Rupee’ নামক প্রবন্ধের উপর গবেষণা কাজ চালিয়ে D.Sc উপাধি লাভ করেন। এরপর লন্ডনে ওকালতি শুরু করেন এবং সেখান থেকে Bar-at-Law ডিগ্রী লাভ করেন।

স্বদেশে ফিরেই ১০ বছর চাকুরি করার অংগীকার অনুযায়ী ড. আম্বেদকর বরোদা স্টেট-এ যোগদান করলেন। মহারাজা তাঁকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে তার আগে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রথমে সামরিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দিলেন। প্রথম কর্মজীবনে প্রবেশ করেও এতোবড়ো পদবীধারী বিদ্বান ব্যক্তিকে ফের অস্পৃশ্যের সেই পুরনো ঘৃণ্য আগুনে পড়তে হলো। অফিসের শিক্ষিত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পিওন পর্যন্ত কেউ তাঁর সাথে কথা বলতো না, তাঁর ফাইল-পত্র টেবিলের উপর ছুঁড়ে মারা হতো, এমনকি অফিসে রক্ষিত পানীয় জল খেতে পারতেন না। এ সময়ে থাকার কোন সুব্যবস্থা না থাকায় তিনি বংশ পরিচয় গোপন রেখে এক পার্সী হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ক’দিন পর পার্সীদের কিছু লোক জানতে পারলো যে, তাদের হোটেলে অবস্থানকারী লোকটি একজন অস্পৃশ্য শ্রেণীভুক্ত, সে হিন্দু নয়। তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠলো তারা। দলবদ্ধ হয়ে লাঠি-সোটা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। আম্বেদকর কর্মদিবস শেষে হোটেলে প্রবেশের পূর্বেই বিক্ষুব্ধ পার্সী লোকজন কর্তৃক বাধাগ্রস্ত ও লাঞ্ছিত হলেন। এরপর তারা জোর করে তাঁকে সে স্থান ত্যাগ করতে বললো এবং তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি ছুঁড়ে ফেলে দিলো। পাশ্চাত্যের সুধীমহলে বিপুলভাবে অভিনন্দিত কীর্তিমান এই ছাত্রটিকে শেষপর্যন্ত স্বদেশের অশিতি, মুর্খ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকদের তাড়া খেয়ে নিরাশ্রিত হয়ে সারাদিন গাছতলায় বসে বড় বিষণ্ন মন নিয়ে ভাবতে হয়েছিলো, অস্পৃশ্যরা কি হিন্দু নয় ?

আম্বেদকর এই ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে মহারাজাকে চিঠি লিখলেন। মহারাজা তাঁর দেওয়ানকে এর বিহিত ব্যবস্থা করতে বললে দেওয়ান তার অক্ষমতার কথা মহারাজাকে জানিয়ে দিলেন। এর অল্প ক’দিন পরেই এক বুক কষ্ট নিয়ে আম্বেদকর বোম্বাই ফিরে এলেন। এ ঘটনায় হিন্দু সমাজের জঘন্যতম রূপটিও তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো। এর উৎসটাকে চিহ্নিত করতেও তাঁর কষ্ট হলো না।

অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আন্দোলন…
বরোদা থেকে আম্বেদকর যখন বোম্বাই ফিরে এলেন এবং সিডেনহ্যাম কলেজ অব কমার্স এ্যান্ড ইকনমিক্স কলেজে আইনের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন, এখানেও অস্পৃশ্যতার ন্যাক্কারজনক থাবা থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন না। বর্ণহিন্দু ছাত্ররা প্রথমে তাঁর ক্লাশ বর্জন করলো, সহকর্মী শিক্ষকরা তাঁর সাথে এক টেবিলে বসে চা-পান ও গল্প-গুজব করতেন না এবং স্টাফরুমের কলসী থেকে জল পানের ক্ষেত্রেও তাদের আপত্তি ছিলো। এ সময়ে চলমান রাজনীতিতে ভারতে স্বায়ত্বশাসনের দাবী জোরদার হয়ে উঠেছে। তখন ভারত সচিব মন্টেগু সাম্প্রতিক অবস্থা সরাসরি জানার জন্য ভারতে আসেন। বিভিন্ন সংগঠন ও জাতিগোষ্ঠি তার কাছে বিভিন্ন দাবী-দাওয়া পেশ করতে লাগলো। এরই মধ্যে ১৯১৮ সালের ২৩ ও ২৪ মার্চ বোম্বাইতে ডিপ্রেসড ক্লাশেস মিশনের পক্ষে বরোদার মহারাজা সয়াজিয়া গাইকোয়ারের পৌরহিত্যে ভারতের অনেক নেতৃবর্গের উপস্থিতিতে যে মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে বালগঙ্গাধর তিলক বলেন যে- অস্পৃশ্যতা হিন্দু সমাজের একটি মস্তবড় ব্যাধি এবং একে অবশ্যই দূর করতে হবে। স্বয়ং ভগবান অস্পৃশ্যতাকে সমর্থন করলেও তিনি করবেন না। অথচ সম্মেলনের ইশতেহারে যখন বলা হলো, কোন নেতা তাদের দৈনন্দিন জীবনে অস্পৃশ্যতা মানবেন না, তখন তিলকই সেই ইশতেহারে সই করলেন না।

রাজনীতির প্রাথমিক অভিজ্ঞতাতেই এমন জ্বালাময়ী বক্তব্য দানকারীদের স্বরূপটাকে ভালোভাবে বুঝে নিতে ভুল করলেন না তিনি। কথায় ও নিজের জীবনাচারে প্রচণ্ড স্ববিরোধী এসব চরিত্রের সাথে কখনোই আপোষকামী না হবার দৃঢ়তাটা আম্বেদকর তখনই নিজের মধ্যে ধারণ করে নিলেন। ফলে নেতৃস্থানীয় ইন্ডিয়ান স্কলার হিসেবে ড. আম্বেদকরকে মন্টেগু চেম্বসফোর্ড রিফর্মস এর ভিত্তিতে নির্বাচন সম্পর্কে সাউথবোরো কমিটিতে আমন্ত্রণ জানালে তিনি নির্যাতিত শ্রেণীর জন্য পৃথক নির্বাচন ও সংখ্যানুপাতে আসন সংরক্ষণের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন। ফলে ১৯১৯ সালের নতুন আইনে (Government of India Act 1919) নির্যাতিত শ্রেণীর রাজনৈতিক অধিকার প্রথম স্বীকৃত হয়। এ আইনে কেন্দ্রীয় আইন সভায় নির্যাতিত শ্রেণীর বেশ কিছু সংখ্যক সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এ সময়ে অস্পৃশ্যদের শিক্ষার প্রসার ও জাতিগত বিধিনিষেধের অবসানকল্পে কোলাপুরের মহারাজা শাহু মহারাজ আন্তরিক উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে এলে তাঁরই অর্থায়নে ১৯২০ সালে ড. আম্বেদকর ‘মুকনায়ক’ নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। প্রথম সংখ্যাতেই ড. আম্বেদকর হিন্দুধর্মীয় বৈষম্যনীতির কঠোর সমালোচনা করেন। এ বছরের মে মাসে নাগপুরে শাহু মহারাজের সভাপতিত্বে একটি সর্বভারতীয় অস্পৃশ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অস্পৃশ্যদের জন্য এটাই প্রথম সর্বভারতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনে ড. আম্বেদকরের চেষ্টায় অস্পৃশ্য মাহারদের আঠারটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্মিলিতভাবে ভোজোৎসবের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ মাহার সম্প্রদায় গড়ে তোলা হয়। এরপরই ড. আম্বেদকর বিদেশী বন্ধু মিঃ নাভাল ভাথেনার আর্থিক সহযোগিতায় ব্যারিস্টারি সনদপ্রাপ্ত হওয়ার পর স্বাধীনভাবে আইন ব্যবসায় নেমে পড়েন এবং নিজ যোগ্যতায় এতে সাফল্য অর্জন করেন।

ইতোমধ্যে নির্যাতিত শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে এস.কে. বোলে কেন্দ্রীয় আইন সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পাশ করান। তা হলো পুকুর, জলাশয়, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, সরকারি অফিস, কোর্ট কাচারিতে নির্যাতিতদের সমানাধিকার থাকবে। আইনগতভাবে পাশ হলেও বাস্তবে তা কার্যকরি হলো না। এদিকে গান্ধীজী খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে মার খাওয়ার পর ১৯২৪ সালে ‘হরিজন’ সম্প্রদায়ের কল্যাণে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। এর পেছনে অস্পৃশ্যদের কল্যাণের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটাই যে প্রধান ছিলো ড. আম্বেদকর তা বুঝতে পেরেছিলেন ঠিকই। একই বছর ১৯২৪ সালে ড. আম্বেদকর অস্পৃশ্যদের উপর চাপিয়ে দেয়া বাধা নিষেধ দূর করার প্রয়াসে কেন্দ্রীয় সংগঠনের গোড়াপত্তন করার উদ্দেশ্যে একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। এই সম্মেলন থেকেই স্যার চিমনলাল শীতলবাদকে সভাপতি করে ২৯ জুলাই ‘বহিষ্কৃত হিতকারিণী সভা’ নামে একটি সমিতি গঠিত হয়। এই সমিতির মাধ্যমে ১৯২৫ সালের গোড়া থেকেই দলিত সম্প্রদায়ের সহায়তামূলক কিছু শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক উদ্যোগ যেমন ছাত্রাবাস নির্মাণ, পত্রিকা প্রকাশ, ফ্রি রিডিং রুম স্থাপন, মাহার হকি কাব গঠন ইত্যাদি বাস্তবায়ন করা শুরু হয়। ড. আম্বেদকরের এই উদ্যোগ দক্ষিণ ভারত তোলপাড়সহ ভারতের অন্যান্য প্রান্তেও আছড়ে পড়ে নতুন এক আন্দোলনের ঢেউ তুলতে লাগলো।

এরই মধ্যে ১৯২৬ সালের মার্চ মাসে মাদ্রাজে সংঘটিত আর একটি ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপি উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মুর্গেসন নামক একজন অস্পৃশ্য যুবক ঝড়-বৃষ্টিতে বিপণ্ন হয়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তাদের জন্য নিষিদ্ধ একটি মন্দিরে ঢুকে পড়লে মন্দির অপবিত্র করার দায়ে দণ্ডিত হয়ে উচ্চবর্ণ লোকদের হাতে তাকে প্রাণ দিতে হয়। আম্বেদকর এ ঘটনাবলী গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাঁর ‘মুক-নায়ক’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ফলাও করে ছাপতে থাকলে আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরপর তিনি সাধারণ মানুষের কাতারে গিয়ে জ্বালাময়ী ও উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে অস্পৃশ্যদের মনে এক অভূতপূর্ব আত্মপ্রত্যয়ের সৃষ্টি করতে লাগলেন। আত্ম নির্ভরতা, আত্ম উন্নয়ন ও আত্মসম্মান, এই তিনটি মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করতে লাগলেন-

‘আমাদেরও জন্মভূমির উপর অন্যান্যদের মতো সমান অধিকার রয়েছে, যে অধিকার থেকে আমাদেরকে শত সহস্র বছর ধরে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। আজ মরনপণ সংগ্রাম করেও সে অধিকার আমাদের আদায় করে নিতে হবে।’

তিনি আরো বলতেন-

‘আগে নিজেকে জাগ্রত করতে হবে। যারা মানুষ হয়েও সমাজে পশুর চেয়ে অধম, যুগ যুগান্তরে সমাজের প্রাণপণ সেবা করেও হিন্দু সমাজের যে সব ধূর্ত ও প্রবঞ্চকের দল তাদের শত সহস্র বছরকাল অস্পৃশ্যতার মালা পড়িয়ে কুকুর বিড়ালের চেয়েও বেশি ঘৃণ্য করে এসেছে সেই সমস্ত মানুষদের প্রথম প্রয়োজন মানুষের অধিকার লাভ। অন্যথায় তাদের জীবনে রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোন ভিত্তি নেই।’

চৌদার পুকুর অভিযান ও বাবা সাহেব খ্যাতি অর্জন
১৯২৩ সালের কেন্দ্রীয় আইন সভায় গৃহীত ‘বোলে প্রস্তাব’ অনুযায়ী মাহাদ মিউনিসিপালিটি ১৯২৪ সালে চৌদার পুকুর অস্পৃশ্যদের জন্য মুক্ত করা হবে বলে ঘোষণা প্রকাশ করেছিলো। কিন্তু মুসলমান ও খ্রীস্টানরা এই পুকুরের জল অবাধে ব্যবহার করলেও অস্পৃশ্যদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধা-নিষেধ ঠিকই বলবৎ রইলো। এমন কাগুজে ঘোষণার মধ্যে অস্পৃশ্যদের অধিকার সীমাবদ্ধ থাকার প্রেক্ষিতে ১৯২৭ সালে ড. আম্বেদকর এবার সরাসরি কার্যকর আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি এ বছরের ১৯ ও ২০ মার্চ মাহাদে একটি সম্মেলন আহ্বান করলেন। এ সম্মেলনে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় দশ হাজার প্রতিনিধি ও কিছু উদারমনা বর্ণহিন্দু ব্যক্তির উপস্থিতিতে ড. আম্বেদকর এক জ্বালাময়ী বক্তৃতায় বলেন-

‘আমরা যদি নিজেদের মর্যাদা নিজেরা সৃষ্টি করতে না পারি কেউই আমাদের মর্যাদা দেবে না এবং পদে পদে অপমান ও ঘৃণা করবে। আমাদের প্রত্যেককে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। ভবিষ্যৎ বংশধরদের যদি আমাদের চেয়ে উন্নতস্তরে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা না করি তবে আমাদের সঙ্গে পশুদের পার্থক্য কোথায় ?’

এ সম্মেলনে প্রথম দিনে ১৯২৪ সালে গৃহীত বোলে প্রস্তাবসমূহ অবিলম্বে বাস্তবায়নে সরকারী দৃষ্টি আকর্ষণের প্রস্তাব রাখা হয়। এবং দ্বিতীয় দিনের সম্মেলন শেষে প্রতিনিধিগণ এক বিরাট শোভাযাত্রা নিয়ে চৌদার পুকুর অভিমুখে যান। ড. আম্বেদকর প্রথম পুকুরের জল স্পর্শ ও পান করে অস্পৃশ্যদের হাজার বছরের অনধিকার ভেঙ্গে দেন। সাথে সাথে সহস্র মানুষের জয়ধ্বনিতে পুকুর প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে এবং নির্যাতিত শ্রেণীর হাজার হাজার জনতা সমস্বরে ড. আম্বেদকরকে ‘বাবা সাহেব’ বলে আখ্যায়িত করলেন। এরপর জনতা আনন্দ মিছিল নিয়ে নিকটবর্তী বীরেশ্বর প্যান্ডেলে ফিরে আসেন।

এদিকে কুচক্রী বর্ণ হিন্দুরা অপপ্রচার করতে লাগলো যে, অস্পৃশ্যরা শুধু পুকুরের জলই অপবিত্র করে নাই, তার বীরেশ্বরের মন্দিরও অপবিত্র করতে আসছে। ফলে একদল হামলাবাজ অতর্কিতে প্যান্ডেল আক্রমণ করে। এ হামলার খবর ডাক বাংলোতে অবস্থানরত ড. আম্বেদকরের কানে পৌঁছলে তিনি দ্রুত পুলিশ কর্তৃপক্ষকে প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে কয়েকজন সহচর নিয়ে দ্রুত প্যান্ডেল অভিমুখে ছুটে এসে হামলাকারীদের উদ্দেশ্যে জানালেন যে মন্দির অভিযানের কোন পরিকল্পনা তাদের নেই। এমন সময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নেতৃবর্গ ও অস্পৃশ্য সাধারণ জনগণ তাদের প্রিয় নেতার সামনে এসে পাল্টা হামলা চালাবার নির্দেশ দানের জন্য আবেদন জানালে তিনি তাদেরকে আইনানুগ ব্যবস্থায় বিহিত ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বস্ত করেন।

আন্দোলনের তীব্রতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। দেশের সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়লো। কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বন করলেন, কেউ আম্বেদকরের পাশে এস দাঁড়ালেন। এদের একজন বীর সাভারকর। যিনি স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করলেন-

‘অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ শুধু যুগোপযোগী নীতি বা কর্তব্য হিসেবেই নয়, মনুষ্যত্বের ন্যায়বিচার ও হিন্দু ধর্মের বৃহত্তর স্বার্থের জন্যেও অবিলম্বে এ ব্যাধি অপসারণ করা দরকার। গোবর ও গোমূত্র নামক পশুমল দ্বারা পবিত্রকরণের হিন্দু ব্যবস্থার ঘৃণ্য ও হাস্যকর বিধান থেকে হিন্দু ধর্মকে মুক্ত করা প্রয়োজন।

উত্তেজনা তীব্র হতে থাকলে ১৯২৭ সালের ৪ঠা আগস্ট হঠাৎ করে মাহাদ মিউনিসিপালিটি এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে চৌদারপুকুরটিকে অস্পৃশ্যদের কাছে উন্মুক্ত রাখার ১৯২৪ সালের প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়। এ ঘটনা ড. আম্বেদকরের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিলো। এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তিনি ১৯২৭ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর বোম্বাইয়ের দামোদর হলে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করেন। এতে মাহাদ মিউনিসিপালিটির অবৈধ প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করা হয় এবং সর্বসম্মতিক্রমে এই অন্যায় আদেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এখান থেকেই ২৫ ও ২৬শে ডিসেম্বর চৌদার পুকুরে সত্যাগ্রহ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে ২৫শে ডিসেম্বর পনের হাজার সত্যাগ্রহীর উপস্থিতিতে সম্মেলন শুরু হলো। ইতোমধ্যে কয়েকজন ব্যক্তি পুকুরটিকে তাদের ব্যক্তিগত দাবী করে কোর্টে কাগজপত্র দাখিল করেছিলো। তাই কোর্ট কর্তৃক পুকুরটি সর্বসাধারণের সম্পত্তি হিসেবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে সত্যাগ্রহ মূলতবী রাখার জন্য জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সত্যাগ্রহ স্থগিত রাখার প্রস্তাব গৃহিত হয়। এই সম্মেলনেই ড. আম্বেদকর হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থ ‘মনুসংহিতা’র তীব্র সমালোচনা করে বলেন-

‘মনুসংহিতাকে হিন্দু ধর্মের আচরণবিধির পবিত্র গ্রন্থরূপে গণ্য করা হয়। মনুস্মৃতিকে ব্রাহ্মণ জগদীশ্বর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, শূদ্রের সম্পদ অর্জনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং ব্রাহ্মণেরা শূদ্রের সম্পত্তির ন্যায়সঙ্গত অধিকারী বলে স্বীকৃত হয়েছে। যে কোন বর্ণের নারী ব্রাহ্মণদের উপভোগের বস্তু। গ্রন্থটি ব্রাহ্মণ্যবাদের কালাকানুন এবং সভ্যসমাজের কলঙ্ক। কাজেই গ্রন্থটিকে অবিলম্বে ভষ্মীভূত করা প্রয়োজন।’

তাঁর এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সম্মেলনের উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলো। ফলে এই সম্মেলন থেকেই প্রথম মানবাধিকারের এক সনদপত্র পাশ করানো সহ হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থ মনুস্মৃতির প্রজ্জ্বলন সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হলো এবং সর্বসম্মতিক্রমে ২৫ ডিসেম্বর রাত ৯টায় সোচ্চার ধিক্কার ও বিপুল আনন্দধ্বনির মধ্য দিয়ে সর্বসমক্ষে ‘মনুস্মৃতি’র বহ্ন্যুৎসব করা হয়।
এদিকে পরবর্তী তিন বছর ধরে চলা চৌদার পুকুরের মামলায় শেষপর্যন্ত অস্পৃশ্যরাই জয়লাভ করলো। আর এই মাহাদ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতেই অল্প সময়ের মধ্যে ড. আম্বেদকরের পক্ষ সারা ভারতে তফসীলি বা দলিত আন্দোলনও গড়ে তোলা সম্ভব হলো।

সাইমন কমিশন রিপোর্ট
১৯২৮ সালের প্রথম সপ্তাহে ভারতের সমস্যাবলী সমীা করার জন্য স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বৃটিশ প্রতিনিধি দল বোম্বাই আসে যা ‘সাইমন কমিশন’ (Simon Commission) নামে পরিচিত। এখানে কোন ভারতীয়কে অন্তর্ভুক্ত না করায় ভারতীয় কোন রাজনৈতিক দলই এই কমিশনকে স্বাগত জানায়নি। এই সময় কংগ্রেস কর্তৃক হিন্দু, মুসলমান, পার্সী, শিখ, দ্রাবিড় ও এ্যাংলো ইন্ডিয়ান প্রভৃতি প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সর্বভারতীয় সম্মেলন আহূত হলেও এই সম্মেলনে নির্যাতিত শ্রেণীর কোন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবে সাইমন কমিশনের কাজে সহায়তা করার জন্য আইন সভার সদস্যদের নিয়ে প্রত্যেক প্রদেশের গঠিত কমিটিতে বোম্বাই থেকে আম্বেদকর মনোনীত হন। নির্যাতিত শ্রেণীর ১৬টি সংস্থা সাইমন কমিশনের কাছে পৃথক নির্বাচনের দাবী জানায়। ড. আম্বেদকর তাঁর ‘বহিষ্কৃত হিতকারিনী সভা’র পক্ষ থেকে সংরক্ষিত আসনে যুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা এবং নির্যাতিত শ্রেণীর জন্য পৃথক আসন দাবী করেন। শেষাবধি কমিশনের সাথে ঐকমত্যে আসতে না পেরে তিনি দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণ ও ঐক্যের প্রতি অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে আলাদাভাবে রিপোর্ট পেশ করেন। এই রিপোর্ট প্রকাশিত হবার পর ড. আম্বেদকর সত্যিকার দেশপ্রেমিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি পান।

১৯৩০ সালের আগস্ট মাসে আম্বেদকরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় নির্যাতিতদের নিয়ে নাগপুরে এক সম্মেলন সভায় তিনি বলেন-

‘জাতিধর্ম নির্বিশেষে অখণ্ড জাতীয়তাবোধের মাধ্যমে ভারতীয়দের পক্ষে স্বাধীন সরকার গঠন সম্ভব। তবে সংবিধান তৈরিকালীন সময়ে বিভিন্ন জাতির সুবিধা অসুবিধার দিকসমূহ বিবেচনার দাবী রাখে। … এক দেশের উপর অন্য দেশের শাসন যেমন বরদাস্ত করা যায় না, তেমনি কোন জাতি বা শ্রেণীর শাসনকে ভাল বলে মেনে নেওয়া যায় না।’

মন্দির প্রবেশ অভিযান
আম্বেদকরের উস্কে দেয়া দলিত আন্দোলন ভারতব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্নস্থানে এই আন্দোলন নির্যাতিতদের শত শত বছরের নিষিদ্ধ থাকা মন্দিরে প্রবেশের অধিকার আন্দোলনেও একাত্ম হয়ে পড়ে। এসব আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও পূজা কমিটি অস্পৃশ্যদের পূজামণ্ডপে প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। কোথাও কোথাও সংঘর্ষের রূপ নেয়। ইতোমধ্যে বর্ণবাদী হিন্দু প্রতিনিধি গান্ধিজী মন্দির প্রবেশের এসব আন্দোলনকে বানচাল করার জন্য বিভিন্ন কূট কৌশল প্রয়োগ করতে লাগলেন। আম্বেদকর বুঝতে পারছিলেন যে গান্ধিজীও আসলে হরিজনদের মন্দির প্রবেশের অনশন আন্দোলনের নামে এক কূট-রাজনীতি শুরু করে দিয়েছেন। তাই তার অনুগামী সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলে দিলেন যে, কোন মানুষের মধ্যে অত্যুজ্জ্বল সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে দেখলে তাকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা ভেবে অবতারে পরিণত করাই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত রেওয়াজ। তারা অস্পৃশ্যরা যেন কখনও তাঁর (আম্বেদকর) উপর দেবত্ব আরোপ না করেন। একমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতাই তাদের পার্থিব দুঃখ দুর্দশার হাত থেকে রা করতে পারে। তিনি আরো বলেন-

‘ভগবানের প্রতি ভক্তি, কোন মহাত্মার পেছনে ছোটা, তীর্থ গমন, অনশন বা উপবাসে মুক্তি মিলবেনা, মুক্তি মিলবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।’

লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠক
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত ১৯৩০ ও ১৯৩১ সালের প্রথম ও দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক (Round Table Confarence) যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ছিলো। এখানে মহাত্মা গান্ধী, মহম্মদ আলী জিন্নাহ, এ কে ফজলুল হক, শিখ নেতা উজ্জল সিং প্রমুখ ভারতের সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজ্যের ভারতীয় রাজন্যবর্গের সাথে ভারতের বড়লাট কর্তৃক এই প্রথম দলিত প্রতিনিধি হিসেবে ড. আম্বেদকরও আমন্ত্রিত হন। সেখানে মহাত্মা গান্ধী নির্যাতিত শ্রেণীর জনগণের সমস্যাকে মামুলি ব্যাপার বলে উপেক্ষা করতে চাইলেও আম্বেদকর দলিত সম্প্রদায়ের পক্ষে বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ করে কড়া যুক্তিসহকারে বিভিন্ন দাবী দাওয়া উত্থাপন করেন। শেষপর্যন্ত এই গোলটেবিল বৈঠক কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই মূলতবি হয়ে গেলো।

ঐতিহাসিক পুনা চুক্তি
১৯৩২ সালের জানুয়ারিতে ‘ফ্রান্সাইজ কমিটি’র আহ্বানে কমিটির সদস্যদের সাথে আম্বেদকর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ পরিভ্রমণকালে সর্বত্রই তাঁর উদ্যোগে নির্যাতিত শ্রেণীর লোকেরা কমিটির কাছে তাদের পৃথক নির্বাচনের দাবী জানিয়েছেন।
তখন কেন্দ্রীয় আইন সভায় নির্যাতিত শ্রেণীর প্রতিনিধি ছিলেন এম.সি রাজা। তিনি প্রথমে ড. আম্বেদকরের পৃথক নির্বাচনের সক্রিয় সমর্থক হলেও পরবর্তীতে ড. মুঞ্জের সাথে একত্রে সংরক্ষিত আসনের ভিত্তিতে যুক্ত নির্বাচনের দাবী জানিয়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রেরণ করে আম্বেদকরকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিলেন।

ড. আম্বেদকর পূর্বে সংরক্ষিত আসনে যুক্ত নির্বাচনের পক্ষপাতী ছিলেন এবং সাইমন কমিশনে উক্ত দাবী করেছিলেন। কিন্তু আম্বেদকরের এই দাবী গান্ধিজী মেনে নিতে অপরাগতা প্রকাশ করায় নির্যাতিত জনসাধারণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ড. আম্বেদকরও পৃথক নির্বাচনের জোরালো দাবী তোলেন। এই দাবীর সমর্থনে সারা ভারতে প্রচণ্ড উত্তেজনা দেখা দেয় এবং নির্যাতিত শ্রেণীর অনেক সংগঠন এই দাবীর সমর্থনে এগিয়ে আসে।

১৯৩২ সালের ১লা মে ‘ফ্রান্সাইজ কমিটি’র অধিবেশন শেষ হয়। এই কমিটি কর্তৃক নির্যাতিত শ্রেণী বলতে কাদেরকে বুঝাবে তার একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা তৈরি করা হয়। তা অনুসারে হিন্দু সমাজের যে সমস্ত শ্রেণীর মানুষকে অস্পৃশ্য হিসেবে গণ্য করা হয় তারাই ‘নির্যাতিত শ্রেণী’ (Depressed Classes) নামে চিহ্নিত হবে।

এ প্রেক্ষিতে ৭ মে নাগপুরে ১৫/২০ হাজার লোকের সমাবেশের মধ্য দিয়ে সর্বভারতীয় দলিত বা নির্যাতিত শ্রেণীর মহা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ড. আম্বেদকরের দাবীকে সমর্থন করে নির্যাতিতদের পৃথক নির্বাচনের দাবী সমর্থিত হয় এবং রাজা-মুঞ্জে ফ্যাক্টকে নির্যাতিত শ্রেণীর স্বার্থ বিরোধী বলে ঘোষণা করা হয়।

এদিকে এম.সি রাজার ডিগবাজীর কারণে বিচলিত আম্বেদকর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং শীঘ্রই লন্ডনের পথে যাত্রা করেন। ১৯৩২ সালের ৭ জুন লন্ডনে পৌঁছে দাবী সম্বলিত ২২ পৃষ্ঠার এক স্মারকলিপি ব্রিটিশ কেবিনেটে পেশ করেন এবং উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে নির্যাতিত শ্রেণীর অনেক বিষয়াদি সম্পর্কে তাদের অবহিত করান।

১৯৩২ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সাম্প্রদায়িক বন্টনের রায় ঘোষিত হয়। এতে পশ্চাৎপদ শ্রেণীর জন্য প্রাদেশিক আইন সভায় পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা এবং দ্বৈত ভোটাধিকারের ব্যবস্থাও স্বীকৃত হয়। এই দ্বৈত ভোট পদ্ধতি হলো- একটি ভোট নিজেদের প্রার্থীকে এবং অন্যটি সাধারণ প্রার্থীকে প্রয়োগ করতে পারবে। এছাড়া ভারতের অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্যেও পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা স্বীকৃত হয়। ফলে পার্লামেন্টে হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ট হয়ে পড়ার আশঙ্কায় হিন্দু স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পত্র-পত্রিকাগুলো সাম্প্রদায়িক বন্টনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণাত্মক খবর ছাপতে থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হলেন পুনার যারবেদা জেলে অবস্থানরত বর্ণ হিন্দুদের প্রধান স্বার্থরাকারী প্রতিভূ মহাত্মা গান্ধী। এই সাম্প্রদায়িক বন্টনের ফলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে চলেছে এই ধারণার বশবর্তী হয়ে নির্যাতিত শ্রেণীর বহু প্রত্যাশিত ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই প্রথম গান্ধিজী আমরণ অনশনের শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলেন।

গান্ধিজীর আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত কংগ্রেস নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ উত্তেজনার সৃষ্টি করলো। গান্ধিজীর জীবন রক্ষার জন্য কেউ কেউ ড. আম্বেদকরের ঐকান্তিক সহযোগিতা কামনা করলেন। অসংখ্য টেলিগ্রাম ও পত্র মারফত কেউ সাম্প্রদায়িক বন্টনের দাবী ত্যাগের অনুরোধ করতে লাগলেন, কেউ বা ড. আম্বেদকরের জীবননাশের হুমকি দিতে লাগলেন, আবার কেউ সাম্প্রদায়িক বন্টনের সিদ্ধান্তে অটল থাকার অনুরোধ জানালেন। আম্বেদকর তাঁর সিদ্ধান্তে অবিচল রইলেন। নির্যাতিত জনগণের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করতে তিনি নারাজ। লন্ডনে অনুষ্ঠিত গোল টেবিল বৈঠকে নির্যাতিত শ্রেণীর জনগণের সমস্যাকে যে গান্ধিজী মামুলি ব্যাপার বলে উপেক্ষা করেছিলেন, অথচ আজ তিনি সেই মামুলি সমস্যার জন্য কেন আমরণ অনশন পালনের সিদ্ধান্ত নিলেন ?

ড. আম্বেদকর প্রশ্ন তোলেন-

গান্ধিজী তো ইংরেজদের দেশ ছাড়তে, মুসলমান বা অন্যান্য সংলঘুদের পৃথক নির্বাচনের বিরুদ্ধে বা সমাজ থেকে চিরতরে অস্পৃশ্যতার মূলোৎপাটন করতে কোনদিন আমরণ অনশনে যাননি। আসলেই তিনি শক্ত মাটিতে পদাঘাত করার মত মুর্খ নন। অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পৃথক নির্বাচনে যদি ভারতের জাতীয়তা নষ্ট না হয় তাহলে অস্পৃশ্যদের পৃথক নির্বাচনে ভারতের জাতীয়তা নষ্ট হবে কেন ?

পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গান্ধিজীর আমরণ অনশন শুরু হয়ে গেলে ১৯৩২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বোম্বাইয়ের ‘ইন্ডিয়ান মার্চেন্টস চেম্বার হলে’ পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যের সভাপতিত্বে বর্ণবাদী হিন্দুদের একটি সম্মেলন আহুত হয়। এই প্রথম এরকম একটি সম্মেলনে ড. আম্বেদকর আমন্ত্রিত হলেন। এ সভায় অন্যান্যদের মধ্যে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন ড. মুঞ্জে, ড. সোলাংকি, চিমন লাল শীতলবাদ, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, ড. দেশমুখ, ড. সাভারকর, মানু সুবেদার, কমলা নেহেরু, তেজ বাহাদুর সপ্রু, চৈত রাম, অ্যানি বেসান্ত, ঠক্কর, কে নটরাজন ও পি.ও গিদওয়ানী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

সভাপতির অনুরোধক্রমে প্রথমে ড. আম্বেদকর তাঁর নাতিদীর্ঘ বক্তৃতায় বলেন-

‘…এটা দুঃখের বিষয় যে, গান্ধিজী নির্যাতিত শ্রেণীর জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে আমরণ অনশন শুরু করেছেন। সকলে যে তাঁর মূল্যবান জীবন রক্ষার জন্য ব্যাকুল হবেন এটাই স্বাভাবিক। আপনারা হয়তো আমাকে নিকটতম ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে গুলি করে মারতে পারেন, কিন্তু আমি যে পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্যভার গ্রহণ করেছি তা থেকে আমি বিচ্যুত হতে পারবো না। গান্ধিজী কোন বিকল্প প্রস্তাব না রাখায় আমি এই সমস্যার সমাধান খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা বরং গান্ধিজীকে এক সপ্তাহের জন্য অনশন বন্ধ রাখতে অনুরোধ জানান এবং এই সময়ের মধ্যে কোন না কোন একটা সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে।’

প্রস্তাব চালাচালি শুরু হলো। কিন্তু দুপক্ষের কারো প্রস্তাব কেউ গ্রহণ করতে পারছেন না।
এদিকে গান্ধিজীর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচেছ। বিষয়টি ড. আম্বেদকরকে চিন্তিত করে তুললো। কেননা কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেলে গান্ধিজীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভারতে অস্পৃশ্য নির্যাতিত শ্রেণীর উপর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ব্যাপক হতাহত হবার তীব্র সম্ভাবনা দেখা দিতে লাগলো। উপায়ান্তর না দেখে ড. আম্বেদকর ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে একটা আপোষ রফায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই আপোষ চুক্তিতে গান্ধিজী যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন তা অভিনব। কার্যোদ্ধারের জন্য পরম শত্রুর কাছেও পরম মিত্রের অভিনয় করার দক্ষতা। ফলে বৃটিশরাজ কর্তৃক সাম্প্রদায়িক বন্টনের ভোট পদ্ধতিতে বন্টিত ৭৮ টি আসনের পরিবর্তে নির্যাতিত শ্রেণীর জন্য এখন ১৪৮ টি আসনে বৃদ্ধি করা হলো বটে, কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো তাদের কাছ থেকে দ্বিতীয় ভোটাধিকার হরণ করে নেয়া হলো। যার মাধ্যমে অস্পৃশ্যরা সহজেই সাধারণ নির্বাচনকে প্রভাবান্বিত করতে পারতো, সেই পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হলো। এই চুক্তি ভারতের ইতিহাসে ‘কুখ্যাত পুনা চুক্তি’ (Poona Pact) নামে চিহ্নিত হয়ে আছে।

স্ত্রীবিয়োগ
১৯৩৫ সালে বোম্বাই সরকারি আইন কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। দু’বছর তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। এদিকে ছোটকাল থেকে লালন করে আসা সুপ্ত স্বপ্নটিকে এবার বাস্তবায়ন ঘটাতে লাগলেন। বোম্বাইর দাদারের হিন্দু কলোনীতে নিজের মতো করে একটি সুন্দর বাড়ি তৈরি করলেন যার উপর তলায় হলো ৫০ হাজারেরও অধিক পুস্তক পরিপূর্ণ একটি ব্যক্তিগত লাইব্রেরী। বাড়ির নাম রাখলেন ‘রাজগৃহ’। যে নামটির সাথে বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন ইতিহাস জড়িত। কিন্তু এ সুখও সইলো না তাঁর। এ বছরেই ১৯৩৫ সালের ২৭শে মে দীর্ঘ রোগভোগের পর তাঁর স্ত্রীবিয়োগ হলো। তাঁর জীবনের সাফল্যের নেপথ্যে যে ধর্মপরায়ণা, পতিপরায়ণা ও সাংসারিক কাজে কর্মনিষ্ঠ ত্যাগী মহিলার অবদান পরতে পরতে জড়িত, জীবনের অধিকাংশ সময় পড়াশুনা, সামাজিক, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকায় যে পরিবারের প্রতি তেমন নজর দেয়ার সুযোগ হয়নি, তাঁর মৃত্যুতে আম্বেদকর বড় নিঃসঙ্গ ও অসহায় হয়ে পড়লেন। ফলে দিন দিন আরো বেশি করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সচেষ্ট হতে লাগলেন।

স্ত্রীর অনেকদিনের স্বপ্ন ছিলো একবার পান্ধারপুর তীর্থভ্রমণে যাওয়ার। আম্বেদকর বারবার এড়িয়ে গিয়ে বলেছিলেন ব্রাহ্মণ্যবাদের অস্পৃশ্যতা মুক্ত হয়ে যেদিন এক নতুন পান্ধারপুর বানাতে পারবেন সেদিনই তাকে নিয়ে তীর্থে যাবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই স্ত্রীর মৃত্যু হলো। বর্ণবাদের কঠিন নিগড় থেকে এখনো হিন্দু সমাজ মুক্ত হতে পারেনি। এবার তিনি বর্ণবাদী হিন্দু সমাজের কূপমণ্ডুকতা, অসহিষ্ণুতা, গোঁড়ামি, ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠলেন। ফলে বর্ণহিন্দুরাও অত্যন্ত নির্দয় ও কটুভাবে অস্পৃশ্য তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্বেষের বিষ ছড়াতে লাগলো। এর প্রেক্ষিতে এবার তিনি ইয়োলা সম্মেলনের ডাক দিলেন।

ইয়োলা সম্মেলন
১৯৩৫ সালের ১৩ অক্টোবর ইয়োলা সম্মেলনের দিন ধার্য হয়। আসন্ন ইয়োলা সম্মেলনে ড. আম্বেদকর ধর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেবেন বলে গুঞ্জন শোনা যেতে লাগলো। নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠান শুরু হলো। অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি স্বাগত ভাষণে বলেন-

“ভারতে হিন্দু ধর্মের নামে চলছে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, সমস্ত প্রকার সুযোগ সুবিধার পাকাপাকি ব্যবস্থা করাই ব্রাহ্মণ্যবাদের মূল কথা, ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ এই নীতি ব্রাহ্মণ্যবাদের মৌলিক কৌশল। এই নীতিকে ধর্মের সংগে যুক্ত করে এবং তা চিরস্থায়ী করার জন্য বর্ণাশ্রমের প্রতিষ্ঠাপূর্বক ব্রাহ্মণদের বর্ণশ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করা হয়। তাদের আর একটি কৌশল দেব-দেবীর সৃষ্টি, দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে ভক্তদের দানীয় বস্তু দেব-দেবীর পক্ষে গ্রহণ করে ব্রাহ্মণ পুরোহিত কর্তৃক আত্মসাৎকরণ।”

এই অনুষ্ঠানে ড. আম্বেদকর তাঁর দীর্ঘ ভাষণে বলেন-

“…নির্যাতিত শ্রেণীর মানুষদের হিন্দু হয়েও যদি সম অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়, বিগত ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা, রাজনৈতিক শোষণ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন বা সংগ্রাম করেও তাদের কাছ থেকে বিন্দুমাত্র ন্যায়বোধের পরিচয় পাওয়া না যায় তাহলে নির্যাতিত সমাজকে ভাল করে ভেবে দেখতে হবে। তাই দীর্ঘ বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদেরকে আত্মসম্মান ও মানবিক অধিকার লাভ করতে হলে হিন্দু ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে। … আমার চরম দুর্ভাগ্য যে, অস্পৃশ্য সমাজে জন্মেছি বলে আমাকে আত্মসম্মানহীন অপমানজনক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।”

তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেন-

“আমি অস্পৃশ্য হয়ে জন্মগ্রহণ করলেও অস্পৃশ্য হয়ে মরবো না।”

এই সম্মেলনে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো-
১) অস্পৃশ্যদের সামাজিক সমতা লাভের আন্দোলনের প্রতি উচ্চবর্ণের হিন্দুদের উদাসীনতা অথবা বিরোধিতাকে এই সম্মেলনে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানায়।
২) হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করার জন্য বিগত ১৫ বছর ধরে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে নির্যাতিত শ্রেণীর হিন্দুদের সমান সামাজিক অধিকার লাভের নিমিত্ত যে আন্দোলন ও সংগ্রাম তারা চালিয়ে আসছে তা এখন থেকে বন্ধ করা হবে।
৩) অতঃপর তারা সমাজে সম্মানজনক ও সমানাধিকার লাভের জন্য ভারতের অন্য যে কোন ধর্ম গ্রহণ করবে।

ইয়োলা সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো প্রকাশিত হওয়া মাত্র মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্মের নেতৃবর্গের কাছ থেকে এদের স্ব-স্ব ধর্ম গ্রহণের জন্য আহ্বান পত্র আসতে লাগলো এবং ড. আম্বেদকরের ধর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে সারা ভারতে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করলো। এর প্রতিক্রিয়ায় নানা জনের নানা মত ব্যক্ত হতে লাগলো। গান্ধিজী ও সমমনা নেতৃবৃন্দ চিন্তা করলেন অস্পৃশ্যরা যদি হিন্দু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে হিন্দুর সংখ্যা কমে যাবে এবং এই অনুপাতে কংগ্রেসের শক্তি হ্রাস পাবে। অনেকে আশংকা করলেন ড. আম্বেদকর যদি তার অনুগামীদের নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাহলে ভারতে মুসলমানদের শক্তি বেড়ে গেলে হিন্দুদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ফলে হিন্দু মিশনারী নেতারা আম্বেদকরের সাক্ষাত প্রত্যাশা করলেন। আম্বেদকর স্পষ্ট ভাষায় জানালেন- ‘একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি উচ্চবর্ণের হিন্দুরা হিন্দুধর্ম থেকে অস্পৃশ্যতা তুলে নেয় তবে তারা হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করবেন না।’ কিন্তু বর্ণ হিন্দুদের কাছে এ প্রস্তাব কোন গুরুত্ব পেলো না।

পরবর্তীতে অধ্যাপক এন. শিবরাজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে শিবরাজ আম্বেদকরের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে বলেন-

‘হিন্দু ধর্ম আজ প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের কায়েমী স্বার্থের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। অতএব এই ধর্ম পরিত্যাগ করা ছাড়া নির্যাতিতদের আর কোন উপায় নেই।’

একই সম্মেলনে ড. আম্বেদকর বলেন-

‘হিন্দু ধর্মের পুনর্জীবনের আর কোন সম্ভাবনা নেই, তাই অতীব দুঃখের সাথে আমাদেরকে হিন্দু ধর্ম থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।’

(চলবে…)

About the Author:

‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।’ -- প্রাচীন গ্রীক কবি ইউরিপিডিস (৪৮০-৪০৬ খ্রীঃ পূঃ)

মন্তব্যসমূহ

  1. একা মে 29, 2010 at 9:31 অপরাহ্ন - Reply

    কথাটা কোথায় জানাবো বুঝতে না পেরে জানাছি সবাইকে। এই মাত্র জানতে পারলাম বাংলা দেশে ফেসবুক ব্যান করা হয়েছে। নবীর অবমাননার কারনে নাকি? যার যার ফেস বুক আছে দেখুন। আমার নাই অবশ্য।

  2. একা মে 29, 2010 at 7:57 অপরাহ্ন - Reply

    অপুর্ব ! বিশেষ করে শেষ কথাটা মন ছুঁয়ে গেল,

    “হিন্দু ধর্মের পুনর্জীবনের আর কোন সম্ভাবনা নেই, তাই অতীব দুঃখের সাথে আমাদেরকে হিন্দু ধর্ম থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।’

    অনেক কিছুই জানার ছিলো। জানলাম।

মন্তব্য করুন