বানান নিয়ে বকবকানি

 

বানান ভুল নিয়ে  মুক্তমনায় ইদানিং অনেকেই মহাবিরক্ততাদের বিরক্তি তারা প্রকাশ করেছেন নানাভাবেমুক্তমনা এডমিনও খুব সোচ্চার হয়ে উঠেছেন বানান ভুল নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে। সোচ্চার না হয়ে উপায়ও নেই কোনকারো কারো লেখায় বানান ভুলগুলো এমনভাবে বসন্তের দাগের মত উৎকট হয়ে থাকে যে সেগুলোকে সহজভাবে মেনে নেয়াটা আসলেই বড্ড কঠিন কাজশুধু প্রবন্ধই নয়, কবিতাগুলোও বানান ভুলের দোষ থেকে মুক্ত নয়কারো কারো কবিতায়তো বানান ভুলের ভুড়ভুড় গন্ধে কাছেই ভেড়া যায় নাআট লাইনের একটা ছোট্ট কবিতায় যদি বারোটা বানান ভুল থাকে তবে সেটা পড়তে কি আর কারো ভালো লাগে? গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত এখন মন্তব্যেও বানান ভুলের মচ্ছব শুরু হয়েছে

 

কেউ কেউ বানান ভুলের অজুহাত হিসেবে ব্যাকরণে দুর্বলতার কথা বলছেনকিন্তু কথা হচ্ছে যে, বানান শুদ্ধ করে লেখার জন্যেতো ব্যাকরণের প্রয়োজন নেইপ্রয়োজন হচ্ছে একটি অভিধানের আর সদিচ্ছারযারা দেশে আছেন তাদের পক্ষে কী খুব একটা কষ্টকর কাজ একটা অভিধান জোগাড় করা? দেশের বাইরে যারা আছেন তাদের কাছে অভিধান নাও থাকতে পারেতবে না থাকলেও খুব একটা ক্ষতি নেইঅনলাইনে সংসদ বাংলা অভিধান পাওয়া যায়সেটা দিয়ে বানানগুলো ভুল না শুদ্ধ সেটা যাচাই করে নিতে পারেন

 

কেউ কেউ আবার টাইপোর অজুহাতও দিয়ে থাকেনএটা অবশ্য ফেলনা যুক্তি নয়কিন্তু, কথা হচ্ছে টাইপোর ক্ষেত্রে সাধারণত কঠিন বানানটা ভুল হবার কথাযেমন ধরুন গুণ লিখতে গিয়ে গুন লিখতে পারে কেউকিন্তু ধন্যবাদ লিখতে গিয়ে কেউ যখন দিনের পর দিন ধণ্যবাদ লেখে বা কাহিনী লিখতে গিয়ে লিখে কাহীনি তখন কী আর টাইপোর অজুহাত খাটে?  

 

একটা লেখা লিখতে একজন লেখককে অনেক ভাবনা চিন্তা করতে হয়, অনেক পরিশ্রম করতে হয়সেই কষ্টের লেখাটাই যখন বানান ভুলের দোষে দুষ্ট হয়ে পাঠকের মনে বিরক্তির জন্ম দেয় তখন সেটা নিশ্চয়ই লেখকের জন্য সুখকর কিছু নয়লেখার সময় বানান ভুল বা টাইপোগুলোকে চোখে নাও পড়তে পারেলেখার পরে নিজে সম্পাদনা করলে বা কাউকে দিয়ে পড়িয়ে নিলে বানানগুলোকে বশে আনা কিন্তু খুব কঠিন কোন কাজ নয় এত পরিশ্রম করে একটা কিছু লেখা হচ্ছে আর সামান্য একটু কষ্ট করে সেটাকে গোটা দুয়েকবার সম্পাদনা করা যাবে না তা মেনে নিতে কষ্ট হয় 

 

 

মুক্তমনায় বানান ভুল নিয়ে যারা সবচেয়ে বেশি বিরক্ত  তাদের মধ্যে  বন্যা একজনজীবনের একটা সময়ে বাংলা লেখালেখির সঙ্গে তার কোন সংস্রব ছিল না বললেই চলেঅনেক কষ্ট করেই বাংলা লেখা শিখতে হয়েছে তাকে। (এখন অবশ্য সেটা বোঝার আর কোন উপায় নেই বাংলায় তার দখল এখন এমনই যে, দেখলে মনে হবে যেন বাংলা সাহিত্যেরই ছাত্রী ছিল সে।) সে কারণেই হয়তো বানান নিয়ে লোকজনের পরিশ্রমবিমুখতায় পুঞ্জীভূত অসন্তোষ তারতার এই অসন্তোষ বহুবারই সে জানিয়েছে আমাকে 

 

অনেকদিন আগে বানান নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। সেই লেখাটাই আবার পোষ্ট দিলাম এখানে

_______________________________________

 

দিনে দিনে মুক্তমনার জনপ্রিয়তার সাথে সাথে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য বাঙালিদের কাছ থেকে দারুণ দারুণ সব লেখা পাচ্ছি আমরা প্রতিনিয়তবিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে মুক্ত বিহঙ্গের স্বাধীনতা থাকার কারণে নিত্য নতুন চমকপ্রদ বিষয়ের উপর অত্যন্ত সুখপাঠ্য, জ্ঞানগর্ভ ও আনন্দদায়ী লেখাতে প্রতিদিনই  উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে মুক্তমনার প্রধান পাতাএটা নিঃসন্দেহেই অত্যন্ত সুখের খবর, গর্বেরও বিষয়প্রতিদিন হালনাগাদ করা হয় এরকম বাংলা আন্তর্জালিক পত্রিকা সংখ্যায় এতই কম যে গুণতে মনে হয় আঙুলেরও প্রয়োজন পড়বে না  

 

মুক্তমনায় যে  লেখাগুলো আসে তার সবগুলোই আমি অসীম আগ্রহ নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়িমুক্তমনার বেশিরভাগ লেখকের লেখারই দারুণ ভক্ত আমিকারো কারো লেখাতো এতো অসাধারণ, সাবলীল এবং ঝরঝরে যে পড়ার পর নিজে কি সব ছাইপাশ লিখি সেটা ভেবে রীতিমত লজ্জায় কর্ণলতি রক্তিম হয়ে যায় আমার  মুগ্ধ আবেশে অবাক বিস্ময়ে ভাবি এত সুন্দর লেখা মানুষ লেখে কি করেআমি হাজার মাথা কুটে গণনযন্ত্র ভেঙে ফেললেওতো ওরকম লেখা আমার চাবি-ফলক দিয়ে বের হবে না  একারণেই মাঝে মাঝে ধনুর্ভঙ্গ পণ করে ফেলি যে আর লিখবো না এই সব ছাইপাশতবে আমার ধনুকটা অত শক্তপোক্ত নয় বলেই হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই আবারো বেহায়ার মতো টুক টুক করে আঙুল চালাই চাবি-ফলকে

 

যাইহোক, এই লেখার বিষয়বস্তু কিন্তু কার লেখার মান কি রকম সে বিষয়ে নয়আমাদের অনেক লেখকই চমৎকার লেখেন সে বিষয়টা নিয়ে শুধু আমার কেন হয়তো কারো মনেই কোন সন্দেহ নেইভাল একটা লেখাতো আর এমনি এমনিই আসে নাএর জন্য গভীর যত্ন নিতে হয়, ঠিকমত জল টল দিতে হয়,  সেই সাথে আন্তরিকতার মশলা মিশিয়ে দিতে হয় পরিমাণমততারপরই না পাওয়া যায় সুস্বাদু মচমচে জিনিষআমার মত চাবি-ফলকে ঝড় উঠিয়ে হুম হাম করে যা মনে এলো তাই লিখে ফেলা, সেরকম করে নিশ্চয় খুম কম লোকই লেখেনতবে অনেক সময় যেরকম কুড়মুড়ে  মুড়মুড়ে জিনিষও সামান্য লবনের অভাবে বিস্বাদ হয়ে যেতে পারে, সেরকম শুধুমাত্র বানান ভুলের কারণে অসাধারণ একটা লেখাও কখনো কখনো অত্যন্ত বিরক্তিকর পর্যায়ে নেমে আসতে পারেযার কিছুটা লক্ষণ বাংলায় যারা লেখালেখি করেন তাদের সবার মধ্যে না হলে কারো কারো মধ্যে লক্ষ্য করা যায় 

 

আমি খেয়াল করে দেখেছি যে, কোন এক অজ্ঞাত কারণে আমরা বাংলা বানানের প্রতি খুব একটা যত্নশীল নাহরহামেশাই ভুলভাল বানানে লিখে ফেলি যা লেখার তাএর জন্য তেমন কোন লজ্জাবোধ বা আত্মগ্লানিতেও ভুগি না আমরাআমি নিজেও যে ধোয়া তুলসী পাতা তা বলছি নাআমার নিজের লেখাগুলো যে সম্পূর্ণ বানান বিভ্রাটমুক্ত এমন দাবী করার মত সৎ সাহস অন্তত আমার নেইঅবশ্য এই লেখাটা আমি সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়ে লিখছি। ( বুদ্ধি করে একটা অভিধান নিয়ে বসেছিকাজেই বলে নিচ্ছি ভুল টুল কিছু হলে অভিধান বেটাই দায়ী, আমি না।)। বানান ভুল সংক্রান্ত নিয়ে লেখায় বানান ভুল থাকুক এটা নিশ্চয় খুব একটা প্রীতিকর কিছু নয়তারপরও কেউ কেউ হয়তো আমার এ লেখাতেই সামান্য চেষ্টা করলে বেশ কিছু বানান ভুল আবিষ্কার করে ফেলতে পারবেনতবে এটুকু অন্তত আশা করছি যে কেউ আমাকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে আঙুল তুলে বলবেন না, ‘বাপু হে, আগে নিজের কাছাখানা সামলাওতো দেখি

 

তবে এটাও সত্যি বাংলা বানানের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সর্বজনগ্রাহ্য কোন বানান রীতি গড়ে উঠেনিদুই বাংলায় দুই ধরনের বানানতো আছেই, সেই সাথে বানানের ব্যাকরণ রীতিটাও বড্ড বেশি জটিল বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেচোখ বন্ধ করেতো দূরের কথা চোখ খোলা রেখেও ভরসা করার মতো কোন অভিধান আমাদের নেইবাংলা একাডেমীর অভিধানের সাথে পশ্চিম বাংলার সংসদ অভিধানের যথেষ্ট পার্থক্য সাদা চোখেই যে কারো কাছে দৃশ্যমান হবেএর অবশ্য কারণও আছেপশ্চিম বাংলায় বাংলা অনেকটা স্থির, আঁটোসাঁটো নিয়মের মধ্যে কাঠামোবদ্ধ অবস্থায় আছেসেই তুলনায় বাংলাদশের বাংলা চপলা কিশোরীদের মত বড় বেশি চঞ্চলা, বড্ড বেশি  বল্গাহীন এবং ভয়াবহ রকমের গতিশীলএই গতির কারণেই বাংলাদেশের বইয়ের পাতার প্রমিত বাংলা ভাষা আর মানুষের মুখের ভাষায় গড়ে উঠেছে আসমুদ্র হিমাচল দূরত্ববা বলা যায় যে বাংলাদেশে মানুষের মুখের ভাষা প্রমিত বাংলাকে হঠিয়ে দিয়ে উঠে আসছে বইয়ের পাতায়এতে অবশ্য সমস্যাও তৈরি হচ্ছেযে যেভাবে শব্দগুলোকে উচ্চারণ করে এখন সেইভাবেই লেখার একটা প্রবনতা দেখা যাচ্ছে অনেকের মধ্যেএতে করে কোন কোন শব্দের সর্বজনগ্রাহ্য বানানও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অনেকসময়ভাষা হচ্ছে বহতা নদীর মততার নিজস্ব নিয়মে সে বিবর্তিত হবে সেটাই স্বাভাবিকএতে আমার বা আমার মত অনেকেরই হয়তো কোন আপত্তি নেইকিন্তু একই সময়ে একই জিনিষ একেকজন বানান লিখবে একেকভাবে সেটা মেনে নেওয়াটাও বেশ কষ্টকর

 

বাংলা উচ্চারণ রীতিও বানান ভুলের জন্য বেশ কিছুটা দায়ীগরু, তরু, জরু অনেক বেশি সঠিক উচ্চারণ আসে গোরু, তোরু বা জোরু লিখলেন এর সাথে ণ, ই এর সাথে ঈ বা স এর শ, ষ এবং স্ব পার্থক্য করাও কঠিনগণ লিখলেও যে উচ্চারণ আসে গন লিখলেও সেটাই আসেরীতিকে রিতী লিখলেও উচ্চারণ পাল্টাবে না একবিন্দুসাভাবিক আর স্বাভাবিকের মধ্যে উচ্চারণগত পার্থক্য কি আমরা করতে পারি? পারি নাতাহলে উচ্চারণ রীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বানান লেখা হবে কীভাবে? নাকি বানানের ক্ষেত্রে উচ্চারণকে উপেক্ষা করে ব্যাকরণকে প্রাধান্য দিতে হবে? মহা জটিল সমস্যা দেখছি!

 

ভাগ্য ভাল এটা আমার সমস্যা নাযাদের মাথা ব্যথা সেই ব্যাকরণবিদরা মাথা ঘামাক ওগুলো নিয়েআমার সমস্যা অন্যখানেআমি যে কারণে এত বকবক করছি সেই বিষয়ে আসা যাক এবারমুক্তমনা ইউনিকোডে যাওয়ার আগে আমরা লেখকদের পাঠানো পিডিএফ ফাইল বা তাদের ডক ফাইলকে মুহুর্তের মধ্যেই ঝটপট পিডিএফ করে সেটাকেই সংযোগে জুড়ে দিতামবড্ড সহজ ছিল কাজটাআহা! কি আরামের দিনই না গেছে তখনভুলভাল বানান যা থাকতো তার সব দায়দায়িত্ব লেখকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যেতো তখন অনায়াসেআমরা থাকতাম ধরা ছোঁয়ার বাইরেকিন্তু ইউনিকোডেড হওয়ার পর থেকে আমাদের কাজ গেছে ঢের বেড়েবেশিরভাগ লেখকেরা এখনো বিজয় বা বর্ণসফট চাবি-ফলক ব্যবহার করে থাকেনসেগুলোকে ইউনিকোডে রূপান্তর করার সময় রূপান্তরক মহাশয় বাংলা অক্ষরের সাথে সাথে আরো বিচিত্র সব অজানা হিজিবিজি চিহ্ন জুড়ে দিয়ে জগাখিচুড়ি যে জিনিষটা উগড়ে দেন তাকে বাংলা বললে বাংলাকে রীতিমত অপমান করা হয়জগাবাবুর সেই খিচুড়ি থেকে পরে ডাল বাছার মত এক এক করে ওইসব বিচিত্র চিহ্নগুলোকে প্রতিস্থাপন করতে হয় চাবি-ফলকে বাংলা অক্ষর মুদ্রণ করে করেসেই সময় যেহেতু কিছুটা হলেও লেখায় হাত পড়ে যায়, কাজেই ভুল বানানগুলোকে ঠিকঠাক করার জন্য আঙুলগুলোও নিশপিশ করতে থাকে তখনগভীরকে গভির, স্বভাবকে সভাব বা মানুষকে মানুস দেখলে কারই বা আঙুল স্থির থাকবে বলুনকিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সময়ের অভাবে সেটা করা হয়ে উঠে না আরতবে মনের মধ্যে খুঁতখুঁতানিটা থেকে যায় ঠিকই

 

বিদঘুটে এই খুঁতখুঁতানি থেকে আমাদেরকে উদ্ধার করতে পারেন একমাত্র লেখকেরাইযে গভীর ভালবাসায় লেখাগুলো লিখছেন আপনারা, সেই একই গভীর ভালবাসা নিয়ে বানান গুলোকেও একটু ঠিকঠাক করে দিন দয়া করেএজন্য খুব বেশি কিছু করতে হবে না আপনাদেরশুধু লেখা শেষ হওয়ার পর পরই কালবিলম্ব না করে ইয়া আলী বলে বিকট এক হুংকার দিয়ে মোটাসোটা একটা বাংলা অভিধান হাতে নিয়ে সম্মুখ সমরে ঝাঁপিয়ে পড়ুনআপনার অজান্তে চাবি-ফলকের ভূত যে বানানগুলোকে ভুলভাল করে লিখেছে সেগুলোকে কোন রকম দয়া মায়া না দেখিয়ে আচ্ছা মত চাবুক মেরে জন্মের মত সোজা করে দিনএরকম কিছুদিন নিয়মিত কষে চাবুক পেটা করলে ভূত বাবাজী বাপ বাপ করে পালিয়ে কূল পাবে না আপনার চাবি-ফলক থেকেভূতের হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়ে তখন আপনার লেখাও হয়ে উঠবে আরো বেশি ঝকঝকে এবং তকতকে

 

আর বানান বিভ্রাটমুক্ত ঝকঝকে তকতকে একটা লেখা পেয়ে আপনার গুণমুগ্ধ পাঠকেরা তাদের ভালবাসা উদারহস্তে দ্বিগুণ বা তিনগুণ করে আপনাকে ফেরৎ দেবেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন

 

এই লেখার কারণে অজান্তে কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে আন্তরিকভাবে দুঃখিতভাল থাকুন সবাই। 

————————————

১ গণনযন্ত্র- কম্প্যুটার 

২ চাবি-ফলক- কিবোর্ড      

৩ রূপান্তরক- কনভার্টার 

  মুদ্রণ- টাইপ

[270 বার পঠিত]