লেখকের মৃত্যু

By |2010-05-13T11:54:33+00:00মে 12, 2010|Categories: গল্প|4 Comments

লেখকের মৃত্যু
মোজাফ্ফর হোসেন

চরিত্র
শরিফ চৌধুরী : প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক
আশরাফ বিল্লাহ : ডাক্তার
নাজমা আনোয়ার : সাংবাদিক
আকলির মা : কাজের মেয়ে
মাসুম আজিজ : কবি বন্ধু
চরিত্র-১ : কুঁড়েঘর উপন্যাসের নায়ক চরিত্র
চরিত্র-২ : কুঁড়েঘর উপন্যাসের নায়িকা চরিত্র
চরিত্র-৩ : কুদ্দুসের নীল আকাশ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র
চরিত্র-৪ : অজ্ঞাত
তানভির সুমন : ইনস্পেক্টর

১ম দৃশ্য
বর্তমান সময়ের লিডিং কথাসাহিত্যিক শরিফ চৌধুরী তাঁর দামী আসবাবপত্র দ্বারা সজ্জিত গেস্ট রুমে বসে আছেন, একটি জাতীয় দৈনিকের মহিলা সাংবাদিক নাজমা আনোয়ার তাঁর সাক্ষাক্ষার নিচ্ছেন।

নাজমা আনোয়ার: (আয়নাতে শেষবারের মতন নিজের চেহারা ঠিক করে নিয়ে) স্যার কেমন আছেন?
[শরিফ চৌধুরী কিছু বলতে যাবেন এমন সময় আকলির মার প্রবেশ করবে]
আকলির মা: স্যার, ডাক্তার সাহেব ফোন করেছিলেন- আমি রাতে আসতে বলেছি। (প্রস্থান)
শরিফ চৌধুরী: উত্তর পেয়ে গেছেন নিশ্চয়?
নাজমা আনোয়ার: স্যার, কি হয়েছে আপনার?
শরিফ চৌধুরী: মাসখানেক হল থেকে থেকে জ্বর আসছে।
নাজমা আনোয়ার: জ্বর কিন্ত ভালো লক্ষণ না! হেলায় উড়িয়ে দেবেন না। আমার এক নানা…
শরিফ চৌধুরী: (থামিয়ে দিয়ে) দেশের নামকরা ডাক্তার ডা: আশরাফ বিল্লাহ আমার চিকিৎসা করছেন।
নামজা আনোয়ার: আপনার কুদ্দুসের নীল আকাশ উপন্যাসটির জন্য বহু আন্তর্জাতিক পুরুস্কার পেলেন। এই উপন্যাসটি সম্পর্কে আপনার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাচ্ছিলাম?
শরিফ চৌধুরী: দেখুন, কুদ্দুসের নীল আকাশ আমার সব ক’টি উপন্যাসের মতই সমাজের এমন শ্রেনীর মানুষকে নিয়ে যাকে নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। তবে অন্য উপন্যাসগুলোর থেকে এখানে মেসেজটা ভিন্ন: আমি দেখাতে চেয়েছি, উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কুদ্দুসের জীবনে সমস্যার অন্ত নেই। বউ ভেগেছে ভাইয়ের ছেলের সাথে। মেয়েদুটা বেশ্যাবৃত্তি করে জীবন ধারণ করছে, ছেলেটা জেলে। তবুও কুদ্দুস পরিপূর্নভাবে সুখি একজন মানুষ। বস্তির ছাদের ফুটা দিয়ে সে নীল আকাশ দেখে। আকাশে টসটসে চাঁদকে দেখে তার যৌনপ্রবৃত্তি জাগে। তারাদের সে সন্তানের মত ভালোবেসে নিজের দেওয়া নাম ধরে ডাকে। মেঘ হচ্ছে তার বাহন। প্রাপ্তির খাতা তার শূন্যই থেকে গেছে তবুও জীবনের ওপর কোন অভিযোগ নেই। এখানেই কুদ্দুসের সাথে আমাদের পার্থক্য।
নাজমা আনোয়ার: অনেকেই তো বলছে, এ-বছর আপনি সাহিত্যে নোবেল পেয়ে যেতে পারেন। অনূভুতিটা কেমন?
শরিফ চৌধুরী: উম্…দেখো, তথাকথিত পুরস্কার আমার কাছে মুখ্য না। মানুষের স্বীকৃতিই আমার কাছে বড় পুরস্কার। আর তাছাড়া আমার লেখনীর মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে পারছি, তাদেরকে বিশ্বে একটি আইডেনটিটি দিতে পারছি- এই ভালোলাগাটাই বা কম কিসের!
নাজমা আনোয়ার: আপনার উপন্যাস এবং গল্পের চরিত্রগুলো সাধারণত সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষগুলো। কেন? এদেরকে নিয়ে লিখলে চলে বেশি এজন্য নাকি এটা একধরণের দায়বদ্ধতা থেকে লেখা?
[আকলির মা চা দিতে আসবে। টেবিলে ধাক্কা খেয়ে পানির গ্লাসটা শরিফ চৌধুরীর গায়ের ওপর পড়ে যাবে]
শরিফ চৌধুরী: (প্রচন্ড রেগে গিয়ে) চোখের মাথা খেয়েছ নাকি? দেখে কাজ করতে পারো না? এক থাপ্পড় দিয়ে…(দাতে দাত খিঁচে)! কিছু মনে করবেন না। এই ছোটলোকের জাতদের লাই দিয়ে মাথায় ওঠাতে নেই। anyway, খুবই ভালো প্রশ্ন। দেখুন ওদের নিয়ে অনেকেই লিখছে; সবারটা কিন্ত চলছে না। আর হ্যাঁ, এখানে সমাজের ঐ মানুষগুলোর প্রতি আমাদের লেখক হিসাবে একটা দায়বদ্ধতা তো অবশ্যই আছে। আমি সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কাজ করে যাচ্ছি মাত্র।
নাজমা আনোয়ার: এবার একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করছি, আপনি বিয়ে করেননি কেন?
লেখক: (একটু ভেবে নিয়ে) দেখ, মানুষকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে নিজেকে নিয়ে ভাববার আর অবকাশ মেলেনি। আসলে কাজকে সামগ্রিক অর্থে মানুষকে এতটাই ভালোবেসে ফেলেছি যে নিজেকে আর আত্মকেন্দ্রীকতায় নিমগ্ন করতে পারিনি।

২য় দৃশ্য
খাটে শুয়ে আছে শরিফ চৌধুরী এবং পাশে ডা: আশরাফ বিল্লাহ থার্মোমিটার দেখছে।

আশরাফ বিল্লাহ: চৌধুরী সাহেব, মনে হচ্ছে ক্রমেই অবস্তার অবনতি ঘটছে।
শরিফ চৌধুরী: কার অবস্তার- আমার না থার্মোমিটারের?
আশরাফ বিল্লাহ: উম্…! বুঝলেন চৌধুরী সাহেব, মাঝে মধ্যে মানুষের অসুখ হবার বড় প্রয়োজন আছে: এতে করে প্রাণভরে বিশ্রাম নেওয়া যায়।
শরিফ চৌধুরী: তা আছে বইকি! নইলে পৃথিবী থেকে যে ডাক্তার শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটবে!
আশরাফ বিল্লাহ: তা যা বলেছেন।
[আকলির মার প্রবেশ]
আকলির মা: স্যার কাগজের লোক এসেছে। আপনার সাক্ষাক্ষার নিতে চায়।
শরিফ চৌধুরী: কোন কাগজ থেকে?
আকলির মা: স্থানীয় একটি সাহিত্য কাগজ থেকে।
শরিফ চৌধুরী: তোমাকে না বলেছি, এইসব ছোটকাগজের লোকদের খুব বেশি পাত্তা দিবে না? বলে দাও আমি অসুস্থ। আর হ্যাঁ, আমি এখন লিখতে বসবো, আমাকে আর ডিস্টার্ব করবে না।
[আকলির মার হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে প্রস্থান]
আশরাফ বিল্লাহ: (ব্যাগ গোছাতে গোছাতে) আজ তবে উঠি। ঘুমের ঔষধ দিয়ে গেলাম- কয়েকদিন ঘুমিয়ে কাটান সব ঠিক হয়ে যাবে।
শরিফ চৌধুরী: ডাক্তার…?
আশরাফ বিল্লাহ: কিছু বলবেন?
শরিফ চৌধুরী: হু, না ঠিক আছে; আপনি বরং এখন আসুন।

৩য় দৃশ্য
শরিফ চৌধুরী টেবিলে বসে লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়বে। এমন সময় অন্ধকার রুমে সাদা পোশাক পরে একজন নারী এবং পুরুষের প্রবেশ ঘটবে। শরিফ চৌধুরী ঘুমের মাঝে কথা বলবে ওদের সাথে।

শরিফ চৌধুরী: তোমরা আবার এসেছ?
চরিত্র-১: সাহেব, আমি আমার বউকে খুন করতে পারবো না!
শরিফ চৌধুরী: কিন্তু তোর বউকে খুন না করলে যে আমি উপন্যাসটা জমাতে পারব না!
চরিত্র-১: আমি যে ওকে বড় ভালোবাসি?
শরিফ চৌধুরী: চোরের আবার ভালোবাসা!
চরিত্র-১: কেন? চোর হলে কি বউকে ভালোবাসতে নেই?
শরিফ চৌধুরী: শোন্, তুই হচ্ছিস মাতাল, জুয়াড়ূ..! তোর মত মানুষ বউকে খুন করবে এটা আমাদের সমাজে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।
চরিত্র-১: এ আমি পারব না। আপনি উপন্যাসটা অন্যভাবে শেষ করেন! আচ্ছা, আমি যদি চুরি করা ছেড়ে দিই, জুয়া, মদ সব-সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে সাধারণ মানুষ হয়ে যাই?
শরিফ চৌধুরী: সাধারণ মানুষ হয়ে গেলে আমার উপন্যাসের বিশেষত্ব থাকল কোথায়? মারতে তোকে হবেই।
চরিত্র-২: আমি মরতে চাই না সাহেব। আমি বাঁচতে চাই।
শরিফ চৌধুরী: পেট পুরে খেতে পাস না! দেহের জ্বালা মেটে না! তোর এত বাঁচার শখ কেন?
চরিত্র-২: তবু, তবুও আমি বেঁচে থাকতে চাই। বেঁচে থাকতে যে আমার প্রচন্ড ভালোলাগে! হ্যাঁ হ্যাঁ, বেঁচে থাকাতেই আমার সুখ, আমার ভালোলাগা!
শরিফ চৌধুরী: মানুষ আমার উপন্যাস পড়বে তোদের মত ছোটলোকদের ভালোলাগা দেখতে? ওরা তোদের হাহাকার-চরিত্রহানী দেখতেই আমার উপন্যাস পড়ে! তারা সুখ পায়! স্বস্তি পায় নিজেদেরকে তোদের সাথে তুলনা করে! আর আমি পাই পুরস্কার! তোদেরকে যদি সুখের বন্যায় ভাসাই তাহলে পৃথিবীর এত জ্ঞান, অর্থ, সম্মান- এসবের মূল্য কোথায়?! এসব যে একেবারে অর্থহীন হয়ে যাবে!
চরিত্র-২: মানুষ! মানুষ! হায়রে মানুষ!
চরিত্র-১: কিন্তু আর না। আপনার নির্দেশে অনেক অপরাধ করেছি, আর কিছুতেই না। আমি আমার ফুলবানুকে মারতে পারব না। প্রযোজনে…!
শরিফ চৌধুরী: কি বল্লি? আমাকে ভয় দেখাস? হা! হা! হা! আমি তোদের প্রভূ, তোদের সৃষ্টিকর্তা। আমি যেমন করে চাইব তেমন করেই হবে সব। আমার ইচ্ছাই চূড়ান-। তোদের জীবনের করুণ পরিণতির মধ্যে দিয়েই শেষ হবে আমার এই উপন্যাস।
চরিত্র-১: কিছুতেই না। প্রয়োজনে…প্রয়োজনে আমি আপনাকে…
শরিফ চৌধুরী: কি বল্লি? ছোটলোকের বাচ্চা! আমি তোকে…আমি তোকে…!!
[চিৎকার শুনে আকলির মা ছুটে আসবে। আকলির মার হাতের স্পর্শে শরিফ চৌধুরীর ঘুম ভেঙ্গে যাবে।]
শরিফ চৌধুরী: কে…কে…আমি…আমি…!!
আকলির মা: স্যার আমি- আকলির মা! কি হয়েছে? কে ছোটলোকের বাচ্চা? আপনি এমন করছেন কেন?
শরিফ চৌধুরী: ও কিছু না। আমাকে এক গ্লাস পানি দাও তো।
আকলির মা: একি! আপনার গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! ডাক্তার ডাকবো?
শরিফ চৌধুরী: উহ, এত রাতে? না থাক।
আকলির মা: তাহলে একটা ঘুমের ঔষধ খান? দেব?
শরিফ চৌধুরী: ঘুম..!? না না না। আমাকে ওরা…! আমি ঘুমাব না। তুমি যাও। উপন্যাসটা শেষ করতে হবে। (আকলির মা চলে যেতে যাবে) শোনো আকলির মা, তোমার তো অনেক দুংখ! কখনো আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করেনি তোমার?
আকলির মা: কি সব পাপের কথা বলেন? পরকালটাও খোয়াব নাকি!
শরিফ চৌধুরী: না ধর তোমাকে বলা হল, গল্পের মানুষগুলোর মত তোমারও কোন পরকাল নেই। মৃত্যুই তোমার সকল কষ্টের অবসান।
আকলির মা: তবুও কেমন জানি ডর করে! বেঁচে থাকাকে অস্বীকার করি কেমন করে!
শরিফ চৌধুরী: মৃত্যুকে তোমরা এত ভয় পাও কেন বুঝিনা!
আকলির মা: স্যার, ডাক্তার আপনাকে বেশি রাত জাগতে বারণ করেছেন।
শরিফ চৌধুরী: তোমাকে না যেতে বলেছি?

[শরিফ চৌধুরী বিছনায় হেলান দিয়ে বসবে। কিছুক্ষণের মধ্যে গভীর ঘুমে নিমগ্ন হবে।]
শরিফ চৌধুরী: তুমি? কে তুমি? কার অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছ?
চরিত্র-৩: হুজুর, আমাকে চিনলেন না? আমি কুদ্দুস।
শরিফ চৌধুরী: কুদ্দুস! কোন কুদ্দুস? না আমি কোন কুদ্দুসকে চিনি না।
চরিত্র-৩: এত তাড়াতাড়ি তো ভুলবার কথা ছিল না? এক চৈত্রের দুপুরে নারায়ণগঞ্জের বস্তিতে আপনি এসেছিলেন, আমার কাছে- মনে পড়ে?
শরিফ চৌধুরী: হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কি চাও আমার কাছে?
চরিত্র-৩: হুজুর, আপনি না বলেছিলেন, আমার জীবন বৃত্তান্ত লিখে আপনি আমার জীবনটাকে একেবারে পাল্টে দেবেন?
শরিফ চৌধুরী: হ্যাঁ, আমি আমার কথা রেখেছি। আজ তো তুমি তারকা! দেশ বিদেশের মানুষ তোমার নাম জানে।
চরিত্র: সবাই চেনে আপনার উপন্যাসের কুদ্দুসকে। সবাই জানে, নীল আকাশ দ্যাখলেই কুদ্দুসের খাওন লাগে না। কিন্তু, ভুখা যে আমাকে শ্যাষ কইরা দিল! আপনি না বলেছিলেন…! কিন্তু কই কেউ তো আইলো না আমার কাছে? সবাই আপনার প্রশংসা করলো, আপনি পুরষ্কার পাইলেন, টাকা পাইলেন। মানব দরদীর খেতাব পাইলেন। কিন্তু কই আমার তো কিচু হইলো না। রাস্তার কুদ্দুস আমি, রাস্তায়-ই থ্যাইকা গেলাম! আর আপনে…?
শরিফ চৌধুরী: তোর মত ছোটলোকের নাম সারা বিশ্ববাসী জানে- আর কি চাস্ তুই?
চরিত্র-৩: খাওন চাই, মাথা গুজবার ঠাঁই চাই।
শরিফ চৌধুরী: আমি দানের প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছি নাকি? এখানে কেন এসেছিস?
চরিত্র-৩: আমার হিস্সা বুইজা লইতে।
শরিফ চৌধুরী: কি বললি? দারোয়ান! দারোয়ান!
চরিত্র-৩: চিৎকার করবেন না। আমি যাচ্ছি। তই হিসাব বুইজা লইতে আবার আমু। আমার পোলাটা জেল থ্যইকা ছাড়া পাইছে। ও এখন ভালো পথে রোজগার করে। আমার বউটা মারা গেছে, আমি হেরে মাপ কইরা দিছি। আপনার উপন্যাসটায় লিইখা দিয়েন।
শরিফ চৌধুরী: দারোয়ান- দারেয়ান-
[চিৎকার শুনে আকলির মা ছুটে আসবে)]
আকলির মা: স্যার, কি হয়েছে? দারেয়ানকে ডাকেন কেন? স্যার- স্যার-
শরিফ চৌধুরী: ওহ্ তুমি? কিছু হয়নি। ডাক্তারকে কাল একবার আসতে বল।

৩য় দৃশ্য
গেস্টরুমে শরিফ চৌধুরীর বাল্যবন্ধু কবি মাসুম আজিজ বসে আছে। শরিফ চৌধুরীর প্রবেশ।

শরিফ চৌধুরী: তা কবি যে! পথ ভুল করে নাকি?
মাসুম আজিজ: না বন্ধু, সজ্ঞানেই এসেছি।
শরিফ চৌধুরী: এতদিনে খোঁজ খবর নিতে আসলে?
মাসুম আজিজ: উ-হু, দিতে আসলাম। তোমার খবর তো আজকাল মিডিয়াতেই পাওয়া যায়।
শরিফ চৌধুরী: তোমরা কবিরা কথার জাদুকর! তোমাদের সাথে পেরে ওঠা বড় মুশকিল!
মাসুম আজিজ: আজকাল কথাসাহিত্যিকরাও কিন’ কম জানে না! তুমি তো দেখিয়েই দিলে…
শরিফ চৌধুরী: কি-যে বলোনা। সবই মানুষের ভালোবাসা। বুঝলে হে?
মাসুম আজিজ: মানুষের ভালোবাসা? হুম, তাতো বটেই!
শরিফ চৌধুরী: আমার কথা বাদ দাও, তোমার কথা শুনি। জানতে পেরেছিলাম অভাবে পড়েছ?
মাসুম আজিজ: অভাব? যার কিছু নেই তার আবার অভাব কিসের? অভাব তো হবে তোমাদের!
শরিফ চৌধুরী: হা! হা! হা! ভালো বলেছ। তবে জানো কি বন্ধু- সবই আছে শুধু শান্তি নেই!
মাসুম আজিজ: বিয়েটা যদি করতে, তাহলে…?
শরিফ চৌধুরী: তুমি তো সবই জানো…!
মাসুম আজিজ: এত টাকা তোমার; বাইরের কোন ভালো ডাক্তারকে দেখালেই পারতে?
শরিফ চৌধুরী: চেষ্টা করিনি আবার! বাদ দাও ওসব কথা।
মাসুম আজিজ: এত খ্যাতি, এত টাকা- এসব কার জন্যে শুনি?
শরিফ চৌধুরী: কেউ নেই বলে তো এগুলোর দরকার বেশি বেশি। কিছু তো একটা নিয়ে বাঁচতে হবে- নাকি? নিজেকে ভুলিয়ে রাখা আর কি!
মাসুম আজিজ: হুম্! তা, এই বই মেলায় কি বই বেরুচ্ছে তোমার?
শরিফ চৌধুরী: একটি উপন্যাস নিয়ে পড়ে আছি বহুদিন থেকে। বলতে পারো, এটাই আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ট কাজ হবে। শেষের দিকে আটকে গেছি।
মাসুম আজিজ: আটকে গেছ মানে? তোমাকে আটকায় কার সাধ্য!
শরিফ চৌধুরী: গল্পের চরিত্রগুলো না কেমন জানি…
মাসুম আজিজ: থামলে কেন? চরিত্রগুলোর কি হয়েছে?
শরিফ চৌধুরী: না, ও কিছু না। আজ রাতেই শেষ হয়ে যাবে।
মাসুম আজিজ: উপন্যাসটির নাম কি দিলে?
শরিফ চৌধুরী: কুঁড়েঘর!
মাসুম আজিজ: আচ্ছা বন্ধু, একটা হিসাব আমি কিছুতেই মেলাতে পারলাম না, একটু ধরিয়ে দিবে?
শরিফ চৌধুরী: কেন? অংকে তো তুমি আমার থেকে বরাবরই ভালো ছিলে।
মাসুম আজিজ: কিন’ জীবনের অংকে তুমিই জিতেছ। আসলে…মানে..আমি! আচ্ছা, তুমি তো জীবনেও অভাব দেখনি। সোনার চামচ মুখে জন্ম তোমার। তবুও তোমার উপন্যাসে অভাবে জর্জরির, অসহায়, না খেতে পাওয়া মানুষগুলোর চরিত্র এত সুন্দরভাবে ফুঁটিয়ে ওঠে কি করে? পুকুরের জল দেখলেও ক্ষুধায় আমার পেট চো চো করে কিন’ কই হাহাকার নিয়ে তো একটা পংক্তিও লিখতে পারলাম না!
শরিফ চৌধুরী: যার যেটার অভাব সে সেটা নিয়েই তো থাকবে- নাকি?
মাসুম আজিজ: (একটু আনমনা হয়ে) উম্, হ্যাঁ…হবে হয়ত..

৪র্থ দৃশ্য
ডা: আশরাফ বিল্লাহ শরিফ চৌধুরীর পাল্স পরীক্ষা করছে।

আশরাফ বিল্লাহ: ঔষধ বোধহয় ঠিকমত খাচ্ছেন না! অবস’ার তো আরো অবনতি ঘটেছে।
শরিফ চৌধুরী: আচ্ছা ডাক্তার, আমরা সবাই কোন না কোন উপন্যাসের চরিত্র না-তো? মহাকাল সময়ের কলমে লিখে চলেছে আমাদের প্রতিটা মুহুর্ত! আমাদের অসি-ত্ব কি শুধুই পৃথিবী নামক এই উপন্যাসের মধ্যে বন্দি! এই উপন্যাসের কি আর কোন খন্ড বেরুবে?
আশরাফ বিল্লাহ: কী জানি! এ রহস্যের জাল ছেদ করতে না পারাটাই বোধকরি আমাদের সবথেকে বড় সীমাবদ্ধতা।
শরিফ চৌধুরী: এ থেকে কি প্রমানিত হয় না যে আমরা সবাই ঐ বইয়ের চরিত্রগুলোর মতই একটি নির্দিষ্টতার মাঝে বন্দি? কেউ একজন আমাদেরকে লিখে চলেছেন আপন মেজাজে!
আশরাফ বিল্লাহ: আমি কিন’ ইচ্ছা করলেই একটা ইনজেকশন পুশ করে আপনাকে চিরকালের জন্য ঘুম পাড়িয়ে রাখতে পারি; আমি চিন্তা করতে পারি ইচ্ছা মত;- এত স্বাধীনতা আপনি দেন-কি আপনার চরিত্রগুলোকে?
শরিফ চৌধুরী: কিন্তু তবুও আপনি জানেন না আপনার গল্পের শেষটা, আগামীর হাতে আপনি আমার চরিত্রগুলোর মতই অসহায়…কারো ইশারার অপেক্ষায়…!
আশরাফ বিল্লাহ: হুম্…জ্বর আরো বেড়ে গেছে। না এভাবে আর হবে না। আপনার বায়ু পরিবর্তন খুবই জরুরী হয়ে উঠেছে।
শরিফ চৌধুরী: আর একটি মাত্র রাত আমাকে সুযোগ দিন ডাক্তার। কাল আপনি যেখানে ইচ্ছে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েন। একটি বাক্যও ব্যয় করব না- কথা দিলাম।
আশরাফ বিল্লাহ: সেই ভালো। আর দেরি করা ঠিক হবে না। আমি বরং উঠি। আপনি কাজটা সেরে নিন। টেবিলে ঘুমের ঔষধ রেখে গেলাম, খেয়ে নিয়েন।
শরিফ চৌধুরী: ঘুম…? হ্যাঁ, আপনি ব্যবস্থা করুন। আকলির মা ডাক্তারকে এগিয়ে দাও।

৫ম দৃশ্য
রাত ২টা। শরিফ চৌধুরী চেয়ার-টেবিলে বসে লিখে চলেছে। রাজ্যের ঘুম তার চোখে কিন’ উপন্যাসটি শেষ না আজ কিছুতেই ঘুমাবেন না তিনি। একপর্যায়ে খোলা খাতার ওপর মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়লেন। মঞ্চে চরিত্র-১, চরিত্র-২ এবং চরিত্র-৩ এর প্রবেশ।

শরিফ চৌধুরী: তোমরা? আবার এসেছ? কি চাও তোমরা?
চরিত্র-১: আপনার হাত দিয়ে এখনো কলঙ্কের রক্ত বৃষ্টির ফোটার মতন টপ্ টপ্ করে ঝড়ে পড়ছে! আমি আপনাকে মুক্তি দিতে এসেছি।
চরিত্র-২: (চরিত্র-১ কে উদ্দেশ্য করে) আমার ওপর অন্যায় করা হয়েছে। আমাকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ দাও।
চরিত্র-৩: আমার হিসাব আজ আমি কড়াই-গন্ডাই বুঝিয়ে নেব। আজ আর আপনার মুক্তি নেই।
(সহসা সাদা শাড়িতে আপাদমস-ক জড়ানো আরো একজনের অর্থ্যাৎ চরিত্র-৪ এর প্রবেশ)
চরিত্র-৪: স্যার, আমার মেয়ে কোথায়? তাকে আপনি কোথায় পাঠাইলেন? আজ আপনাকে বলতেই হবে!
শরিফ চৌধুরী: একি তুমি?! তুমিও শেষ পর্যন্ত…! আমি…আমি তোমাকে পুলিশে দেব।
চরিত্র-৪: আমি ওদেরকে সব বলে দেব! সব ফাস করে দেব!
শরিফ চৌধুরী: একি? তোমরা এভাবে আমার দিকে এগিয়ে আসছো কেন? (শরিফ চৌধুরী ভয় পেয়ে যাবে) না, না, এ অসম্ভব- এ হতে পারে না! আমি নিশ্চয় স্বপ্ন দেখছি।
চরিত্র-৩: হা! হা! হা! স্বপ্ন? স্বপ্নই তো! আমরা সবাই স্বপ্ন দেখছি। আমরা কেও আর জেগে নেই।
শরিফ চৌধুরী: না- এ অসম্ভব! ছেড়ে দাও আমাকে। আমাকে মেরো না দয়া করে।
চরিত্র-৪: মৃত্যুকে এত ভয় কিসের চৌধুরী সাহেব?
চরিত্র-২: আমাদের সাথে না তোমার আত্মার সম্পর্ক? আমাদের সাথে থাকতে এত আপত্তি কেন?
শরিফ চৌধুরী: না, না, তোমরা আমাকে মারতে পারো না। আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি। এতটা বিশ্বাসঘাতক তোমরা হতে পারো না!
চরিত্র-১: আমি চোর, আমি মাতাল…হা! হা! হা!
[চারজন এসে একসাথে গলাটিপে ধরবে শরিফ চৌধুরীর। শরিফ চৌধুরী তড়পাতে তড়পাতে মেঝেতে পড়ে যাবে।]

শেষ দৃশ্য
সাদা কাপড় দিয়ে জড়ানো থাকবে শরিফ চৌধুরীর মৃত দেহ। ইনস্পেক্টর তানভির সুমন খুটিয়ে খুটিয়ে দেখবে রুমের চারপাশ এবং আকলির মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।

তানভির সুমন: গতকাল বাসায় কে কে এসেছিল?
আকলির মা: স্যারের অনেক পুরনো দিনের এক বন্ধু আর ডাক্তার।
তানভির সুমন: গতরাতে কে কে ছিল?
আকলির মা: (কাঁদতে কাঁদতে) আমি আর স্যার।
তানভির সুমন: তুমি কখন স্যারকে মৃত হিসাবে আবিষ্কার করলে?
আকলির মা: সকালে চা দিতে গিয়ে দেখি, স্যার টেবিলে খাতার ওপর মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। অনেক ডাকাডাকি করলাম, কোন সাড়াশব্দ নেই। গায়ে হাত দিয়ে দেখি…(কান্না)
তানভির সুমন: রাতে রুমের ভেতর থেকে কোন শব্দ শুনতে পেয়েছিলে কি?
আকলির মা: না। গতকাল আমি একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
তানভির সুমন: যদি খুন হয়ে থাকে তবে তোমার রক্ষা নেই!
আকলির মা: খুন? স্যারকে খুন করা হয়েছে? হায় আল্লাহ! আমি একি শুনছি।
তানভির সুমন: এখন এতটা নিশ্চয়তা দিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। হার্ট এ্যটাক কিংবা আত্মহত্যাও হতে পারে- মেডিক্যাল টেস্টের পর সব জানা যাবে। (কনস্টেবলদের ইশারা করে) ডেড বডিটা গাড়িতে তোলো।
আকলির মা: আত্মহত্যা? না, না, স্যার আত্মহত্যা করতে যাবেন কোন দুংখে!
তানভির সুমন: আমি আবার আসব। তুমি আমার নির্দেশ ছাড়া এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না। কি যেন তোমার নাম বলেছিলে?
আকলির মা: আকলির মা।
তানভির সুমন: এটা তো স্যারের একটা উপন্যাসের নাম।
আকলির মা: হ্যাঁ। ওটা আমাকে নিয়ে লেখা।
তানভির সুমন: আকলি এখন কোথায়?
আকলির মা: উপন্যাসটি পড়েননি?
তানভির সুমন: ও হ্যাঁ মনে পড়েছে। মেয়েটা এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে…! শোনো, কাদের সাথে স্যারের ওঠা বসা তার একটা তালিকা করে আমাকে দিবে। আমরা ডেড বডিটা নিয়ে গেলাম। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। এমন সাক্সেসফুল একজন মানুষের জীবনের এইভাবে ইতিঘটবে;- ভাবা যায় না!
[আকলির মা প্রচন্ড কান্নায় ভেঙ্গে পড়বে]

http://shashwatiki.mywibes.com/

জন্ম সন : ১৯৮৬ জন্মস্থান : মেহেরপুর, বাংলাদেশ। মাতা ও পিতা : মোছাঃ মনোয়ারা বেগম, মোঃ আওলাদ হোসেন। পড়াশুনা : প্রাথমিক, শালিকা সর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শালিকা মাদ্রাসা। মাধ্যমিক, শালিকা মাধ্য বিদ্যালয় এবং মেহেরপুর জেলা স্কুল। কলেজ, কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন। স্নাতক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি অনার্স, ফাইনাল ইয়ার)। লেখালেখি : গল্প, কবিতা ও নাটক। বই : নৈঃশব্দ ও একটি রাতের গল্প (প্রকাশিতব্য)। সম্পাদক : শাশ্বতিকী। প্রিয় লেখক : শেক্সপিয়ার, হেমিংওয়ে, আলবেয়ার কামু, তলস্তয়, মানিক, তারাশঙ্কর প্রিয় কবি : রবীন্দ্রনাথ, জীবননান্দ দাশ, গ্যেটে, রবার্ট ফ্রস্ট, আয়াপ্পা পানিকর, মাহবুব দারবিশ, এলিয়ট... প্রিয় বই : ডেথ অব ইভান ঈলিচ, মেটামরফোসিস, আউটসাইডার, দি হার্ট অব ডার্কনেস, ম্যাকবেথ, ডলস হাউস, অউডিপাস, ফাউস্ট, লা মিজারেবল, গ্যালিভার ট্রাভেলস, ড. হাইড ও জেকিল, মাদার কারেজ, টেস, এ্যনিমাল ফার্ম, মাদার, মা, লাল সালু, পদ্মা নদীর মাঝি, কবি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিলে কোঠার সেপাই, ভলগা থেকে গঙ্গা, আরন্যক, শেষের কবিতা, আরো অনেক। অবসর : কবিতা পড়া ও সিনেমা দেখা। যোগাযোগ : 01717513023, [email protected]

মন্তব্যসমূহ

  1. প্রদীপ দেব মে 13, 2010 at 7:17 অপরাহ্ন - Reply

    লেখকের দায়বদ্ধতা ব্যাপারটা একটু গোলমেলে। পদ্মা নদীর মাঝি’র কুবের বা মাঝি শ্রেণীর প্রতি মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ভালবাসা ছিল কি ছিল না সেই তথ্য কি খুব জরুরী? সাহিত্য বিচারে পদ্মা নদীর মাঝি কোন্‌ পর্যায়ের সেটাই বিবেচ্য।

  2. ফরিদ আহমেদ মে 12, 2010 at 8:54 অপরাহ্ন - Reply

    শিরোনাম বক্সে লেখকের নাম ব্যবহার করায় মূল শিরোনাম পালটে গেছে। আপনার নামটা ওখান থেকে ছেটে ফেলাটাই বোধহয় ভাল হবে।

  3. স্নিগ্ধা মে 12, 2010 at 8:15 অপরাহ্ন - Reply

    মোজাফফর হোসেন, এ পর্যন্ত প্রকাশিত আপনার লেখাগুলো বেশ প্রশংসিত হয়েছে, তাই এ লেখা সম্পর্কে সমালোচনা করতে গিয়ে একটু অস্বস্তিতে ভুগছি – কেমন যেন ‘শুধুই দোষ খুঁজে পাই’ ধরনের একটা ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে!

    আপনার লেখার হাত শক্তিশালী। আসলেই। কিন্তু এই নাটিকা/চিত্রকল্পটি বেশ একটু ক্লিশে। এই থীম পাঠকের বেশ চেনা। বিশেষ করে এই দ্বিমুখীচারিতা বা ভন্ডামি আপনি নিজেই কাহিনীর একদম শুরুতেই খুব স্পষ্ট করে দেন –

    শরিফ চৌধুরী: (প্রচন্ড রেগে গিয়ে) চোখের মাথা খেয়েছ নাকি? দেখে কাজ করতে পারো না? এক থাপ্পড় দিয়ে…(দাতে দাত খিঁচে)! কিছু মনে করবেন না। এই ছোটলোকের জাতদের লাই দিয়ে মাথায় ওঠাতে নেই। anyway, খুবই ভালো প্রশ্ন।

    এর পরের আত্মগ্লানির অংশটুকুও লেখকের তৈরী করা বিভিন্ন উপন্যাসের চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার যে চেষ্টা করা হয়েছে, সেটা খানিকটা দুর্বল। আকলির মা’র মুখের কথা/ভাষা একজন কাজের মহিলা বা গ্রামের মহিলার জন্য ততোটা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে নি।

    আর শেষটা নিয়ে আমি সংশয়িত। আকলির মা’র তো লেখকের ওপর রাগ থাকার কথা! সে যদি তারপরও লেখকের মৃত্যুতে ‘কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে’, তাহলে অনুভূতির সেই টানাপোড়েনটা বা তার কারণ আরও কিছুটা বিস্তৃত করা দরকার ছিলো না?

    তবে, সবশেষে একথাটাও বলি – আপনার লেখার হাত আসলেই ভালো। হয়তো এর পরের লেখাটা পড়েই একদম মুগ্ধ হয়ে যাবো 🙂

    • মোজাফফর হোসেন মে 13, 2010 at 3:30 পূর্বাহ্ন - Reply

      @ প্রিয় স্নিগ্ধা, আমি একজন তরুণ লেখক। সত্যি বলতে লেখক শব্দটা ব্যবহার করতে আমার বেশ লজ্জা লাগে। anyway, আমার মত তরুণ লেখকদের জন্য শুধুমাত্র সাধুবাদ জানানোর থেকে ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া অনেক ভালো, এতে আমারই মঙ্গল। আমি ব্লগে লেখি তার অন্যতম কারণ হচ্ছে আমার লেখার ভুল বা দুর্বলতাগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে শুদরে নেওয়া। তাই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

      প্রথমত, আমি নাট্যকার না। আমি এখনো experiment এর অপর আছি। প্রথম কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলাম। পরে দেখলাম কবিতা আমার দ্বারা হবে না। সারাজীবন ধরে কবিতা লিখলে বড় জোর তৃতীয় শ্রেণীর কয়েকটি কবিতা হয়ত লিখতে পারবো। তাই কবিতা লেখা কমিয়ে দিলাম। এখন মাঝে মধ্যে গল্প প্রবন্ধ নাটক লিখে আসলে দেখতে চাচ্ছি, আমাকে দিয়ে চূড়ান্তভাবে কোনকিছু সম্ভব কি-না।

      আর এই নাটকের ব্যপারে যদি বলতে হয়, তবে শুরুতেই বলি আপনার অভিযোগ পুরোটাই সত্য।
      এই নাটকের কেন্দ্রিয় চরিত্র হচ্ছে একজন লেখক। একটা পর্যায়ে তাঁর বিবেক জেগে ওঠে। তখন সে সাইকো হয়ে যায়। তার কল্পনার জগতে অনেক কিছুই ঘটতে থাকে যার ব্যাখ্যা আমরা করতে পারি না। একটা পর্যায়ে তার unconscious mind থেকে অনেক কিছুই conscious mind এ চলে আসে। তখন তার ভেতরে দুইটো সত্বার conflict শুরু হয়। আর duelism এর ব্যপারটা সাহিত্যে চিরবকাল ছিল এবং থাকবে। প্রকৃত পক্ষে, ‘man is not trully one but trully two’ তাই সাহিত্যে মানুষের দুই ধরণের আচরন থাকবেই। তাই তো প্রশ্ন উঠে আসে আপনা আপনি, আমরা যেটা ভাবি আসলেই কি তা বলি? কিম্বা আমরা যা করি আমাদের মন কি তাই করতে বলে? একবার ভেবে দেখুন তো আমাদের unconscious mind যদি কথা বলত তাহলে কি কেলেঙ্কারীই না ঘটে যেত !

      আর একটা ব্যপার হচ্ছে, আমরা প্রায়ই বলি, সাহিত্যিকদের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা। মানিক ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ লিখে কি কুবেরদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছ? সবাই ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ পড়েছে, মানিক পেয়েছে খ্যাতি। কুবেরদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। মানিক যদি সত্যিই কুবেরদের ভালোবেসে উপন্যাসটি লিখে থাকে তবে মানিকের মৃত্যু ঘটেছে বইকি। নাটকটিকে কেন্দ্র করে আরো অনেক কথায় চলে আসে…

      আকলির মা কি লেখকের মৃত্যু শোকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ? নাকি অন্য কোন কারণ থাকতে পারে! হতে পারে তার আর কোন আশ্রয় থাকলো না এই ভেবে, কিম্বা এই কান্না শুধু মাত্র একটি বিচ্ছেদের কান্না। তাছাড়া নাটকের কোথাও তো পরিষ্কার করে বলা হয়নি, আকলির মা লেখককে শুধুই ঘৃনা করে। লেখকের রুমে মধ্যরাতে যে আকলির মা যায় সেটা তো লেখকের কল্পনার….

      যাই হোক, আবারো ধন্যবাদ আপনাকে। আমার প্রতিটি লেখায় আপনার আলোচনা প্রত্যাশা করছি। ভালো থাকবেন।

মন্তব্য করুন